micro-story-bosudhoibo-kutumbokom

বসুধৈব কুটুম্বকম

সপ্তর্ষি চ্যাটার্জি

‘দেখি, দেখি, সরুন!’ লোকাল থানার দারোগাবাবুর হাঁকে ভিড়টা পাতলা হয়।

‘ইশ, কী অবস্থা করেছে! এই যে, মিস্টার, হু আর ইউ?’

ছেঁড়াখোঁড়া জামা, রক্তমাখা ওষ্ঠপ্রান্ত নিয়ে বিদেশি লোকটি চিঁ-চিঁ করে, ‘মাইসেলফ জোনাথন। ফ্রম আয়ারল্যান্ড! প্লিজ সেভ মি!’

‘আচ্ছা বাপু, সেভ তো করব, কিন্তু…’ আকারে-ইঙ্গিতে ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনি দিয়ে করা দারোগাবাবুর ভঙ্গিমাটা দেখেই চট করে নিজের পকেট দেখিয়ে মাথা নেড়ে তাঁকে আশ্বস্ত করে জোনাথন।

এবার আরও তৎপর হলেন দারোগাবাবু। ‘এইও, হট যাও। সাহেবকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

পাশের ভিড় থেকে চিৎকার ওঠে, ‘ছাড়বেন না স্যার, ব্যাটা নির্ঘাত জালিয়াত নয়তো ছেলেধরা! বদ মতলবে এসেছিল!’

আরেকজন বলে ওঠে, ‘এইসব জায়গায় ভিডিও ক’রে পরে সেগুলো অন্য দেশের লোকের কাছে বেচেও দিতে পারে এরা। ভাবুন তো যদি পাকিস্তানে এসব চলে যায়?’

ক্ষিপ্ত জনতাকে যথাসম্ভব বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জোনাথনকে জিপে তুলে, থানায় গিয়ে তার পরিচয়পত্র খতিয়ে দেখার পর দারোগা শুধান, ‘এবার বলো তো, কী হয়েছিল? লোকগুলো ক্ষেপে গেল কেন? একেবারে গণধোলাই!’

জবাবে জোনাথন হাউমাউ করে জড়ানো ইংরেজিতে যা বলল, তার বাংলা তর্জমা করলে মোটামুটি এরকম হয় –

‘আজ্ঞে স্যর, আমি একজন সামান্য ট্রাভেল ভ্লগার, আমার একটা ইউটউব চ্যানেল আছে। দেড় মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার। দেশ-বিদেশ ঘোরার ফাঁকে আমি স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করি, কখনও তাদের কিছু ছোটখাটো উপহার দিই। তেমনই আজ গঙ্গার ধারে এখানে ভ্লগ করতে এসে ফুটপাথে দুটো বাচ্চার সঙ্গে আলাপ হয়।’

‘বেশ, তারপর?’

‘কাছেই একটা বেলুনওলা যাচ্ছিল, ওরা সেদিকে করুণচোখে তাকিয়ে আছে দেখে আমি একশো টাকা দিয়ে দুটো বড় বেলুন কিনে ওদের হাতে দিই। যদি ওদের মুখে একটু হাসি ফোটে!’

‘বাহ, বাহ!’

‘কিন্তু ওটাই তো ভুল করলাম স্যর!’

‘কেন? ভুল কেন?’

‘বেলুন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে একজন মহিলা, সম্ভবত ওদের মা-ই হবে, আরও আট-দশটা ওই বয়সের বাচ্চা নিয়ে এসে আমাকে ঘিরে ধরে চেঁচামেচি আরম্ভ করে।’

‘সব্বোনাশ! কেন?’

‘ওরা বলল, বেলুন নয়, আগে সবার খাবারের পয়সা দিতে হবে। আসলে বেলুনটা তো খেলার জিনিস, খালি পেটে কী আর খেলায় মন বসে?’

‘তা বটে। এরা সব হাভাতের দল, বুঝলেন! তারপর কী করলেন জোনাথন সাহেব?’

‘খারাপ লাগছিল। আমি বাধ্য হয়ে আরও একশো টাকা দিলাম ওই মহিলার হাতে, তিনি ওটা নিয়ে সরেও গেলেন, কিন্তু…’

‘আবার কিন্তু?’

‘কিন্তু বাচ্চাগুলো আমাকে তবুও ছাড়ে না, সবাই হাত-পা ধরে টানাটানি করতে থাকে। ওদের দাবি, বেলুনটাও এবার দিতে হবে। সবাইকেই। আমি বলি, আমার কাছে অত টাকা নেই এখন। সেই শুনে ওরা আরও জোরে চেঁচাতে থাকে। আমি বুঝলাম এখান থেকে পালানো ছাড়া গতি নেই।’

‘সবক’টা বদমাশ!’

‘শুধু তাই নয়, আমি পালাতে যেতেই ওরা গলা ফাটিয়ে ডেকে আরও লোক জড়ো করে। এবার কিছু ষণ্ডাগুন্ডাও চলে আসে কোত্থেকে। তারা বলে আমি নাকি ছেলেধরা! সবাই মিলে টাকা চাইতে থাকে, নইলে পুলিশে দেবে! আমি কিছু বলতে যেতেই বলা নেই-কওয়া নেই, মারতে শুরু করল। তারপরই তো আপনি এলেন! ভাগ্যিস! ওরা আপনাকে ডাকেনি নিশ্চিত!’

‘বুঝলাম। না, ওরা ডাকেনি। আমরা এমনিই টহল দিচ্ছিলাম গাড়িতে ওই এলাকায়। ঝামেলার আওয়াজ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখি এই অবস্থা! যাই হোক, আর এসব ক’রবেন না। বুঝলেন? কারণ, বারবার তো আমরা আপনাকে বাঁচাতে পারব না। একটু সাবধানে চলুন। নিন এবার কিছু ডলার ছাড়ুন দেখি!’

‘ডলার!’

‘কী হল? আকাশ থেকে পড়লেন নাকি? আগে যে বলেছিলাম আপনাকে ইশারায়? ভুলে গেলেন? নিন, জলদি মিটিয়ে ফেলুন ব্যাপারটা।’

আ-আচ্ছা! … এ কী! আমার ওয়ালেট! আমার মোবাইল? কোথায় গেল সবকিছু? বুঝেছি! পকেটমার! ওই ভিড়েই…’

‘ওহো। তাহলে কী আর করা যাবে? ঠিক আছে, হাতঘড়িটাই খুলে দিন। সুইস তো? চলবে।’

হতভম্ব জোনাথন ঘড়িটা নীরবে খুলে দিতে যায়। তখনই নজর পড়ে, থানায় রাখা টিভি সেটে দেশের পর্যটন নিয়ে কী একটা বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। ঠিক তখুনি সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পরে একজন মাঝারি উচ্চতার সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক ঘরে ঢুকতেই দারোগাবাবু সহ বাকি পুলিশকর্মীরা সবাই তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। জোনাথনের হাতঘড়িসহ হাতটা দারোগাবাবু নিমেষে চেপে ধরলেন চট করে। ইঙ্গিতে খুলতে নিষেধ করছেন ওটা।

“কী মিস্টার বিশ্বাস, সব ঠিকঠাক তো?”

“হ্যাঁ-হ্যাঁ স্যর। বসুন স্যর! এই কে আছিস, এমএলএ সাহেবের জন্য চা নিয়ে আয় একটু!”

আচ্ছা, উনি তবে এলাকার বিধায়ক! জোনাথন তাকিয়ে থাকে লোকটির দিকে।

মুখে হালকা হাসি টেনে গম্ভীর স্বরেই তিনি বললেন, “শুনলাম একজন বিদেশিকে নিয়ে কিছু ঝামেলা হয়েছে আপনার এখানে? ইনিই কি সেই ব্যক্তি?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যর। উনিই। এই যে স্যর, স্যর এসে গেছেন। আপনার কোনও চিন্তা নেই। আপনার সব কিছু জলদি ফেরত পেয়ে যাবেন।”

“দেখুন। যত জলদি সম্ভব সব ক’টা কালপ্রিটকে ধরার ব্যবস্থা করুন। আমি জানি আপনারা ভালই জানেন কোন কোন গ্যাং এইসব গণ্ডগোলের জন্য দায়ী। কোনও ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। এটা আমাদের দেশের প্রেস্টিজ ইস্যু। কোনও কম্প্রোমাইজ নয়! বুঝেছেন?”

বিধায়কের গলা আরও গম্ভীর হয়। এবার তিনি জোনাথনের দিকে ফিরে স্পষ্ট ইংরেজিতে বললেন, “আয়াম স্যরি! আমি ভীষণভাবে লজ্জিত। দেখুন আমাদের দেশে একটা কথার চল আছে। ‘অতিথি দেবো ভবঃ’! অতিথিই আমাদের ভগবান, নর নারায়ণ। তাঁর অপমান মানে আমাদের ইষ্ট দেবতার অবমাননা। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুরুন, ফিরুন। কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না আর। আর আপনার সব হারানো জিনিস যাতে জলদি উদ্ধার করা যায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করা হবে তার জন্য। আমি কথা দিলাম। তা আপনি কোথায় উঠেছেন এখানে? মানে কোথায় থাকবেন রাতে?”

জোনাথন অসহায় কণ্ঠে বলে, “ভেবেছিলাম কোনও হোটেলে থাকব, কিন্তু আমার তো ওয়ালেট, মোবাইল সব চুরি হয়ে গেছে। হয়তো রাস্তাতেই রাতটা কাটাতে হবে আজ কোথাও।”

“সে কী কথা! না না তা হয় না জোনাথন। ছি ছি! রাস্তায় কাটাবেন কেন? আপনি এক কাজ করুন। আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চলুন। গেস্ট রুম খোলা আছে। আপনার কোনও সমস্যা হবে না। কি, অসুবিধা নেই তো?”

অসুবিধা! চোখে জল এসে যায় জোনাথনের। নাহ, সব ভাল যার শেষ ভাল তার। টিভির ওই বিজ্ঞাপনটা আবার চলছে, জোনাথন আনমনা হয়ে সেদিকে চেয়ে দেখল, বড় বড় ইংরেজি হরফেই দুটো শব্দ ফুটে উঠেছে স্ক্রিনে– ‘বসুধৈব কুটুম্বকম!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *