ফিল্ম রিভিউ
অদিতি বসুরায়
বত্রিশ বছরের সালমা, বিয়ে করেনি বলে সারা মহল্লার তাকে নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। ওদিকে, সে কাজ করে বলে তাদের সংসারের চাকা গড়াতে পারছে। বাবা অকর্মণ্য, বিলাসী নবাবের বংশধর। রোজগারের বালাই নেই অথচ শখ আছে ষোলআনা। পূর্বপুরুষের হাভেলীটা পর্যন্ত মর্টগেজ দিয়ে বসে আছেন তিনি। সালমা ভাই, বোন, মা-বাপের জন্য খরচ করে উপার্জনের সবটাই। বিয়ের কথা সে ভাবেও না- কিন্তু তা বলে তো লখনউ-এর সমাজ তাকে ছেড়ে দেয় না। সর্বত্র তার বিয়ের জন্য লোকে উদ্বিগ্ন। প্রতিদিন সকালে, বাড়ির সামনের পরিত্যক্ত গাড়ির ধুলোমাখা কাঁচে বদমাশ ছেলেরা নাম্বার লিখে যায়, ‘রাতের গর্মি’ কমানোর জন্য। রোজ এই জিনিস দেখতে দেখতে বিরক্ত সালমা, একদিন সেই নাম্বারে ফোন করে ধরে ফেলে ছেলেটিকে, তারপর বেধড়ক ধোলাই দেয় তাকে পুরো পাড়া সাক্ষী রেখে। শেষ পর্যন্ত নানা ঘাটের পাত্র দেখার পর, শাদী ফাইন্যাল হয় তার। ছেলের নাম সিকান্দার, তার পোশাকের কারবার। শহরেই বিরাট দোকান – নিকাহ-এর দিন ঠিক হয় ইতিমধ্যে, সালমা তার অফিসের কাজে বিলেত যাওয়ার বরাত পায়। পুরো পরিবার তার বিরুদ্ধে গেলেও হবু বর সিকান্দার তাকে সমর্থন করায়, সালমা তার টিমের সঙ্গে ইংল্যান্ডে ল্যান্ড করে। তবে এরপর, ঘটে এক মারাত্বক ঘটনা – সাগড় পারে, সালমার সুইমিং স্যুট পরিহিত ছবি ভাইর্যাল হয় এবং শুরু হয় আরেক বখেরা। শহরের রক্ষণশীল সমাজে ঢি ঢি পরে যায় এবং তার জেরে বাবার বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে। তখনও একমাত্র সিকান্দারই তার সমর্থনে, সঙ্গে ছিল। তবে যা ভাবছেন তা কিন্তু ঘটে নি। কী হল শেষ পর্যন্ত জানতে হলে, নেটফ্লিক্সে ছবিটি দেখতে হবে। আসলে, গত শতক থেকে নারীর ক্ষমতায়নের যা যা দলিল লেখা হয়েছে তাতে মেয়েদের ক্ষমতার মূল উৎস তার নিজস্ব উপার্জন হলেও বিবাহ আজও মেয়েদের জীবনের আবশ্যিক শর্ত। আশা করা হয়, কাজের জায়গায় সে যতই উন্নতি করুক না কেন, নারীকে সংসার ও সাংসারিক কাজেও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সিংল সালমা ছবিতে পরিচালক সেই অবাঞ্ছিত মিথকে ভেঙে দিয়েছেন। অত্যন্ত সূক্ষ্ম সব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ছবিতে পরিচালক নচিকেত সামান্ত, নিজের মনোভাব ফুটিয়ে তুলছেন। উচ্চকিত, সদর্প ঘোষণার বদলে সালমা, কেবল নিজেকে এবং নিজের কর্ম জগতকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়েছে। এই বার্তার প্রভাব স্লোগানের থেকে শক্তিশালী। সমাজের মনোভাব বদল ওত সহজে হয় না, হয় ধীরে ধীরে অবিরাম ধাক্কার মাধ্যমে। সালমার মায়ের চরিত্রটিও সেও লক্ষ্যেই নির্মাণ করেছেন গল্পকার আমিনা খাতুন এবং চিত্রনাট্যকার রবি কুমার।
সালমার ভূমিকায় হুমা কুরেশির তুলনাহীন কাজ, দীর্ঘদিন মনে থাকবে। সালমার রাগ, বিরক্তি, উচ্চাকাঙ্খা, ভালবাসা, দ্বিধাকে তিনি অত্যন্ত বাস্তবোচিত উপায়ে তুলে ধরেছেন। ফলে, সালমার চরিত্রে অন্য কাউকে কল্পনা করাও সম্ভব না। সিকান্দারের রোলে, শ্রেয়শ তলপাড়ে দুর্দান্ত। যে কোনও স্বাধীন মনোভাবাপণ্ণ মেয়ে, তাঁকে যে আদর্শ স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে চাইবেন, তা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। সিকান্দারের চরিত্রটি যথার্থ ভাবেই চিত্রনাট্যকারের দাক্ষিণ্য পেয়েছে এবং শ্রেয়শ সেই সুযোগকে যথাযথভাবেই কাজে লাগিয়েছেন। খুব ভাল অভিনয় করেছেন তিনি। সালমার বাবার ভূমিয়ায় কানোয়ালজিত চমৎকার।
পরিবর্তিত সামাজিক প্রেক্ষাপটের জন্য সিংগল সালমা নিঃসন্দেহে তার অবদান রাখবে। ছবিটি সেই দিক দিয়েও জরুরী বার্তা দেয়।
