মধুমতী রাজেন্দ্রম
শ্যামলী রক্ষিত
একটি অদ্ভুত সন্ধ্যা নেমে এল এই উপকুলীয় শহরে। লবণাক্ত বাতাস এসে লুটোপুটি খাচ্ছে সারা শহর জুড়ে। মধুমতী দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সারাদিন একটা বই বা পত্রিকা কিছুই বিক্রি হয়নি। সে ভাবছিল এবার দোকানের সাটার নামিয়ে দিয়ে, বিচে গিয়ে একটু বসবে। অনেকদিন পর এরকম একটা ইচ্ছে হচ্ছিল তার। সারাদিন তেমন পেট ভরে খাওয়া হয়নি। এই বন্দরে সমস্ত খাবারের দাম প্রচুর। গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো বিক্রি নেই। চার পাঁচ মাসের দোকান ভাড়া বাকি। মালিক যে কোনো দিন ভাড়া তুলে দেবে। তখন কি হবে সে জানে না। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে সে আর পারছে না। এই ভাবে আর সম্ভব হচ্ছে না। সারাদিনে বিক্রি নেই বলে খাবার কেনার পয়সাও নেই। এক কাপ চা কিনে খাবে সে পয়সাও নেই কাছে।
মধুমতী রাজেন্দ্রম গত কদিন ধরেই খুব চিন্তায় আছে। অনেক ভেবেছে তার প্রিয় এই দোকানটা নিয়ে। তার সখের ড্রিম ওয়ার্ল্ডকে, শেষমেশ হয়ত আর রক্ষা করতে পারবে না। দিনরাত এই চিন্তায় তার ন্যুব্জ অশক্ত শরীরটা আরো নুয়ে পড়ছে ক্রমশ। এই ভাবনাতেই আজকের দিনটাও শেষ হয়ে গেল। ভাঙা মন নিয়ে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে আর একটা সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেবে ভেবেছিল।
সমুদ্র তীরে সন্ধ্যার পর বই কেনার কোনো খদ্দের থাকে না। এখন মদের দোকানে ভিড় হয়। মধুমতী বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ঘাড় সোজা করে স্থির দৃষ্টিতে দেখল, দেদার মদ বিক্রি হচ্ছে। পলকহীন চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে সে। একটা প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে, দোকানের সাটারটা টানতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে একজন নাবিক এসে বলল, এক্সকিউজ মি। আমার একটা বই প্রয়োজন। অ্যান ওল্ড ম্যান এন্ড দি সি বইটা কি আপনার কাছে আছে?
মধুমতী বলল, দেখছি দাঁড়ান। বলে একটু খোঁজার পরই বইটা একটা সেলফ থেকে বার করে ধুলো ঝেড়ে ওঁর দিকে এগিয়ে দিল। উনি ছোঁ মেরে বইটা নিয়ে বুকে চেপে ধরে, চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকলেন নিঃশব্দে। সুভা অবাক হয়ে দেখছিল, নাবিকের চোখের পাতা তখন ভিজে উঠছে। ক্রমশঃ গাল বেয়ে নেমে আসছে সেই লোনা জল। সুভা বুঝতে পারছিল না সে কী করবে? ওঁকে সরে যেতে বলবে, না কি অপেক্ষা করবে?
সে জানতে চাইল কি হয়েছে আপনার। উনি চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, বইটা আমার জল পড়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আমি পাগলের মত খুঁজছি, কোথাও পাইনি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি আমাকে বাঁচালেন! উনি বইয়ের টাকাটা বাড়িয়ে দিলেন।
সুভা বলল মূল্য লাগবে না। আমি পেয়ে গেছি।
বইটা নিয়ে সেই নাবিক আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছিল সমুদ্রের দিকে।
সন্ধের আকাশে তখন অসংখ্য নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। সাগরের উন্মত্ত ঢেউয়ের ওপর পড়েছে তাদের আলো। মধুমতী রাজেন্দ্রম দেখছে সেই মাছ শিকারীর লড়াই …
