novel-shadow-of-the-radcliff

শ্যাডো অফ দ্য র‍্যাডক্লিফ লাইন

অজিতেশ নাগ

১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। স্বাধীনতার বয়স সবে এক বছর এক মাস। কিন্তু কোলকাতার আকাশে সেই উৎসবের কোনও রেশ নেই। বরং সেখানে জমে আছে দেশভাগের এক দগদগে, নীলচে বিষণ্ণতা। আমহার্স্ট স্ট্রিটের দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঔপনিবেশিক আমলের জরাজীর্ণ বাড়িগুলো যেন একেকটা বোবা সাক্ষী। নোনা ধরা দেওয়াল থেকে চুনবালি খসে পড়ছে ঠিক যেমনভাবে মানুষের জীবন থেকে খসে পড়েছে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের আশ্বাস।

দেশভাগের ক্ষত এখনও টাটকা। শহরের বাতাসে উত্তেজনার একটা চাপা রেশ সব সময় লেগে আছে। কিন্তু এই শেষ রাতে, আমহার্স্ট স্ট্রিটের চওড়া ফুটপাথ আর ব্রিটিশ আমলের চুনবালি খসা অট্টালিকাগুলো যেন কোনও এক গভীর রহস্য বুকে চেপে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়ার গাড়ির চাকার দাগ বসা ভিজে রাস্তাটা চকচক করছে কালচে আয়নার মতো, যেন সেখানে পা রাখলেই কোনও নিষিদ্ধ ইতিহাসের পাতা উল্টে যাবে। আধো-আলো আর এই একটানা বৃষ্টির শব্দ মিলে এক এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটা অন্ধকার গলির মুখ থেকে মনে হচ্ছে এই বুঝি কোনও ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসবে।

আকাশটা আজ সকালেই তামাটে বর্ণ ধারণ করেছিল, তারপর নামল সেই অসময়ের অবাধ্য বৃষ্টি। শরতের সাদা মেঘের বদলে ঝুলে আছে সিসে-রঙা মেঘের পাহাড়। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের ব্যালকনি আর কার্নিশ বেয়ে জল পড়ার শব্দটা যেন কোনও কান্নার একটানা সুর। রাস্তার ম্যানহোলগুলো অনেক আগেই হার মেনেছে। উপচে পড়া নোংরা জল এখন রাজপথের দখল নিয়েছে। সেই জলের ওপর ভেসে যাচ্ছে ছেঁড়া খবরের কাগজ, বিড়ির টুকরো আর মানুষের ক্লান্ত অস্তিত্বের কিছু ভাঙা অবশেষ।

রাস্তার ধারের রোয়াকগুলোতে উপচে পড়ছে ওপার বাংলা থেকে আসা সর্বহারা মানুষের ভিড়। তাদের চোখের চাউনিতে না আছে নালিশ, না আছে প্রত্যাশা, আছে শুধু এক জমাট বাঁধা শূন্যতা। গুমোট ভ্যাপসা গরমে ভিজে কাপড়ের কটু গন্ধ আর নর্দমার পচা জল মিলেমিশে বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে ভারি চাকার লরি, যার চাকা থেকে ছিটকে আসা জল ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া কোনও পরিবারের একমাত্র সম্বলটুকু।

দাঙ্গা-পরবর্তী কোলকাতা এখন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢাকা। মোড়ে মোড়ে পুলিশের টহল কমলেও মানুষের মনের সন্দেহ মেটেনি। সকাল হলেই আমহার্স্ট স্ট্রিটের প্রতিটি গলির মোড়ে জটলা পাকাচ্ছে একদল যুবক। কারও হাতে বাসি খবরের কাগজ, কারও চোখে আগামীর অনিশ্চয়তা। ট্রামলাইনের ওপর জমে থাকা জল থেকে বিদ্যুতের নীল স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠছে, যেন শহরের ভিতরে ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

এই সড়কেরই এক জীর্ণ তিনতলা মেসবাড়ির দোতলার কোণের ঘরে লণ্ঠনের ম্লান আলোয় বসে ছিল ডঃ অনিমেষ লাহিড়ী। অনিমেষবাবু সিটি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক। বয়স তেত্রিশ কী চৌত্রিশ, কিন্তু অতিরিক্ত পড়াশোনা আর লাইব্রেরির ধুলো ঘাঁটার ফলে চোখে বড় পাওয়ারের চশমা। উপরন্তু কপালে জেগে থাকা চিন্তার রেখার জন্য তাকে একটু বেশিই বয়স্ক দেখায়। তার ঘরটি ছোট, কিন্তু বইয়ের ভারে সেটি যেন আরও সংকুচিত হয়ে এসেছে। তক্তপোশের তলায়, আলমারির মাথায়, এমনকি জানালার তাকেও থরে থরে সাজানো পুরোনো গ্যাজেটিয়ার, মানচিত্র আর ইতিহাসের নথি।

অনিমেষ তখন মগ্ন হয়ে পড়ছিল আঠেরোশো শতাব্দীর বাংলার ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার উপরে লেখা একটি পাণ্ডুলিপি। লণ্ঠনের শিখাটা তেলের অভাবে মাঝে মধ্যে কেঁপে উঠছে, আর সেই কাঁপুনির সঙ্গে দেয়ালে অনিমেষের বিশাল ছায়াটা ভূতুড়ে ভঙ্গিতে দুলছে।

হঠাৎই মেসবাড়ির নিচে সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। এই বৃষ্টিভেজা শেষ রাতে মেসের অন্য বাসিন্দাদের কারও জেগে থাকার প্রশ্ন নেই এবং কারও বাইরে থাকারও কথা নয়। তবে কড়া নাড়ে কে? অনিমেষ কান খাড়া করল।

নীচে মেসের রাঁধুনি রঘুনন্দনের গলার আওয়াজ আর সেই সঙ্গে দরজা খোলার শব্দ হল। আর তারপরেই দ্রুত একজোড়া পায়ের শব্দ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতে লাগল। সিঁড়িগুলো পুরোনো কাঠের, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সেগুলো আর্তনাদ করে উঠছে। শব্দটা অনিমেষের ঘরের দরজার সামনে এসে থামল। তারপর এক উন্মত্ত ধাক্কা, “অনিমেষ! অনিমেষ! দরজা খোল! আমি পরেশ!”

অনিমেষ চমকে উঠল। পরেশ! স্কুলজীবনের প্রিয় বন্ধু পরেশ পাল? বিগত মাস ছয়েক হল ওর কোনও পাত্তা পাওয়া যায়নি। অনিমেষ দ্রুত গিয়ে খিল খুলতেই ঝড়ের বেগে এক মূর্তি ভিতরে আছড়ে পড়ল যেন। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে পরেশের শরীরের অবস্থা দেখে অনিমেষ শিউড়ে উঠল। পরনে আধময়লা একটা পাঞ্জাবি, যা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কালো পাতলুনের জায়গায় জায়গায় কাদার ছাপ। বৃষ্টিভেজা চুলগুলো ওর কপালে লেপ্টে আছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ওর চোখের দৃষ্টি। সেখানে যেন বাসা বেঁধেছে এক আদিম আতঙ্ক। পরেশ হাঁপাচ্ছে, ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অনিমেষ ওর কাঁধ চেপে ধরল, “পরেশ? তুই এই অবস্থায়? কোত্থেকে আসছিস?”

পরেশ কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। ও শুধু মেঝের দিকে তাকিয়ে ধুঁকছিল। অনিমেষ টেবিলের উপরে রাখা কুঁজোটা থেকে জল গড়িয়ে এগিয়ে দিল। পরেশ এক চুমুকে জলটা খেয়ে গ্লাসটা ঠকাস করে টেবিলে নামিয়ে রাখল। অনিমেষ খেয়াল করল, পরেশের হাত কাঁপছে।

“অনিমেষ, সময় নেই। আমার পেছনে লোক লেগেছে। ওরা… ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।” পরেশ নীচু গলায় ফিসফিস করে বলল।

অনিমেষ দারুণ অবাক হল, “কারা? তুই জলপাইগুড়িতে ছিলি, শুনেছিলাম যেন?”

“জলপাইগুড়িতে নয়, আমি হিলিতে ছিলাম।”

হিলি! নাম শুনতেই অনিমেষ চিনতে পারল। উত্তরবঙ্গের এই হিলি নামের গ্রামটি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত। এটি জেলা সদর বালুরঘাট থেকে প্রায় ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা। দেশভাগের সময় হিলি গ্রামটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এর পশ্চিম অংশ ভারতে পড়ে, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় আর পূর্ব অংশ চলে যায় বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলায়। ভারতের অংশে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল চেকপোস্ট’ বসানো হয়েছে। অনিমেষ বলল, “ওখানে কী করছিলি?”

“বর্ডারের কাছে কিছু জরুরী কাজ করছিলাম এক সাহেবের সঙ্গে। সেখানেই আমি এটা পাই।”

বলেই পরেশ কাঁপা হাতে ওর পাঞ্জাবির ভিতরের পকেট থেকে পুরোনো খবরের কাগজে মোড়া একটা ভারি বস্তু বের করল। মোড়ক খুললে দেখা গেল, ভিতরে একটা কালো চামড়ায় বাঁধানো জীর্ণ ডায়েরি। ডায়েরিটার কোণগুলো ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু কভারের উপরে একটি ব্রিটিশ রাজকীয় সিলমোহর এখনও উজ্জ্বল।

“এটা তো একটা ডায়েরি!” অনিমেষ অবাক হয়ে ডায়েরিটার দিকে তাকাল।

“এটা শুধু ডায়েরি নয় রে অনিমেষ, এটা একটা মরণফাঁদ। স্যার সিরিল জন র‍্যাডক্লিফ যখন দেশভাগের লাইন টানছিলেন, তখন তার টিমে একজন ব্রিটিশ সার্ভেয়ার ছিলেন, নাম ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিং। ব্রিটিশরা যখন ভারতের মানচিত্র তৈরি করছিল, তখন এই জেমস হার্ডিং ভদ্রলোক উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স, দেরাদুন এই সব অঞ্চলের জরিপের কাজে যুক্ত ছিলেন। যাক গে। এই ডায়েরিটা ওর। হার্ডিং সাহেব বর্ডারের এমন কিছু এলাকা চিহ্নিত করেছিলেন, যা ভারতের মানচিত্রে নেই। উত্তরবঙ্গের এমন এক গোপন করিডোর, যা ভারত বা পাকিস্তান, কোনও দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেনি এখনও। কিন্তু সেই করিডোর দিয়ে এমন কিছু পাচার হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে যা বদলে দিতে পারে এই দুই দেশের ভবিষ্যৎ।”

অনিমেষ ইতিহাসের অধ্যাপক। সে জানে ১৯ জুলাই ১৯৪৭-এর পর সীমান্ত নিয়ে কত কারচুপি হয়েছে। কিন্তু হার্ডিং সাহেবের নাম সে কখনও শোনেনি। সে ডায়েরিটা হাতে নিতেই বুঝতে পারল, এর ভিতরে কোনও এক অদ্ভুত রহস্য লুকোনো আছে। ডায়েরিটার ভিতর থেকে একটা পচা পুরোনো কাগজের গন্ধ আসছে। সে বলল, “আরে, তুই দাঁড়িয়ে কেন? বোস? কোথায় ছিলি, কী করছিস…”

অনিমেষকে থামিয়ে দিয়ে পরেশ দ্রুত বলল, “অনিমেষ, আমি আড্ডা মারতে আসিনি। আমি জানি ওরা আমার গতিবিধির উপরে নজর রাখছে।”

“কারা!”

সে কথার উত্তর না দিয়ে পরেশ বলল, “আমি চাই এই ডায়েরিটা তোর কাছে থাকুক। ওরা ভাববে আমি এটা নিয়ে বর্ডারের ওপারে পালিয়েছি। তুই একজন হিস্টোরিয়ান। তুই বুঝবি এটার গুরুত্ব। অনিমেষ, যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তবে এর পেছনের সত্যটা বের করিস, ভাই। ডায়েরির ভিতর লাল কালির দাগগুলো দেখিস…”

পরেশের কথা শেষ হল না। নীচে রাস্তার মোড়ে একটা গাড়ির টায়ার ঘষার শব্দ শোনা গেল। তারপরেই সদর দরজায় ঘন ঘন কড়াঘাত আর অনতিবিলম্বে চার-পাঁচ জোড়া ভারি বুটের শব্দ মেসবাড়ির চাতালে। পরেশ বিদ্যুদ্বেগে জানালার দিকে ছুটল। একবার পিছন ফিরে বলল, “অনিমেষ, ডায়েরিটা লুকো! এক্ষুনি লুকো!”

পরেশ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গরাদহীন খোলা জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার গলিতে ঝাঁপ দিল। দোতলা থেকে পড়ার শব্দ হল, একটা অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ, তার পরেই জলের উপর দিয়ে দ্রুত দৌড়নোর শব্দ মিলিয়ে গেল দূরে। অনিমেষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ডায়েরিটা নিজের তক্তপোশের তোষকের তলায় ছুঁড়ে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এক প্রচণ্ড লাথি এসে পড়ল। ভেজানো দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। ভিতরে ঢুকে এল পাঁচ জন দীর্ঘকায় পুরুষ। তাদের পরনে লম্বা কালো রেইনকোট, প্রত্যেকের হাতে উদ্যত রিভলভার। একজন আগন্তুক জানালার দিকে ছুটে গিয়ে নীচে তাকিয়ে কাকে যেন উদ্দেশ্য করে গর্জন করল, “ওকে ধর!”

আরেকজন অনিমেষের দিকে এগিয়ে এল। লোকটার ডান গালে একটা গভীর কাটা দাগ, মাথার টুপি চোখ ছাপিয়ে নীচে নেমেছে। রিভলভারের নলটা অনিমেষের বুকে ঠেকিয়ে সে বলল, “প্রফেসর, বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল তো? ডায়েরিটা কোথায়?”

অনিমেষের সারা শরীর হিম হয়ে এল। সে দেখতে পেল, লোকটার আঙুল ট্রিগারের ওপর নড়ছে। জীবনের প্রথমবার মৃত্যুর এত কাছে এসে তার মনে হল, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না, ইতিহাস মাঝে মাঝে রক্ত আর বারুদের গন্ধে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অনিমেষ বলল, “আমি… আমি জানি না আপনারা কোন ডায়েরির কথা বলছেন। আর আমার বন্ধু, ও তো শুধু দেখা করতে এসেছিল।”

“দেখা করতে এসে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গেল। আপনার বন্ধুটি তো খুব অদ্ভুত!”

বলেই লোকটা ঘরের ভিতরে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল। চারদিকে বইয়ের স্তূপ, নথিপত্র আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাগজ। লোকটার দৃষ্টি একবার বিছানার দিকে গেল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নীচে মেসের অন্য বাসিন্দাদের গোলমাল শোনা গেল। কে যেন চিৎকার করে পুলিশ ডাকার কথা বলছে। লোকটি অনিমেষের দিকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বলল, “আবার দেখা হবে, প্রফেসর। তবে পরের বার এই প্রফেসর-সুলভ মিথ্যে দিয়ে নিজের প্রাণটা বাঁচাতে পারবেন না।”

আগন্তুকরা ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নিচে একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ পাওয়া গেল এবং ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে গেল দূর থেকে দূরে।

অনিমেষ মেঝেতে বসে পড়ল। তার কানের পাশ দিয়ে ঘাম চুঁইয়ে পড়ছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বাইরে বৃষ্টি আরও বেড়েছে বলে মনে হল। সে দরজা বন্ধ করে জানালাটা দিয়ে একবার বাইরে তাকাল আর তাকাতেই তার চোখে পড়ল, আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে, রাস্তার ওপারে, একটা কালো রঙের অস্টিন গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সরে এসে তোষকের নীচ থেকে ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির ওপরে ব্রিটিশ সিলমোহরের পাশে ছোট করে লেখা একটি তারিখ। ১৯ জুলাই, ১৯৪৭।

ভোর হতে তখনও খানেকটা বাকি। বৃষ্টির তোড় কমলেও একটা একনাগাড়ে ঝিরঝিরে শব্দ আমহার্স্ট স্ট্রিটের নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। আমহার্স্ট স্ট্রিটের আকাশটা যেন তালের রস নিঙড়ানো কালচে ধূসর রঙের একটা চাদরে ঢাকা। রাতভর যে দাপুটে বৃষ্টি রাজপথ আর গলিগুলোকে চাবুক মেরে গেছে, তার তেজ এখন মিইয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু ক্লান্তি নেই। সেই প্রবল গর্জন এখন থিতু হয়েছে একনাগাড়ে চলা এক ঝিরঝিরে শব্দে। রাস্তার ধারের গ্যাসের বাতিগুলো তখন টিমটিম করে জ্বলছে, যার হলদেটে ম্লান আলো বৃষ্টির সূক্ষ্ম কণাগুলোর গায়ে পড়ে একটা অদ্ভুত কুয়াশার মতো মায়া তৈরি করেছে। আশেপাশের বাড়িগুলোর খড়খড়ি দেওয়া জানালাগুলো বন্ধ। চারপাশটা এতটাই নিঝুম যে, সেই একটানা বৃষ্টির শব্দের মাঝখানে দূরে কোথাও কোনও নর্দমা দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের তোড় বা কোনও পুরনো বাড়ির কার্নিশ থেকে ঝরে পড়া জলের শব্দও কানে এসে বিঁধছে।

মেসবাড়ির তক্তপোশে বসে অনিমেষ লাহিড়ী এখন এক মূর্তির মতো স্তব্ধ। তার কোলের ওপর পড়ে আছে সেই চামড়ায় বাঁধানো ব্রিটিশ ডায়েরিটা। লণ্ঠনের তেল ফুরিয়ে আসছে, শিখাটা মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠে দেয়ালে দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। অনিমেষের মনে হচ্ছিল, সেই ছায়াগুলো আসলে অতীতের কোনও প্রেতাত্মা, যারা এই ডায়েরির ভিতর বন্দি ছিল এতকাল। পরেশকে ওই অবস্থায় জানালা দিয়ে ঝাঁপ দিতে দেওয়ার দৃশ্যটা অনিমেষের বুকের ভিতরে এখনও ধড়ফড় করছে। পরেশ কি বাঁচবে? ওই রিভলভারধারী লোকগুলো কারা ছিল? তাদের চোখে যে পেশাদার হিংস্রতা ছিল, তা কোনও সাধারণ অপরাধীর নয়। ওগুলো ছিল প্রশিক্ষিত শিকারির দৃষ্টি। অনিমেষ ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে জানেন, ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় অনেক গোপন দল তৈরি হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল পর্দার আড়ালে সীমান্ত নিয়ে দর কষাকষি করা। এরা কি সেই ‘শ্যাডো এজেন্সির’ কেউ?

অনিমেষ কম্পিত হাতে ডায়েরিটার প্রথম পাতা ওল্টাল। ভিতরের কাগজগুলো হলুদ হয়ে গেছে, একটা ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে আসছে। অনিমেষের আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছিল, যেন সে কোনও ডায়েরি নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে ঘুমিয়ে থাকা কোনও এক অস্থির প্রেতাত্মাকে জাগিয়ে তুলছে। ডায়েরির পাতাগুলো এখন আর সাদা নেই, সময়ের প্রলেপ পড়ে সেগুলো বিষণ্ণ হলদেটে বর্ণ ধারণ করেছে। ঠিক যেন শরতের ঝরা পাতার মতো জীর্ণ আর ভঙ্গুর, একটু জোরে চাপ লাগলেই ঝুরঝুরে হয়ে ঝরে পড়বে। কাগজের বুক চিরে বের হওয়া সেই তীব্র স্যাঁতসেঁতে গন্ধটা অনিমেষের চশমার কাঁচদুটোকে যেন আরও ঝাপসা করে তুলল। দীর্ঘকাল বদ্ধ আলমারির অন্ধকার কোণে পড়ে থেকে ডায়েরিটার গায়ে একটা আঁশটে, পুরোনো পাণ্ডুলিপির মতো গন্ধ সেঁটে গেছে। পাতার ওপর কালির লেখাগুলোতেও সময়ের দাপটে কিছুটা ফ্যাকাসে হয়ে নীলচে ছোপ ধরেছে। কালির সেই রেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে অনিমেষের মনে হল, এগুলো কেবল অক্ষর নয়, কোনও এক বৃষ্টির রাতে কোনও এক রুদ্ধশ্বাস মানুষের হৃদস্পন্দন এখানে থমকে আছে। বাইরে তখনও আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেই একনাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ হয়ে চলেছে, আর ঘরের ভেতর হলদেটে পাতার ওপর দিয়ে অনিমেষের কম্পিত হাত যেন সময়ের কয়েকটা বড় ধাপ পেরিয়ে এক অন্ধকার অতীতে পা রাখতে চলেছে।

তৃতীয় পাতায় কোনও লেখা নেই, শুধু হাতে আঁকা একটি অদ্ভুত নকশা। নকশাটা দেখতে অনেকটা একটা পাহাড়ী নদীর গতিপথের মতো, যার একপাশে ঘন জঙ্গল আর অন্যপাশে খাঁজকাটা পাহাড়। কিন্তু নকশাটার ওপর দিয়ে লাল কালিতে একটা চওড়া রেখা টানা হয়েছে, যার ওপর লেখা, ‘দ্য জিরো লাইন: নট টু বি ডিসক্লোজড’।

অনিমেষের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে চশমাটা খুলে পাঞ্জাবির খুঁটে মুছে আবার চোখে পড়ল। ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে মানচিত্র বোঝা তার সহজাত অভ্যাস। এই নকশাটা উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি বা হিলি অঞ্চলের কাছাকাছি কোনও একটা এলাকার হতে পারে। কিন্তু ‘জিরো লাইন’ কথাটার মানে কী? তারিখ লেখা আছে ১৯ জুলাই, ১৯৪৭। অর্থাৎ দেশভাগের ঠিক প্রায় এক মাস আগে কেন এই মানচিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল?

হঠাৎ মেসবাড়ির একতলায় রঘুনন্দনের হাঁকডাক শোনা গেল। এটা ভোর হওয়ার সঙ্কেত। অনিমেষ বুঝল, এই ঘরে আর থাকা নিরাপদ নয়। যারা রাতে এসেছিল, তারা নিশ্চয়ই মেসবাড়ির ওপর নজর রাখছে। তারা জানে অনিমেষ ডায়েরিটা পেয়েছে। রাতে পুলিশের ভয়ে পালিয়ে গেলেও, সকালে এসে পুরো ঘর তোলপাড় করতে পারে। সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। পাঞ্জাবী আর ধুতি পরে নিয়ে, দেরাজ থেকে সামান্য কিছু টাকা আর খুচরো পকেটে ঢুকিয়ে নিল। তারপর ডায়েরিটি একটি খবরের কাগজে মুড়িয়ে পাঞ্জাবীর ভিতরের পকেটে চালান করে দিয়ে মেসবাড়ি থেকে বেরোল অনিমেষ। রাস্তায় ভোরের আলো ফুটলেও আকাশ মেঘলা। ট্রাম লাইনের জল ডিঙিয়ে সে ধীর গতিতে  হাঁটতে লাগল কলেজ স্ট্রিটের দিকে, যেন মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছে। তার গন্তব্য, প্রেসিডেন্সি কলেজের লাইব্রেরি। সেখানে এমন কিছু পুরোনো রেকর্ড আছে যা অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলের কনফিডেনশিয়াল সার্ভে রিপোর্টসগুলো। অনিমেষের একজন পরিচিত লাইব্রেরিয়ান আছেন সেখানে, যদুদা। যদুনাথ গোস্বামী। বৃদ্ধ মানুষ, সারাজীবন বইয়ের মাঝেই কাটিয়ে দিয়েছেন। এখনও দেন। ভোর নেই, রাত নেই, ঐ লাইব্রেরিতেই পড়ে থাকেন। তিনি থাকেনও ঐ কলেজেই। 

তখন সবে ভোরের কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছাতেই চারপাশ একটু সজাগ হয়ে উঠল। চায়ের দোকানের ঝাঁপ খুলছে, খবরের কাগজের ফেরিওয়ালারা সাইকেলে করে দ্রুত যাতায়াত করছে। ট্রামলাইনের ওপর দিয়ে ভোরের প্রথম ট্রামটি তার ধাতব আওয়াজ তুলে চলে গেল। ফুটপাত ঘেঁষা গাড়িবারান্দাগুলোতে প্রচুর মানুষ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে। বৃষ্টির ছাঁট তাদের অধিকাংশই ভিজিয়ে দিয়েছে, তবু হুঁশ নেই। কফি হাউসের দিকটা একটু অন্যরকম। দোকানের ঝাঁপ খোলার সেই পরিচিত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে এলাকাটা সজাগ হয়ে উঠছে। উনুন ধরানো হয়েছে, আর সেই কয়লার ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ফুটন্ত চায়ের সুবাস। সাইকেলের ক্যারিয়ারে বাঁধানো খবরের কাগজের বান্ডিল। সাইকেলের ঘণ্টার আওয়াজ আর দৈনিক কাগজ ভাঁজ করার শব্দ মিলেমিশে একাকার। সারা রাত ত্রিপল চাপা পড়ে থাকা পুরানো বইয়ের সেই সোঁদা গন্ধটা ভোরের বাতাসে ভুরভুর করছে। দোকানের কর্মচারীরা দোকানের সামনে জল ছিটিয়ে পরিষ্কার করছে। কোনও এক কোণে হয়তো দু-তিনজন ছাত্র বা বিপ্লবী স্বভাবের যুবক দাঁড়িয়ে এখনই রাজনীতি নিয়ে তপ্ত আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। দেশভাগের ফলে চলে আসা ওপার বাংলার মানুষের ভিড় শিয়ালদহ ছাড়িয়ে কলেজ স্ট্রিটের দিকেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের চোখে একদিকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নতুন করে বাঁচার লড়াই।

অনিমেষ লাইব্রেরির পেছনের দিকের ছোট দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। লাইব্রেরির ভিতরটা সবসময় একটা গুমোট আর পুরোনো কাগজের গন্ধে ম ম করে। যদুদা তখন তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে একরাশ নথিপত্র নাড়াচাড়া করছিলেন। তাকে দেখে একপ্রকার চমকে উঠে বললেন, “অনিমেষ? এত ভোরে?”

“যদুদা, খুব জরুরি একটা রিসার্চ-পেপার দরকার হয়ে পড়েছে। সিটি কলেজে পাচ্ছি না। ১৯৪৭-এর জুন-জুলাই মাসের উত্তরবঙ্গের বর্ডার সার্ভে রিপোর্টগুলো একটু দেখতে পারি? বিশেষ করে ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিংয়ের কোনও রিপোর্ট কি আপনাদের এখানে আছে?”

যদুদা একটু ভ্রু কুঁচকালেন, “ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিং? নামটা চেনা চেনা ঠেকছে। দাঁড়াও, ক্যাটালগটা দেখি।” 

যদুদা যখন পুরোনো খাতাগুলো ওল্টাচ্ছিলেন, অনিমেষ তখন লাইব্রেরির জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তার দিকে নজর রাখছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল, রাস্তার ওপারে একটা কালো রঙের অস্টিন গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক একই রকম গাড়ি সে ভোররাতে আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে দেখেছিল না? তার মানে তাকে অনুসরণ করা হচ্ছে! অনিমেষের হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল।

যদুদা বলে উঠলেন, “হার্ডিং সাহেবের একটা ফাইল ছিল বটে, কিন্তু ওটা ১৯৪৯ সালে ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় ‘রেস্ট্রিক্টেড’ ক্যাটাগরিতে পাঠিয়ে দেয়। তবে তার একটা ‘ড্রাফট নোটিস’ আমাদের আর্কাইভের পুরোনো বাক্সের ভিতর থাকতে পারে। চলো তো আমার সঙ্গে হেল্প করবে।”

লাইব্রেরির এক অন্ধকার কোণে, যেখানে ধুলোর আস্তরণ কয়েক ইঞ্চি পুরু, সেখানে একটা পুরোনো কাঠের সিন্দুক রাখা আছে। যদুনাথ গোস্বামীর নির্দেশে অনিমেষ সেই সিন্দুকের ঢাকনা খুলল। যদুদা ঝুঁকে পড়ে তার ভিতর থেকে একটা হলদেটে ফাইল বের করে আনলেন। একটা ময়লা কাপড় দিয়ে ফাইলের উপর থেকে ধুলোর আস্তরণ মুছে ফেলতেই দেখা গেল বড় বড় করে লেখা, ‘Hilly Border Investigation: 1947’।

অনিমেষ ফাইলটা খুলতেই তার চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল। ফাইলের ভিতরে অমৃত বাজার পত্রিকার একটা ক্লিপিং আটকানো রয়েছে। কাগজের তারিখ, ২০ জুলাই, ১৯৪৭। অনিমেষ মন দিয়ে ইংরেজিতে লেখা পুরো প্রতিবেদনটি পড়ল। প্রতিবেদনটি বাংলায় রূপান্তর করলে এমনটি দাঁড়ায়,  

ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিং নিখোঁজ: উত্তরবঙ্গের জঙ্গল থেকে ফেরার পথে উধাও ব্রিটিশ সার্ভেয়ার

(নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি)

গত ৪৮ ঘণ্টা যাবৎ ব্রিটিশ রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের অভিজ্ঞ সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিং-এর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স সংলগ্ন গভীর জঙ্গল থেকে জরিপ শেষ করে ফেরার পথে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।

বিগত তিন মাস ধরে ক্যাপ্টেন হার্ডিং সিকিম সীমান্ত এবং ডুয়ার্সের বক্সা পাহাড় সংলগ্ন বনাঞ্চলে একটি বিশেষ মানচিত্র তৈরির কাজে নিযুক্ত ছিলেন। গত ১৮ই জুলাই বিকেলে তিনি তার দুই নেপালি খালাসি এবং একজন স্থানীয় গাইডসহ ক্যাম্প থেকে কালচিনির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। জানা গেছে, পথিমধ্যে প্রবল বৃষ্টি এবং পাহাড়ধ্বসের কারণে তারা মূল রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরদিন সকালে গাইড এবং খালাসিরা জখম অবস্থায় লোকালয়ে ফিরে এলেও ক্যাপ্টেনের কোনও হদিস মেলেনি।

উদ্ধার হওয়া গাইড রাম বাহাদুর পুলিশকে জানিয়েছে, তোর্সা নদীর কাছাকাছি একটি নির্জন এলাকায় তারা তাঁবু ফেলেছিল। মাঝ রাতে এক অদ্ভুত বাঁশির শব্দ শুনে ক্যাপ্টেন সাহেব তার তাঁবু থেকে বেরিয়ে যান। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। আশ্চর্যের বিষয় হল, তার তাঁবু থেকে জরিপের সমস্ত কাগজপত্র এবং অত্যন্ত মূল্যবান ‘থিওডোলাইট’’যন্ত্রটি পাওয়া গেলেও তার ব্যক্তিগত ডায়েরিটি গায়েব।

জলপাইগুড়ির জেলাশাসক জানিয়েছেন, নিখোঁজ অফিসারের সন্ধানে এক প্ল্যাটুন সশস্ত্র পুলিশ জঙ্গলে পাঠানো হয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ডামাডোল এবং দেশভাগের উত্তেজনার মাঝে এই ঘটনা ভিন্ন কোনও ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, তা নিয়ে গোয়েন্দা মহলে কানাঘুষো চলছে। স্থানীয়দের মতে, ওই জঙ্গলের গভীরে এমন কিছু ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ আছে যা মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে হার্ডিং সাহেব বেশ কিছুদিন ধরেই চিন্তিত ছিলেন।

কলিকাতায় অবস্থানরত তার পরিবার এবং ব্রিটিশ হাই কমিশন এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বাধীনতার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে একজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ সার্ভেয়ারের এভাবে নিখোঁজ হওয়া প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

ক্লিপিংটার ঠিক নীচেই হাতে লেখা একটা নোট। অনিমেষ আন্দাজ করল, হয়তো বা কোনও গোয়েন্দা অফিসার লিখেছিলেন। নোটটিতে যা লেখা আছে তার বঙ্গানুবাদ,

“হার্ডিংয়ের কাছে এমন একটি ম্যাপ ছিল যা স্যার সিরিল রেডক্লিফের মানচিত্রকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। সেই ম্যাপে এমন একটি ‘করিডোর’ বা চোরাপথের উল্লেখ ছিল, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে, আবার সঠিক ব্যবহার করলে তা তুরুপের তাস হতে পারে।”

অনিমেষের পকেটে থাকা ডায়েরিটা যেন এই মুহূর্তে আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, পরেশ তাকে সাধারণ কোনও ডায়েরি দেয়নি, সে তাকে দিয়েছে এক রাজনৈতিক বারুদের স্তূপ। এই ডায়েরিতে আঁকা ম্যাপ প্রকাশিত হয়ে পড়লে ভারতের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। শুরু হতে পারে বর্ডার নিয়ে পড়শি দেশের সঙ্গে ঝামেলা। আর যদি ভারত সরকারের কোনও অসাধু কর্মকর্তার হাতে পড়ে, তবে ইতিহাস মুছে যেতে পারে চিরতরে।

হঠাৎ লাইব্রেরির সদর দরজার কড়া প্রবলভাবে নড়ে উঠল। যদুদা চমকে উঠলেন “এত সকালে আবার কে এল?”

অনিমেষ যদু গোস্বামীকে থামিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যদুদা, আপনি এই ফাইলটা অন্য কোথাও লুকিয়ে ফেলুন আর এখান থেকে অন্য ঘরে চলে যান। আমার মনে হয় যারা এসেছে, আমার খোঁজেই এসেছে এবং তারা খুব একটা ভাল লোক নয়। যদুদা, আমি যে দরজাটা দিয়ে ঢুকলাম, সেটা বাদে লাইব্রেরির আর কোনও পেছনের রাস্তা আছে?”

অনিমেষের কথা শুনে যদু গোস্বামীর চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ইশারায় একটা ছোট জানালার দিকে দেখিয়ে বললেন, “ওটা টপকে চলে যাও। কিন্তু ব্যাপার কী বলো তো?”

অনিমেষ উত্তর দেওয়ার সময় পেল না। লাইব্রেরির দরজার বাইরে ভারি বুটের একাধিক শব্দ পাওয়া গেল তার সঙ্গে কড়া নড়ে ওঠার ঘন ঘন শব্দ। কারা যেন এবারে দরজার উপরে আঘাত করছে। অনিমেষ জানালা দিয়ে নিচে তাকাতেই দেখল প্রায় পনেরো ফুট নীচ দিয়ে একটা নোংরা নর্দমা চলে গেছে। অনিমেষ দু’বার ভাবল না। সে জানালা দিয়ে ঝাঁপ দিল। পড়ার সময় তার চশমাটা ছিটকে গেল। ভাগ্য ভাল তিনি উপুড় হয়ে পড়ে যাননি, শুধু হাঁটু অবধি কাদায় ডুবে গিয়েছিল, নইলে ডায়েরিটাও কাদামাখা জলে মধ্যে ভিজে যেত। নর্দমার নোংরা জল আর কাদার গন্ধে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। নর্দমা থেকে উঠে, বৃষ্টির জল ধুয়ে যাওয়া, কোলকাতার সেই গলিতে অনিমেষ কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। চশমাটা কোথায় গেল? চশমা ছাড়া যে সে একেবারে অন্ধ, কিন্তু অর্ধেক দৃষ্টিশক্তি নিয়ে সে কীই বা করে উঠতে পারবে? সৌভাগ্যবশত কাদার ভিতরে দু’ তিনবার হাতড়াতেই জিনিসটা পেয়ে গেল সে। বাঁ দিকের কাঁচটাতে একটা সামান্য চিড় ধরেছে, তবে কাজ চলে যাবে।

অনিমেষ দ্রুত উঠে দাঁড়াল। পকেটের উপর দিয়ে অনুভব করে বুঝল, খবরের কাগজে মোড়া ডায়েরিটা এখনও সুরক্ষিতই আছে। আচমকা লাইব্রেরির ভিতর থেকে চিৎকার আর ভারি বুটের শব্দ তার কানে যেতেই সে গলি ধরে দৌড়তে শুরু করল। খানিকটা দৌড়ে যেতেই সে পরিচিত গলি খুঁজে পেল। কলেজ স্ট্রিটের এই গোলকধাঁধায় অনিমেষ ছোটবেলা থেকে অনেক ঘুরেছে আর সেই সুত্রে এখানকার অলিগলি তস্য গলি মোটামুটি সব তার চেনা। এই গলিগুলো এতই সরু যে ওপরের দিকে তাকালে আকাশ দেখা ভার, দুই ধারের পুরনো বাড়িগুলোর কার্নিশ প্রায় একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলেছে যেন। গলিগুলোর ভিতরে রাস্তার দু’পাশে খোলা নর্দমা, যার ওপর দিয়ে সাবধানে পা ফেলে এগোতে হচ্ছিল তাকে। বাড়ির রোয়াকগুলোতে তখনও ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে খবরের কাগজ পড়া শুরু হয়নি, কেবল দু’একটা বাড়ির কলতলায় বালতিতে জল ভরার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কোনও গলির বাঁক ঘুরতেই পুরোনো স্যাঁতসেঁতে বই আর বাইন্ডিংয়ের আঠা’র কড়া গন্ধ নাকে আসছে। হয়তো কোনও এক দোকানের ভিতর কেরোসিন ল্যাম্পের মৃদু আলো জ্বলছে। কলেজ স্ট্রিটের পেটের ভেতর ছোট ছোট ছাপাখানাগুলো তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, কিন্তু সেখান থেকে সিসার টাইপ বা কালির একটা চাপা গন্ধ ভোরের বাতাসে ভাসছে।

এদিকে সূর্য এখন পুরোপুরি উঠে গেছে, কিন্তু মেঘলা আকাশের কারণে চারপাশটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। অনিমেষ বুঝল, আমহার্স্ট স্ট্রিটের মেসে ফিরে যাওয়া এখন আত্মহত্যার শামিল। তার কাছে কোনও নিরাপদ আশ্রয় নেই। হঠাৎ তার মাথায় এল একটা জায়গার নাম। শিয়ালদহ স্টেশন। এই সময়ে শিয়ালদহ স্টেশন মানেই হাজার হাজার মানুষের ভিড়, উদ্বাস্তু শিবিরের কোলাহল আর অন্তহীন বিশৃঙ্খলা। সেই জনসমুদ্রের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে ফেলা সবচেয়ে সহজ।

অনিমেষ যখন শিয়ালদহের মেইন প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাল, তখন সেখানে নরক গুলজার। ওপার বাংলা থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। কেউ পোটলা-পুঁটলি নিয়ে বসে আছে, কেউ হারিয়ে যাওয়া স্বজনের নাম ধরে চিৎকার করছে। স্টেশনের বিশাল লোহার চালার নীচে তখন ধোঁয়া, বাষ্প আর কান্নার এক ভারি আস্তরণ। ওপার বাংলা থেকে আসা স্টীম ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া প্ল্যাটফর্মে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। ট্রেনের কামরা থেকে উপচে পড়া মানুষের ভিড়; কেউ কামরার ছাদে, কেউ বা পাদানিতে বাদুড়ঝোলা হয়ে এসেছে। ট্রেনের বাঁশির তীক্ষ্ণ আওয়াজও তখন মানুষের আর্তনাদের কাছে ম্লান। প্ল্যাটফর্মের বাইরে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তালি দেওয়া চট, টিনের ট্রাঙ্ক, দড়িতে বাঁধা বিছানা আর পিতলের বাসনকোসন। যা কিছু সম্বল ছিল, সবটুকু নিয়ে মানুষগুলো ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এসেছে। এক কোণে ইটের টুকরো দিয়ে উনুন বানিয়ে কেউ হয়তো ফ্যানা ভাত ফুটাচ্ছে। সেই ধোঁয়া আর মানুষের ঘামের গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত।

এই চরম বিশৃঙ্খলার মাঝে কাদা মাখা জামাকাপড় পরা অনিমেষকে আলাদা করে চেনার কোনও উপায় নেই। সে একটা পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল।

“চা খাবেন বাবু?”

একটি বছর বারো-তেরোর ছেলে মাটির ভাঁড় আর রঙ-ওঠা কেটলি নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সকাল থেকে পেটে কিছুই পড়েনি। মাথাটা কেমন যেন ধরে আছে। অনিমেষের মনে হল, এক ভাঁড় চা হলে মন্দ হয় না। সে প্রশ্ন করল, “কত?”

“এক পয়সা, বাবু।”

অনিমেষ পকেট থেকে একটা পয়সা বের করে দিল। গরম চায়ের ভাঁড়টা থেকে খানিকটা গলায় ঢালতেই তার শরীরের কাঁপুনিটা একটু কমল। চা খেতে খেতে সে ডায়েরিটার কথা ভাবতে লাগল। ক্যাপ্টেন হার্ডিংয়ের সেই নকশা আর ‘জিরো লাইন’, এই রহস্যের চাবিকাঠি নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে উত্তরবঙ্গে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা বা উপায় কোনওটাই এই মুহূর্তে তার কাছে নেই।

হঠাৎ তার মনে হল, কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। ভাল করে লক্ষ্য করতেই দেখতে পেল। ভিড়ের মাঝে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘাঙ্গী নারী। পরনে রঙ উঠে যাওয়া নীল রঙের শাড়ি, মাথায় ঘোমটা দেওয়া থাকলেও তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা এই ভিড়ের মানুষের মতো নয়। তার চোখেমুখে কোনও ক্লান্তি নেই, বরং এক তীক্ষ্ণ সতর্কতা। অনিমেষের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেয়েটি চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অনিমেষের সন্দেহ হল। সে চায়ের ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে দ্রুত অন্য প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভিড় ঠেলে সে যেদিকেই যাচ্ছেন, সেই নীল শাড়ি পরা ছায়াটি তাকে অনুসরণ করছে। অনিমেষের হৃৎপিণ্ড আবার দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করল। তবে কি এ সেই কালো রেইনকোট পরা লোকগুলোরই কেউ? নাকি কোনও নতুন বিপদ? দৌড়তে দৌড়তে অনিমেষ স্টেশনের পেছনের দিকের একটি নির্জন মালগুদামের কাছে চলে এল। এখানে ছায়া বেশি, মানুষের আনাগোনা কম। হঠাৎ পিছন থেকে একটা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “পালাবেন না, অনিমেষবাবু। আমি আপনার কোনও ক্ষতি করতে আসিনি।”

অনিমেষ থমকে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাতেই দেখল সেই নীল শাড়ি তার থেকে মাত্র পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে। তার হাতে কোনও অস্ত্র নেই, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত গভীর। অনিমেষ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে? আমার নাম জানলেন কী করে?”

মেয়েটি একটু হাসল, তবে সে হাসিতে কোনও আর্দ্রতা নেই, “আমি রেণুকা। আমি পরেশ পালের সঙ্গে কাজ করতাম। পরেশদা আমাকে বলেছিল, যদি ওর কিছু হয়ে যায় তবে আমি যেন আপনার ওপর নজর রাখি। ও জানতো আপনি নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনতে পারেন।”

অনিমেষ স্তব্ধ হয়ে গেলেন, “পরেশ কোথায়? ও কি বেঁচে আছে?”

রেণুকার মুখটা একটু ম্লান হল, “পরেশদা কাল রাতে ধরা পড়ে গেছে। লালবাজারের লক-আপে ওকে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। যারা আপনার মেসে গিয়েছিল, তারা কেউ পুলিশের লোক নয়, অনিমেষবাবু। তারা এক আন্তর্জাতিক গুপ্তচর সংস্থার সদস্য, যারা দেশভাগের এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ভারতের মানচিত্র নতুন করে লিখতে চায়। আপনার কাছে পরেশদার একটা ডায়েরি আছে। সেটা সঙ্গে নিয়েই ঘুরছেন তো?”

অনিমেষ কিছুই বুঝতে পারল না। সে তার পকেটে থাকা ডায়েরিটা আরও জোরে চেপে ধরল, “এই ডায়েরির ভিতর কী আছে রেণুকা? কেন সবাই এটার জন্য পাগল?”

রেণুকা, চারদিকে একবার সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে, অনিমেষের দিকে সামান্য সরে এসে বলল, “যা বলছি, মন দিয়ে শুনুন। অনিমেষবাবু, ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যায়, তারা শুধু একটা দেশ ভাগ করে যায়নি, তারা অসংখ্য ‘টাইম-বোম’ পুঁতে দিয়ে গেছে। হার্ডিং সাহেব যে করিডোরটার ম্যাপ তৈরি করেছিলেন, সেটা কোনও সাধারণ পাহাড়ী রাস্তা নয়। ভৌগোলিক ভাষায় ওটা একটা ‘স্ট্র্যাটেজিক চোক-পয়েন্ট’। শিলিগুড়ি করিডোর বা ওই সংলগ্ন মুরগির ঘাড়ের মতো সরু যে ভূখণ্ডটি আছে, সেটা যদি কোনওভাবে বিতর্কিত করে রাখা যায়, তবে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের যোগাযোগ স্রেফ একটা সুতোর ওপর ঝুলবে। ব্রিটিশ সার্ভে বিভাগের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর এই গোপন সংস্থাটির ছকটা আপনি ভাবতে পারবেন না। তারা জানে, মানচিত্রের ওই কয়েক ফুট জমিতে যদি এমন কোনো ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা বিতর্কিত সীমান্ত তৈরি করা যায় যা আন্তর্জাতিক আইনে অমীমাংসিত, তবে ভারত সরকার সেখানে কখনোই স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে না। আর সেই সুযোগে ওই করিডোর দিয়ে বিদেশি অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার আর অস্থিরতা জিইয়ে রাখা হবে। হার্ডিং সাহেব সম্ভবত শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার জরিপ করা তথ্যগুলো লন্ডনের আর্কাইভে নয়, বরং কোনও এক ছায়া-সরকারের হাতে চলে যাচ্ছে। তাই তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগেই ম্যাপটা সরিয়ে ফেলেন। সেই ম্যাপের একটা অংশ বা সেটার সঙ্কেত এখন আপনার কাছে।”

“এই ডায়েরির মধ্যে!!”

“হ্যাঁ, অনিমেষবাবু। যারা আপনার মেসে কাল রাতে গিয়েছিল, তারা আবার আজ সকালে গিয়ে আপনার ঘর তছনছ করেছে। কে জানেন? তারা ওই করিডোরের চাবিকাঠিটা চায়। ওটা হাতে পাওয়া মানে ভারতের সার্বভৌমত্বের হৃৎপিণ্ডে একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি করা। ওরা শুধু মানচিত্র বদলাতে চায় না অনিমেষবাবু, ওরা চায় উত্তর-পূর্ব ভারতকে, মূল ভারতভূমি থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এক আইনি ও ভৌগোলিক হাতিয়ার। কিছু বুঝলেন?”

রেণুকা থামল। অনিমেষ সবটা যে বুঝতে পেরেছে এমন নয়, কিন্তু এটা বুঝতে পারল, তার পকেটে থাকা ডায়েরিটার ভিতর আছে এমন এক করিডোরের ম্যাপ, যা দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব। ব্রিটিশরা চেয়েছিল ওই এলাকাটা চিরকাল বিতর্কিত থাকুক যাতে ভবিষ্যতে তারা আবার হস্তক্ষেপ করতে পারে। অনিমেষকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, রেণুকা বলল, “আমাদের হাতে সময় কিন্তু খুব কম। আজ রাতের মধ্যেই আপনাকে কোলকাতা ছাড়তে হবে। ওরা শিয়ালদহ স্টেশনের প্রতিটি গেটে লোক বসিয়েছে। বেসিক্যালি আপনাকে খুঁজছে।”

“কিন্তু আমি যে এখানে এসেছি, এটা তো ওদের জানার কথা নয়।”

“হাসালেন, অনিমেষবাবু। ওদের চার-পাঁচজনকে দেখে কি আপনার মনে হয়েছে ওরা চার-পাঁচজনই? ওদের জাল অনেক অনেক দূর অবধি বিস্তৃত।”     

অনিমেষ ঘামতে শুরু করল, “কোথায় যাব আমি?”

“উত্তরবঙ্গে। হিলিতে। যেখানে ক্যাপ্টেন হার্ডিং নিখোঁজ হয়েছিলেন। সেখানেই এই ডায়েরির শেষ পাতাটির রহস্য সমাধান হবে। কিন্তু তার আগে আপনাকে একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে, মিস্টার এক্স। ডায়েরির শেষ পাতায় যার নাম লেখা আছে।”

অনিমেষের মাথায় ঝড়ের মতো অনেকগুলো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মেয়েটিকে কি বিশ্বাস করা যায়? সে কি সত্যিই পরেশের বন্ধু, নাকি ডায়েরিটা হাতিয়ে নেওয়ার কোনও ফন্দি এঁটে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার চেষ্টা করছে? কিন্তু এই মুহূর্তে অনিমেষের সামনে আর কোনও পথও তো খোলা নেই। অনিমেষ এবারে সরাসরি রেণুকার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আমি কীভাবে বিশ্বাস করব আপনাকে? আপনি কি সত্যিই পরেশের পরিচিত?”

“এই প্রশ্নটা অনেক আগেই আপনার করা উচিত ছিল, অনিমেষবাবু। দাঁড়ান, প্রমাণ দিই।”

বলেই রেণুকা তার আঁচলের তলা থেকে একটা ছোট ব্রোঞ্জের পদক বের করে দেখাল। অনিমেষ চিনতে পারল। ওটা তাদের স্কুলজীবনের এক ডিবেট কম্পিটিশনের উইনার মেডেল, যা পরেশ সবসময় সঙ্গে রাখত।

“ঠিক আছে,” অনিমেষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি যাব। কিন্তু আমি তো সাধারণ একজন অধ্যাপক, বন্দুক চালাতে জানি না, মারামারি জানি না। আমি কী করব সেখানে?”

রেণুকা মৃদু হাসল, “বন্দুক চালানোর লোক অনেক আছে, অনিমেষবাবু। কিন্তু ম্যাপ পড়ে বোঝা আর ইতিহাস বোঝার লোক একটাই, আপনি। মনে রাখবেন, কলমের আঁচড় মাঝে মধ্যে তলোয়ারের চেয়েও বেশি গভীর হয়। আপাতত চলুন, হাতে প্রচুর সময় আছে। ট্রেন ছাড়বে সেই রাত আটটার সময়।”

“কোথায় যাব?”

রেণুকা মৃদু হাসল, “আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? নিয়ে গিয়ে গুম খুন করব না, কথা দিচ্ছি।”

রেণুকার পিছু পিছু অনিমেষ শিয়ালদহ স্টেশনের পিছনের একটা বস্তিতে এসে ঢুকল, চারপাশের স্যাঁতসেঁতে নোনা ধরা দেয়াল আর পচা নর্দমার গন্ধে তার দম আটকে আসতে লাগল। টালি আর টিনের চালের ঘরগুলো এতই ছোট যে, তার দরজায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো দায়। চারিদিকে টিনের চালের ওপর বৃষ্টির জল পড়ার একঘেয়ে শব্দ আর মাঝে মধ্যেই ট্রেনের ইঞ্জিনের তীক্ষ্ণ হুইসেল শোনা যাচ্ছে। অনিমেষ দেখল, গলির মধ্যের একটা মাত্র টিউবওয়েলের সামনে জনা পঞ্চাশেক মানুষের লাইন। ঘটি-বাটি নিয়ে ছিন্নমূল মানুষেরা এক বালতি জলের জন্য লড়াই করছে। কয়লা আর ঘুঁটের ধোঁয়ায় সারা বস্তি অন্ধকার হয়ে আছে। ছোট্ট ছোট্ট জানালাবিহীন ঘরগুলো থেকে শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। অনিমেষ চারদিকে একবার তাকিয়ে নিল। তার কাছে প্রতিটি অপরিচিত মুখই এখন সন্দেহজনক।

বস্তির একদম ভিতরের দিকে একটা ঘুপচি ঘরের দরজার তালা খুলে রেণুকা ঢুকল। অনিমেষ ঢুকে দেখল, এক কামরার ঘরটি বিশ্রী স্যাঁতসেঁতে গন্ধে ভরে আছে। ছোট্ট একটি ঘুলঘুলি দিয়ে যৎসামান্য আলো আসলেও, বাইরের নর্দমা আর কয়লার ধোঁয়ার কটু গন্ধ ঘরের বাতাসকে ভারি করে রেখেছে। বাঁশের বাখারি আর চটের পর্দার আড়াল দিয়ে রাখা পাশের ঘরের মানুষের ফিসফাস, শিশুর কান্না আর একটু দূরেই রেললাইনের ওপর দিয়ে মালগাড়ির গুমগুম আওয়াজ প্রতি মুহূর্তে অনিমেষকে ভীত করে তুলছিল। সে কোথায় ছিল আর কোথায় এসে পড়েছে, ভাবতেই যেন সব হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছিল। ঘরের মধ্যে কোনও খাট বা খাটিয়া জাতীয় কিচ্ছু নেই।

তাকে বসিয়ে রেণুকা বেরিয়ে গিয়েছিল, ফিরে এল ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই। হাতে কলাপাতা ঢাকা দেওয়া একটা থালা, “খেয়ে নিন পেট ভরে। এর পরে আবার কখন পেটে কিছু পড়বে, কিচ্ছু ঠিক নেই। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমার খাওয়া হয়ে গেছে। ঘুম পেলে কোণের দিকে কাঁথা আছে, পেতে ঘুমিয়ে নিতে পারেন।”

“ঘুম কি আর আসবে?”

বলেই অনিমেষ কাঁথা পেতে তার উপরে বসে পড়ল। মুখোমুখি বসল রেণুকা। তারপর বলল, “অনিমেষবাবু, আমরা একটা অনিশ্চিত পথে বেরিয়ে পড়েছি, বুঝতেই পারছেন? তার আগে… মানে পরেশ আমাকে কিছুটা বলেছে, তবুও আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছি।”

“কী শুনতে চাইছেন?”

“আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। তাতে আমাদের এক সঙ্গে কাজ করতে সুবিধে হবে। মানে আপনার জন্ম কোথায়, পড়াশোনা, পরিবার এই সব আর কী। খুব ব্যক্তিগত কিছু জানতে চাইছি না।”

অনিমেষ সামান্য ভেবে নিয়ে শুরু করল, “আমার জন্ম খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার অমলডাঙ্গা গ্রামে। আমার বাবা আশুতোষ লাহিড়ী ছিলেন দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজের অধ্যাপক। তারপর তো… এদিকে চলে আসতে হল। ছেলেবেলায় জানেন তো, আমার খেলাধুলোয় তেমন মন ছিল না, তার জায়গায় বাবার লাইব্রেরিতে থাকা পুরোনো পুঁথি আর ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্র, এই সব নিয়েই বেশি সময় কাটত আমার।”

“ইতিহাসের প্রতি ঝোঁকটা সেই কারণেই আশা করি?”

“একদমই। আমি ইতিহাসে এম.এ। স্বর্ণপদকও পেয়েছিলাম। তারপর রিসার্চ করলাম এবং ডক্টরেট ডিগ্রি।”

“আপনার গবেষণার বিষয় কী ছিল?”

“বাংলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিবর্তন।”

“আচ্ছা। পরেশদার সঙ্গে আপনার কীভাবে আলাপ?”

“পরেশ আমার স্কুলজীবনের বন্ধু। একেবারে গলায় গলায়। তবে পরেশ ছিল ডানপিটে আর আমি ছিলাম ঘরকুনো। বন্ধুত্বটা কিন্তু অটুট ছিল। বড় হওয়ার পরে আমি নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম পড়াশোনায় আর পরেশ জড়িয়ে পড়ল রাজনৈতিক আন্দোলনে। আচ্ছা, এখানে একটা কথা বলে রাখি। আমাদের দুই পরিবার দেশভাগের পরেই যে এপারে চলে এসেছিলাম, তা কিন্তু নয়। আবার বাবা অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। দূরদর্শীও। উঁচু উঁচু মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। আলাপ ছিল বেশ কিছু ইংরেজ অফিসারের সঙ্গেও। দেশভাগ হতে পারে এমন উড়ো খবর পেয়েই আমার বাবা এপারে চলে আসেন। মানে ইচ্ছে একেবারেই ছিল না, আসতে বাধ্য হন। তিনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, আর কয়েক বছরের মধ্যেই সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা ঘটবে। হয়তো দাঙ্গাও বেঁধে যেতে পারে। তখন সকলের সঙ্গে গাদাগাদি করে পালিয়ে আসার চাইতে আগে যাওয়াই ভাল। বাবা ভেবেছিলেন, যদি ইংরেজরা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও অবস্থা সুস্থির থাকে, তখন না হয় অমলডাঙ্গায় ফেরত যাওয়া যাবে। বাবা চলে আসেন ১৯৪৫ সালের শেষাশেষি। মানে স্বাধীনতার বছর দেড়েক আগেই। পরেশের ফ্যামিলিও আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসে।”

“কিন্তু এপারে তো আপনাদের কোনও স্থায়ী ঠিকানা ছিল না।”

“আমাদের ছিল। আমাদের এক আত্মীয় বসবাস করতেন হাতিবাগান অঞ্চলে, আমরা তার বাড়িতেই এসে উঠি আর পরেশ চলে যায় দক্ষিণ কোলকাতায় ভবানীপুর অঞ্চলে। সেখানে একটি বসতবাড়ির খানিকটা কিনে নিয়ে পরেশের বাবা বসবাস শুরু করেন। তারপর দেশভাগ হল। সেই সময় যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা হয়ে এপারে এসে পৌঁছচ্ছিল, পরেশ তখন ত্রাণ শিবিরে নাগাড়ে কাজ করছিল। ওর সঙ্গে আমিও ছিলাম। রেণুকা, সেই সময় প্রথমবার ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা খুব কাছ থেকে আমি দেখেছি। আর সেই অভিজ্ঞতাই আমাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্ত করে তুলেছিল।”

“তো এখন আপনি মেসে থাকেন? একা?”

“হ্যাঁ। হাতিবাগানের ঐ বাড়িতে আমার বাবা-মা মারা যান। আসলে দেশভাগটা ওরা দু’জনেই কেউ মন থেকে মেনে নিতে পারেননি, সম্ভবত সেই কারণেই বাবা আর মায়ের শরীর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল। পৈতৃক ভিটেমাটি হারানোর যে গভীর চাপা কষ্ট, তাতেই ভুগতে ভুগতে চলে গেলেন দু’জনে। যাই হোক, একসময় আমি সিটি কলেজে অধ্যাপনার চাকরি পেলাম। আমহার্স্ট স্ট্রিটের মেসবাড়িটার একটা ঘর ভাড়া নিলাম, যেটা কলেজ লাইব্রেরির খুব কাছেই। আসলে হাতিবাগানের পরিবারের উপরে আমি নির্ভরশীল থাকতে চাইনি, তার উপর আমি একা থাকতে খুব ভালবাসি। আমার একমাত্র নেশা হল পুরোনো বই সংগ্রহ করা আর পড়া। আড্ডা বা গপ্পগুজব, আমার পছন্দ নয়।”

“আর অত বেশি পড়তে পড়তেই আপনার অমন ভারি চশমা?”

“ঠিক তাই। কিন্তু পড়া আমি ছাড়তে পারব না। ব্যস, আর আমার কিছু জানাবার নেই।”

রেণুকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে নিয়ে বলল, “তাহলে আমার সম্পর্কেও কিছু জেনে রাখুন। আমার পুরো নাম রেণুকাবালা সিংহ। আমার জন্ম ময়মনসিংহে। পিতামহ ছিলেন পারিবারিক সুত্রে জমিদার। আমার বাবা বিনয়কৃষ্ণ সিংহ ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী, যিনি গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। তিরিশের দশকের উত্তাল সময়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে অনেক বিপ্লবী আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। ছোটবেলা থেকেই আমি মেয়েদের মতো, পুতুল খেলা-ফেলা, বিশেষ পছন্দ করতাম না।”

“পড়তে ভালবাসতেন?”

“সে তো ছিলই, কিন্তু আমার কী ভাল লাগত জানেন? বাবার কাছারিঘরের বাইরে চুপটি করে বসে রাজনীতির আলোচনা শুনতে। সেই সময় অনেক দিকপাল রাজনীতির লোকজনদের আমাদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল।”

“বেশ আনকমন কিন্তু।” অনিমেষ বিস্মিত হল।

“বেয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ পুলিশ আমাদের বাড়িতে হানা দিল। আমাদের সবার চোখের সামনে আমার বাবাকে গুলি করে হত্যা করা হল। অনিমেষবাবু, সেই দিন থেকেই একটা ষোল বছরের শান্ত মেয়ে তার বুকের ভিতরে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল। বুঝলাম ঘরে বসে থাকলে সেই আগুন একদিন নিভে যাবে। ঘর ছাড়লাম। সেই বছরেই চলে এলাম কোলকাতা। এক গোপন বিপ্লবী সংস্থায় নাম লেখালাম। আর সেখানেই আমার আলাপ পরেশদার সঙ্গে। পরেশদা হল, আমার দাদা এবং মেন্টরও।”

“ও বাবা! তার মানে আপনি পরাধীন ভারতের বিপ্লবী ছিলেন?”

“বিপ্লব কখনও শেষ হয় না, অনিমেষবাবু, শত্রুপক্ষের মুখগুলো বদলে যায় শুধু। যাই হোক। দেশভাগের ঠিক আগে, যখন ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাকে একটি বিশেষ কাজের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হল। মানচিত্র কীভাবে পাঠ করতে হয়, এনক্রিপশন মানে গোপন সঙ্কেত কীভাবে উদ্ধার করতে হয় সব শিখলাম। শিখলাম পিস্তল চালানোও। দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরে জুলাই মাস নাগাদ আমাকে উত্তরবঙ্গে পাঠানো হল। সেখানে আমি ছদ্মবেশে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিংয়ের বাংলোয় রাঁধুনির কাজ নিয়েছিলাম। কী ভাবে সেই কাজটা পেয়েছিলাম, সে অন্য গল্প। আমার আসল টার্গেট ছিল হার্ডিং সাহেবের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা। এদিকে হার্ডিং সাহেব আমার বুদ্ধিমত্তা দেখে আমাকে খুবই বিশ্বাস করতে শুরু করে দেন। এই ডায়েরিটার বিষয়ে তিনিই প্রথম আমাকে জানান। আমার কাজ ছিল, ডায়েরিটা চুরি করে এনে পরেশদার হাতে তুলে দেওয়া।”

বলেই রেণুকা তার বাম হাতের কবজির পোড়া দাগটা দেখিয়ে বলল, “এটা দেখতে পাচ্ছেন? বিপ্লবী সংস্থায় যোগ দেওয়ার সময় আমি নিজেই মোমবাতির শিখায় এই হাত পুড়িয়ে শপথ নিয়েছিলাম, কখনই দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না আর দুই, দেশের স্বার্থে যা করতে হয়, করব। অনিমেষবাবু, আমি যা করতে চলেছি, আর যে কারণে আপনাকে আমার সঙ্গে নিয়ে চলেছি, জেনে রাখুন, সবটাই দেশের স্বার্থে।”

অনিমেষ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। এই আপাত কৃষ্ণকায়, একদম সাধারণ দেখতে একটা মেয়ের মধ্যে এত আগুন! রেণুকা উঠে দাঁড়াল, “আমি সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসব। আমি বেরিয়ে গেলে হুড়কোটা আটকে দেবেন।”

এরপরে কী ভাবে যে সারাটা দিন কেটে গেল, অনিমেষ যেন বুঝতেই পারল না। অন্ধকার ঘরে শুয়ে বসে কখন যে বাইরে দিনের আলো নিভে এল, কে জানে। কাঁথা পেতে শুয়ে থাকলেও অনিমেষের ঘুম এল না। বাইরে কারও গলার স্বর শুনলেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠছিল।

আন্দাজ রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ রেণুকা ফিরে এল। একটা পুরোনো চামড়ার হাতব্যাগ দিয়ে, তার ভিতরে ডায়েরিটাকে রাখতে বলল। এরপরেই অনিমেষ রেণুকার পিছু পিছু অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। সে জানতো না, এই যাত্রা তাকে এমন এক যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেবে, যেখানে বন্ধু আর শত্রুর পার্থক্য মুছে যাবে। এমন সময় ট্রেনের হুইসেল বাজল। এক দীর্ঘ, করুণ সুর।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তখন জনসমুদ্রের গর্জন। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া আর কয়লার গুঁড়োয় আকাশটা আরও ধূসর হয়ে উঠেছে। রেণুকা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ভিড় ঠেলে এগোচ্ছিল। অনিমেষ শক্ত হাতে ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে রেণুকার পিছন পিছন ছুটছিল। সারাদিনে ভিজে জামাকাপড় শুকিয়ে এখন গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে, আর জুতোর ভিতর কাদা শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সে সব দিকে নজর দেওয়ার সময় এখন নেই। সে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে চারদিকে তাকিয়ে একবার করে দেখছিল, কেউ কি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে আসছে?

“অনিমেষবাবু, ঘাড় ঘুরিয়ে বার বার পেছনে তাকাবেন না,” রেণুকা নিচু স্বরে ধমক দিল, “সাধারণ মানুষের মতো হাঁটুন। আপনি যত সতর্ক হতে চাইছেন, ততই আপনাকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে। হ্যাঁ, আরেকটা কথা, ট্রেনে উঠে যা বলবেন, সব ইংরেজিতে। কথা না বললেই ভাল।”

অনিমেষ মাথা নিচু করল। তারা টিকিট কেটে উত্তরবঙ্গগামী দার্জিলিং মেল-এর একটি তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় গিয়ে উঠল। ট্রেনের কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষ, বস্তা, মুরগির খাঁচা আর কান্নাকাটি, সব মিলিয়ে এক অসহ্য পরিবেশ। ভাগ্য ভাল এক জায়গায় জানালার পাশে একটু জায়গা পাওয়া গেল। রেণুকা সেখানেই অনিমেষকে বসিয়ে তার পায়ের কাছে ট্রেনের মেঝের উপরে, জানালার দিকে মুখ করে, বসে পড়ল। অনিমেষ অবাক হল। তার মানে এই মেয়েটি তার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে?

ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল, তখন অনিমেষের মনে হল, কোলকাতার সঙ্গে তার কয়েক দশকের নাড়ির টান যেন ছিন্ন হয়ে গেল। আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেই ধুলোমাখা ঘর, সিটি কলেজের ব্ল্যাকবোর্ড আর বিকেলে কলেজস্ট্রিটের অলিতে গলিতে পায়চারি, সবই এখন এক ঝাপসা স্মৃতি। ট্রেনের চাকার ছন্দবদ্ধ শব্দে তার মাথার ভিতর ডায়েরির সেই নকশাটা যেন নাচতে লাগল।

 “রেণুকা, আমরা কোথায় নামব?” অনিমেষ ফিসফিস করে ইংরেজিতে প্রশ্ন করল।

রেণুকা মাথা উঁচু করে জানালা দিয়ে বাইরে অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল, ইংরেজিতেই উত্তর দিল, “হিলি স্টেশনে সরাসরি যাওয়া এখন ঠিক হবে না। ওটা বর্ডারের খুব কাছে, কড়া পাহারা। আমরা আগের কোনও স্টেশনে নেমে জঙ্গলের পথ ধরব।”

কে জানে কপালে কী আছে! কেন সে যে এই এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াল, তার হিসেবই বা করবে কে? উদাস মনে অনিমেষও বাইরের দিকে তাকাল। শহর ছাড়িয়ে ট্রেন এখন গ্রামবাংলার বুক চিরে এগোচ্ছে। বাইরের জগতটা যেন এক কালির সাগরে ডুবে গেছে। শুধু চোখে পড়ছে আদিগন্ত অন্ধকার মাঠ আর মাঝে মাঝে দূর গ্রামে দু’একটি হ্যারিকেন বা তেলের প্রদীপের টিমটিমে আলো, যা ট্রেনের গতির সাথে সাথে দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে আসা ইঞ্জিনের আগুনের আভা যখন বাইরের গাছগুলোর ওপর পড়ছে, তখন মনে হচ্ছে গাছগুলো যেন কোনও দানবীয় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশঝাড়গুলো বাতাসের দাপটে এ ওর গায়ে আছড়ে পড়ছে, আর সেই ঘর্ষণের শব্দ ট্রেনের ছন্দের সাথে মিশে যেন এক ভৌতিক আবহ তৈরি করছে। বাইরে সামান্য বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তির্যকভাবে আছড়ে পড়ছে ভিতরে। থেকে থেকেই ইঞ্জিনের কয়লার ধোঁয়া জানালার পাশ দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ট্রেন যখন কোনও নির্জন স্টেশনে না থেমে হুইসেল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন সেই আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন ফিরে আসছে এক অন্ধকার জগত থেকে। অনিমেষ, শক্ত হাতে ব্যাগটা ধরে, জানালার গরাদের ওপর কপাল ঠেকিয়ে, বাইরের এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারের মতোই তাদের গন্তব্যও এখন অনিশ্চিত। একবার মুখ নামিয়ে দেখল, রেণুকা একেবারে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে, ট্রেনের দুলুনিতে সেই মূর্তি দুলছে মাত্র। ও কি ঘুমুচ্ছে, নাকি চোখ বুজে আছে, দেখে বোঝার উপায় নেই।

ঘণ্টাখানেক কাটার পর কামরার ভিড় একটু হালকা হল। বাইরে রাতের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে নামছে। ট্রেনের ভিতরে টিমটিমে হলুদ আলো জ্বলছে, যা মাঝে মধ্যেই দপদপ করে নিভে যাচ্ছে। অনিমেষ অনুভব করল তার ব্যাগে থাকা ডায়েরিটা যেন এক জীবন্ত প্রাণীর মতো ধুকপুক করছে। তার খুব ইচ্ছে করছিল, ডায়েরিটা খুলে একবার পড়ে, কিন্তু সবার সামনে সেই কাজ করতে সে ভরসা পেল না। একটা আড়াল অন্তত দরকার। আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল, মেঝেতে, রেণুকার ঠিক পিছনে একটা পরিত্যক্ত খবরের কাগজের একটা পাতা পড়ে আছে। খুব সম্ভবত ঐ জায়গায় যে লোকটি এই কাগজটা পেতে বসেছিল, আগের কোনও স্টেশনে নেমে গেছে। সে চারদিকে একবার তাকাল, সবাই চোখ বুজে ঢুলছে। অনিমেষ চকিতে কাগজের পাতাটা কুড়িয়ে নিয়ে তার আড়ালে ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে খুলে ফেলল। 

ডায়েরির মাঝখানের একটি পাতায় ক্যাপ্টেন হার্ডিং লিখেছেন, “The line is not just a boundary; it is a fracture. If the corridor is opened, the North will bleed.”  অর্থাৎ, ‘এই লাইনটি কেবল একটি সীমান্ত নয়; এটি একটি ফাটল। যদি এই করিডোরটি খুলে দেওয়া হয়, তবে উত্তরবঙ্গ রক্তাপ্লুত হবে।’ সর্বনাশ!

সে ম্যাপের পাতায় ফিরে এল। ম্যাপটির দিকে তাকিয়ে অনিমেষের ইতিহাস-শিক্ষকের মনটা সক্রিয় হয়ে উঠল। সে লক্ষ্য করল, ম্যাপটার এক কোণে ছোট করে কিছু স্থানাঙ্ক, যাকে কো-অর্ডিনেটস বলে, দেওয়া আছে, যা বর্তমানের কোনও সাধারণ ম্যাপে তিনি দেখেননি।

অনিমেষ ম্যাপের নকশায় একেবারে ডুবে গিয়েছিল, আচমকা তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু সঙ্কেত পাঠাতেই সে কাগজের উপর থেকে মুখ তুলে দেখতে পেল, সামনের সিটে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ব্যক্তি, যার পরনে সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি এবং মাথায় একটা মাফলার জড়ানো, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। লোকটার এক চোখ পাথরের মতো স্থির, সম্ভবত নষ্ট হয়ে গেছে।

বৃদ্ধ হঠাৎ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল, “ইতিহাসের পাতায় অনেক সময় ভুল লেখা থাকে, প্রফেসর, কিন্তু মানচিত্র কখনও মিথ্যে বলে না।”

শব্দগুচ্ছসমূহ অনিমেষের কানে প্রবেশ করতেই যেন তার রক্ত হিম হয়ে গেল। সে চকিতে কাগজশুদ্ধ ডায়েরিটা ব্যাগের ভিতরে চালান করে দিয়ে রেণুকার দিকে একবার তাকাল। দেখল রেণুকা আগের মতোই মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে। অনিমেষ খানিকটা আশ্চর্যও হল। ভদ্রলোক যদিও বা তার তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে এটা বুঝতে পারেন যে, সে খবরের কাগজের আড়ালে কিছু পড়ছে, কিন্তু ডায়েরির পাতায় আঁকা ম্যাপটা বৃদ্ধ ভদ্রলোক বুঝতে পারলেন কী করে? আর অনিমেষ যে প্রফেসর, সেটা তো আন্দাজ করে বলা সম্ভবপর নয়। অনিমেষ থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি… আপনি কে?”

বৃদ্ধ একটু হাসলেন। তার ভাঙা দাঁতগুলো দেখা গেল। তিনি বলল, “আমি কেউ না। আমি শুধু তাদেরকে চিনি, যারা অকালমৃত ক্যাপ্টেনের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে বেড়ায়। আপনি যে পথে চলেছেন, সে পথে ফেরার রাস্তা নেই কিন্তু। জানেন তো?”

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের হলুদ আলোটা দপ দপ করে একেবারেই নিভে গেল। পুরো কামরায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। কামরার অন্য যাত্রীদের নাক ডাকার শব্দ আর ট্রেনের ঝিকঝিক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। অনিমেষ সজোরে তার ব্যাগটা চেপে ধরল। ঠিক সেই সময় অনিমেষ অনুভব করল, এক জোড়া ঠান্ডা হাত তার ব্যাগের ওপরটা হাতড়াচ্ছে।

“রেণুকা!” অনিমেষ চিৎকার করে উঠল।

অন্ধকারের মাঝেই ধস্তাধস্তি শুরু হল। অনিমেষ দু’হাত দিয়ে যত জোরে পারে, ব্যাগটা চেপে ধরল। ঠিক সেই সময়ে সে অনুভব করল কেউ একজন, সরু দড়ি জাতীয় কিছু একটা, তার গলার চারপাশে পরিয়ে, ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছে। এই খুনের চেষ্টা সে হাত দিয়ে আটকাতেই পারত, কিন্তু সেটা করতে গেলেই তার ব্যাগ ছিনতাই হয়ে যাবে। দমবন্ধ হয়ে আসছে অনিমেষের। সে মুহুর্মুহু মাথা ঝাঁকিয়ে অপকর্মটি এড়াতে চেষ্টা করল, আর সেটা করতে গিয়ে তার চশমাটা কোথায় যেন ছিটকে পড়ে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে এক তীব্র আলো এসে পড়ল অনিমেষের মুখে। টর্চের আলো। রেণুকার হাতে জ্বলে উঠেছে। সেই আলোতে দেখা গেল সেই বৃদ্ধ লোকটি আর বৃদ্ধ নেই। রীতিমত বছর তিরিশের এক শক্তসমর্থ যুবক। তার এক হাতে একটা সরু তারের ফাঁস, আর সে তার অন্য পেশিবহুল হাতটি দিয়ে অনিমেষের গলা টিপে ধরেছে। রেণুকা সেই মুহূর্তে আচমকা লাফিয়ে উঠে হিংস্র বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে নিদারুণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। অনিমেষ দেখল, একটা সরু লিকলিকে ছুরি আমূল বিঁধে গেছে লোকটার ডান কাঁধে। তার মানে রেণুকার হাতে ছুরি ছিল। ট্রেন তখন দ্রুতগতিতে বিকট ঝড়াং ঝড়াং শব্দ তুলে একটা সেতুর ওপর দিয়ে যাচ্ছে। নীচে গঙ্গার উত্তাল জল। লোকটা আহত অবস্থাতেই ট্রেনের খোলা দরজা দিয়ে অন্ধকারের মাঝে বাইরে ঝাঁপ দিল।

কামরার অন্য যাত্রীরা ততক্ষণে জেগে উঠে চিৎকার শুরু করেছে। রেণুকা এক হাতে ডায়েরির ব্যাগটা নিয়ে অন্য হাতে অনিমেষকে টেনে তুলল, “আমাদের এখনই নামতে হবে। ও একা ছিল না, ট্রেনের অন্য কামরায় ওর লোক নিশ্চয়ই আছে।”

অনিমেষ মেঝে হাতড়াতে লাগল, “চশমা! আমার চশমাটা কোথায় গেল?”

“আরে চশমা ছাড়ুন! ট্রেনের চেইন টানুন!”

রেণুকা গর্জে উঠল। কিন্তু চশমা ছাড়া অনিমেষের চলবে কী করে? এমন সময় একজন ভদ্রলোক তার দিকে চশমাটা এগিয়ে দিল। তাকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে অনিমেষ ট্রেনের চেইন ধরে সজোরে মারল এক টান। এক বিকট শব্দ করে চাকাগুলো লাইনের ওপর ঘষা খেতে লাগল। আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোতে শুরু করল। ট্রেন প্রায় থেমে এলে রেণুকা অনিমেষের জামার হাতা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, “ঝাঁপ দিন!”

কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝখান দিয়ে অনিমেষ আর রেণুকা রেললাইনের পাশের ঢালু জমিতে গড়িয়ে পড়ল। পুরু ঘাসের জমি থাকায় চোট লাগল না। ট্রেনের পেছনের কামরাগুলো থেকে ততক্ষণে টর্চের আলো এদিক-ওদিক ঘুরছে। কয়েকজন লোক লাফিয়ে নামছে ট্রেন থেকে। অনিমেষ দেখল রেললাইনের সমান্তরালে একটা ঘন জঙ্গল শুরু হয়েছে। সে দেখল, রেণুকা সেই ব্যাগটাকে শক্ত করে ধরে হাঁটা দিয়েছে।

রেণুকার পিছন পিছন চলতে চলতে অনিমেষ বলল, “হার্ডিং সাহেব যেখানে শেষ করেছিলেন, আমাদের সেখান থেকেই শুরু করতে হবে, তাই না?”

রেণুকা পিছন ফিরে তার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, “স্বাগত, অনিমেষবাবু। এবার আসল খেলা শুরু। দৌড়োন।”

তারা দু’জনে মিলে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে সেই গভীর জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। অনিমেষ বুঝল, তার চশমার বাঁ দিকের কাঁচটা পুরোপুরি ভেঙে খুলে পড়ে গেছে, তাই এক চোখে অর্ধেক দৃষ্টি নিয়েই, সে রেণুকাকে অনুসরণ করে চলল। পেছনে পড়ে রইল থেমে যাওয়া ট্রেন আর তাদের পিছু নেওয়া ঘাতকদের চিৎকার।

উত্তরবঙ্গের গভীর জঙ্গল। এখানে অন্ধকারের রঙ কোলকাতার মতো নয়; এখানে অন্ধকার যেন এক কালো মখমলের চাদর, যা চারপাশের সবকিছুকে গিলে নিতে চায়। ঝিঁঝিঁ পোকার একনাগাড়ে কোরাস আর দূরের কোনও অজানা বন্যপ্রাণীর ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। অনিমেষ আর রেণুকা রেললাইন থেকে বেশ খানিকটা গভীরে চলে এসেছে। রেণুকার পিছু পিছু হাঁটছে অনিমেষ। সে খেয়াল করল, রেণুকা এই অন্ধকারের মধ্যেও টর্চ জ্বালিয়ে ঠিক হেঁটে চলেছে, কোথাও থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটার কত অভিজ্ঞতা আছে কে জানে!

“রেণুকা, আমরা ঠিক কোথায়?” অনিমেষ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

“আমরা এখন জলপাইগুড়ি আর হিলির মধ্যবর্তী এক বনাঞ্চলে। সামনেই তিস্তার একটা ছোট শাখা নদী আছে, ওটা পার হলেই আমরা মিস্টার এক্স-এর ডেরার কাছাকাছি পৌঁছে যাব।”

“নদী পার হতে হবে?”

“ডেপথ বেশি নয়, হেঁটেই পার হওয়া যায়।”

রেণুকা টর্চের আলোটা মাটির দিকে নিবদ্ধ রেখে দ্রুতপায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা শিকারি বাঘিনীর সাবলীলতা আছে। অনিমেষের পায়ের তলায় শুকনো পাতা মড়মড় করে ভাঙছে। তার মনে হচ্ছিল, এই জঙ্গল কেবল গাছপালা দিয়ে তৈরি নয়, এটি হাজার বছরের পুরোনো গোপন কথার সাক্ষী। সে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, রেণুকা, এই মিস্টার এক্সটা কে?”

অন্ধকারে মনে হল, রেণুকা সামান্য হাসল, “আপনি সত্যিই সোজাসাপ্টা মানুষ। এই প্রশ্নটাও আপনার অনেক আগেই করা উচিত ছিল। শুনুন তবে। মিস্টার এক্স হলেন, অমরেশ সান্যাল। আমরা বলি, সান্যাল সাহেব। ওনার জন্ম উত্তরবঙ্গের এক বনকর্মীর পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই জঙ্গল আর পাহাড় ভদ্রলোকের নখদর্পণে। তিরিশের দশকের শুরুতে তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দেন। তার অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং নিখুঁত নিশানার জন্য তাকে দ্রুত ‘ইন্টেলিজেন্স কোর’-এ ট্রান্সফার করা হয়। উনচল্লিশ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, ওনাকে বার্মা ফ্রন্টে পাঠানো হয়। বার্মার গভীর জঙ্গলে জাপানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় সান্যাল সাহেব বুঝতে পারেন যে, কেবল বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। দরকার সঠিক মানচিত্র আর গোপন তথ্য। সেখানে তিনি ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে মিলে অনেক ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার এবং গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেন। এই সময়ই তার সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ তুর্কি জেমস হার্ডিংয়ের। হার্ডিং তখন একজন লেফটেনেন্ট ছিলেন আর সান্যাল সাহেব ছিলেন তার প্রশিক্ষক ও বন্ধু। সাতচল্লিশে যখন র‍্যাডক্লিফ সাহেব ভারত ভাগের রেখা টানছিলেন, তখন সান্যাল সাহেবকে স্পেশাল ডিউটিতে উত্তরবঙ্গে পাঠানো হয় হার্ডিংকে সাহায্য করার জন্য। হার্ডিং যখন সেই গোপন করিডোর এবং খনিজ সম্পদের সন্ধান পান, তিনি প্রথম সেই খবরটি সান্যাল সাহেবকেই দিয়েছিলেন। সান্যাল সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই তথ্য প্রকাশিত হলে ভারত এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের কবলে পড়বে। তাই হার্ডিং যখন নিখোঁজ হয়ে যান, সান্যাল সাহেব চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই স্বেচ্ছায় ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান, যাতে তিনি বাইরের জগৎ থেকে আড়ালে থেকে এই গোপন রহস্য পাহারা দিতে পারেন। গত এক বছর ধরে সান্যাল সাহেব জঙ্গলে একাকী বসবাস করছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে তিনি নিজের একটি গুপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল ‘হার্ডিং কোড’ যেন ভুল হাতে না গিয়ে পড়ে। তিনি জানতেন পরেশদা বা আমার মতো লোকজন লড়তে জানে, কিন্তু এই কাজের জন্য দরকার একজন অভিজ্ঞ মাথা আর উনি সেই অভাবটাই পূরণ করে আসছেন।” 

  রেণুকার কথা শুনতে শুনতে অদেখা ভদ্রলোকের প্রতি অনিমেষের শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছিল। আচমকা একটা কথা মনে পড়ায় সে বলল, “আচ্ছা, হার্ডিং সাহেবের বাড়িতে আপনার রাঁধুনির কাজটা কি সান্যাল সাহেবই…”

রেণুকা বলে উঠল, “এই তো প্রফেসর, ধরে ফেলেছেন। সান্যাল সাহেবের শখ কী জানেন তো? শুনলে অবাক হবেন। উনি পুরোনো ঘড়ি মেরামত করতে ভালোবাসেন। বেশ মজার না? উনি কী বলেন জানেন? উনি বলেন, ‘সময় একবার খারাপ হয়ে গেলে তাকে সারিয়ে তোলা যায়, কিন্তু ইতিহাস একবার বিগড়ে গেলে তা ঠিক করা কঠিন।’ কী দারুণ সত্য কথা।”

আচমকা অনিমেষের ডায়েরিটার কথা মনে পড়ল। এই জঙ্গলেই কি ক্যাপ্টেন হার্ডিং তার শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিল?

প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর জঙ্গলের ঘনত্ব একটু কমল। সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী। বরফগলা জলের সেই ঠান্ডা হাওয়া অনিমেষের ঘামে ভেজা শরীরে একটু স্বস্তি দিল। নদীর ওপারে একটা ছোট কুঁড়েঘর দেখা যাচ্ছে, যার জানালা দিয়ে টিমটিমে আলোর আভা বেরিয়ে আসছে।

রেণুকা আঙুল দিয়ে দেখাল, “ওই যে। ওটাই আমাদের গন্তব্য।”

নদী পার হওয়াটা অনিমেষের মতো সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ছিল না। হাঁটুর ওপর ধুতি তুলে, পিচ্ছিল পাথরে পা দিয়ে যখন ওপারে পৌঁছালেন, তখন তার পা বরফ ঠান্ডা হয়ে প্রায় অবশ। কুঁড়েঘরটার সামনে পৌঁছাতেই এক বিশালকার কুকুর গরগর শব্দ করে তাদের পথ আগলে দাঁড়াল।

“ব্রুটাস, কিপ কোয়ায়েট!”

ঘরের ভিতর থেকে এক গম্ভীর অথচ পরিষ্কার কণ্ঠস্বর ভেসে এল। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। দীর্ঘদেহী, পরনে খাকি হাফপ্যান্ট আর একটি পুরোনো কোট। তার মাথায় একরাশ সাদা চুল, চোখের দৃষ্টি ইস্পাতের মতো ধারালো। দেখেই মনে হয় কোনও প্রাক্তন সামরিক অফিসার।

লোকটির ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, “রেণুকা, তুমি সময়মতোই এসেছ। আর ইনিই কি তবে আমাদের সেই ইতিহাসের জাদুকর?”

রেণুকা সামান্য হেসে বলল, “হ্যাঁ, মিস্টার সান্যাল। ইনিই অনিমেষ লাহিড়ী, পরেশ পালের বন্ধু। পরেশদা একেই ডায়েরিটা দিয়ে গেছেন।”

মিস্টার সান্যাল অনিমেষের দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন, “আসুন, অনিমেষবাবু। জঙ্গলের নিঃস্তব্ধতায় স্বাগতম। আমি অমরেশ সান্যাল। একসময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে ছিলাম। এখন আমি ইতিহাসের সেই পাতাগুলো পাহারা দিই যা লোকে ভুলে যেতে চায়।”

ঘরের ভিতরটা অদ্ভুত। দেয়াল জুড়ে অসংখ্য মানচিত্র আর হাতে আঁকা স্কেচ। এক কোণের একটা টেবিলের উপরে একটা পুরোনো টাইপরাইটার রাখা। সান্যাল সাহেব সেই টেবিলের ওপর একটি বড় ম্যাপ বিছিয়ে দিলেন।

“অনিমেষবাবু, আপনি কি জানেন কেন আপনার কাছে থাকা ডায়েরিটা এত গুরুত্বপূর্ণ?” সান্যাল সাহেব সরাসরি প্রশ্নে এলেন।

“আমাকে তুমি করতে বলতে পারেন। রেণুকা, ব্যাগটা।”

রেণুকা তার ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করে টেবিলের ওপর রাখল। অনিমেষ বলল, “আমি যতটুকু বুঝেছি, ক্যাপ্টেন হার্ডিং এমন একটি করিডোরের সন্ধান পেয়েছিলেন যা র‍্যাডক্লিফ লাইনের বাইরে ছিল। কিন্তু কেন?”

সান্যাল সাহেব লেন্স দিয়ে ডায়েরির শেষ পাতাটি পরীক্ষা করতে করতে বলল, “কারণ হার্ডিং বুঝতে পেরেছিলেন, ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে যে বিভাজন রেখা টানা হয়েছে, তা কোনও প্রাকৃতিক সীমানা নয়। তিনি হিলির জঙ্গলে সার্ভে করার সময় মাটির নীচে এক বিশাল খনিজ সম্পদের স্তর খুঁজে পান, যার অবস্থান এমন এক ভূখণ্ডে যা কোনও দেশের মানচিত্রেই নেই। এই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ যদি ভারত পায়, তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিরক্ষা হবে অভেদ্য। আর যদি পাকিস্তান বা অন্য কোনও তৃতীয় শক্তি এটা পায়, তাহলে বুঝতেই পারছ, অনিমেষ?”

অনিমেষের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, “তাহলে হার্ডিং সাহেব নিখোঁজ হলেন কেন?”

সান্যাল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “কারণ তিনি কোনও পক্ষ নিতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এই তথ্যটা যেন কোনও অসৎ রাজনীতিবিদের হাতে না পড়ে। তিনি জানতেন, সত্য যখন রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন সত্যকেই হারিয়ে যেতে হয়। আমার আন্দাজ হার্ডিংকে খুন করা হয়েছে অনিমেষ, আর সেই খুনিরা এখনও এই ডায়েরির সন্ধানে তোমার পিছনে লেগে আছে।”

অনিমেষ ডায়েরির সেই লাল দাগগুলোর দিকে তাকাল। হঠাৎ তার মাথায় একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল, “সান্যাল সাহেব, এই দাগগুলো কি কেবল করিডোর বোঝানোর জন্য? দেখুন তো, দাগগুলো যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখানে একটা ছোট ক্রুশ চিহ্ন দেওয়া আছে না?”

সান্যাল সাহেব তীক্ষ্ণ নজরে দেখলেন, “হুম, হার্ডিংয়ের ব্যক্তিগত সঙ্কেত বলেই মনে হচ্ছে। কিসের সঙ্কেত হতে পারে?”

অনিমেষের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত প্রত্যয় ফুটে উঠল, “একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি বলতে পারি, এটা কোনও সাধারণ সঙ্কেত নয়। এটা একটা পুরোনো ব্রিটিশ বাঙ্কারের চিহ্ন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আক্রমণ ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছিল। হার্ডিং সাহেব হয়তো সেই বাঙ্কারের ভিতরেই মূল মানচিত্রটা লুকিয়ে রেখে গেছেন।”

রেণুকা আর সান্যাল সাহেব একে অপরের দিকে তাকাল। অনিমেষের সাধারণ অধ্যাপক সত্ত্বাটা যেন ধীরে ধীরে এক দুর্ধর্ষ গোয়েন্দায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে ব্রুটাস প্রচণ্ড জোরে ডেকে উঠল। তারপরই শোনা গেল কার যেন এক কর্কশ গর্জন। সান্যাল সাহেব দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়াল থেকে তার রাইফেলটা নামিয়ে নিলেন, “ওরা এসে গেছে। ওরা জঙ্গল ছেঁকে ফেলেছে। অনিমেষ, আজ রাতটাই হয়তো ইতিহাসের শেষ পরীক্ষা।”

অনিমেষ ডায়েরিটা বন্ধ করে দু’হাত দিয়ে আগলে ধরল। সে বুঝে গেছে, আপাতত পালানোর পথ বন্ধ। এবার সম্মুখ লড়াইয়ের সময়।

বাইরে আচমকা গুলির শব্দ। ব্রুটাসের ডাক হঠাৎ করেই থেমে গেল। অনিমেষ বুঝল, কুকুটাকে গুলি করা হয়েছে। অমরেশ সান্যাল রাইফেলের সেফটি ক্যাচটা সরিয়ে দিলেন। তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ।

সান্যাল সাহেব প্রায় ফিসফিস করে আদেশ দিলেন, “অনিমেষ, টেবিলের নীচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পেছনের দরজার দিকে যাও আর রেণুকা, তুমি ওকে কভার করো। আমি ততক্ষণ ওদের আটকে রাখছি।”

অনিমেষের হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। যে মানুষটা এক সময় ক্লাসরুমে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের উপরে লেকচার দিয়েছিল, আজ সে নিজেই এক পতনের মুখে দাঁড়িয়ে। সে ডায়েরিটা শক্ত করে চেপে ধরল। হঠাৎ কুঁড়েঘরের জানালার কাচ ভেঙে একটা টিয়ার গ্যাসের সেল ভিতরে এসে পড়ল। মুহূর্তে ঘরটা সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেল। চোখ-নাক জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে অনিমেষের। সে কাশতে কাশতে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, এমন সময় রেণুকার গলা কানে এল, “অনিমেষবাবু! আমার হাতটা ধরুন!”

সেই সাদা দমবন্ধ-করা ধোঁয়ার মধ্যে অনিমেষ রেণুকার হাত খুঁজে পাওয়ার আগেই, রেণুকা তাকে হিড়হিড় করে টেনে পেছনের এক ছোট দরজা দিয়ে বাইরে বের করে আনল। কুঁড়েঘরের সামনে তখন গুলির শব্দ শুরু হয়েছে। সান্যাল সাহেবের থার্টি-থ্রি-জিরো রাইফেলের গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্ধকারের ওপার থেকে রাইফেলের পর পর আওয়াজ আসছে। জঙ্গলের বুক চিরে তারা দৌড়াতে শুরু করল। এবার আর কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই। অনিমেষ শুধু রেণুকার নীল শাড়ির আঁচলটা লক্ষ্য করে ছুটল। ডালপালা মুখে লাগছে, কাঁটায় পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যাচ্ছে, হাত ছড়ে যাচ্ছে, কিন্তু থামার উপায় নেই। অনেক পেছনে বুটের শব্দ আর টর্চের আলো ধেয়ে আসছে।

প্রায় আধঘণ্টা দৌড়ানোর পর রেণুকা একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছের গুড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। দেখাদেখি, অনিমেষও। দুজনেই হাঁপাচ্ছে। অনিমেষের মনে হচ্ছিল যেন তার ফুসফুস ফেটে যাবে। মনে হল তার শ্বাসনালী এবং বুকের ভেতরটা কেউ যেন আগুনের ছ্যাঁকা দিচ্ছে। অনিমেষ হাঁটুতে ভর দিয়ে দম নিচ্ছিল। সেই দেখে রেণুকা বলল, “অনেকদিন দৌড়নোর অভ্যেস নেই মনে হচ্ছে? এক কাজ করুন, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত দুটো মাথার পেছনে রাখুন। এবার ধীরে ধীরে লম্বা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন। এতে কী হবে, ফুসফুস প্রসারিত হওয়ার জন্য বেশি জায়গা পাবে।”

রেণুকার কথামতো কাজ করতেই বেশ খানিকটা উপকৃত হল অনিমেষ। সে জিজ্ঞেস করল, “ওরা… ওরা কারা, রেণুকা?”

“ওরা ‘ব্ল্যাক ঈগল’ গ্রুপের লোক। ভাড়াটে খুনি। কোনও এক বিশেষ দেশের হয়ে কাজ করছে।”

ঠিক সেই সময় রেণুকা তার কোমর থেকে একটা রিভলভার বের করতেই অনিমেষ চমকে উঠল। সে বুঝল, দেখতে অতি সাধারণ হলেও, রেণুকা কোনও সাধারণ মেয়ে নয় এবং অবশ্যই প্রশিক্ষিত।

রেণুকা তার রিভলভারটা লোড করতে করতে বলল, “ম্যাপে আঁকা ব্রিটিশ বাঙ্কারের চিহ্নগুলো মনে আছে? আমি চিনি সেই বাঙ্কার। আমাদের ওই বাঙ্কারেই পৌঁছাতে হবে। আমার আন্দাজ সত্যি হলে ডায়েরির সেই ম্যাপের শেষ বিন্দুটা এই গাছের ঠিক চারশো গজ উত্তরে।”

অনিমেষ ডায়েরিটা আবার বের করল। টর্চের আলোয় শেষ পাতাটা দেখল। হার্ডিংয়ের সেই ক্রুশ চিহ্নের পাশে ছোট করে ল্যাটিন ভাষায় লেখা আছে, ‘Ad Infinitum’। অনিমেষ বলল, “এটা তো ইংরেজি বলে মনে হচ্ছে না।”

পাতাটার উপরে ঝুঁকে পড়ে রেণুকা বলল, “ল্যাটিন ওয়ার্ড। বাংলা করতে দাঁড়ায় ‘অনন্তকাল ধরে’।”

অনিমেষ আবারও চমৎকৃত হল। রেণুকা ল্যাটিন জানে! কিন্তু সেদিকে মন দেওয়ার অবস্থায় সে নেই এখন। নামটা শুনেই একটা ব্যাপার তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। সে বলল, “রেণুকা, ওয়েট! হার্ডিং সাহেব যে ল্যাটিন শব্দটা ব্যবহার করেছেন, তার মানে কিন্তু শুধু ‘অনন্তকাল ধরে’ নয়। আমি পড়েছি এই ব্যাপারটা। অনেক আগে অবশ্য। এটা একটা আর্কিটেকচারাল কোড। ব্রিটিশরা যখন বাঙ্কার বানাত, তখন তারা কম্পাসের মূলবিন্দুকে এই নামে চিহ্নিত করত। তার মানে… তার মানে… হা ঈশ্বর! ম্যাপটা সোজা নয়, এটা আয়নার মতো উল্টো করে পড়তে হবে!”

রেণুকা অবাক হয়ে তাকাল, “তার মানে আমরা ভুল দিকে যাচ্ছিলাম?”

“অবশ্যই! উত্তর নয়, আমাদের যেতে হবে দক্ষিণে, আই প্রিজিউম দক্ষিণ-পশ্চিমে, যেখানে নদীর স্রোতটা বাঁক নিয়েছে।”

“বেশ। কিন্তু সরাসরি উল্টোপথে গেলে চলবে না। শত্রুরা আমাদের পিছনে আছে।”

“তাহলে?”

“আমি রাস্তা চিনি। সামান্য ঘুরপথ, কিন্তু আমি নিয়ে যেতে পারব। চলে আসুন।”

ভাবা মাত্র কাজ। অনিমেষ আর রেণুকা দিক পরিবর্তন করে ঘুরপথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নিঃশব্দে এগোতে লাগলেন। পেছনের শত্রুরা তখন হয়তো উত্তরের জঙ্গলে তাদেরকে খুঁজছে। কিছুক্ষণ পর তারা একটা টিলার সামনে এসে পৌঁছাল। টিলাটা ঘন লতাগুল্মে ঢাকা। কিন্তু একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, লতার আড়ালে কংক্রিটের এক প্রাচীন কাঠামো উঁকি দিচ্ছে। এটাই সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাঙ্কার। লোহার দরজাটায় মরচে ধরে গেছে।

অনিমেষ জানে, ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে যখন আকাশপথে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছিল, তখন সামরিক কমান্ডের সুরক্ষায় এই বাঙ্কারগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এই জাতীয় বাঙ্কারগুলো সাধারণত মাটির অনেক গভীরে তৈরি করা হতো। এর ছাদ ও দেয়াল হতো কয়েক ফুট পুরু কংক্রিট দিয়ে তৈরি, যাতে ভারি বোমার সরাসরি আঘাতও সহ্য করতে পারে আর বাঙ্কারের প্রবেশপথে ব্যবহৃত হতো ভারি ব্লাস্ট ডোর, যেগুলো শুধু শত্রুর আক্রমণ নয়, বরং বোমার প্রচণ্ড শব্দ বা আঘাত এবং বিষাক্ত গ্যাস আটকাতেও সক্ষম ছিল।

অনিমেষ আর রেণুকা দু’জনে মিলে, গায়ের যত জোর আছে, সব একত্র করে ধাক্কা দিতেই, একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ব্লাস্ট ডোরটা সামান্য ফাঁক হল। অমনি ভিতর থেকে এক ভ্যাপসা, পুরোনো বারুদ আর পচা ভাপের গন্ধ যেন এক লাফে বাইরে বেরিয়ে এল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে টর্চ জ্বালিয়ে ভিতরে ঢুকল রেণুকা। তার পিছনে অনিমেষ।

ঢুকতেই নাকে আসল ভ্যাপসা ধুলোর গন্ধ। দীর্ঘদিনের স্যাঁতসেঁতে ভাবের কারণে দেওয়াল থেকে চুনকাম খসে পড়ছে। ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের চাইতে অনেকটাই কম এবং বাতাস বেশ ভারি। দেওয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু রি-ইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে তৈরি। দেওয়ালের গায়ে বিদ্যুতের প্যাঁচানো তার এবং চিনেমাটির ইনসুলেটর। কক্ষের এক কোণে একটা ভারি কাঠের টেবিল আর তার ওপর পড়ে আছে কিছু জং ধরা টিন। এক কোণায় পড়ে আছে কিছু পুরোনো আমলের ফিল্ড টেলিফোন আর বেতার যন্ত্রের ভগ্নাবশেষ। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু হ্যারিকেন, কাঠের বাক্স। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে অনিমেষ দেখতে পেল, দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে ব্রিটিশ রাজকীয় প্রতীকের একটা ফলক। আরও রয়েছে একটা লোহার আলমারি, কিছু জং ধরা কিছু র‍্যাক আর ড্রয়ার।

কক্ষের একেবারে মাঝখানে একটা ছোট টেবিলের উপরে রাখা আছে একটা হ্যান্ডেলযুক্ত আয়তকার মেটাল বক্স। দু’জনে সেই দিকেই এগিয়ে গেল। মেটাল বক্সের উপরে খোদাই করা রয়েছে কিছু ইংরেজী শব্দ। ‘Property of British Surveyor Corps’। অনিমেষের বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। রেণুকা বলল, “খুলে ফেলুন বাক্সটা, দেখা যাক।”

কাঁপা হাতে বাক্সটা খুলতেই দেখা গেল তার ভিতরে সুন্দর করে গুটিয়ে রাখা একটা সিল্কের ম্যাপ। ম্যাপটা খুলতেই অনিমেষ আর রেণুকা স্তব্ধ হয়ে গেল। ম্যাপে উত্তরবঙ্গের সেই গোপন করিডোরের প্রতিটি ইঞ্চি নিখুঁতভাবে আঁকা। কিন্তু চমকটা ছিল অন্য জায়গায়। ম্যাপের নিচে হাতে লেখা ইংরেজি একটা নোট, যার বাঙলা করতে দাঁড়ায়, “যিনি এই ম্যাপটি খুঁজে পাবেন, তিনি জানবেন, এই করিডোর কেবল এক টুকরো জমি নয়, এটি একটি সুড়ঙ্গ পথ যা হিমালয়ের পাদদেশ দিয়ে সরাসরি তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত। এর নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, এশিয়ার ভবিষ্যৎ তার মুঠোয়।” নীচে স্বাক্ষর স্বয়ং হার্ডিংয়ের।

হঠাৎ বাঙ্কারের প্রবেশপথে এক ছায়া দেখা দিল। অনিমেষ চমকে তাকিয়ে দেখল, সেই গালে কাটা দাগওয়ালা লোকটা। এই লোকটাই অনিমেষের মেসবাড়িতে সেদিন রাতে গিয়েছিল। এখন লোকটার এক হাতে একটা জোরালো টর্চ আর অন্য হাতে একটা চকচকে রিভলভার। লোকটা রীতিমত উল্লসিত গলায় বলল, “ব্রাভো, প্রফেসর! আপনি সত্যিই একজন জিনিয়াস। ম্যাপটা খুঁজে দেওয়ার জন্য আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ। এবার ওটা আমার হাতে দিয়ে দিন, আর আমি আপনাদের মৃত্যুটা যতটা সম্ভব যন্ত্রণাহীন করার চেষ্টা করব।”

অনিমেষ টের পেল, সে আর ভয় পাচ্ছে না, তার বুক দুরদুরু করে উঠছে না। সে ম্যাপটা ধীরে ধীরে ফের মেটাল বক্সটার ভিতরে চালান করে, হ্যান্ডেলটা শক্ত করে চেপে ধরে, লোকটার চোখের দিকে তাকাল। তার মনে হল, সে এখন আর শুধুমাত্র ইতিহাসের একজন অধ্যাপক নয়, সে এই দেশের লুকোনো ইতিহাসের একজন দায়িত্বশীল পাহারাদার। সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “দুঃখিত, এই ম্যাপটা আপনাকে দেওয়া যাচ্ছে না।”

লোকটা এবার হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল, “আপনি আমাকে চেনেন না, প্রফেসর। আমাকে টাইগার নামে সবাই চেনে। আমার কবলে একবার পড়লে…”

লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেল। সেই শব্দে বাঙ্কারটা যেন একবার কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল ভিতরে থাকা তিনজনই। দেখতে দেখতে বাঙ্কারের ছাদ থেকে ঝুরঝুর করে বালি পড়া শুরু হয়ে গেল। রেণুকা চিৎকার করে বলল, “আমাদের এখনই এখান থেকে বেরোতে হবে।”

লোকটা বলে উঠল, “সে তো বটেই, তবে আমি একা। আপাতত ম্যাপের বাক্সটা আমাকে দিয়ে দিন, প্রফেসর।”

রেণুকা বলল, “বোকা! ম্যাপ তো বাইরে গিয়েও দেওয়া যায়। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে আপনাকে আর কষ্ট করে আমাদেরকে মারতে হবে না। তিনজনই মারা পরে যাব।”

লোকটা কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই আরেকটা বিস্ফোরণের শব্দে বাঙ্কারের দেওয়াল আর ছাদের বহু বছরের ধুলো আর চুনবালি এক সঙ্গে ভেঙে পড়ল মেঝেয়। ধোঁয়া আর ধুলোয় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল।

বিস্ফোরণের ধাক্কায় অনিমেষ মেঝেতে ছিটকে পড়েছিল, কিন্তু তার হাত থেকে মেটাল বক্সের হ্যান্ডেলটা আলগা হয়নি। সে ঝাপসা চোখে দেখল, সেই ধুলোর মেঘের মধ্যে ‘টাইগার’ নামের লোকটা রিভলভার উঁচিয়ে কাউকে যেন খুঁজছে, অথচ দেখতে পাচ্ছে না।

“রেণুকা!” অনিমেষ ফিসফিস করে ডাকলেন। কোনও উত্তর নেই।

সম্ভবত তার কথা কানে গেল টাইগারের। সে বার দু’য়েক কেশে নিয়ে কর্কশ গলায় হেসে উঠে বলল, “প্রফেসর, আপনার ওই সঙ্গিনী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। এবার খেলাটা শেষ করুন দেখি। আপনি কোথায় চাপা পড়েছেন বলুন দেখি। আমি আপনার কাছে আসছি। প্রফেসর, ম্যাপটা আমাকে দিয়ে দেবেন, তা না হলে আমার প্রথম গুলিটাই আপনার ওই ইতিহাস ভরা মগজটা ফুটো করে দেবে।”

অনিমেষ বুঝল, লোকটা তাকে দেখতে পাচ্ছে না। চারদিকে হাতড়ে ধুলোর আস্তরণের মধ্যেই সে একটা পুরোনো মরচে ধরা লোহার পাইপ খুঁজে পেল। তার শরীরটা কাঁপছে, কিন্তু মনের ভিতর এক অদ্ভুত ঠান্ডা জেদ যেন চেপে বসেছে। তার কাছ থেকে ম্যাপ কেড়ে নিতে হলে আগে তার প্রাণটাকে কেড়ে দিতে হবে। সে জানতো, সরাসরি এই দুর্ধর্ষ ঘাতকের সামনে দাঁড়ানো মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। এখন তাকে ইতিহাসের পাতা থেকে শেখা সেই ‘গেরিলা টেকনিক’ ফলো করতে হবে।

অনিমেষ চকিতে পাইপটা মেঝে থেকে তুলে নিয়ে পাশের একটা মেটাল র‍্যাকের ওপর সজোরে আঘাত হানল। শব্দটা বাঙ্কারের এক কোণে প্রতিধ্বনিত হল। টাইগার তৎক্ষণাৎ সেদিকে ঘুরে পর পর দুটো গুলি চালাল। আগুনের ফুলকি আর কান ফাটানো শব্দে বাঙ্কারটা আরেকবার কেঁপে উঠল। টাইগার হতচকিত হয়ে পড়ল আর সেই সুযোগে রেণুকা অন্ধকারের আড়াল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল টাইগারের ওপরে। আচমকা আক্রমণে টাইগারের হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে পড়ে গেল। এর পরে মেঝের ওপর শুরু হল দুই প্রশিক্ষিত যোদ্ধার মরণপণ লড়াই। টাইগার আকারে বিশাল, কিন্তু রেণুকার ক্ষিপ্রতা দেখার মতো।

টাইগারের মতো অমন বিশালদেহীর সঙ্গে যুঝতে যুঝতে রেণুকা চিৎকার করে উঠল, “অনিমেষবাবু! পালান! বাক্সটা নিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে যান! আপনার বাঁদিকে…”

রেণুকা আর কিছু বলতে পারল না। টাইগার তার মুখ চেপে ধরেছে। অনিমেষ টর্চের আলো ফেলে দেখল, টেবিলের পেছনের দিকে একটা ছোট লোহার ম্যানহোল। ওটা বোধহয় সেই গোপন সুড়ঙ্গ যা হার্ডিং সাহেব তার নোটে লিখেছিলেন। কিন্তু সে রেণুকাকে এই অবস্থায় ফেলে পালাতে পারবে না।

“আমি আপনাকে রেখে যাব না!”

অনিমেষের গলায় এক বলিষ্ঠ তেজদীপ্ত কন্ঠস্বর যেন ঝলসে উঠল। সে দেখল টাইগারের হাতটা ক্রমশ রেণুকার গলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একবার পেঁচিয়ে ধরতে পারলেই, সবল বাহুর চাপে, রেণুকার দম বন্ধ হয়ে যাবে। অনিমেষ আর এক মুহূর্ত ভাবল না। জীবনে প্রথমবারের জন্য সে হিংসার আশ্রয় নিল। সেই ভারি লোহার পাইপটা দু’হাতে তুলে সে সজোরে টাইগারের পিঠে আঘাত করল। টাইগার যন্ত্রণায় চিৎকার করে রেণুকাকে ছেড়ে দিল। সেই ফাঁকে রেণুকা তার রিভলভারটা কুড়িয়ে নিয়ে টাইগারের হাঁটু লক্ষ্য করে গুলি চালাল। বাঙ্কারের বদ্ধ বাতাসে গুলির শব্দটা যেন বাজ পড়ার মতো শোনাল। একটা আর্তচিৎকার করে টাইগার মুখ থুবড়ে পড়ল ধুলোঢাকা মেঝেতে।

“চলে আসুন, অনিমেষবাবু।”

“আর এই শয়তানটা?” অনিমেষের তখনও ইচ্ছে করছিল, নরপশুটার পিঠে আরও এক ঘা বসিয়ে দেয়।

“ও মরবে না, কিন্তু আপাতত আমাদের আর ধরতে পারবে না।” রেণুকা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। ওর কপাল দিয়ে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছিল, “চলুন, বাইরে থেকে ওর আরও লোক আসছে।”

তারা দু’জন মিলে সেই ম্যানহোলের ঢাকনাটা সরাল। ভিতরে একটা পাথরের সিঁড়ি ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে গেছে। তারা ভিতরে ঢুকে ঢাকনাটা আবার বন্ধ করে দিল। সুড়ঙ্গের ভিতরটা স্যাঁতসেঁতে আর ন্যাপথলিনের মতো একটা গন্ধে ভরা। দেওয়ালের গায়ে ব্রিটিশ আমলের ইলেকট্রিক তারের অবশিষ্টাংশ ঝুলে আছে। হাঁটতে হাঁটতে অনিমেষের মনে হল, তারা যেন সময়ের উল্টো দিকে হাঁটছে।

“রেণুকা, বাইরে বিস্ফোরণটা কে ঘটাল? সান্যাল সাহেব কি বেঁচে আছেন?” অনিমেষ উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল।

“সান্যাল সাহেব একাই একটা সেনাবাহিনী, অনিমেষবাবু। ওটা ওনারই কাজ। উনি নিজেকে বিপদে ফেলে আমাদের জন্য রাস্তা পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু আমাদের কাজ এখনও শেষ হয়নি। হার্ডিংয়ের ম্যাপ বলছে, এই সুড়ঙ্গটা হিলির বর্ডারের ওপারে কোনও এক পুরোনো চার্চের নীচে গিয়ে শেষ হয়েছে। একবার ম্যাপটা খুলে দেখুন তো।”

টর্চের আলোয় অনিমেষ মেটাল বক্সটা খুলে ম্যাপটা আবার মেলে ধরল। হ্যাঁ, একটা জায়গার নাম লেখা আছে বটে। ‘সেন্ট জাভিয়ার্স চ্যাপেল’। ১৯৪৫ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। র‍্যাডক্লিফের হিসেব অনুযায়ী, ওটা এখন পাকিস্তান বর্ডারের ঠিক ওপরে, খুব সম্ভবত। অনিমেষ বলল, “কিন্তু রেণুকা, ম্যাপের শেষ পাতায় হার্ডিং একটা অদ্ভুত কথা লিখেছেন, ‘The key is not the map, the key is the observer’। এই কথার মানে কী?”

রেণুকা বলল, “ও বাবা! এর মানে তো আমিও বুঝতে পারলাম না।”

কিছুক্ষণ কী ভেবে নিয়ে অনিমেষ বলল, “আমার মনে হচ্ছে, এই ম্যাপটা সাধারণ ম্যাপ নয়। ম্যাপের ওপরে যদি কোনও বিশেষ লেন্স না ফেলা হয়, তবে সেই করিডোরের আসল প্রবেশপথটা দৃশ্যমান হবে না। এই রকম ডকুমেন্টের ব্যাপারে আমি রিসার্চ করবার সময়ে একবার জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবার কথা হচ্ছে সেই লেন্সটা আমি এখানে পাব কোথায়?”

কিছুক্ষণ ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে থেকে রেণুকা বলল, “হোক বা না হোক, হার্ডিং সাহেব এই ডায়েরির মধ্যেই কোথাও সেই লেন্সটা লুকিয়ে রেখেছেন। ভাল করে প্রত্যেকটা পাতা দেখুন তো।”

“কিন্তু লেন্স তো কাগজের পাতা নয় যে, ডায়েরির মধ্যে থাকলেও আমি টের পাব না।”

তবুও বেশ ভাল করে প্রত্যেকটা পাতা খুঁটিয়ে দেখার পরে অনিমেষ হতাশ হল। এমন সময় রেণুকা বলল, “কভার! কভারটা চেক করুন!” 

অনিমেষ তৎক্ষণাৎ ডায়েরির চামড়ার মলাটটা নখ দিয়ে খুঁটতে শুরু করল। প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে মলাটের ভিতরে একটা শক্ত গোল চাকতি মতো কিছু অনুভব করল সে। আরও খানিকটা খুঁটতেই বেরিয়ে এল জিনিসটা। একটা নীল রঙের কাঁচের লেন্স।

“ইউরেকা! পেয়ে গেছি। এবারে ম্যাপটা ভাল করে মেলে ধরে…”

অনিমেষের কথা শেষ হওয়ার আগেই সুড়ঙ্গের পেছনের দিক থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা গেল। তারা দু’জনেই বুঝল, টাইগার হয়তো ধরাশায়ী, কিন্তু তার দলবল কুকুর নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছে। অনিমেষ চকিতে মেটাল বক্সটা খুলে তার ভিতরে ডায়েরি আর লেন্সটা চালান করে দিয়ে হ্যান্ডেলটা নিজের বাহুতে ঝুলিয়ে নিল। রেণুকা নিজের রিভলভারের সিলিন্ডার খুলে চেম্বারগুলো পরীক্ষা করে দেখে নিল, তাতে ক’টা বুলেট অবশিষ্ট আছে, তারপর বলল, “আর মাত্র একটা বুলেট আছে। যাক গে। অনিমেষবাবু, ওরা কিন্তু আমাদের গন্ধ পেয়ে গেছে। আপনি মেটাল বক্সটা নিয়ে সামনে দৌড়ান। আমি ওদের আটকে রাখছি।”

“না।” অনিমেষ শান্ত গলায় বলল।

রেণুকা অধৈর্য গলায় বলল, “চিন্তা নেই, এবার আমরা আলাদা হব না। এই সুড়ঙ্গের নকশা আমি মুখস্থ করে ফেলেছি। সামনেই একটা জলপথ আছে। আমরা যদি জলে ঝাঁপ দিই, তবে কুকুরগুলো আমাদের গন্ধ হারিয়ে ফেলবে।”

জলপথ! অনিমেষ কান পেতে শুনল, সত্যিই সুড়ঙ্গের শেষে জলের কলকল শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে বলল, “যেতে হলে দু’জনেই যাব, আর নইলে দু’জনেই এক সঙ্গে আক্রমণ প্রতিহত করব।”

মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল রেণুকা। বলল, “চলুন তবে।”

দু’জনেই সুড়ঙ্গের আরেকটা মুখের দিকে দৌড় দিল। সুড়ঙ্গ শেষ হতেই দেখা গেল নীচে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার। ওপর থেকে চাঁদের আলো চুঁইয়ে পড়ছে একটা ফাটল দিয়ে।

আচমকা অনিমেষ যেন আর্তনাদ করে উঠল, “কিন্তু জলে পড়লে বাক্সের ফাঁক দিয়ে জল ঢুকে যদি…”

“ভয় নেই। মেটাল বক্সটা সেভাবেই তৈরি করা। আর ভিজে গেলেও, ম্যাপটা সিল্কের তৈরি, তেমন ক্ষতি হবে না। তবে ডায়েরিটার কথা বলা যায় না।”

হা ঈশ্বর! তীরে এসে যেন তরী না ডুবে যায়। অনিমেষ মনে মনে প্রার্থনা সেরে নিতেই রেণুকার গলা ভেসে এল, “অনিমেষবাবু, রেডি?”

“আয়াম রেডি।”

“তাহলে এক… দুই… তিন… জাম্প!”

অনিমেষ আর রেণুকা একসঙ্গে সেই অন্ধকার ঠাণ্ডা জলে ঝাঁপ দিল। যদিও ঝাঁপ দেওয়ার পূর্বমুহূর্তে, এক পলকের জন্য হলেও, অনিমেষের বুকের রক্ত জমে গিয়েছিল, কিন্তু জলে পড়া মাত্র জলাধারের সেই বরফশীতল জল অনিমেষের শরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে শুষে নিল। কিন্তু সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হল না। দেখা গেল, সুড়ঙ্গের ওপর থেকে টর্চের আলো জলের ওপর হন্যে হয়ে ঘুরছে, আর পাথরের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কুকুরগুলোর সম্মিলিত ক্রুদ্ধ গর্জন।

জলাধারের ওপারে একটি ভাঙাচোরা পাথরের চাতাল। রেণুকা আর অনিমেষ কোনওমতে জল থেকে উঠে সেখানে হামাগুড়ি দিয়ে আশ্রয় নিল। হাতে ঝুলে থাকা মেটাল বক্সটা যেন একটা জগদ্দল পাথরের মতো ভারি মনে হচ্ছে। অনিমেষ সঙ্গে সঙ্গে মেটাল বক্সটা খুলে দেখল, সবই অক্ষত আছে। অনিমেষের এই উদ্বেগ দেখে রেণুকা বলল, “এই সিল্কের ম্যাপ আর ডায়েরিটাই কিন্তু এখন আমাদের একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ।”

বলেই রেণুকা হাঁপাতে হাঁপাতে আঙুল দিয়ে ওপরের দিকে দেখাল, “ঐ দেখুন।”

দেখল অনিমেষ। জলাধারের ছাদের এক কোণে একটা মরচে ধরা লোহার মই খাড়া হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। মইয়ের শেষে একটা কাঠের পাটাতন। তারা সাবধানে মই বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। মইটা প্রতিটি পদক্ষেপে কাঁপছে, যেন কোনও দুর্বল ইতিহাসের হাড়গোড় মড়মড় করে ভাঙছে। ওপরে উঠতেই তারা এক বিশাল হলঘরের মাঝে এসে পড়ল। চাঁদের আলো চুঁইয়ে পড়ছে ছাদের ভাঙা ঘুলঘুলি দিয়ে। চারদিকে সার সার কাঠের বেঞ্চ, ধুলোর পুরু আস্তরণ আর মাকড়সার জাল। সামনে একটি বিশালাকার যিশুর ক্রুশবিদ্ধ মূর্তি, তার হাত দুটো ভেঙে ঝুলে আছে। অনিমেষ যেন স্বগতোক্তি করল, “এটাই সেই পরিত্যক্ত সেন্ট জাভিয়ার্স চ্যাপেল।

“আমরা বর্ডারের একদম ওপরে দাঁড়িয়ে আছি, অনিমেষবাবু, এই চার্চের অর্ধেকটা ভারতে, আর বাকিটা পাকিস্তানে। মাঝখান দিয়ে অদৃশ্য এক মরণরেখা চলে গেছে।”

অনিমেষ কম্পিত হাতে মেটাল বক্সটা খুলে তার ভিতর থেকে নীল কাঁচের লেন্সটা বের করে আনল। ডায়েরির মলাট ছিঁড়ে পাওয়া এই সামান্য কাঁচের টুকরোটিই কি তবে এশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করবে? সে সিল্কের ম্যাপটা চার্চের পাথরের অল্টারের ওপর বিছিয়ে দিয়ে বলল, “রেণুকা, টর্চটা ধরুন তো। লেন্সের ওপর দিয়ে ম্যাপের এই ‘জিরো পয়েন্টে’ আলো ফেলুন।”

কথা বলতে গিয়ে অনিমেষ টের পেল, তার গলায় এক অদ্ভুত উত্তেজনা খেলা করছে। রেণুকা ঠিক জায়গায় তাক করে টর্চটা ধরল। নীল লেন্সের ভিতর দিয়ে যখন তীব্র আলো ম্যাপের সেই নির্দিষ্ট স্থানাঙ্কে গিয়ে পড়ল, তখন এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। সাধারণ চোখে যা ছিল কেবল লাল কালির দাগ, নীল আলোর নীচে ফুটে উঠল হাজার হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডট আর সঙ্কেত। রেণুকা লাফিয়ে উঠল যেন। সে ঠিকই আন্দাজ করেছিল। অনিমেষ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল, “কী হল?”

“অনিমেষবাবু, আমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট। আর তাই আমি বুঝতে পারছি, ওগুলো কোনও ভৌগোলিক চিহ্নই নয়, ওগুলো আসলে একটি গোপন রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আর সুড়ঙ্গের ভিতরের প্রেসার ডোর খোলার গাণিতিক কোড।”

“সর্বনাশ!” অনিমেষ চেঁচিয়ে উঠল, “তার মানে হার্ডিং সাহেব কোনও ম্যাপ আঁকেননি, রেণুকা। তিনি এই পুরো উত্তরবঙ্গ জুড়ে এক গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিকেশনের গুপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্লু-প্রিন্ট রেখে গিয়েছিলেন। এই করিডোর দিয়ে কেবল মানুষ নয়, অদৃশ্য তরঙ্গে গোপন তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব, যা কোনও রাডার ধরতে পারবে না! হা ঈশ্বর!”

ঠিক সেই মুহূর্তে চার্চের প্রধান দরজাটা এক বিকট শব্দ করে ভেঙে পড়ল। রেণুকা আর অনিমেষ এই আচমকা আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না। তারা ম্যাপটা মেটাল বক্সে ঢুকিয়ে ফেলার আগেই ইউনিফর্ম পরিহিত একদল ভারতীয় সেনা ভিতরে ঢুকে এল। তাদের সবার সামনে রয়েছেন একজন মাঝবয়সী অফিসার, যার কাঁধে একাধিক স্টার আর বুকে একটা সোনালী মেডেল। অনিমেষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক, অবশেষে ঠিকঠাক লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এবার নিশ্চিন্ত।

প্রধান অফিসারটি হাততালি দিতে দিতে এগিয়ে এলেন, “অসাধারণ কাজ করেছেন প্রফেসর! আমি কর্নেল পরীক্ষিৎ চৌধুরী আর আমার সঙ্গে আমার টিম। আমরা গত দশ বছর ধরে এই ‘হার্ডিং কোড’ খুঁজছিলাম। আমাদের ইন্টেলিজেন্স আপনাকে চিনে নিতে ভুল করেনি। তাই আমরা ফলো করতে করতে আসছিলাম। আরও একবার আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।”

কর্নেল পরীক্ষিৎ চৌধুরী করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। অনিমেষও স্মিত হেসে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রেণুকা হঠাৎ বিদ্যুৎবেগে অনিমেষকে সরিয়ে নিয়ে নিজের রিভলভারটা সেই অফিসারের দিকে তাক করল। কর্নেল পরীক্ষিৎ চৌধুরী দাঁড়িয়ে পড়লেন, “কী করছেন, লেডি? আমরা শত্রু নই। ইন্ডিয়ান সোলজার।”

অনিমেষও বলল, “রেণুকা, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, এরা…”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই, রেণুকা চিৎকার করে উঠল, “দাঁড়ান অনিমেষবাবু! এরা যদি আমাদের ফলো করতে করতে আসে, তবে বাঙ্কারের ভিতরেই আমাদের সাহায্য করতে পারতেন। কর্নেল চৌধুরীর ইউনিফর্মটা ভাল করে দেখেছেন? ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেলের ইউনিফর্মে মেডেলের ওপরের কলারে ওটা কীসের চিহ্ন?”

সত্যিই তো! অনিমেষ এবারে লক্ষ্য করল, কর্নেলের সাদা কলারে ছোট একটা কালো ঈগলের চিহ্ন। অনিমেষের মনে পড়ে গেল। রেণুকা বলেছিল বটে, ‘ব্ল্যাক ঈগল’ গ্রুপটার কথা। তারা নাকি ভাড়াটে খুনি এবং কোনও এক বিশেষ দেশের হয়ে নাকি কাজ করে। তার মানে ‘ব্ল্যাক ঈগল’ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ছদ্মবেশে এসেছে!

কর্নেল পরীক্ষিৎ চৌধুরী দাঁড়িয়েই ছিলেন, এবার শান্ত গলায় বললেন, “শাবাশ, মিস রেণুকা সিংহ। আপনি সত্যিই খুব স্মার্ট এবং ইন্টেলিজেন্ট। কিন্তু একটা ব্যাপার কী জানেন? বুদ্ধি দিয়ে বন্দুক ঠেকানো যায় না। প্রফেসর, লাইক আ গুডম্যান, ম্যাপ আর লেন্সটা এবার আমার হাতে দিয়ে দিন। আপনি ইতিহাসের মানুষ, আপনি জানেন বড় কোনও পরিবর্তনের জন্য মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কিছু বলিদান দিতেই হয়, হয় না?”

অনিমেষ দেখল, কর্নেল ভদ্রলোকের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোও এবারে তাদের হাতের রাইফেল তাক করেছে তার আর রেণুকার দিকে। এমন সময় এক কাণ্ড ঘটল! চার্চের চারপাশের জানালা দিয়ে আরও আট-দশজন সশস্ত্র লোক ভিতরে ঢুকে পড়ল। অনিমেষ বুঝল, তারা এখন এক খাঁচায় বন্দি দুটি ইঁদুর। কিন্তু সেই মুহূর্তে চার্চের ওপরতলার ঘণ্টাটা গম্ভীর শব্দ করে বেজে উঠল। এক… দুই… তিন…। সেই বিকট আওয়াজে সবাই চমকে উঠল। ওপরের বেল-টাওয়ার থেকে এক পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “মেডেলটা তো ভালই নকল করেছেন কর্নেল, কিন্তু সেনাশিবিরের নিয়মগুলো ভুলে গেছেন!”

অমরেশ সান্যাল!! অনিমেষের মনটা আচমকাই কেন কে জানে, এক গভীর প্রশান্তিতে ভরে গেল। অমরেশ সান্যাল ততক্ষণে বেল-টাওয়ারের ওপর থেকে একটি শক্তিশালী স্মোক গ্রেনেড ছুঁড়লেন চার্চের মাঝখানে। সেকেন্ডের মধ্যে পুরো চার্চটা ঘন ধোঁয়ায় ভরে গেল। উপর থেকে অমরেশ সান্যালের গর্জন শোনা গেল, “অনিমেষ! রেণুকা! তোমরা দু’জনে অল্টারের পেছনের চোরকুঠুরি দিয়ে নীচে নেমে যাও! এক্ষুনি!”

অনিমেষ বিদ্যুৎগতিতে ম্যাপ আর লেন্সটা মেটাল বক্সে ভরে ফেলতেই হাতে টান অনুভব করল। রেণুকা তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেছে। সামনেই চোরকুঠুরির গহ্বর। রেণুকা ফিস ফিস করে বলল, “আবারও ঝাঁপ দিতে হবে। অনিমেষবাবু, তৈরি হয়ে নিন।”

কিন্তু ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তে অনিমেষ অনুভব করল একটা তপ্ত সিসার বুলেট তার কাঁধ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় অনিমেষের দৃষ্টি একপ্রকার ঝাপসা হয়ে এল, কিন্তু তিনি থামলেন না। লাফ দিলেন।

অন্ধকার চোরকুঠুরির মেঝেতে আছড়ে পড়ার পর অনিমেষের মনে হল তার বাম কাঁধটা যেন কেউ জ্বলন্ত কয়লা দিয়ে চেপে ধরেছে। বুলেটের আঘাতটা গভীরে যায়নি ঠিকই, কিন্তু রক্তক্ষরণে তার শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসছে। রেণুকা দ্রুত তার শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে অনিমেষের ক্ষতস্থানটা শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর বলল, “অনিমেষবাবু, জ্ঞান হারাবেন না। আমরা করিডোরের একদম প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছি।”

রেণুকার গলার স্বরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা পরিলক্ষিত হল। এই মুহূর্তে তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা একটা ভূগর্ভস্থ পাথুরে কক্ষ। ওপর থেকে তখনও গুলির শব্দ আর ধস্তাধস্তির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। অমরেশ সান্যাল একাই ওপরের দলটাকে ঠেকিয়ে রেখেছেন, কিন্তু কতক্ষণ পারবেন সেটা অনিশ্চিত। কক্ষের এক দেয়ালে একটা বিশাল লোহার চাকা লাগানো দরজা। দরজার গায়ে কোনও হাতল নেই, কেবল অসংখ্য খাঁজকাটা ঘর। সেই ঘরগুলোতে রয়েছে অসংখ্য নাম্বার। ১, ৫, ৯, ১৪, ২১, এইরকম।

অনিমেষ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও হাত তুলে দরজাটা স্পর্শ করে বলল, “এটাই সেই প্রেসার ডোর। ম্যাপের সেই নীল লেন্সের নিচের কোডগুলো… রেণুকা, টর্চটা জ্বালুন আর বাক্স থেকে ম্যাপটা বের করুন।”

রেণুকা টর্চ জ্বালিয়ে ম্যাপটা বের করল। তারপর নীল লেন্সটা ম্যাপের ওপর ধরতেই পাঁচটা সংখ্যা যেন একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠল। ‘৭-৩-৯-২-৫’। অনিমেষ কাঁপা কাঁপা হাতে ঐ নাম্বারগুলো লেখা আছে এমন খাঁজে হাতের চাপ দিতে থাকল আর একটু একটু করে  লোহার চাকাটা ঘুরাতে শুরু করল। ম্যাপে লেখা প্রতিটি সংখ্যা-লিখিত-খাঁজে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক একটা করে গম্ভীর ধাতব শব্দ বের হতে লাগল, যা এই নিঃস্তব্ধতায় যেন কালপুরুষের পদধ্বনির মতো শোনাচ্ছিল। শেষ সংখ্যা লেখা খাঁজে চাপ দিয়ে লোহার চাকাটা ঘোরাতেই অদ্ভুত একটা শব্দ হল, কিন্তু দরজা খুলল না।

অনিমেষ হতভম্ব, “কী হল?”

রেণুকা বলল, “অনেক দিন না খোলায় জং ধরে গেছে হয়তো। দু’জনে মিলে ধাক্কা দিলে হয় না?”

তাদের সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হল। অনিমেষ বলল, “দাঁড়ান, এভাবে হবে না। রেণুকা, দরজার উপরে টর্চটা ধরুন তো, কিছু একটা লেখা আছে মনে হচ্ছে।”

সত্যিই তাই। কিন্তু যা লেখা আছে, সবই ল্যাটিন ভাষায়। আর তার পাশে একটা কিছু অস্পষ্টভাবে আঁকাও রয়েছে। অনিমেষের মনে পড়ল, রেণুকা ল্যাটিন জানে। সে রেণুকাকে সামনে এগিয়ে দিল। রেণুকা সবটা পড়ে নিয়ে বলল, “পড়লাম, কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না।”

“তুমি পড়ে শোনাও।”

রেণুকা ইংরেজিতে তর্জমা করে বলে চলল, “I have no voice, but I can tell you the height of the mountain. I have no legs, but I show the path to the sea. To open the gate, find the number of the king who lost his head but kept his crown.”

অনিমেষ ঠিক পাঁচ মিনিট ধরে এক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “এখানে কিং মানে তো রাজা, বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কোন রাজা?”

রেণুকা বলল, “আচ্ছা, এই যে পাশে ছবিটা রয়েছে, এটা যদি দাবার ছক বলে ধরে নেন, তাহলে কি দাবার রাজা?”

“উঁহু! এটা দাবার ছক নয়। এই রকম ছবি আমি কোথাও দেখেছি। দাঁড়াও, ভাবতে দাও। ইয়েসসস। রেণুকা, এটা তাসের ছবি। অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে তাস খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল আর সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশও ছিল। ওই সময়ে তাস খেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, ছিল আভিজাত্য প্রদর্শনের একটা অন্যতম উপায়। মনে পড়ছে, একটা বইতে পড়েছিলাম, সেই সময়ে হুইস্ট, কোড্রিল, পিকুয়েট, লু, তাসের এই খেলাগুলো ছিল উচ্চবিত্ত সমাজের অঙ্গ। এই তাস নিয়ে প্রচুর জুয়াও খেলা হতো। তাহলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে, রাজারাজড়ারাও তাস খেলত। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? এখানে তাসের ‘King of Hearts’-কে বোঝানো হচ্ছে। ঐ লাইনটা মনে করুন। the king who lost his head। মিলে যাচ্ছে? তাসের রাজাদের মধ্যে কেবল ‘King of Hearts’-এর গোঁফ নেই। lost his head মানে হল গোঁফহীন মুণ্ডু। কিন্তু…”

অনিমেষ ফের চুপ হয়ে গেল। রেণুকা বলল, “কী হল?”

“নাহ। ভুল এক্সপ্লেইন করলাম মনে হচ্ছে। lost his head মানে রাজার শিরশ্ছেদ হয়েছে। কোন রাজার মুণ্ডু কাটা গেছিল?”

রেণুকা বলল, “রাজা প্রথম চার্লস?”

“ইয়েসস। ব্রাভো রেণুকা। রাজা প্রথম চার্লস। শিরশ্ছেদ হওয়া একমাত্র ব্রিটিশ রাজা। প্রথম চার্লস মানে হল গিয়ে ১। দাঁড়াও তো।”

বলেই অনিমেষ ‘১’ লেখা খাঁজে চাপ দিয়ে চাকাটা আরেকবার ঘোরাতেই বিকট শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে এক দীর্ঘ, সংকীর্ণ প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গপথ।

অনিমেষ বলল, “চলুন, রেণুকা।”

সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে অনিমেষ বুঝতে পারল, এটা কোনও সাধারণ সুড়ঙ্গ নয়। সুড়ঙ্গের দেয়ালগুলো তামার পাত দিয়ে মোড়া, আর ছাদ থেকে অদ্ভুত সব কাঁচের টিউব ঝুলে আছে। অনিমেষ বুঝল, এটাই সেই ‘হার্ডিং করিডোর’ অর্থাৎ ব্রিটিশদের তৈরি এক গোপন সিগন্যাল রুম যা হিমালয়ের তরাই অঞ্চলকে এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে রেখেছিল।

সুড়ঙ্গের ভিতরে কিছুটা যাওয়ার পরেই দেওয়ালে গায়ে লাগানো কিছু হালকা নীল আলোর বাল্ব দেখতে পেল তারা। সম্ভবত ভিতরে কোনও ব্যাটারি বা জেনারেটর এখনও সচল আছে। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল কন্ট্রোল প্যানেল। সেখানে গোটা বিশেক সুইচ আর একটা পুরোনো টেলিটাইপ মেশিন।

“অনিমেষবাবু, দেখুন!”

রেণুকার আতঙ্কভরা কন্ঠস্বর শুনে অনিমেষ সামনে তাকাল এবং নিদারুণ চমকে উঠল। কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে একটা চেয়ারে একটা কঙ্কাল বসে আছে। পরনে জরাজীর্ণ ব্রিটিশ সামরিক ইউনিফর্ম। বুকের উপরে একটা তামার প্লেটে খোদাই করা একটা নাম। ‘ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিং’।

রেণুকা বলে উঠল, “হার্ডিং সাহেব তাহলে কোথাও পালিয়ে যাননি। তিনি এই রহস্যের ওপর বসে নিজের সমাধি নিজেই তৈরি করেছিলেন। মা গো!”

হার্ডিংয়ের কঙ্কাল-হাতের নিচে একটা ডায়েরি আর তার একটা পাতা খোলা ছিল। অনিমেষ খুব সাবধানে কাছে গিয়ে দেখল, সেখানে কাঁপাকাঁপা হাতে লেখা একটা বার্তা, ‘The truth is a burden. I have disconnected the core. Whoever finds this, do not reconnect unless you want the world to watch your every move.’

রেণুকা বিড় বিড় করল, “সত্য হল একটি বোঝা। আমি এর মূল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। যে এটি খুঁজে পাবে, সে যেন আবার সংযোগস্থাপন না করে, যদি না সে চায় যে পুরো বিশ্ব তার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রাখুক।”

উত্তরে অনিমেষ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্ত তার আগেই সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের দিকে কাদের পদধ্বনি শোনা গেল। আর সেই সঙ্গে বেশ কিছু ছায়া এসে পড়ল সুড়ঙ্গের ভিতরে। অনিমেষ আর রেণুকা দু’জনেই চমকে উঠে দেখল, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছদ্মবেশী কর্নেল আর তার দলবল। এখন তাদের প্রত্যেকের মুখে লাগানো একটা করে গ্যাস মাস্ক আর হাতে রাইফেল।

“সান্যাল সাহেব বোম-টোম ছুঁড়ে চেষ্টা করেছিলেন অনেক, কিন্তু বেচারা! শেষ পর্যন্ত পারলেন না।”

ছদ্মবেশী কর্নেলের পৈশাচিক হাসিতে ঘরটা যেন ভরে গেল। ছদ্মবেশী কর্নেল এবার এগিয়ে এলেন অনিমেষের দিকে, “হ্যালো, প্রফেসর, ওই কঙ্কালের কাছ থেকে সরে দাঁড়ান তো। হার্ডিং যা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিলেন, আজ আমরা তা চালু করব। দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ এখন আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে আপনার কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগবে, কথা দিচ্ছি। অ্যান্ড এই দারুণ ব্যাপারটা আপনার হাত দিয়েই হোক, এটাও আমি চাই। প্লিজ, না করবেন না। সামান্য একটা কাজ। কন্ট্রোল প্যানেলের কোণে ঐ যে দেখছেন একটা লাল লিভার, ওটা ধরে টেনে দিন।”

অনিমেষের আগেই নজরে এসেছিল লিভারটা। ওটাই কি তবে সেই ‘কোর’? কিন্তু ওটায় টান দিলে কী হবে? নিশ্চিত কোনও অপকর্ম শুরু হবে। হয়তো ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত জুড়ে এক বিশাল জাল বিছিয়ে দেওয়া হবে, যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওই ‘ব্ল্যাক ঈগল’ গ্রুপের হাতে। এই সর্বনাশটা তিনি কীভাবে করবেন? অনিমেষকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছদ্মবেশী কর্নেল আরও একবার তাগাদা দিলেন কিন্তু তাতেও কাজ না হওয়ায় তিনি সরাসরি রেণুকার মাথায় পিস্তল ধরলেন, “এবার? লিভারে চাপ দেবেন? নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সঙ্গিনীর মাথার ঘিলু ছিটকে যাওয়া দেখবেন, প্রফেসর?”

আর উপায় নেই। বাধ্য হয়েই অনিমেষ লিভারটার দিকে এগোলো। রেণুকা চিৎকার করে উঠল, “অনিমেষবাবু, লিভারটা ধরবেন না!” বলেই রেণুকা আচমকা বসে পড়ে তার রিভলভার থেকে শেষ বুলেটটা ছুঁড়ল। কর্নেলের একজন বডিগার্ড লুটিয়ে পড়তেই আরেকজন রেণুকাকে তাক করে গুলি দেগে দিল। নির্ভুল লক্ষ্য। রেণুকার হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে পড়ে গেল। রেণুকা যন্ত্রণায় মেঝেতে বসে পড়ল। কর্নেল পিস্তল নাচিয়ে বললেন, “এবার? লিভারটা টানবেন? নাকি…?” 

অনিমেষ বুঝতে পারল, হার্ডিং কেন এই সুড়ঙ্গটা ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। কিছু সত্য অজানাই থাকা ভাল। সে ধীরে ধীরে লিভারটার দিকে এগিয়ে গিয়েই তার সর্বশক্তি দিয়ে প্যানেলের পেছনের একগুচ্ছ তার টেনে ছিঁড়ে ফেলল।

“নোওওওওও!”

কর্নেল গর্জে উঠে তার পিস্তল তাক করল অনিমেষের বুক লক্ষ্য করে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সুড়ঙ্গের ছাদ থেকে জল ঢুকতে শুরু করল। ওপরের জলাধারের বিস্ফোরণে সুড়ঙ্গের কাঠামো আগেই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। এবার তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পালা।

“ইতিহাস পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে না, কর্নেল। এবার আপনি আমাকে স্বচ্ছন্দে মেরে ফেলতে পারেন। আমি আমার কর্তব্য করে ফেলেছি।” অনিমেষ শান্ত স্বরে বলল।

দেয়াল ফেটে হু হু করে জল ঢুকছে। কর্নেল সভয়ে সেদিকে তাকিয়ে প্রবেশপথের দিকে দৌড়াতে লাগলেন, পিছন পিছন তার দলবল। কিন্তু অনিমেষ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার শান্ত সমাহিত প্রজ্ঞা তাকে ইতিকর্তব্য স্থির করে দিয়েছে। সে রেণুকাকে এক হাতে জাপটে ধরে তুলে, হার্ডিংয়ের কঙ্কালের পেছনের এক ছোট ইমার্জেন্সি এগজিটের দিকে এগিয়ে গেল। জল তখন তাদের কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে। সুড়ঙ্গের নীল আলোগুলো দপদপ করে এক এক করে নিভে যাচ্ছে। ইতিহাসের সেই গভীর করিডোর আর তার গোপন রহস্য এবার জলসমাধির পথে।

অনিমেষ একবার পিছনে তাকিয়ে দেখল, সুড়ঙ্গের ভিতর জলের গর্জন যেন কোনও ক্ষুধার্ত দানবের আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে।

“রেণুকা! আমাকে জাপটে ধরুন। কোনও মতেই আমাকে ছাড়বেন না!”

অনিমেষের চিৎকার সুড়ঙ্গের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। রেণুকার শরীরটা অবসন্ন, হাত দিয়ে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হচ্ছে, কিন্তু তার লড়াকু সত্ত্বা এখনও হার মানেনি। সে প্রাণপণে অনিমেষকে আঁকড়ে ধরলেও, বুঝতে পারছিল, তার চোখ দুটো ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও নিজের অদম্য শক্তিকে হাতিয়ার করে সে নিজেকে জ্ঞান হারাতে দিচ্ছিল না।

তারা দুজনে মিলে হার্ডিংয়ের কঙ্কালের পেছনের সেই ছোট ইমার্জেন্সি এগজিট পার করে একটি সরু লোহার সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। পিছনে তাকিয়ে দেখল, ততক্ষণে কন্ট্রোল প্যানেলের বৈদ্যুতিক তারগুলো ছিঁড়ে গিয়ে জলের সংস্পর্শে এসে নীল আগুনের ফুলকি ছিটকাচ্ছে। নীল আলো আর গাঢ় অন্ধকারের সেই মরণখেলায় আচমকা অনিমেষের চশমাটা চোখ থেকে খুলে জলে কোথায় যে তলিয়ে গেল, সেই সঙ্গে সেই মেটাল বাক্সটাও। এখন তার চারপাশটা প্রায় ঝাপসা, কিন্তু মনের ভিতরে সত্যের আলোটা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার।

ঠিক সেই সময়েই পেছন শোনা গেল এক প্রচণ্ড ধ্বস নামার শব্দ। অনিমেষ বুঝল, ক্যাপ্টেন জেমস হার্ডিংয়ের দেহের অবশিষ্টাংশ আর সেই অভিশপ্ত ‘হার্ডিং করিডোর’ চিরকালের জন্য মাটির গভীরে বিলীন হয়ে গেল। সুড়ঙ্গের সেই বিশাল গোপন তথ্যভাণ্ডার এখন কেবলই ইতিহাসের এক জলমগ্ন ধ্বংসস্তূপ। প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে অন্ধকার সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের ভিতর লড়াই করার পর, তারা এক অদ্ভুত জায়গার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।

সামনে খোলা আকাশ। শরতের শেষ রাতের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া তাদের ভেজা শরীরে চাবুকের মতো লাগল। অনিমেষ আর রেণুকা আর পারছিল না। তারা টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল ঘাসের ওপর। দূরে সেন্ট জাভিয়ার্স চ্যাপেলটা দেখা যাচ্ছে। গোটা চার্চটা এখন আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলছে। সম্ভবত সান্যাল সাহেব তার কাজ শেষ করে গেছেন।

অনিমেষ আকাশের দিকে তাকাল। রাতের কালো রঙ এখন ফিকে হয়ে এসেছে। আকাশের এক প্রান্তে গাঢ় নীল, আর অন্য প্রান্তে পুব আকাশে মিশেছে হালকা বেগুনি আর ছাই রঙের আভা। এক চিলতে সাদা মেঘ যা ছিল, তা-ও যেন উত্তরের হাওয়ায় দূরে সরে যাচ্ছে। আকাশটা এখন একদম পরিষ্কার, যেন সদ্য ধুয়ে ফেলা এক নীল দর্পণ। ঠিক দিগন্ত রেখার খানিকটা উপরে শুকতারা এখন স্বমহিমায় ভাস্বর। মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তা যেন এক টুকরো হিরের মতো জ্বলজ্বল করছে। সারা আকাশের স্তব্ধতা ভেঙে ওই একটি তারাই যেন ঘোষণা করছে, আলো আসছে। পুবের আকাশপ্রান্তে সিঁদুরে রঙের একটা হালকা রেখা দেখা দিচ্ছে। অন্ধকারের বুক চিরে সেই লালচে-গোলাপী আভা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা জানান দিচ্ছে সূর্যোদয় আর খুব বেশি দূরে নেই।

“অনিমেষবাবু…” রেণুকা নিচু স্বরে ডাকল। তার চোখে তখন জল, “সব শেষ হয়ে গেল। সেই ম্যাপ, লেন্স, কোড, কিছুই আর রইল না।”

“লেন্সটা আমার কাছেই আছে।”

“কিন্তু আমাদের এত লড়াই কি তবে সব ব্যর্থ হয়ে গেল?”

অনিমেষ শান্ত গলায় বলল, “না রেণুকা। ব্যর্থ হয়নি। হার্ডিং সাহেব যা চেয়েছিলেন, আমরা তাই করেছি। এই তথ্য যদি কোনও এক দেশের হাতে যেত, তবে অন্য দেশ বিপন্ন হত। শান্তি আসতো না, আসতো কেবল নতুন এক শীতল যুদ্ধ। ইতিহাস মাঝে মধ্যে কিছু গোপন তথ্যকে নিজের ভিতরে লুকিয়ে রেখেই পৃথিবীকে রক্ষা করে। আজ করিডোরটা ধ্বংস হয়েছে বলেই হয়তো ভারত আর পাকিস্তানের বর্ডারে অদূর ভবিষ্যতের একটা বড় যুদ্ধ আটকে গেল।”

হঠাৎ জঙ্গলের দিক থেকে কিছু পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। রেণুকা সচকিত হয়ে অভ্যেস মতো তার রিভলভারটা বের করতে গেল, দেখল, সেটা স্বস্থানে নেই। হয়তো জলের নীচেই তলিয়ে গেছে। তবুও সে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। খালি হাতেও সে কয়েকজনের মোকাবিলা করতে পারবে।

জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন অমরেশ সান্যাল। তার কাঁধে একটা ব্যান্ডেজ, এক হাতে সেই চিরচেনা রাইফেল। তার সাড়া মুখে কালিঝুলি মাখা, কিন্তু চোখে এক পরম পরিতৃপ্তি। সান্যাল সাহেব এগিয়ে এসে অনিমেষের কাঁধে হাত রাখলেন, “ব্রাভো, প্রফেসর! আমি জানতাম তোমরা বেরোতে পারবে। ‘ব্ল্যাক ঈগল’-এর কর্নেলবাবু, তার দলবল নিয়ে জিপে করে পালানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স তাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা এখন বন্দী।”

সান্যাল সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “আগামীকাল খবরের কাগজে হয়তো লেখা হবে, হিলির বর্ডারে বড় এক চোরাচালান চক্র ধরা পড়েছে। কিন্তু কেউ জানবে না, পর্দার আড়ালে কোলকাতার এক ইতিহাসের প্রফেসর কীভাবে এশিয়ার মানচিত্র রক্ষা করেছেন।”

অনিমেষ উঠে দাঁড়াল। তার পরনের পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে গেছে, সারা গায়ে কাদা আর রক্ত। কিন্তু তার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এখন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস দেখা গেল। সে বলল, “সান্যাল সাহেব, আমি আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেই মেসবাড়িতেই ফিরে যাব। কিন্তু এবার থেকে যখন কলেজে ক্লাস নেব, তখন শুধু আর সম্রাট বা যুদ্ধের গল্প বলব না। পাশাপাশি আমি বলব সেই সব মানুষদের কথা, যারা ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানোর জন্য নয়, বরং ইতিহাসকে রক্ষা করার জন্য নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিয়েছিল।”

ভোরের প্রথম আলো যখন হিলির জঙ্গলে এসে পড়ল, তখন একটা জিপ, ধীরে ধীরে বর্ডারের ধূলিময় রাস্তা ধরে, ছুটতে শুরু করেছে। পেছনে পড়ে রইল এক জ্বলন্ত চার্চ আর মাটির নিচে চাপা পড়া এক বিশাল ষড়যন্ত্র। দেশভাগের ক্ষত হয়তো কোনওদিন মুছবে না, কিন্তু সেই ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়েই অনিমেষ আজ বুঝতে পেরেছে, মানুষের দেশপ্রেম কেবল সীমারেখায় আটকে থাকে না, তা থাকে মানুষের বিবেকের গোপন করিডোরে।

দিন দশেক পরের কথা। অনিমেষ লাহিড়ী আবার তার কোলকাতার সাধারণ জীবনে ফিরে গেছে। একজোড়া নতুন চশমা বানাতে হয়েছে তাকে। আটপৌরে নিয়ম আর ঘড়ি ধরে চলা অভ্যাসের ভিড়ে সে মিশে গেল ঠিকই, কিন্তু তার মেসের ঘরে জানালার পাশের ডেস্কটায় এখনও সবসময় এক টুকরো নীল রঙের কাঁচের লেন্স রাখা থাকে। বিকেলের মরা রোদে সেই লেন্স থেকে ঠিকরে আসা আলো যখন তার দেওয়ালে পড়ে, তখন নীল রঙের এক মায়াবী আভা তৈরি হয়। সেই নীল আভাটা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা হাড়-মাংস-রক্তের ভিতরেই আসলে সুপ্ত থাকে কোনও এক অতিমানবিক বা অসাধারণ হয়ে ওঠার বীজ। হয়তো সেই শক্তিটা সবার কাছে দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু তা চিরকালই বর্তমান।

এর পরে কেটে গেছে কয়েক মাস। একদিন অনিমেষের মেসের ঠিকানায় একটি সাদা খামে বেনামী চিঠি এসে পৌঁছলো। খামটা খুলতেই ঝকঝকে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা মাত্র দুটো লাইন। ‘ইতিহাসের পাতায় কোনওদিন দাঁড়ি পড়ে না, বন্ধু। মহাকালের পথ খুব ছোট, আমাদের আবার দেখা হবে।’

পরেশ পাল! স্কুলজীবনের প্রিয় বন্ধুর হাতের লেখা চিনতে সমস্যা হল না অনিমেষের। অনিমেষ জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। এই চিঠির প্রতিটি অক্ষর যেন এক অশুভ সঙ্কেতের মতো অন্ধকারে দুলছে। সে বুঝে যায়, এ কেবল কোনও শুভেচ্ছাবার্তা নয়, বরং পরবর্তী দাবার চালের এক সূচনা মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *