micro-story-jibon-jemon

জীবন যেমন

অনুভা নাথ

রমেনবাবু বিগলিত গলায় বললেন “স্যর, এত কমে হবে কেমন করে? আরও দুটো রাধাবল্লভী নিতেই হবে”! রমেনবাবু যাকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বললেন সেই অমিতাভবাবু পাঁঠার মাংসের হাড় চুষতে চুষতে জিভের স্বাদে-আরামে প্রায় চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন। রমেনবাবুকে দেখে অতি কষ্টে খাবার চিবোতে চিবোতে বললেন, “আরে না না, এরপর তো আরও খাবার আছে। তবে রেওয়াজি খাসিটা যা হয়েছে না।” কথাটা বলতে বলতে অমিতাভবাবু আবারও আয়েসে চোখ বন্ধ করে ফেললেন!

রমেনবাবু তখনও অমিতাভবাবুর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে।

অমিতাভবাবু উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরে। তাঁর অঙ্গুলিহেলনে কোটি কোটি টাকার কাজ পায় কনট্রাকটরেরা। রমেনবাবু আজ অমিতাভবাবুর অফিসের লোকজনদের একটা লজে খাওয়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অমিতাভবাবু একাই একটি টেবিলে বসে খাচ্ছেন। বাকি কর্মচারীরা জুটি বেঁধে চারজন করেই খেতে বসেছে। চর্ব, চোষ্য খেতে খেতে খুব নিচু ও সাবধানী গলায় কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে রমেনবাবুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে।

“বড় সাহেব এমন করে খাচ্ছেন যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারেন না, এদিকে ঠিক তলে তলে রমেনবাবুকে শাঁসালো টেন্ডার পাইয়ে কাজের ব্যবস্থা করে দেবেন! তবে, শুনেছি রমেনবাবুর আগের কাজ করতে গিয়ে বাজারে বেশ ধার হয়ে গেছে! এখন বড় সাহেব যদি কৃপা করেন…” সবাই ঠিক-ঠিক বলে মাথা নাড়ল।

খাওয়া-দাওয়া মিটলে রমেনবাবু বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন। ততক্ষণে দুপুরের ঝাঁঝ বিকেলের ঠান্ডা হাওয়ায় উড়ে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে নরম। এমন সময় রমেনবাবুর মোবাইল বেজে উঠল। ফোনের ওপারে তাঁর স্ত্রী আরতি উদ্বিগ্ন গলায় বললেন “কখন বাড়ি ফিরবে? খেয়েছ?” রমেনবাবু মনমরা গলায় উত্তর দিলেন “এত খাবার সারাদিন ঘাঁটলে কি আর খাওয়া যায়? তারওপর লোনের জন্য প্রতি মাসে এতগুলো টাকা কাটছে, এত সমস্যার মধ্যে আবার মেয়েটারও….” রমেনবাবু চুপ করে গেলেন। আরতি এইবার প্রসঙ্গান্তরে গেলেন “বাড়ি এসো। পরির জ্বর এখন নেই। সে ড্রইং করছে।” অতর্কিতে রমেনবাবুর চোখ ভরে উঠল জলে। তাঁর কেবলই মনে হতে লাগল জীবন কেন এমন নিষ্ঠুর, কেন এত কঠিন?

রাতে আরতি পরিকে ঘুম পাড়িয়ে রমেনবাবুর পাশে এসে বসলেন। তিনি তখনও জমা-খরচ,ইএমআই এর হিসাবে ব্যস্ত! “কী করবে বলো তো?” রমেনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “কী আর করব আরতি, বড় বাজেটের কাজ করতে গিয়ে লস হল। এদিকে এই ফ্ল্যাটের লোন চেপেছে। জানি না নতুন কাজ না পেলে কেমন করে আর কতদিন এত টাকার লোন টানতে পারব… তার ওপর আমাদের সাত বছরের বাচ্চা পরির শরীরটাও খারাপ।” আরতি রমেনবাবুর দিকে ঘন হয়ে বসলেন তারপর ইতস্তত গলায় জিজ্ঞেস করলেন “আজকে যাদের খাওয়ালে কাজ কি কিছু হল?” রমেনবাবু পরির ড্রইংখাতাটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক গলায় বললেন “এত তাড়াতাড়ি কি সরকারি জায়গায় কিছু হয়? দেখতে হবে। তবে, অমিতাভবাবু করিৎকর্মা লোক শুনেছি। টাকা পয়সা দিলে হয়তো কাজ দেবেন।” আরতি আহত গলায় বললেন “এই তো এত টাকা খরচ করে খাওয়ালে; কাজ পাওয়ার জন্য আবারও টাকা দিতে হবে!” রমেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন “দুনিয়াটাই তো তাই, টাকার খেলা! ভেতরের অবস্থা বাইরে বলা যায় না। লোককে দেখাতে হয় ভাল আছি, দুর্দান্ত আছি। উল্টো দিকের মানুষটারও আমাকে বোঝার তাগিদ নেই। সে নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত!” ঠিক তখনই রমেনবাবু দেখতে পেলেন পরি ড্রইংখাতায় তাঁর ছবি আঁকতে চেষ্টা করেছে। তিনি দোকান থেকে জিনিস কিনছেন, তবে তাঁর মুখটা ভীষণ করুণ…. ছবিটা দেখে রমেনবাবুর মনটা দুলে উঠল। তারপরই দেখলেন পরি নিচে মোমরং দিয়ে এলোমেলো হাতে লিখেছে “বাবা, আমি কখনই তোমার কাছে কিছু কিনে দেওয়ার জন্য বায়না করব না। আমি এবার থেকে খুব কম কম খাব বাবা। দেখো, তোমার টাকা খরচই হবে না। কিন্তু তুমি এমন চিন্তা কোরো না বাবা।” লেখাটা ওঁরা দুজনেই পড়লেন। নিজেদের অপ্রাপ্তিগুলো কেমন করে কখন তাঁদের অজান্তে সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তা তাঁরা বুঝতেই পারেননি। একটা সাত বছরের বাচ্চা যা বুঝেছে তা এই সমাজের কারোর বোঝার তাগিদ নেই! একথা ভেবেও অসহায় মানব-মানবী কী করবেন তা বুঝতে পারলেন না। তাঁরা বোবা যন্ত্রণা আর নির্বাক চাউনি নিয়ে একে অপরের দিকে শুধু তাকিয়ে রইলেন…।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *