micro-story-suchetana

সুচেতনা

ঋতুপর্ণা রুদ্র

রাত এগারোটা বাজে। বরাবরের অভ্যাস মতো, অসিতবাবু শোবার আগে বালিশ, বিছানা, লকার, সব যথাযথ আছে কি না দেখছিলেন। হঠাৎই মিষ্টি গন্ধ পেলেন। কে এসেছে দেখার জন্য, দরজার লক খুলে বাইরে উঁকি দিলেন অসিত। সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে এল সুচেতনা। অনেকটা দমকা হাওয়ার মতো।

এত রাতে সুচেতনাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন অসিত। সুচেতনা অবশ্য সে’সবে ভ্রুক্ষেপ না করে, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের মাঝখানে। চোখে কেমন রাগ রাগ ভাব।

এর আগে সুচেতনা এই ঘরে আসেনি কখনও। এমন না, যে দেখা হয় না দুজনের। দেখা হয়। মাঝেমধ্যে সভা সমিতি সেরে ফেরার সময়ে পার্কে, বা বাগানে বসেন কিছুক্ষণ। তখন কথাবার্তা হয়। আজ এখানে কীভাবে চলে এল?

“কিছু বলবে সুচেতনা? কী হয়েছে?”

“তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই, অসিতদা?”

“কী বলছ, কিছুই বুঝতে পারছি না। অবসর পেলে তোমাকে ডাকি। আজ নিজে এলে কীভাবে?”

“সত্যিই বুঝতে পারছ না? কেন এসেছি? তুমি যে আগ্নেয়গিরির উপরে বসে আছ অসিতদা। ভয় করে না?” ফিসফিসে হয়ে এসেছে সুচেতনার গলার স্বর।

“আগ্নেয়গিরি?” চারপাশে তাকান অসিত। দোতলায় পুব দক্ষিণ খোলা মস্ত শোবার ঘর তাঁর। বাড়ি ঘিরে বাগান। দু’টো ডোবারম্যান কুকুর আছে৷ গেটে পাহারা দিচ্ছে দারোয়ান। উঁচু পাঁচিলের উপরে বিদ্যুৎ পরিবাহী তার আছে ফুট তিনেক। তাহলে? ভয় কিসের?

“কত টাকা রেখেছ বিছানার মধ্যে? আলমারিতে? বাথরুমের আয়নার পিছনে ছোট সিন্দুকে? এই ঘরে আর কোথায় কোথায়?”

এইবারে একটু নিশ্চিন্ত হন অসিত। “টাকার জন্য ভয় পাব কেন সুচেতনা? ওটাই তো আমার শক্তি। এই গদি পুরোটাই টাকার বানানো। তার দুপাশে স্পঞ্জের আস্তরণ আছে। খাটের প্রতিটা সাইডে লুকনো ভল্ট আছে, তাতে সোনার বাট রাখা। বাথরুমে, সিন্দুক ছাড়াও উত্তর দিকের দেওয়ালে দুটো টাইলস খোলা যায়। তার পিছনে আমার সমস্ত বেনামীতে কেনা সম্পত্তির কাগজপত্র। ছাতের ফলস সিলিং এর ভিতরে…”

কথা শেষ করতে না দিয়ে সুচেতনা বলে, “তুমি কাগজ পড়ো না অসিতদা? রোজ কোথাও না কোথাও রেইড হচ্ছে, জেলে পুরছে। যদি তোমাকেও কেউ নিয়ে যায়?”

হাহা করে হেসে উঠলেন অসিত। “অসিতদাকে আজও চিনলে না সুচেতনা? কেউ আসবে না এখানে। যারা আসবে ভাবছ, তাদের ম্যানেজ করেছি। আমি নিশ্চিন্ত। ব্যাটাদের খাঁই খুব। রেট কমায় না একদম। আমার কাছে অবশ্য সামান্য বিষয়। ওরা ভাবল প্রচুর দাঁও মেরেছে। আসলে সমুদ্র থেকে একঘটি জল নিয়েছে।” হাসতে হাসতে চোখে জল আসে অসিতের।

সুচেতনা হাসছে না। “তোমার বিদেশের সম্পত্তি? যদি কেউ জানতে পারে?”

“ট্যাক্স হেভেন জানো? সেখানেই আছে সব।”

“কত?”

“আমিও জানি না সুচেতনা। হিসেব গুলিয়ে গেছে অনেকদিন। লিখে রাখতে বারণ আছে, তাই লিখে রাখি না। কত আছে, জিজ্ঞেস কোরো না। ওই যে বললাম, সমুদ্র।”

“এত টাকা দিয়ে কী করবে অসিতদা?”

এই প্রথম সামান্য অসহায় লাগে অসিতকে। উত্তরটা মাথায় আসে না।

“আমি চলি। সাবধান করে দিলাম। সবাইকে কি টাকা দিয়ে আটকে রাখা যায়? যদি ধরে নিয়ে যায়!”

“বোসো সুচেতনা। কতদিন দেখিনি তোমায়, আজকাল এত কম আসো।”

সুচেতনা বসল না, চলে গেলো। অসিত তাকিয়ে রইলেন, তার কলেজ জীবনের ভালবাসার গমনপথের দিকে। একুশের পরে সুচেতনার বয়স বাড়েনি।

ও যাই বলুক, অসিত নিশ্চিন্ত। কেউ আসবে না এখানে। টাকায় বশ হয় না, এমন কেউ আছে নাকি! ধরে নিয়ে যাবে কে?

অসিত জানতেন না, পরদিন খবরের কাগজের হেডলাইন হবে, ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিশিষ্ট সমাজসেবী এবং রাজনৈতিক নেতা অসিত মণ্ডলের জীবনাবসান হয়েছে৷ তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী সহ সমাজের বিশিষ্ট মানুষেরা।

দূরের আকাশে, সুচেতনা তখন তারা হয়ে ফুটে আছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *