রম্যরচনা
বৈশাখী ঠাকুর
নিঃশব্দে একটা বিপ্লব ঘটে গেল সমাজে। কোন রাজনৈতিক রঙ নেই তাতে। তাই রঞ্জিত বা অতিরঞ্জিত হয়েও কোথাও সে খবর ছাপা হল না। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন তর্ক তর্জা নেই। এই ব্যাপারে যেন সবাই এক মত। যেন রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে সবাই লাল জল হাতে এক মত পোষণ করে চলেছে। কোন মত বিভেদ এই নিয়ে থাকতেই পারে না। ছোটবেলায় সেই হরলিক্সের বিজ্ঞাপনের মত— এই একটা বিষয়ে সবাই একমত। বেশি সাসপেন্স বজায় রাখা কোন কাজের কথা নয়। অনেকেরই বিপি হাই আছে। খোলসা করে বলে ফেলাই ভাল। তা সেই চুপিসারে বিপ্লবটি হচ্ছে আধুনিক সমাজে ওয়েট লসের বিপ্লব। চারিদিকে নজর করলেই দেখা যায় ওজন কমানোর হুড়োহুড়ি। গোদা বাংলায় রোগা হওয়ার তুমুল হিড়িক।
সে রুপোলী পর্দার দীপিকা পাড়ুকোন, ক্যাট্রিনা, কারিশ্মা হোক বা কর্পোরেট সেক্টরের দেবাশা, মুসকান, নাতাশা হোক বা পাড়ার পিঙ্কি, মলি, রিয়াই হোক না কেন!
সেই বিজ্ঞাপনে শুধু মুখ ঢেকে যায় না— সর্বাঙ্গ ঢেকে যায়। তিন মাস, এক মাসের ক্র্যাশ কোর্স মায় সাত দিন, পাঁচ দিনের কোর্সও আছে নিজেকে মেদহীন, তন্বী করে তুলে ধরার জন্য আগামী কোন বিশেষ দিন, বিশেষ উৎসবের জন্য। বিশেষ করে দুর্গা পুজোর আগে তো কথাই নেই! দুয়ারে বিপ্লব! আর যদি কোন এক ফাঁকে সেই ইচ্ছে প্রকাশ হয়ে যায় তাহলে ছিনে জোঁকের মত পেছনে পড়ে থাকবে রক্ত (পয়সা) চোষার জন্য সেই সব সংশ্লিষ্ট সংস্থা। ফাঁদের সে বিবিধ আয়োজন!
তা সেই বিপ্লবীরা নিজেদেরকে কোন এক দুর্গম, সর্পিল, দুরূহ যাত্রাপথের সঙ্গী মনে করে। পথ বড় পিচ্ছিল। আকাশে বাতাসে খাবারের সুগন্ধ পেলেই হড়কা বানের মত ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা। উলটে এখানে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই—ম্যান মেড না ন্যাচারাল? ডিভিসি জল ছেড়েছে নাকি ফারাক্কার লক গেট খুলে দেওয়া হয়েছে! নিজের ছাড়া কারুর দায় নেই। কোন স্নিফার ডগ, রেসকিউ টীম আসবে না। কোন চ্যানেলের বাইটও কপালে জুটবে না! শুধু তাই নয়, বড় রেস্তোরাঁর সামনে দিয়ে গেলেই নিজেকে খাবারের গোলকধাঁধায় হারিয়ে ফেলার প্রবল সম্ভাবনা। বিপদ সংকুল পথে বড় সাবধানে পা ফেলতে হয়! বিরিয়ানি-চিকেন চাপ, বাসন্তী পোলাও-মাটান কষা, ফ্রাইড রাইস-চিলি চিকেন, নবরত্ন পোলাও-শাহী পনির, নান-রেজালা, কাবাব-কোরমা, রোল চাউমিন, চপ-কাটলেট, ফ্রাই-মোগলাইয়ের অলি গলিতে অসহায়ের মত ঘুরে সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়েছ কি মরেছ! না না স্কুইড গেমের মত একেবারে মৃত্যু নয় — ওই ফের তখন শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। ক্রেডিট পয়েন্ট জিরো। রবার্ট ব্রুস বেঁচে থাকলে আজ আর মাকড়সা দেখে অনুপ্রাণিত হতেন না, হতেন এই সব দুর্গম যাত্রাপথের বিপ্লবীদের দেখে। কিভাবে বার বার হড়কে গিয়ে, পিছলে গিয়েও অটল তারা তাঁদের লক্ষ্যে। সংযমের এমন দৃষ্টান্তে বড় বড় মুনি ঋষিদেরও প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দিতে পারে। কথাতেই আছে – পেটের বালাই, বড় বালাই। সেই বালাইকেই যদি সামলে চলা যায় তাহলে যাত্রাপথ সুগম হতে বাধ্য। নিন্দুকেরা যা যাই বলুক, এমন সংযমের পথে হাঁটলে মনুষ্যজাতির জয়যাত্রা রুখবে কে!
কিন্তু সে কথা ফুলকাকিমা মোটেই বোঝেন না। তাঁর নাতনি রণিতাও সেই যাত্রা পথে সামিল। অদৃশ্য ঝান্ডা হাতে নিয়ে সে “কদম কদম বড়ায়ে যা” করে চলেছে। অনন্ত পথের যাত্রী। আজ সে কলেজ থেকে ফিরে এসেছে তাড়াতাড়ি। মুখটা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। ফুলকাকিমা বললেন,
—–আহা! রোদে তেতে পুড়ে ফিরেছিস। একটু পাখার তলায় আরাম করে বোস দেখি। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই! ফুলকো ফুলকো দুটো লুচি ভেজে দিই। সাথে সাদা সাদা আলুর চচ্চড়ি। পেট পুরে খা।
—-না—আ—আঁ—আ… এমন একটা চিৎকার করল গোল্লা গোল্লা চোখ নিয়ে বিপ্লবী রণিতা যে ফুল কাকিমার নিজেকে দুশমন শিবিরের গব্বর সিং ছাড়া আর কিছু মনে হল না। অথবা উগ্রপন্থী। নিদেন পক্ষে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার হবেও বা! না জানি কী গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন তিনি!
—- থাম্মা, তুমি জান না! আঁতকে উঠল সে। আমি ওয়েট লস জার্নিতে আছি।
—- তুই তো আমার সামনে আছিস। কোথায় কি জার্নি করছিস? কোথাও গেলে অবশ্য মানুষ একটু পেট ঠিক রাখার পরিকল্পনা করে বইকি! তা তুই যাচ্ছিসটা কোথায়?
—- শরীর সারাতে।
—- তা আমাদের সময় অবশ্য লোকে পশ্চিমে যেত শরীর সারাতে। ফিরত যখন ওখানকার জল হাওয়ায় যা সুন্দর স্বাস্থ্য নিয়ে আসত না যে কী বলব! গাল ফুলে, গায়ে গতরে পুরে সে যেন এক অন্য মানুষ!
ততক্ষণে রণিতা একটা বাটিতে টক দই ঢেলেছে। তার ওপর প্যাকেট থেকে গোলমরিচ ঢালল বেশ অনেকটা। এবার ফুলকাকিমার আঁতকে ওঠার পালা।
— ও কি করছিস! এত গোলমরিচ কেউ ঢালে নাকি!
—- গোলমরিচ নয়। এটা চিয়া সীডস। চিয়া শুনে যে ফুলকাকিমার জিয়া ঘাবড়িয়েছে — এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। চশমা পরে কাছে এসে দেখে বলল,
—- এই ধুলোময়লার মত জিনিসগুলো খেলে কি হয়?
—- ধুলোময়লা! কি বলছ তুমি? এগুলো হচ্ছে সুপার ফুড। এদেশে হয় না গো। মেক্সিকো, লাতিন আমেরিকায় এদের চাষ হয়। এগুলো খেলে ওজন নিয়ন্ত্রনে থাকে। রোগা হয়। শুধু রোগা নয়, শরীর স্বাস্থ্য ভাল হয়, প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি আসিড আছে। আরো অনেক কিছু আছে গো, থাম্মা। এই যে তোমার এত পায়ে ব্যথা। তুমিও যদি ওজন কমাও তোমার অনেক রোগ সেরে যাবে।
অবাক হয়ে শুনছিলেন তিনি। এ যাবৎ সুপারম্যান, সুপারউম্যান, সুপারস্টার, সুপারন্যাচারাল পর্যন্ত শুনেছেন কিন্তু তাই বলে সুপারফুড! সম্বিত ফিরে পেয়ে বললেন,
—- সত্যি বলছিস!
—- হ্যাঁ, শরীরের সমস্ত ওজন তো পা দুটোকেই বহন করতে হয়, তাই না। ওজন কমলে পা জোড়ার ওপর প্রেশার পরবে কম। তাই পা দুটো ভাল থাকবে। কথাটা বেশ মনঃপূত হল ফুলকাকিমার।
—– এর পর রাতে কি খাবি?
—- মিলেটের কিছু বানিয়ে নেব।
—- মাছের ফীলেট জানি, মিলেট আবার কী?
—- বাজরা, জোয়ার, রাগি।
—- বাব্বা! এইসব বাঙালির রান্নাঘরে কখনও ঢুকেছে নাকি!
—- বাঙালি – অবাঙালি আবার কী! মানুষের শরীরের জন্য যা ভাল—তাই মানুষ খাবে।
হক কথা! খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে এরকম সাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনা একেবারেই ভাল না। মনে মনে লজ্জিত হলেন ফুলকাকিমা।
—- তা এইসব জিনিসের দামও তো তেমন আছে।
—- যে কোন ভাল জিনিসের দাম আছে, থাম্মা।
মৃদু মৃদু ঘাড় নাড়েন তিনি। অব্যর্থ বলেছে তাঁর নাতনি। বিপ্লবী রণিতাকে এই ব্যাপারে সাহায্যের হাত এগিয়ে দেবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন ফুলকাকিমা।
নিজেকে প্রস্তুত করার জন্যে খবরের কাগজ, ম্যগাজিন, মোবাইল, টিভি সব কিছু থেকে জ্ঞান আহরণ করতে শুরু করলেন জরুরি তৎপরতায়।
এক সপ্তাহ বাদে
—- ও রনি, ওঠ। ওঠ মা। আমাদের দুজনের জন্য স্পেশাল চা বানিয়েছি। ফুলকাকিমা ওরফে রণিতার থাম্মা চাটা বেশ ভালই বানায়। দুধ চা হলে এলাচ লবঙ্গ দিয়ে কি সুন্দর গন্ধ ভুরভুর করে। নাহলে লেবু চাটাও জম্পেশ করে। একটু আগ্রহ নিয়ে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে রণিতা দেখল থাম্মা লেবু চিপে তাঁদের দুজনের চায়ে দিচ্ছে। মনে মনে ভাবল—তাহলে লেবু চা। অনেকদিন খাওয়া হয়নি, থুরি পান করা হয়নি বটে! কিন্তু চুমুক দিতেই তাঁর অভিব্যক্তি দেখে ফুলকাকিমা বললেন,
—- যাত্রাপথের চা রে পাগলি।
—- একদম বাজে কথা বলবে না। ট্রেনে বাসে ট্রামে এর থেকে ঢের ভাল চা বানায়। যাত্রাপথে চা খেতে আমার খুবই ভাললাগে। এটা কি চা বানিয়েছ তুমি?
—- ওয়েট লস জার্নির চা। অ্যান্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর। দিনটা শুরু করতে বলেছে এরকম একটা স্বাস্থ্যকর পানীয় দিয়ে। ভুলে গেলে কমরেড।
—- তা কি দিয়ে এই চাটা বানিয়েছ তুমি?
—- গোটা জিরে, গোটা মৌরি, গোটা ধনে, দারচিনি, মেথি দানা, জোয়ান—
—- চা ছাড়া রান্নাঘরের তাকে সমস্ত মশলা দিয়ে দিয়েছ তো! ঘাড় নেড়ে পরিতৃপ্তির হাসি ছড়িয়ে গেল ফুলকাকিমার ঠোঁটে। উদ্ভাসিত মুখমন্ডল। যেন আলোর পথযাত্রী!
—- আজ থেকে আমিও তোর যাত্রাপথের সঙ্গী যে! একটু ঢোঁক গিলল রণিতা।
— তা জলখাবারে কি বানাবে?
—- রাগির রুটি আর দই। অথবা ওটসের মত সুপারফুডও খেতে পারিস।
—- তুমি পারবে খেতে? আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল রণিতা।
—- পারতে হবে কমরেড। লুচি পরোটা, পোলাও কোর্মা সব শহিদ হয়েছে। তাঁদের একটা স্তম্ভ বানিয়ে আমাদের এই খেয়ে দিনানিপাত করতে হবে। করতে হবে। করতে হবে।
আচমকা সেই সব সুস্বাদু খাবারের কথা ভেবে এবং তাদেরকে বিলুপ্তির পথে যেতে হচ্ছে দেখে রণিতার যেন চোখ ফেটে জল চলে এল। চামচে ভরা জলের মত টলটল করে উঠল তাঁর চোখ জোড়া। থাম্মার হাতের কিমার পরোটা, পিঠেপুলি পায়েস, ইলিশ ভাপা –এই সব চিন্তা করে বিরহী যক্ষীর মত তাঁর বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। আড় চোখে ফুলকাকিমা দেখে বলল,
—- শহীদদের উদ্দেশ্যে চোখের জল ফেলা উচিত বইকি! তাদেরকে স্মরণ করাও আমাদের অবশ্য কর্তব্য। প্রাতঃস্মরণীয় তারা। রণিতার সত্যিই মনে হচ্ছিল মাঝে মাঝে প্রাতঃরাশে লুচি আর সাদা সাদা আলুর তরকারিকে স্মরণ না করে সে থাকবে কি করে! থাম্মা যাত্রা পথের সঙ্গী হয়ে এবং তাঁর তুমুল উৎসাহ দেখে সেসব কিছু আর মুখে আনতে সাহস হল না। এদিকে থাম্মা বিপ্লবের পথ অনুসরণ করে অত্যুৎসাহী হয়ে টগবগ করে ফুটছে সারাক্ষণ। থাম্মার এই পরিবর্তন দেখে বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগল রণিতার। মোচা চিংড়ি, কচি পাঁঠার ঝোল,চিতল মাছের মুইঠ্যা, পটলের দোলমা— সব ইতিহাস হয়ে গেল! হায় হায়!
সে দেখতে পাচ্ছিল থাম্মার এক মুঠো করা অদৃশ্য হাত যেন শূন্যে উঠে বলতে চাইছে—ইনকিলাব, জিন্দাবাদ। কমরেড তোমার সাথে আছি। সাথে থাকব। আজীবন। লাল সেলাম।
সেই সব সুস্বাদু শহীদদের কথা চিন্তা করে, আর থাকতে না পেরে রণিতা ভ্যা—অ্যা করে কেঁদে ফেলল অবশেষে।
ফুলকাকিমা কিন্তু তখনও বৈপ্লবিক সুপারফুডের রেসিপি নিয়ে ভীষণ রকম ব্যস্ত!
