micro-story-fifty-fifty

ফিফটি -ফিফটি

নীলা নাথদাস


ঠং করে একটা শব্দ হতেই রতন রবীনের দিকে তাকাল। নিশ্চয়ই মাটির নিচে ধাতব কিছু রয়েছে। গাঁইতিটা এবার আস্তে চালাতে হবে। রতন ফিসফিস করে বলল—গাঁইতি আস্তে মার রবীন। মনে হচ্ছে কলসী রয়েছে। দুশো বছরের পুরনো বাড়ি, গুপ্তধন থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। রবীন সায় দেয়। তারপর, ধীরে ধীরে মাটি সরাতে শুরু করল। এবার দুজনেরই কাজে উৎসাহের জোয়ার এসেছে। বড় গরীব ওরা। সংসারে অভাব-অনটন নিত্য সঙ্গী। গুপ্তধন হাতে পেলে আর্থিক অবস্থা ফিরবে। এই আশায় খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে লাগল দুজনে। কিন্তু, কিছুটা মাটি সরাতেই যা বেরোল, তা দেখে দুজনেরই চক্ষু চড়কগাছ। ইয়া বড় এক  পিতলের কলসীর মুখ বেরিয়েছে। মুখ দেখেই কলসীর বিশালত্ব মালুম হল ওদের। বাপরে, ওরাতো ধনী হয়ে যাবে এ ধন পেলে! এবার পুরো কলসীটিকে উপরে তোলার পালা। উপরে তুলতে, কালঘাম ছুটে গেল ওদের। দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে থাকার দরুন রঙের খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। প্রাচীনত্ব তার বদলে যাওয়া রঙেই স্পষ্ট। দুজনে মিলে খুব সন্তর্পণে কলসীটি গর্তের ভিতর থেকে উপরে নিয়ে এল ওরা। দুজনের মুখেই জয়ের উল্লাস আর চোখে আনন্দের ঝিলিক। অবশেষে, ভাগ্যদেবতা মুখ তুলে চেয়েছেন। রতনের মতে, ফিফটি ফিফটি বখরা হবে। বাড়ির মালিককে জানতে দেওয়া যাবে না। পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি বানাচ্ছে মালিক। বর্তমানে, পুরো পরিবার নিয়ে ভাড়া বাড়িতে থাকে। এসময়, খুব একটা আসে না এদিকে। ওরা, নিশ্চিন্তে কলসীর মুখ খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মুখ যে গালার মত কোন পদার্থ দিয়ে শক্ত করে আঁটা। খুলতে সময় লাগবে। এদিকে সূর্যদবতা মাথার উপর খাড়া হয়ে কিরণ দিচ্ছে। বেলা হয়েছে বেশ। পেটও চোঁচোঁ করছে। রবীনরা ঠিক করল, আগে বরঞ্চ খেয়ে নেবে। মালিক তো আসবে না, কাজেই খেয়েদেয়ে গুপ্তধনের পিটারা খুলবে ওরা। যেই কথা সেই কাজ। খাওয়া শেষ করে দুজনে কুঁয়োতে হাত ধুয়ে কলসী খুলতে যাবে, ঠিক তক্ষুনি মালিক বাবু শা এসে হাজির। এদিক দিয়ে অন্য কাজে নাকি যাচ্ছিল। তাই, এসেছে। ওকে হঠাৎ দেখে ওরা মনে মনে যা ভয় করছিল তা-ই হল। কলসীর দিকে চোখ পড়তেই প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিল মালিক। কি, কে, কোথায় ইত্যাদি। সেই সঙ্গে, এ জমি আমার, অতএব এ কলসীও আমার, ভিতরের গুপ্তধনও আমার। শুনে রতন, রবীন দুজনেরই মাথায় হাত। কিন্তু হাল ছাড়লে তো চলবে না। মরিয়া হয়ে ফুঁসে উঠল দুই বন্ধু। কত স্বপ্ন দেখে ফেলেছে ওরা এই কলসীর ধনকে ঘিরে! এত সহজে হার মানবে?

-আমরা প্রথমে দেখেছি, তাই এ ধন আমাদের। জোর দিয়ে একথা বললেও মালিক শুনতে চাইল না।

দু পক্ষের বাদানুবাদ চলাকালীন ওরা সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেই মালিক একটু কাবু হল। শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এল যে, কলসী থেকে যা পাওয়া যাবে তার ফিফটি-ফিফটি ভাগ হবে। এক ভাগ মালিকের, বাকি ভাগ দুই বন্ধুর। প্রথমে, গাঁইগুঁই করলেও শেষে নিমরাজি হল ওরা। যাহোক, নেই মামার থেকে কানা মামা ভাল। অতঃপর অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে কলসীর মুখ খুলতে লেগে পড়ল ওরা। কত বছরের পুরনো কলসী কে জানে? মুখটা যেন সেঁটে বসেছে। অনেক পরিশ্রম করে যখন মুখ খুলল কলসীর গভীরতা দেখে ওরা সবাই অবাক। হয়তো অনেক হীরে, মোহর রয়েছে ভিতরে। তবে, যখের ধন সাপ পাহারা দেয় এরকম গল্প শুনেছে বলে, খুব সাবধানে কলসীর মধ্যে উঁকি মারতেই ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওদের। কোথায় মোহর, কোথায় সোনা-দানা? তার বদলে, দুহাতে চুড়ি ও গলায় হার পরা আস্ত একটি কঙ্কালকে দেখতে পেল ওরা। ভাঁজ করে ঢোকানো। নারীর কঙ্কাল। ওরা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যখন দাঁড়িয়ে তখন মালিক ওদের ফিসফিস করে বলল- তোরা কাউকে এসব বলিস না। জানিসই তো,আমি পুরনো বাড়ি অন্যের থেকে কিনেছি। মিছিমিছি পুলিশের ঝামেলায় পড়তে চাই না। আজ মাঝ রাতে বড়ালদের এঁদো পুকুরে কলসী ফেলে দিস। কিরে, কাজটা করবি তো?

ভয়ার্তস্বরে মালিক একথা বলতে‌ রতন বলল, নাহ মালিক পারব না। আমাদেরও তো পুলিশের ভয় আছে। শেষে, খুনের দায়ে পড়ব নাকি?

-বিনে পয়সায় করাব নারে। এইনে ব’লে ওয়ালেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে রতনের হাতে দিল মালিক। পাঁচ-পাঁচ ভাগ করে নিস। টাকা পাবে শুনে, এবার ওরা রাজি হল।

মুখ অমাবস্যার রাতের মত কালো করে বাবু শা যখন বাইক নিয়ে বেরোচ্ছে, তখন ওর পথ আটকে দাঁড়াল গুন্ডার মত দুজন তাগড়া লোক।

-কি দাদা, কলসীতে কি পেলেন? ক্লাবের ছাদ থেকে আমরা সব দেখেছি।

বাবু শা, ব্যাক পকেটে হাত দিয়ে মোটা ওয়ালেটটা বের করে আনলেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *