bibidho-honsomodhye-bok-jotha

হংসমধ্যে বক যথা
ফিচার
ভগীরথ মিশ্র
(চার দশকের আমলাগিরি’র রম্য স্মৃতিচারণ)

তাঁর পুরো নাম পূর্ণচন্দ্র কর্মকার (সৌজন্যবশত নামটা পরিবর্তিত)। কিন্তু অফিসের সবাই মুখের সামনে পূর্ণবাবু বলে ডাকলেও, আড়ালে যে কেন ওঁকে গুরুত্বপূর্ণবাবু বলে ডাকেন, সেটা আমার প্রথমদিকে জানা ছিল না। পরবর্তীকালে অবশ্য বুঝেছি। বলা যায়, হাড়ে হাড়ে বুঝেছি।

এমনিতে অকর্মার ঢেঁকি একটি, কিন্তু সারাক্ষণ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়েই তাঁর সুখ। বাস্তবিক, আমাদের ব্লক-টিমের এত-এত রাজহাঁসগুলির মধ্যে ওই-এক বকপাখিটি কেমন করে যে সেঁধালেন। সারাক্ষণ ওঁকে নিয়ে তাই বিব্রত থাকি ইদানীং। বিব্রত থাকেন অফিসের অন্যরাও।

এমনিতে মানুষটি সুভদ্র, সুজন। ভদ্র ও বিনয়ী। অফিস শুরু’র আগেই অফিসে এসে যান। অফিস ছাড়েন সবার পরে। কিন্তু ভদ্রলোককে কোনো কাজ দেওয়ামাত্র এমন দাপাদাপি জুড়ে দেন, গোটা অফিসকে একেবারে অস্থির করে মারেন। অবশেষে, কাজটির আদ্যশ্রাদ্ধ করে, আমাদের সকলের ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দেন। আবার, কোনো কাজ না-দিলে যারপরনাই গোঁসা হয় তাঁর। এর-ওর কাছে অভিমান করে বেড়ান সেজন্য।

 আজ সেই পূর্ণবাবুকে নিয়েই কিছু কথা। 

 ১৯৮২ সালের বিধানসভা নির্বাচন। আমি তখন বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর ব্লকের বিডিও। ক’দিন আগেই ভোটের বাজনা বেজে গিয়েছে৷ আর, এই রাজ্যে ভোট মানেই ব্লক-অফিসগুলোর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া৷ কারণ, এই রাজ্যের যেকোনো ভোটে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সবই করতে হয় ব্লক-অফিসে নিযুক্ত কর্মচারীদেরই৷ তখন ব্লক-অফিসগুলোতে চব্বিশ ঘন্টা যজ্ঞ চলতে থাকে৷

ভোটের আর দিন-কতক বাকি৷ আমার অফিসে কিংবা অফিসের সামনে এতবড় যজ্ঞি সামলাবার মতো জায়গা নেই। সেই কারণে, বিষ্ণুপুর হাইস্কুলের মাঠে বিশাল প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে৷ সেখানে যথাসময়ে তৈরি হবে ডজনটাক কাউন্টার৷ কাউন্টারগুলো থেকে ভোটকর্মীদের মালপত্র বিলি করা হবে৷ তখন জায়গাটার নাম হবে ‘ডিস্ট্রিবিউশন-সেন্টার’। ওখান থেকে মালপত্র বুঝে নিয়ে ভোটকর্মীরা গাড়িতে চড়ে চলে যাবেন বুথগুলোতে৷ মাঠের অপর প্রান্তে প্রচুর সংখ্যক বাস ও ট্রাক এসে জড়ো হবে৷ ওগুলোতে চড়েই ভোটকর্মীরা বুথে যাবেন৷ আবার ভোট শেষ হলে ভোটকর্মীরা ওই কাউন্টারগুলোতেই ব্যালট-বাক্সসহ সমস্ত মালপত্তর জমা দেবেন। তখন ওই জায়গাটার নাম হবে ‘রিসেপ্‌শন-সেন্টার’।  

স্কুলের মাঠটা বাদেও, স্কুল-কর্তৃপক্ষ আমাদের ব্যবহারের জন্য স্কুলেরই খান-দু’তিন ক্লাসরুম এবং ওঁদের হলঘরটা ক’দিনের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। ওই ঘরগুলোরই একটাতে আমার টেম্পোরারি অফিস-চেম্বার, বাকি রুমগুলো অন্য অফিসাররা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছেন।

ভোটের দু’দিন আগের কথা। গোটা রাতটা আমাদের বিনিদ্র কেটেছে৷ সারা রাত ব্যাগিং-এর কাজ চলেছে৷ ব্যাগিং’এর কথা যখন উঠলো, তাহলে ওই কর্মযজ্ঞটিকে একটু খোলসা করেই বলা যাক।

আজকের দিনে যেসব অফিসাররা ভোট পরিচালনা করেন, তাঁরা কেমন করে ব্যাগিং’এর কাজটি করেন, কিংবা আদৌ করেন কিনা, তা ঠিক জানা নেই। তবে আমাদের সময়ে, অর্থাৎ বিশ শতকের আট-ন’য়ের দশকে যেভাবে ওই ব্যাগিং’এর কাজটি করা হত, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষাচিত্র আঁকাটা জরুরি। জরুরি এই কারণে যে, যেভাবে দিন-দিন ভোটের পদ্ধতি দ্রুত বদলাচ্ছে, তাতে করে আগামী দিনে হয়তো ব্যাগিং-ট্যাগিং’এর দরকারই হবে না। হয়তো, ভোটের সবকিছু কাজই হবে কম্পুটারের দ্বারা। অত হ্যাপা হয়তো করতেই হবে না। কাজেই, অতীত দিনের ভোটের এই খুঁটিনাটি প্রক্রিয়াগুলি লিপিবদ্ধ করে না-রাখলে, আগামী প্রজন্ম তা জানতেই পারবে না। অতীতকালের ভোটের কাজের অনেককিছু খুঁটিনাটি ব্যাপার তলিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে।

তো, সেই প্রসঙ্গে এবার আসি। ভোটের কর্মযজ্ঞে ‘ব্যাগিং’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। ‘ব্যাগিং’ বলতে, ভোটের কাজে ব্যবহৃত একশো-এক রকমের সামগ্রীকে বুথ ধরে ধরে ব্যাগস্থ করা। ব্যাপারটা র‍্যাগিং’এরই সমতুল্য। কারণ, ওই সামগ্রীর তালিকায় কী নেই! ভোট দেবার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি ব্যালটপেপার। ওইসঙ্গে ডজনটাক বিভিন্ন নম্বরওয়ালা ফর্ম। ওই ফর্মগুলিকে ভরবার জন্য সমান সংখ্যক খাম। ভোটারের আঙুলে লাগাবার কালি (ইন্‌ডেলিব্‌ল ইংক)। ভোটের দিনে ভোটার মশাই অত্যন্ত স্পর্শকাতর, ওইদিন তাঁর আঙুলটিও স্পর্শ করা যাবে না। তাই, ভোটারদের আঙুলে কালি লাগাবার জন্য একটি প্লাস্টিকের কাঠিরও ব্যবস্থা। ভোট দেবার আগে ভোটার তাঁর উপস্থিতিজ্ঞাপক টিপছাপ দেবেন, সেজন্য বেগুনি-কালির একটি ঢাকনাওয়ালা প্যাড। টিপছাপ দেবার পর ভোটার মশাই ওই কালিমাখা আঙুলটি মুছবেন, সেজন্য একটুকরো কাপড়। ব্যালট-পেপারগুলিকে কাউন্টারফয়েল থেকে বিচ্ছিন্ন করবার জন্য, স্কেলের মতো দেখতে একটি লোহার পাত। ভোটারের আঙুলে লাগাবার কালির শিশিটি বড়ই মূল্যবান। শিশিটি উল্টে গিয়ে কালিটুকু পড়ে গেলেই ভোট বন্ধ। কাজেই, কোনোগতিকে শিশিটি যাতে উল্টে না-যায়, সেজন্য একটা টিনের কৌটো’র ব্যবস্থা। ওই কৌটোতে বালি ভরে, ওই বালির মধ্যে কালির শিশিটিকে পুঁতে দিতে হবে। ব্যাগিং’এর সময়, কৌটো তো বটেই, ওই বালিটুকুও কাগজে মুড়ে দিতে হয়। এছাড়াও, পলিথিন শীট, হ্যারিকেন, মোমবাতি, দেশলাই, সূঁচ-সুতো, ব্লেড…আরও কত যে খুঁটিনাটি সামগ্রী সহকারে ভোটকর্মীদের ‘রণসাজে’ সাজিয়ে পাঠাতে হতো বুথে! সব মিলিয়ে, প্রতিটি বুথে যে-একশো-একটা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, ওগুলোকে দুটি বড় চটের ব্যাগে, বুথ ধরে ধরে অতি সতর্কতার সঙ্গে ভরতে হতো। কারণ, ভোটের কাজ চালাবার বেলায় একটি তুচ্ছাতিতুচ্ছ সামগ্রীও যদি না-পাওয়া যেতো, তবে ওটার জন্যই বুথের মধ্যে ভোটকর্মীরা পড়ে যেতেন বিপাকে।

আমাদের ব্লক-এলাকায় প্রায় একশো-তিরিশটি মতো বুথ৷ প্রতিটি বুথের জন্য দরকার দুটি করে বড় সাইজের চটের ব্যাগ। 

‘ব্যাগিং’ করবার পদ্ধতিটাও বেশ অভিনব। মূলত চারটে পর্যায়ে কাজটি করতে হয়।

প্রথম পর্যায়ে, সমস্ত সামগ্রীকে এককাট্টা করতে হয়। যেমন, ১৩০টি বুথের জন্য ১৩০ জোড়া চটের থলিকে এককাট্টা করে, প্রত্যেক জোড়াতে আলতা দিয়ে বুথ-নম্বরগুলি লিখতে হয়। তারপর, সব ধরনের ফর্মগুলিকে আলপিনে গেঁথে, প্রত্যেক বুথের জন্য একটি করে সেট বানাতে হয়। অনুরূপভাবে, সবগুলি খামকে আলপিনে গেঁথে প্রত্যেক বুথের জন্য একটি করে সেট বানাতে হয়। সূঁচ-সুতো, ব্লেড ও ভোটারের আঙুলে কালি লাগাবার কাঠিটি দিয়ে একটি মোড়ক বানাতে হয়। অনুরূপভাবে, একমুঠো বালি দিয়ে ১৩০টি মোড়ক বানাতে হয়। এইভাবে, গুনেগেঁথে আরও অনেক সামগ্রীর ‘সেট’ বানাতে হয়। বলাই বাহুল্য, উল্লিখিত প্রত্যেকটি সামগ্রীরই ১৩০টি ‘সেট’ বানাতে হয়। এবার, ঠিক বিয়েবাড়িতে পংক্তিভোজনের মতো, ওই জোড়া-জোড়া চটের থলিগুলোকে, ঠিক পাত পাড়বার মতো করে, হলঘরের মধ্যে সারবন্দী পেতে ফেলতে হয়। ব্যস, প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ।

তো, বিষ্ণুপুর হাইস্কুলের হলঘরে দুপুর থেকে ব্যাগিং’এর প্রথম পর্যায়ের কাজগুলি শুরু হয়েছে। হলের এক কোনায় বসে কয়েকজন কর্মী মিলে ব্যালট-পেপারগুলিকে বুথ ধরে ধরে ব্রাউন-পেপার দিয়ে প্যাক করছেন। অল্প তফাতে জনাকয় বসে গিয়েছেন ফর্মগুলির সেট বানাতে। পাশটিতে বসে জনাকয় খামের সেটগুলি বানাচ্ছেন। হলঘরের অন্যকোণে বসে কেউ বানাচ্ছেন কিছু খুঁটিনাটি সামগ্রীর মোড়ক। অল্প তফাতে একজন হয়তো-বা ছোট ছোট কাগজের ঠোঙায় একমুঠো করে বালি ভরে মোড়ক বানাতে ব্যস্ত। ততক্ষণে জনাকয় মিলে চটের থলিতে আলতা দিয়ে বুথ-নম্বর লিখতে ব্যস্ত।

এইভাবে সবগুলো সামগ্রী ‘সেটবদ্ধ’ করবার পর, হলঘরের মধ্যে চটের থলির জোড়াগুলোকে ঠিক পাত পাড়বার ভঙ্গিতে গোটা হলঘর জুড়ে সারবন্দী পেতে ফেলবার কাজটি যখন শেষ হল, ঘড়িতে তখন সন্ধে ছ’টা।

এবার, সবাইয়ের জন্য ঘন্টা-দুয়েকের ছুটি। ঠিক আটটায় শুরু হবে ব্যাগিং’এর আসল কাজ। রাতভর চলবে তা। তার আগে অফিসের সব কর্মী বাড়ি গিয়ে চানটান সেরে আসবেন।  

ব্যাগিং’এর প্রথম পর্যায়ে, পূর্ণবাবুকে কোনো বিশেষ সামগ্রীর সেট বানাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তার বদলে, তাঁকে দেওয়া হয়েছে গোটা কাজটি সুপারভাইজ করবার দায়িত্ব। অর্থাৎ যখন হলঘরে’র বিভিন্ন অংশে কর্মীরা হরেক সামগ্রীর ‘সেট’গুলো বানাবেন, পূর্ণবাবু সারাক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখবেন, কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা। যদিও আমি ভালোই জানি, ওই সুপারভিশনটা অর্থহীন। কারণ, ঘুরে ঘুরে দেখবার কিছুই নেই। তাও, কাজটা পূর্ণবাবুকে দেওয়া হয়েছে, কারণ, তাঁকে তো কোনো সামগ্রীর সেট বানাবার কাজটি দেওয়া চলে না। দিলেই ভদ্রলোক নির্ঘাত গুবলেট করবেন। অথচ কিছু-একটা দায়িত্ব না-দিলে তাঁর গোঁসা হবে। বলা যায় না, অযাচিতভাবে কোনো-একটি গ্রুপের সঙ্গে হাত লাগাতে বসে গেলেন! এবং কিছু-একটা গুবলেট করে, কর্মীদের হ্যাপা আরও বাড়িয়ে দিলেন! তো, দিনভর সুপারভিশনের নামে গোটা হলঘরে দৌড়ে বেড়িয়ে ভদ্রলোক যারপরনাই ‘ক্লান্ত শরীরে’ রওনা দিলেন বাড়ির উদ্দেশে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজেও পূর্ণবাবুকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ওই পর্যায়ে তিনি আমার সহকারী। অর্থাৎ আসল ব্যাগিং’এর সময় আমি যখন হলের মধ্যিখানে চেয়ার চেপে বসে গোটা কাজটার ওপর নজরদারি করবো, পূর্ণবাবু তখন আমার পাশটিতে বসে আমায় সব ব্যাপারে সহায়তা করবেন। এমন কাজে তো যাকে-তাকে বহাল করা যায় না। পূর্ণবাবু’র মতো একজন ‘দক্ষ, নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী’ অফিসার ছাড়া চলবে কেমন করে? কাজটা খুব পছন্দ হয়েছে পূর্ণবাবু’র। খোদ বিডিও সাহেবের ছায়াসঙ্গী হয়ে সব কাজের তদারকি করার মতো মর্যাদাসম্পন্ন কাজের দায়িত্ব পেয়ে তিনি যারপরনাই খুশি। বলাই বাহুল্য, মনে দুঃখ না-দিয়েও তাঁকে যে সব রকমের গুরুত্বপূর্ণ কাজের বাইরে রাখা গিয়েছে, এতে আমরাও যারপরনাই খুশি।       

ঠিক রাত আটটায় শুরু হল ব্যাগিং’এর কাজ। কিন্তু খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে, ওই পর্যায়ে পূর্ণবাবু অনুপস্থিত! কিন্তু এমনটা হওয়ার তো কথা নয়। অফিসে হাজিরার ব্যাপারে তিনি সবদিনই ব্লকের মধ্যে এক-নাম্বার। সেই তিনি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিনেই গরহাজির! শরীর-টরীর খারাপ হল কিনা, ওই নিয়ে কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তা হলেও, ভদ্রলোকের অনুপস্থিতিতে আমি অন্তত বেশ স্বস্তি পেলাম। স্বস্তি পেলাম এই কারণে যে, আসল ‘ব্যাগিং’এর এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উনি উপস্থিত থাকলে কখন কী বিপত্তি বাধাতেন! অন্তত সেই ভয়টা তো রইল না।  

হলঘরের মধ্যে পাতা রয়েছে, ১৩০টি বুথের জন্য ১৩০ জোড়া চটের থলি। ১০১ রকমের সামগ্রীগুলো পরিবেশনের জন্য দশজন দায়িত্বশীল কর্মচারিকে নির্বাচন করা হয়েছে। প্রত্যেক কর্মচারি দশটা করে সামগ্রী, ঠিক বিয়েবাড়ির পংক্তিভোজের স্টাইলে পরিবেশন করবেন। কোন্‌ কর্মচারি কোন্‌ দশটা সামগ্রী পরিবেশন করবেন, সেই তালিকাটিও আগাম ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের হাতে। সমগ্র সামগ্রীর তালিকাটি নিয়ে হলের একপ্রান্তে বসেছেন ও-সি ইলেকশন, পুলক বোস। তালিকার একনম্বর সামগ্রীটির নাম চেঁচিয়ে বলছেন, কী-না, ব্যালট-পেপার–, গৌতম ঘোষ–। অমনি গৌতমবাবু এগিয়ে চললেন একনম্বর বুথের দিকে। পিছু পিছু একজোড়া হাতল লাগানো একটি এ্যালুমিনিয়মের ‘নৌকো’য় প্রথম ৩০টি বুথের ব্যালট-পেপারের বাণ্ডিলগুলি ভরে নিয়ে ‘নৌকো’টিকে বয়ে চলেছেন দুজন গ্রুপ-ডি কর্মচারি। গৌতমবাবু একেবারে একনম্বর বুথ থেকে শুরু করে ব্যালট-পেপারের বাণ্ডিলগুলি পেতে রাখা চটের থলির ওপর রাখছেন। পরমুহূর্তেই পুলকবাবু হাঁক পাড়ছেন, ফরম’এর সেট–, রামপ্রসাদ গাঙ্গুলি—। অমনি রামপ্রসাদবাবু, ঠিক ভাতের ওপর ডাল দেবার ভঙ্গিতে, চটের থলির  ওপর রাখছেন ফরমের এক-একটি সেট। তাঁর পিছু পিছু রবিবাবু চলেছেন খামের সেটগুলি পরিবেশন করতে…।

এইভাবে চলতে থাকল একে একে তাবৎ সামগ্রী পরিবেশনের কাজ। একটি সামগ্রী যখন ১৩০টি ‘পাত’এ পরিবেশিত হল, পুলকবাবু অমনি ওই সামগ্রীর বামদিকে একটি ‘টিক’ চিহ্ন এঁকে দিলেন।

এইভাবে ৫০টি সামগ্রী পাত’এ পড়বার পর, একঘন্টা নৈশভোজের বিরতি।

বিরতির পর শুরু হল পরের সামগ্রীগুলি পাত’এ ফেলবার কাজ।

এইভাবে ১০১টি সামগ্রী যখন ঠিকঠাক পরিবেশিত হল ১৩০টি বুথে, ব্যাগিং’এর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজটি শেষ হল।  

একপ্রস্থ চা-পানের পর শুরু হল তৃতীয় পর্যায়ের কাজ। এই পর্যায়ে অলোকবাবু, অসিতবাবু, গৌতমবাবু, ধনঞ্জয়বাবু, স্বর্ণেন্দুবাবু’র মতো সিনিয়র অফিসাররা ৩০% ‘পাত’এর সামগ্রীগুলি রেন্‌ডাম চেক করে দেখবেন, সবগুলি সামগ্রী ঠিকঠাক দেওয়া হয়েছে কিনা। বুথ নম্বর ১ থেকে ২০ অবধি যদি আলোকবাবু চেক করেন তো, ২১ থেকে ৪০ নম্বর বুথগুলি চেক করবেন অসিতবাবু। এইভাবে, ১৩০টি বুথের ৩০% রেণ্ডাম চেক করবার কাজটি সাঙ্গো হলে-পর, শেষ হল ব্যাগিং’এর তৃতীয় পর্যায়।

এরপর শুরু হলো ব্যাগিং’এর চতুর্থ তথা শেষ পর্যায়। এই পর্যায়ে কয়েকজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল অফিসারের তদারকিতে শুরু হবে প্রতিটি বুথের তাবৎ সামগ্রীগুলি থলির মধ্যে ভরে ফেলবার কাজ। ওই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হল, ব্যাগে ঢোকাবার আগে সংশ্লিষ্ট অফিসার স্বচক্ষে দেখে নেবেন, ব্যালট-পেপারের যে-বাণ্ডিলটি থলিতে ভরা হচ্ছে, তা ওই বুথের জন্য বরাদ্দ কিনা। চটের থলির ওপর লেখা বুথ-নম্বরের সঙ্গে ব্যালট-পেপারের বাণ্ডিলের গায়ে লেখা বুথ-নম্বরটি স্বয়ং মিলিয়ে নিয়ে, তবেই সংশ্লিষ্ট থলিতে ভরবেন ওটা।

এইভাবে, একসময় সামগ্রীগুলি ব্যাগে ভরে ফেলা হলো। এবং বুথপিছু দুটো থলির হ্যান্ডেলগুলোকে সুতলি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হলো, যাতে ডিসট্রিবিউশন সেন্টারে নিয়ে যাবার কালে, বুথপিছু থলিজোড়াটি একত্রে যেতে বাধ্য হয়।

পুরো কাজটি যখন শেষ হলো, ততক্ষণে রাত কাবার। হলঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

এমন ঝঞ্ঝাটের কাজটি অবশেষে সাঙ্গো করা গেছে, সেই কারণেই, শারীরিকভাবে ক্লান্ত হলেও, আমার মনের মধ্যে তখন একজাতের ফুরফুরে ভাব। কেবল একটা ব্যাপারই খচখচ করছিল বুকের মধ্যে। পূর্ণবাবু’র এমন বিনা-খবরে অনুপস্থিতি। বাস্তবিক, পূর্ণবাবুকে নিয়ে কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তাও কাজ করছিল মনে। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আচমকা এমন ডুব মেরে দেওয়াটা কস্মিনকালেও পূর্ণবাবুর ধাতে নেই। অসুখ-বিসুখ বাধিয়ে বসলেন কিনা, কে জানে!

স্থির করলাম, বেলা একটু বাড়লে ওঁর বাড়িতে কাউকে পাঠাবো।

 

২

 

রাতভর ‘ব্যাগিং’এর কাজ করবার পর, ভোর নাগাদ ব্লকের পনেরোআনা অফিসার ও স্টাফ ক্লান্ত শরীরে যে-যার বাড়ি চলে গিয়েছেন। একটুখানি বিশ্রাম নিয়ে, চান-খাওয়া সেরে তাঁরা সবাই ফিরে আসবেন এগারোটা নাগাদ।

আজ দিনভর আরও অনেক কাজ। আগামীকাল সকাল থেকেই আর-একটা যজ্ঞ শুরু হবে। ভোটকর্মীরা রওনা দেবেন বুথের উদ্দেশে। তাঁদের সবাইকে মালপত্র ও টাকাপয়সা সহযোগে ঠিকঠাক রওনা করিয়ে দিতে হবে। সেই যজ্ঞও চলবে কাল বিকেল অবধি। সন্ধে থেকে শুরু হবে আর-এক পর্ব। প্রতিটি বুথে ভোটকর্মীরা ঠিকঠাক পৌঁছলেন কিনা, সেই খবর সাইকেল মেসেঞ্জার মারফৎ আসতে থাকবে। সেগুলো কিস্তিতে কিস্তিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে। পরিশেষে, সমস্ত বুথে ভোটকর্মীদের পৌঁছে যাবার খবর এস-ডি-ও অফিসে পাঠাতে পাঠাতে গভীর রাত হয়ে যাবে। আর, পরশুই তো শুরু হবে ভোট নামক মহাযজ্ঞ!   

ব্যাগিং’এর কাজ শেষ করে ভোর নাগাদ অফিসের সবাই বাড়ি চলে গেলেও, আমরা ক’জন তখনো অবধি বসে রয়েছি আমার অস্থায়ী অফিস-চেম্বারে। ক’জন বলতে, রয়েছেন ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক পুলকবাবু৷ সঙ্গে রয়েছেন শিল্প-অফিসার আলোক আচার্য, পঞ্চায়েত অডিট অফিসার গৌতম ঘোষ এবং পঞ্চায়েত-সমিতির করণিক রামপ্রসাদ গাঙ্গুলি। আমরা পাঁচজনে বসে আগামী কাজগুলোর একটা তালিকা বানাচ্ছিলাম৷ এবং কোন্ কাজটি কোন্ অফিসারকে দেওয়া যায়, তাই নিয়েও আলোচনা করছিলাম৷ কেউ থাকবেন মাল-বিতরণকারী কাউন্টারগুলোর দায়িত্বে৷ কেউ-বা  করবেন গাড়িগুলোর বরাদ্দ ও তদারকি৷ কেউ থাকবেন ভোটের পরে ব্যালটপেপার-ভর্তি ভোটবাক্সগুলির যথাযথ সংরক্ষণের দায়িত্বে৷ কেউ-বা থাকবেন কয়েক হাজার ভোটকর্মীর হাজিরার তদারকি ও তাদের প্রাপ্য অর্থ বিলি করবার দায়িত্বে…৷ আরও অনেক ধরনের কাজ রয়েছে ভোটযজ্ঞটিকে সুষ্টুভাবে শেষ করবার জন্য৷ প্রত্যেকটি কাজই অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ।

কর্মীদের তালিকাটি চূড়ান্ত করে, সেইমতো নির্দেশনামাটি তৈরি করে, আজই সব অফিসারের হাতে ধরিয়ে দিতে হবে৷ নইলে, রাতটি পোহালে তাঁরা নিজ-নিজ দায়িত্বগুলো বুঝে-টুঝে নেবেন কীকরে? আমরা গভীর মনোযোগ সহকারে ওই কাজটি করছিলাম৷ রাত্রি-জাগরণের ফলে পাঁচজনেই খুব ক্লান্ত৷ গৌতমবাবুর চোখ তো মাঝে মাঝেই ছোট হয়ে আসছিল৷ তাও, সেই ক্লান্তিকে অগ্রাহ্য করে, আমরা এইবেলা কাজটা সেরে রাখতে চাইছিলাম৷

ঠিক সেই মুহূর্তে বেশ হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে ঢুকলেন পূর্ণবাবু।

দেখলাম, চানটান সেরে বেশ ফিটফাট হয়েই এসেছেন৷ ঘাড়েও দেখলাম বেশ পাউডার-টাউডার বুলিয়েছেন৷ আগের রাতে যে বেশ সুনিদ্রা হয়েছে, সেটাও তাঁর চোখেমুখে পরিষ্কার৷

 — ভেরি, ভেরি, ভেরি সরি স্যার। গতকাল আর কিছুতেই আসতে পারলাম না । আমরা কিছু শুধোবার আগেই তিনি গড়গড় করে বলে যেতে লাগলেন, দিনভর ব্যাগিং’য়ের কাজ সুপারভাইজ করতে গিয়ে এইসান টায়ার্ড হয়ে গেলাম—শরীরটা আর বইছিল না, স্যার। 

— ঠিক আছে, ঠিক আছে। ওঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলি, শরীরের আর দোষ কি? গেল-মাসটাক নাগাড়ে যে ধকল যাচ্ছে—।

— তাও আসতাম স্যার। আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন পূর্ণবাবু, কিন্তু মেয়েটার হঠাৎ বিকেলের দিকে জ্বর এসেছে। বাড়ি গিয়ে দেখলাম, একশো’র ওপর জ্বর–।

— ঠিক আছে, ঠিক আছে। পূর্ণবাবুকে আর এগোতে না-দিয়ে বলে উঠি, জ্বরটা ছেড়েছে তো?

— হ্যাঁ স্যার, ঠিক সময়ে ওষুধ পড়ায় জ্বরটা আর নেই। পূর্ণবাবু বলতে থাকেন, তবে, এটা মানছি যে, আমার না-আসার খবরটা কালই আপনাকে দেওয়াটা উচিত ছিল। কারণ, যে-দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভার আমার ওপর চাপিয়েছিলেন আপনি, তাতে করে, আমি না-এলে আপনি যে মহা বিপদে পড়বেন, তা তো আমি বুঝেছি। কিন্তু কী করে জানাবো বলুন? পাশের যে-দোকানটা থেকে মাঝে মাঝে ফোন-টোন করি, সেটা কেন-কে-জানে কাল বন্ধ ছিল। নইলে—।

— ওই নিয়ে আপনি একটুও ভাববেন না পূর্ণবাবু। আমি মিষ্টি হেসে বলি, আপনি না-থাকায় যথেষ্ট অসুবিধে হয়েছে বটে, তবে আমরা সবাই মিলে কোনোগতিকে কাজটা শেষ করতে পেরেছি।

বলতে বলতে আমার সামনে বসে থাকা মানুষগুলির মুখের পানে আড়চোখে তাকাই আমি। প্রত্যেকেই তখন প্রাণপণে হাসি চাপতেই ব্যস্ত।

আমার শেষ কথাটায় বুঝি মনে মনে কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হলেন পূর্ণবাবু। ওঁর অনুপস্থিতি আমাদের যে অধিক কাবু করতে পারেনি, এটা বোধ করি হজম করতে পারছিলেন না ভদ্রলোক।

সহসা বেশ ব্যস্তসমস্ত গলায় বলে উঠলেন, আমি তাহলে আসল কাজটা সেরে ফেলি স্যার৷

—আসল কাজ? আসল কাজ মানে? আমি অবাক হয়ে তাকাই পূর্ণবাবুর মুখের দিকে।

—মানে, ভোটের ব্যাগগুলো সমস্ত বুথের জন্যই ঠিকঠাক তৈরি করা হল কিনা, এক-দুই করে গুনে ফেলি৷ কারণ, কোনওগতিকে যদি দু’চারটে বুথের জন্য ব্যাগ কম পড়ে, তবে তো আগামীকাল মাল বিলির সময় ধুন্ধুমার লেগে যাবে৷

আমি বহু কষ্টে হাসি সামলে বলি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি বরং এইবেলা ব্যাগগুলোকে গুনেই ফেলুন৷ বেশ ভালো করে গুনবেন কিন্তু৷ একবার নয়, অন্ততপক্ষে তিন-চারবার৷

—সেটা আমায় বলে দিতে হবে না স্যার৷ গলায় যৎপরোনাস্তি গুমোর ফুটিয়ে পূর্ণবাবু বলেন, কোন্ কাজের কতখানি গুরুত্ব, তা আমি ভালই জানি৷ বাইশ বছর হয়ে গেল স্যার৷ বিধানসভা, লোকসভা এবং পঞ্চায়েত মিলে না-হোক হাফ-ডজন ভোট সামলেছি৷

বলতে বলতে ভুরু-টুরু কুঁচকে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন পূর্ণবাবু৷ বুঝতে পারি, তিনি এখন হলঘরে গিয়ে ১৩০টি বুথের জন্য গুছিয়ে রাখা থলিগুলোকে এক-দুই করে গুনবেন। 

পুলকবাবু বাঁকুড়ার সন্তান। অত্যন্ত রসিক ব্যক্তি৷ এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি তিনি৷ পূর্ণবাবু চলে যাবার পর এতক্ষণে মুখ খুললেন ৷

চোখেমুখে যারপরনাই শ্লেষ ফুটিয়ে বলে উঠলেন, হুহ্‌!  কুনো কাজে নাই বউড়ি / লাউ কুটতে দৌড়াদৌড়ি!

পুলকবাবুর কথাটা নিমেষের মধ্যে বিঁধে গেল মগজে৷ বলি, মানে কি কথাটার? তার জবাবে ফিক করে হাসেন পুলকবাবু৷ একসময় ব্যাখ্যা করেন প্রবাদটার মর্মার্থ৷

গ্রামাঞ্চলে, একান্নবর্তী শ্বশুরবাড়িতে, বউদের দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়৷ জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ৷ কাকভোর থেকে মাঝরাত অবধি৷ তো, একান্নবর্তী পরিবারের বউয়েরা যখন গেরস্থালি কাজগুলো ভাগাভাগি করে নেয়, তখন অপেক্ষাকৃত চালাক ও কৌশলী বউটি পরিশ্রমের কাজগুলিকে এড়িয়ে গিয়ে হালকা কাজগুলিকে বেছে নেয়৷ যেমন, রাবণের গুষ্টির জন্য যখন কাঁড়ি কাঁড়ি মসলা পিষছে কেউ কিংবা গোটা বাড়ি ও ভিটেয় ঝাঁটপাট দিচ্ছে, লেপাপোঁছা করছে, কিংবা এককাঁড়ি কাপড় নিয়ে কাচতে বসেছে, তখন চালাক ও কৌশলী বউটি বেশ ঘটা করে বসে গেল লাউ কুটতে! বুঝতেই পারছেন, লাউয়ের মতো নরম সবজিটিকে কোটা হল সবচেয়ে হালকা কাজ৷ সেই কারণেই, দৈনন্দিন জীবনে যখনই কেউ পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলিকে পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা কাজটিকে বেছে নেয়, তখনই এই প্রবাদটা ব্যবহার করে অন্যরা৷ কিনা, কুনো কাজে নাই বউড়ি / লাউ কুটতে দৌড়াদৌড়ি!

ইস্! শ্লেষ প্রকাশ করবার কী সহজ-সরল অথচ কী মোক্ষম ভঙ্গি এই প্রবাদ-প্রবচন! কিন্তু কথাটা শেষ করেই পুলকবাবুর মুখমণ্ডলে সহসা ফুটে উঠল দুর্ভাবনার ছাপ!

বলি, কী হল? কী ভাবছেন?

আমার কথায় অল্পক্ষণ গুম মেরে বসে থাকেন পুলকবাবু। একসময় বিড়বিড় করে বলেন, ভাবছি, পূর্ণবাবুকে তো ব্যাগগুলো গুনতে পাঠালেন। তিনি আবার আধা-ডজন ভোট করবার অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাগগুলোর ভেতর থেকে মালগুলো বের করে গুনতে বসবেন না তো?

— আমিও ঠিক এই আশঙ্কাটাই করছি তখন থেকে। পাশ থেকে বলে ওঠেন আলোকবাবু।

— তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে, স্যার। বলতে বলতে ঝটিতি উঠে দাঁড়ান গৌতমবাবু, যাই, দেখি।

বলতে বলতে ব্যাগিং’এর জায়গাটার উদ্দেশে দ্রুতপায়ে রওনা দেন তিনি। পিছু পিছু দৌড় মারেন রামপ্রসাদবাবু।

ভাগ্যিস গিয়েছিলেন ওঁরা, নইলে সত্যি সত্যি এক অনর্থ ঘটত। কারণ, পূর্ণবাবু সত্যি সত্যি ব্যাগগুলোর থেকে সামগ্রীগুলোকে মেঝেতে ঢালবার উদ্যোগ করছিলেন। গৌতমবাবু ও রামপ্রসাদবাবু একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে কোনোগতিকে থামান ওঁকে।

 

৩

 

ভোটের সময় বুথগুলোর কাজকর্মের তদারকি করবার জন্য পুরো ব্লক এলাকাকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতি সেক্টরের অধীনে পনেরো-বিশটা করে বুথ থাকে। চার্জে থাকেন একজন করে অফিসার। নির্বাচনের আগের দিন থেকেই তাঁরা সেক্টর-অফিসে পজিশন নেন। বুথগুলোর যাবতীয় দায়িত্ব সবই ন্যস্ত থাকে তাঁদের ওপর। তাঁদের অধীনে থাকে দু’একজন গ্রুপ-সি কর্মচারি এবং ঘন্টায় ঘন্টায় ভোটের খবর আদান-প্রদানের জন্য একজন করে সাইকেল মেসেঞ্জার। ভোটের পর, যতক্ষণ না ভোটকর্মীরা ব্যালট-বাক্স নিয়ে ফিরে আসছেন ‘রিসেপশন-সেন্টার’এ, ততক্ষণ অবধি তাঁদের ছুটি নেই। খুবই দায়িত্বের কাজ ওটা।

পূর্ণবাবুর একান্ত বাসনা, তাঁকে একটা গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হোক। ইতিমধ্যেই অফিসের কাউকে কাউকে আকারে-ইঙ্গিতে তিনি জানিয়েছেন তা। এবং সারা ব্লকের মধ্যে কোন্‌ সেক্টরটি তাঁর মতো ‘দক্ষ ও দায়িত্বশীল’ অফিসারের পক্ষে যথাযথ, সেটাও প্রকাশ করেছেন অন্যদের কাছে।

কিন্তু পঞ্চায়েত অফিসার পুলকবাবু’র তৈরি সেক্টর বরাদ্দের তালিকাতে তাঁর নামটাই নেই! ভোটের হপ্তাটাক আগে সেক্টর-অফিসারদের তালিকাটি তৈরি করে আমার কাছে পেশ করেছিলেন পুলকবাবু। ওই তালিকায় পূর্ণবাবুর নাম না-দেখে, আমি মনে মনে খুশি হলেও কিঞ্চিৎ প্রমাদ গুনছিলাম। কোনো সেক্টরের দায়িত্বেই তিনি নেই, এটা জানার পর পূর্ণবাবুর কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটাই ভাবছিলাম মনে মনে।

একসময় পুলকবাবুকে শুধোই, পূর্ণবাবুকে রাখেননি?

— গুরুত্বপূর্ণবাবুকে? পুলকবাবু মুচকি হাসেন, আপনি বললেই রেখে দিই।

আমি সহসা কোনো জবাব দিতে পারিনে। কারণ আমি তো ভালোমতোই জানি, কোনও দায়িত্ব না-দিলেও তিনি যেমন ব্যস্ত-সমস্ত ভাব করে সবাইকে অস্থির করে মারেন, সত্যি সত্যি কোনো সেক্টরের দায়িত্ব দিলে তো শুধু তাঁর বায়নাক্কা শুনতে শুনতেই আমার বারোআনা সময় খরচ হয়ে যাবে। কিন্তু কোনও দায়িত্ব না-পেলেও তো তিনি কাউকে টিঁকতে দেবেন না। কাজেই, পুলকবাবুকে একটুখানি সমঝোতায় আসতে অনুরোধ করি।

বলি, এক কাজ করুন। মড়ার সেক্টরটাতে তো পনেরোটা বুথ রয়েছে। ওই সেক্টর থেকে বিষ্ণুপুর শহরের এক্কেবারে লাগোয়া গোটা পাঁচেক বুথ নিয়ে একটা নতুন সেক্টর বানিয়ে ফেলুন। ব্লক অফিস থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই হবে বুথগুলো। এমনিতে ঝুটঝামেলাও তেমন নেই ওগুলোতে। পূর্ণবাবু ওই সেক্টরের দায়িত্বেই থাকুন।

— স্যার ঠিকই বলেছেন, পুলকদা। আলোকবাবু-গৌতমবাবুরা তৎক্ষণাৎ একযোগে বলে ওঠেন, এতে করে সবদিকই রক্ষা হবে। নইলে, পূর্ণদা স্যারের চেম্বারে কাক-চিল বসতে দেবেন না।

সবাইয়ের পীড়াপীড়িতে পুলকবাবু খুব অনিচ্ছাসহকারে আমার প্রস্তাবটা গিলতে বাধ্য হয়েছেন। সেইমতো, শহর-লাগোয়া পাঁচটি বুথ নিয়ে একটা নতুন সেক্টর তৈরি হয়েছে, স্রেফ পূর্ণবাবুর জন্য। 

সেক্টর-অফিসারদের লিষ্টটা বেরোতেই খুব মনমরা দেখালো পূর্ণবাবুকে। অফিসের কাউকে কাউকে বলেও ফেললেন তাঁর অসন্তোষের কথা। কী-না, বিডিও-সাহেব এখনো অবধি কাজের মানুষগুলোকে ঠিকঠাক চিনলেন না। চিনলে, আমাকে এই পাঁচ-বুথওয়ালা সেক্টরের দায়িত্ব দিতেন না।

অফিসের অন্যদের থেকে সে-খবর যথাসময়ে পেয়ে গেলাম আমি। একসময় পূর্ণবাবুকে একা-একা নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠালাম।

খাটো গলায় বললাম, মড়ার এলাকার পাঁচটা বুথ নিয়ে খুব ড্যামেজিং রিপোর্ট এসেছে আই-বি’র থেকে। ওই পাঁচটা বুথ-এলাকায় নকশালরা নাকি খুবই এ্যাকটিভ হয়ে উঠেছে। ওই পাঁচটা বুথ নিয়ে একটা নতুন সেক্টরই বানিয়ে ফেলতে হল তাই। আর, এমন সেক্টরের দায়িত্ব তো যাকে-তাকে দেওয়া যায় না। আপনি ছাড়া তো আর লোক দেখিনে পূর্ণবাবু। আপনি যদি ওই সেক্টরের দায়িত্বটা নেন তো আমি গোটা ব্লক এলাকার ভোটের কাজগুলো আরও ফ্রি-মাইন্ডে দেখতে পারি।

আমার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে গলে একেবারে জল হয়ে গেলেন পূর্ণবাবু।

গদগদ গলায় বললেন, আমার ওপর দায়িত্ব দিয়ে এখনও অবধি কেউ পস্তায়নি স্যার। গেল-ভোটে তো স্বয়ং এস-ডি-ও সাহেব ফোন করেছিলেন বিডিও-সাহেবকে, কী-না, পূর্ণচন্দ্র কর্মকারকে আমার এক্সক্লুশিভ্‌লি চাই। তো, ফোনটা পেয়েই নবনী দে’-সাহেব পড়লেন মহা ফাঁপরে। এদিকে সারা ব্লক জুড়ে রাবণের যজ্ঞি। এই অবস্থায় খোদ আমিই যদি না থাকি, তবে আর ভোটের কাজ তুলতে হবে না। সেযাত্রা এস-ডি-ও সাহেবকে বহু কষ্টে বুঝিয়ে-সুজিয়ে নিরস্ত করেছিলেন নবনী দে’ সাহেব।

পূর্ণবাবুর কথা শুনে বহু কষ্টে হাসি সামলাই। গলাটা নামিয়ে বলি, এবারেও তো একই ঘটনা। এস-ডি-ও সাহেব তো প্রায় জেদ ধরেই বসেছিলেন। বহুকষ্টে তাঁকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে—।

পাঁচ-বুথওয়ালা, কিন্তু সারা ব্লকের মধ্যে সবচেয়ে খতরনাক সেক্টরের দায়িত্ব পাওয়ায়, খুব ফুরফুরে মনে আমার চেম্বার থেকে ভারি ভারি পা ফেলে বেরিয়ে যান পূর্ণবাবু।

তার ফলটা ফলে ওইদিন সন্ধে নাগাদ।

 

৪

 

ব্লকের শিল্প-অফিসার আলোক আচার্য রয়েছেন গাড়িঘোড়া’র দায়িত্বে। নির্বাচন উপলক্ষে সদর থেকে কিস্তিতে কিস্তিতে যে বিশাল সংখ্যক ট্রাক-বাস ও ছোট গাড়ি আসছে, সামগ্রিকভাবে সেগুলোর দেখাশোনা ও বরাদ্দ করবার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত করে নিশ্চিন্তে রয়েছি আমি।

তো, সন্ধেনাগাদ আলোকবাবু আমার ঘরে ঢুকেই বলে ওঠেন, গুরুত্বপূর্ণবাবুকে নিয়ে তো আর পারিনে স্যার।

— কেন? তিনি আবার কী করলেন? আমি ফাইল থেকে মুখ তুলে তাকাই আলোকবাবুর মুখের পানে।

— আরে, দেখুন না, সেক্টর অফিসারের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি হাজারো বায়নাক্কা জুড়েছেন।

— কীরকম?

— দেখুন না, আপনার ঘর থেকে বেরিয়েই অবধি তিনি বায়না ধরেছেন, তাঁকে এক্ষুনি একটা গাড়ি অ্যালট করতে হবে।

— কেন? এক্ষুনি গাড়ি নিয়ে তিনি করবেনটা কি?

— তিনি এক্ষুনি বুথ ভিজিটে বেরোবেন। গলায় যারপরনাই বিরক্তি ফুটিয়ে আলোকবাবু বলতে থাকেন, যত বোঝাই, সদর থেকে এখনও অবধি সেক্টরের জন্য গাড়ি আসেনি, কথা কানেই তুলছেন না। মাত্তর তিনখানা স্মল-ভেহিকেল পাঠিয়েছে সদর থেকে। তাই চড়ে অসিত ভাণ্ডারি’রা ঘুরে ঘুরে বুথ, রাস্তাঘাট আর অকেজো টিউবওয়েলগুলো সারাচ্ছেন। ওই গাড়ির একটা ওঁকে দিই কেমন করে?

নরম গলায় বলি, পূর্ণবাবুকে একটু বুঝিয়ে-সুজিয়ে বলুন। বলুন, সেক্টরের গাড়ি এলেই তিনি সবার আগে পাবেন।

একটুবাদেই ইলেকশনের বড়বাবু এসে হামলে পড়েন আমার সামনে। বলেন, গুরুত্বপূর্ণবাবু স্টেশনারি’র অ্যাত্তোবড় লিষ্ট দিয়েছেন স্যার। তার মধ্যে শুধু আট-নম্বর রেজিস্টারই পাঁচখানা। তাছাড়া, আধা ডজন বলপেন, তিন-চার রঙের স্কেচপেন, আর্টপেপার…।

— বলেন কি! আমি চমকে উঠি, এত জিনিস তাঁর কী কাজে লাগবে?

— বলছেন, প্রত্যেক বুথের ভোটকর্মীদের নাম, পদের নাম, অফিসের ঠিকানা, বাড়ির ঠিকানা, অফিস ও বাড়ির টেলিফোন নম্বর, ভোটের বুথ নম্বর, ভোটে নিযুক্ত পদের নাম, কবে-কখন ডিউটিতে জয়েন করলেন, ভোটের পর কবে-কখন ডিউটি থেকে ছাড়া পেলেন, শরীরে কোনও বিশেষ রোগ রয়েছে কিনা, ভোটের কাজ কেমন করেছেন, কোনও অভিযোগ পাওয়া গেল কিনা, গুষ্টির কার-কার পিণ্ডি দেওয়া হয়েছে, কার-কার এখনও অবধি বাকি রয়েছে…সবই নাকি লিখে রাখবেন পৃথক-পৃথক রেজিস্টারে। রাগের চোটে ততক্ষণে লাল হয়ে উঠেছে বড়বাবুর সারামুখ।

আসলে, বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকে যখন ব্লক-ডেভেলপমেন্ট অফিসগুলো তৈরি হচ্ছিল, তখনই পূর্ণবাবুদের নিয়োগ করেছিল সরকার। ওঁদের কাজ ছিল, ব্লক-এলাকার সব রকমের উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান তৈরি করে নিয়মিতভাবে তা সরকারকে জানানো। সেইসব খতিয়ান তৈরি করবার জন্য গাদা গাদা রেজিস্টার লাগতো। এক-একটি রেজিস্টারে এক-এক ধরনের রিপোর্ট লিপিবদ্ধ থাকতো। কাজেই, পূর্ণবাবুরা কথায় কথায় গাদা গাদা রেজিস্টার ব্যবহারে রপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন। এতকাল বাদে, ব্লকের কাজকর্মের ধরনটা যেমন বদলেছে, রিপোর্ট-রিটার্নের ধরনও বদলে গিয়েছে অনেক। পূর্ণবাবুদের এখন আর ওইসব কাজ করতে হয় না। এখন যা-কিছু রিপোর্ট-রিটার্ণ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোই পাঠায় নিজ-নিজ ওপরওয়ালাদের। পূর্ণবাবুদের এখন আর ওইসব রিপোর্ট পাঠাতে হয় না। তাই বলে ওই পদটা তো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। কাজেই, পূর্ণবাবুরা থেকে গিয়েছেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁরা ঠিক কী কাজ করবেন, সরকার সেটাও নির্দিষ্ট করে বলে দেয়নি। কাজেই, বিভিন্ন ব্লকের বিডিও’রা নিজেদের প্রয়োজনমতো ওঁদের ব্যবহার করেন। তবে, বিডিও’রা ওঁদের যে-ধরনের কাজে ব্যবহার করুক না কেন, পুরোনো অভ্যেসবশে, প্রতিটি কাজে গাদা গাদা রেজিস্টার ব্যবহার করাটা এঁদের মজ্জাগত হয়ে গিয়েছে।  

বড়বাবুর কথাগুলো শুনতে শুনতে হেসে ফেলি আমি। বলি, আমি আর কী বলব, বলুন তো?  আপনাদেরই তো কলিগ উনি। একটু বুঝিয়ে-সুজিয়ে…।

— কী বোঝাব স্যার, কাকে বোঝাব? বাচ্চা ছেলে হলে বোঝানো যায়, একটা বয়স্ক মানুষ—-। সমানে গজগজ করতে থাকেন বড়বাবু।

মুচকি হেসে বলি, ওঁকে বলুন, রেজিস্টার বাঁধাইখানায় পড়ে রয়েছে। বাইণ্ডারের কলেরা হয়েছে। আর, বলপেনের কারখানায় বোনাসের দাবিতে স্ট্রাইক চলছে। বলতে বলতে আবারো হেসেই ফেলি আমি।

 

৫

 

ভোটের দিন-কয় আগে সদর থেকে আরও খান-তিনেক ছোট গাড়ি এলো। পূর্ণবাবু বুঝি তক্কে তক্কে ছিলেন। গাড়িগুলো পৌঁছনো মাত্র তাদের বডি, সীট এবং ড্রাইভারের বদনগুলি পরীক্ষা করে এলেন স্বয়ং। একটা গাড়িকে খুবই পছন্দ হল তাঁর। ড্রাইভারটিকেও বেশ চৌকস মনে হল। ভোটের ডিউটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ, ওই কাজে একজন ড্রাইভারের ওপর যে কতখানি গুরুদায়িত্ব বর্তায়, কতখানি ধৈর্য, তিতিক্ষা, অধ্যবসায় এবং নিষ্ঠার দরকার হয়, তাই নিয়ে পছন্দের ড্রাইভারটির সামনে লম্বা বক্তৃতা সেরে, সোজা এগিয়ে যান ও-সি ভেহিকল আলোক আচার্যের কাছে।

— ডবল-ফাইভ-থ্রি-ফোর গাড়িটা আমার নামে অ্যালট করে দিন দেখি জলদি। বুথগুলো একবার চক্কর মেরে আসি।

আলোকবাবু মুচকি হেসে বলেন, গাড়ি কী হবে পূর্ণবাবু? পাঁচটা বুথই তো আপনার নাকের ডগায়। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েই তো দেখে নিতে পারেন।

— ইয়ার্কি হচ্ছে? মর্নিং-ওয়াকের সঙ্গে বুথ ইন্‌সপেকশন! পূর্ণবাবু ক্ষেপে ফায়ার, বিশ বছর ইলেকশন ডিউটি করছি মশাই। ইলেকশনের গুরুত্ব আমি ভালোই বুঝি। না দিলে, বলে দিন, আমি বিডিও সাহেবকে জানিয়ে দেব, বুথে গোলমাল হলে আমাকে যেন দোষ না দেন।

— ঠিক আছে, ঠিক আছে, চটছেন কেন? আলোকবাবু নরম গলায় বলেন, গাড়িগুলো তো এইমাত্তর এল। এখনও অবধি রিপোর্টই করেনি। আগে রিপোর্ট করুক, মোটর ভেহিকেল ইনস্পেক্টর গাড়িগুলোকে চেক করে দেখুক, ফুয়েল-টুয়েল নিক…। কত নাম্বার বললেন? ডবল-ফাইভ-থ্রি-ফোর? লিখে নিলাম। ভাববেন না, আপনাকেই দেওয়া হবে ওটা।

—থ্যাঙ্ক য়্যু। বলতে বলতে পূর্ণবাবু হনহনিয়ে হাঁটা দেন। তাঁর পছন্দের গাড়ির ড্রাইভারটিকে চায়ের দোকান থেকে খুঁজে বের করে ধমক দিতে থাকেন, এখনও অবধি রিপোর্ট করনি? যাও, যাও, জলদি রিপোর্ট কর। গলাটা খাদে নামিয়ে বলেন, এরপর রিপোর্ট করলে পাম্পে গিয়ে তেল পাবে না। পুলিশের গাড়িগুলো পাইকারি হারে তেল ভরছে যে-যার গাড়িতে। আর একটা কথা, রিপোর্ট করবার পর আশেপাশেই থেকো। যেকোনও মুহূর্তে তোমাকে আমার দরকার হতে পারে।

সন্ধ্যের দিকে সারা মুখমণ্ডলে অমাবস্যার অন্ধকার জমিয়ে যখন আমার ঘরে ঢুকলেন পূর্ণবাবু, দেখেই আমি মনে মনে প্রমাদ গুনছিলাম। আমার ঘরে তখন রাজনৈতিক দলের লোকজন ছিল। পূর্ণবাবু নিঃশব্দে বসে পড়লেন একটি চেয়ারে। অখণ্ড অধ্যবসায় নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

সবাই চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণবাবু ওলাওঠার ভেদবমির মতো গলগল করে উগরে দিলেন তাঁর যাবতীয় ক্ষোভ। স্যার, কথায় কথায় সবাই নন-কোঅপারেট করলে তো সিন্‌সিয়ারেস্ট সার্ভিস ডিসচার্জ করা যাবে না, স্যার।

— কেন কী হল? আমি কিছুই না-জানার ভান করতে থাকি।

— ইলেকশন তো একটা টিম-ওয়ার্ক, স্যর।

— ঠিকই তো। কিন্তু হলটা কি?

— আলোকবাবুকে আমি এত করে বলে রেখেছিলাম, আমার অবিলম্বে বুথগুলো ভিজিট করা দরকার। আপনিও স্যার কথা দিয়েছিলেন, সদর থেকে গাড়ি এলেই পয়লা লট থেকে আমাকে একটা অ্যালট করা হবে।

— তেমনই তো কথা ছিল। আমি ভুরু কুঁচকে বলি।

— আলোকবাবুও আমাকে তাই বলেছিলেন। কিন্তু এইমাত্র জানতে পারলাম, তিনটে গাড়িই নাকি বেলশুলিয়া, লায়েকবাঁধ আর ভড়া সেক্টরকে অ্যালট করা হয়ে গিয়েছে।

— তাই নাকি? আমি চোখেমুখে ডিপ-কন্‌সার্ন ফুটিয়ে বলি, কিন্তু এমনটা তো কথা ছিল না। অবশ্য, ওই তিনটে সেক্টরই এই ব্লকের সবচেয়ে দূরবর্তী সেক্টর। তাও, কথা যখন হয়েই ছিল —।

— আমার বক্তব্যটা স্যার সেখানেই। ইলেকশনটা যদি একটা টিম-ওয়ার্ক হয়, তবে সেই টিমের ক্যাপ্টেন তো আপনি। তো, আপনি বলে দেওয়া সত্বেও সেটা যদি ইম্‌প্লিমেন্টেড না হয়…।

— ঠিকই তো। চোখেমুখে যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ ফুটিয়ে বলি, কেন এমনটা হল? আমি এক্ষুনি খোঁজ নিচ্ছি।

— আমি আপনাকে একটা কথা বলছি, স্যার টিম-ওয়ার্কে ডিসিপ্লিন না থাকলে কিন্তু সবকিছু চৌপট হয়ে যাবে। আমি আজ কুড়ি বছর ইলেকশন করছি, স্যার।

— জানি তো।

— আমার মতো অভিজ্ঞতা এই ব্লকে আর কোনও অফিসারেরই নেই, স্যার।

— জানি তো।

— সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি স্যার, এসব বিশৃঙ্খলাকে শক্ত হাতে দমন করুন। নইলে এরা আপনার বদনাম করে ছাড়বে। ওদের তো কিছু নয়, কোথাও ম্যাসাকার হলে, তার সব দায় তো আপনার ওপরই বর্তাবে।

— বটেই তো।

— আমি যে এখন কী করি! সহসা হাহাকার করে ওঠেন পূর্ণবাবু, বুথগুলো এখনও দেখা হয়ে উঠল না। আর ক’দিনমাত্র বাকি!

পূর্ণবাবুর উদ্বেগটা শনৈ শনৈ বাড়ছে দেখে আমার মনে হল, একটু-কিছু করতেই হয়। নইলে ভদ্রলোককে শান্ত করা যাবে না।

আদিত্যবাবুকে ডেকে বললাম, একটিবার আলোকবাবুকে আসতে বলুন তো, আলোকবাবুকে আগেই বলা ছিল, তাই তিনি ঢোকামাত্র ওঁর ওপর একচোট নিতে পারলাম আমি।  

বললাম,  কী ব্যাপার আলোকবাবু, পূর্ণবাবু এখনও অবধি গাড়ি পেলেন না কেন? কাঁচুমাচু মুখে আলোকবাবু বললেন, দিয়ে দেব, স্যার। আসলে, তিনটে মাত্র গাড়ি এসেছিল তো, এক্কেবারে দূরের সেক্টর তিনটেতে দিয়ে দিলাম। ওদিকের বুথগুলো তো একেবারে বর্ডারের লাগোয়া। ১৫-১৬টা করে বুথ এক-একটা সেক্টরে। তাই ভাবলাম, ওদের যদি একটা দিন আগেও গাড়ি দিতে পারি, তো সেক্টর-অফিসাররা বুথগুলো দেখে-টেখে নিতে পারবে।

— সেটা ঠিক আছে, কিন্তু পূর্ণবাবুর বুথগুলোও তো কম ইম্পর্ট্যান্ট নয়। যেজন্য ওই বুথগুলোকে নিয়ে একটা নতুন সেক্টর করতে হল—।

— জানি, স্যার। আপনি আমাকে বলেছেন। আজ রাতেই এক লট গাড়ি আসছে। তার থেকেই একটা পূর্ণবাবু পেয়ে যাচ্ছেন, স্যার।

আমি আলোকবাবুকে ভৎর্সনা করলাম, এবং আজ রাতেই এক লট গাড়ি আসছে, এবং তার থেকে একটা পাওয়া একরকম নিশ্চিত, —তিনদিক থেকে এমন অনুকূল হাওয়ার দাক্ষিণ্যে পূর্ণবাবু একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেলেন।

মহত্ব আর উদারতার পরাকাষ্ঠাটি হয়ে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে, দূরের সেক্টরগুলোতে আগে গাড়ি দিতে হবে বৈকি। তাদেরও তো দরকার। ঠিক আছে, আজ রাতে যদি আর এক লট আসে —। আমি এখন উঠছি স্যার। যাই, ততক্ষণে রেজিস্টারগুলো কমপ্লিট করে ফেলি। আরও অনেক কাজ পড়ে রয়েছে।

পূর্ণবাবু চলে যেতেই আমরা দুজনে নিঃশব্দে হাসি বিনিময় করি।

এরপর সদর থেকে কিস্তিতে কিস্তিতে গাড়ি আসতেই লাগল। প্রতিবারই পূর্ণবাবু সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন একটা গাড়ির দখল নেবার জন্য। কিন্তু প্রতিবারই আলোকবাবু আমার গোপন নির্দেশ অনুসারে, নানারকম বুদ্ধি খাটিয়ে সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোকে বরাদ্দ করে দিলেন। এই নিয়ে আমি পুনরায় আলোকবাবুকে ছদ্ম তিরস্কার অবধি করলাম। আমার ব্লকে মোট পনেরোটি সেক্টর। পূর্ণবাবুর জন্য একটা নতুন সেক্টর বানানোয় বর্তমানে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ষোল। ইতিমধ্যে বারোটি গাড়ি এসে গিয়েছে। যেকোনও মুহূর্তে বাকি গাড়িগুলো চলে আসতে পারে। দেখেশুনে পূর্ণবাবু একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। শেষ কিস্তির গাড়িগুলো এলে তাঁর গাড়িটা যাতে কোনও মতেই ফস্কে না যায়, সেজন্য তিনি সারাক্ষণ চিলের নজর রেখেছেন। নানা সূত্রে আমি জানতে পেরেছি, ইতিমধ্যে তিনি আলোকবাবুকে বারকয় চা-জিলিপিও খাইয়ে দিয়েছেন।

 

৬

 

ভোটের ঠিক দু’দিন আগে আরো তিনটে গাড়ি এল। তিনটেই অ্যাম্বাসাডর। আলোকবাবু সেই খবরটা দিতে আমার ঘরে ঢুকেছিলেন। পূর্ণবাবু কোত্থেকে যেন গন্ধ শুঁকে শুঁকে সেখানে এসে হাজির। ওঁকে দেখামাত্তর আমার সঙ্গে আলোকবাবুর চোখে চোখে কথা হয়ে গেল।

আলোকবাবু বললেন, তাহলে স্যার, তিনটে গাড়ির মধ্যে একখানা পূর্ণবাবুকে দিয়ে দিই। বাকি দুটো দিই রাধানগর আর বাঁকাদহ সেক্টরে। মড়ার সেক্টরকে না হয় পরের কিস্তি থেকে দেওয়া যাবে।

আমি গম্ভীর গলায় জবাব দিই, ঠিক আছে। তাই করুন।

— আমাকে কোন্‌ গাড়িটা দিচ্ছেন? পাশ থেকে পূর্ণবাবু বলে ওঠেন।

— যেকোনও একটা। যেটা আপনি চাইবেন। আলোকবাবু যেন চরম উদারতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ! 

— বাইশ-সাতাত্তরটাই দিন তাহলে।

— এক মিনিট। আলোকবাবু একটা চিরকুটে নম্বরটা লিখে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে।

আলোকবাবু বেরিয়ে যাওয়া মাত্র পূর্ণবাবুও উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে খুব ব্যস্তসমস্ত গলায় বললেন, আমি তবে যাই স্যার, অনেক কাজই বাকি পড়ে রয়েছে। বলতে বলতে হনহনিয়ে হাঁটা দিলেন তিনি। বুঝতে পারছিলাম, এখন আর কোনও মতেই আলোকবাবুকে চোখের আড়াল করতে নারাজ পূর্ণবাবু।

পরের দিন আলোকবাবুই আমার ঘরে ঢুকে বোমার মতো ফেটে পড়লেন। পেছন পেছন পূর্ণবাবুও এসে ঢুকেছেন।

আলোকবাবু উত্তেজিত গলায় বললেন, সমীরবাবুর আক্কেলটা দেখেছেন স্যার, পূর্ণবাবুর জন্য যে বাইশ-সাতাত্তরটা ঠিক করে রেখেছিলাম, বলা নেই, কওয়া নেই, সেটাই নিয়ে উনি সেক্টরে চলে গিয়েছেন! আমি তো বিলক্ষণ জানি তা। ব্লক-অফিসের ফিসারি-অফিসার সমীর গুপ্ত রাধানগর সেক্টরের দায়িত্বে রয়েছেন। রাধানগর এমনিতেই বেশ গোলমেলে এলাকা। সমীরবাবু অতিশয় দক্ষ অফিসার বলেই তাঁকে ওই সেক্টরের দায়িত্ব রাখা হয়েছে। একেবারে শেষ মুহূর্তেও একটা গাড়ি ওঁকে না-দিলে ভদ্রলোক সেক্টরগুলো দেখেবুঝে নিতে পারবেন না। তাই—।

— সমীরবাবু’র অডাসিটিটা একবার দেখুন স্যার। পাশ থেকে পূর্ণবাবু বলে ওঠেন, ও-সি ভেহিকেল্‌কে না-জানিয়েই একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন !

আমি বহুকষ্টে হাসি চেপে ততোধিক ক্ষেপে উঠে বলি, তাই তো। অ্যালটমেন্ট ছাড়া সমীরবাবু গাড়ি নিয়ে যান কী করে?

— ওই গাড়ির ড্রাইভারটি শুনলাম ওর পাড়াতেই থাকে। পূর্ণবাবু তৎক্ষণাৎ বলে ওঠেন, সেই সুবাদে ওকে ম্যানেজ-ট্যানেজ করে ফেলেছে আর কি।

— সে কি! আমি উত্তেজিত গলায় বলে উঠি, পাড়ার ড্রাইভার বলে তিনি বিনা অ্যালটমেন্ট গাড়ি নিয়ে চলে যাবেন?

— চলে যাবেন কি, চলে গিয়েছেন, স্যার। পূর্ণবাবু প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন।

একটুক্ষণ গুম মেরে থেকে আলোকবাবুর দিকে রুষ্ট চোখে তাকাই আমি। বলি, এক্ষুনি একটা গাড়ি পাঠান। রাধানগর সেক্টর থেকে বাইশ-সাতাত্তরকে এক্ষুনি ফিরিয়ে আনুক। আর, ফিরলে-পরে সমীরবাবুকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবেন।

আলোকবাবু আমতা আমতা করে বললেন, গাড়ি পাঠিয়ে কি কোনও লাভ হবে, স্যার? সে গাড়ি কি সেক্টর-অফিসে বসে রয়েছে? সমীরবাবু হয়তো-বা এতক্ষণে বুথে-বুথে ঘুরছেন। আমাদের গাড়ি কোথায় খুঁজে বেড়াবে তাকে?

— ইলেকশনটাকে কেউ কেউ মওকা বলে মনে করে স্যার। পাশ থেকে বলে ওঠেন পূর্ণবাবু,— কোনওগতিকে একটা গাড়ি বাগিয়ে নিয়ে বেশ টো-টো করে ঘোরা হলো! ইলেকশনটা যে স্রেফ গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নয়, কবে যে এরা বুঝবে তা!

— এক কাজ করুন। আলোকবাবুর দিকে তাকিয়ে বলি, আপনি সমীরবাবুর বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দিন, তিনি যেন ফেরামাত্রই বাইশ-সাতাত্তরকে রিলিজ করে দেন। ওটা ফেরৎ পাওয়া মাত্র পূর্ণবাবুকে অ্যালট করে দিন।

আলোকবাবু আমতা আমতা করে বলেন, সমীরবাবু সম্প্রতি বাসা বদলেছেন, স্যার। ওঁর নতুন বাসাটা ঠিক জানা নেই আমার। তবুও দেখি কী করতে পারি।

আলোকবাবু একসময় বেরিয়ে গেলেন আমার ঘর থেকে। পিছু পিছু পূর্ণবাবুও। ঘর থেকে বেরিয়েই পূর্ণবাবু হাঁকডাক জুড়ে দিলেন। জনে জনে সমীরবাবুর নতুন বাসার ঠিকান জিজ্ঞেস করতে করতে সব্বাইকে একেবারে অস্থির করে তুললেন তিনি। এবং রাত ন’টা নাগাদ যখন অফিসের পঞ্চায়েত-পিয়ন বারীন ঘোষ সমীরবাবুর বাড়িতে খবরটা দিয়ে ফিরে এল, পূর্ণবাবু কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হলেন।

 

৭

 

পরের দিন সকাল ন’টা নাগাদ আলোকবাবু ও পূর্ণবাবু একসঙ্গে ঢুকলেন আমার ঘরে।

চেয়ারে বসেই আলোকবাবু উত্তেজিত হয়ে বলেন, আমাকে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিন স্যার।

— কেন, কী হল? আমি নড়েচড়ে বসি।

— কী করে দায়িত্ব পালন করবো বলুন? আলোকবাবুর চোখেমুখে জমাট ক্ষোভ, আমি একরকম ভেবে রাখি, কিন্তু অন্যেরা তা যদি পদে পদে ভেস্তে দেয়—!

— আরে, কী হয়েছে, বলবেন তো।

— দেখুন না স্যার, এত করে বলা সত্বেও বাইশ-সাতাত্তরকে সমীরবাবু রিলিজ করেননি!

সেটা তো আমি বিলক্ষণ জানি। গতকাল রাত বারোটা নাগাদ সমীরবাবু আমার বাসায় এসে রাধানগর সেক্টরের সমস্ত খবরাখবর জানিয়ে গিয়েছেন। সেখানে কয়েকটি বুথে সামান্য অব্যবস্থা রয়েছে। আমার নির্দেশেই তিনি আজ ভোর-ভোর আবার রওনা হয়ে গিয়েছেন বুথগুলোকে ঠিক করতে। কিন্তু তাও উপস্থিত ক্ষেপে উঠি আমি। বলি, বলেন কি! সমীরবাবু বাড়ি ফিরে আমার নির্দেশ পেয়েছিলেন?

আলোকবাবু বলেন, আমি সকালেই বারীনদাকে পাঠিয়েছিলাম সমীরবাবুর বাসায়। সে ফিরে এসে জানাল, সমীরবাবু নাকি কাল রাতে বাড়িই ফেরেননি। পাশেই বসে ছিলেন পূর্ণবাবু। চুপটি করে আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন তিনি। আলোকবাবুর শেষ কথাটা শোনামাত্তর অকস্মাৎ বোমার মতো ফেটে পড়লেন। বললেন, হুম্‌। বহুদিন বাদে একটা সরকারি গাড়ি পেয়েছে, আর কি বাড়ি ফেরে? ফুয়েল তো সরকারের। কাজেই, রাতভর গাড়ি চড়ে এন্তার হাওয়া খাও!

আমি পূর্ণবাবুকে শান্ত করবার চেষ্টা চালাতে থাকি। বলি, কিন্তু সমীরবাবু তো এমনিতে খুবই সিন্‌সিয়ার অফিসার। তাছাড়া, গাড়িটা পেয়েছেন বলে, রাতের খাওয়া-ঘুম কামাই করে কেউ কি রাতভর ঘুরে বেড়ায়? আমি ভাবছি অন্য কথা। ভাবছি, ওঁদের কোনও বিপদ-টিপদ হল না তো? গাড়িটা আতান্তরে গিয়ে বিগড়ে-টিগড়ে গেল না তো? যা দুর্গম জায়গা ওই রাধানগর এলাকাটা, কোনও অসুবিধেয় পড়লে খবর-টবর দেওয়াও ঝকমারি। দেখি, আর একটুক্ষণ অপেক্ষা করি। তারপর না হয় খোঁজখবর করা যাবে। কিন্তু উপস্থিত পূর্ণবাবুকে তো একখানা গাড়ি এক্ষুনি দিতে হবে। নইলে তিনি কাজ করবেন কেমন করে?

— আমি বলছিলাম কি স্যার—। আলোকবাবু বলেন, সেক্টরের জন্য তো আমাদের আরও একখানা গাড়ি পাওনা রয়েছে জেলা-অফিস থেকে। খবর পেয়েছি, সেটা নাকি আজ দুপুরের মধ্যে এসে যাবে —।

— সদরের কথায় ভরসা করে বসে থাকবেন না। আমি গলায় যৎপরোনাস্তি বিরক্তি ফুটিয়ে বলি, দশটা বাজলেই ফোন করুন সদরের ভেহিকেল অফিসে। বলুন, আমাদের প্রাপ্য একটা সেক্টর-ভেহিকেল যেন অবশ্যই বারোটার মধ্যে রিপোর্ট করে। নইলে কিন্তু আমার একটা ইম্‌পর্ট্যান্ট সেক্টর কাজ করতে পারবে না। তার দায় কিন্তু সদরকেই নিতে হবে। আমিও দেখছি, ফোনে এস-ডি-ও সাহেবকে পাই কিনা। তাঁকে দিয়েও একবার সদরকে বলাই।

— ঠিক আছে, স্যার। আলোকবাবু উঠে দাঁড়ান, আমি ঠিক দশটা বাজলেই ফোন করবো।

আমার উদ্যোগের বহর দেখে বুঝি সামান্য শান্ত হ’ন পূর্ণবাবু। ধীরপায়ে বেরিয়ে যান আলোকবাবুর পিছুপিছু। তখনই বুঝতে পারি, এর পর থেকে গাড়ি না-পাওয়া অবধি পূর্ণবাবু আঠার মতো সেঁটে থাকবেন আলোকবাবুর পাশে পাশে। এমনকি, দশটা থেকে তিনি আলোকবাবুর টেবিলের উলটোদিকটা দখল করে বসে থাকবেন সারাক্ষণ।

সেদিন বিকেলে আমাকে একটা মিটিংয়ে যেত হল সদরে। নির্বাচন বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ‘লাস্ট-মিনিট’স ইন্‌স্ট্রাকশন্‌স’ সারা বিকেল, সন্ধে জুড়ে শুনতে হল। মিটিং সেরে অনেক রাতে ফিরলাম। ফলে, পূর্ণবাবু সেই রাতে আর আমাকে ধরতে পারলেন না। কিন্তু বাসায় এসে তাঁর ‘মোস্ট আরজেন্ট’ নোট পেলাম। তার মর্মার্থ হল, যে-গাড়িটা সদর থেকে আসার কথা ছিল, সন্ধে আটটা অবধি তা রিপোর্ট করেনি।

রাত পোহালেই ম্যাটেরিয়াল ডিসট্রিবিউশন। ব্লক-এলাকার প্রায় শতাধিক বুথের সমস্ত ভোটকর্মী এসে জড়ো হবেন বিষ্ণুপুর হাইস্কুলের সামনের মাঠে। মাঠের একপ্রান্তে গোটা পঞ্চাশেক ট্রাক, বাস, ম্যাটাডর সারবন্দী দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাত পোহালেই মহাযজ্ঞ শুরু হবে। আমি তার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে নিতে রাত একটা নাগাদ বিছানায় গেলাম।

তার পোহাতেই সারা প্যাণ্ডেল-চত্বর জুড়ে হৈ-হৈ বেধে গেল। কাতারে কাতারে ভোটকর্মী এসে গিজগিজ করতে লাগলেন ডিস্‌ট্রিবিউশন-সেন্টারের সামনে। তাঁদের চিৎকারে, কলরবে, গর্জনে, হুঙ্কারে সবাইয়ের কানে তালা লাগবার জোগাড়। ওদিকে মাঠের মধ্যে শতাধিক ট্রাক, বাস, মিনিট্রাক, একসঙ্গে গর্জন জুড়ে দিল। ব্লকের কর্মীদের একেবারে নাভিশ্বাস অবস্থা।

বেলা একটা নাগাদ প্রায় সব ভোটকর্মী বাসে-ট্রাকে চড়ে মালপত্তর ও পুলিশসহ রওনা হয়ে গেলেন যে-যার বুথের উদ্দেশে। এতক্ষণে ব্লকের কর্মীরা একটুখানি দম ফেলবার সুযোগ পেলেন। এবার আর একটিমাত্র কাজ। সেক্টর-অফিসাররা যে-যার গাড়ি নিয়ে রওনা হয়ে যাবেন নিজেদের সেক্টর-অফিসগুলোর উদ্দেশ্যে। পরের দিন ভোট শেষ হলে পর, সমস্ত ভোটকর্মী ব্যালট-বাক্স নিয়ে ব্লক অফিসে পৌঁছনোর পর, সেক্টর-অফিসারদের ছুটি।

সামান্য কিছু শুকনো খাবার চোখেমুখে গুঁজে, নিজের ঘরে বসে, ও-সি ইলেকশন পুলকবাবুর সঙ্গে আগামীকালের জরুরি কাজগুলো একে-একে ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। এমনি সময়ে ঘরে ঢুকলেন পূর্ণবাবু। সারামুখে রাজ্যের ক্ষোভ ফুটিয়ে বললেন, আমাকে কি সেক্টর-অফিসে যেতে হবে, স্যার?

পূর্ণবাবুর কাঠ-কাঠ প্রশ্নে মনে মনে প্রমাদ গুনতে থাকি। সারা মুখে একরাশ বিস্ময় ও উদবেগ জড়ো করে বলি, সে কি, আপনি এখনও রওনা হননি?

সারা মুখে দ্বিগুণ ক্ষোভ ফুটিয়ে পূর্ণবাবু বলেন, আপনি হুকুম দিলে পায়ে হেঁটেই রওনা দিই।

শোনামাত্র আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, মানে? আপনাকে আলোকবাবু এখনও গাড়ি অ্যালট করেননি?

— গাড়ি পেলে কি স্যার এতক্ষণ এখানে থাকতাম? এসময় সেক্টর অফিসারদের যে কী গুরুদায়িত্ব, আমি কি আর জানিনে তা? সমস্ত ভোটকর্মী বুথে পৌঁছল কিনা, পথে কোনও টিমের গাড়ি বিগড়োলো কিনা, কালকের জন্য সব রকমের প্রস্তুতি নিল কিনা, তা সেক্টর-অফিসার ছাড়া আর কে দেখবে, স্যার?

— বটেই তো। এখনই সবকিছু দেখে না নিলে… পরে কোনও ডিস্‌লোকেশন হলে, এই কে আছ, আলোকবাবুকে জলদি আসতে বল।

একটুবাদেই আলোকবাবু হাজির। ওঁকে দেখামাত্র বোমার মতো ফেটে পড়ি আমি, এসব কী হচ্ছে বলুন তো আলোকবাবু? রাত পোহালে যজ্ঞি শুরু হবে, আর, একটা কমপ্লিকেটেড সেক্টরে আপনি একটা গাড়ি প্লেস করলেন না?

আলোকবাবু খুব বিপন্ন গলায় বললেন, কী যে বিপদে পড়েছি, স্যার! কাল থেকে সমানে সাধাসাধি করেও হেডকোয়ার্টার থেকে একটা গাড়ি পেলাম না!

ওই গাড়ি যে কোনওদিনই পাওয়া যাবে না, তা আমার চেয়ে বেশি আর কে জানে? এই ব্লক এলাকায় চিরদিনই পনেরোটা সেক্টর হয়। হেডকোয়ার্টারেও পনেরোটা সেক্টরের তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছি কবেই। সেইমতো পনেরোটি গাড়ি এসে গিয়েছে। এদিকে, স্রেফ পূর্ণবাবুকে কাজ দেবার জন্য আমিই ষোল নম্বর সেক্টরটা লোক্যালি বানিয়েছি। তার জন্য এক্সট্রা গাড়ি হেডকোয়ার্টার তো দেবে না। তার প্রয়োজনও নেই। ওই সেক্টরে মাত্র খান-পাঁচেক বুথ। সবগুলোই ব্লক অফিসের থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে। চিরকালই ব্লক অফিস থেকে অফিসাররা আনাগোনা করবার ফাঁকে ওগুলোকে দেখে যান, সব ঠিকঠাক চলছে কিনা। কেবল এই বছরই, স্রেফ পূর্ণবাবুর জন্যই, ওগুলোকে নিয়ে একটা পৃথক সেক্টর বানাতে  হয়েছে।

তাও আমি আলোকবাবুর দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকাই, তা একটা গাড়ি যে কম পেয়েছেন, এতক্ষণ আমাকে জানাননি কেন? কী যে করেন আপনারা!

বলতে বলতে আমি হেডকোয়ার্টারে ফোন লাগাই। সেখানে যিনি ভোটের গাড়িঘোড়ার দায়িত্বে রয়েছেন, তিনি আমার চেয়ে বছর-কয়েকের সিনিয়র হলেও আমার সঙ্গে খুব ভাব রয়েছে তাঁর।

ফোনে ওঁকে ধরেই আমি হামলে পড়ি। বলি, এটা কি হচ্ছে দাদা? আমাদের সেক্টর-অফিসগুলোর জন্য একটা গাড়ি কম দিয়েছেন কেন?

ওপ্রান্ত থেকে জবাব ভেসে আসে, কম দেবো কেন ব্রাদার? তোমার ব্লকের সেক্টর-অফিসের লিস্ট খুলে দ্যাখো, হিসেব মতো সব গাড়িই অলরেডি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

— না, পাঠানো হয়নি। একটা গাড়ি কম পাঠানো হয়েছে। আর, তার ফলে আমার ব্লকের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল সেক্টরের অফিসারই মুভ করতে পারছেন না।

— কিন্তু ব্রাদার, আমার তো যতদূর জানা আছে, তোমরা তোমাদের রিকোয়্যারমেন্ট মতো সব গাড়িই পেয়েছো। তাও তুমি যখন বলছ, আমি আমাদের রেকর্ড চেক করে দেখছি।

— হ্যাঁ, একটু জলদি দেখুন দাদা। আমাদের সবচেয়ে কমপ্লিকেটেড সেক্টরটাই একেবারে আনকেয়ার্ড-ফর রয়েছে। কতক্ষণের মধ্যে পেতে পারি?

— আরে, প্রথমে রেকর্ডটা চেক করতে দাও। যদি দেখি, তোমাদের একটা গাড়ি পাওনা রয়েছে, ঘণ্টা দু’তিনের মধ্যেই পেয়ে যাবে। 

— দু’তিন ঘণ্টা— ঠিক আছে। আমি ঘণ্টাটাক বাদে  আবার ফোন করব। মনে রাখবেন দাদা, আমাদের ব্লকের সবচেয়ে ভাল্‌নেরেবল সেক্টরটাই— ঠিক আছে, ঠিক আছে —। বলতে বলতে ফোন নামিয়ে রাখি আমি।  

যদিও ওপাশের কথাগুলো শুনতে পেলেন না কেউই, কিন্তু আমার জবাব দেবার ধরণ দেখে পূর্ণবাবুর বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ঘণ্টা দু’তিনেকের মধ্যেই তাঁর জন্য গাড়ি আসছে।

আলোকবাবুর দিকে তাকিয়ে বলি, এক ঘণ্টা অন্তর জেলার ভেহিকেল অফিসে ফোন করতে থাকবেন।

— ইয়েস, স্যার। বহু কষ্টে হাসি চেপে জবাব দেন আলোকবাবু।

— আর, একটা কাজ করুন। একটা, স্ট্যান্ডবাই গাড়ি দিয়ে পূর্ণবাবুকে তাঁর সেক্টর-অফিসে পৌঁছে দিন। তিনি প্রাথমিক কাজগুলো দেখেশুনে নিন। হেডকোয়ার্টার থেকে গাড়িটা এলেই একেবারে ট্যাঙ্কি ফুল করে পাঠিয়ে দেবেন ওঁর কাছে।

আলোকবাবু কাঁচুমাচু গলায় বলেন, স্ট্যান্ডবাই গাড়ি তো এইমুহূর্তে নেই, স্যার। দুটোমাত্তর বাড়তি স্মল ভেহিকল। তার মধ্যে একটা গেছে এস-ডি-ও অফিসে। কিছু স্টেশনারি নাকি কম পড়েছে। রামপ্রসাদবাবু ওগুলো আনতে গেছেন। আর একটা গাড়ি নিয়ে ক্যাশিয়ারবাবু গেছেন ট্রেজারিতে।

— তাহলে…তাহলে…। আমি ভাবনায় ডুবে যেতে থাকি। একসময় বলি, এক কাজ করুন। আমার গাড়িটা দিয়ে পূর্ণবাবুকে পাঠিয়ে দিন। তারপর…সদর থেকে গাড়ি এলে…, আরে মশাই, মানুষটাকে তাঁর ডিউটিটা করতে দেবেন তো? যান পূর্ণবাবু, এক্ষুনি রওনা হয়ে যান। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আশা করছি, ঘণ্টা  দু’তিনেকের মধ্যেই আপনি গাড়ি পেয়ে যাচ্ছেন।

সারামুখে আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব ফোটাতে ফোটাতে পূর্ণবাবু বেরিয়ে গেলেন।

ওঁর পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আলোকবাবু আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে এক ঝলক হাসলেন।

আমিও প্রত্যুত্তরে হাসলাম বটে, তবে গোটা ব্যাপারটাকে একটুও রেলিস করতে পারছিলাম না। একটা গাড়ির জন্য পূর্ণবাবুর সঙ্গে এতখানি ছলনার আশ্রয় নিতে খুবই খারাপ লাগছিল। কিন্তু উপায় তো নেই। সবাইকে এ্যালট করবার পর সাকুল্যে দুটোমাত্র ছোট গাড়ি অবশিষ্ট রয়েছে আমার হাতে। ওগুলো তো কোনোমতেই হাতছাড়া করা চলবে না। কারণ, যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো বুথে কোনোরূপ অঘটন ঘটলে পুলকবাবুদের ঝটিতি পাঠাতে হবে সেখানে। তাছাড়া, আমি তো জানিই, সম্ভবত পূর্ণবাবুও জানেন, তাঁর সেক্টরের পাঁচটি বুথ ব্লক-অফিসের এতটাই কাছে যে, সারাক্ষণ অফিসে বসেই ওগুলোর ওপর নজরদারি করা যায়। কিন্তু ভদ্রলোক সেটা বুঝলে তো! কাজেই, একপ্রকার বাধ্য হয়েই—। 

কালকের জন্য প্ল্যানিং- ট্যানিং সেরে সহকর্মীরা যে-যার বাড়ি ফিরে গেলেন, রাত ন’টা নাগাদ তপনকে নিয়ে বেরোলাম। নিয়মমতো, নিজের ব্লক-এলাকায় একপ্রস্থ চক্কর মারাটা দরকার। চারপাশে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা, তারই একটা আইডিয়া পেতেই এই বেরোনো। তবে, বেশি দূরে যাবার তো উপায় নেই। রাতটা পোহালেই শুরু হবে মহাযজ্ঞ। দিনভর চলবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুম্ভ-নিশুম্ভ’র লড়াই। কাজেই, একেবারে কাছাকাছি বুথগুলোতে একপাক চক্কর মেরেই ফিরতে হবে। বাড়িতে খেয়েদেয়ে দু’এক ঘন্টা ঘুমিয়েও নিতে হবে। নইলে, কালকের মহাযজ্ঞটিকে ঠিকঠাক সামলানো যাবে না। মনে মনে স্থির করেছিলাম, দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যেই বাড়ি ফিরবো।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর বিধাতা কপালে লিখে রাখেন অন্য। মানুষ যখন নিজের মতো করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তখন বিধাতা বুঝি অলক্ষ্যে মিটিমিটি হাসতে থাকেন।

ওই রাতে আমার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটল।

 

৮

 

আশেপাশের বুথগুলোতে একপ্রস্থ চক্কর মেরে বাসা’র দিকে ফিরছিলাম। রাত তখন আন্দাজ দশটা। শহরের লাগোয়া কাঁচা রাস্তা দিয়ে আমার গাড়িটা ধীরগতিতে ফিরছিল। আর, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমার বাড়ি পৌঁছে যাবার কথা। হঠাৎ নজর পড়ল দূরে। প্রায় কয়েকশো মিটার দূরে ফাঁকা মাঠের মধ্যিখানে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে রয়েছে।

এত রাতে ফাঁকা মাঠের মধ্যে গাড়িটা কী করছে? আমার ভুরুজোড়ায় অজান্তে মৃদু ভাঁজ পড়ে। হেডলাইটের জোরালো আলো দেখে মনে হচ্ছে, বাস কিংবা ট্রাকের আলো না হয়ে যায় না।

— ওই মাঠের মধ্যে কি কোনও রাস্তাঘাট রয়েছে, তপন? ড্রাইভার তপন রক্ষিতকে শুধোলাম।

তপন জবাব দেয়, একটা কাঁচা রাস্তা আদিবাসীদের পাড়ার দিকে গিয়েছে, স্যার।

— তো, ওই রাস্তায় ওই ধরনের বড় গাড়ি এত রাতে গিয়েছে কেন?

— আদিবাসীপাড়ায় তো বুথ রয়েছে, স্যার। একই স্কুলে দুটো।

— তা থাকতেই পারে, কিন্তু ভোটের লোকজন তো বিকেলের অনেক আগেই পৌঁছে গিয়েছে সেখানে। তারপর তো বাস বা ট্রাকের বুথে গিয়েই থাকবার কথা। কাল বিকেলের আগে তো কারোর নড়বারই কথা নয়।

তপন রক্ষিত ব্লকের পুরোনো ড্রাইভার। এসব ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা ঢের।

বলে, দূরের বুথগুলোতে ঠিকঠাক থাকে স্যার। কিন্তু শহরের এক্কেবারে লাগোয়া বুথের বাস বা ট্রাকগুলো রাতে পালিয়ে যায় বাড়িতে।

কেবল বাড়িতেই নয়, আমি জানি, শহরের লাগোয়া বুথগুলোতে ভোটকর্মীদের নিয়ে যেসব বাস-ট্রাক যায়, তারা কিছুতেই থাকে না বুথে। ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই হোটেল-ধাবা, মদের ঠেক, চাটের গুমটি। ওদিকে, খোরাকি বাবদ ব্লক থেকে পেয়েছে কিছু করকরে নগদ টাকা। এমন রাতে অন্ধকার বুথের সামনে ভূতের মতো রাত কাটানোটা ওদের একেবারেই পোষায় না। আলোর পানে যেমন পোকা ছোটে, ঠিক তেমনই  বাস-ট্রাকের ড্রাইভারগুলোও ছুটতে থাকে শহরের দিকে। সেখানে কোনও গুমটি-হোটেলে কিংবা ধাবায় মাংসের চাট দিয়ে আকণ্ঠ মদ খায়। তারপর একেবারে সুবোধ বালকবৎ যারা, বাড়ি গিয়ে ঘুম লাগায় পরের দিন বেলা অবধি। শহরের সিনেমাহলে রগরগে ছবির টানেও ঢোকে কেউ কেউ। কেউ-বা সখসাধ মেটাতে বেপাড়ার উদ্দেশেও রওনা দেয়। কখনও কখনও হোটেল, ধাবায়, অথবা বাজে-পাড়ায় স্ফুর্তি করতে গিয়ে নানা ধরনের হুজ্জতিতে জড়িয়েও পড়ে এদের কেউ কেউ। মারপিঠ, রক্তপাত, ভাঙচুর অবধি ঘটে যায়। এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে আমার আগের ব্লকে। বুথ থেকে উধাও হয়ে গেছে ড্রাইভারসহ বাহনটি। এমনকী, ভোটের পরও তার পাত্তা নেই। ওর অভাবে তিন-তিনটে টিম আটকে রয়েছে। খোঁজ-খোঁজ-খোঁজ… অনেক খোঁজাখুঁজির পর ট্রাকটিকে পাওয়া গেল একটি বেশ্যাপল্লীতে, আর ড্রাইভারকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল হাসপাতালে। সেই কারণেই, একবার বুথে পৌঁছে যাবার পর, একেবারে ভোটকর্মীদের নিয়ে ফিরে আসার আগে অবধি, কোনও বাস বা ট্রাকেরই বুথ ছেড়ে দু’কদমও বেরোনো বারণ। ড্রাইভিং-লাইসেন্স অবধি বাতিল করার ভয় দেখানো হয়েছে। সেক্টর-অফিসারদেরও কড়া নজর রাখতে বলা হয়েছে।

তপনের দিকে তাকিয়ে বলি, তুমি বলতে চাইছো, বাস বা ট্রাকটা—।

— বাসের নয়, স্যার। ট্রাকেরই আলো ওটা।

সেটাই সম্ভব। কারণ, শহরের অত কাছে কোনও বাস দেওয়া হয় না। বাস দেওয়া হয় সেইসব টিমকে, যারা বহুদূরের বুথে যাবে। অনেকক্ষণ জার্নি করতে হবে যাদের। কাছেপিঠের বুথগুলোতে তো চড়তে-না-চড়তেই নামার সময় এসে যায়।

বলি, ট্রাকই সই, কিন্তু আমি বলতে চাইছি, ভোটেরই গাড়ি তো এটা? এত রাতে ওই ফাঁকা মাঠের মধ্যে করছেটা কী? তাছাড়া, এত করে বলে দেওয়া সত্বেও ওরা রাতের বেলায় বুথ ছেড়ে বেরিয়েছে কেন?

সে কথায় তপন নিঃশব্দে হাসে। বলে, এইসব বাস-ট্রাকের ড্রাইভাররা যে কী পরিমাণ ডেসপারেট হয়, স্যার!

— আদিবাসীপাড়া তো ষোল নম্বর অর্থাৎ পূর্ণবাবুর সেক্টরের মধ্যে পড়ে। তিনি তো খুবই কড়া ধাতের লোক। তাঁর নজর এড়িয়ে তো পান থেকে চুন খসবার জো নেই।

তপন আবারো নিঃশব্দে হাসে, গুরুত্বপূর্ণবাবুও হয়তো ভাগল্‌বা, স্যার। হয়তো এতক্ষণে বাড়ি গিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন।

— অসম্ভব। আমি ঘনঘন মাথা নাড়াতে থাকি, উনি কিছুতেই সেক্টর-অফিস থেকে এক পা’ও নড়বেন না। সাধে কি আর ওঁর কলিগরা ওঁকে কর্মবীর আখ্যা দিয়েছে! আর, ওঁর চোখ এড়িয়ে কোনো ট্রাক রাতের বেলায় বুথ ছাড়বে, এটাও বিশ্বাস হয় না আমার।

হেডলাইটের আলোটা কিন্তু একটুক্ষণ জ্বলেই নিভে গিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা কেমন রহস্যময় লাগছিল আমার কাছে। ভোটের আগের রাতটা খুব গোলমেলে। কে যে এই রাতে কোন দুষ্কর্ম ঘটাবার তালে রয়েছে, কত রকমের স্যাবোটেজ যে হতে পারে!

একসময় বলি,  চলো তো, কাছে গিয়ে দেখি।

তপন গাড়ি চালিয়ে দিল আদিবাসীপাড়ার দিকে। একটুবাদেই বড় রাস্তা ছেড়ে গাড়ি ওই সরু কাঁচা রাস্তায় নামল।

খানিক এগোতেই আধো অন্ধকারে ট্রাকটাকে চেনা গেল। একটা ফুল পাঞ্জাব-বডি ট্রাক। রাস্তায় নয়, রাস্তা থেকে নেমে ট্রাকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে মাঠের মধ্যে। সামনের বনেটের পাশটিতে দাঁড়িয়ে একজন সমানে ঠুকঠাক করছে।

ট্রাকটার পাশে পৌঁছে রাস্তার ওপর গাড়ি থামায় তপন। ঠিক সেই মুহূর্তে ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে নেমে এলেন একজন। হনহন করে হেঁটে অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন আমার গাড়ির কাছটিতে। আর, তাঁকে দেখামাত্তর ভূত দেখবার মতো চমকে উঠলাম আমি।

পূর্ণবাবু!!

ওঁকে দেখামাত্র বলে উঠি, পূর্ণবাবু, কী ব্যাপার, এত রাতে ট্রাকটা মাঠের মধ্যে কী করছে? আপনিই-বা ট্রাকের মধ্যে বসে রয়েছেন কেন?

তার জবাবে অনেকক্ষণ ধরে পূর্ণবাবু যা বোঝালেন, তার মর্মার্থ হল, রাত ন’টা অবধি তাঁর জন্য কোনও গাড়ি না পৌঁছানোয়, বাধ্য হয়ে স্রেফ কর্তব্যের খাতিরে, তিনি বুথেরই একটা ট্রাক নিয়ে তাঁর সেক্টরের বুথগুলো ইন্সপেকশন করতে বেরিয়েছিলেন। ট্রাক-ড্রাইভার অবশ্য কিছুতেই যেতে রাজি হয়নি। পূর্ণবাবুই তাকে ধমক-চমক দিয়ে বাধ্য করেছেন। আদিবাসীপাড়ার দুটো বুথ দেখে ফেরার সময় ওই সরু কাঁচা রাস্তায় ট্রাকটা বেসামাল হয়ে মাঠের মধ্যে নেমে গিয়েছে। ট্রাকটাকে পুনরায় রাস্তায় তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে কোনও-একটা পার্টস বুঝি বিকল হয়ে গেছে। ট্রাকটাকে কিছুতেই নড়ানো যাচ্ছে না। ড্রাইভার তখন থেকে ট্রাকটাকে চালু করবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

দেখেশুনে একেবারে তাজ্জব হয়ে গেলাম আমি। পূর্ণবাবুর কাণ্ড দেখে রাগও হচ্ছে, অনুকম্পাও। মানুষটির চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তখনো অবধি খাওয়াদাওয়া কিছুই জোটেনি তাঁর।

একসময় বলি, ঠিক আছে, আপনি আমার গাড়িতে উঠে বসুন। আপনাকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিই।

— বাড়ি! আঁতকে ওঠেন পূর্ণবাবু, কী বলছেন, স্যার? ট্রাকটা মাঠের মধ্যে পড়ে রইল, কাল ভোটের পর ওটার দরকার হবে…, তাছাড়া, রাত পোহালে রাবণের যজ্ঞি শুরু হবে, সেক্টর অফিস ছেড়ে যাওয়া যায় নাকি?

বুঝলাম, জোর করে পূর্ণবাবুকে বাড়ি পাঠালে দুঃখে তাঁর বুক ফেটে যাবে। অগত্যা বললাম, ঠিক আছে, আমার সঙ্গে চলুন তো। আপনাকে কিছু খাইয়ে দিয়ে আবার সেক্টর-অফিসে পৌঁছিয়ে দেব। আর, এই ট্রাকের জায়গায় আর একটা ট্রাক প্লেস করবার জন্য আলোকবাবুকে বলে দিচ্ছি।

— কিন্তু এখনও অবধি দুটো বুথ যে দেখা হল না স্যার।

— ঠিক আছে, সে ব্যবস্থাও করছি। এখন আমার সঙ্গে চলুন তো।

যারপরনাই অনিচ্ছাসহকারে আমার গাড়িতে উঠলেন পূর্ণবাবু। আমারও আর বাসায় ফেরা হলো না। ওঁকে নিয়ে হাইস্কুলের মাঠে ফিরে এলাম। সামনের হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে দিলাম ওঁর জন্য। পাশের একটা ঘরে গিয়ে খেতে বসলেন পূর্ণবাবু। সেই ফাঁকে আলোকবাবুকে ডেকে বললাম, আমাদের দুটো স্পেয়ার গাড়ির থেকে এখনই একটা দিয়ে দিন পূর্ণবাবুকে।

আমার সিদ্ধান্তটা একেবারেই মনঃপুত হল না আলোকবাবুর। তাও আমতা আমতা করে বললেন, এখনই? কাল সকালে দিলে হয় না, স্যার?

— না, না, এখনই। পূর্ণবাবু এখনও অবধি দুটো বুথ ইনস্‌পেক্ট করতে পারেননি। তাছাড়া, কাল আমাকে পুরো ব্লকের ভোটটা করতে হবে তো। উনি একটা গাড়ি না পেলে, আগামীকাল আমাকে কাজই করতে দেবেন না। প্লীজ।

খাওয়াদাওয়া সেরে নিজের সেক্টরের গাড়িতে চড়ে পূর্ণবাবু পূর্ণোদ্যমে রওনা দিলেন বাকি দুটো বুথের উদ্দেশ্যে।

উনি চলে যেতেই আলোকবাবুর দিকে তাকালাম। বললাম, এই রাত একটার সময় পূর্ণবাবু বুথ দেখতে বেরোলেন! পাগলামো আর কাকে বলে!

আমার সামনেটিতে গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন আলোকবাবু। আমার কথার জবাবে বিড়বিড় করে বললেন, আমি ভাবছি, ওই বুথগুলোর প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের কথা। 

শুধোই, ওদের নিয়ে আবার ভাবনার কী হল?

— ভাবছি স্যার, কাল ওই দুটো বুথে নির্বিঘ্নে ভোটটা হলে হয়।

— কেন?

— বা রে, ওরা তো কালকের জন্য সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে, খেয়েদেয়ে এখন ঘুমোচ্ছে। রাত পোহালেই তো ওদের ওপর ঝড়ঝঞ্ঝা নেমে আসবে। আজ রাতে একটুখানি ঘুমোতে পারলে কাল ঝক্কিটা সামলাতে পারত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণবাবুর ইনস্‌পেকশনের ঠেলায় ওদের রাতের ঘুমটি তো মাটি হতে চলেছে। এখন তিনি গিয়ে সবাইকে ডেকেহেঁকে তুলবেন। সমস্ত ব্যবস্থাপনা খুঁটিনাটি বুঝবেন। সমস্ত কাগজপত্র আগাগোড়া মিলিয়ে দেখবেন…। বেচারাদের রাতের ঘুমটাই পণ্ড হবে। না, স্যার, আজ রাতেই ওঁকে একটা গাড়ি দিয়ে আপনি ঠিক করেননি।

— ঠিক বলেছেন আপনি। নিজের ভুলটা ততক্ষণে বুঝতে  পেরেছি আমি। বলি, ঠিক বলেছেন। গাড়িটা ওঁকে কাল সকালে দিলেই হত।

— তাহলে আমি রওনা দিচ্ছি, স্যার। আচমকা দরজার বাইরে পূর্ণবাবুর গলা।

আমি চমকে তাকাই, সে কি, আপনি এখনও যাননি?

— এই যাব, স্যার। গাড়িটা তেল ভরতে গিয়েছিল, ফিরল।

একটুক্ষণ ভাবলাম আমি। একসময় সারামুখে যারপরনাই দুশ্চিন্তা ফুটিয়ে বললাম, এদিকে একটা মহা সর্বনাশ হয়ে গেছে পূর্ণবাবু।

— আবার কী হল, স্যার?

— উলিয়াড়া সেক্টর থেকে ধনঞ্জয় গুহ এসেছিলেন। আমি তো ছিলুম না, এখন শুনছি, হিংজুড়ির একটা বুথে একশোটা ব্যালট-পেপার কম গিয়েছে। ভাগ্যিস আগের রাতেই ধরা পড়ল! নইলে কাল কী যাচ্ছেতাই কাণ্ড হত বলুন তো?

— সে কি? চমকে ওঠেন পূর্ণবাবু, দেখেশুনে দেয়নি কেন? স্বর্ণেন্দুবাবু তো ব্যালটপেপারের চার্জে ছিলেন।

বলতে বলতে সহসা গম্ভীর হয়ে ওঠে পূর্ণবাবুর মুখখানি। বলেন, এই কথাটাই আপনাকে বলতে চাচ্ছিলাম স্যার। ভোটের কাজের গুরুত্বটাই এরা বোঝে না। দে-সাহেবের আমলে আমি চিরকাল থাকতাম ব্যালট-পেপারের চার্জে। গত ভোটে এস-ডি-ও সাহেব বায়না ধরলেন, গোটা সাবডিভিশনের ব্যালট-পেপার সেকশনটা পূর্ণচন্দ্র কর্মকারকে দেখাশোনা করতে হবে। দে-সাহেব তো পড়লেন মহাবিপদে। আমাকে ছেড়ে দিলে তাঁর নিজের ব্লকের ব্যালট-পেপার সেকশন তো কানা হয়ে যাবে…।

— ধনঞ্জয়বাবু তো একশোটা ব্যালট-পেপার নিয়ে ফিরে গেলেন। পূর্ণবাবুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠি, কিন্তু আমি তো পড়ে গেলাম মহা সংকটে।

— কেন স্যার? পূর্ণবাবুর ভুরুতে ততক্ষণে গভীর ভাঁজ পড়েছে।

বলি, ধনঞ্জয়বাবুর থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর, ব্যালটপেপার রেজিস্টার খুলে দেখা গেল, বিসমিল্লাতেই গলদ।

— কী রকম?

— রেজিস্টারেই ওই বুথের এগেন্‌স্টে একশো ব্যালট-পেপার কম লেখা রয়েছে।

— সে কি! বিস্ময়ের যেন থই পাচ্ছিলেন না পূর্ণবাবু, কেমন করে ওটা হল?

— কেমন করে আবার, হিসেব কষতে গিয়েই ভুল করেছে। স্রেফ যোগে ভুল।

দু’চোখ আকাশের দিকে তুলে পূর্ণবাবু বলেন, বুঝুন তবে! কাদের ওপর আপনি এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন! আমি তো সব্বাইকে বলি স্যার যে, নির্বাচনটা ছেলেখেলা নয়। নট এ ম্যাটার অফ জোক। রীতিমতো এক্সপেরিয়েন্স লাগে। সেবারে এস-ডি-ও সাহেব…।

— আমার তো খুব ভয় করছে পূর্ণবাবু। ওঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলি, একটা বুথের বেলায় যখন ভুলটা ধরা পড়েছে, আরও কত বুথের বেলায় ওই রকমের ভুল করে রেখেছে, কে জানে! যদি কাল ভোট চলাকালীন আরও গাদাগাদা বুথ থেকে খবর আসতে থাকে, কিনা ব্যালটপেপার কম পড়েছে, কী হবে?

— ঠিকই তো স্যার। আমার চালটা ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন আলোকবাবু। বলেন, রেজিস্টারেই যদি ভুল হিসেব থাকে, তবে সদরে তো সেইমতো রিকোয়ারমেন্ট গিয়েছে, স্যার। সেই অনুসারেই তো ব্যালটপেপার এসেছে।

— তার মানে, তখন গাদাগাদা বুথ থেকে ব্যালটপেপার চাওয়া হবে, কিন্তু আমরা যেহেতু কম ব্যালটপেপার পেয়েছি, কাউকেই বাড়তি ব্যালটপেপার দিতে পারব না। সব বুথেই মাঝপথে ভোট বন্ধ হয়ে যাবে। কী সর্বনাশটা হবে তাহলে, বুঝতে পারছেন?

— তা আর পারছি নে স্যার? সেবার যখন এস-ডি-ও সাহেব—।

— এই বিপদ থেকে আপনি ছাড়া তো উদ্ধার করবার মতো কাউকেই দেখতে পাচ্ছি নে পূর্ণবাবু।

আমার কথায় একটুক্ষণ গাঢ় ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেলেন পূর্ণবাবু। একসময় শুধোলেন, স্বর্ণেন্দুবাবু কোথায়?

— তিনি তো খবরটা শুনেই নিজের সেক্টরে ফিরে গিয়েছেন। এতক্ষণে হয়তো সেক্টর-অফিসেই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন।

— এই সব ইর্‌রেসপনসিব্‌ল লোকদের আপনি কিনা এমন ভাইট্যাল সেকশনগুলোতে বসিয়েছেন! আগের ভোটে এই স্বর্ণেন্দুই তো বুথগুলোর জন্য ব্যাগে ব্যাগে স্টেশনারি ভরতে গিয়ে সবকিছু একেবারে গুবলেট করে দিয়েছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে সেটা ধরা পড়ায় দে-সাহেব আমাকে ধরলেন, কিনা, পূর্ণবাবু, আপনি এসে হাল না ধরলে—। ভেবে দেখুন স্যার, রাত পোহালেই সবাই মেটেরিয়্যাল নেবে, আগের রাতেই এই কাণ্ড। শেষ অবধি সারা রাত জেগে, প্রত্যেকটি ব্যাগ নতুন করে সাজালাম।

— এবারেও আপনাকেই হাল ধরতে হবে পূর্ণবাবু। নইলে আমার চাকরিটাই চলে যাবে। আমি কর্মচ্যুত হবো, এই আশঙ্কাটাই বুঝি পূর্ণবাবুকে অকস্মাৎ সিরিয়াস করে তোলে। বলেন, একটা গাড়ি নিয়ে আমি এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি স্যার।

ইস, এই ভদ্রলোক দেখি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না! শুধোই, গাড়ি নিয়ে কী করতে চাইছেন?

— বুথে বুথে ঘুরে দেখি, কোথায় কোথায় কম ব্যালটপেপার গিয়েছে। এখন বাজে দেড়টা। ভোট শুরু হতে এখনও ঘণ্টা ছয়েক দেরি আছে। দেখি এর মধ্যে কতটুকু-কি করা যায়। সেবারে তো সারা রাত ঘুরে আমি—।

আবার পূর্ণবাবুকে মাঝপথে থামিয়ে দিই। বলি,  বুথে বুথে ঘুরে করবেনটা কি? বুথে গিয়ে তো কেবল বোঝা যাবে, রেজিস্টার অনুযায়ী ওই বুথের জন্য কত ব্যালটপেপার পাবার কথা, এবং সেইমতো পেয়েছেন কিনা? রেজিস্টারেই যদি ভুল হিসেব কষা থাকে, বুথে গিয়ে সেটা বুঝবেন কেমন করে?

পূর্ণবাবু সম্ভবত বুঝতে পারেন ব্যাপারটা। মাথাটা অল্প অল্প দোলাতে দোলাতে সমর্থন করেন আমার যুক্তিটাকে।

বলি, আমার মতে, প্রথমে রেজিস্টারটাই চেক করে দেখা দরকার। কোনও বুথের ব্যালট-পেপারের হিসেবে ভুল রয়েছে কিনা। যেসব বুথের ক্ষেত্রে ভুল রয়েছে, সেগুলোতে নির্ঘাত কম বা বেশি ব্যালটপেপার গিয়েছে। তার জন্য সাকুল্যে আরও কত ব্যালটপেপার দরকার হবে, তাও জানা যাবে। আজ রাতের মধ্যে রেজিস্টারটা চেক করে ফেলতে পারলে ছবিটা ভোরের আগেই বেরিয়ে আসবে। কাল সকালে একটা গাড়ি করে সদরে গিয়ে বাড়তি ব্যালটপেপারগুলো নিয়ে এসে বুথে-বুথে পাঠিয়ে দিলেই চলবে। ব্যালটপেপার কম পড়লে ভোটের একেবারে শেষের দিকে পড়বে। অন্তত দুপুরের আগে তো নয়ই। তার মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা ম্যানেজ করা যাবে।

একটুক্ষণ গুম মেরে বসে রইলেন পূর্ণবাবু। একসময় বললেন, আপনি তাহলে বলছেন স্যার, প্রথমেই রেজিস্টারটাই চেক করে দেখা উচিত।

— হ্যাঁ তো। একটা বুথে টোট্যাল ভোটারের সংখ্যা, রাউন্ডেড আপ-টু-নেক্সট্‌ টেন, প্লাস টেন, এই তো ফরমুলা।

— জানি স্যার। অন্তত দশ বছর ব্যালটপেপার-সেকশন চালিয়েছি। সেবার যখন ডি-এম সাহেব আমাকে ডেকে বললেন—।

— তাহলে আর দেরি নয়। মাঝপথে পূর্ণবাবুকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠি, একশো-তিরিশটা বুথের আলাদা-আলাদা হিসেব। অনেকটা সময় লাগবে।

— তা তো লাগবেই স্যার। তবে, হিসেবটা করবে পূর্ণচন্দ্র কর্মকার। সেবার যখন আচমকা    অবজার্ভার সাহেব আমাকে ডেকে ব্যালটপেপার হিসেব করবার ফর্মুলাটা জানতে চাইলেন—।

— তাহলে আলোকবাবু, ব্যালটপেপার সেকশনটা খুলিয়ে কাগজপত্র, রেজিস্টার সবকিছু গুছিয়ে দিতে বলুন পূর্ণবাবুর সামনে। আমাকে আবার দ্বারিকা’র দিকটাতে একবার যেতে হবে। ওখানে নাকি কীসব ঝামেলা হয়েছে। আপনিও আমার সঙ্গে যাবেন নাকি? এতরাতে, একলা, অতদুর পথ…।

— যেতে পারি, স্যার। আজ তো এমনিতেই বাড়ি ফেরা হবে না।

— ঠিক আছে, স্যার। পাশ থেকে আমাদের উদ্দেশে তাড়া লাগান পূর্ণবাবু, আপনারা রওনা হয়ে যান, কাল সকালের আগে যেভাবেই হোক, হিসেবটা শেষ করে ফেলছি আমি।

বলতে বলতে ব্যালটপেপার সেকশনের দিকে ভারী ভারী পা ফেলে এগোতে থাকেন পূর্ণবাবু।

গাড়িতে উঠে তপনকে বললাম, প্রথমে আলোকবাবুকে ওঁর বাড়িতে নামিয়ে দাও। তারপর আমাকে নামাবে।

আলোকবাবু খুব হালকা গলায় বলে ওঠেন, যাক বাবা, বুথদুটোর লোকজনকে অন্তত রাতের মতো ঘুমোতে দেওয়া গেল।

বাড়ি ফিরবার বেলায় মনটা খুব ভারী হয়ে আসছিল আমার। একটা অকর্মা মানুষকে, মনে কষ্ট না দিয়েও, পুরো ভোটের কাজ থেকে কার্যত সরিয়ে রাখতে গিয়ে, এত-এত ছলনার আশ্রয় নিতে হল আমায়! কিন্তু সেটা করতে গিয়ে নিজের মনের কষ্টটাও বেড়ে গেল যে! এই মুহূর্তে নির্ঘাত পূর্ণবাবু ব্যালটপেপার সেকশনে বসে হিসেবের মধ্যে বুঁদ হয়ে রয়েছেন। এবং আমি নিশ্চিত, আজ রাতে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করবেন না মানুষটি।

ভাবতে গিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছিল বটে, তবে তার মধ্যেও একটা অন্তত সান্ত্বনা পাচ্ছিলাম মনে মনে। এমনিতেই তো পূর্ণবাবু আজ রাতে চোখের পাতা এক করতেন না। রাতভর বুথগুলোতে গিয়ে ঘুমন্ত ভোটকর্মীদের জ্বালিয়ে মারতেন। তার চেয়ে এটাই বরং ভালো হল। মাঝরাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ পেয়ে গিয়ে মানুষটা এখন গুমোরে ফুলছেন। বাস্তবিক, এমন একটি কাজ দিয়ে মানুষটার মনের যাবতীয় কষ্ট শুষে নেওয়া তো গেল। ওই খুশিতেই আজ রাতভর মশগুল থাকবেন মানুষটি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *