bibidho-chelebela-daake

ছেলেবেলা ডাকে অনন্তের পথে
ফিচার
নবকুমার বসু

তখনও ভোরের হিমকুয়াশায় ডুবে রয়েছে চরাচর। অঘ্রাণ মাসের শেষ দিক। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। নিবিড় নীরবতায় উত্তরের হাওয়া বইছে। আঁধার ফিকে হতে শুরু করেছে। তবু ধূসর আলোহীন চতুর্দিক বিরাজমান স্তব্ধতা। এখন নিষ্প্রভ রজনীর অন্তিম প্রহর। গঞ্জের প্রান্তসীমায় বাংলার শষ্যক্ষেত আর পুরুষ্টু ধানক্ষেতের ওপর বিছিয়ে রয়েছে কুয়াশার মশারি। গাছের কোটরে, নীড়ে জেগে উঠেছে পাখির ছানা। কিচমিচ শব্দ করছে ভোরের আভাস পেয়ে।

এই শান্ত ভোরের আচ্ছন্নতার মধ্যে ভেসে আসে কাঁপা কাঁপা কীর্তনের শব্দ… ভজ গৌরাঙ্গ… কহ গৌরাঙ্গ… লহ গৌরাঙ্গের নাম রে… খোল করতালের শব্দ কখনও শোনা যায়, কখনও হারায়… আবার ফিরে আসে…। জমাট বাঁধা ঠাণ্ডার দিনে কম্বলের উষ্ণতায়, ওমে, আরামে বিছানার মধ্যে পাশ ফিরে শোয় বাঙালি। কারো ঘরে তখনই ভূমিষ্ট হয় এক নবজাতক।

জনৈকা এক পাড়াতুতো মাসি, অন্নমাসি সেই নবজাতকের নাম দিলেন নবকুমার।

কে তিনি এই অন্নমাসি? সম্ভবত তাঁর পুরো নাম অন্নদা ভট্টাচার্য। গৌরী-সমরেশের প্রাণের বন্ধু, পাড়ার ডাক্তার রামরঞ্জন ভট্টাচার্যর কনিষ্ঠা ভগ্নী। তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে প্রভূত ব্যবধান। তথাপি তাঁদের মধ্যে আন্তরিকতা আর বন্ধুত্বে কোন ফাঁক ও ফাঁকি নেই। তৃতীয় সন্তানটির নাড়ি কেটে অন্নদা গৌরীর কোলে তুলে দিয়েছিলেন। দেশ তখন দুবছর আগে স্বাধীন হয়েছিল। সুতরাং ছেলের নাম নবকুমার। তাছাড়াও তার সদ্য লেখক হয়ে ওঠা বাবা সমরেশের সর্বাপেক্ষা প্রিয়, নমস্য সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রর অন্যতম নায়কের নামও নবকুমার। ইচ্ছে করলেই পুত্রের একটু আধুনিক নামকরণ করতে পারতেন সমরেশ। কিন্তু না। পুরানো ধাঁচের বঙ্কিমচন্দ্রীয় নবকুমার-ই তাঁরও পছন্দ। অন্নমাসির দেওয়া নাম রয়ে গেল।

হায় রে, টালির চালের কুঁড়েঘরে জন্ম নিলি এ কোন নতুন কুমার। ‘কানাছেলের নাম পদ্মলোচন’ হয়ে গেল নাকি! নাহ্‌ ছেলের বাবা মা কেউ তা বিশ্বাস করেনি। নবকুমারের জন্মের পর থেকেই একটি একটি করে আরও লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল তার বাবার। এইসব কথা সে শুনেছিল তার আর একটু জ্ঞান হওয়ার পরে।

লেখক কী বস্তু সে তো জানে না! একদিন মায়ের মুখে শুনলি এক আশ্চর্য কথা। “তোদের বাবা যে একজন লেখক”। ব্যাস, আর কিছু জানার দরকার হয় নি। লেখক বলতে আমি বুঝি আমার বাবা। যে শৈশব থেকে আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হতে শুরু করেছিল, তখন থেকে আমি জানি লেখক মানে আমার বাবা। কিন্তু জীবন তো সেই নামের পরিচয়ে চলে না। চালাঘরের দারিদ্রে জ্বলন্ত ক্ষুধার মুখ সর্বদা হাঁ করে থাকে। সেই হাঁ –করা মুখে জোগান দিতে হয় খাদ্যের। একটি দুটি তো নয়। ছ-টি প্রাণী তখন সংসারে। নবকুমারের পরে আর একটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে সেই সংসারে। চার ভাই বোন। বাবা-মা। ছ-জনের টেনে নিয়ে যাওয়া নেহাৎ মুখের কথা নয়।

আজ তবুও স্মরণ করি, ঠিক কবে থেকে সেই দারিদ্র পীড়িত জীবনের স্মৃতি দাগ কেটেছিল মনের ওপর। যা কিছু দাগ কেটেছিল, তা কি শুধু দারিদ্র! নাকি আরও অনেক অনুভূতির সমাহার? একটা বিষয় আমি আজও বুঝি। ইংরেজিতে যেভাবে বলা হয়, ‘মাই মেমরি ইজ মাই এনিমি’ – আমিও প্রায় যেভাবেই আমার স্মৃতিকে অতি প্রখরভাবে কাঁচা বয়স থেকে তুলে আনতে পারি; কিন্তু তাকে আমি ‘এনিমি’ বা শত্রু বলি না, বলতে পারি না।

বরং বলতে পারি, স্মৃতিই আমার মূল্যবোধ ও জীবনের ভিত্তিস্থাপন করেছে। ভালমন্দ মিশিয়ে। শুধু দারিদ্র না। প্রীতি ভালবাসা, বেদনা- হিংসা- যৌনতা, উদারতা-নীচতা, আনন্দ-মজা-শোক-বিস্ময়-মুগ্ধতা-ঘৃণা-ক্রোধ-ক্ষোভ-মমতা… কত কিছুই যে শৈশব বাল্যকালকে অধিকার করে রেখেছিল, আজও তা ভুলি নি। জীবন সায়াহ্নে শব্দটা আমার মোটেও পছন্দ না। তবু শেষের দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছি সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও আজ সেই অতীত সন্ধানের উদ্যোগ শুধু রোমান্থণ না। কিঞ্চিৎ মূল্যায়ন ও পর্যালোচনাও বটে।

কোন ঝাপসা অতীতের অনুভব আর স্মৃতি মনে আসে?

গঞ্জ আর গ্রামের মধ্যবর্তী সেই আটপৌরে অঞ্চলের নাম আতপুর। হ্যাঁ আতপুর। অনেকেই চেনে না এবং জানে না। তাই কেউ উচ্চারণ করে আটপুর বা আঁটপুর। কেউ বা ভুল করে বলে আতাপুর। আমার শৈশবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে যে স্থান, তার নাম আতপুর। লোকেশন-এর ধরতাই দিতে পারি। আতপুরের নিকটতম রেলষ্টেশন, একটু দক্ষিণে গেলেই পড়বে শ্যামনগর। যে স্টেশনে লোকাল ট্রেন ঢোকার সময় যাত্রীসাধারণ কপালে হাত ছোঁয়ান শ্যামনগরের জাগ্রত কালী ঠাকুর তথা কালীমন্দিরের উদ্দেশে।

আর উত্তরে গেলে জগদ্দল, কাঁকিনাড়া। আরও পরে ভাটপাড়া, নৈহাটি। টানা পশ্চিমদিক জুড়ে প্রবাহিত স্বচ্ছসলিলা গঙ্গা। আতপুরের ওপর পাড়ে চন্দননগর। পূর্ব দিকটা গিয়ে দেখেছি কোনোদিনই লোক বিশেষ মাথা ঘামায় না। জায়গাগুলোর তখন কি গুরুত্ব ছিল না! আমডাঙ্গা-হাবড়া-গোবরডাঙ্গা পরের দিকে বনগাঁ গুরুত্ব পেল বাংলাদেশ হওয়ার পরে। কিন্তু সে তো আমার যৌবনকালে। এখন থাক সে কথা। নিবিড় তন্ময়তায় আপাতত ডুবে রয়েছি শৈশব- বাল্যকালে।

স্মৃতির পটে বড় ফ্রেম, তার ধুলো পরিষ্কার করতে করতে দেখছি, একটু একটু করে জেগে উঠেছে স্বচ্ছ ছবি। সে বড় প্রাণময়। সে জীবনের জলছবি আমার কালহরণ করতে পারে নি। দেখতে পাচ্ছি গাড়িঘোড়া আর বাসরাস্তা ছেড়ে এক চুনসুরকির গোলার পাশ দিয়ে আমাদের পাড়ার যাওয়ার রাস্তা। তার একদিকে শ্যাওলাধরা বহু পুরনোদিনের কোনো এক দালান কোঠা। আর একদিকে বস্তির মতো টানা পাশাপাশি টালিখোলার ঘর। শ্রমিক মিস্ত্রী বিহারী মানুষদের বাসস্থান।

সেই পথ ধরে আরও পূবে চলে এলেই আমাদের বাঙালিপাড়া। সরু গলি হঠাৎ চওড়া। হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। বাঁদিকে বড় কলতলার পাশে আতপুর হাই স্কুলের হেডমাস্টারের বাড়ি। বাড়ির জানালায় পর্দা। শুনেছি ওঁর বাড়িতে নাকি রেডিও আছে। আর ডানদিকেই সেই রামরঞ্জন ভট্টাচার্য, ডাক্তারবাবুর বাড়ি। দোতলা। সামনে ডিসপেনসারি। সেখান দিয়ে গেলেই ওষুধ-ওষুধ গন্ধ। ডাক্তারবাবু আমার বাবা-মার বন্ধু। তাঁর বাবা রাঘব ভট্টাচায্‌ নাকি জমিদার। তারা বিরাট বড়লোক। তা সত্ত্বেও ডাক্তারবাবু আমার বাবা-মার বন্ধু, আমাদের পরম আপনজন। শুনেছি, সবাই কম্যুনিস্ট পার্টি করেন, তাই।

আরও সোজা হেঁটে গেলে, মিউনিসিপ্যালিটির খোয়া পেটানো রাস্তা চলে গেছে আমাদের তরফদার পাড়ায়। পথের ডান দিকে বেশ বড়, টানা লম্বা ফুলিপুকুর। পিটুলিগাছের ডাল ছায়া ফেলে সেই পুকুরের জলে। আর বাঁদিকে জানতাম বাঙালদের পাশাপাশি বাড়ি। হায়রে, আমিও যে বাঙাল কেউ তো তা বলে দেয়নি।

সেই খোওয়া পেটানো রাস্তার শেষে কলতলা ঘুরে বাঁ হাতে আমাদের দেড়কামরা টালির বাড়ি। শুধু আমাদের না। পাশাপাশি ঘরে আরও অন্য ভাড়াটে। একেবারে শেষের দুটোয় থাকে বাড়িউলি, মালকানি সুকুমারী। আর তার ঘরজামাইসহ এক মেয়ে রম্ভা। আর এক অবিবাহিতা মেয়ে পারি। নিশ্চয়ই পার্বতী হবে, এখন বুঝি। একটানা টালির ঘরের সামনে উঠোন। একপ্রান্তে ছাই গাদা। সেখানে আমাদের প্রিয় পোষ্য দুই নেড়িকুকুর থাকে। রানি আর কেলো। বছর বছর তাদের তিন চারটে করে নধর বাচ্চা হয়। উঠোনের মাঝখানে তুলসীমঞ্চ। মা সেখানে সন্ধেবেলা পিদিম জ্বালায়।

আমাদের দেড়কামরা ঘরের সামনে একটুখানি দাওয়া। উঠোন থেকে দু ধাপ সিঁড়ি। দাওয়ার ডানদিকে মায়ের রান্নাঘর। তিনখানা উঁচু করা তোলা উনুন। পুরনো বালতিতে ফুটো করে উনুন বানানো হয় আমি জানি। লোহার শিকের ওপর প্রথমে ঘুঁটে, তারপর কয়লা। বালতির তলার দিকে কাটা ফোকর দিয়ে আগুন ধরানো হয় ঘুঁটেতে। কয়লায় আগুন ধরে গেলে গনগনে আঁচ হয়। তখন উনুনে ভাতের হাঁড়ি চাপায় মা। আমি ভাতের গন্ধ পাই।

আমি পাই, যেহেতু একটু তফাতে দাওয়ার ওপর চালা পেতে আমি পড়তে বসি। কেননা আমার দিদি ও দাদা বড়। ওরা অবৈতনিক স্কুলে যায়। আমার স্কুলে যাওয়ার বয়েস হয়নি। মায়ের কাছে বর্ণপরিচয় আর স্লেট, পেন্সিল নিয়ে বসি। পাশে একটি আসন পাতা ছোট্ট বিছানায় আমার ছোটবোন ঘুমোয়।

পড়া ছেড়ে, আমি আনমনা আমি তাকিয়ে থাকি বাইরে। উঠোন ছেড়ে আরও দুরে…। পুকুর। পুকুরে মেঘের ছায়া, জলের ওপর মৃদু বাতাসে স্রোত। একটা মাছরাঙ্গা পুকুরের অনেকটা ওপরে ডানা নাড়তে-নাড়তে স্থির হয়ে থাকে। তারপর ঝুপ করে জলে ডাইভ দেয়। এবং কয়েক মুহূর্ত পরেই ঠোঁটের ডগায় অব্যর্থ শিকার ছোট্ট মাছটি নিয়ে উড়ে যায়।

ষষ্ঠঋতু ঘুরে ঘুরে আসে আমার চোখের সামনে। কালো রঙের স্লেটের ওপর আমার হাত থেমে যায়।

ছ-ইঞ্চি বাই দশ ইঞ্চি কালো পাথরের স্লেট। পাতলা কাঠের ফ্রেম দিয়ে বাঁধানো। দুপিঠেতেই লেখা যায়। একপিঠে স্বরবর্ণ অন্য পিঠে ব্যঞ্জনবর্ণের অর্ধেক মা খড়ি দিয়ে লিখে দিয়েছে। আমি তার ওপর খড়ির পেন্সিল দিয়ে দাগ বোলাবো। হাত সেট হবে। তারপর একদিন আমি নিজেই লিখতে শুরু করব। লেখার প্রতি বড় দরদ আমার।

আর একজনও লেখে। দাওয়ার পেছনে আমাদের ফাটা মেঝের ঘর। সেখানে সামনে চারচৌকো জলচৌকির ওপর সাদা কাগজ। আমার বাবা সমরেশ বসু লেখেন দোয়াতে ডোবানো সরু কলম দিয়ে। দাওয়া আর ঘরের মাঝখানে কাঠের দরজাটা আলগা বন্ধ করা থাকে। ভিতরে মেঝের ওপর পাটির আসন পেতে বাবা লিখছে… গল্প… উপন্যাস… ভ্রমণকাহিনি।

গ্রীষ্মকালে টালির চাল তেতে ওঠে। কাঠফাটা গরম। তারমধ্যে আমার বাবা তন্ময় হয়ে বসে ঘামতে ঘামতে লেখে। একসময় মা আমাকে উনুনে দেওয়ার তালপাতার পাখাটা হাতে দেয়। বলে, যা তো বাবা, আস্তে করে ঘরে ঢুকে তোর বাবাকে একটু হাওয়া কর তো! আমি এই কাজটা পেয়ে খুব খুশি হই। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে, হাতপাখা নিয়ে ঘরে ঢুকি। তারপর বাবার পিছন দিকে দাঁড়িয়ে পাখা আন্দোলিত করি। বাবা টের পায় না। লিখে যায়।

হঠাৎ একসময় সচেতন হয়। গায়ে হাওয়া লাগছে। পেছনে তাকিয়ে দেখে চার বছরের ছোট্ট ছেলে হাওয়া করছে! বিস্ময়ে, বেদনায়, আনন্দে আত্মজকে কোলে টেনে নেন সমরেশ বসু। বিপন্ন অশ্রু বাঁধ মানে না। পিতৃ হৃদয়ের আকুলতা, কষ্ট, আবেগ ঝাপসা করে দেয় দৃষ্টি। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেই হয়তো আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠেন জীবনে, সাহিত্যে পূর্ণ মনোনিবেশ করার জন্য। আত্মজটির অবচেতন মনেও কি কিছু প্রতিক্রিয়া হয় নি সেই বয়েসে!

দারিদ্র বললে আমাদের পারিবারিক অবস্থা ও অবস্থানকে কিছুটা অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া হয়। ছ-টি প্রাণীর সেই সংসার ও জীবনযাপন ছিল তারও অধিক কিছু। অথচ একটি সদ্য তিরিশ বছরের যুবক, দায়িত্ববান চার সন্তানের জনক, এবং তার সমবয়সী সহধর্মিণী, এক অটুট আত্মবিশ্বাসে, ভালবাসায় প্রবল স্পর্ধিত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। সাহিত্যচর্চা ব্যতিত অন্য কোনো উপার্জনের পথে যাবে না সে। গৌরী তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।

আমি জানি আমার অবচেতন  মনে সেই দৃঢ়তার আকাশ সঞ্চারিত হয়েছিল। তাই দারিদ্র ছিল, কিন্তু আনন্দ, মুগ্ধতার আবেগ, অনুভূতিকে চাপা দিতে পারে নি। ষষ্ঠ ঋতু ঘুরে ঘুরে আসছে…

কাঠফাটা গরম। রোদে দগ্ধ দীর্ঘ দুপুর নিঝুম। ঝুপসি আম আর জামগাছের পাতার আড়ালে ঝিমুচ্ছে ডাহুক আর শালিকপাখি। ঠোঁট ফাঁক করে হাঁফাচ্ছে। থম্‌ ধরা প্রকৃতি। হাওয়া নেই। গনগনে আকাশে ঝলকাচ্ছে সূর্যের তাপ। পুকুরের জল শুকোচ্ছে। কাদাজলে গা ডুবিয়ে বসে আছে গাইগরু, মোষ। ছোট ছোট পাখিরা তাদের গা থেকে পোকা খুঁটে খাচ্ছে।

মা বলে, হাওয়াহীন, গুমোট গরম হলেই ঝড়বৃষ্টি আসার সময় হয়। এই সময়কে নাকি বলে কাঁঠাল পাকানো গরম। জ্যৈষ্ঠ্যমাসের মাঝামাঝি হয়ে গেল। এবার ধরণী শীতল হবে। ঠিক তাই হয়।

আকাশের নীল সরিয়ে ধূসর মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। তারপর একদিন জমাট বেঁধে নৈঋতে (দক্ষিণ-পশ্চিম) মেঘ। প্রথমদিকে আর একবার কালবৈশাখীর মতো হঠাৎ ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়ার মতো ছুটে আসে। তারপর বড় বড় ফোঁটায় চড়বড় শব্দ তুলে সবকিছু এলোমেলো করে বৃষ্টি নামে। টালির চালের শব্দ হয়। পুকুরের জল ভাতের হাঁড়ির মতো ফুটতে থাকে। গাছেরা স্নান করে। অঝোর ধারায় ভিজতে থাকে ধরিত্রী। নৈঋতের মেঘ ছড়িয়ে পড়ে ঈশানকোণেও। গম্ভীর মেঘের গর্জনের সঙ্গে বিদ্যুতের ঝিলিক আকাশকে চাবুক মারে। এবার বৃষ্টি ধরে আসবে।

কিন্তু এ বৃষ্টি এখনই যাবে না। টিপটিপ, ফিসফিস, কখনও ‘ঝরঝর বরিষে বারিধারা।’ দ্বিতীয় ঋতুর কাল সমাগত। এখন বর্ষা। আমাদের দেড়কামরা ফাটা টালির ঘরে এখন বিপদের সময়। ওপর থেকে চুঁইয়ে পড়ে। নিচে ফাটা মেঝের ফাঁক দিয়ে, মুখে সাদাসাদা ডিম নিয়ে পিঁপড়েরা বেরিয়ে পড়ে দলে দলে। বাবার লিখতে খুব অসুবিধা হয়। পিঁপড়ে কামড়ায়। মা ছালা পেতে দেয় বাবার বসার জন্য।

আমরা এখন মাঝেমাঝেই পুকুরপাড়ে কচুর পাতা মাথায় দিয়ে বসে থাকি। যারা মাছ ধরতে বসে তাদের পাশে বসে দেখি, জলে মাছের ঘাই মারা। প্রবল উত্তেজনা যখন এক আধটা রুই কাতলা ধরা পড়ে। আমাদের পাড়ার মধ্যেই বড় পুকুর। তার মালিকের নাম জংলি। পুকুরের নাম তাই জংলির পুকুর। প্রতিবেশীরা লুকিয়ে মাছ ধরে, যাতে জংলি ধরতে না পারে। পাড়ার বাইরে গিয়ে মাঠের দিকে গেলে আর একটা পুকুর। তার নাম বাঙালপুকুর। বানভাসির সময় মাঝখানের রাস্তা ডুবে গিয়ে দুই পুকুর এক। কার মাছ যে কোথায় চলে যায়!

আমাদের ঘরের পেছনদিকে চলাচলের পথ। সেই পথের উলটোদিকে কান্তি কুণ্ডুর বাড়ি। সে পয়সাওয়ালা লোক এবং তার রেশনের দোকান এবং গম ভাঙানো কল আছে আতপুর বাজারের কাছে। বর্ষাকালে তার বাড়ি থেকে ইলিশমাছ ভাজার গন্ধ পাই আমরা। আর কিছু না। তারপর হঠাৎ একদিন দেখি, বাবা আস্ত ইলিশমাছ কানকোয় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে বাড়ি আসছে। আমার পৃথিবী, জীবনে যে এক অন্যতম আনন্দের দিন। একেবারে গঙ্গার ইলিশ! বাবা তখন ছেলেদের সঙ্গে নৌকো করে ভেসে বেড়ায়, তাদের জীবন ও যাপন নিয়ে উপন্যাস লেখার জন্য।

আতপুরে থাকতেই বাবা ‘গঙ্গা’ উপন্যাস লিখেছিল। বাংলাসাহিত্যে এখনও নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসের অন্যতম সেই ‘গঙ্গা।’ কিন্তু আমি তা বুঝবো কী করে সেই বয়েসে! কিন্তু ইলিশমাছের সঙ্গে গঙ্গা সমার্থক হয়ে গেল।

এবার হাওয়া ঘুরছে আবার। তখনও আশ্বিনের মাঝামাঝি বাজনা বেজে ওঠেনি।

কিছু একটা ব্যাপার ঘটেছিল তখন। প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু ঘোষণা করেছিলেন পুজোর আগে সব পরিবারকে কিছু অতিরিক্ত রেশন দেওয়া হবে। চাল- গম- চিনি। কিন্তু সেটা আনার জন্য আমাদের মাঠ ভেঙ্গে অনেক দূর থেকে হবে। রেললাইন ধরে শ্যামনগর ইস্টিশনের কাছে নারাণপুর নামের জায়গা থেকে। পাড়ার লোক সব চলল। আমার দিদি তখন প্রায় বছর দশের, এবং ও-ই সব থেকে বড়। আমি প্রায় ছয়। মা- এর কাছে বায়না করলাম আমিও যাব। চললাম অনেকের সঙ্গে। পরনে ইজের। যাহোক একটা জামাও বোধহয় ছিল।

মাঠের মাঝখান দিয়ে টানা রাস্তা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে, দু পাশের পুকুর আর ব্যাটারি ফ্যাক্টরির সীমানা পাঁচিল পার হওয়ার পরেই দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। এখন সবুজ মাঠ জুড়ে কাশফুলের বন। তার মাঝখান দিয়ে পায়ে চলার পথ। ওপরে নীল আকাশ। মৃদুমন্দ হাওয়ায় মাঠের দুপাশে কাশবনে ঢেউ তুলছে। কোত্থেকে যেন একটা গুনগুন বিনবিন ধ্বনি শোনা যায় এসময়ে। এখনও অনেক দূরে রেললাইন। হ্যাঁ শেষপর্যন্ত দেখতে পেলাম সেই লাল রঙের রেলগাড়ি। তখন কু- ঝিক্‌ঝিক্‌ কয়লার ইঞ্জিন। মাথার ওপর দিয়ে কাশে ধোঁয়ার ঢেউ পেছনে ছড়িয়ে দিয়ে। সামনে রেলগাড়ি ছুটে যাচ্ছে। আহা, কী অপূর্ব সেই দৃশ্য! চোখের সামনে ভাসছে… কাশফুলের মাথা ছাড়িয়ে আকাশের গায়ে আঁকা রেলগাড়ি…। আলো নিভে আসছিল ফেরার পথে। অতটা পথ হাঁটার অভ্যাস তো ছিল না আগে। ব্যায়াম সমিতির কাকা মামারা ছিল। কে যেন একটা আমাকে পিঠে ‘কুমড়ো’ বানিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। দুটো ছেলেমেয়ে বাইরে… রেশন আনতে গেছে। মায়েদের বুকের ধুকপুকুনি বোঝার বয়েস হয় নি আমার তখন।

কিন্তু খাদ্যসংগ্রহ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে বাড়িতে ফিরে এলে মা-এর দু চোখ জলে ভেসে যায়… আমি দেখেছি। এক দিকে জঠর নিবৃত্তির আয়োজন, আর একদিকে বুকের ধনগুলোকে আঁকড়ে রাখার মধ্যে জীবনযাপন প্রাণময় হয়ে ওঠে। তারপরেই দেখি তরফদার পাড়ার আটচালার মাঠে বাঁশের খুঁটি পোঁতা শুরু হয়েছে। ম্যারাপ বাঁধা হচ্ছে। স্বর্গের দেবী দুর্গা, মর্ত্যের মেয়ে উমা হয়ে বাপের বাড়ি আসবেন, চার ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে। কী এক মন মাতানো পুজো পুজো গন্ধ আকাশে বাতাসে। ভোরের শিউলি উঠোনে চাদর বিছিয়ে রাখে। টলটল করছে পুকুরের জল। সাদা মেঘের ভেলা আর নীল আকাশের ছায়া পড়ে জলে। হাওয়ায় শিরশিরে ভাব। সবায়ের নতুন জামা কেনা হয় এসময়ে। আমাদের নতুন না হোক, কিছু নতুনের মতো পুরনো জামাকাপড় আসে। বাবা-মার খুব ভাল বন্ধু আছেন কলকাতায়, নৈহাটি-ভাটপাড়ায়। তাঁরা দিয়ে যান। মা আর বড়দি সেগুলো কেচে তুলে রাখে। পুজোর দিনে বার করে দেবে পরার জন্য। মহানন্দে সেই জামা গায়ে আটচালার বসে পুজো দেখি। আর অপেক্ষা করি, কখন পুজো শেষ হওয়ার পরে প্রসাদ বিতরণ হবে।

তারপর খুব তাড়াতাড়ি একদিন দশমী এসে পড়ে। ঠাকুর বিসর্জন হবে। প্যান্ডেল অন্ধকার। মাঝখানে একটা প্রদীপ জ্বলছে। সে যে কী মন খারাপ আর বুক টলটলানি কাকে বোঝাই! একমাত্র মা-ই বোঝে।

দু-বছর করে সিঁড়িভাঙ্গা ব্যবধানের চার ভাইবোনকে একসঙ্গে বসায়। বড় একটা টিনের থালায় মাখা ভাত ডাল, আলুসেদ্ধ। এক এক করে মুখে গ্রাস তুলে দিচ্ছে আর কৈলাশের গল্প বলছে। কী খাচ্ছি জানি না। কিন্তু খাওয়ার সঙ্গে গল্প তাইতে একসঙ্গে ভরে উঠেছে পেট আর মন। অভাবের ঘরে কী সুন্দর যে ছেলেবেলা!

ইতিমধ্যে কালীপুজোর খবর হয়েছে। পুকুড় পাড় দিয়ে ঘুরে গেলেই শান্তামাসির বাড়ি। তার উলটোদিকে বিশ্বনাথদের পাকা দোতলা বাড়ি। একদিকে ধানের মরাই, ঢেঁকি। একটু তফাতে পাতকুয়ো। শুনেছি শান্তমাসির ছেলে মনু আর বিশ্বনাথ বাজী তৈরি করবে। ছুঁচোবাজি, তুবড়ি-বসানো এবং উড়োন তুবড়ি। পুকুড়পাড়ে কাঠকয়লা তৈরি করবে। কুলকাঠ আনতে যাবে গয়লাপাড়ার পাঁচু মিস্ত্রির বাড়ি থেকে। আমার মাকে ওরা ধরেছে, পাঁচুকে বলার জন্য।

ঝাঁকড়া টোপাকুলের মস্ত গাছ পাঁচু মিস্ত্রীর বাড়ি। মা বলে দিলে, পাঁচু আপত্তি করবে না। আমরাও গঙ্গা হলাম মনু আর বিশ্বনাথের সঙ্গে। বাজী বানাবার লেজুড় হয়ে রইলাম সেই থেকে। গোটা কয়েক শুকনো, মোটা ডাল কেটে আনা হল। ছোট ছোট সাইনে কাটা। তারপর পুকুরধারে, সজনেগাছের তলায় গর্ত করা হল। বড় বড় মানকচুর পাতার ওপর শুকনো কুলের ডাল। আগুন ধরানো হল। কিন্তু কাঠ ছাই হওয়ার আগেই গর্তের ওপর টিন চাপা, তার ওপর মাটি এবং ইট দেওয়া হল। ছ-দিন থাকবে ওই অবস্থায়। অস্থির প্রতীক্ষা।

তৃতীয়দিন সকালবেলা সেই মাটি সরিয়ে, টিন তুলে ফেলা হল। কাঠকয়লা রেডি। হালকা ভঙ্গুর বাজী তৈরির প্রথম ধাপ। তারপর সোরা-গন্ধক-লোহাচুর…। ধেড়ে বয়েস পর্যন্ত ভুলিনি সেই ভাগ। ষোল-বারো-চার-তিন। জীবনের স্ফুলিঙ্গ দিয়ে আলো জ্বালানর দীক্ষা হয়েছিল কাঁচা বয়েসে। কীভাবে বুঝে গিয়েছিলাম অবশ্য বারুদের স্তূপ থেকে আমায় দূরে থাকতে হবে। ব্যবধান না রাখলে, নবকুমার ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তা সে হয়নি। নিজে জানে। জানে আর পাঁচ জন।

তারপর কবে হাওয়া উত্তরে ঘুরেছে। বেলা ছোট হয়ে এসেছে। এক ঘরে মেঝের উপর মাদুর আর শতরঞ্চি, তোষক বিছিয়ে আমরা চার ভাইবোন ঘুমোই। একটাই কুটকুটে বড় কম্বল। কিন্তু পরস্পরের গায়ের ওমে উষ্ণতার অভাব হয় না। দেড় কামরার আধখানাটায় একটা ক্যাম্পখাট আছে। সেটায় বাবা শোয়। রাতে কখন বাবা ঘুমোয় আমরা টের পাই না। শুনেছি মাঝেমাঝে বাবা কলকাতা যায়। কখন ফেরে জানি না।

কিন্তু শীতের ভোরে প্রায়ই আমার ঘুম ভাঙ্গে মা-র গান শুনে। “আর নাই দেরি, নাই যে দেরি।” কিংবা “শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন।” কিংবা আবার কোনোদিন, “হর- হর- হর, ব্যোম-ব্যোম…।”

আমার সব গানের মধ্যে শুধু মনে ধরে থাকে…

“শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা,

তারি লাগি রইনু বসে সকাল বেলা…।”

কেন যে রবীন্দ্রগানের ওই ছোট লাইন জন্ম থেকেই প্রায় মনের মধ্যে গেঁথে বসেছিল।…

এক ভোরে শুনি, ঘরের দরজার বাইরে কুঁই –কুঁই শব্দ। তখনও আবছা অন্ধকার বাইরে। কনকনে ঠাণ্ডা। অভ্যাসবশতই মশারি তুলে বেরুতে যাব, মা সাবধান করল। “দাঁড়া… ফট করে বাইরে যাস না।”

“কীসের শব্দ মা! বাচ্চা কাঁদছে মনে হচ্ছে যে…”

“হ্যাঁ… নিশ্চয়ই রানির বাচ্চা হয়েছে… কোথায় আর যাবে, আমাদের বারান্দার কোণেই এসে ফুটেছে। কিন্তু এক্ষুনি কাছে যাস না… কামড়ে দিতে পারে ভয় পেয়ে…।”

আর একটু বেলা হল। পরম কৌতূহল। রানির কটা বাচ্চা হল, কেমন দেখতে! নিশ্চয়ই খুব শীত করছে ওদের…

মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছি, কী সুন্দর দৃশ্য। চারটে গুবলু- গুবলু গোল পুতুলের মতো বাচ্চা হয়েছে আমাদের ছাইগাদার রানির। সে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। পেটের কাছে চারটে ছানা। এখনও চোখ ফোটে নি।

আমাদের অবস্থা, ‘আপনি খেতে পায় না, আবার শঙ্করাকে ডাকে।’ তাহলেও মা তো মা-ই। কোত্থেকে দু-চারখানা ছেঁড়া কাপড়, একটা ফাটা কম্বল, ঘরের একটু দুধ, রাতের বাসি রুটি… একটু তফাৎ থেকে এগিয়ে দিল বারান্দার কোণে। দেখি, আমার পড়তে বসার সেই ছালাটিকেই রানি তার প্রসবশয্যা নির্বাচন করে নিয়েছে। কিন্তু মা একটু দুধ, জল আর রুটি, কাপড় দেওয়ার পরে, পাটকিলে রং রানির চোখে কী যে কৃতজ্ঞভাব ফুটে উঠল, আমি আজও তা ভুলি নি। কে বলে প্রাণীরা অবলা? কথা কি শুধু মুখ দিয়েই বলা যায়? নীরবতা আর চোখ কি আরও অনেক বেশি বাঙময় নয়?

ছাইগাদার রানির বাচ্চা, চারটি শিশুসন্তান ঈশ্বরের উপহারের মতোই আমাদের বারান্দার কোণ দখল করে রইল…

তারপর একদিন সকালে দেখি। বাবা শতরঞ্জির মধ্যে একটা বালিস, দুটো জামাকাপড়, গামছা। টুকিটাকি সব নিয়ে, একটা পুঁটলির মতো বোঁচকা বেঁধেছে। আর গভীর নীল রঙের, একটা লম্বা, রেলের কোট গায়ে দিয়ে দেখছে। আর মাকে বলছে “বুড়ি (বাবা মাকে চিরকাল ওই ডাকনামে সম্বোধন করত) এ যে বড্ড কুট কুট করছে!” মা বলল, “আগে একটা জামা গায়ে দাও। তাহলে আর অত কুটকুট করবে না।”

ব্যাপার কী? বাবা কি কোথাও যাচ্ছে? বাবা-মার মধ্যে কীসব কথাবার্তা হচ্ছে… ঠিক ধরতে পারছি না। ওই বয়সে ধরতে পারার কথাও না। তাহলে দুঃখে- দারিদ্রের মধ্যে যারা বড় হয়, তারা একটু বেশি সচেতন, স্পর্শকাতর,  বাস্তববোধ সম্পন্ন হয় বলেও আমার মনে হয়। হয়তো অভাব আর ক্ষুধা, তাদের কিঞ্চিৎ অনুসন্ধিৎসুও করে তোলে।

রাতে বাবা-মার কথা কানে আসে। অন্ধকার ঘর, শুয়ে আছি। কিন্তু কান খাড়া।

বাবা বলছে, চিন্তা করো না। দু-তিন সপ্তাহ… দেখতে দেখতে কেটে যাবে। এলাহাবাদ কতই বা দূর! ত্রিবেণী সঙ্গম…।

মা বলছে, কিন্তু ওইরকম একটা ফাঁকা জায়গা… তারপর অত দূরের দেশ…।

বাবা – কিছু একটা জোগাড় হয়ে যাবে। সাগরদা বলেছেন…।

মা – তার ওপর আবার লক্ষ লক্ষ লোকের ভিড় হবে। তখন তো…।

বাবা – তাই দেখতেই তো যাওয়া। কী পায় মানুষ ওখানে গিয়ে!

সে সব তো আবার তোমায় আনন্দবাজারে লিখে পাঠাতে হবে বললে! কীভাবে পাঠাবে? ওদের স্থানীয় এজেন্ট আছে। সে যাক। তুমি এদিকে চালাতে পারবে তো?

চালাতে তো হবেই। গৌর পনের টাকা দিয়ে গেছে সকালে। মুদি দোকানে বলে রেখেছি… কদিন দেরি হবে…।

আমি ফিরে এলেই সব মেটাব। ওঁরা বলে রেখেছেন, একসঙ্গে কয়েক কিস্তির টাকা… ফিরে এলেই…।

তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। শুনলাম বাবা এলাহবাদ যাচ্ছে। প্রয়াগ, কুম্ভমেলা নাম সেই প্রথম শুনলাম। আরও বেশ কিছুদিন পরে বাবার লেখা বই দেখলাম আতপুরের বাড়িতে। অমৃত কুম্ভের সন্ধানে। লেখক কালকূট। বাবার আর এক নাম, যাকে ছদ্মনাম বলে, তা হচ্ছে কালকূট।

আমার অক্ষরজ্ঞান ইতিপূর্বেই হয়েছিল। বাবার লেখা প্রথম বইয়ের গন্ধ আমার এখনও মনে আছে। সে- বইয়ের নাম উত্তরঙ্গ। প্রচ্ছদে ছিল, একজন শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে আছে। সেই সময় আমি জীবনে প্রথম দশ টাকার নোট দেখেছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বাবা লিখে অর্থোপার্জন করেন এবং সেই অর্থে আমরা সবাই প্রতিপালিত হই। লেখা যে মানুষকে জীবন দান করে, সেই আমার প্রথম অনুভূতি। সাহিত্য-সংস্কৃতি বুঝি না। কিন্তু লেখা যে জীবিকা হয়, সংসার চালায়, আগে এই বোধ হয়েছিল। জীবজগতে আগে খেয়ে পরে বাঁচতে হয়। শিল্পসংস্কৃতি আগে তারপরে। আমার বাবা জীবন বাজি রেখে লিখে চলেছিল বলে তাঁর রচনা সাহিত্য হয়ে উঠেছিল।

লেখক থেকে সাহিত্যিক হয়ে ওঠার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক আছে, তা প্রকৃতই উপলব্ধির বিষয়। বলে বোঝানোর নয়। ঠিক সেই কারণে অনেকে লেখক হলেও কোনোদিনই সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারেন না। যাক সে কথা এখন।

আমার সেই ছ- বছরের বাল্যকালে বাবার ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ প্রকাশিত হল। তখন থেকে কিভাবে আমাদের জীবনেও একটু করে পরিবর্তন আনতে শুরু করল। এমনকী আমার আতপুরের শৈশব জীবনও ফুরিয়ে গেল। কিন্তু আজীবনের জন্য রেখে গেল একটা মায়াময় স্মৃতির কালবেলা, পরিণামে যা এই জীবদ্দশার ভিত্তিভূমি হয়ে রইল।

শুনলাম আমাদের পুর্নবাসন হতে চলেছে নৈহাটিতে। নৈহাটি আমার বাবা – মার আপন শহর। মা জন্মাবধি কাঁঠালপাড়ার মেয়ে। বৈদিক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা। বাবা নৈহাটিতে পৌঁছেছিল বাউন্ডুলে কিশোর হিসাবে। ঢাকা থেকে ভাসতে ভাসতে। সেই নৈহাটিতেই একসময়ের দুই প্রতিবাদী বিপ্লবী চরিত্রের নারীপুরুষ, যাদের ইন্টারকাস্ট বিবাহ হয়েছিল – ব্রাহ্মণ–কায়স্থের মধ্যে। অতঃপর তথাকথিত সামাজিক স্ফলন ও বিতাড়ন। এবং আবার পায়ের নিচে মাটির সন্ধান করে সেই নৈহাটিতেই প্রত্যাবর্তন। উত্তর চব্বিশ পরগণার বনেদি শহর তথা শহরতলি নৈহাটি।

কিন্তু এ কোন মুসলমানের পরিত্যক্ত গৃহে, বাজার অধ্যুষিত বস্তির মধ্যে এসে পড়লাম! বড় রাস্তা আর বাজার ছেড়ে, ঝোপজঙ্গলে ভরা এক এঁদো, আঁস্তাকুড়ের মতো জায়গা। বেশ কয়েকটা নারকেল গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে – আশশ্যাওড়া, বিষকাটারি আর নানান জংলীগাছের মধ্যে থেকে। জায়গার নাম নারকেলবাগান। তার মধ্যে বাজারের কিছু ফড়িয়া, ব্যাপারি, কুলি মিস্ত্রীদের ঘরের সঙ্গে দু কামরার টালির চাল দেওয়া ঘর। বিচিত্র আয়োজন সেই ঘরের। সোঁদা গন্ধ, মাকড়শার জাল, ইঁদুরছুঁচো। বাজারের উচ্ছিষ্ট, বাতিল আনাজ ইত্যাদির ডাম্পিং গ্রাউন্ড আমাদের সেই দক্ষিণ-পশ্চিমে। ঘরের জানলা ছাদের কাছে। ওটা নাকি আব্রুর জন্য। একটা ঘরে টালির চাল ফুঁড়ে উঠে গেছে একটি নারকেল গাছ। দুই ঘরের সামনে ফাটা বারান্দার দেয়ালে চিত্রবিচিত্র আঁকা।

আবছা মনে আছে, নৈহাটিতে আমার আমার সিদ্ধান্ত মা-এর। মা দূরদর্শিনী। উত্তরকালের ছবি দেখেছিল। তাছাড়া পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধব, আমাদের লেখাপড়ার সুযোগ এবং বিশেষ করে বাবার কলকাতার সঙ্গে ট্রেনে যোগাযোগের সুবিধে… অনেক কিছু ভেবেছিল। অমৃতকুম্ভের সন্ধানে – উপন্যাস ছবি করার জন্য বম্বের বিমল রায়। এক হাজার টাকায় চিত্রস্বত্ত্ব কিনলেন। মা সেই টাকা নৈহাটির ওই পোড়োবাড়ি কেনার জন্য আগাম দেওয়ার ব্যবস্থা করল। আমাদের নতুন জীবন শুরু হল।

দুই ঘর, বারান্দার সঙ্গে আমাদের আরও বেশ খানিকটা জায়গা আছে ওই বাড়িতে। কিন্তু সে জায়গা জংলি গাছপালা , ঝোপ আর বছরের পর বছর পড়ে থাকা এঁদো জমি ছাড়া আর কিছু না। মা আমাদের উৎসাহিত করল, ওই সব ঝোপজঙ্গল কেটে পরিষ্কার করার জন্য। তারপর বেড়া দেওয়া হল জমির সীমানা ধরে। নাহ খুব ছোট জায়গা তো নয়!

এবার আমার পড়াশুনো শুরু হয়েছে। নৈহাটি বয়েজ স্কুলে ভর্তি হয়েছি দাদা আর আমি। দিদি গরিফা গার্লস-এ। লেখাপড়া করার সঙ্গে এবার নতুন কাজ জুটেছে। টালির ঘরের সঙ্গে লাগোয়া আমাদের জমিতে শাকসব্জি বোনা। একইসঙ্গে দু-চারটে মুর্গি পোষা। কী এক উন্মাদনাই যেন পেয়ে বসল। দুটো ঘরের একটাতে বাবা বসে সারাদিন লেখে। সপ্তাহে তিনদিন সোম-বুধ-শুক্র কলকাতায় যায় নৈহাটি লোকালে। ফিরতে রাত হয়। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।

নৈহাটিতেই আমাদের মামারবাড়ি, তথা দাদুর বাড়ি। দাদু খ্যাতনামা শিক্ষক এবং কাঁঠালপাড়ায় পণ্ডিত মানুষ হিসাবে খ্যাত। স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন একসময়। যোগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ি রেললাইনের পূর্বপাড়ে। আমরা পশ্চিমে। আমরা দাদুর কাছে সকালবেলা পড়তে যাই। ফিরে এসে ভাত খেয়ে স্কুলে যাই। বাড়ির গাছপালা নিয়ে মত্ত থাকি। একটু করে বড় হচ্ছি। ছোট দুই ঘরে আমাদের জায়গার সংকুলান হয় না। দাদুর বড় বাড়িতে প্রায়ই রাতে শুতে যাই। আমি মাঝমাঝে টের পেতে পেতে শুরু করেছি, দাদুর ভূমিকা আমার জীবন ও ভাবনায় ছায়াপাত করতে শুরু করেছে। নতুন ভাবনার দিশা দেখাচ্ছে।

এদিকে বাড়ির সেই পড়ো জমিতে আমরা তখন শাকসব্জির পশরা ফলাতে শুরু করেছি। পালংশাক, ধনেপাতা, মূলো। ফুলকপি – টমেটো – বাঁধাকপি। মাচা তৈরি করেছি। তাইতে লাউ, চালকুমড়ো, শিম। শীতের শেষদিকে ঢ্যাঁড়স, ডেঙ্গোডাঁটা, লালশাক, বেগুন, কাঁচালঙ্কা…। বাড়িতে সব্জী ফলানোর সে যে কী আনন্দ! ততদিনে রীতিমত এক্সপার্ট হয়ে উঠেছি চাষবাস সম্পর্কে। বীজবপন থেকে শুরু করে অঙ্কুরোদ্দম এবং গাছের পরিচর্যা, মাঝেমাঝে সার দেওয়া আর নিত্য পর্যবেক্ষণ। মুর্গির ঘর বানিয়েছি ইট-কাঠ জোগাড় করে। রোজ ডিম দিচ্ছে। একটা ঘটনা ঘটল একদিন। সেটা মার্চ মাসের দিক হবে বোধহয়।

বাবা সেই টালির ঘরে বসে লিখছে। সেই ঘরের মেঝে থেকেই নারকেল গাছ, টালির চাল ভেদ করে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। ঝড়ো হাওয়ায় একখানা ঝুনো নারকোল পড়ল টালির পাশে সশব্দে। টালি ফেটে চৌচির। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে টালির টুকরো। বাবার জলচৌকির ওপর রাখা লেখার কাগজের ওপরেও। কপালগুনে বাবার মাথায় কিংবা গায়ে বিশেষ কিছু পড়ে নি বা লাগে নি। আমরা সবাই স্তব্ধ এই ঘটনাটায়।

কিন্তু মা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সেদিন থেকেই। যা হোক করে এবার পাকা ঘর করতেই হবে। ধার দেনা করেই করতে হবে। বাবা-মার তো বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই নৈহাটিতে। সবাই ভালবাসে এবং গৌরী-সমরেশের জীবনসংগ্রামকে বিস্মিত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তাছাড়া ‘গঙ্গা’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে, সাহিত্যিক হিসেবেও তখন বাবা বেশ পরিচিত। সুতরাং পড়ে থাকা জমিতে এবার আমাদের পাকা ঘর তথা বাড়ি তৈরির সূচনা হল।

একটু করে কাজ শুরু হয়, আবার টাকার জোগান না থাকায় বন্ধ হয়ে যায়। মনে আছে, প্রথমেই হল আমাদের একটা স্যানিটারি পায়খানা বাথরুম। তারপর একখানা ঘরের দেয়াল উঠল। কিন্তু ছাদ নেই।

মা কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সকলের অন্যান্য সাংস্কৃতিক বোধ, বিকাশের দিকে নজর রেখেছিল। দিদি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিচ্ছে। প্রথমে কানাই বৈরাগী, তারপর ননীগোপাল চট্টোপাধ্যায় মাষ্টারের কাছে। আমরা তবলা পিটাচ্ছি। মা নিজে গণনাট্য সংঘের অনুষ্ঠানের তদারকি করছে। ভাটপাড়া, নৈহাটির কত লোক যে যাতায়াত করেন!

হঠাৎ প্রবল চিকেনপক্স-এর ধুম শুরু হল। আমি ভীষণভাবে আক্রান্ত হলাম। বাবার-ও খুব বেশি হল। কিন্তু মা এবং মামার বাড়ির সকলেই অতীতে ভুগেছিল বলে, মা-র কিন্তু হল না। কিন্তু একার ওপর দায়িত্ব পড়ল, সবকটা ছেলেমেয়ে এবং স্বামীকে শুশ্রূষা করা এবং বাঁচিয়ে রাখার। কী অমানুষিক পরিশ্রম ভাবা যায়!

কিন্তু আমি টের পাচ্ছিলাম, আমি বদলে যাচ্ছি।

আজ মনে হয়, একটু কম বয়েস থেকেই কি নিজের মধ্যে বদল টের পেতে শুরু করেছিলাম!

মুস্কিল হচ্ছে কী বদল ভেতরে ঘটছে, তা ধরতে পারছি না। কিন্তু কিছু একটা হচ্ছে। একা হয়ে যাচ্ছি। অথচ যাকে বলে কিশোরবেলা… অ্যাডোলেসেন্স, সে বয়সে পৌঁছাইনি তখনও। বাল্যকালই চলছে। বড্ড বেশি প্রকৃতি মুগ্ধতা যেন পেয়ে বসছে। দূর বনস্থলীর মধ্য থেকে উৎসারিত এক মুগ্ধতার ভাষা যেন বায়ুতাড়িত হয়ে এসে নীরবে আছড়ে পড়ছে আমার মাথার মধ্যে কোথাও। সে ভাষার আনন্দ আর বিলাস দুই যেন মিশে আছে। আমি ঠিক প্রকাশ করতে পারছি না। মুখেও না, লিখেও না। এবং কারুর কাছে বলার মতো তো নয়ই।

আবার মাঝেমাঝে ওই অবস্থাটা ভুলে গিয়ে মেতে উঠি নানান বালকোচিত আচরণে। ঠিক সেই সময়েই একটি হারমোনিকা আমাকে খুব মধুর সঙ্গ দিল। তখন জন্মদিন পালন বা উপহার রীতি ছিল না। তবু আমার এক বন্ধু, তাঁর মাকে বলে এবং সে আমায় একটি হারমোনিকা তথা মাউথঅরগ্যান উপহার দিল। নেহাতই সাধারণ। কিন্তু কিছুদিন পরে মা খেয়াল করল, আমি বেশ গানের সুর তুলছি সেই হারমোনিকায়। আধুনিক- হিন্দি মায় রবীন্দ্রসঙ্গীতও। ইতিপূর্বে স্কুল পত্রিকায় গল্প লিখেছি।এবার শুরু হল হারমোনিকা। তবলাও বাজাই। রবীন্দ্রজয়ন্তী আর নববর্ষের গান। কিন্তু মাথায় ঘোরে কবে দীপাবলি আসবে… ষোল-বারো-চার-তিন ভাগে তুবড়ি বানাব।… অতি সামান্য এলেবেলে, আটপৌরে, দারিদ্রের মধ্যে তখনও আমার দিনযাপন। পুরনো বই হাফদামে কিনি। ক্যালেন্ডারের চকচকে ছবির পাতা দিয়ে মলাট দিই। মা বলেছে এবার পুজোর সময় একটা নতুন জামা আর প্যান্ট কিনে দেবে। শুনেছি, শিয়ালদা স্টেশনে শারদীয়া পত্রিকার বিজ্ঞাপনে বাবার ছবি দিয়েছে…।

আবার দিন যায়। আমি উদাস হই অনেক কিছু জানা, না-জানার টানাপোড়েনে। বিস্ময়, মুগ্ধতা আর অনুরাগ রঞ্জিত ক্ষণবিহ্বলতায় আমার বাল্যকাল প্রান্তসীমার দিকে অগ্রসর হয়। আমার দুচোখ জুড়ে বিপুল মধুর স্বপ্নের আবেশ ভারি হয়ে আসে। হঠাৎ হঠাৎ সচেতন হয়ে অনুভব করি সৃষ্টি আর আলোর রোশনাই এক মালিন্যহীন হাতছানি দিয়ে আমায় ডাকছে অনন্তের পথে…।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *