রাধার জন্য নয়
তন্ময় সরকার
কুটিলার ছেলে সরকারি পাঠশালার পণ্ডিত হয়েছে। সে এসে বলল, “মামি, তুমি তো যুক্তিসম্মত অসঙ্গতিতে পড়ে গেছ। পুরোনো কাগজপত্র কিছু আছে?”
বৃদ্ধা হতাশা প্রকাশ করলেন, “না রে, বাবা। আমার কাছে কিছু নেই। সেসব তো তোর মামার গুছিয়ে রাখার কথা। কিন্তু তিনি ছিলেন এক আলাভোলা মানুষ। তাঁর নিজেরই কাগজপত্রের ঠিকঠিকানা ছিল না। গোকুল থেকে বৃন্দাবনে আসার সময় কোনওকিছুই গুছিয়ে আনেনি।”
কুটিলার ছেলে বলল, “কিছু মনে কোরো না, মামি। আয়ানমামা মরে একপ্রকার বেঁচেই গেছে। না হলে এই সময়ে সেও নিশ্চিত যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির খপ্পরে পড়ত। তুমি এক কাজ করো, বাপের বাড়ি যাও। গিয়ে তোমার বাবার কাগজ কিছু নিয়ে এসো।”
“বাপের বাড়ি!” বৃদ্ধা উদাস হয়ে গেলেন, “কতবছর সে-মুখো হই না। তারা আছে কি গেছে— তাও জানি না। এখন সামান্য কাগজের জন্য…”
পণ্ডিত বলল, “সংকোচ কীসের? এখন কাগজের জন্যে ভুলে যাওয়া মানুষদের খুঁজছে সবাই।”
বৃদ্ধা বললেন, “বাবার কাগজ এনেই বা কী হবে? পদবি মিলবে না। প্রমাণ কী করে করব যে, তিনি আমার বাবা?”
“কথাটা তুমি ভুল বলোনি মামি…” বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল কুটিলার পণ্ডিত ছেলে।
বৃদ্ধা চোখ বন্ধ করে ভাবলেন, আজ যদি তিনি থাকতেন তবে কি বৃন্দাবনবাসীকে এত চিন্তা করতে হত! সব বিপদ থেকে তিনি একাই সকলকে উদ্ধার করতেন। দরকারে প্রলয় বাধিয়ে দিতেন। সেই তাণ্ডবে ফুলে উঠত যমুনার জল, কেঁপে যেত ব্রজধামের মাটি। তারপর সকলে যখন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, তিনি কুঞ্জ সাজিয়ে ফুঁ দিতেন বাঁশিতে। সেই মোহন সুর শুনে কি আর ঘরে থাকা যেত…
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বৃদ্ধা— সে আজ হয়ে গেল কতকাল! তবে কোনও একদিন নিশ্চয়ই তিনি ফিরবেন, তাঁর কিশোরবেলার সখীর জন্য একটিবার…
ভাবতে ভাবতে কখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। উঠোনের উনুনে শুকনো কাঠপাতা জ্বেলে বৃদ্ধা হাঁড়িতে চাল চড়ালেন।
এ বাড়ির সেই অতীত শ্রী আর নেই। এখন ফটক অর্ধভগ্ন হয়ে কোনওমতে দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচিলটা তো ভেঙেই পড়েছে, সেখানে রাস্তা আর উঠোন একাকার।
বৃদ্ধা দেখলেন, রাস্তা দিয়ে কে যেন চলেছে উত্তরপানে। ডাকলেন, “কে যায়?”
একজন রাজপুরুষ এসে দাঁড়ালেন সম্মুখে। ঝাপসা অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না, তবু অনুমান করা যায়— তাঁর পক্ব কেশদামের উপর স্বর্ণমুকুট। পীতবর্ণ রেশমি বসন। কোটিদেশে চক্রসদৃশ কোনও অস্ত্র। সামান্য স্ফীত উদর। মুখমণ্ডলে বয়সজনিত ভাঁজ।
বৃদ্ধা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। উনুনের আগুনের লাল আলোয় চিক্চিক্ করে উঠল চোখের কোণ।
ধীরে ধীরে সে-পুরুষের অবয়ব স্পষ্ট ফুটে উঠল। শুভ্র কুন্তল আর সোনার শিরোভূষণ অদৃশ্য; সেখানে চূড়া করে বাঁধা চুলের মধ্যে একটি ময়ূরপুচ্ছ হাওয়ায় দুলছে। কোথায় মুখের বলিরেখা, স্থূল শরীর? উজ্জ্বল শ্যাম মুখকান্তি আর সুঠাম দেহসৌষ্ঠব— যেন তমালের দৃঢ়তা নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। কোমরে চক্র তো নয়, গোঁজা রয়েছে একটি বাঁশের বাঁশি…
প্লাবিত নয়নে চেয়ে রইলেন বৃদ্ধা… উথলে উঠল হাঁড়ির ভাত…
সকলে জানে, সেই যে তিনি বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় গেলেন, আর ফেরেননি। কিন্তু রাধা জানেন, অনেক অনেক বছর পর একদিন বিকেলের আলোর গায়ে সন্ধ্যার আঁধার ছুঁয়ে দিলে তিনি চুপিচুপি বৃন্দাবনে ফিরেছিলেন। রাধার জন্য নয়। কাগজের জন্য।
