ফিল্ম রিভিউ
সুরশ্রী ঘোষ সাহা
মা… আমাদের প্রত্যেকের জীবনে মায়ের ভূমিকা যে কী, মাতৃহারা জীবন যে কেমন, তা আমরা কম বেশি সকলেই জানি। তবে, সবাই হয়তো এটা জানি না, এই দুনিয়ায় জন্মে থেকে কোনরকম শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার যে মানুষ, সেই মানুষটা যখন মাতৃহারা হয়ে পড়ে, তারপর তার কোন্ মর্মান্তিক করুণ অবস্থা হয়!
নধর তেমনই এক মানুষ। যার জীবনকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘নধরের ভেলা’ ছবিতে।
প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার। ওঁর নির্মিত ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-ও একসময় আমার পছন্দের তালিকার প্রথম সারিতে ছিল। এবার ‘নধরের ভেলা’ ছবিটি তৈরি করেছেন তিনি। গতিময়তাই তো জীবন – চিরকালীন এই আপ্তবাক্যের উল্টো স্রোতে হেঁটে স্লথ জীবনের গান কেমন হয় তা শুনিয়েছেন।
পাশাপাশি এক যুগান্তকারী ঘটনাও ঘটিয়ে চলেছেন সমানে। যা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটছে। সেটি হলো, ছবিটি কোথাও হল-রিলিজ হয়নি। নানা শহরে গিয়ে সেখানকার কোন মঞ্চ, লাইব্রেরী কিংবা স্টেজে পর্দা টাঙিয়ে দর্শকদের সামনে পরিবেশিত হচ্ছে। যা দেখে সত্তর – আশি দশকের মানুষজনের শৈশবের স্মৃতি ফিরে আসতে বাধ্য। পাড়ার ক্লাবে, খোলা মাঠে পর্দা টাঙিয়ে যেমন ভাবে ছবি দেখানোর চল ছিল কোনো এক সময়ে, ঠিক তেমনি। এক্ষেত্রে যদিও বাড়তি কিছু পাওনা আছে। যেটি হলো, ছবিটি দেখার আগে দর্শক টিকিট কাটতে পারছে সিনেমার পরিচালক – কলাকুশলী ও স্বয়ং সঙ্গীত শিল্পীর হাত থেকে।
আমি মৃণাল সেনকে দেখিনি, সত্যজিৎ রায়কেও দেখিনি, কিন্তু বুক বাজিয়ে চিরকাল বলতে পারব, অসম্ভব মাটির মানুষ নিরহঙ্কার পরিচালক – প্রযোজক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যকে সামনে থেকে দেখেছি। তাঁর হাত থেকে টিকিট কেটেছি। সিনেমা দেখে সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চোখে জানিয়েছি আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। সামনে বসে শুনেছি শিল্পী সাত্যকি ব্যানার্জির কন্ঠে ”মরো না, মরো না, মা’। কোনো মা কি সাধ করে মরতে চায়! তার উপর নধরের মায়ের মতো মা! আহারে নধর! সে যে এই দ্রুতগামী যন্ত্রযুগে বড় অচল মানুষ। সে পুরোপুরি স্থির নয়, অথচ ধীর। যার ধীর স্বভাবকে এই সমাজ চেটেপুটে খায়। যাকে সহজেই বানিয়ে ফেলা যায় ব্যবসার – শিল্পের – চাতুরতার সামগ্ৰী। যাকে মেরে পিটিয়ে খেতে না দিয়ে নিজের উদরপূর্তি করা যায় অবলীলায়। দুর্ধর্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে তেমনটাই আমাদের দেখিয়েছেন অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী।
সকল কামনা বাসনার উর্দ্ধে নির্মিত চরিত্র নধর কিন্তু নির্বাক নয়। সে কথা বলতে পারে, কিন্তু ততটুকুই বলে যতটুকু তার বেঁচে থাকার শেষ ও একমাত্র আশা থেকে উঠে আসে। বাকিটা সে চোখের ভাষায় বোঝায়। আর সেই ভাষা পড়তে গিয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে দর্শকের। এই ছবিতে নধরের চরিত্রে অমিত সাহার অভিনয় বহুকাল মনে রাখার মতো।
ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, চিরকালীন চাহিদা মতো নধর কলার ভেলায় চেপে ভেসে পড়তে পেরেছে অসীম জলের তরলতায়। আর স্থিত অথচ স্থবির নয়, ধীর অথচ অচল নয়, ব্যর্থ কিন্তু নিষ্ক্রিয় নয় এমন এক মানুষের প্রতি ভালবাসায় বিপুল জলরাশিতে ঝাঁপ দিচ্ছে এক নারী। ছবির অপর এক মুখ্য চরিত্র, দুর্দান্ত অভিনয় করে মন জিতে নেওয়া প্রিয়াঙ্কা সরকার।
পারে, নারীই একমাত্র পারে, পাথরে ফুল ফোটাতে, জলে আগুন জ্বালাতে, স্থলে – জলে সর্বত্র মায়ার – ভালবাসার বাসর ঘর সাজাতে। যেমনটা একদিন বেহুলাও পেরেছিল।
