ফিল্ম রিভিউ
সুরশ্রী ঘোষ সাহা
আপনাকে যদি একটা দামী ও সুন্দর গাড়ি ক’দিনের জন্য দিয়ে বলা হয়, নিন, আপনি এবার খুব বড় অপূর্ব সুন্দর যাত্রায় বেরিয়ে পড়ুন দেখি!
আচ্ছা, আপনি কোথায় যাবেন? আপনার কি মনে হয়, সত্যিই এমন ভাবে বেরিয়ে পড়ার জন্য পৃথিবীতে অনেক ভাল ভাল জায়গা আছে? আসলে সুন্দর জার্নির সংজ্ঞা কী?
নাহ্, প্রশ্নের হেঁয়ালি ছেড়ে ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলি। জানেন তো, নিজের অতীতের কাছে যাওয়া ছাড়া, পুনরায় ফেলে আসা জীবনকে ছুঁয়ে দেখার মতো সুযোগ পাওয়া ছাড়া আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই বিগ বোল্ড বিউটিফুল জার্নি বলে মনে হয় কিছুই নেই। যদি সম্ভব হত আমরা প্রত্যেকেই জীবনে একবার অন্তত অতীতে ফিরতে চাইতাম।
আর এমনটাই আমাদের দেখাতে ও বোঝাতে চেয়েছেন, লেখক সেথ রেইস ও পরিচালক কোগোনাডা।
২০২৫ সালের একেবারে শেষের দিকে নেটফ্লিক্সে এসেছে “আ বিগ বোল্ড বিউটিফুল জার্নি” নামে এক ছবি। যা একটি আমেরিকান রোমান্টিক ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র। ছবিতে অভিনয় করেছেন মার্গট রবি, কলিন ফারেল, কেভিন ক্লাইন এবং ফোবি ওয়ালার-ব্রিজ।
এই ছবির গল্পের বিষয় ভীষণই আশ্চর্যজনক রকমের সুন্দর। প্রেমের গল্পও যে এমন হতে পারে তা এই ছবি মনোযোগ সহকারে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। ছবিতে দেখা যায়, প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে অথবা যাকে বলা যায় ভাগ্যের এক অপ্রত্যাশিত মোড়ে এসে অপরিচিত ও অবিবাহিত দুই নারী – পুরুষ সারাহ এবং ডেভিড তাদের নিজ নিজ অতীতের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ পায়। কাহিনির নায়ক-নায়িকা দু’জনেই একই ‘কার রেন্টাল এজেন্সি’ থেকে গাড়ি ভাড়া করে নিজের মতো সোলো ট্রিপে যাবে ব’লে। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন অনুযায়ী পথে সারাহ’র গাড়ি চালু না হলে একটাই গাড়িতে দু’জনে বেরিয়ে পড়ে কিছু নতুন অ্যাডভেঞ্চার জড়ো করতে। আমরা এও দেখি, এজেন্সি প্রায় জোর করেই ডেভিডের গাড়িতে যে জিপিএস বসিয়ে দিয়েছে, তার দ্বারাই তারা পুরোপুরি পরিচালিত।
পরিচালক এভাবেই আমাদেরও যেন তাঁর জিপিএসের আওতায় ঢুকিয়ে ফেলেন আর এগিয়ে নিয়ে চলেন, কাহিনির নতুন যাত্রাপথে। যেখানে পথে পড়ে একটা ক’রে নতুন নতুন দরজা। যে দরজা খুললেই ঢুকে পড়া যাবে ছেড়ে আসা অতীতের ঘরে। সারাহ ও ডেভিড সেভাবেই একটার পর একটা দরজা খুলে ঢুকে পড়ে কখনো কৈশোরের পছন্দের সমুদ্র তীরবর্তী লাইট হাউজের কিনারায়, কখনো মিউজিয়ামে, কখনো হাইস্কুলের মিউজিক কনসার্টে, কখনো হাসপাতালে জারার মৃত মাকে দেখতে কিংবা ডেভিডের জন্মলগ্নের মুহূর্তে তার উদ্বিগ্ন পিতার কাছাকাছি। সকল দৃশ্যেই অতীত বড় নাড়া দেয় আমাদের। আর এটাই স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, অতীত চিরকাল ছায়ার মতো থেকে যায় বর্তমানের পিছনে। স্মৃতির দরজা খুললেই হুটপাট যেখানে ঢুকে পড়তে পারি আমরা সবাই।
কিন্তু হায়! আর নতুন করে বদলে ফেলা যায় না অতীতের কোনকিছুই। অতীত স্থির অনড় থাকে চিরকাল। হাইস্কুলে থাকতে ঠিক ১৫ বছর বয়সে যে মেয়েটিকে ডেভিড প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল কনসার্টের শেষে, দীর্ঘ চল্লিশ বছর বয়স পার করে হবহু এক হয়ে থাকা অতীতে ফিরে পুনরায় সুযোগপ্রাপ্ত ডেভিড আবার সেই পছন্দের মানুষটিকেই ভালবাসার কথা বলতে চেয়ে দেখে, কিছু কি অন্য উত্তর আসবে এবার?
কিন্তু না। কৈশোরের প্রেম আবারো প্রত্যাখ্যাত হয়, আবারো ছিঁড়েখুঁড়ে দেয় ডেভিডের প্রেমিক হৃদয়। একইরকম ভাবে সারাহও পারে না তার মায়ের মৃত্যুর সময়ে হাসপাতালে পৌঁছতে।
‘আর’ রেটেড এই ছবিতে কিছু গালাগাল, একটিবারের চুম্বন দৃশ্য ও “আমি তখন আমার অধ্যাপকের সঙ্গে ঘুমাচ্ছিলাম” সারার মুখের এমন বাক্য ছাড়া যৌনতার ছোঁয়া কিছুমাত্র নেই। এই ছবি সপরিবারে বসে দেখার জন্যই তৈরি।
এই ছবির মাধ্যমে লেখক পরিচালক আমাদের এটাও দেখাতে চান, যে, জীবন অভিজ্ঞতা ও বেশি বয়স মানুষকে কতখানি বিজ্ঞ করে তোলে। আগামীকালকে নিয়ে ও পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে দুশ্চিন্তা তাই বারবার সারাহ ও ডেভিডের মুখের নকশা বদলে দেয়। একে অপরের প্রেমে পড়েও তাকে স্বীকার করে এগিয়ে চলা যে কত কঠিন তা বোঝা যায়।
তবুও প্রেমেরই জয় হয়। জার্নি শেষে ডেভিড গাড়িটি এজেন্সিতে ফেরত দেয়। ক্যাশিয়ার এবং মেকানিককে মজা করে বলে, যে, তারা তাদের আত্মার বন্ধুদের সঙ্গে গ্রাহকদের মেলাচ্ছে আর তার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। অপরদিকে মন পরিবর্তন করে সারাহও। ডেভিডের ঠিকানায় আসে সে এবং স্বীকার করে, সে তাকে ভালোবাসে। একে অপরকে চুম্বন ক’রে তারা সামনের দরজা দিয়ে একসাথে হেঁটে যায়।
এক ঘন্টা ঊনপঞ্চাশ মিনিটের জার্নি শেষে দর্শকেরও উপলব্ধি হয়, এমন অসংখ্য দরজা আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই আছে। শুধু আমরা ভয়
