micro-story-plastic

প্লাস্টিক

রাখী শীল আঢ্য

সোহিনী আর প্ল্যাস্টিক ব্যাগ যেন একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। একে অন্যকে ছাড়া থাকতেই পারে না। যেখানেই দেখবে সোহিনী প্ল্যাস্টিক ব্যাগ, সেখান থেকে তুলে এনে যত্ন করে জমিয়ে রাখবে।‌ অবশ্য এর আবার শ্রেণীবিভাগ আছে। সবথেকে দেখতে ভালো এবং মানেও বেশ উঁচু দরের, সেই প্লাস্টিক ব্যাগগুলো বেশী যত্ন পায়, ভালো জায়গায় থাকে। আর যেগুলো একটু নীচু মানের, সেগুলো হাতের কাছে থাকে এবং সবথেকে বেশি ব্যবহার হয় নানা চাহিদায়, কখনো বা অন্যের দরকারেও।  

তবে প্রয়োজনে চাইলেই যে প্লাস্টিক ব্যাগ পাওয়া যেত, তা নয়। সোহিনী প্রথমে নেই নেই বলতে বলতে অনেক সময় পর খুঁজে পেতে কম সুন্দর, নীচু মানের প্যাকেটকে হাতে ধরায়। কিন্তু কোনভাবেই সে ভালো মানের প্যাকেটগুলো কাউকে সহজে দিতে চাইতো না। এত যত্ন দেখে মনে হতো যে প্যাকেটগুলো মনে হয় শাড়ি – জামাকাপড়ের থেকেও মূল্যবান। যে কোন পোশাক কেনার সময় কোন দোকানের প্যাকেট যদি আকর্ষণীয় হতো, তাহলে সেই দোকান থেকে কেনাকাটা সোহিনী অবশ্যই করতো। শাড়ি বা জামা পছন্দের ব্যাপারটা সেখানে অতটা গুরত্ব পেতো না।  সোহিনীর প্লাস্টিক প্যাকেট প্রীতি নিয়ে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে ঠাট্টা ইয়ার্কি চলতো। সোহিনীর এই প্লাস্টিক ভালোবাসা লোকের মুখে কাহিনি হয়ে ঘুরতে শুরু করেছিল। 

সমরেশের কানেও আসতো এই সব কথা। অনেক অভিযোগ জানিয়েছিল সোহিনীকে এই নিয়ে। ঝগড়াও লেগে যেতো সময়ে-অসময়ে। খানিক চেঁচামেচির পর সমরেশ নিজেই চুপ করে যেত। 

সোহিনীর ইদানিং শরীরটা খারাপ যাচ্ছিল, তাই সমরেশ চাইছিল সোহিনী নিজের ভালোলাগার জগত নিয়ে থাকুক, এতে যদি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায়। 

-“তোমার প্লাস্টিক নিয়েই থাকো সোনু, আমার কথা আর ভেবো না।” কখনো কখনো ঝগড়ার পর ছদ্ম অভিমান দেখিয়ে বলতো সমরেশ।

সোহিনী জানতো এই সোনু বলে ডাকা মানেই সমরেশ তার উপর রাগ করেনি। নিজের মনে হেসে তাই ভ্রু কুঁচকে বলতো, “আমার সাধের জিনিসগুলো আমি না থাকলেও আগলে রেখো গো। তাহলেই তো আমার অনুপস্থিতি তুমি অনুভব করবে না।”

এই কথা বলার সাথে সাথেই সমরেশ সোহিনীর মুখ চেপে ধরতো আর নিজের চোখের জল লুকোনোর জন্য আরো বেশি করে কথা কাটাকাটি চালিয়ে যেতো। 

ইদানিং সমরেশও বাইরে – বাড়িতে যত প্লাস্টিক আছে সব এক জায়গায় জড়ো করে আনতো সোহিনীর জন্য। বোঝাতে চাইতো স্ত্রীকে যে তার পছন্দই সমরেশের ভালোলাগা, আর সেটার জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত।

দিনে দিনে বাড়ির আনাচে-কানাচে রঙিন, সাদা-কালো, ছোট-বড়,মাঝারি, মোটা-পাতলা ইত্যাদি নানা রঙ ও আয়তনের প্লাস্টিক ব্যাগের সংখ্যা বেড়েই চললো। আর এই নানা রং ও আয়তনের মধ্যে সমরেশ ও সোহিনীর সংসার মিশে গিয়ে দিব্যি চলছিল।

কিন্তু ছন্দপতন তো আচমকাই হয়। সোহিনী যে হঠাৎ কোন এক ভোরে সব ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

নদীর তীরে শ্মশান। সেখান থেকে অনেকগুলো সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে নদীর কোলে‌। ঘি-মাখা হাতটা ধুতে গিয়ে সিঁড়ির শেষ ধাপটার পরেও আরো কিছুটা যেতে হলো, সেখানে রয়েছে শুধু কাদা। নামতে গিয়ে দুটো পায়ে পুরো কাদামাটি লেগে গেলো সমরেশের। মাটির মালসাটা জলে ভাসাতে গিয়ে একটা মোটা গাছের ডালে আটকে গেল। দুহাতে জল ধুইয়ে দিয়েও কিছুতেই যাচ্ছে না‌, মায়া না কাটিয়ে যাওয়ার মতো। উপায় না দেখে সমরেশকে হাঁটু অব্দি জলে নামতেই হল। গাছের ডাল থেকে মালসাটাকে আলাদা করতে গিয়ে দেখে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট তাতে জড়িয়ে আছে। 

ঘি আর মাটি মিশে গিয়ে সমরেশের হাত থেকে অদ্ভুত একটা গন্ধ আসছিল। গন্ধের রেশে মাথা বেশ ঝিমঝিম করে উঠলো। সমরেশ মাটি দিয়ে রগড়ে হাত ধুতে ধুতে নিজের মনেই বলে উঠল, “সোনু, এভাবে হঠাৎ কেন চলে গেলে আমায় ছেড়ে, তোমার সংসার ছেড়ে? গতকালও তো তুমি ছিলে, আজ সবকিছু ‘নেই’ কি ভাবে হয়ে গেলো?”

সমরেশের প্রশ্ন চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে নিজের কাছেই বিনা উত্তরে ফিরে এল।

সমরেশ সযত্নে প্লাস্টিক থেকে মালসাটা আলাদা করে ভাসিয়ে দিল অজানার উদ্দেশ্যে। চোখের জল গাল বেয়ে নেমে আসতে হাত দিয়ে মুছে মৃদু স্বরে বলল, “সোহিনী এবার তো প্লাস্টিক ব্যাগ থেকে মুক্ত হও।”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *