শিরোনাম
শুভ্রা বেজ
আমি কবীর। নাম শুনে অনেকেই ধন্দে পড়েন কিন্তু গোঁড়া বামুন। প্রায় আঠারো বছর পরে দেশে এলাম, কানাডায় থাকি সপরিবারে। এম. এস করতে গিয়ে প্রেমে পড়লাম লিজা’র। শান্ত সুন্দর এক ফরাসি মেয়ে লিজা। বাড়িতে ঘোর আপত্তি সত্বেও ওকেই বিয়ে করেছি। কিছুদিনের মধ্যেই বাবা ও মা চলে গেলেন। কলকাতায় হোটেলে থাকি। শান্তিনিকেতনে বাবা যে বাড়ি বানিয়েছিলেন সেটা আমার খুব প্রিয়।
আঠারো বছরে কলকাতার আমূল পরিবর্তন, পরিবর্তন সেই মেঠো গোয়ালপাড়াতেও। কিন্তু মাধবদা বাড়িটাকে খুব যত্ন করে আগলে রাখে।
হেমন্তের গোলাপী বিকেলে গিয়ে পৌঁছলাম আমাদের ছায়ানটে। বাড়ির নাম, মায়ের দেওয়া। মা রাগসঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। সুচারু, ছিমছাম ছায়ানটে ঢুকতেই প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল। মাধবদা গরম কফি এনে দিলো। স্নান সেরে বাগানে ঘুরছিলাম…
আবছা সন্ধ্যায় দূরে এক অবয়ব, ছায়া ছায়া। মহিলা!! দীর্ঘদিন বিদেশবাসের জন্য উচ্চারণে একটা বদল এলেও আমি বাংলা ভালোই বলতে পারি। এমনকি লিজা আর অ্যানি মানে আমার মেয়েও বাংলা বলতে পারে।
— আচ্ছা মাধবদা, ঐ গাছে এখনও শিউলি ফোটে? আর পূবদিকের ঐ গাছটায় বকফুল? ইনকা আর জারবেরা লাগিয়েছো দেখলাম।
— হ, ছোটকত্তা। কদ্দিন পরে এলে। থাকো দিকিনি মাসখানেক। আমি আর ক’দিন, বাড়িঘর সামাল দিতে হবে তোমাকে ইবার।
— হা হা হা। বেশ, হাঁসের মাংস রেঁধো একদিন।
— হ হ। রাঁধবোক।
বীরভূমের এই মেঠোভাষা আমার খুব মিষ্টি লাগে। সত্যিই মাধবদার পরে কে দেখভাল করবে বাড়িটার? ভেবে তল পাই না।
দুদিন পরে…
রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই এগিয়ে গেছি। দূর থেকে সাঁওতালি নাচের আওয়াজ আসছে, বাউলগান আর অস্পষ্ট হাটের ছবি। ভিডিও কলে লিজাকেও দেখালাম। খুব খুশি সে।
আরও কিছুটা এগিয়েছি, একি! সেই মেয়েটার মতো যেন। হেমন্তের সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। সেই তিনসন্ধ্যায় আমার মুখোমুখি যেন কৃষ্ণকলি! চিকণকালো, গায়ে লালছাপা শাড়ি, ব্লাউজহীন। আমায় দেখে তাড়াতাড়ি আটপৌরে আঁচল টেনে কাঁধ ঢাকে। এত শার্প চোখ নাক আর খরখরে ঠোঁট তার গায়ের রঙে বাধা হয়নি। আবেদনময়ী হাসি নিয়ে ঠোঁট কামড়ে আমার দিকে এক অপূর্ব বিভঙ্গে দাঁড়িয়ে। আঠাশ ডিগ্রিতেও আমার পাঞ্জাবি ঘামে ভিজছে কেন?
— তু হেথায় লতুন বটে, লয়? রিণরিণে কণ্ঠে বলে ওঠে মেয়েটি।
— অ্যাঁ? হ্যাঁ। হুমম। নতুন। তোমার নাম কি?
— জোনাকি। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। আমি জোনাক ধরি বোতল ভ’রে। হি হি হি… ছুট দিলো সে। আমিও ঘরমুখো।
মাধবদা শুনে হাসে… উ তো পাগলি বটেক, রেতের বেলায় জোনাই ধরে… বাপটো মরে যাওয়া থেকেই ঐ রোগে ধরেছে… মা’ টো কানা… ভিক্ষে করে খায় দুজনা…
পরেরদিন আবার সেই পথ টানলো আমাকে। মন উচাটন। ঐ তো! আজ লালফিতে দিয়ে টানটান করে চুলবাঁধা।
— ই বাবু, তুই তো হামাকে ঘরে ডাকলি না?
— না। কাল সকালে এসো। কিছু দরকার?
— লাহ্… দৌড়ে চলে গেল। হাঁফ ছাড়লাম। মাধবদা আজ হাঁসের মাংস রেঁধেছে। উফফ। ঝালে ঝোলে এক্কেরে খাসা। এক পেগ হুইস্কি সঙ্গে। হালকা ঠান্ডায় ছাদে ঘুরছি, আরে! ও কি?
— তুর ধলা রং, আমাকে পছন্দ লয় আমি জানি। কিন্তুক শহরের লোকগুলান এই কালা শরীলটাকে নিয়ে কত্তো কসরৎ করে… ছবি আঁকে… পয়সা দেয়…
— তোমার ওসব ভালো লাগে?
— জানিলা, তাই জোনাক ধরি। তুই ঠিক বোসেদের টিভির বিজ্ঞাপনের মতন। হি হি হি…
হিমঝুরি রাতে কামোষ্ণ ঠোঁট কাছে টেনে নিলো বছর তেইশের উদ্ধত যৌবনকে। বাধা দেয়নি সেও। বুকে হাত রেখে চুমু এঁকে দিলাম ওর আদুল গায়ে। মূর্তিমতী ভাস্কর্যকে টাকা দিয়ে পণ্য করেনি পঁয়তাল্লিশের কবীর।
অপরাধবোধ? নাহ্। কিন্তু জোনাকির ঠিকানায় প্রতিমাসেই টাকা পাঠাতাম ওদের প্রয়োজনেই।
পাগলি? তবে সেই রাতের কথা গোপন করলো কেন?
