একটি নিখুঁত হত্যা
মহুয়া ব্যানার্জী
অলকদা, এই শাড়িটা নতুন দেখলাম তাই এটাই গায়ে দিয়ে দিলাম। অলকদা! ভাইয়ের বৌ রুমির ডাকে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অলক!
এই শাড়িটা কেমন লাগছে? দেখো না। ওই।
আঃ, তোমার ছেলেমানুষী এখনও গেল না সুমি। দেখছ খেলাটা জমে উঠেছে, এখনই তোমায় এসব ফালতু ব্যাপারে আমাকে ইনভলভ করতে হবে? ঢিভির পর্দা থেকে চোখ না সরিয়ে উত্তর দেয় অলক। মুখের হাসিটা দপ করে নিভে যায় রুমির। কালো পাড়ের লাল সিল্কটা বুকে চেপে ঘরের ভেতরে চলে যায় সে…
এটা সুমি কোনদিন পরেনি। সেই যে আলমারিতে রেখে দিয়েছিল, আর কোনদিন…
আমি কি ওর মনকে হত্যা করেছিলাম? রুমি?
অলকের কথার খেই ধরে রুমি বলে, এখন এসব ভেবে লাভ কী? তখন যদি একটু বুঝতেন।
দিদিভাই এত গল্প করতে ভালোবাসত, অথচ ধীরে ধীরে কেমন চুপ হয়ে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গেও কথাবার্তা কমে আসছিল।
জানতো, আজ পাশের ফ্ল্যাটে কি হয়েছে? এই, শোনো না।
সুমি, তুমি এত কথা বলার এনার্জি পাও কোথা থেকে? অফিস থেকে সবে ঘরে এলাম। একটু শান্তিতে বসতে দাও। যত সব বাজে গসিপ শুনে আমি কি করব? হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেও ভেতরে ব্যাঙ্গের সুর বুঝতে সুমিতার কোন অসুবিধা হয়নি। সে নীরবে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। এভাবেই চলতে চলতে কথা কমে আসে। দাম্পত্যের গল্প কমে আসে, তারপর নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা।
বড় সুন্দরী সুমিতা। এই পঞ্চাশেও আকর্ষণীয় ফিগার। পুরুষদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এখনও। এ নিয়ে বন্ধুমহলে কম রসিকতা হয় না। গলায় রজনীগন্ধার মালা, কপালে চন্দনের ফোঁটা, সিঁথিভর্তি সিঁদূরে আজও তেমনই সুন্দর লাগছে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অলক।
আঃ, ছাড়ো আমায়। বর্ষণমুখর রাতে অলকের উষ্ণ আলিঙ্গন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় সুমিতা।
প্লিজ, এই সময় এমন করে না সোনা। তুমি খুব হট। তোমার তো আদর খেতে ভালোলাগে। জোর করে সুমিতাকে নিজের বুকে টেনে নেয় অলক। তার বুকের উপত্যকায় মুখ রাখে।
না। এখন আমার ঘেন্না করে তোমাকে। যে পুরুষ নিজের বেডরুমের কথা বন্ধুমহলে বলে বেড়ায় সে ভালোবাসা বোঝে না। রাগ ক্রমশ কান্নায় পরিণত হয়।
কী এমন বলেছি ওদের? বলেছি যে আমার বৌ এর হেবি খিদে। রোজ রাতে চাই। একবারের বেশিই। আমি শালা সামলাতে পারি না। হা হা হা। আরে বড় বড় পার্টিতে এসব কথা চলে। সবাই মজা নেয়। তুমি ওভার রিঅ্যাক্ট করছ।
নাআআআ। বলবে না। চিৎকার করে ওঠে সুমিতা। আমি ওদের সামনে দাঁড়াতে পারি না। মনে হয় সবাই আমায় দৃষ্টি দিয়ে নগ্ন করছে।
প্রতিদিন আমি তিলে তিলে মরে যাচ্ছি। শরীরে, মনে আমি তোমার দেওয়া আঘাতে মরে যাচ্ছি।
বেডরুমের দেওয়ালে অপমান লেখা হয় রোজ।
সুমি, সুমি, এই ভর সন্ধ্যেবেলায় শুয়ে আছ যে। শরীর খারাপ?
না তো। আমি এখুনি চা করে দিচ্ছি। ব্যস্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসে সে।
আরে, চা খাব কখন বললাম। আমি তো এমনিই জিজ্ঞাসা করছি। আজ তো রোববার। বহুদিন আমরা কোথাও বেড়াতে যাইনি। তাই ভাবলাম আজ দুজনে বাইরে ডিনার করতে যাব। এসে দেখি তুমি শুয়ে আছ।
সেদিন অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ অলকের দিকে তাকিয়েছিল সুমিতা। তারপর দমকা হাসিতে ফেটে পড়েছিল। তোমার ক্লাব বন্ধ আজ? বন্ধুরা আসবেনা তাসের আড্ডায়? ইস্ বড় কষ্ট তো। আহারে, তাই আজ আমার কথা মনে পড়ল! তীব্র ব্যাঙ্গে অলককে ছিন্নভিন্ন করতে করতে সুমি হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে। শেষবারের মতো।
শ্মশানের কাজ মিটেছে বহুক্ষণ আগে।
অলকের হাতে সুমিতার অস্থিকলস। সবাই তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে। শুধু অলক ভাবছে কখন বাড়ি গিয়ে হাত থেকে খুনের দাগ মুছবে। যদিও সব দাগ মোছে না…
