micro-story-kaktaliyo

কাকতালীয়

তুলিকা মজুমদার

ঘটনাগুলো প্রায় নীরবে ঘটছিল। ফলে সেইভাবে রাজীব, পৃথা অথবা তাদের কন্যারত্ন মিষ্টি কেউই সেসব নিয়ে প্রথমদিকে চিন্তাভাবনা করেনি।

কলকাতার বুকে ওরা যখন ভাড়া এলো দুর্গাপুরের পাঠ চুকিয়ে, দু কামরার ফ্ল্যাটে পা দিয়েই রাজীবের চোখে পড়েছিল পেল্লায় সাইজের একটা শৌখিন খাট। তৎক্ষণাৎ দালালকে ফোন করে খাট সরাতে বলেছিল রাজীব। কারণ ওদের নিজস্ব ফার্নিচারের সংখ্যাও বড় কম নয়। কিন্তু দালাল নিস্পৃহ কণ্ঠে জানিয়ে দেয় যে খাট সরানো সম্ভব নয় কারণ খাটটি দেয়ালের সঙ্গে স্ক্রু দিয়ে আটকানো। অগত্যা নিজেদের বিয়ের খাট মেয়ের ঘরে চালান করে রাজীব আর পৃথা ওই খাটেই নতুন ম্যাট্রেস লাগিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করেছিল। দুর্গাপুর থেকে আসার পর খুব অদ্ভুতভাবেই রাজীবের একদম রাতে ঘুম হচ্ছিল না। অফিসের প্রবল খাটনির পর বাড়িতে খেতে বসে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ার মত ক্লান্তি থাকলেও বিছানায় শুলেই সেই ঘুম বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে শুরু হয়েছিল এক নতুন উপসর্গ। প্রায় নির্ঘুম রাত কাটানোর সঙ্গে সঙ্গে বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছিল ওর। ফ্ল্যাটে দুটি বাথরুমের একটি শুধুমাত্র রাজীব ব্যবহার করা শুরু করেছিল। তার কারণ এই বাড়িতে আসার দুদিনের মাথায় ওটাতে মিষ্টি গিয়ে পেল্লায় এক শুঁয়োপোকা দেখে প্রায় ভিরমি খাচ্ছিল। যদিও ওর হাঁকডাক শুনে ওর মা-বাবা গিয়ে শুঁয়োপোকার কোনো অস্তত্ব খুঁজে পায়নি কিন্তু পৃথাও মেয়ের বাথরুম ব্যবহার করা শুরু করেছিল। অনিদ্রা, রাতে বাথরুম যাওয়া ছাড়াও রাজীবের অবচেতন মনে অস্বস্তি দানা বাঁধছিল আরেকটি কারণে। প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে ওর মনে হত ওদের ঘরে ওরা ছাড়াও আরো কেউ আছে! রাজীব, তার সাবধানী পদচারণা অথবা চাপা নিঃশ্বাসের শব্দও অনুভব করছিল। “অনুভব” বলার কারণ সঙ্গে সঙ্গেই আলো জ্বালিয়ে সে কখনোই কারোর দেখা পায়নি, এমনকি একটা ইঁদুরেরও না। আসল সমস্যা শুরু হল এক সপ্তাহ পর। অফিসে লাঞ্চের সময় পৃথার ফোন আসে এবং সে প্রবল কান্নকাটি করতে করতে জানায় আজ ব্যালকনিতে কাপড় মেলতে গিয়ে হঠাৎই ব্যালকনির দরজা কেউ সশব্দে বন্ধ করে দেয় অথচ সেই সময়ে সে ঘরে একা ছিল এবং সেরকম হাওয়াবাতাসও ছিল না! অনেকবার দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করে ও যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়ে মাটিতে বসে পরে ইষ্টনাম স্মরণ করছে, তখন হঠাৎই যেন কেউ দরজাটা ভিতর থেকে খুলে দেয়। একবুক আতঙ্ক নিয়ে রাজীব সেদিন বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু নিজের এযাবৎ অনুভূত অনুভূতির কথা প্রকাশ্যে বলার আগেই সেই রাত থেকে পৃথার অসম্ভব রক্তক্ষরণ শুরু হয় পায়ুপথ থেকে। হাসপাতালে ভর্তি হলে রাজীব জানতে পারে পৃথার একিউট কোলন-আলসার হয়েছে! সারাজীবন অত্যন্ত কর্মঠ, সুস্থ, স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যসচেতন স্ত্রীয়ের এই পরিণাম রাজীবকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। ওর স্থির বিশ্বাস হয় ওই ফ্ল্যাটে কিছু সমস্যা আছে। মেয়েকে নিজের মামারবাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সামান্য কটা জামাকাপড় নিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে রাজীব। সেইদিন ঘরে ঢুকে ওর এক বন্ধুর পরামর্শমত ফোনে হনুমানচল্লিশা চালাতে গিয়ে বারবার ইউটিউব বন্ধ হয়ে যায় আশ্চর্যজনকভাবে। অত্যন্ত নার্ভাস অবস্থায় কোনোমতে ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোনোর সময় দরজার মুখে ওর দেখা হয় নিচের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোকের সঙ্গে। প্রায় অসহায়ের মত রাজীব তাকেই জিজ্ঞেস করে “দাদা, আপনাদের কারোর সাথেই আমার আলাপ হয়নি। বলতে পারেন এই ফ্ল্যাটে এর আগে কারা থাকতেন?” ভদ্রলোক কিছুক্ষণ রাজীবের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেন “প্রায় তিনবছর ফ্ল্যাট খালি পড়েছিল, তার আগে যিনি থাকতেন তিনি মারা গিয়েছিলেন – কোলন ক্যান্সারে!” রাজীবের হাত থেকে জামাকাপড়ের ব্যাগ খসে পড়ে যায়, ও পাগলের মত ওর গলায় ঝোলানো হনুমানজির লকেটটা চেপে ধরে!  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *