সোলমেট
মুম্বাই এ টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ এ তিনদিনের সেমিনার ছিল, সোহাগের যদিও কোনো প্রেজেনটেশন ছিল না এই সেমিনারে, তবুও শ্রোতা হিসাবে সে এসেছে। ওর গাইড টিচার-ই ওর নামটা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন রেজিস্ট্রেশনের জন্য। সেমিনারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, দেশ এবং বিদেশের অনেক প্রফেসর, সায়েন্টিস্ট আসবেন এতে। সকলের বক্তব্য শুনলে তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে, নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়। নতুন নতুন যে সব কাজ বা ভাবনাচিন্তা চলছে সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। যদিও ইন্টারনেটে সবই পাওয়া যায়, কিন্তু সরাসরি কথা বলার সুযোগ তো থাকেনা রিসার্চ স্কলার বা তার গাইড প্রফেসরের সাথে। মাঝে মাঝে এরকম সেমিনারে যেতে পারলে, রিসার্চের কাজে নতুন উদ্যম আসে। প্রথম দিন সকালের প্রথম ‘টক’টা শেষ হবার পর ছিল ‘টি ব্রেক’। হলের বাইরে ছিল চা কফির ব্যবস্থা। চায়ের জন্য হল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে দু’পা এগিয়েছে সোহাগ, তখনই পেছন থেকে তার নাম ধরে কেউ ডেকে উঠল। ডাকটা কানে যাওয়া মাত্র, ওর শরীর শিথিল হয়ে গেল। পা দুটো ভীষণ ভারী হয়ে গেঁথে গেল মাটিতে, শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল বরফের কুচি আর ওর হৃৎপিন্ড এত বছরের পাম্পিং এর ছন্দ বেমালুম ভুলে গিয়ে, হঠাৎ করে এক মগ গরম রক্ত যেন ছুঁড়ে মারল ওপরের দিকে, যা ওর মাথায় মুখে ছড়িয়ে পড়ল। গরম রক্তের আগুনে ওর গালগুলো তেতে গোলাপী হয়ে গেল আর নাক-কান দিয়ে বেরোতে লাগল আগুনের হল্কা, তাত। এই বিশেষ ডাকটা শোনার অপেক্ষাতে কত কত বছর জেগে ছিল তার মন, জেগেছিল তার স্নায়ু। প্রতীক্ষা করতে করতে তারপর ভয়ঙ্কর তুষার ধসে চাপা পড়ে গেছে সব, তলিয়ে গেছে শীত ঘুমে, তবু ডাক আসেনি। যদিও একটা সময় পর্যন্ত সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করত, সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, যা কিনা তাকে দিয়েছিল অনাদি কালের ঘর বাড়ি, ঠিকই ডেকে নেবে তাকে একদিন। কিন্তু তার বিশ্বাস সত্যি হয়নি। বিশ্বাস করতে করতে সে ক্লান্ত হয়েছে, প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে সে একদিন স্বেচ্ছায় ভুলে গেছে সেই সোহাগকে, যে একটা সাদা পালকের মত উড়ে যেতে পারত মেঘেদের দুনিয়ায় আর তারপর বৃষ্টি হয়ে নেমে এসে, উষর রুক্ষ মাটিকে ভিজিয়ে দিতে পারত। কিংবা রোদে ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গাছগুলোকে করে তুলতে পারত সবুজ, প্রানবন্ত। এতগুলো বছর পরে, যখন জারুলগাছে বেগুনীরঙা ফুলগুলো ফুটল আর ঝরে গেল, যখন প্রতিটা মার্চ মাসে শিরীষফুলের গন্ধভরা সন্ধ্যে এল আর চলে গেল, কিন্তু পাশাপাশি হাঁটবে বলে কেউ ডাক পাঠালনা তখন সোহাগ ভুলিয়ে দিল নিজেকে, ভুলিয়ে দিল সেই কণ্ঠস্বর, শুধু তার চোখদুটোকে জাগিয়ে রাখল স্বপ্নের মাঝখানে। এতগুলো বছর পর যখন সেই কণ্ঠস্বর কানের তন্ত্রীতে ধাক্কা খেয়ে তার চেতনাতে পৌঁছল, তখন তার চারপাশে জমাট বেঁধে থাকা বরফ, যে বরফ শয্যাতে সে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল একুশ বছর বয়সের সেই সোহাগকে, সেই বরফ ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়তে লাগল। আর অবাক হয়ে সে উপলব্ধি করল, এতগুলো বছর বরফশয্যায় শুয়ে থেকেও মারা যায়নি সোহাগ নামের সেই একুশ বছরের তরুণী, ধীরে ধীরে চোখ মেলে জেগে উঠছে সে, উষ্ণ রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে তার সারা শরীরে। সোহাগ যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল কারণ তার পা নাড়ানোর ক্ষমতা সেই মুহূর্ত্তে ছিল না। আর সে পেছন ফিরে দেখতে ও সাহস পাচ্ছিল না, কারণ আগে বহুবার যেমন তার শ্রবণ আর দৃষ্টিবিভ্রম ঘটেছে তেমনই কিছু এবারও ঘটেছে-সেই ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে এভাবে কতক্ষণ করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকত সেটা এখন আর বলা যায় না, কারণ সত্যি সতিই ঈশান, রক্তমাংস দিয়ে তৈরী জীবিত ঈশান এগিয়ে এসে তার হাত চেপে ধরেছিল। এত প্রবলভাবে ঈশান চেপে ধরেছিল তার হাত যে, হাতের অনামিকায় থাকা আংটিটা চেপে বসে মধ্যমাতে, আর সেই চাপে মধ্যমাতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ঈশান শুধু এসে হাতটাই ধরেছিল, কোনো কথা বলতে পারেনি সেও। কারণ এত বেশি কথা বাকী রয়ে গেছে তাদের দুজনের মধ্যে যে, যে কথাই তারা বলুক না কেন এখন, কোনো কথাই তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে প্রকাশ করতে পারবে না। কখনো কখনো যে নীরবতার ভাষা, শব্দের থেকে অনেক বেশী শক্তিশালী হয়, সেই মুহূর্ত্তে তারা সেটা উপলব্ধি করল। ‘টিব্রেক’ শেষ হয়ে যাওয়ায় চা না খেয়েই হলে ঢুকে পড়তে হল তাদের উথাল পাথাল বুক নিয়ে। সোহাগ নিজের জায়গা ছেড়ে ঈশানের পাশের চেয়ারে চলে এল প্রত্যাশামতোই, কিন্তু লেকচারের একটা শব্দের প্রতিও সে মনোসংযোগ করতে পারছিল না। কতদিনের কত না বলতে পারা জমানো কথা যে এক এক করে ভেসে উঠছে মনে, সেগুলোকে কিছুতেই দূরে সরিয়ে রেখে এইসব সিরিয়াস আলোচনাতে মন দিতে পারছিল না। লাঞ্চ ব্রেকের আগে দুটো লেকচার ছিল; লেকচার চলাকালীন অডিটোরিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে পড়াটা অত্যন্ত অশোভন বলে, কোনোরকমে শরীরটাকে অডিটোরিয়ামে বসিয়ে রাখল সোহাগ। লাঞ্চ ব্রেকে ঈশান কে জানালো সে, পোষ্ট লাঞ্চ সেশনে উপস্থিত থাকতে সে কোনো মতেই পারছে না। কারণ মন যখন বসাতে পারছে না, শরীরটাকে পুতুলের মত বসিয়ে রেখে কি লাভ। ঈশান ও সম্মত হল সোহাগের প্রস্তাবে, বলল, ”চল, তাহলে কোথাও গিয়ে বসি আমরা।” লাঞ্চ শেষ হবার পর সবাই যখন অডিটোরিয়াম ঢুকল, ওরা দুজন ছাত্রজীবনের কলেজের ক্লাশ কাটার মত, চুপি চুপি টি.আই.এফ.আর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ল। তারপর কখনো ভাড়া করা ক্যাবে, কখনো বা রেস্তোরাঁতে বসে, কোথা দিয়ে যে সাত-সাতটা ঘন্টা পার হয়ে গেল, ওরা বুঝতেই পারল না। সাত ঘন্টা পর যখন ঘড়ি বলছে, এবার ফেরা দরকার টি. আই. এফ.আর -এ, তখন ওরা অনুভব করল কোনো কথাই যেন বলা হয়নি তখনও। আসলে দীর্ঘকাল মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে সে জল, পাথর ভেঙে তাকে তুলে আনতে সময় তো লাগবেই। সেমিনার চলবে আরো দুদিন। তারপর যে যার ঘরে ফেরার ফেলা। সোহাগ ফিরবে কলকাতায়, আর ঈশান কয়েকটা দিন বাড়িতে কাটিয়ে ফিরবে ফ্রান্সে, ওখানে ওর একটা প্রজেক্ট চলছে। সেমিনারের দ্বিতীয়দিন বিকেলবেলা সব শেষ হবার পর যখন ওরা দুজন বাইরে ঘুরতে বেরোল, তখন ঈশান সোহাগকে বলল, ”যদি দুদিন বাদে কলকাতা ফিরিস তুই, তাহলে কি কোনো অসুবিধা হবে তোর?” সোহাগের বুকের রক্ত ছলাৎ করে ওঠে। মনে মনে এমনই কিছু একটা চাইছিল সে। মুখে বলে, ”না অসুবিধা কিছু নেই, তবে রিটার্ন টিকিটটা ক্যানসেল করে তৎকাল কাটতে হবে একটা, এই যা!” ”তাহলে চল না, আমরা আরো দুদিন থেকে যাই। বহুদিন বাদে তোকে পেলাম তো, সময়টাকে যতটা পারি, টেনে খানিকটা লম্বা করে নিতে ইচ্ছা করছে। আর কি ইচ্ছা করছে জানিস?” ”কি?” ”বর্তমান থেকে খানিকটা সময় চুরি করে, অতীতের ভুলগুলো কারেকশান করে নিতে।” দুষ্টুমি মাখা হাসি হাসে ঈশান। সোহাগের ও ইচ্ছা করছিল না ঈশানকে এক মুহূর্ত্তের জন্য কাছ ছাড়া করতে। কিন্তু টিকিট ক্যানসেল করলে কিভাবে ফিরবে সে চিন্তাও তার হচ্ছিল। তাই বলে, ”কিন্তু তৎকালে যদি টিকিট না পাই?” ”ওটা নিয়ে তুই চিন্তা করিস না, ওটা আমার ওপর ছেড়ে দে। দালালকে বেশী টাকা দিলেই পাওয়া যাবে টিকিট।” সোহাগ আর আপত্তি করে না। কারণ সেও তো মনে প্রাণে চাইছিল ঈশানের সঙ্গে আরো সময় কাটাতে, এত দিনের না পাওয়া কে ভুলিয়ে দিয়ে ওকে পরিপূর্ণ করে পেতে। এখান থেকে চলে যাবার পর আবার কবে দেখা হবে সে নিশ্চয়তা যখন নেই তখন দেখা হওয়া সময়টাকে আরো একটু টেনে বাড়িয়ে নিতে তার মনও ভীষণভাবে চাইছিল। যদিও ঈশান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এখন থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে সে, স্কাইপে আসবে, মেল ও করবে রোজ। কিন্তু ‘স্কাইপ’এ ‘দেখা’ যায়, ‘দেখা পাওয়া’ তো যায়না! ভারচুয়ালে কিছুতেই মন ভরেনা সোহাগের। তাই ঈশান যখন তার টিকিটের দায়িত্ব নিয়ে নিল, তখন সোহাগও থেকে যাবার প্রস্তাবে খুশী মনে সায় দিল। কারণ ঈশানের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো তার কাছে অমূল্য সম্পদ। শেষদিনের সেমিনার শেষ হল বিকেল পাঁচটায়, সোহাগের ফেরার ট্রেন ছিল পরদিন সকালের। কাজেই সেই রাতটা এমনিতেই থেকে যেতে হত তাকে মুম্বাই। বাইরে থেকে আসা গেষ্টদের বেশীর ভাগই সেই রাতটা গেষ্ট হাউসেই কাটাবে, এমনই ব্যবস্থা ছিল। ওরা দুজনও রাতটা গেষ্ট হাউসে থেকে পরদিন খুব সকালে বেরিয়ে পড়ল পঞ্চগনির দিকে। সমস্ত ব্যবস্থা ঈশান একদিনের মধ্যে পাকা করে ফেলেছিল। সোহাগ সকাল থেকেই মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগছিল। সে বুঝে উঠতে পারছিল না, কাজটা ঠিক না ভুল হল। এই যে ঈশান, সে তো পর্ণার সঙ্গে দাম্পত্যে জড়িয়ে আছে, আর সে নিজেও আছে রিম্বিকের সাথে লিভ ইন সম্পর্কে, যেখানে ঝোঁকের বশে এই দুটোদিন চুরি করে নেওয়াটা উচিত হয়নি, এই বোধ তাকে পীড়া দিচ্ছিল। যাত্রাপথে সোহাগকে চুপচাপ হয়ে যেতে ঈশান ও অস্বস্তিতে পড়ে যায়। খুশী-খুশী এই দুটো দিন কাটানোর কথা তাদের, যাতে ভবিষ্যতে এই দিন দুটোর স্মৃতি তাদের ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতে পারে। তাই সোহাগকে একটু বেসুরো লাগছে দেখে ঈশান জিজ্ঞাসা-ই করে বসে, ”টেনশন করছিস?” ”মনের মধ্যে একটা অশান্তি হচ্ছে জানো, মনে হচ্ছে কাজ অন্যায় হচ্ছে।” ”ও, এই ব্যাপার! আচ্ছা, সত্যি করে বল তো, পর্ণার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে জেনেও তুই আমাকে কি ভালোবাসিস নি?” সোহাগ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায়। ”আর আমিও তোকে ভালোবেসেছি; মানে আমি নিজে বুঝে ওঠার আগে কখন যেন ভালোবেসে ফেলেছি। তখন থেকেই সবসময় তোকে কাছে পেতে চেয়েছি, সবসময় তোর কাছাকাছি থাকতে চেয়েছি। তাহলে? মনে মনে কোনো কিছু ভাবলে সেটা অন্যায় হয়না, শুধু বাস্তবে প্রকাশ করলেই অন্যায়? তোর সাথে একান্তে দুটো দিন কাটানো যদি অন্যায় হয়, তবে সেই অন্যায় আমি বহুদিন আগেই করে ফেলেছি। এটা আমার মত, জানি না তুই কি ভাবছিস!” ”আমার যে তোমার সঙ্গে থাকতে কী ভীষণ রকম ভালো লাগে তুমি ভালোভাবেই জানো। কিন্তু…তাও মন থেকে অশান্তিটা যাচ্ছে না। মনে মনে কাউকে খুন করার কথা ভাবা আর সত্যি সত্যি কাউকে খুন করে ফেলা; এ দুটো কি একরকম অন্যায়?” ”সোহাগ! নিজেদের আর কত ঠকাব বলতে পারিস? পর্ণাকে বিয়ে করেছি আমি ঠিকই, কিন্তু এক মুহূর্ত্তের জন্য তোকে ভুলতে পারিনি। তোর প্রতি আর আমার নিজের প্রতি যে অন্যায় করেছি, সেটা ও তো অন্যায়, এ জীবনে তো আর সেটা শোধরানো যাবে না।” সোহাগের দুচোখ জল ভরে আসে। নিজেকে সংযত করে সে বলে, ”তুমি যখন বলেছিলে আমরা দুজন সোলমেট, তার অর্থ আমি তখন ভালো করে বুঝিনি। কিন্তু যখন তুমি আমার হাত ছেড়ে চলে গেলে, তখন থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত আমি অনুভব করেছি, তুমি কি ছিলে আমার কাছে।” ঈশান কাছে টেনে নেয় সোহাগকে, সোহাগের চোখের জলে ভিজতে থাকে ওর কাঁধ, কিন্তু বাধা দেয় না সে। কাঁদুক, যত ইচ্ছা কাঁদুক সোহাগ। হালকা হয়ে যাবে বুকের মধ্যে জমে থাকা পাথর। কিন্তু কীই বা করার ছিল ঈশানের! সময়কেও তো আর পেছনের দিকে হাঁটানো যায় না! যদি যেত, তবে কখনোই সে জড়িয়ে পড়ত না পর্ণার সঙ্গে সম্পর্কে, আর অপেক্ষা করে বসে থাকত, সোহাগের সঙ্গে দেখা হবার মুহূর্তটার জন্য। এখন ওরা দুজনই সময়ের হাতে বন্দী, সময় কাউকে ক্ষমা করেনা, ওদেরও করেনি। মনে মনে ভাবতে থাকে ঈশান, সেই যে গত জন্মে, কিংবা তারও আগে, হাত ছেড়ে হারিয়ে গেছিল যে মেয়ে, এ জন্মে সে আবারও ফিরে এসেছে তার জীবনে। কিন্তু একটু দেরী করে ফেলেছে। এই দেরীর অবকাশে, ঈশান ঢুকে গেছে অন্য আর এক জীবনের বৃত্তে, যে বৃত্ত থেকে বাইরে বেরনোর পথ একেবারে বন্ধ। তাই, সোহাগকে পেয়েও আবার হারাতে হল, আবার হাত ছেড়ে, জনসমুদ্রে ভাসিয়ে হল স্বপ্নের নৌকাটিকে। এ জন্মেও থেকে গেল অপূর্ণতা। আত্মা সঙ্গীটির সঙ্গে মিলনের টানে আবার হয়ত জন্মাতে হবে ঈশানকে, আবার জন্ম নিতে হবে সোহাগকে, অন্য কোনো দেশ-কালে। কে জানে, কতদিন চলবে তাদের এই জন্মান্তর-যাপন। সকাল ছটায় মুম্বাই থেকে গাড়িতে রওনা দিয়েছিল ওরা পঞ্চগনির উদ্দেশ্যে। পৌঁছতে পৌছতে বেলা দুটো বেজে গেল প্রায়। দূরত্বটাও বড় কম নয়তো, প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার। ঈশানের সঙ্গে থাকায়, এতটা পথ পাড়ি দেওয়াটা গায়ে লাগেনি সোহাগের, তবু ও দু এক বার সে ভেবেছিল, এত দূর না গিয়ে, কাছাকাছি কোথাও থাকলেই তো ভালো হত! কিন্তু পঞ্চগনি পৌঁছে সে বুঝল কেন ঈশান তাকে নিয়ে এখানে এসেছে। পশ্চিমঘাট পর্বতের কোলে, ছোট্ট হিল স্টেশন পঞ্চগনি। ছিমছাম ছোট্ট শহরটিকে দেখে, প্রথম দর্শনেই প্রেম হয়ে গেল সোহাগের। রাস্তার বাঁক ঘুরে হঠাৎ দেখা গেল দূরে নীচু দিয়ে বয়ে চলছে এক নদী। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে নাম জানা গেল কৃষ্ণা। পাহাড় চূড়োয় কখনো মেঘ, কখনো রোদ, দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে বারে বারে। মনটা খুশীতে ভরে গেল সোহাগের। জায়গাটা যে এত সুন্দর হবে, নাম শুনে ধারণা ও করতে পারেনি সে। কারণ কখনো কারো কাছেই সে পঞ্চগনির নাম আগে শোনেনি। হোটেল আগে থেকেই বুক করে রেখেছিল ঈশান। চেক ইন করে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি। রুম সার্ভিসের ছেলেটি বলল, এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি আসে, অল্প সময় পর থেমেও যায়, তখন পাহাড় চুড়োয় ঝলমলিয়ে ওঠে রোদ। বৃষ্টি দেখে সোহাগ আনন্দ ধরে রাখতে পারে না আর। ঈশানকে বলে, ”একটু ভিজে আসি?” ”ভিজবি? চল।” তাড়াতাড়ি তারা নেমে আসে হোটেলের লনে, বয়স যেন হঠাৎ করেই কমে গিয়ে তারা পৌঁছে গেছে ছোটবেলাতে। হোটেলের ম্যানেজার, তার কাউন্টার থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখে মনে মনে হাসেন। হনিমুন করতে আসা দম্পতিদের যে মাথায় কত রকমের উদ্ভট খেয়াল চাপে, ভাবেন তিনি। অনেকগুলো কৌতুহলী চোখ তাদের বৃষ্টিতে ভেজা দেখছে, এটা বুঝতে পেরে ঈশান তাড়া লাগায় সোহাগকে, ”চল, ভেতরে চল, আর না” বৃষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়াও ছিল, ফলে ভেজা শরীরে একটু শীত শীতও করছিল সোহাগের। তাছাড়া, বৃষ্টিতে ভিজে টি-শার্টটাও শরীরে চেপে বসায়, একটু অস্বস্তিও বোধ করছিল সে। তাই ঈশান বলা মাত্র বাধ্য মেয়ের মত, ঈশানের পিছু পিছু ঘরে ফিরে আসে সে। রুমে ফিরে সে ভেবেছিল একদম স্নান সেরে নেবে, কিন্তু সে সুযোগ আর ঈশান দিল না তাকে। দরজাটা লক করেই তীব্র ভাবে জড়িয়ে ধরল তাকে। দুজনের শরীরের ভেজা পোশাক আর ভিজে চুল থেকে গড়িয়ে পড়া জলের কথা মনেও থাকল না। ঈশানের আলিঙ্গন তার আদরে সোহাগ যেন ফিরে গেল সেই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় যেদিন প্রথম ঈশান তাকে টেনে নিয়েছিল বুকে আর প্রথমবার কোনো পুরুষের ঠোঁট আদর মাখিয়ে দিয়েছিল তার ঠোঁটে, সেই দিনটার স্মৃতি, সোহাগ এতগুলো বছর ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, ঈশানকে আর কখনো ফিরে পাবে না জেনেও। সুতরাং এতগুলো বছর পর যখন সত্যিই ঈশান বুকে টেনে নিল তাকে, তার ঠোঁটদুটো ডুবে গেল ঈশানের ঠোঁটের ভেতর, তখন সোহাগ ও ঈশানকে পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ল। শারিরীক মিলনের উত্তাপ কি পৌঁছয় আত্মার গভীরে? জানা নেই কারোরই, তবু এই দু জন সময়ের হাতে বন্দী অসহায় মানুষ-মানুষী দ্বিধাহীন ভাবে তাদের শরীরকে মিলিয়ে দেয়। শরীরের স্থূল বাধা অতিক্রম করে, তারা স্পর্শ করতে চায় একে অপরের সূক্ষ্ম শরীরকে। একটি অতৃপ্ত আত্মা মিলিত হতে চায় তার হারিয়ে ফেলা সঙ্গীর সাথে। যেমন ভাবে প্রকৃতিতে, একটি কণা তার বিপরীত কণার সাথে মিলিত হলে উভয়ের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়, পড়ে থাকে খানিকটা শক্তি, তেমন ভাবেই তারা মিলিত হচ্ছিল সোহাগ তার ঈশান নামধারী দুটি অস্তিত্বকে মিশিয়ে দিয়ে, একটিমাত্র প্রাণ, একটিমাত্র আত্মায় পরিণত করার ইচ্ছায়।
উমাকে নিয়ে কয়েকটা দিন বেশ ব্যস্ততা গেল; সঙ্গে খানিকটা টেনশনও। সোহাগ ভাবছিল দুটো বছর নষ্ট না করে, এবারই উমাকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটা দেওয়ানো যায় কিনা, তাহলে লোক পাঠিয়ে ওর বাড়ি থেকে বই খাতা, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট আর স্কুল থেকে অ্যাডমিট কার্ড আনানোর ব্যবস্থা করবে সে। কিন্তু উমা নিজেই রাজী নয়। ও আর ফিরতে থাকতে চায় না তিক্ত অতীতে। পরীক্ষার দিনগুলোতে, সোহাগ ওকে মানসদার সেই মাসীর বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। কিন্তু উমা বেঁকে বসল; ওর বক্তব্য পরীক্ষা দিতে গিয়ে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, আর ওদের গ্রামের দিকে যেকোনো কথাই হাওয়ায় অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়, ফলে কারোরই জানতে বাকী নেই ওর ঘটনাটা। দেখা হওয়া মাত্র সবাই নানা রকম অশ্লীল প্রশ্ন করবে, ঠাট্টা করবে, হাসাহাসি করবে। ”দিদি, আমার মন খারাপ হয়ে যাবে, ভালো করে পরীক্ষা দিতে পারব না। তার থেকে নতুন জীবন যখন শুরু করছি, নতুন থেকে-ই শুরু করি। ঐ গ্রামে আমি আর ফিরব না।” যুক্তি অকাট্য এবং যথেষ্ট ভাবার। তবু সোহাগ পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে চায়। ”কিন্তু দুটো বছর নষ্ট হবে তাহলে, সেটা ভেবেছিস তো?” ”তুমি আমাকে না নিয়ে এলে তো গোটা জীবনটাই নষ্ট হয়ে যেতো দিদি, সেখানে দুটো বছর তো কিছুই না।” কঠিন পরিস্থিতি উমাকে অনেক পরিণত করে দিয়েছে। সোহাগ চমৎকৃত হয় ওর চিন্তা ভাবনার ধরণ দেখে অনেক কিছু ভেবে ফেলেছে ও এই কদিনে। ”নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে, চাকরি পেতে হলে আমাকে তো উচ্চমাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে, বল দিদি। এবার পরীক্ষা দিলে আমি পাশ করব, কিন্তু রেজাল্টটা ভালো হবে না। আমাদের বাড়িতে ভালো করে লেখাপড়া করার পরিবেশ ছিল না তো, তাই পড়া ভালো তৈরী হয়নি, আর তাছাড়া দেখিয়ে দেওয়ারও তো কেউ ছিল না, নিজে নিজে পড়তাম, তুমি আমাকে আবার নতুন করে ইলেভেন ক্লাশে ভর্তি করে দাও, আমি প্রথম থেকে আবার ভালো করে পড়া শুরু করব।” আর জোরাজুরি করেনি সোহাগ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। উমা যখন নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছে, ওকে সে সুযোগ দেওয়াই উচিত। তাছাড়া ওর গ্রামে ফিরে পরীক্ষা দেওয়াটা সত্যিই কষ্টকর, ওর মনের ওপর চাপ তো পড়বেই তাছাড়া যে গোলমাল চাপা পড়ে গেছে, সেটা আবার নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। উমাকে কিছুদিনের জন্য বাবা মায়ের কাছে রেখে আসাই মনস্থ করে সোহাগ। কারণ সে নিজে বাড়ি থাকবে না কয়েকটা দিন, মুম্বাই যাবে সেমিনারের জন্য, আর তাছাড়া মায়ের ওখানে থাকলে, বাবার কাছেই ইংরাজীটা পড়তে বসলে, নতুন করে ভর্তি হয়ে ক্লাশ শুরুর আগেই ওর পড়াশোনা অনেকটা এগিয়ে যাবে। মুম্বই থেকে সোহাগ ফিরল সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ হয়ে। নিজেকে এত খুশী আর হালকা তার আগে কখনও লাগেনি। সে যেন হাঁটছিল না, মাটির ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে চলছিল। ঈশানের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে, এমন স্বপ্ন দেখাও যখন সে ছেড়ে দিয়েছিল, তখন তাকে এমন অযাচিত ভাবে পেয়ে তার জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি ঘুচে গেছে। ভেতরে ভেতরে এতটাই জীবনীশক্তি জড়ো করে ফিরেছে সে, যে তার এখন মনে হচ্ছে, এক বছরের কাজ, এক দিনেই করে ফেলতে পারবে। রিম্বিক যেহেতু শুধুমাত্র সোহাগের লিভ-ইন পার্টনার নয়, ভাল বন্ধুও, তাই ঈশানের সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা তার কছে গোপন করেনা সে, শুধু পঞ্চগনি যাবার ব্যাপারটা উহ্য রাখে। ”ঈশানদার সঙ্গে দেখা হল জানিস তো, ওর একটা টক্ ছিল।” ”কোথায় থাকে এখন?” ”ফ্রান্সে। ওখানে একটা প্রজেক্ট কাজ করছে বলল।” ”এবারে বুঝলাম! কেন মুম্বই থেকে ফেরার পর তুই কেন এত খুশীতে ঝলমল করছিস।” ”ইয়ার্কি মারিস না। এতদিন পর একজনের সঙ্গে দেখা হলে সাবারই ভালো লাগে। আফটার অল, একটা সময় ঈশানদা আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল।” ”সেইজন্যই তো বললাম। কাছের মানুষকে বহুদিন পর কাছে পেলে সবাই খুশী হবে। তা এখানে আসতে বললি না?” ”বলেছিলাম। অনেক কাজ নিয়ে এসেছে এবার, তাই বলল সময় হবে না। নেক্সট টাইম দেশে আসলে আসবে বলল। এই দ্যাখ, ঈশানদার ছবি।” মোবাইলে ঈশানের যে ছবি তুলে এনেছিল সোহাগ, আগ্রহ করে দেখায় রিম্বিককে। রিম্বিক দেখে, কিন্তু ততটা উৎসাহ নিয়ে নয়, যতটা উৎসাহ নিয়ে সোহাগ তাকে ছবিটা দেখাচ্ছিল। মোবাইলটা সোহাগকে ফিরিয়ে দিয়ে, হঠাৎই গম্ভীর হয়ে যায়। সোহাগ ততটা খেয়াল করেনি ওর ভাবান্তরটা, তাই নিজের মনেই বক্বক্ করে বলে যাচ্ছিল সেমিনারের নানা ব্যাপারে কথা। সোহাগ যদি রিম্বিককে সেই সময় লক্ষ্য করত, তাহলে বুঝতে পারত, সোহাগের কথার একটা শব্দও সে শুনছে না, ডুবে আছে অন্য কোনো ভাবনায়। সোহাগের বক্বকানি মাঝপথে থামিয়ে হঠাৎ করে সে বলে বসে, ”তাহলে, তোর ঈশানদাকে তো পেয়েই গেছিস, এবার আমার ছুটি তো?” সোহাগ এমন একটা কথা শুনবে ভাবতেও পারেনি। সে হক্চকিয়ে যায় রিম্বিকের কথা শুনে। কয়েকটা মুহূর্ত্ত রিম্বিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করে, ও কথাটা সিরিয়াসলি বলছে, না, ঠাট্টাচ্ছলে বলছে! যখন বুঝতে পারে, রিম্বিক ব্যাপারটাতে সিরিয়াস তখনও নিজেও সিরিয়াস হয়ে যায়। গম্ভীর ভাবে বলে-”রিম্বিক ছেলেমানুষী করিস না! তুই জানিস ভালো করেই ঈশানদা বিবাহিত, আর আমিও ওর জন্যে অপেক্ষা করে বসে নেই। আর এই যে যোগাযোগ হল, একে কি পাওয়া বলে? তাছাড়া আমিতো প্রথম থেকেই জানতাম, যে ওকে কোনোদিনই আমি পাবো না।” ”জানতিস-ই যদি, তবে এতটা ইনভলভ্ হওয়া তোদের উচিত হয়নি।” সোহাগ কিছু বলে না আর। উচিৎ যে হয়নি, সে কথা তো সেও জানে ভালো করে। সকলেই যদি উচিৎ পথে পা ফেলে, দুনিয়ার সবাই যদি সব কাজ ভালো করে বুঝে করে তবে তো ”সমঝ্ তে থে, মগর ফিরভি না রাখ্খি দুরিয়াঁ হামনে / চরাগ কো জ্বলানে মে, জ্বলা লি উঙ্গলিয়াঁ আপনে।” এই সব গান কোনোদিন লেখাও হত না, গাওয়াও হত না। সোহাগের মত আলো জ্বালাতে গিয়ে নিজের হাতই পুড়িয়ে ফেলে এমন মানুষ দুনিয়ার আনাচে কানাচে খুঁজলে অনেকই পাওয়া যাবে। সবই তো জানা ছিল তার, তবু কি একবারও পারল ঈশানের থেকে দূরে থাকতে? কি যেন একটা অদৃশ্য সুতো, সব সময় তাকে টানতে থাকে ঈশানের দিকে, পুড়ে মরা নিশ্চিত জেনেও, বার বার সে সাড়া দিয়ে ফেলে সেই টানে, বার বার সে ঝাঁপ দেয় আগুনে। উমাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো, স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়াটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিল সোহাগ। তাই মুম্বই থেকে ফেরার পর, নিজের পড়াশোনার সাথে সাথে, ওর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাজেও হাত দিয়েছিল সে। মাধ্যমিকের রেজাল্ট মোটামুটি একরকম ছিল উমার, খুব একটা ভালো ছিল না, তারপর আবার দু’বছর বাদ দিয়ে ভর্তি হবে, ফলে খুব একটা ভালো স্কুলে ওর ভর্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। মোটামুটি মাঝারি মানের একটা স্কুলে, ব্যক্তিগত পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে, ওর ভর্তির ব্যাপারে প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে রাখল সোহাগ। কয়েকটা মাস অপেক্ষা করতে হবে। মাধ্যমিকের রেজাল্ট বার হবার পর নতুন ভাবে ওকে ভর্তি হতে হবে। ইতিমধ্যে লালগোলা থেকে লোক পাঠিয়ে উমার বাড়ি থেকে ওর মাধ্যমিক পাশের রেজাল্ট, সার্টিফিকেট, অ্যাডমিট কার্ড এসব প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র আনানোর ব্যবস্থাও সে করে ফেলেছে। বাকী থাকল কেবল ওর থাকার একটা ব্যবস্থা করা। ওদের সাথে একই ফ্ল্যাটে থাকাটা সম্ভব হবে না, কারণ রিম্বিকের পছন্দ নয় ব্যাপারটা। মুখে কিছু বলেনি রিম্বিক, কিন্তু সোহাগ বুঝতে পেরেছে, এতে রিম্বিকের অস্বস্তি হবে, তাই এই চিন্তাটা মাথা থেকে বাদ দিয়েছে। স্কুল যতদিন না শুরু হচ্ছে, ততদিন উমা, বারাসাতে সোহাগের মা বাবার কাছে যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, এ ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু স্কুল শুরু হলে, স্কুলের কাছাকাছি কোনো লেডিজ হস্টেল বা কোনো বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসাবে যাতে থাকতে পারে উমা, সোহাগ তার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকল। লেডিজ হোস্টেলে বা পেয়িং গেস্ট হিসাবে রাখলে, উমার জন্য অনেকটা খরচ বেড়ে যাবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু তাছাড়া তো উপায় ও নেই। সোহাগ তাই ঠিক করে বাড়তি খরচের ধাক্কা সামলানোর জন্য, ও কয়েকটা টিউশন পড়ানো শুরু করবে। ফেলোশিপ আর টিউশনের টাকা মিলিয়ে ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে। উমাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোটা উমার জন্য যতটা জরুরী, ততটা জরুরী সোহাগের নিজের জন্যেও। যদি অন্তত একজন উমাকেও বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাচ্চা নাচিয়ে টাকা তোলা কিংবা ট্রেনে বাসে রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তির মত অসম্মানের জীবন থেকে সরিয়ে আনতে পারে, তবে সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্ন সে দেখেছিল, আর তার জন্য সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিল, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য অন্তত কিছু করতে পারবে। সোহাগের বাবা ও একদিন সমাজের বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি অর্জনের স্বপ্ন দেখে, ডাক্তারির মত সম্মানজনক পেশা ছেড়েছেন, জেলও খেটেছেন। সোহাগের মা, নিজের মেয়েকে অন্যের ভরসায় ফেলে রেখে, দিনের পর দিন ছুটেছেন, অন্যের ছেলেমেয়েদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের ভরসা যোগাতে। ওর বাবা, মা তার তাদের সঙ্গীরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে, যে স্বপ্নের সন্ধান করেছিলেন, সেই স্বপ্ন তাদের অধরাই রয়ে গেছে। ব্যর্থ, ভ্রান্ত আন্দোলনের তকমা গায়ে সেঁটে তারা সবাই কার্যত ইতিহাস। সোহাগকে এই সব অভিজ্ঞতা অন্য ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। সে বোঝে, বাইরে থেকে আন্দোলনে করে, সমাজকে পাল্টানো যায় না। সমাজের যারা উপাদান, তাদের প্রত্যেককে পরিবর্তন করতে পারলে, তাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন করতে পারলে, মুক্তির স্বপ্ন দেখাতে শেখালে, তবেই পরিবর্তন সম্ভব সমাজ ব্যবস্থার। তাই সোহাগ ভেবেছিল, অন্তত একজন উমার মনে লড়াইয়ের সাহস ফেলাতে পারলে, তাকে দেখে আরো দশজন উমা, তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, অনৈতিক জুলুমের প্রতিবাদ করার সাহস পাবে। তখন আর ওদের হয়ে অন্য কারোকে অধিকারের কথা বলতে হবে না, নিজের অধিকার ওরা নিজেরাই ছিনিয়ে নেবে। মুম্বই থেকে ফেরার পর থেকেই সোহাগ বুঝতে পারছিল রিম্বিকের সঙ্গে তার বন্ডিংটা ঠিক জমছে না। প্রথম প্রথম সে ভাবছিল, সমস্যাটা হচ্ছে তার নিজের দিক থেকেই। যেহেতু ঈশানের সঙ্গে তার ভেঙ্গে যাওয়া সাঁকোর পুনর্নির্মাণ হয়েছে, তাই হয়ত তার নিজের মনটা সেদিকেই পড়ে থাকছে, আর রিম্বিকের প্রতি সে অমনযোগী থাকছে। এটা যাতে না হয় তার জন্য রিম্বিকের প্রতি সে বিশেষ মনোযোগ দেয়, আর তখনই বুঝতে পারে আসলে রিম্বিকই অন্যমনস্ক আছে, যে কোনো কারণেই হোক। হতে পারে, ঈশানের সঙ্গে সোহাগের যোগাযোগ হওয়াটাকে মেনে নিতে পারেনি, নিজেকে অসম্মানিত লাগছে ওর, কিংবা উমাকে নিয়ে সোহাগের এই যে মেতে থাকা, সেটাও তার অপছন্দ হতে পারে। যাই হোক না কেন অনুমান করে নিয়ে বসে থাকার চাইতে সরাসরি জেনে নেওয়া ভালো, এটাই সোহাগ মনে করে। তাই রিম্বিককে জিজ্ঞাসা করে, ”তোর কি হয়েছে বল তো? কদিন ধরেই দেখছি ডিস্টার্বড!” ”তেমন কিছু নয়।” ”যেমনই হোক না কেন, কিছু তো হয়েছে বটেই। আমাদের কিন্তু সবসময় খোলাখুলি কথা বলার অভ্যাস ছিল রিম্বিক, ভুলে যাস না।” ”আসলে আমি ভাবছিলাম, দিল্লিতে যদি থাকত পারতাম, তাহলে আই.এ.এসের প্রিপারেশনে সুবিধা হত।” ”বাড়িতে বলেছিস?” ”হ্যাঁ বাবার সাথে কথা বলেছি। কেন না টাকাটাও তো একটা বিরাট ফ্যাক্টর।” ”টাকা দিতে রাজী হয়েছেন?” ”হ্যাঁ।” ”তাহলে তোর সমস্যাটা কোথায়?” ”আসলে অনেক দিনের ব্যাপার তো; কিন্তু তুই তো এখন কলকাতা ছাড়তে পারবি না, তাই ভাবছিলাম..” ”কি ভাবছিলি? আমি তোকে ছাড়ব না, যেতে নিষেধ করব? আমাকে অত ইনকনসিডারেট ভাবিস না। আরে বাবা, আমাদের দুজনেরই এখন কেরিয়ার তৈরী করার সময়, পরে অনেক সময় পড়ে আছে, একসাথে থাকার জন্য, তুই ফালতু চাপ নিস না, চলে যা।” রিম্বিকের বুক থেকে পাথর নামে। দিল্লী যাবার পরিকল্পনা তার অনেক দিনের, যোগাযোগের কাজও অনেকদূর এগিয়ে গেছে, কিন্তু সোহাগকে বলে ওঠা হয়নি। একসাথে থাকার প্রস্তাবটা যেহেতু তার দিক থেকেই ছিল, তাই এখন আবার নতুন করে আলাদা হয়ে যাবার প্রস্তাবটা কিভাবে দেবে, এটা চিন্তা করেই সোহাগকে কথাটা বলতে পারছিল না। এখন সোহাগ নিজে থেকে প্রসঙ্গ তোলায় ব্যাপারটা ওর পক্ষে সহজ হয়ে গেল। খুশী হয়ে সোহাগের কোমর জড়িয়ে ধরে রিম্বিক বলে, ”এই জন্যই তো, তোকে এত ভালোবাসি, কত সহজে আমার সমস্যা মিটিয়ে দিলি।” ”ভালো তো বাসিস, কিন্তু সহজ হতে পারিস না কেন? মনের মধ্যে চেপে না রেখে, সোজা কথা সোজা করে বলতে পারিস না?” দুজন খোলাখুলি কথা বলে ব্যাপারটা সেট্ল করল ঠিকই, তবু দুজনেরই মনে অনেকগুলো না বলা কথা, অনেক সংশয় থেকে গেল। যে কোনো সম্পর্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য-এই জাতীয় সংশয় সাথে সাথে দূর করা অত্যন্ত জরুরী। সোহাগের মনে প্রশ্ন তৈরী হয়, ”রিম্বিক কি দিল্লী যাবার ব্যাপারটা আগে থেকেই ঠিক করেছিল, নাকি ঈশানকে নিয়ে মনে সংশয় আর অভিমান তৈরী হওয়াতে এমন ভাবে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল? যদি আগে থেকেই যাবার কথা ভেবে থাকে, তবে ওর তো উচিৎ ছিল, আমার সঙ্গে আলোচনা করা! এতবড় একটা সিদ্ধান্ত ও একাই নিয়ে নিল! আমাকে না জানিয়েই যদি ও ওর সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারে, তবে তো ওর জীবনে আমার আর কোনো প্রয়োজনই নেই। একসাথে থাকা মানে তো এক বাড়িতে থাকা বা এক বিছানায় শোওয়া নয়। এভাবে একসাথে থাকার কোনো মানেই তো হয় না। তাছাড়া বন্ধু হিসাবেও তো ওর আলোচনা করা উচিত ছিল। নাকি স্বার্থ সামনে দাঁড়িয়েছে বলে বন্ধুত্বও ফিকে হয়ে গেছে।” আর রিম্বিক ভাবে, ”সোহাগ তো আমার দিল্লী চলে যাবার কথা শুনে সেভাবে রি অ্যাক্ট করল না। তাহলে কি ও আমার সাথে আর থাকতে চায়না? হয়ত ও আমাকে কোনোদিন সেভাবে ভালোই বাসেনি, আমি শুধুমাত্র ঈশানদার পরিবর্ত হিসাবে ছিলাম। এখন ঈশানদাকে আবার ফিরে পেয়ে গেছে বলে, আমাকে আর ভালো লাগছে না! এই জন্যই সোহাগ বিয়েতে রাজী হয়নি। কারণ মন থেকে ওর কখনোই সায় ছিল না তো! আমি দিল্লী চলে গেলে ওর তাহলে ভালোই হবে নিজের মত করে এনজয় করবে লাইফটা!” ফাটল এভাবেই তৈরী হয়, আর এভাবেই সূক্ষ্ম ফাটল থেকে ভেঙ্গে পড়ে বৃহৎ ইমারত। রিম্বিক আর সোহাগের মধ্যে যে সুন্দর বোঝাপড়া তৈরী হয়েছিল বন্ধুত্বের দিন যাপনের মধ্যে দিয়ে, পরস্পরকে যত কাছের থেকে চিনেছিল বিশ্বাস করতে শিখেছিল, আর পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠছিল একে অন্যের পরিপূরক, শুধুমাত্র একটা সন্দেহ উঁকি দেওয়াতে, সেই নির্মাণে মিশে গেল বিষ। কেরিয়ার তৈরীর তাগিদে, দূরে চলে যেতে পারতই তারা, থাকতেই পারত একে অন্যকে ছেড়ে একাধিক বছর, কিন্তু সে দূরত্ব হত কেবল শারিরীক। কিন্তু যে সংশয়, সন্দেহ কে মনে রেখে দিয়ে এখন তারা ভৌগোলিক দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলল, তা এখন শুধুই পোড়াতে থাকবে। প্রথমে যা ছিল শুধুমাত্র সংশয়, তা কালক্রমে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হতে থাকবে। আর ওদের সরিয়ে দিতে থাকবে, পরস্পরের থেকে দূরে আরও দূরে…।
”আজ সন্ধ্যেতে কি ফাঁকা আছ?” ক্লাশের ফাঁকে সাহিলকে টেক্সট করে সোহাগ। উত্তর আসে সঙ্গে সঙ্গেই প্রায়, ”আমি তো ফাঁকা-ই থাকি। ফাঁকা দোকানে বসে মাছি তাড়াই। বল কি দরকার।” ”তাহলে সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে এসো, ডিনার করে ফিরবে” মেসেজ পাঠায় সোহাগ। ”ওকে” সাহিল তৎক্ষণাৎ জানায়। সেদিনের শেষ ক্লাশ ছিল তিনটে দশ-এ। ক্লাশ নেওয়া শেষ করে সোহাগ শপিং-এ যায়। মনে মনে ও ঠিক করেছিল আজ নিজের হাতে রান্না করে সাহিলকে খাওয়াবে। সেই অনুযায়ী অফ পিরিয়ডে বসে মেনুও ঠিক করে ফেলেছিল। সেই মেনু অনুযায়ী রান্না করতে যা যা লাগবে, তার কোনোটাই সম্ভবত তার কিচেনে নেই। সম্ভবত এই কারণে, কোনো দিনই সে, কি আছে কি নেই এসব দেখে না। রান্নার দিদি যা যা আনতে বলে তাই কিনে আনে। আর তাছাড়া অনেক দিন হল, জমিয়ে বাঙালী রান্না আর গুছিয়ে বাঙালী খাবার খাওয়ার পাট উঠে গেছে তার বাড়ি থেকে। একা নিজের জন্য ভালোমন্দ রান্না করে খাবার কথা কেই বা ভাবে! সকালে কলেজে বেরনোর তাড়া থাকে, তখন যে কোন একটা পদ দিয়ে খেতেই সুবিধা হয়, আর রাতে ভাত বা রুটি এসব খায়না সে, দুধ কর্ণফ্লেক্স খাওয়াই পছন্দ তার। খাদ্য রসিক কোনোদিনই ছিল না সোহাগ। আর এখন তো রান্নার মেয়েটি নিজের খুশী মত যা রান্না করে, বিনা জিজ্ঞাসাবাদে তাই খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং ভালো করে রান্না করতে হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য তাকে আগে লিস্ট বানিয়ে শপিং এ যেতেই হত। এই রান্নার প্ল্যানটা নিয়ে সে বেশ উত্তেজিত, একটু টেনশনই আছে বৈকী, অনেকদিন পর রান্না করবে তো! ঠিকঠাক হবে কি না, সেটা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা আছে বৈকী। কোন প্রিপারেশনে, কি মশলা দিতে হয়, সেটা যদি অনভ্যাসে ভুলে যায়, তবে কাকেই বা জিজ্ঞেস করবে! যাকে জিজ্ঞাসা করে রান্না করত আগে, তিনি তো আর নেই! ওর রান্না পাবদা মাছের বিশেষ একটা প্রিপারেশন বাবা খেতে খুব ভালো বাসতেন, বাবা চলে যাবার পর সেটা আর কখনো রান্না করেনি সোহাগ। আজ সেটাই রান্না করবে বলে ঠিক করেছে। তাই মাছের বাজারেও যেতে হবে ওকে, পাবদা মাছ কেনার জন্য। আজ সোহাগের জন্মদিন। পাঁচবছর আগে বাবা চলে গেলেন আর তার মাস ছয়েকের মধ্যে মাও। একান্ত নিজের বলতে তার এমন কেউই রইল না, যে জন্মদিন উদযাপন করবে। বন্ধুরা, ছাত্রছাত্রীরা ফোনে, এস.এম.এসে শুভেচ্ছা জানায় জন্মদিনের, ব্যস এইটুকুই। অবশ্য নিজের জন্মদিন পালন নিয়ে মাতামাতি তার কোনোদিনই ছিল না, কারণ তাদের পরিবারে এসব চল ছিল না। সোহাগের জন্মদিনটাতে মা তার পছন্দের রান্না গুলো করতেন, আর ওর বাবা, যত কাজই থাকুক না কেন, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতেন, আর তারা তিনজন একসাথে বসে রাতের খাবারটা খেত। এমনিতে খাওয়ার সময় বাবা মা দুজনের উপস্থিতি একসাথে সচরাচর পাওয়া যেত না বলে, সবাই মিলে একসাথে খাওয়াটা তার কাছে খুবই ভালবাসার ছিল। খেতে বসে, কত যে গল্প হত তাদের, হাতে থালা সব শুকিয়ে খটখটে হয়ে যেত, খাবারও অর্ধেক হজম হয়ে যেত, তারপর তারা উঠত টেবিল ছেড়ে। গতকাল থেকে এই কথাগুলোই বার বার মনে পড়ছে সোহাগের, তার মনটা ভারীও হয়ে উঠেছে থেকে থেকে। ছোট থেকে, বাবা তাকে শিখিয়ে ছিলেন, দুঃখ কষ্ট এই নেগেটিভ অনুভূতিগুলোর মুখ সব সময় ঘুরিয়ে দিতে হয় পজিটিভ দিকে, কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল কাজে, তাহলে সেই কষ্টের উপশম হয়, আর নতুন কিছু কাজ করার আনন্দে মনটা ও ভালো থাকে। বাবার সেই কথা সবসময়ই মেনে চলার চেষ্টা করেছে সোহাগ! কালরাতে যখন পরিবারহীনতার নিঃসঙ্গতা বোধ তাকে পীড়িত করছিল, তখনই এই রান্না করার প্ল্যানটা মাথায় আসে তার। বাবা যা যা খেতে ভালোবাসতেন সেগুলো নিজে হাতে রান্না করবে সে রান্নার দিদিকে ছুটি করে দিয়ে, আর সাহিলের সাথে বসে একসঙ্গে রাতে খাবে এটাই হবে তার জন্মদিনের উদযাপন। এই পরিকল্পনাটা করে ফেলার পর তার মনটা হালকা হয়ে গেছিল, আর তাই, বিছানাতে শোওয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়তে পেরেছিল। আজ সকালে ঘুম ভাঙার সোহাগের মনে খুশীর ছোঁওয়া। মনে হচ্ছে, আজ অনেক কিছু করার আছে, দিনটা সম্পূর্ণ অন্যরকমভাবে সাজানো আছে তার জন্য, সম্পূর্ণ নতুন রকমভাবে কাটবে দিনটা তার, যেরকম ভাবে সে গত পাঁচ বছরে একটা দিনও কাটায়নি! ভেবেই ভীষণ ভালো লাগতে থাকে তার। বাজার করা শেষ করে, ফুলও কেনে সোহাগ। রজনীগন্ধা, ভীষণ ভালোবাসার ফুল তার। মা বাবার ও খুব প্রিয় ছিল এই ফুল, তাই তাদের বাড়িতে অন্য কোনোরকম বিলাসিতা বাহুল্য না থাকলেও, বাবা মাঝে মাঝেই রজনীগন্ধা কিনে এনে, ফুলদানিতে রাখতেন। সন্ধ্যে থেকে ঘর ভরে থাকত রজনীগন্ধার গন্ধে। সেই নেশা সোহাগের মধ্যেও ঢুকে গেছে; যেদিন ই বাজার করতে যায়, রজনীগন্ধার স্টিক, নিয়ে ফেরে। রাতে, একা বাড়িতে, ঐ গন্ধ তাকে পৌঁছে দেয় ছোটবেলার দিনগুলোতে, মা, বাবার সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলোতে। তার ভালোলাগা সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় এই গন্ধ। আজকের দিনে তাই বিশেষ করে রজনীগন্ধা কেনে সোহাগ; আজকে জন্মদিনের সন্ধ্যেটাতে সে ফিরে পেতে চায়, মন ভালো করে দেওয়া অনুভূতি। বাড়ি ফিরে এসে, কোনমতে পোশাক পাল্টে সে লেগে পড়ে রান্নায়। যাতে সাহিল আসার আগেই সব শেষ করে ফেলতে পারে। যদিও সাহিল ফোন করে জানিয়েছে ওর আসতে আসতে সাড়ে আটটা বাজবে। রান্না করতে করতে ভীষণ গরম লেগে গেছিল ওর। এতক্ষণ সময় রান্নাঘরে কাটানোর অভ্যাসও নেই, সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছিল, মাথার চুল থেকে ও গড়িয়ে গড়িয়ে নামছিল ঘাম। এমনিতে গরমের দিনে বাইরে থেকে এসেই স্নান করা অভ্যাস ওর, এতে ক্লান্তি কেটে যায়, কিন্তু আজ রান্নাঘরে ঢুকতে হবে বলে সেটা করেনি। তাই রান্না শেষ করে তাড়াতাড়ি স্নানে চলে যায়। স্নান সেরে বেরিয়ে আজ একটা শাড়ি পরে, সাধারণ সুতির শাড়ি একটা, দক্ষিণের সুতি, দেখতেও সুন্দর আর পরেও আরাম। এমনিতে শাড়ি খুব একটা পরে না সে কোনো দিনই; কলেজেও সালোয়ার কামিজে যাওয়া যায় বলে বেশীর ভাগ সময় সালোয়ার কামিজই ওর বাইরে যাবার পোষাক। বেশ তাড়াতাড়ি পরে রেডি ও হওয়া যায়, আবার স্বচ্ছন্দে চলা ফেরা ও করা যায়। শাড়িতে খুব একটা অভ্যস্ত নয় সে কোনোদিন। কিন্তু আজ সে স্নান সেরে, মায়ের একটা দক্ষিনি তাঁতের শাড়ি পরল, হাল্কা গোলাপি খোলের। মায়ের এই শাড়িটি তার খুব প্রিয় ছিল। যখনই মা এই শাড়িটি পরতেন, মাকে ভীষণ সুন্দর লাগত তার। এমনিতে সোহাগের মা সুন্দরীই ছিলেন, গায়ের রং ও ছিল ফরসা, মধ্য পঞ্চাশেও তাঁকে সোহাগের মা বলে মনে হত না। তাই তিনি যা পরতেন, তাতে সোহাগ মুগ্ধ হয়ে যেত, কিন্তু এই হালকা গোলাপী রং এর শাড়িটা পরলে, সোহাগ মায়ের দিক থেকে চোখ ফেরাতেই পারত না। ও এত পছন্দ করতো বলে, মা বলতো ”শাড়িটা তবে যত্ন করে তুলে রেখে দিই, তুই-ই পরিস, কলেজে উঠে। দেখিস তোকেও খুব সুন্দর দেখাবে।” সত্যিই মা যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন শাড়িটা, কিন্তু সোহাগের আর পরা হয়নি কখনো। আজ বিশেষ দিনে তাই এই শাড়িটাই বার করে পরল সে। শাড়ি পরে, ভেজা চুল গুলো আঁচড়ে নিয়ে, কপালে একটা ছোট্ট টিপ পারল সে, তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে নিজেরই চিনতে অসুবিধা হল তার। এরকম নরম সরম চেহারার, শান্ত স্নিগ্ধ সোহাগকে তো সে কখনো দেখেনি। তার মধ্যে এমন একটা রূপ যে লুকানো ছিল, সে কোনোদিন জানতই না। মায়ের মত সুন্দর না হলে ও, নিজেকে এই প্রথম বেশ সুন্দর লাগল তার, এটা তবে, নিজের পক্ষ থেকে, নিজেকে জন্মদিনের উপহার! দরজায় বেলের শব্দে, তন্ময়তা কাটে সোহাগের। তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খোলে। সাহিল এসে গেছে, হাতে ফুলের তোড়া। ব্লু ডেনিমের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবিতে, ওকেও আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ভেতরে না ঢুকেই, ফুলের তোড়াটা সোহাগের দিকে বাড়িয়ে দেয় সে, ”শুভ জন্মদিন”। ”সে কি। তুমি জানলে কি করে? আমি তো কখনো বলিনি!” ”জানি না তো! শুধু অনুমান করেছিলাম। এখন তোমাকে দেখে, সিওর হলাম।” ”কি করে অনুমান করলে শুনি?” ”নেমন্তন্ন করেছ যখন, কিছু একটা ব্যাপার তো থাকবেই। বিয়ে তো করনি যে, বিবাহবার্ষিকী হবে, সুতরাং পড়ে থাকল জন্মদিন। এখন তোমাকে দেখে বুঝলাম, আমার অনুমান মিথ্যা নয়! ভীষণ সুন্দর লাগছে কিন্তু তোমাকে।” সাহিলের গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে, সোহাগের একটা হার্টবিট যেন মিস্ হয়ে যায়। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য সে তাড়াতাড়ি বলে, ”চা খাবে তো? একটু বসো, বানিয়ে আনি।” সোহাগ চা বানানোর জন্য উঠে রান্না ঘরে পা বাড়াতে ই, হঠাৎই সাহিল সোফা ছেড়ে উঠে সামনে এসে দাঁড়ায় তার, আর সোহাগ কিছু বুঝে ওঠার আগে, ওকে দু’হাতে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে। এমন একটা ঘটনার জন্য সোহাগ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে প্রথমটা বাধা দিতে চায়, চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে সাহিলের আলিঙ্গন থেকে, কিন্তু সাহিলের শক্তির কাছে হার মেনে যায়। ততক্ষণে সাহিল ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছে তার ঠোঁটে, ফলে ”ছেড়ে দাও” কথাটাও বলতে পারে না সে। কিছুক্ষণ সে চেষ্টা করে, সাহিলের কাছে আত্মসমর্পণ না করতে, নিজের সত্ত্বাকে হারিয়ে না ফেলতে, ওর হঠকারিতাকে মেনে না নিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারে না। কখন যেন আলগা হয়ে আসে তার প্রতিরোধ, আর সেও নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয় সাহিলের হাতে। একসময় আলগা হয় সাহিলের বাঁধন, নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সোহাগ, কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় ধাতস্থ হতে তারপর বলে, ”এটা কি হল সাহিল?” ”তোমার খারাপ লেগেছে?” ”খারাপ লেগেছে না ভালো লেগেছে সেটা তো পরের কথা, আগে তুমি বল, কেন এমন করলে?” সাহিল উত্তর দেয় না। সত্যি কথা বলতে, কি উত্তর দেবে এই কথার, সেটা তার জানা নেই। সে নিজেও স্পষ্ট করে জানে না, কেন এমন করল! সে আগে কোনো দিন একান্তে, কল্পনাতেও সোহাগকে আদর করার কথা ভাবে নি। কিন্তু আজ হঠাৎ করে কি যে হয়ে গেল! শাড়িতে, ভেজা খোলা চুলে, কপালের ছোট্ট টিপে, সোহাগকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল ঠিকই! কিন্তু কাউকে দেখতে সুন্দর লাগলেই, তাকে আদর করার ইচ্ছা হবে, এমন মানসিকতা তো তার নেই! কিন্তু কি যে ঘটে গেল আজ, সোহাগের চোখে চোখ পড়তেই কেমন একটা অনুভূতি হল, মনে হল সোহাগ তার ভীষণই কাছের মানুষ, তার নিজের ভালোবাসার জন, তাই সে আর পারল না ওকে কাছে টেনে নিয়ে থাকতে। কিন্তু এই অদ্ভুত অনুভূতি কি করে সে বোঝাবে এখন সোহাগকে? আর বললেই বা সে বিশ্বাস করবে কেন? ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায় সাহিল। অসহায় ভাবে তাই চুপ করে থাকে। সাহিলকে চুপ করে মুখ নীচু করে বসে থাকতে দেখে, খারাপ লাগে সোহাগের। সে এসে বসে সাহিলের পাশে, তারপর নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে, ”তুমি আমাকে ভালোবাসো?” সোহাগ আচমকা এমন প্রশ্ন করে বসবে, সাহিল ভবেনি, তাই চমকে যায় সে, খানিকটা ঘাবড়ে যায় আবারও। কারণ এই প্রশ্নটা নিয়েও আগে কোনোদিন নিজের মনে ভেবে দেখেনি সে। তেমন পরিস্থিতিও আসেনি। কিন্তু আজ হঠাৎ করে এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হল, ভালো তো সে সোহাগকে অবশ্যই বাসে, না হলে, কেনই বা তার সঙ্গে দেখা করার জন্য, তার ফোনের জন্য ভেতরে ভেতরে অপেক্ষা থাকে তার? কিন্তু সোহাগের সঙ্গে তার শ্রেণীগত বৈষম্য এতটাই বেশী যে, এই ভালোবাসার কথাটা চেতন মনকে জানাতে অবচেতন মনের ও সাহসে কুলায় নি কোনোদিন আর তাই সে কখনো এটা নিয়ে ভাবেনি। সাহিলকে চুপ থাকতে দেখে সোহাগ ভাবে তার আচরণ বোধহয় খানিকটা রূঢ় হয়ে গেছে, সাহিলের খারাপ লেগেছে। তাও সে ওর হাতের ওপর হাত রাখে, আর দ্বিতীয় বার প্রশ্নটা করে, ”উত্তর দিচ্ছ না কেন? তুমি কি ভালবাসো আমায়?” সোহাগের হাতের ছোঁয়ায় যেন ভরসা পায় সাহিল, বোঝে আর যা-ই হোক, সোহাগ রেগে যায়নি তার এই ব্যবহারে। তাই সে চোখ তোলে মাটি থেকে, আর সাহস করে সরাসরি সোহাগের চোখে চোখ রেখে বলে, ”বাসি।” ”বেশ না হয় বুঝলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো। কিন্তু তাই বলে, সব কিছুর একটা সঠিক সময় থাকবে না! তুমি ভালোবাসো আমাকে আর আমি সেটা আদৌ জানি না। আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা, তুমি জানো না! আরে বাবা, সম্পর্ক তো আগে মনের দিক থেকে এগোয়, তারপরে শরীরে যায়। কিন্তু, তুমি এটা কি করলে বল তো।” এতগুলো কথা একসাথে বলে, সোহাগ দম নেওয়ার জন্য থামে। ওর সেই বিরতিতে সাহিল তাড়াতাড়ি বলে, ”জল খাবো” উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল অনেকক্ষণ ধরেই। কিন্তু উপযুক্ত সময় পাচ্ছিল না, যখন জলটা চাওয়া যায়। তাছাড়া জল পাবে, না গলাধাক্কা, এ নিয়েও একটা দ্বন্দ্ব ছিল তার মনে। এখন সোহাগের কথায় ভরসা পেতেই, জলের কথাটা বলে ফেলে। সোহাগ জল আনে। গ্লাসটা ওর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে আবার স্মরণ করিয়ে দেয় সাহিলকে, ”আর কোনোদিন এরকম কোরো না কিন্তু।” সাহিল কোনো উত্তর দেয় না। গ্লাসটা ফেরৎ দেওয়ার সময়, সরাসরি চোখ রাখে সোহাগের চোখে। সেই চোখে সোহাগ পড়তে পারে, ওর আকুতি, যেন ও বলতে চাইছে, ”আমাকে ভুল বুঝোনা সোহাগ, আমি খারাপ মানুষ নই।” রান্নাগুলো কেমন হয়েছে, সে ব্যাপারটা নিয়ে সোহাগ একটু চিন্তায় ছিল, অনেকদিন পরে রান্না করা তো! তাছাড়া সে কেমন রান্না করে, সে ব্যাপারে তার কোনো স্বচ্ছ ধারনা নেই। কারণ বাবা, তার রান্না খেয়ে সবসময় ভালো বলতেন, সেটা যে সত্যিই ভালো না কি, নিজের মেয়ের হাতের রান্না বলে ভালো সেটা তো আর জানা নেই সোহাগের। খেতে বসে যখন সাহিল ওর প্রতিটা রান্নাই খুব তৃপ্তি করে খেল, তখন সোহাগের খুব ভালো লাগল। সাহিলের তৃপ্তি করে খাওয়া দেখে ওর ঘেমে নেয়ে রান্না করাটা সার্থক হয়েছে বলে মনে হল। সাহিলকে যত্ন করে খাওয়াতে গিয়ে ওর নিজের প্লেট বার বার ফাঁকা পড়ে থাকছিল, আর তাছাড়া রাতে এত কিছু খাবার অভ্যেস ও নেই অনেকদিন, তাই বেশী খেতেও পারেনা, কিন্তু সেটা সাহিলকে কে বোঝাবে? ওর প্লেট ফাঁকা দেখলেই, সাহিল অতিথি থেকে গৃহকর্তা হয়ে যাচ্ছিল। ”আরে তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না! নাও নাও, মাছ নাও আর একটা, মাছটা খুব ভালো রান্না হয়েছে” বলে সে নিজেই মাছ তুলে দেয় সোহাগের প্লেটে। সাহিলের বলার ধরনে, হাসি পেয়ে যায় সোহাগের, যেন কতদিন ধরে একসাথে বসে খায় তারা, তার যত্নের ভার যেন সাহিলের ওপরেই দেওয়া, এমন একটা ভাব ওর মধ্যে। কিন্তু ভালো ও লাগে খুব কারণ, মা চলে যাবার পর, তাকে এমন যত্ন করে কেউ খাওয়ায় নি এতদিন। ফিরে যাবার সময় সাহিলকে আবার বলে সোহাগ, ”তুমি যাকে ভালোবাসা ভাবছ, সেটা মোহ নয় তো? ভালো করে ভাববে, তারপর বলবে।” সাহিল সোহাগকে কাছে টেনে, কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়, তারপর বলে, ”সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি আমি, সময় দাও, নিজেই বুঝবে।” ”তুমি কতটুকু জানো আমাকে বলতো? আমার অতীত, আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি কি না, অন্য কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে কি-না, এসব কিছু না জেনে, তুমি দুম করে ভালোবেসে ফেললে আমাকে?” ”ভালো বাসার জন্য তোমার অতীত কেন জানতে হবে? বর্তমানে এটাই তো যথেষ্ট। তুমি, আমি কেউ কি অতীতে ফিরতে পারব? না কি অতীতে বাঁচব? বাঁচব তো বর্তমানে। আর তুমি যদি অন্য কাউকে ভালোবাসো, বাসবে। আমি তো তোমার কাছে কিছু দাবী করছি না। তুমি জানতে চাইলে ভালোবাসি কি না, তাই জানালাম। ব্যস মিটে গেল, সহজ ব্যাপার।” সাহিলের ‘সহজ ব্যাপার’ থতমত খাইয়ে দেয় সোহাগকে। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকে সে, সাহিলের কাছে গোটা ব্যাপারটা-ই এত সহজ! যেন এক কাপ চা, ইচ্ছে হল খেয়ে নিলাম! এমন অদ্ভুত ভাবে যে ভাবা যেতে পারে, কেউ এমন অদ্ভুত ভাবে যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে দেখতে পারে, সাহিলের সঙ্গে না দেখা হলে, তার অজানাই থেকে যেত।
ভেজা চুলের জল মিশেছে বুকের অরণ্যে কাঁধের ওপর দুটি জলবিন্দু চুম্বনের অপেক্ষায় ছুঁয়ে দিলেই নাভির জলমগ্নতায় আপাদমস্তক স্নান। স্বপ্ন তো ভেঙেই যায় একটি চাতক জেগে থাকে বৃষ্টি-দিনের কবিতায়। পঞ্চগনি থেকে ফেরার পর কয়েকটা দিন বাস্তবের মাটিতে পা রাখতে পারেনি সোহাগ। সব কিছু স্বপ্নের মত লাগছিল তার। সত্যি ঈশানের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার, সত্যি দু-দুটো দিন তারা একসাথে কাটিয়েছে এই পৃথিবীর স্থান কানের বাইরে দিয়ে, সে কথা যতবারই ভেবেছে সে, সারা শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎ তরঙ্গ। শরীরের ভেতরে যে বায়োলজিক্যাল ক্লক আছে, তা যেন উল্টোদিকে চলতে শুরু করেছে। তাই রাতে স্বপ্নের মধ্যে ঈশান যে বার বার ফিরে আসবে, এতো প্রত্যাশিতই। কাল রাতে ও এসেছিল সে, বৃষ্টির জলমাখা শরীরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল তার; মাথার অবিন্যস্ত চুল থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিল জল, সেই জল আপন করে জড়িয়ে নিয়েছিল বুকের রোমগুলিকে, ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল ঈশানকে, মনে হচ্ছিল সমুদ্র থেকে উঠে আসা কোনো গ্রীক দেবতা যেন; দু ফোঁটা বৃষ্টির জল, টলমল করছিল ওর কাঁধের ওপর, সোহাগের ভীষণ ইচ্ছা করছিল ওই জলের ফোঁটা দুটোকে ঠোঁট দিয়ে শুষে নেয়; কিন্তু ঈশানকে, ঈশানের স্বপ্ন শরীরকে ছুঁতে পারার আগেই ঘুম ভেঙে যায় তার। তাই পরদিন ডায়েরিতে কবিতায় এঁকে রাখে সেই স্বপ্নের ছবি। কিন্তু ঈশানকে এত সব কথা, তাকে নিয়ে দিবারাত্র যে সব স্বপ্ন দেখে চলেছে সোহাগ, সেই সব কথা জানানো হয় না তার। যতটা যোগাযোগ থাকলে, প্রতি মুহূর্তের অনুভবগুলোর কথা জানানো যায়, বোঝানো যায়, ততটা যোগাযোগ ঈশান রাখেনি সোহাগের সঙ্গে। সে মেল করে, স্কাইপে ও আসে, কথা বলে, কিন্তু সবটাই তার মর্জি মত, কারণ সে ভীষণ ব্যস্ত। ফলে সোহাগের মনে কথা জমতে জমতে পাহাড় হয়, আবেগ জমতে জমতে হারিয়ে যায়। পাঁচ দশদিন পর যখন যোগাযোগ হয়, তখন কোনটা ছেড়ে কোন কথাটা বলবে! অনুযোগ অভিযোগ করা সোহাগের স্বভাব নয়, কোনোদিন করেনি, এখনও করে না। বোঝানোর চেষ্টা করে নিজেকে যে, ওর কাজের প্রচন্ড চাপ, এখন আবার তার সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্বও বেড়ে গেছে, কারণ সদ্য, যমজ সন্তানের বাবা হয়েছে সে। কিন্তু, টানা দশ পনের দিন যখন কোনোরকম যোগাযোগ থাকে না, মেল করলেও উত্তর আসে না, তখন সোহাগের মন কিচ্ছু বুঝতে চায় না, ভীষণ অভিমান হয়, মনে হয়, বরাবরই ঈশানের কাছে তার গুরুত্ব কম; তার নিজের ইচ্ছা হলে কাছে টানে, আর ইচ্ছামত দূরে সরিয়ে দেয়, অথচ সোহাগ যে তার অপেক্ষাতে কেমন ছটফট করে, সেটা তো ঈশানের অজানা নয়। অভিমানে সোহাগ সংকল্প করে, আর যোগাযোগ রাখবে না সে! মেল করলে উত্তর দেবে না, স্কাইপে ডাকলে আসবে না, তার নিজেকেও তো কোনো একটা জায়গায় থিতু হতে হবে! এমন অস্থিরতা নিয়ে সে কিভাবে আর কতদিন কাটাবে? এমনভাবে চোরাবালিতে ডুবে থেকে কতদিন আর শ্বাস নিতে পারবে সে? ক্রমশঃ তো তলিয়েই যাবে! কিন্তু সংকল্পে স্থির থাকা হয়না তার, যদি পনের দিন পরেও যদি ঈশান তার মেলের রিপ্লাই করে, সে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারেনা আর, তৎক্ষণাৎ বসে যায় উত্তর লিখতে। সোহাগ যতই তার অভিমান উপুড় করে দিক না কেন চিঠিপত্রে, কিন্তু তাতে খুব একটা ভাবান্তর হয় না ঈশানের; সেবারকার মত, ‘ভুল হয়ে গেছে’, ‘আর হবে না’, এই জাতীয় কথাবার্তা বলে, সোহাগের অভিমান ভাঙ্গালেও, আবারও সেই একই কাজের পুনরাবৃত্তি করে সে কিছুদিন পরে। সোহাগ নিজেকে শাসন করে, নিজের কাজ কর্মে মন বসানোর চেষ্টা করে, কিন্তু থেকে থেকেই মনটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে তার, কাজ থামিয়ে ভাবতে বসে সে, ”যাতে যাতে ওহ মুঝে আচ্ছি নিশানি দে গয়ি উমর ভর দহরউঙ্গা অ্যায়সি কহানি দে গয়ি।” আর চোখ ছাপিয়ে, গাল ভাসিয়ে নামে তার জলের ধারা। এদিকে রিম্বিক পড়াশোনা নিয়ে ভালোরকম ব্যস্ত হয়ে পড়ায়, যাবার পর থেকে একদমই কলকাতায় আসার সময় পায়নি। সোহাগ একবার দিল্লীতে গিয়ে কয়েকদিন ওর সাথে থেকে এসেছিল, ব্যস ওই পর্যন্তই। ক্রমশ যে বাঁধন আলগা হচ্ছিল দুজনের, সেটা দুজনেই বেশ বুঝতে পারছিল। সাধারণ দাম্পত্যে, মানের বাঁধন যদি আলগা হয়, তবু আইনের বাঁধন, সমাজের বাঁধন, সেটাকে শক্ত করে বেঁধে রাখে, আলাদা হতে দেয় না; সম্পর্কটা জোড়া লেগে থাকে। হাড় ভেঙে গেলে যেমন প্লাস্টার করে, বাইরে থেকে জোড়া দিয়ে রাখা হয়, যাতে সেখানে অস্থি কলা নতুন করে তৈরী হয়ে ভাঙা হাড় জুড়ে দেয়, তেমন, আইনি বন্ধনে, বাইরে থেকে সম্পর্ক বাধা থাকলে, অনেক সময়ই সেখানে নতুন করে তৈরী হয় মনের বাঁধন, ফলে সম্পর্কটা বেঁচে ওঠে। কিন্তু রিম্বিক সোহাগের সম্পর্কে যেহেতু আইনি বন্ধন ছিল না, তাই আলগা হয়ে যাওয়া সম্পর্কের ফাঁক বোঁজানোর জন্য, নতুন করে কোনো কোষ বিভাজন হবার সুযোগ থাকল না। ভেঙে যাওয়া গাছের ডাল থেকে গজাল না কোনো নতুন শিকড় বাকড়, যা মাটিকে আঁকড়ে ধরতে পারে পুনর্বার, গাছকে দিতে পারে মাটির সঙ্গে দৃঢ় বন্ধন। রিম্বিক মেধাবী আর পরিশ্রমী ছিল, সেই সঙ্গে তার ছিল কোনো কিছু লক্ষ্য স্থির করলে, সেটা পূরণ করার জেদ। সুতরাং আই.এ.এস পরীক্ষায় সে সফল হল। ওর প্রথম পোস্টিং হল পাঞ্জাবে। সুতরাং ওর আগামী কয়েক বছরে কলকাতায় ফেরার সম্ভাবনা আর থাকলই না। সোহাগের মা বাবা বারাসাত ছেড়ে কলকাতায় ওর সঙ্গেই পাকাপাকি ভাবে থাকার জন্য চলে এলেন। রিম্বিক দিল্লী চলে যাবার পর, উমাকে আর হোস্টেলে রাখার প্রয়োজন হয়নি, উমা সোহাগের সঙ্গেই থাকছিল। ইলেভেন, টুয়েলভ এবং দুটো বছর ও সোহাগের সঙ্গে থাকায়, সোহাগের খুব সুবিধে হয়েছিল, বাইরে থেকে খাবার আনাটা বন্ধ করে দিয়েছিল ওরা। প্রস্তাবটা উমাই দিয়েছিল, বলেছিল, -”দিদি হোম সার্ভিস বন্ধ করে দাও, আমি রান্না করব, ওদের রান্না খাওয়া যায় না।” সোহাগ প্রথমটা রাজী হয়নি, ”না, না, তোকে পাকামি করতে হবে না, পড়াশোনার ক্ষতি হবে।” কিন্তু উমা নাছোড়বান্দা। ”কিচ্ছু ক্ষতি হবে না দিদি, তুমি দেখো, আমি ভালো রেজাল্ট করবই। দুজনের রান্নাতে কত আর সময় লাগবে, আমি ঠিক করে নেব। বাড়িতে এর থেকে কত বেশী কাজ করে পড়াশোনা করতাম!” সোহাগ কথা বাড়ায়নি আর। কারণ বাড়ির প্রসঙ্গে মেয়েটার মনটা যে খারাপ হয়ে যায়, সে কথা তো বুঝতে ওর অসুবিধা হয় না। সোহাগের নিজের কোনো ভাই বোন না থাকার অভাবটা মেয়েটা দু’বছরে পূরণ করে দিয়েছিল। বয়সে ছোট হলেও অনেক বেশী বুদ্ধি রাখে উমা, তাই সোহাগের খেয়ালও ভালো মত রাখত। সোহাগের মা বাবা ও উমা থাকাতে দারুণ নিশ্চিন্ত ছিলেন, দু-একবার এসে, দেখে বুঝে গেছিলেন, উমা, দিদিকে খুবই ভালোবাসে আর যত্ন করে। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উমাকে, সোহাগ জুনিয়র বেসিক ট্রেনিং এ ভর্তি করে দিল। পরীক্ষার ফল ওর ভালই হয়েছিল তাই ভর্তি হতে কোনো অসুবিধা হয়নি। সোহাগ চাইছিল, ও গ্রাজুয়েশন করুক; কিন্তু উমা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সোহাগ বোঝে, ওর ব্যস্ততার কারণ। আসলে ওর তো অনেক জবাব দেবার আছে, তাই তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা জরুরী। তাছাড়া সোহাগের উপার্জনে বেশিদিন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাতে ওর আত্মসম্মানে আঘাত লাগতে পারে। সোহাগ, উমার এই আত্মসম্মান বোধকে, প্রতিষ্ঠিত হবার প্রবল ইচ্ছাকে সম্মান করে। তাই আর আপত্তি না করে, ওকে বেসিক ট্রেনিং এ ভর্তি করে দেয়। কলেজটা ছিল আবাসিক এবং কলকাতার বাইরে, ফলে উমা হোস্টেলে চলে গেল। উমা চলে যাওয়াতে, ওর মা বাবা চলে এলেন ওর কাছে, রিম্বিক যখন থাকছেই না, তখন মেয়েকে একা রাখতে কোন বাবা মা-ই বা চান! সেই যে সোহাগ উচ্চমাধ্যমিকের পর বাড়ি ছেড়েছিল, তারপর এই প্রথম, বহু বছর বাদে, তারা তিনজন আবার একসাথে থাকার সুযোগ পাওয়াতে, সোহাগের মা দারুণ খুশী। সোহাগের বাবার শরীরটাও ভালো না থাকায় বাইরে ঘুরে পার্টির কাজ করা থেকে তাকে দল ছুটি দিয়ে ছিল। তিনি বাড়িতে বসেই লেখা পড়া করতেন। তাঁর কাছে পরামর্শ নেবার হলে দলীয় কর্মীরা তাদের বাড়িতেই আসত। যে সময়টা সোহাগের মায়ের স্বামী, কন্যা নিয়ে সংসারে করার কথা ছিল, তখন তারা দুজনেই রাজনৈতিক কাজে খুব ব্যস্ত ছিলেন। মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কখনও ঠাকুমা দিদিমা কখনও বা প্রতিবেশিনীর কাছে। ফলে তাদের তিনজনকে নিয়ে যে বৃত্তটি আঁকা এত দিন অসম্পূর্ণ হয়ে ছিল, তা এত দিনে সম্পূর্ণ হল। সোহাগ ও খুব খুশী মা, বাবাকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাছে পেয়ে। সে এখন যেন তার ছোটবেলার দিনগুলো ফিরে পেয়েছে। বাড়ি ফিরে, বাবা মায়ের সাথে বসে, মায়ের হাতের রান্না খেতে পারছে, এটা তার কাছে দারুণ আনন্দের ব্যাপার। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে বাবা মায়ের সঙ্গে গল্প করতে পারছে, ভাগ করে নিতে পারছে সারাদিনের অভিজ্ঞতা, এটা বিরাট প্রাপ্তি তার কাছে। শুধু এই সব পাওয়ার মধ্যে একটাই না পাওয়া, একটাই শূন্যতা, সেটা হল ঈশান। সে না থেকেও আছে তার সমস্তটা জুড়ে, তার অস্তিত্বের প্রতিটা বিন্দুতে মিশে আছে, অথচ বাস্তব জীবনে সে থেকেও নেই। চোখের সামনে যে তোমাকে দেখি কতটুকুই বা চিনি তার বন্ধ চোখের নিচে যে থাকে কি করে ভোলাই তাকে, এই দোলাচলে দীর্ণ থাকায় কৃপাণ দেখিনি আমি। রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার পর, চোখ বন্ধ করে, এভাবে সে একা একা কথোপকথন চালায় ঈশানের সাথে। তুমি যদি সত্যিই আমার সোলমেট হয়ে থাকো ঈশান, তবে আমার এই ভাবনার তরঙ্গ নিশ্চয়ই পৌঁছবে তোমার কাছে, তোমার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে একই রকম ভাবে রক্তক্ষরণ হবে, যেমনটা আমার হয়, হয়ে চলেছে এত বছর ধরে। একমাত্র তুমিই তো জানো ঈশান, ধর্মাধর্ম, পাপপূণ্য কোনো কিছু দেখিনি আমি, তোমাকে নিঃশেষ সমর্পণ করেছি। বিশ্বাস হারানো পাপ জেনে কখনো তোমাকে অবিশ্বাস করিনি। অথচ বার বার তুমি আমাকে ডাকো আর একলা করে দিয়ে চলে যাও। কোনো কোনো ঘুম না আসা রাতে, ঈশানের উদ্দেশ্যে নিজে ডায়েরির পাতায় লেখে সে, যে ক’টি মুহূর্ত্ত তোমাকে একান্ত ভাবে পাই পরম যত্নে তা সঞ্চয় করে রাখি তাই নিয়ে পার হয়ে যাই গ্রীষ্মের দুঃসহ দুপুর। তারও পরে থাকে শীতের দীর্ঘ রাত ঝরা পাতার মত দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যায় যত আশ্বাস পড়ে থাকে পথ অন্তহীন রাত গভীর হলে, ছায়ারা প্রলম্বিত হয় সব হারানোর ভয় বিদ্ধ করে। অনন্ত কালের ঘর বাড়ি যদি নীলামে ওঠে ভাবনাতে ঝড় ওঠে ঝড় ওঠে, ভাঙ্গে ডালপালা বৃষ্টি নামে, ভেসে যায় সুস্থিতি। সোহাগ ভেবেছিল, এমন লেখা যদিও বা কখনো দেখে, ভাববে নিছকই কবিতা লিখেছে সে, কবিতার আড়ালে থাকা সত্যটাকে খুঁজে পাবে না কেউ। কিন্তু তার এই ভাবনাতেও ভুল ছিল। বালিশের নীচে ডায়েরিটা দেখে, সোহাগের মা, বিছানা গোছানোর সময় সেটাকে যথাস্থানে তুলে রেখেছিলেন। এমনিতে ওদের বাড়িতে, কেউ কারো ব্যক্তিগত এলাকাতে প্রবেশ করে না। অন্যের ডায়েরি, চিঠিপত্র এসব কখনো পড়তে নেই, একথাটা ছোট থেকে মা-ই শিখিয়েছিলেন সোহাগকে। কিন্তু সেদিন ডায়রিটা টেবিলের ওপর রাখার পর, হাওয়াতে পাতা উল্টে, কবিতার পাতাটা বেরিয়ে পড়েছিল। ছোট থেকেই একটু একটু কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল সোহাগের, তাই তেমন কোনো কবিতা লিখেছে ভেবে, ওর মা সবটা পড়েন। যদিও সোহাগ ভেবেছিল, কবিতার মুখোশ দিয়ে ঢাকা থাকায় কেউ খবর পাবেনা তার ভেতরে থাকা জলের ফোঁটার। কিন্তু মায়ের কাছে সবকিছুই যে ধরা পড়ে যায়, সে কথাটা ও বোঝেনি। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে সোহাগ, মাকে আনমনা দেখে, ও ভাবে হয়ত বা বাবার শরীরটা আবার খারাপ হয়েছে, তাই জিজ্ঞেস করে, ”মা, বাবার শরীর কি খারাপ হয়েছে আবার?” ”নাতো, উনি ঠিকই আছেন।” ”তাহলে তুমি কি নিয়ে চিন্তায় আছ মা?” ”ঈশান কি তোর সাথে যোগাযোগ রাখে না আর?” কোনোরকম ভনিতা না করে, সরাসরি প্রশ্ন করেন তিনি। এবারে সোহাগ অপ্রস্তুত। মা যে সমস্ত কিছু বুঝতে পারবেন, এভাবে যে মায়ের কাছে ধরা পড়ে যাবে, বুঝতে পারেনি সে। যতই হোক না মা, তবু বড় হয়ে যাবার পর, আলাদা ব্যক্তিত্ব তৈরী হবার পর, মায়ের কাছ থেকেও কিছু কিছু জিনিস আড়াল করতে হয়। ঈশান যে তাকে অবহেলা করে, একথাটা মা কে কখনো বলেনি সে। আর বলবেই বা কি করে, সম্পর্কটা যে স্বাভাবিক নয়, সুতরাং তার চলনও স্বাভাবিক হবে না, এটাও সে বোঝে। তাই আজ মা সরাসরি জানতে চাওয়ায়, সে লজ্জিত হয়। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে, ”আমি অনেকবার মেল করার পর ও উত্তর দেয়। ওর মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তটা খুঁজে পাই না যেন আর।” ”আর সেই জন্যই তুই কষ্ট পাচ্ছিস, তাই তো?” সোহাগ উত্তর দেয় না। কারণ, মা তো আসল কথাটাই বলে ফেলেছেন। ”দেখ সোহাগ, মানুষের কোনো কিছু পারার একটা সীমা থাকে, আর সেটা প্রতিটা মানুষের জন্য আলাদা আলাদা। ঈশান তোকে নিশ্চয়ই ভালোবাসে, ওর ভালোবাসা নিয়ে তো সংশয় থাকা উচিত নয়। কিন্তু, তুই যেভাবে চাস সেভাবে তোর সঙ্গে ও যোগাযোগ রাখতে পারে না, আর পারবেও না। কারণ, ওর একটা সংসার আছে, সেখানে ওর একটা দায়বদ্ধতা আছে। যত দিন যাবে, সেই দায়িত্ব বাড়তেই থাকবে, আর তোর সঙ্গে যোগাযোগ আলগা হতে থাকবে, এটা তোকে মেনে নিতে হবে, আর সেইভাবে নিজের মনকে তৈরী করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পাল্টাতে হয়, অতিক্রম করে যেতে হয়, এটাই দুনিয়ার নিয়ম। তুই যদি এখন পাঁচ বছর আগেকার ঈশানকে খুঁজিস, পাবি না। ও এখন যেমন, সেটাই তো তোকে মেনে নিতে হবে। অ্যাকসেপ্টও করতে হবে। নাহলে শান্তি পাবি না।” সোহাগ চুপ করে থাকে। মায়ের কথাগুলো শুনতে ভালো লাগছিল তার। তার ক্ষতে যেন শান্তির প্রলেপ পড়ছিল। সত্যিই তো ব্যাপারটা সে এভাবে ভেবে দেখেনি আগে। মা আবার বলতে থাকেন, ”এই দ্যাখনা, ছোট বেলায় তুই যেমন ভাবে আমার কাছে কাছে থাকতিস, মা ছাড়া তোর দুনিয়ায় আর জন্য কেউ ছিলনা, এখন কি তাই আছে? আমি বাড়ি ফিরলে, তুই আমার পায়ে পায়ে চলতিস, আর ‘মা’, ‘মা’ করে অস্থির করে তুলতিস। ‘জানো মা আজ স্কুলে এই হয়েছে, অমুক আমাকে এ-ই বলেছে…’ সেইসব দিনগুলোর ছবি তো আমার চোখে ভাসে, কিন্তু তাই বলে, সেই দিনগুলো কি এখন ফিরে পাব? নাকি তোকেও সেভাবে সবসময় পাব? তোর দুনিয়াটা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, শুধু মাকে নিয়ে নেই। সেটাই স্বাভাবিক। তুই যে পাঁচ বছর হোস্টেলে ছিলিস, ভালো করে কথাই তো হতো না তোর সঙ্গে। তাই বলে কি আমি কি কখনো ভেবেছি, তুই আমাকে ভালোবাসিস না, আমার থেকে দূরে চলে গেছিস?” ”যাহ, তোমার থেকে কি করে দূরে যাবো আমি, তুমি তো আমার মা।” মাকে জড়িয়ে ধরে সোহাগ। ”আর তুই যে বলিস, ঈশান তোর সোলমেট, তাহলে ওই বা কি করে দূরে যেতে পারে?” ”আমিও এই কথাটা ভাবি, বিশ্বাস কর। কিন্তু তবু মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগে, জানো! মনে হয়, ওকে আমি পাচ্ছি না।” ”তোকে কি এইরকম অস্থিরতা মানায় মা। তুই তো কত ছোটবেলা থেকে কত পরিণত! তোর কাছ থেকে আমি, তোর বাবা, কত কি শিখেছি! তুই ভালো করে ভেবে দেখ, বাইরে থেকে কোনো কিছু কি পাই আমরা? যা বাইরে থেকে পাচ্ছি বলে মনে হয়, তা তো আসলে আমাদের ভেতরেই থাকে। ঈশানকে তুই ভালোবাসিস, সেটা তোর নিজস্ব একটা তৃপ্তির বোধ। আর ঈশানের সঙ্গে কাটানো তোর ভালো স্মৃতিগুলো, সেগুলো তো তোর সঙ্গেই আছে! ঈশান তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখুক আর না-ই রাখুক, সেগুলো তো আর তোর কাছ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না। ওইগুলোই তো তোর পাওয়া। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত্ত কি সুন্দর হয় মা? কয়েকটা মুহূর্তই সুন্দর হয় শুধু। সেইগুলো নিয়েই তো আমরা জীবন কাটাই। ঈশানের কাছ থেকে তোর কিছু ভালো অনুভূতি পাওয়ার ছিল, সেটা তো পেয়েই গেছিস, আর সেই অনুভূতিগুলো তো তোর সঙ্গেই আছে। ও যদি তোর সোলমেট হয়, তবে ওকে তোর ভেতরে, তোর আত্মাতে খুঁজবি; সেখানেই সবসময় পাবি।” মায়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে ভীষণ শান্তি পায় সোহাগ। ঠিক যেমন জ্বর হলে, মায়ের ঠান্ডা হাত জড়িয়ে ধরে মনে হত, জ্বরের কষ্ট কমে গেল, আর সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, তেমন ভাবে ভেতরটা জুড়িয়ে গেল তার। তারপর অনেকক্ষণ অন্ধকার বারান্দায় কাছাকাছি বসে রইল তারা, মা এবং মেয়ে। নিঃশব্দে বসে থাকল তারা, কিন্তু পরস্পরের ভাবনা যেন তারা বুঝতে পারছিল, দুজনের চিন্তার তরঙ্গ এক জায়গায় এসে মিশে যাওয়ায়, দুই প্রজন্মের দুই নারী উপলব্ধিতে এক জায়গায় এসে পৌঁছে গেল। বহুদিন পর নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছিল সোহাগের। যেমনভাবে, মাতৃগর্ভে থাকাকালীন, ফোঁটা ফোঁটা করে জীবনরস তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল মায়ের শরীর থেকে, আর তাকে পুষ্ট করে তুলেছিল, পূর্ণ করে তুলেছিল; সোহাগের মনে হতে লাগল, আজ এই অন্ধকার বারান্দায়, মায়ের আত্মা থেকে উৎসারিত চেতনার আলো বিন্দু বিন্দু করে তার ভেতরে সঞ্চারিত হয়ে তার মনের অন্ধকার দূর করে দিচ্ছে। খুব ভালো লাগছিল তার এমনভাবে মাকে ছুঁয়ে চুপ করে বসে থাকতে। আরও কতক্ষণ যে তারা দুটিতে এমনভাবে বসে থাকত কে জানে, যদি না বাবা এসে ডাকত; ”অনেকক্ষণ সাড়াশব্দ পাচ্ছি না তোমাদের, তাই দেখতে এলাম, কি হয়েছে? অন্ধকারে দুজনে এরকম ভুতের মত বসে আছ কেন?” ”গল্প করছিলাম তো, তাই আর আলো জ্বালাইনি। বসো, তুমিও বসো, আমি চা করে নিয়ে আসি।” সোহাগের মা উঠে রান্নাঘরের দিকে যান। তারপর, মা, বাবা মেয়ের অনেকরাত পর্যন্ত আড্ডা চলে, একেবারে নির্ভেজাল আড্ডা। সোহাগকে প্রাণখুলে হাসতে দেখে গল্প করতে দেখে, মায়ের বুক থেকে পাথর নেমে যায়। সোহাগেরও ভালো লাগে খুব, অনেকদিন পর মায়ের সামনে এমন স্বচ্ছ হয়ে যেতে পেরে, প্রাণখুলে হাসতে পেরে, মনখুলে কথা বলতে পেরে মনটা ভীষণ হালকা লাগে তার। সেই রাতে, ঘুমোতে যাবার আগে, ডায়রীর পাতায় রবীন্দ্রনাথের দুটি লাইন উদ্বৃত করে রাখে সে, আজকের উপলব্ধিটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য, ”দেখা দিল দেহের অতীত কোন সে দেহ মোর ছিন্ন করি বস্তু বাঁধন ডোর।”

