micro-story-sankota-dulche

সাঁকোটা দুলছে

কাকলি দেবনাথ

সাঁকোটা দুলছে। ভয় করছে নিবারণের। এক পা উঠিয়ে, খানিকক্ষণ দু হাতে দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। আস্তে করে আর এক পা তুলল। ধীরে ধীরে পা বাড়াচ্ছে। একটু একটু করে এগোচ্ছে। ওপার থেকে দুটো অল্প বয়সি ছেলে মেয়ে লাফাতে লাফাতে আসছে। জোরে দুলে উঠল সাঁকোটা। নিবারণ ভয় পেয়ে দড়ি ধরে একপাশে বসে পড়ল। ছেলে-মেয়ে দুটো গন্তব্যে পৌঁছে যেতেই আবার ধীরে ধীরে উঠল। একটু কুঁজো হয়ে, এক পা এক পা করে এগোতে থাকল। নীচে গভীর খাঁদ। তাকানোর সাহস নেই। উপরে অনন্ত আকাশ। নিবারণের একমাত্র লক্ষ্য, ধীর পায়ে এগিয়ে চলা। এপার ওপারের মাঝে এই ঝুলন্ত সাঁকো। প্রতিদিন কত মানুষ আসে – যায়। আসে প্রফুল্ল, আসে আব্দুল মাঝি, আসে ইন্দ্রনাথ।

উচ্ছে, বেগুন, পটল মুলোর সংসার। খেলা সাঙ্গ করে সবাইকেই ওপারে ফিরতে হবে। ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে যাওয়াতেই আনন্দ। একজন পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নিবারণ আড়চোখে তাকে দেখল। মনের ভেতর একটা প্রতিযোগিতা চাগাড় দিয়ে উঠছে। লোকটা তাকে হারিয়ে দেবে? নিবারণ তার গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। না, হারলে চলবে না। সাঁকোটা অসম্ভব দুলছে। টাল সামলাতে না পারলেই গভীর খাদে পড়তে হবে। ভীত সন্ত্রস্ত পদক্ষেপ।

লোকটা কিছুদূর গিয়েই বসে পড়েছে। নিবারণ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেল লোকটা কাতরাচ্ছে। একবার মনে হল, কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে? কিন্তু না, নিবারণ দাঁড়ালো না। ভাবল, এমনও তো হতে পারে, এটা লোকটার চাল! আজকাল কাউকে বিশ্বাস নেই। হয়ত তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে গভীর খাদে ফেলে দেবে। পিছনে না তাকিয়ে এগিয়ে চলল নিবারণ।

 “এই যে শুনছেন!” লোকটা ডাকছে। নিবারণ মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল। তারপর পিছনে না তাকিয়ে এগিয়ে চলল। সাঁকোটা জোরে দুলে উঠল। কী ব্যাপার! এত জোরে দুলছে কেন? নিবারণ সাঁকোর দড়ি ধরে বসে পড়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, লোকটা কুঁজো হয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। নিবারণ হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল। না, হারলে চলবে না। নীচ দিয়ে কলকল করে বয়ে যাচ্ছে শান্তি নদী। নদীর দু পারে কমলা লেবুর গাছ। কমলা লেবুতে গাছ ভরে আছে। সেদিকে তাকাচ্ছে না নিবারণ। আকাশে নাম না জানা এক পাখি, মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠল। আচমকা এমন ডাকে নিবারণ বিরক্ত হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ মুক্ত নীল আকাশ। পেঁজা তুলোর মত নীল সাদা মেঘ আকাশ জুড়ে। চট করে চোখ ফিরিয়ে নিল নিবারণ। লোকটা জিতে গেল প্রায়। পৌঁছে গেছে সাঁকোর শেষ সীমানায়। পড়ি কি মরি করে নিবারণ দ্রুত এগোতে থাকল। খুব দুলছে সাঁকোটা। টাল সামলাতে পারছে না সে। ওপার থেকে লোকটা কি সাঁকোটা নাড়াচ্ছে?

 “আরে আরে…” বলতে বলতে নিবারণ পড়ে গেল। পড়তে পড়তে এক হাতে সাঁকোর মোটা দড়ি ধরে ফেলেছে। এখন ঝুলছে সে। জীবন মৃত্যুর মাঝে ঝুলছে। হাত ছাড়লেই গভীর খাদ। মৃত্যুর মুখোমুখি। দম বন্ধ হয়ে আসছে। লেবুর মিষ্টি গন্ধ নেওয়া হল না। মৃত্যু ভয়ে কান গরম হয়ে গেছে। পাখির সুমধুর ডাক শোনা হল না। চোখ খুলে তাকাতে পারছে না। আকাশে মেঘের খেলা দেখা হল না। কত ভালোলাগা, কত ভালোবাসা বুকের ভেতর দম চেপে বসে আছে। হাত অবশ হয়ে যাচ্ছে। আর দড়ি ধরে রাখতে পারছে না নিবারণ। মন জুড়ে এখন একটাই আপসোস, লোকটার কাছে হেরে গেলে, কী এমন ক্ষতি হত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *