শিউলি ফুলের মরশুমে
অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়
পুজো আসতে আর বেশি দেরি নেই। সকাল সকাল স্নান সেরে একটা অফ-হোয়াইট কেরালা কটনের শাড়ি পরে নিল অর্পিতা। সাথে কাঁথাস্টিচের কাজ করা কমলা রঙের ব্লাউজ। তারপর আয়নার সামনে বসে অনেকক্ষণ ধরে বেশ গুছিয়ে মেক-আপ করল। হালকা সাজে খুব শান্ত, স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওকে। শরতের সকালের জন্য এক্কেবারে পারফেক্ট সাজ।
এবার আজকের আসল কাজ। ঠাকুরঘরের মেঝেয় সাঁটা গোল আলপনাটাকে শিউলি ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে তার পাশে বসে পড়ল অর্পিতা। মোবাইল ফোনটাকে অটো-মোডে সেট করে বেশ কয়েকটা সেলফি তুলে নিল। বাছাবাছি করে সবচেয়ে সুন্দর ফটোটা আপলোড করে দিল ফেসবুকে। ক্যাপশন দিল ‘আমার শারদ অর্ঘ্য’।
অর্পিতা ফেসবুকে খুবই অ্যাকটিভ। রোজই কিছু না কিছু পোস্ট করে। কখনও নতুন রান্না, কখনও পুরোনো ফটো। কখনও আবার বিখ্যাত কবিদের লেখা কোনো কবিতা। তবে ওইসব পুরোনো ফটো আর কবিতায় খুব বেশি লাইক পড়ে না। লাইক পড়ে ওর রান্নার রেসিপিতে আর সুন্দর করে সাজগোজ করা ফটোতে। পনেরোই আগস্টে পোস্ট করা তিন রঙা চন্দ্রপুলির রেসিপিটা! ওটা তো একেবারে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। কতজন যে শেয়ার করেছিল ওই রেসিপিটা! এ বছর পুজোর জন্যও অর্পিতা বেশ জবরদস্ত প্ল্যান কষে রেখেছে। ষষ্ঠী থেকে দশমী, পাঁচদিনে পাঁচটা নতুন রেসিপি দেবে আর রোজ সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাইকে পুজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে ভিডিও পোস্ট করবে। কোনদিন কি শাড়ি পরবে সেটাও এখন থেকেই ঠিক করে রেখেছে। ষষ্ঠীতে গরদ, সপ্তমীতে জামদানী, নবমীতে কাঞ্চীভরম, দশমীতে চওড়া পাড়ের তাঁতের শাড়ি। আর অষ্টমীতে? অষ্টমীতে অর্পিতা বেনারসী পরবে। অষ্টমীর দিন বেনারসী পরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে।
ফেসবুকে ফটো পোস্ট করার পর প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে গিয়েছে। এবার একবার দেখে নিতে হবে কেমন লাইক পড়ল। ওরে বাব্বা! যা ভেবেছিল তার থেকে অনেক অনেক বেশি রি-অ্যাকশন! এত্তো জন কমেন্ট করে ওকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়েছে! কেউ লিখেছে ‘আপনার পুজো খুব ভালো কাটুক’, কেউ আবার লিখেছে ‘বাঙালি রান্নার রেসিপি চাই, পুজোর সময় বানাবো’। বাব্বা! এতো সকালেও এতোজন অ্যাকটিভ থাকে ফেসবুকে!
লম্বা একটা নিঃশ্বাস নেয় বাহাত্তর বছর বয়সের অর্পিতা। বছর খানেক আগে যখন শিবব্রত জাগতিক মায়া কাটিয়ে চিরতরে চলে গিয়েছিল তখন ও একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। মাঝে মাঝে ওর মনে হত এভাবে একা একা বেঁচে থেকে কি লাভ!
নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য অর্পিতা সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নেয়। অনেক পুরোনো বন্ধু রয়েছে সেখানে। কিন্তু তারা কেউই খুব একটা সাহায্যে আসে না। হয় তারা নিজেদের দুঃখের কথা বলে আর নয়তো অর্পিতাকে অযাচিত ভাবে একগাদা জ্ঞান দেয়। দুঃখ আর জ্ঞান, দুটোর কোনোটাই তেমন ভালো লাগে না অর্পিতার। একটু পজিটিভ-ভাইব পাওয়ার জন্যই তো সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা।
ফেসবুকে একেবারে অচেনা লোকজনের সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে শুরু করে অর্পিতা। সেই সব অপরিচিত মানুষেরা ওর ফটোতে লাইক দেয়, পোস্টে কমেন্ট করে। দেখে ভালো লাগে অর্পিতার। অর্পিতা একটু পজিটিভ-ভাইব পায়। প্রতিদিন কিছুটা সময় কেটে যায় খুব সুন্দরভাবে।
অর্পিতা আর একবার ফেসবুকের আপডেট চেক করে। একজন কমেন্ট করেছে ‘আপনার পুজোর সাজ দেখার অপেক্ষায় রয়েছি’। অর্পিতার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো আনন্দের হাসি ঝিলিক দেয়। শিবব্রত না থাকলেও এ বছরের পুজোটা ওকে একা একা কাটাতে হবে না। অর্ন্তজালের অগণিত বন্ধু সারাক্ষণই ওর সাথে থাকবে।
