ভিক্টোরিয়ার নেকলেস
রাজশ্রী বসু অধিকারী
অপর্ণা ছাদে দাঁড়িয়েছিল রোজকার মত। এই সময়টা আকাশের রংবদল না দেখলে তার ভাল লাগে না। মনে হয় কী যেন একটা কাজ অসম্পুর্ণ রয়ে গেল। ভোরের নরম আকাশ ধীরে ধীরে ডিমের কুসুম থেকে উজ্জ্বল নীল কাঁচের থালার মত রঙ নেয়। সেজে ওঠে নতুন একঝাঁক সম্ভাবনার হিরে মুক্তোর গয়নায়।
ভারি সুন্দর এইসময়টা। শেষ রাত্রে উঠে স্নান সেরে ছাদে এসে একটু একটু করে ভোর হতে দেখা, সূর্য উঠতে দেখা আজ বহু বছরের অভ্যাস অপর্ণার। সেই যেদিন মণিশঙ্কর চলে গেলেন, আর বেলা করে ঘুমোনোর অভ্যাসটা রইল না। বলতে গেলে মাঝরাত থেকে জেগে থাকা। এপাশ ওপাশ করে কাক ডাকা মাত্রই উঠে পড়া। এ একরকম নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল।
এই সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য একটু একটু করে বিশাল ছাদে টবের বাগান করেছেন অপর্ণা। লাল বেগুনি গোলাপী নানাফুলের সমাহার তাতে। রয়েছে দুষ্প্রাপ্য কিছু অর্কিড আর পাতাবাহার। নিজে হাতে সেই গাছেদের জল খাইয়ে তবে তার দিন শুরু হয়। দুই যমজ ছেলে অরুণ আর কিরণ কতবার বারণ করেছে এত পরিশ্রম করতে। স্বামীকে হারানোর দিনটিতে তারা দুজনে মাত্র বারো বছরের ছিল। আজ তিরিশ বছর পর তাদের নিজ নিজ সংসার কর্মক্ষেত্র হয়েছে। অরুণ থাকে ভেলোর আর কিরণ বানারহাট। একজন ডাক্তার, অন্যজন বানারহাটে চা বাগান কিনেছে। সঙ্গে রয়েছে তার নিজস্ব ট্রাভেল এজেন্সি। সেই ছোট থেকে আজ পর্যন্ত তারা মাকে একইভাবে বারণ করে যায় বেশি পরিশ্রম করতে। কিন্তু এই গাছপালাগুলো যে অপর্ণার সন্তান হয়ে গেছে সেটা কাকেই বা বোঝাবেন তিনি। মনে হয় সকালবেলায় তার হাতে জল না পেলে আজ গোলাপ চোখে জল ঝড়াবে তো কাল জবা গাছ গাল ফোলাবে। তাই ছেলে বৌমাদের কথা শোনা হয় না।
রোজকার মত আজও সেই রুটিন চলছিল। ঝাঁঝড়ি হাতে জল ঢালতে ঢালতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝে মাঝে। কখনও বা দু’কলি গান গেয়ে ওঠা গলা ছেড়ে। বিয়ের পর পরই মণিশঙ্কর বৌয়ের জন্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন গানপাগল শিল্পী মানুষ। নিজের হাতে মাটির পুতুল তৈরি করতেন এমন যে কিশোরী অপর্ণার তাক লেগে যেত।
“এ তো একদম মেলায় বিক্রী হওয়া কৃষ্ণ ঠাকুরের মতই হয়েছে গো…”
বৌয়ের অবাক প্রশ্নে মণিশঙ্কর হেসে বলতেন, “এ তো আমার রক্তেই রয়েছে। কৃষ্ণনগরের ছেলে মাটি ছানতে জানবে না, পুতুল গড়তে জানবে না, তাই হয় নাকি?”
অপর্ণা সেসব দিন মনে করে আপনমনে হাসেন। হয়েছে। মণিশঙ্কর বেঁচে থাকলে দেখতে পেতেন তার দুই ছেলের কেউই মাটি ছানার ধারেকাছেও যায়নি। হয়তো ওদের রক্তের সেই অমূল্য শিল্পকির্তী ধমনীর অনেক গভীরে চাপা পড়ে গেছে যুগের হাওয়ায়।
অপর্ণা কাউকেই জোর করেননি। যে যা হতে চেয়েছে, যেখানে থাকতে চেয়েছে, সবই মেনে নিয়েছেন। এখন তার একটাই ইচ্ছে, যে ক’টা দিন আছেন, যেন নিজের সমস্ত ভাললাগাগুলোকে আগলে রেখে শান্তিতে দিন কাটে। এই বাড়িতে এসেছিলেন বিয়ে হয়ে, সে প্রায় সাতচল্লিশ বছর আগে। সতেরো বছরের মেয়ে মণিশঙ্করের হাত ধরে নেমেছিলেন গাড়ি থেকে। যখন পাড়াঘরে প্রায় বাঁজা নাম হতে বসেছে, তখন বিয়ের পাঁচ বছর পর একসাথে দুই ছেলে এলো কোল আলো করে। তারপরেও বারো বছর বেঁচে ছিলেন মণিশঙ্কর। এই বারো বছরের ইতিহাস অপর্ণার জীবনে শুধুই আলোয় আলো ভরে দিয়েছে। তাই মণিশঙ্কর চলে যাওয়ার পরেও আজও এতদিন ধরে পথ চলতে কোন অসুবিধা হয়না তার।
নিজের গাছপালা, গান, বই, কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি আর দু’চারজন অতি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে কেটে যাচ্ছে। তার ওপর ছেলে বৌমা নাতি নাতনিরা তো আছেই। যদিও তারা দূরের পাখি, বৎসরান্তে দুবার দেখা হয় কী হয় না, তবু কারো ওপর কোন অভিযোগ নেই তার। যেটুকু পান, তাতেই মন ভরে থাকে।
আজ অবশ্য সেই ভরা মনটা আরো কিছু বেশি পরিমান পূর্ণ। যেন কানায় কানায় টইটম্বুর জলপাত্র। কাল অনেক রাত্রে এসে পৌঁছেছে দুই ছেলে তাদের পরিবার নিয়ে। অরূনের এক মেয়ে। ঝিলিক। অরূনের বৌ মালাও ডাক্তার। মেয়ে সেদিকে যায়নি। সে মাইক্রোবায়োলজিতে পি এইচডি করছে ভেলোর ইউনিভার্সিটিতে। ওখানেই একটি দক্ষিণী ছেলেকে পছন্দও করেছে নিজের জন্য। তার বাবা মায়ের আপত্তি নেই। অপর্ণার তো আপত্তি করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় প্রবল বিশ্বাসী। আগামী মাসে ঝিলিকের রেজিষ্ট্রি ম্যারেজ ছেলেটির সঙ্গে। অপর্ণা আগেই জানিয়েছেন অতদূরে সংসার ফেলে যাবেন না। তাই ছেলে তার পরিবার নিয়ে মায়ের আশীর্বাদ নিতে এসেছে শুভকাজের আগে। সেইসঙ্গে খবর দিয়ে আনিয়ে নিয়েছে ভাইকেও।
কিরণের একছেলে একমেয়ে। ছেলেটি ঝিলিকের চেয়ে দুবছরের ছোট। আর মেয়ে এখনও স্কুলে পড়ে। কিরণের বৌ স্বামীকে ব্যবসায় সাহায্য করে। বলতে গেলে ট্রাভেল এজেন্সিটা নন্দাই চালায়। ছেলে বরুণ আর মেয়ে উজ্জ্বলাকে নিয়ে দুজনের সুখের সংসার। অন্তঃত অপর্ণার সেটাই মনে হয়। শুধু এবারই যেন কিরণকে একটু অন্যরকম লাগল। অতরাত্রেও সে সামান্য একটা কথায় যেভাবে নন্দাকে ঝাঁঝিয়ে উঠল, অপর্ণার কান এড়ায়নি। ভালও লাগেনি। কিন্তু ওদের নিজস্ব বৃত্তে ঢোকা উচিত হবে না ভেবে তিনি কিছুই বলেননি। কুশল বিনিময়ের পর শুতে চলে গিয়েছিলেন।
এখন গোলাপী জবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে মনে পড়ে গেল। নন্দা একটাও জবাব দেয়নি কিরণকে। শুধু স্পষ্ট করে তাকিয়ে ছিল চোখে চোখ রেখে। সেই চুপ করে তাকিয়ে থাকাটা ভেসে উঠছে আকাশের রঙ বদলানোর অপরূপ খেলার মধ্যেও।
অপর্ণার কী জিজ্ঞেস করা উচিত কিরণকে? কী হয়েছে তার? কেন অমন মাথা গরম করে ফেললো নন্দাকে? বারকয়েক ভেবেও কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না তিনি। যাকগে, সবে তো কাল এসেছে। থাকবে তো ওরা চারদিন। দেখাই যাবে সত্যিই কিরণের কিছু পরিবর্তন হয়েছে কিনা। নাকি সবটাই তার মনের ভুল।
নিজেকে সামলে হাতের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করেন অপর্ণা। জলের ঝাঁঝড়িটা রেখে দেন নির্দিষ্ট জায়গায়। আকাশের রঙ এখন নীল। বেলা বেড়ে গিয়েছে। এবার নামতে হবে। আজ বাড়ি ভর্তি। অন্যদিনের মত ঢিলেমি করলে চলবে না। অনেক কাজ।
সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই অবাক অপর্ণা। ছুটে ছুটে ওপরে আসছে তার দিনরাত্রের সঙ্গী মোহিনী। এই মেয়েটাই তাকে দেখেশুনে যত্ন আত্তি করে রাখে। রান্নার লোক থাকলেও মোহিনীর নির্দেশেই সবটা চলে।
“কী রে! এত ছুটছিস কেন? আমি তো নিচেই আসছি।”
“নিচে বড়দা ছোড়দা কোণের ঘরে দরজা বন্ধ করে ঝগড়া করছে। তুমি শিগগির এসো।”
“ঝগড়া? আমার ছেলেরা করবে ঝগড়া? ওরা তো কোনদিন জানতেই পারে নি ঝগড়া কী জিনিস।” অপর্ণা নামতে নামতে বলেন।
“সে হল গিয়ে ছোটবেলার কথা। বড় বেলায় কে কোথায় কী শিখেছে তুমি জানবে কী করে?” মোহিনী অম্লানবদনে বলে।
তা ঠিক। অপর্ণা মানতে বাধ্য হন। অরুণ আর কিরণ তার কাছে নেই সেও তো কত বছর হয়ে গেল। আর ভিডিওকলে কী চেনা জানা হয়? তখন তো মায়ের সঙ্গে ভালবেসেই কথা বলবে সবাই। তবু এতদিন পর বাড়ি এসেই দু’ভাই নিজেদের মধ্যে সাতসকালে ঝগড়া করবে একথাটা যেন বিশ্বাস হতে চায় না।
অপর্ণা এ নিয়ে আর একটা কথা না বলে নিচে নামতে থাকেন। তার আগে মোহিনীকে একদম রান্নাঘরে পাঠিয়ে দেন লুচি আর সাদা আলুর তরকারির বরাত দিয়ে। আজ তিনি নিজে তরকারি রাঁধবেন। এটা সবার প্রিয়। আর ময়দার ময়ানটাও দেখিয়ে দিতে হবে।
লম্বা বারান্দা ধরে রান্নাঘরের সিঁড়ির কাছে এগোচ্ছিলেন অপর্ণা। একদম কোণের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে তার পা থেমে যায়। কিরণ নয়, অরুণের গলা। সে শাসাচ্ছে ভাইকে, “আমিও শেষ দেখে ছাড়ব। বার বার তোকে সাবধান করেছি আমি। আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়ব। এতদিন সব মেনে নিয়েছি বলে এটা নয় যে আজকেও তোর কথাই থাকবে।”
এবার কিরনের উত্তেজিত গলা, “যা যা, তোর কী ক্ষমতা আমার জানা আছে। বৌ না থাকলে তো না খেতে পেয়ে মরতিস।” এবার অরূন জোরে হেসে ওঠে, “আরে ব্রাদার, এটা তো আমার বলার কথা। শোন আমাকে একদম ঘাঁটাস না। মা কিছু জানুক এটা আমি চাইছি না।”
“আমিও চাই না। তাই বলে তোর কথাও আমি শুনব না। এবার আমার কথাটাই থাকবে।”
এই তার দুই ছেলে? যাদের শিক্ষা দীক্ষা সদ্ভাব সম্প্রীতি নিয়ে এত গর্ব তার মনে! এইভাবে অসভ্যের মত ঝগড়া করছে তারা? ছি ছি! অপর্ণা আর দাঁড়িয়ে শুনতে পারেন না। স্বাভাবিকের চেয়েও দ্রুত নেমে আসেন রান্নাঘরের দিকে । তার মনে একটা প্রশ্নই কাঁটার খোঁচা মেরে যায়। কী নিয়ে এভাবে ঝগড়া করছে ওরা? কী এমন কথা যা তিনি জানেন না এবং দুই ছেলেই চাইছে না যে তার কানে আসুক? চাইছে না তবু নিজেদের সংযত করতে না পেরে এমন চিৎকার করে ঝগড়া করছে? ছি ছি। অপর্ণার ভোরবেলার সুন্দর মনটায় একরাশ কালি ঢেলে দেয় যেন কেউ। সাদা আলুর তরকারি করতে আর মন থাকে না।
“মোহিনী, ঠাকুরকে বলে দে কিভাবে সাদা আলুর তরকারিটা করতে হবে। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি। এখন কেউ যেন আমায় না ডাকে।” কথাগুলো বলে দিয়ে আবার দোতলার দিকে এগোন অপর্ণা। সেখানে এক বিশাল ঘর নিয়ে তার নিজস্ব পৃথিবী। সেখানে দেওয়ালজোড়া মণিশঙ্করের ছবি। সেই ছবির সামনে বসে নিজেকে শান্ত করতে হবে আগে। নইলে ভেতরের অস্থিরতা ধরা পড়ে যাবে।
“সে কী গো, দাদারা এলে তো তুমি নিজেই কর এই তরকারি…” মোহিনী হাতের কাজ রেখে কথাটা বলে তাকায়। কিন্তু অপর্ণাকে আর দেখতে পায় না। তিনি চলে গিয়েছেন নিজের ঘরে।
২
অপর্ণা নিজের ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকেন। আজকের দিনটা তার পরিকল্পনা মত শুরুই হল না। দুই ছেলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক বিনিময় তার মানসিক স্থৈর্য্যে আঘাত করছে। যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নিজের জীবনটাকে কাটিয়ে দিলেন তিনি প্রায় একা, সেখানে এসব ব্যক্তিগত সমস্যার কোন জায়গা নেই। কিন্তু আর সবকিছু বাদ দিলেও অপর্ণা মা। তার সংসার, তার সন্তান এরাও জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে। তিনি বরাবর জানেন তারা যার যার জগতে ভাল আছে সুখে আছে। নিজের সন্তানদের স্থিত দেখার পর যে প্রশান্তি, তা সমস্ত মনে প্রাণে অনুভব করার পরেই না অপর্ণা ভিন্ন জগতে বিচরণ করতে পারেন। নিজের ঘর যদি না সুস্থ থাকে তাহলে কী করে তিনি অন্য কোন বড় কাজে মনোনিবেশ করবেন!
অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকেন অপর্ণা। হাতের মোবাইলের দিকে মাঝে মাঝে তাকান। যে কলটা আসার অপেক্ষা করছেন সেটা এখনও এলো না। এই কাজটা না হওয়া পর্যন্ত বাইরেই বা যাবেন কী করে! এরমধ্যে বউমা বা নাতি নাতনি যে কেউ চলেও আসতে পারে। তাদের কী বলে সরাবেন এই ঘর থেকে! একথা তো বলা যায় না যে আমার কাজ আছে, আমায় একা ছেড়ে দাও! চৌষট্টি বছরের সম্ভ্রান্ত বিধবা গৃহবধূ অপর্ণার যে তারা ছাড়াও আরও কোন কাজ থাকতে পারে এটাই তো কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। তারা জানে অপর্ণার জীবন তার ছেলেদের নিয়ে আর এই বাড়ি নিয়ে আবর্তিত হয়। তাদের কী বলবেন অপর্ণা? এখুনি মোহিনী ডাকতে আসবে জলখাবারের জন্য। তিনি নিজের হাতে সবাইকে খেতে দেবেন, এটাই নিয়ম।
যখন অনেক ভাবনায় অপর্ণা অস্থির, ঠিক সেই সময় হাতের ফোনটা বেজে উঠল।
“হ্যালো …। টু জিরো ওয়ান স্পিকিং …”
ওপাশে নিস্তব্ধতা। একটু পরে শোনা যায় কথা।
“মীরন হিয়ার। আজকের মিটিং রাত সাড়ে বারোটায়। ওভার।”
কেটে যায় ফোন। অপর্ণা দ্রুত হাতে কলটা ডিলিট করে দেন। এই সময়টাই জানার ছিল। ভালই হয়েছে। রাত্রে সবাই যার যার ঘরে ঢুকেই পড়বে। যদি দুপুর বা সন্ধ্যে হত তাহলে অনেক সমস্যা হয়ে যেত। একা থাকেন, কোন সমস্যা হয় না। ছেলেরা এলে অ্যাডজাষ্ট করতেই হয়।
তাড়াতাড়ি মোবাইলটা বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা খুলছিলেন তিনি।
সামনেই দাঁড়িয়ে নাতনি। ঝিলিকের মুখ যেন বেশ লালচে। কোন উত্তেজনায় রয়েছে সে। দরজা খুলতেই জড়িয়ে ধরে অপর্ণাকে, “ঠামি, আই হ্যাভ সামথিং ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট টু টেল ইউ … দরজাটা বন্ধ করে দাও প্লিজ …”
“কী হল তোর? পরে শুনব সোনা, আমাকে ডাইনিংয়ে যেতে হবে। তুইও আয়…”
“না ঠামি। আগে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলবে …” ঝিলিক বার বার চেষ্টা করতে থাকে অপর্ণাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার। ঠিক একই সঙ্গে বারান্দার উল্টোদিক থেকে প্রায় দৌড়েই এসে পৌঁছায় বরুণ।
“হাই, ঠামি … গুড মর্নিং … মে আই সি ইয়োর রুম? আমি একবার দাদানের ছবিটা দেখব। বাবি বলছিল ওই ছবিটার একটা রেপ্লিকা বানাতে দেবে … আই উইল টেক আ মোবাইল শট জাষ্ট …”
“তোকে এখুনি আসতে হবে? যা নিচে যা, আমি ঠামির সঙ্গে কথা বলছি অ্যান্ড ইটস প্রাইভেট।” ঝিলিক ঝাঁঝিয়ে বলে। কিন্তু রাগে না। বরং যেন মজা পেয়েছে এইভাবে বলে, “নো ও ও মাই ডিয়ার সিস্টার, ঠামি ইজ নট ওনলি ইয়োর ঠামি, মাইন ট্যু উ উ। আমি এখুনি ঠামির রুমে যাব।”
এরা ভাইবোনেরা কেন অকারণ বিসম্বাদ করছে? অপর্ণার কপালে কোঁচ ধরে। কেউ তাকে অন্যজনের সঙ্গে একা ছাড়তে চাইছে না। আঁচল থেকে চাবির গোছা নিয়ে দরজার পাল্লাদুটো টেনে তালাবন্ধ করে দেন তিনি।
“এখন কেউই এ’ঘরে আসবে না। আগে খেতে হবে। চলো।” তিনি ঝিলিক আর বরুণের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকেন। তারপর নিচের দিকে নামতে থাকেন। মনের মধ্যে বেশ খচখচানি লেগে থাকে। ভাইবোনের মধ্যে তার ঘরে ঢোকার জন্য এই রেষারেষি কেন? আগে তো এমনটা দেখেননি কখনও! ঠাকুমার ঘরে নাতি নাতনিরা আসবে এর মধ্যে এমনিতে কোন বিশেষত্ত্ব নেই। কিন্তু ওদের মধ্যে যেন সূক্ষ্ম কোন প্রতিযোগিতা চলছে, কে আগে ঢুকতে পারে ওই ঘরে। এটা ঠিক মুখে বলা যাবে না, শুধু অনুভব করার। কিন্তু যে কথাটা কাউকেই বোঝানো যাবে না, তা হল তিনিও আর আগের মত নেই। তার ঘরেও আর উপায় নেই কাউকেই যখন তখন প্রবেশে অনুমতি দেওয়ার। অপর্ণা কাউকেই সেসব কথা বুঝতে দেবেন না। মাত্র তো চারটে দিন ওরা থাকবে। কেটেই যাবে।
“এস, তোমরা দুজনেই আমার সঙ্গে এস। টেবিল রেডি…”
“ঠামি, কখন তুমি আমার সঙ্গে একটু বসতে পারবে বলো তো?” পেছনে পেছনে প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলে ঝিলিক। অপর্ণা কিছু বলার আগেই বরুণ হুমড়ি খেয়ে পরে, “নো ঠামি, তুমি একা দিভাইকে নেবে না। আমাকেও ডেকে নেবে। বল, প্রমিস?”
অপর্ণার ঠোঁটের কোণে ভেসে যায় টুকরো হাসি। ঠিক যেন মনে হয় বাচ্চা অরুণ আর কিরণ নিজেদের মধ্যে মায়ের ভাগ নিয়ে মারামারি করছে।
সকলের পাতে পাতে মোহিনী তার নির্দেশে খাবার তুলে দিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে বরুণ ঝিলিককেও বসে পড়তে ইশারা করেন অপর্ণা। ওদের বাবা জ্যাঠা মায়েরা সবাই চলেই এসেছে। সবচেয়ে লক্ষ্মী হল কিরণের ছোট মেয়েটা। সে হাতের বইয়ে চোখ রেখে মুখে ঢুকিয়ে যাচ্ছে লুচির টুকরো। অপর্ণা তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নেন অরুণ কিরণ দুজনে শান্ত হয়ে খেয়ে যাচ্ছে। মনেই হবে না তাদের মধ্যে সকালবেলায় ঝগড়া হয়েছে কোন। নন্দা অপর্ণাকে দেখে হাসিমুখে তাকায়, “মা আপনিও খেয়ে নিন। তারপর আমরা একটু বসতে চাই আপনার সাথে।”
“হ্যাঁ আমিও তোমাদের সবার সঙ্গে একবার বসব। কিছু কথা আছে আমার।” অপর্ণা নিজের প্লেট টেনে নিয়ে বলেন।
“সময় কী সব পালিয়ে যাচ্ছে? আছি তো কয়েকটা দিন। আজ বরং একটু শহরটা ঘুরে আসি।” বরুণ বলে।
“না। আগে মায়ের সঙ্গে কথা হবে, তারপর আর সব।” কঠিন গলায় বলে ওঠে কিরণ। অপর্ণার মনে পড়ে যায় ভোরবেলায় কিরণের গলার আওয়াজ। এই ছেলেকে চেনা হয়নি তার এত বছরেও। তার কিরণ এতখানি বয়সেও নরম সুন্দর গলায় কথা বলে।
“হ্যাঁ আমিও সেটাই চাইছি। তোমাদের কার কী বলার আছে সেটা নিয়েই আগে বসব। ব্রেকফাষ্ট শেষ করো। চা কফি খাও। তারপর নিচের হলে সবাই চলে এসো।” অপর্ণা তার মতামত জানিয়ে দেন। কিরণ আবার কঠিন সেই স্বরে বলে ওঠে, “কেন? হলে কেন? আমরা তোমার বেডরুমে বসতে চাই।”
অপর্ণা সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নেন। সবারই একই মত। তাদের মুখের ভাষা তাই বলছে।
“না। আমার বেডরুমে আমি বসতে চাই না। তোমরা এসো। আমি হলে থাকব।”
নিজের প্লেট নামিয়ে রেখে আস্তে সুস্থে উঠে চলে যান তিনি।
৩
হলঘরটাও বিশাল। মোটা মোটা থামের ওপর রয়েছে গোটা দোতলা বাড়িটা। ঢোকার মুখে গেট থেকে বনেদী সব পরিবাবের সখ অনুযায়ী বাগান অনেকটা অংশ জুড়ে। মাঝখানের মোড়ামের রাস্তা এসে উঠেছে মার্বেলের লম্বা বারান্দায়। সোজা ঢুকেই বড় গোল হলঘর। তার পর সারি সারি ঘরগুলোর মধ্যে দুটো কী তিনটেই মাত্র খোলা হয়। প্রয়োজনে লাগে না এখন আর। মণিশঙ্করের আমল পর্যন্ত বহু অতিথি অভ্যাগতের আসা যাওয়া লেগেই থাকত। ব্যবসার কাজে তাকেও যেতে হত নানা জায়গায়। তখনও তরুণী অপর্ণা। এই হলের অর্ধেক দেওয়াল জোড়া বইয়ের আলমারিগুলো, নানা মাপের চেনা অচেনা সব বাদ্যযন্ত্র তাকে টানত অমোঘ টানে। নিচে আসা বারণ ছিল সাধারণভাবে। কিন্তু দুপুরবেলায় সমস্ত কাজের অবসরে অপর্ণা কতদিন এই হলঘরে এসেছেন, গদি আঁটা সোফায় লুটিয়ে পড়ে বই পড়েছেন। আজও যখনই এখানে ঢোকেন সেই সব দিন মনে পড়ে যায়। মাঝখানের সোফাটায় বসে ছেলেদের অপেক্ষা করেন অপর্ণা। এরা এত দেরি করছে কেন কে জানে! এরপর দুপুরের রান্নার তদারকি রয়েছে। বাড়িভর্তি লোকজন, এলে যেমন আনন্দ তেমন কাজও তো। ভাবতে ভাবতেই একসঙ্গে সকলে এসে পড়ে। দুই ছেলে দুই বৌমা, নাতনি ঝিলিক আর নাতি বরুণ। শুধু ছোট নাতনি আসেনি। তার গা গরম হয়েছে। গল্পের বই নিয়ে বিছানায়।
অপর্ণা সবার দিকে একবার তাকিয়ে নেন। তিনি কথা শুরু করবেন, তার আগেই অরুণ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, “আমার একটা কথা ছিল। আমি আগে বলে নিলে সুবিধা হয়।”
কিরণ যেন এই কথাটারই অপেক্ষা করছিল। সে যেন জানত অরুণ এমন কিছু বলবে, সজোরে মাথা নেড়ে বলে, “তাহলে তো আমাকেও বলতে হবে এবং আমি চাইব আমার কথাটাই আগে হোক।” “থামো! “তীব্র স্বরে অপর্ণা দুই ছেলেকে থামান। তারা মায়ের এমন আওয়াজ বহুকাল শোনেনি।
“আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি যে তোমরা সাধারণ শিক্ষা সহবত সব ভুলে বসে আছো। গতবছরও এমন ছিলে না তো তোমরা? পারিবারিক মিটিংয়ে সবসময় বয়োঃজ্যেষ্ঠ আগে বলবেন, এই তো এবাড়ির নিয়ম। আমার কথাই তোমরা আগে শুনবে। তারপর উচিত মনে করলে আমি তোমাদের কথা শুনব কিংবা শুনব না।”
মাকে রেগে যেতে দেখে দু’ভাই একসাথেই চুপ করে গেছে। অপর্ণা এবার তার বক্তব্য শুরু করতে যাবেন এমনসময় দরজার কাছে উঁকি মারে উজ্জ্বলা, “ঠামি, আমি আসব?”
“ওমা তুমি যে শুয়ে আছ শুনলাম? এসো এসো …” অপর্ণা দু’হাত বাড়িয়ে ছোট নাতনিকে নিয়ে বসান নিজের পাশে।
“কেউ ওপরে নেই, আমার তাই ভাল লাগল না। আমি পেছনের সিঁড়ি দিয়ে বাগানের দিকে চলে গেলাম ঘুরতে। আচ্ছা, ঠামি … সামনের দিকে রাণী ভিক্টোরিয়ার একটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা মূর্তি দেখতে পেলাম? ওটা কে বানিয়েছিল?”
অপর্ণার দু’চোখ বুজে আসে স্মৃতিভারে। যেন দেখতে পান কিশোরি সদ্য বিবাহিতা তিনি প্রশ্ন করছেন যুবক মণিশঙ্করকে। এই একই প্রশ্ন। মৃদু হেসে বলেন, “ওই মূর্তিটা বানিয়েছিলেন তোমাদের দাদুর দাদু স্বর্গীয় রমণীশঙ্কর চ্যাটার্জী। তিনি ছিলেন মহারানি ভিক্টোরিয়ার খুবই প্রিয়পাত্র।”
“উনি কী নিজের চোখে দেখেছিলেন মহারানি ভিক্টোরিয়াকে?”
“না। উনি ছিলেন একজন চিকিৎসক। ওঁর হাতের ওষুধে বহু ইংরেজ সেরে উঠেছিল নানা রোগ থেকে। বিশেষত ভারতীয় জলহাওয়ায় প্রথমেই যারা শয্যা নিত তাদের জন্য উনি ছিলেন ধন্বন্তরি। লোকমুখে তার নাম গিয়ে পৌঁছেছিল সাগর পার হয়ে মহারাণীর কানে। এমনকী মহারানি ওঁর বিয়েতে উপহারও পাঠিয়েছিলেন শুনেছি।”
এবার কিরণ তীব্র শ্লেষের সঙ্গে বলে ওঠে, “শুধু শুনেছো? চোখে দেখনি? কিন্তু আমরা যে আরও অনেক কিছু শুনেছি মা। বাবা যখন চলে যান আমরা তো নেহাত শিশু ছিলাম না …”
অপর্ণা অবাক হয়ে শুনছিলেন তার আদরের ছোটছেলে কিরণের কথা। এত রুক্ষ্ম সে কবে হয়ে গেল? এমন করে তো কখনও কথা বলেনি সে। ব্যথার ছায়া নামা চোখে হাওয়ায় দুলতে থাকা পুরনো দিনের ঝাড় লন্ঠনের দিকে তাকান তিনি। তারপর আপ্রাণ চেষ্টায় স্বাভাবিক হয়ে বলেন,
“হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো তুমি। আমি দেখেওছি সেই উপহার। সে এক মণি মুক্তোখচিত বহুমূল্য নেকলেস। ফুলশয্যায় ঢোকার আগে আমার শাশুড়ি মা সেটা আমায় পড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এই হল ভিক্টোরিয়ার নেকলেস। এটা আমাদের পরিবারের সম্মান। একে সাবধানে রেখো। কিন্তু, কিন্তু …” মাথা নিচু করে কপালে হাত দিয়ে অপর্ণা মাঝপথে থেমে যান।
“কিন্তু কী মা? থামলে কেন? বল? একসঙ্গে ঘরের সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে অপর্ণার ওপরে। শুধু ছোট নাতনি উজ্জ্বলা চুপ করে বসে আছে ঠামির দিকে তাকিয়ে। ঝিলিকের মুখে আশাভঙ্গের বেদনা। বরুণ অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছে ঠামির দিকে।
অরুণ, কিরণ, মালা, নন্দা, ঝিলিক, সবাই অপর্ণাকে ঘিরে আছে। সবার মুখেই প্রশ্ন।
“আমি আমার শাশুড়ির কথা বজায় রাখতে পারিনি। ঐ নেকলেস চুরি হয়ে গিয়েছে।”
“কী? কবে? কখন? কই আমরা তো জানি না?”
এতজন মানুষের নানারকম গলায় হাজার প্রশ্ন এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে অপর্ণার ওপরে। অরুণ অত্যন্ত উত্তেজিত ভাবে উঠে পায়চারি করতে থাকে সারাঘরে। নন্দা আর মালা নিজেদের মধ্যে নিচুগলায় কিছু বলাবলি করে। বরুণ চোখ কপাল কুঁচকে কেমন এক অদ্ভুত চোখে চেয়ে আছে ঠামির দিকে। ওই নেকলেস নিয়ে যে রিলটা সে বানিয়ে এবার ইউ টিউবে ছাড়বে বলে ভেবে এসেছিল সব প্ল্যানে জল পড়ে গেল। ঝিলিকের মুখে কেউ যেন একপোচ কালি ঢেলে দিয়েছে। বিয়ের আগে এত দূর থেকে এত খরচ করে এতগুলো দিন এখানে এসে নষ্ট করার একটাই অর্থ ছিল তার কাছে। অন্তত মা বাপি সেরকমই বলে রেখেছিল। ঠামি বিয়েতে যাবে না। তাই বিয়ের আশীর্বাদীটা এবারেই দিয়ে দেবে। ঐ নেকলেসের এত গল্প শুনেছে সে ছোট থেকে যে ঠামির কাছে ওটাই চেয়ে নেবে ভেবে রেখেছিল। এখন মনে হচ্ছে বিয়ের আগে এতটা সময় নষ্ট করে এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে না এলেও চলত। এমনিতেও ঝিলিকের বেঙ্গল একদম ভাল লাগে না। সাউথে থেকে থেকে ওদিকটাই বেশি আপন হয়ে গেছে।
অপর্ণা সকলের মুখের দিকে পর্যায়ক্রমে তাকিয়ে দেখছিলেন। একটা গয়না চুরির ঘটনায় সবাই এমন বিচলিত হয়ে পড়বে এটা তার মধ্যে যুগপৎ আনন্দ ও দুঃখের জন্ম দিচ্ছিল। আনন্দ এইজন্য যে তার নিজের মানুষেরা সবাই তারই মত এই পরিবারের একটা বহুমূল্য ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলার বেদনায় কাতর। তার মানে তারাও ভালবাসে চ্যাটার্জী পরিবারের সম্মানজনক অতীতকে। তাদের সবার কাছেই অতীত গরিমার মূল্য আছে। আর দুঃখ এইজন্য যে, একটা গয়না হারিয়ে তারা এমন করছে যেন সামনে বসে থাকা মানুষটার আর কোন মূল্যই নেই। অপর্ণা যে সশরীরে এখনও তাদের মধ্যেই আছেন সুস্থ সবল হয়ে, তার কাছে যে গয়না বা সম্পত্তি কিছুই লাগে না, এই ভাবনাটা তাদের মধ্যে এলো না।
হঠাৎ, কিরণ একলাফে উঠে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ায়, বেশ চিৎকার করে সে বলে ওঠে, “শোন মা, ছোটবেলা থেকে তোমার অনেক চালাকি দেখে দেখে বড় হয়েছি আমরা। নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে বাবা একটা একটা করে তার সমস্ত সম্পত্তির সিংহভাগ তোমার নামে করেছেন। তারপর উইলে তো তোমার নামেই সব রেখে গেছেন জানা গেল। এবার কিন্তু আর কোন গল্প আমি শুনছি না। ঐ ভিক্টোরিয়ার নেকলেস আমার চাই। আজকেই আমায় ওটা দিয়ে দেবে তুমি।”
অপর্ণা স্তম্ভিত! কিভাবে কথা বলছে কিরণ? তিনি চালাকি করে নিজের নামে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছেন মণিশংকরের কাছ থেকে? একথা শোনার আগে তো মৃত্যু ভাল ছিল! আর ঐ নেকলেস! ওটার ওপরেই চোখ কিরণের! ঐজন্যই সে এত দুর্ব্যবহার করে চলেছে এসে অবধি!”
অরুণ অতটা রূঢ় ভাবে না হলেও বেশ বিরক্ত হয়েই বলে ওঠে, “ভেবেছিলাম, ওই নেকলেসটা তুমি বড় নাতনি হিসেবে ঝিলিককেই আশীর্বাদি দেবে। ওইজন্যই আরও ছুটি নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে করে এলাম এখানে। কিন্তু এখন তো দেখছি …”
ওই গয়নাটা না থাকলে কী আমায় তোমার মেয়ের বিয়েতে যেতে বলতে না নাকি আমার আশির্বাদের প্রয়োজন ছিলনা তোমাদের?” অপর্ণা অবাক গলায় বলেন।
বড় বৌমা সহজে কথা বলে না সচরাচর। এখন সেও মুখ খোলে, “কিন্তু মা, এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, আপনি আমাদের একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না? কেন মা?”
“কী করতে তোমরা? দু’বছর আগে আমার বাই পাস সার্জারির সময়ে কে কে এসেছিলে তোমরা? দু’ঘন্টার আকাশপথ, কেউ তো এসে পৌঁছোতে পারনি। কাজের লোকেদের ফোন করে দায় সেরেছো। আমার বাড়িতে চুরি গেলে আমি তোমাদের তারপরেও বিরক্ত করব?”
নন্দা উঠে দাঁড়ায়। “আমি ওপরে যাচ্ছি” বলে সে চলেই যাচ্ছিল। অপর্ণা তাকে থামান। “তোমাদের কথা আছে বলছিলে সে তো শোনা হল না …”
“নেকলেসটাই তো নেই। আর কী বলব! ওটাই আমাদের ইচ্ছে ছিল এবার নিয়ে যাওয়ার” প্রায় একসঙ্গেই বলে কিরণ আর নন্দা।
“অরুণ? মালা? তোমাদের কোন কথা নেই?”
“আমরাও চেয়েছিলাম ঐ নেকলেসটাই। যদি ঝিলিকের বিয়ে উপলক্ষ্যে ওটা পাওয়া যায় তাহলে …, এরকমই ভাবনা নিয়ে এসেছিলাম এবার। আগেও অনেকবার ভেবেছি কিন্তু বলে উঠতে পারিনি।” অরুণ বলে। অপর্ণা এবার শব্দ করে হেসে ওঠেন, “বাহ, চমৎকার! তাহলে মাকে দেখতে কেউ আসনি তোমরা! …”
“না না তা কেন …” মালা আপত্তি করে মৃদু গলায়।
“থাক বড় বৌমা। আমার যা বোঝার তা বুঝেছি। ঝিলিক আমার বড় নাতনি। ওর বিয়েতে তোমাদের প্রয়োজন থাক না থাক আমি তো আশীর্বাদ করবই। ঐ ভিক্টোরিয়ার নেকলেস ছাড়াও আরও বহু গয়নাই এখনও আছে আমার তোমরা হয়তো জান। আমি ঝিলিকের জন্য গয়না বেছে রেখেছি। কাল নিয়ে নেবে। আর উজ্জ্বলার জন্যও যা রেখেছি সেটাও এবারেই দিয়ে দেব। বিয়ে যখন হবে তখন হবে। বরুণকেও গয়নার সমপরিমান সম্পত্তি আমি লিখে দেব। উকিলবাবু সব তৈরি করেই রেখেছেন। শুধু সইটা বাকি আছে। আশা করি তোমাদের আর কিছু জানার নেই! বলারও নেই! এবার আমি ওপরে চললাম।”
“ঠামি তুমি খাবে না? ওপরে মানে তোমার বাগানে? আমাকে নিয়ে চলো …” উজ্জ্বলা বলে।
এই নাতনি তার ছোট্ট একটা প্রশ্নে অপর্ণার চোখে জলের পর্দা টেনে দেয়। কিন্তু অপর্ণাও মণিশংকর চাটুজ্জ্যের স্ত্রী। কাঁদেন না তিনি কারূর সামনে। উজ্জ্বলার মাথাটা ধরে একটূ আদর করে দেন, “খাব বাবু, তোমরা খেয়ে নাও। মোহিনী দিদিকে আমি সব বুঝিয়ে দিচ্ছি। তারপর আমার ঘরে ঢুকব। আমায় ডেকো না কেউ। কাজ আছে আমার”
“এতখানি বয়সে কী এমন কাজ মা তোমার? আমরা কেউ তোমার ঘরে ঢুকতে পারব না, কবে কখন এমন দামি জিনিসটা হারালো জানতেই পারলাম না, পুলিশে খবর দেওয়া হল কিনা কিছুই বললে না, এমন লুকোচুরি কিসের জন্য? এবার তো আমার নানারকম সন্দেহ হচ্ছে।” তীব্র ভঙ্গিতে কিরণ এমন সব কথা বলে ওঠে যা সে নিজেও হয়তো কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে মাকে বলবে। কিন্তু হাতের ছোঁড়া তির তো ফেরত আসে না। বলতে যখন শুরু করেছে থামতে পারে না সে। অরুণ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তাকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে তা চোখ এড়ায় নি অপর্ণাদেবীর। বস্তুতঃ তিনি বেশ বুঝতে পারছেন, তার আপনজনেরা আজ থেকে আর আপন রইল না।
কোনদিনই কী ছিল? সে প্রশ্ন এখন বাতুলতা মাত্র। এত এত নীচ কথার চাষ হয়ে যাওয়ার পর আর মন আগের জায়গায় থাকে না। অপর্ণা ধীরে সুস্থে উঠে পড়েন তার সোফা থেকে।
“প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরই তোমাদের জানার অধিকার রয়েছে। আমি হয়তো তা বলতামও। কিন্তু এই মুহূর্তে কথা বলতে আর রুচি হচ্ছে না। কিছু সময় লাগবে। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি, তোমাদের বাবার উইলটার কথা। বৌমারা দেখেনি, কিন্তু অরুণ, কিরণ তোমরা দুজনেই দেখেছো সেই উইলের বয়ান। অতএব আর নতুন করে জানাচ্ছি না। আমিও একটা উইল করব বলেই ভেবেছি। সেটাও তোমাদের কাছে যথাসময়ে চলে যাবে। শুধু বলব, তোমরা নিজেদের মধ্যে যতই ঝগড়া কর, তাতে লাভ হবে না কিছু। বরং সদ্ভাব রেখে চলাই ভাল। আমাদের দেশে কখনও কোন ঝগড়ার ফলই শেষপর্যন্ত ভাল হয়নি। সবারই মনে রাখা দরকার, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল।”
অপর্ণা ধীর পায়ে উঠে চলে যান তার ঘরের দিকে।
কিরণ দুহাত উলটে দাঁড়িয়ে থাকে। মা শেষের দিকে কী কী বলে গেল একবর্ণও তার মাথায় ঢোকেনি। কারুর মাথাতেই কী ঢুকেছে?
৪
মালা গালে হাত দিয়ে বসেছিল। কিরণ খুব রাগ রাগ মুখ করে উঠে বাগানের দিকে চলে গেল। নন্দা বোধহয় ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করতে গেল। বরুণ কাঁধের দুদিকে হাত ছড়িয়ে নাথিং ডুয়িং মার্কা মুখ করে বেরিয়ে চলে গেল। ঝিলিক কী যে ভাবছে বোঝা যাচ্ছে না। সে তার ফিঁয়াসে কে এই ঐতিহাসিক নেকলেসের অনেক গল্প বলেছিল। তার মনে আশাও ছিল এটা ঠামি তাকেই দেবে। এখন কীভাবে সেখানে মুখ দেখাবে সেই চিন্তাতেই হয়তো সে ব্যকুল। চলে গেল ঘরের বাইরে । মালা ফাঁকা ঘর পেয়ে অরুনের পাশে এসে বসে। তারপর হঠাৎ বলে ওঠে,
“ব্যাপারটা তোমার কেমন সন্দেহজনক লাগছে না?”
“কোন ব্যাপারটা?”
“আহ, এই যে চুরির কথাটা মা বলে গেলেন। এতবড় একটা জিনিস চুরি হয়ে গেল আর আমরা কিছুই জানলাম না? আমাদের একবার বলবেন না? থানা পুলিশ হল কিনা, কাউকে ধরপাকড় হল কিনা … এগুলো তো জানা দরকার। তোমরা দু’ভাই মাকে চেপে ধর। তাহলে যদি উনি বলেন।”
অরুণ দুদিকে মাথা নাড়ায়, “মাকে আমরা চিনি মালা। খুব ছোট থেকেই দেখছি, মা একটাও এক্সট্রা কথা বলার মানুষ নন। যদি ওগুলো জানানোর থাকত তাহলে নিজেই বলতেন। তাছাড়া বাবা ঠাকুর্দা যে বিশাল সম্পত্তি রেখে গেছেন সে সবই মায়ের নামে। আমরা যখন খুব ছোট, মাকে দেখেছি ধীর স্থির ভাবে সবটা তদারকি করতে। সাধারণ বাড়ির মহিলাদের মত মাকে কখনওই ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। আমাদের সবচেয়ে সেরাটা দিয়ে মা বড় করেছেন, কত আত্মীয় পরিজন এবাড়িতে থেকে জীবন কাটিয়েছে। এখনও মা অন্তত পনেরোটি ছেলের ভরণ পোষণ পড়াশোনা করিয়ে থাকেন। এই মা কখনও অকারণে কিছু বলতে পারেন না।”
অরুনের কথাগুলো শুনতে শুনতে মালা বিরক্ত হয়। এই এক দোষ অরুণের। নিজে যখন তখন মায়ের ওপর রেগে যাবে, নানা কথা বলবে। কিন্তু মালা একটা কথা বলতে এলেই মায়ের গুণের গান গাইতে শুরু করবে। অসহ্য! ওর মাথায় এটা ঢুকছে না যে চুরির কথাটা মা ওদের কাছে চেপে গেলেন কেন! সপ্তাহে তিনদিন ভিডিওকল হয় দুই ছেলের সঙ্গে পালা করে। তাতে বাড়ির কাজের লোকজন থেকে শুরু করে পাড়ার শহরের প্রতিটি কথা মা জানান তাদের। আর যে নেকলেসের দাম কয়েক কোটি টাকা, যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম সেটা খোওয়া গেল আর মা কিছুই জানালেন না? কবে হল চুরিটা সেটা পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না।
কিন্তু অরুণকে কিছু বলেই আর কোন কাজ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তার চেয়ে দেওরকে যদি বুঝিয়ে কিছু করানো যায়। মনে মনে মতলব আঁটে মালা। অবশ্য কিরণকে খুব কিছু বোঝানোর দরকার হবে বলে মনে হয় না। সে এমনিতেই রেগে টং হয়ে আছে। একটাই সমস্যা, দাদার সঙ্গে ঝগড়া করে সে বৌদিকেও বিপক্ষের বলেই ভাবছে হয়তো।
যদি নেকলেসটা পাওয়াও যায় তাহলেও তো আরেকটা বিবাদ শুরু হবে। ওই নেকলেস নিয়ে দুই ভাই, দুই বৌ, নাতি নাতনি সবার সমান আগ্রহ রয়েছে। সবাই ওটা পেতে চাইবে। আরেক অশান্তি শুরু হবে। এমনিতেই অশান্তির আঁচ বাড়িময় ছড়িয়ে পড়েছে। নাহ, মালা অনেক ভেবেও কোন কূলকিনারা পায় না, ঠিক কী করলে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। সবথেকে তার বিরক্ত লাগে শাশুড়ির ওপর। এতখানি বয়স হল অথচ প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী হয়ে সবটা আগলে আছেন উনি। এই বয়সে মানুষ ঠাকুর দেবতার নাম করে, বিষয় সম্পত্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। কোথায় দুই ছেলেকে সবকিছু সমান ভাগ বাটোয়ারা করে নিজে ছুটি নেবেন, তা না সবার মুখের সামনে খুড়োর কল ঝুলিয়ে রেখেছেন। কী? না, উইল করব। উইল মানে তো সবাইকেই ওঁর মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে হবে। আর এখনও এমন নিপাট সুস্বাস্থ্যের অধিকারী অপর্ণাদেবী যে কোন না বিশ বছর এমন কাটবে। ডাক্তার মালা বসে বসে কী কী উপায়ে মানুষকে তাড়াতাড়ি নিকেশ করা যায় হাতে কোন কালি না লাগিয়ে, সেই চিন্তা করতে থাকে। তারপর চমকে উঠে দরজার দিকে তাকায়।
মোহিনী সবাইকে খাওয়ার জন্য ডাকতে এসেছে। ভাগ্যিস, মনের চিন্তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না! মধুঢালা গলায় মালা বলে ওঠে, “মা খেয়েছেন মোহিনী? তাকেও ডেকেছ তো? আমরা আসছি।”
“উনি আজ জল উপোসে থাকবেন। আগেই বলে দিয়েছেন। তোমরা চলে এসো, বৌদি।”
জল উপোস? সেটা আবার কী? নন্দা বাইরে থেকে আসছিল। কথাটা কানে যেতে প্রশ্ন করে।
“মানে হল সারাদিন শুধু জলের ওপর থাকবেন। আর কিচ্ছু না। রাত দুটোর সময় একগ্লাস দুধ খাবেন শুধু।” মোহিনী চলে যায় উত্তর দিয়ে। এরপর যদি প্রশ্ন হয় কেন এমন করবেন অপর্ণা, তার কোন জবাব তার কাছে নেই। আজ শুক্রবার। সে এবাড়ীতে আসা অবধি দেখছে প্রতি শুক্রবার অপর্ণা জল ছাড়া কিছু খান না। সকালে সামান্য জলখাবার, তারপর গ্লাস গ্লাস জল। কী, কেন, এইসব প্রশ্ন তাকে করা যায় না। অপর্ণা যতটা সাধারণ ততটাই অসাধারণ। মোহিনী ভালবাসে এই মানুষটাকে।
নন্দা আর মালা নিজেদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ওল্টায়। অরুণ সেই থেকে গুম হয়ে বসে আছে। কিরণ বাগানে বাগানে ঘুরছিল। মুখ লাল করে ঢুকে দাদার সামনে গিয়ে হাত নেড়ে বলে ওঠে, “যা বুঝছি, এবার একটা হেস্তনেস্ত না করে ফেরা যাবে না। কবে কোন উইল হবে সেজন্য কী আমরা হাত তুলে বসে থাকব? আমাদের বাবার সম্পত্তিতে আমাদের কিছু অধিকার আছে তো নাকি?”
নন্দা পরিষ্কার মনের মেয়ে। সে বরকে থামানোর চেষ্টা করে।
“ভুলে যেও না, প্রতি মাসে তোমরা দু’ভাই এক লাখ টাকা করে পাও মায়ের কাছ থেকে। এতদিনে সেটা কত হয়েছে হিসেব কর। অবশ্য যদি তা থেকে থাকে। উড়িয়ে দিলে রাজার ধনও কিছু না।”
“কী বলতে চাইছো তুমি? এক লাখ? মাত্র এক লাখ? কী হয় তাতে? আমার ব্যবসার মূলধন, বানারহাটের রাজার মত বাংলো, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, চারখানা গাড়ি, ড্রাইভার, পাঁচটা কাজের লোক, এতকিছু ওই একলাখে? ফুঃ …”
“শোন কিরণ, মিছিমিছি মাকে দোষ দিও না। তোমাকে আমি তো কোনদিন বলিনি এত বিলাসিতার জীবন চাই? অনেক কমে খুশি থাকতে জানি আমি। আর ব্যবসা? আমি হাল না ধরলে তার কী অবস্থা হত সবাই জানে। একটা কথা মনে রাখবে, মা কিন্তু ওই এক লাখ টাকাও না দিতে পারতেন। আইনতঃ এখনও সবকিছুই ওনার নামে।”
“তাই বলে ভিক্টোরিয়ার নেকলেসটা চুরি হয়ে গেল আর আমাদের জানানো হবে না? “কিরণ অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে দুমাস করে টেবিলে একটা ঘুষি মেরে বিকট চিৎকার করে ওঠে।
এই প্রতিক্রিয়া ভাবেনি নন্দা। সে চমকে উঠে দাঁড়ায়, “ছি ছি, এই তুমি চ্যাটার্জী বাড়ির ছেলে? আমি আজই চলে যাব।”
বেড়িয়ে যায় নন্দা। নিচে সবাইকে রেখে ওপরে চলে এসেছিলেন অপর্ণা। মনটা তার আঘাতে আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে আছে। কিন্তু কাউকে তা বুঝতে দেওয়ার মানুষ তিনি নন। ছেলেরা যখন যখনই তাদের পরিবার নিয়ে এসেছে, সেই দিনগুলো অপর্ণার শুকনো ডালে সবুজ পাতা হয়ে ঘিরে থেকেছে। এবারও অনেক ভাললাগা নিয়ে তাদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সারা কৃষ্ণনগর বহরমপুরের বাজার খুঁজে যে যা খেতে ভালবাসে সেই সমস্ত জিনিসের আয়োজন রেখেছেন। নিজে তিনি স্বল্পাহারি হলেও ছেলেদের পরিবারের জন্য প্রায় রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করিয়েছেন ফোনে ফোনে বা লোক পাঠিয়ে।
আজ সকালবেলায় ঘুম থেকে ওঠার পর মনটা আনন্দে ভরে ছিল। কিন্তু তারপরেই একের পর এক ছন্দপতন তাকে অনেকটাই দুমড়ে দিয়েছে। আর এখন নিচে যা সব কথা হল তাতে মনের ভেতরটা কাঁটাবনের মত হয়ে আছে। এখন অনেক সময় লাগবে সবটা হজম করে আবার স্বাভাবিক হতে। সেই বিয়ে করে আসার দিন থেকে আজও পর্যন্ত তার সকল দুঃখ সুখের একমাত্র আশ্রয় এই ঘরখানা। যে ঘর মণিশংকরের জীবদ্দশায় কখনও তার চোখে জল দেখেনি। এই ঘর ভরে থাকত ভালবাসায়, হৃদয়ের উষ্ণতায়, জ্ঞানের আলোয়, গানের সুরে। এই চোদ্দ বাই চোদ্দ বিশাল মার্বেল বসানো ঘরখানা অপর্ণার নিজস্ব জগত। এর বাইরে কোথাও গিয়ে শান্তি নেই তার। আজ যে বিশেষ পথে পা রেখেছেন তারও তো সাক্ষী এই নীরব দেওয়ালগুলোই।
ওরা সবাই এই ঘরে আসতে চায়। চায় এইখানে আসর জমাতে। কিন্তু অপর্ণা এইখানে স্বার্থপর কিছুটা। কাউকেই এখানে ঢুকতে দিতে চান না তিনি। যতদিন অরুণ কিরণ ছোট ছিল, তাদের জড়িয়ে এই বিশাল রাজকীয় খাটে শুয়েছেন। কিন্তু কিছু বড় হতেই ওদের বিচ্ছিন্ন করেছেন নিজের থেকে। মণিশংকর হাসতেন। তিনি জানতেন তার আদরের অপর্ণা কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বামীর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত সে জীবনভোর এই ঘরের মধ্যে থেকে একান্তে উপভোগ করতে চায়। তারপর তো সেইদিনগুলো আর রইল না। মণিশংকর নিজেই চলে গেলেন।
কিন্তু এখানে দেওয়ালজোড়া তার এক বিশাল প্রতিকৃতি রয়েছে। এখনও অপর্ণার যত বিশ্রম্ভালাপ সেই ছবির মানুষটার সঙ্গেই। যত দুঃখ আনন্দ সব তিনি এখনও ভাগ করে নেন মণিশংকরের সঙ্গেই।
একটু আগে নিচে একদম স্পষ্ট হয়ে গেল ছেলেদের এবার আসার উদ্দেশ্য। ওদের সবার নজর ঐ ভিক্টোরিয়ার নেকলেসের দিকে। একটা গয়নার জন্য ওরা কী তীব্রভাষায় আক্রমণ করল মাকে, যে মা ছোট থেকে এখনও পর্যন্ত ওদের সমস্ত সুখ সুবিধার দিকে তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে রেখেছে। ওরা ভাবল না যে অপর্ণাই এই সমস্ত সম্পত্তির মালিক। তাকে কোনভাবেই চার্জ করা যায় না। ওরা এইটুকু ভরসা রাখতে পারল না যে মা যা করবে ওদের সবার ভালর কথা চিন্তা করেই করবে। মণিশংকরের ছবির দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন অপর্ণা। সমস্ত কথা মনে মনে উজার করে দেন ঠিক যেমন দিতেন তার জীবিত সময়ে। আর ছবিতে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে অপর্ণা যেন সেই স্পর্শ অনুভব করেন মাথার ওপর, ঠিক যেমনভাবে মণিশংকর তাকে আদর করে মন ভাল করে দিতেন।
“তুমি বলে দাও আমি কী করব? তুমি তো জান আজ রাত বারোটায় মিটিং কল করেছে ওরা। আমি কী বলব ওদের? তোমার ছেলে বৌমা নাতি নাতনি তাদেরই বা কী বলব? তুমি তো জান আমি মিথ্যার বোঝা বইতে পারি না। বল, কী করব আমি! সামান্য চুরির কথা শুনেই তো ওরা এভাবে রিয়্যাক্ট করছে, এরপর কিভাবে আমি ওদের এক ছাতার তলায় রাখব? ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতা হবে? মাকে সবাই শত্রু ভাববে? এত আদর যত্নে বড় করা সন্তানেরা মাকে তাদের চরম শত্রু ভাববে? সেই ভাবনার বোঝা নিয়ে আমি তো মরেও শান্তি পাব না …”
অপর্ণা অনেক কেঁদে অনেক চোখের জল ফেলে একসময় শান্ত হন। ছবির মণিশংকর তখনও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি হাসছেন। সেই হাসি থেকে নিজের কর্তব্য বুঝে নেন অপর্ণা।
অনেকক্ষণ সময় পার করে যখন অপর্ণা ভাবছেন এবার ঘর থেকে বাইরে যাবেন, তার মোবাইলে ভেসে ওঠে চেনা নম্বর।
“হ্যালো …টু জিরো ওয়ান হিয়ার। কী ব্যাপার মীরন? এখন কল করছো?”
“ম্যাডাম, স্যর প্ল্যান একটু চেঞ্জ করেছেন। রাতের মিটিংটা সন্ধ্যেবেলায় হবে। বাই ইভনিং সিক্স থার্টি আপনাকে চলে আসতে হবে হাই ওয়ের কাছে সিস্টার্স হাট ধাবার সামনে। কালো গাড়ি থাকবে, নাইন নাইন নাইন ফোর। ওটাতে উঠতে হবে। আফটার হাফ আন আওয়ার ইউ ইউল বী ব্যাক।”
অপর্ণা কিছু বলার আগেই কেটে যায় ফোন। কী মুশকিল হল! ওঁর জিজ্ঞাস্য ছিল যে কিছু! প্রশ্ন ছিল। সে তো জানাই হল না। অপর্ণা চিন্তিত মুখে ফোন অফ করে দরজা খোলেন।
বেলা প্রায় দেড়টা। ওরা সব খেতে বসল কিনা কে জানে। নিজের ঘরে চাবি দিয়ে সাদা ধপধপে ধনেখালির আঁচলে চাবির গোছাটা বেঁধে ঝনাৎ করে সেটা কাঁধের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দেন তিনি। পা বাড়ান নিচের দিকে। সারা বাড়ি খাসির ঝোলের গন্ধে ম ম করছে। এই নতুন ঠাকুরটা রাঁধে বড় ভাল। অরুণ কিরণ এই ঝোল বড় ভালবাসে। চট করে চিন্তাটা মাথায় এসে গেলেও পাশাপাশি মনে পড়ে যায় একটু আগের দেখা দুই ছেলের মুখগুলো। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস গিলে ফেলে নিচে নামেন অপর্ণা।
পায়ে পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ান। বিশাল ডাইনিং এরিয়ায় বিরাট বড় পাথরের খাওয়ার টেবিল। সেগুন কাঠের নিখুঁত কারুকাজ করা চেয়ার। একসঙ্গে দশজন বসতে পারে। সবই মণি শংকরের আমলের শৌখীন জিনিসপত্র। বছরে একবারও এখানে পুরো পরিবার বসে কী বসে না। আজ তাই খুবই আনন্দে খাওয়াদাওয়া হবে ভেবে রেখেছিলেন অপর্ণা, কিন্তু সেই আনন্দের সম্ভাবনা ছেলেরা ভেঙ্গে দিয়েছে হলঘরের মিটিং-এ।
এখন সবাই বসে আছে অসন্তুষ্ট গম্ভীর মুখ নিয়ে। অপর্ণা কাউকেই কিছু বলেন না। শুধু মোহিনীকে ডেকে বলেন কারূর কিছু লাগবে কিনা ভাল করে দেখেশুনে দিতে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছোট নাতনি উজ্জ্বলার মাথায় হাত বুলিয়ে অন্যদিকে চলে যান তিনি। লক্ষ্য করেছেন ছেলেরা তার দিকে একবার তাকালোও না। বৌমারা কাষ্ঠহাসি দিয়ে দায় সারলো। ঝিলিক তো ইলিশমাছের কাঁটা বাছতে এতই ব্যস্ত যে ঠামিকে বোধহয় দেখতেই পায়নি। বরুণ হাপুস হুপুস করে খাসির মাংস দিয়ে ভাত মেখে সাপটে নিয়ে খাচ্ছে। যেন একটু ধীরে খেলে কেউ ওর থেকে কেড়ে নিয়ে নেবে। শুধু উজ্জ্বলা তাকে দেখামাত্রই খাওয়া থামিয়ে ঠামিইইই বলে বাঁ হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ওকে একটু আদর করে তাই বাগানে চলে এসেছেন তিনি।
অদ্ভুত লাগছে ভাবলে। এরাই তার আপনজন? এদের জন্যই সারাজীবন এতরকম চিন্তা ভাবনা করে গেলেন তিনি? ছি ছি। সামান্য একটা নেকলেস চুরি হয়েছে বলায় তার এই প্রতিক্রিয়া? যদি এদের নাই জানিয়ে থাকেন তাতে হয়েছেটা কী? এমন তো নয় যে এখানকার সমস্ত খবর তিনি সারাক্ষণ ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করেন? জমিজমা বিষয় সংক্রান্ত ক’টা খবরই বা ওরা জানে? দু’খানা মামলা যে চলছে গত সাত বছর ধরে সেও তো কেন, কী বৃত্তান্ত কিছুই বলতে পারবে না। তিনি তো প্রথমদিকে জানিয়েছিলেন সবটাই। একবার তো ভুলেও নিজের থেকে জিজ্ঞেস করে না মামলা কতটা এগোল। এতগুলো দিন দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে বৌমারা তো তিনি যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট ছিল। কেউ জিজ্ঞেস করেনি আরও কী কী গয়না আছে শাশুড়িমায়ের। অবশ্য তিনি দিয়েওছেন দুই বৌমাকে গা ভরিয়ে। নাতনিদের জন্যও সেরকমই রেখেছেন। এমনকি যে নাতবৌ আসার এখনও কোন গল্পই নেই তার কথা কল্পনা করেও গয়না রেখেছেন অপর্ণা। হতে পারে মণিশংকর ভালবেসে সমস্ত সম্পত্তি স্ত্রীকে দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু অপর্ণা তো নিজেকেই একা ঈশ্বর ভাবেননি কোনদিন। যা করেছেন সবটাতেই ছেলেদের সমান সমান ভাগ রেখেছেন। সে ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট হোক, শেয়ারের কাগজপত্র হোক বা কোন জমি বাড়ি কেনা বেচা হোক। ছেলেদের বলতে গেলে তারা তো কোনদিন মাথা ঘামায়নি এসব নিয়ে। কিন্তু তিনি সবকিছুই সমান তিন ভাগে করেছেন। আর নিজের যা কিছু তার জন্য উইলের খসড়াটুকুও করে রেখেছেন। এত কথা কিছুই ছেলেরা ভাল করে খুঁটিয়ে শুনতে চায়নি কোনদিন। তিনি ওদের বলতে গেলেও ওরা সবটা মায়ের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছে। আজ একটা নেকলেসকে কেন্দ্র করে তারা মায়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার করল! বাগানের শেষমাথায় বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে অপর্ণা চেষ্টা করেন অন্যদিকে মন দিতে। কিন্তু বারেবারেই অরুণ কিরণের রুক্ষ্ম গলার আওয়াজ ভেসে ভেসে উঠে বুকের ভেতরটাকে ভেঙ্গে দিতে থাকে। কতক্ষণ তিনি ঘাটের ধারে বসে আছেন, কেউ একবার ডাকতে এলো না তার কাছে। শুধু চারপাশের আম কাঁঠাল জবা সন্ধ্যামালতিদের দল দুলে দুলে গায়ে বুলিয়ে দিতে চাইছে সহানুভূতির স্পর্শ। ভেঙ্গে পড়া অপর্ণাদেবীকে মানায় না। সে অভ্যাসও তার নেই। মন শক্ত করে ড্রাইভার সমরকে রিং করেন,
“হ্যাঁ মাসিমা …বলুন।”
“গাড়ি রেডি রাখো। আমি সাড়ে পাঁচটায় বের হব।”
সমরের বাচনভঙ্গি মনে শান্তির প্রলেপ দেয়। বড় ভদ্র সভ্য এই গরীব শিক্ষিত ছেলেটি। সে জানে কোন কৌতূহল ও প্রশ্নবিহীন ভাবে আদেশ পালনের ধারা। খুঁজে পেতে গ্রাম থেকে ছেলেটিকে এনে কলেজে পড়িয়ে ড্রাইভিং চালানো শিখিয়েছিলেন অপর্ণাই। তাকে কোন ব্যবসা শুরুর জন্য অর্থসাহায্যও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমর সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে সেই সাহায্য। বিনিময়ে চেয়ে নিয়েছে অপর্ণার সারথির দায়িত্ব। এখানেই থাকে। গাড়ি চালিয়ে যা পায় সে, তার নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার তাতেই সুখে থাকে।
অপর্ণা আবার ভাবতে বসেন, এই যে কোনদিন সমর জিজ্ঞেসমাত্র করে না কোথায় যাচ্ছেন তিনি, এক একদিন এক একসময়ে তিনি বাইরে যান, তার জন্যও কোন জিজ্ঞাসা থাকেনা সমরের, এটা কী একটু আশ্চর্য্য নয়! কিন্তু সে ভাবনা স্থায়ী হয় না। তার আগেই মোহিনী ছুটতে ছুটতে আসে।
“মাসি, তুমি এখানে! আর দেখো গিয়ে …”
“ধীরে ধীরে বল। হাঁপাস না। কী দেখব?”
“বড়দা ছোড়দা বৌদিরা সব্বাই তোমার দরজার বাইরে জটলা করছে।”
অপর্ণা হাসেন, “বেশ তো, করুক না। বাড়ি কী আমার একার? ওদেরও তো বাড়ি। ওরা একটু ঘুরে ফিরে দেখবে না?”
“না গো, সবাই বলছে তুমি যখন দরজা খুলবে সব্বাই একসঙ্গে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়বে । ভেতরে নাকি কী সব আছে …”
“হ্যাঁ আছেই তো। ভেতরে তোর মেশোমশাই আছে । ওরা তো বাইরে দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঢুকে পড়ার কী আছে? আমাকে বললেই আমি ডেকে নেব সবাইকে। তবে, এখন না, এখন তুই আমার একটা কাজ করে দে তো …”
“কী গো? সবার খাওয়া হয়ে গেছে। সব গুছিয়ে তুলে দিয়েছি।”
“আঃ শোন, রান্নাঘরের একদম ভেতরে একটা ছোট আলমারি আছে না? ওর ভেতরে একটা কালো শাল আছে। নিয়ে আয়। আর আমার একখানা পাম্প শ্যু, হাতে তুলে আনবি।
মোহিনীরও গুণ আছে। কোনও প্রশ্ন করে না সেও। বুঝতেই পারে মাসি এইখান থেকেই কোথাও যাবে। অনেকসময়েই যায়। চুপচাপ ভেতরে চলে যায় মোহিনী।
অপর্ণা মনে মনে হাসেন। কোমড়ের কাছে হাত দিয়ে অনুভব করেন সেই পরম বস্তুখানার। ভিক্টোরিয়ার নেকলেস। কোমর থেকে তাকে বের করে এনে গলায় পড়ে ফেলেন। আজ একবার গলায় না পড়াটা দাতাকে অসম্মান করা হবে। শাশুড়ি মা সবসময় বলতেন কুড়িখানা অন্য নেকলেস পড়লেও এটা খুলবে না কখনও। আজ গলায় একটাও অন্য কিছু নেই। শুধু অতিসুন্দর মণিমুক্তোখচিত এই ভিক্টোরিয়ার নেকলেসটাই জ্বলজ্বল করছে। আজ একবার এটা না পড়লে চলত না। এটা সারাক্ষণ তার গলায় না হলেও তার শরীরের মধ্যেই থাকে, যেদিন থেকে মণিশংকর চলে গেলেন। এই নেকলেস ছুঁয়ে থাকার অর্থ হল মণিশংকরের সপ্রেম স্পর্শ তাকে ছুঁয়ে থাকা। আজ সেই স্পর্শটা শেষবারের মত প্রাণ মন শরীর ভরে নিয়ে নিতে চান অপর্ণা। শাড়ির আঁচল দিয়ে ভাল করে কাঁধ গলা জড়িয়ে ঢেকে নেন নেকলেসটা। না, কেউ দেখতে পাবে না, শুধু তিনি জানবেন সে আছে। না, তার মনে কোন ক্ষোভ নেই। ছেলেদের এই যে বললেন নেকলেস চুরি হয়ে গিয়েছে তাতেও কোন অপরাধবোধ নেই। এই যে আর কিছুক্ষণ পর থেকে সত্যিই এই নেকলেস আর তাকে ছুঁয়ে থাকবে না তাতেও কোন দুঃখবোধ নেই। দেশের দশের ভালর জন্য আপন স্বার্থ ত্যাগ করতে হয় একথা তো তাকে মণিশংকরই পাখিপড়া করে শিখিয়ে গেছেন। মনকে দৃঢ়তা দিয়ে ঢেকে নেন অপর্ণা।
একটাই আফশোষ তার। শুধু যদি ছেলেদের সবটা খুলে বলতে পারতেন! বলতেন যদি তারা তার মনের মত হত। বহুবার ভেবেও ছিলেন যে বলবেন সব খুলে। কিন্তু তার সমস্ত কথা শোনার উপযুক্ত যে তারা হয়নি সে তো আজ সকালেই প্রমান হয়ে গিয়েছে। এত ক্ষুদ্র স্বার্থে যাদের মন ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে তাদের কাছে নিজের কোন মূল্যবান চিন্তার ভাগ দিতে চান না অপর্ণা।
বাড়িতেও ধোপদুরস্ত দামি ধনেখালির তাঁত পড়ে থাকা অপর্ণার চিরকালের অভ্যাস, তাই কাপড় আর বদলানোর দরকার পড়ছে না। মোহিনী চলে এসেছে শাল আর পাম্প শ্যু নিয়ে। সেগুলো যথাযথভাবে পরে নিয়ে সমরকে গাড়িটা বাগানের ধারে বড় রাস্তায় আনতে বলে দেন।
গাড়িটা যখন নিস্তারপুর গ্রামের রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে তখন একটা কথা ভেবেই খারাপ লাগে অপর্ণার। ছেলে বৌমাগুলো হয়তো এখনও তার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় বারান্দার ওপরেই ভিড় করে আছে।
তিনি যেহেতু ঐ ঘরটা নিয়ে একটু বেশি পজেসিভ, সবসময়েই তালা বন্ধ করে রাখেন ঘরটা, তাদের তাই ধারণা জন্মেছে ঐ ঘরেই হয়তো লুকানো আছে মণিশংকরের লুকানো মণিমানিক্যের স্তুপ। হায় রে! কোনটা যে আসল ধন সম্পত্তি সেই পরিচয়টাই তিনি দিয়ে উঠতে পারেননি ওদের। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে মা হিসেবে তো তিনি ব্যর্থ। ওপারে যাওয়ার পর মণিশংকর কী তাকে ক্ষমা করবেন?
নানা সম্ভব অসম্ভব চিন্তা আসে মনের আকাশে। তারই মধ্যে থেকে থেকে মনে হতে থাকে, আহারে! গুরু ভোজনের পর একটু গড়িয়ে না নিলে অরুণ কিরণ দুজনেরই চলে না। ওরা কী এখনও ঐ ঘরের সামনে তার জন্যই অপেক্ষা করছে! যাই ঘটে যাক, যতই দুর্ব্যবহার করুক ওরা, তার মায়ের মনকে কিভাবে ওদের থেকে বিমুখ করবেন! খারাপ লাগতে থাকে অপর্ণার। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যাবে নিশ্চয়ই। কতক্ষণ পাহারা দেবে ওরা ঘরের বাইরে? তিনি কী একটা ফোন করে জানিয়ে দেবেন যে রাত হবে তার? নাকি রাতেরবেলা একটা মিটিং ডেকে সবটা খুলে বলে দেবেন? তারপর ওদের হাতে তুলে দেবেন উইলের খসড়া? ফাইনাল সই করে দেবেন দু একদিনের মধ্যে? কিন্তু এই নেকলেসের মালিকানা যে অপর্ণার, অপর্ণা যে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই নেকলেস সম্পর্কে, তা কী মেনে নেবে ওরা?
রাস্তায় হাম্প ছিল। গাড়ি একটু জাম্প করে যায়। সেইসঙ্গে ছিঁড়ে যায় অপর্ণার চিন্তা। একটু গড়িয়ে গিয়ে থেমে যায় গাড়িটা।
৫
“কী হল সমর? গাড়ি থামালে যে? সিস্টার্স হাট তো আসেনি … কিছুটা দেরিও হয়ে গেছে আমার। থামলে চলবে না।”
“পেছনে কেউ ফলো করছে মাসিমা …”
“ফলো করছে? কী বলছো? আমাকে কেউ কেন ফলো করবে? তুমি থেমো না, জোরে চালাও” অপর্ণা দেবী কথা বলতে বলতে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকান। সত্যিই একটা কালো রঙ এর গাড়ি আসছে। এই গ্রামে এরকম গাড়ি তো কারো আছে বলে জানেন না তিনি। একটু অবাক লাগে। অবশ্য আজকাল হাতে পয়সা পেলেই তো লোকে আগে একখানা গাড়ি কিনে ফেলে। তাছাড়া ব্যাঙ্কগুলোও লোন দেওয়ার জন্য বসেই আছে। হবে কারুর।
“সমর, এটা কী আমাদের গ্রামের কারুর গাড়ি?”
“এই গাড়িটা দুদিন আমি বাজারে দেখেছি মাসিমা। ভেতরে যারা ছিল তাদের চিনি না। আজ আমি গেটের কাছ থেকেই দেখছি পিছু নিয়েছে।”
“বেশ। তুমি সাইড করে দাঁড়াও তো, দেখি ওরা কী করে।”
“সেটা কী ঠিক হবে?”
“যা বলছি তাই কর।”
সমর সাইড রোডে নামিয়ে দেয় গাড়ি। কালো গাড়িটা এভাবে সাইড পাবে ভাবেনি বোধহয়। বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ওটাও দাঁড়িয়ে যায়। অপর্ণা বোঝেন সত্যিই ওই গাড়িটা তাদেরই ফলো করছিল। এখন উপায় কী হবে? তিনি দ্রূত মাথা খাটাতে শুরূ করেন। পেটের কাছে শক্ত ঠান্ডা ধাতব বস্তুটা একবার হাত দিয়ে স্পর্শ করেন। এটা মাসখানেক আগে দিয়ে গিয়েছিল একটি ছেলে। কখনো ভাবেননি ব্যবহার করতে হবে। তার যা কাজ তাতে খুন খারাপির মত ভয়ঙ্করের স্থান নেই। কিন্তু মীরনের আদেশ ছিল ওটা যেন কাছে রেখে দেওয়া হয় আর বিশেষ কোন কারণে বাইরে যাওয়ার আদেশ এলে যেন সঙ্গে রাখা হয়। সেই কথা মনে করে আজ নিয়ে এসেছেন।
দুজন লোক ওই গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে এদিকেই। রাস্তাটা একদম ফাঁকা। একটা খালি ভ্যান রিকশ চলে গেল একটু আগে। দুপাশে লম্বা লম্বা গাছের সারি। অপর্ণা ভেবে পান না ঠিক কী করা উচিত। তাকে সিস্টারস হাট ধাবার কাছে গিয়ে গাড়ি বদল করতে বলা হয়েছে। সেই জায়গাটা কৃষ্ণনগর বাসস্ট্যান্ডের প্রায় কাছাকাছি। এত আগে থেকে এখানেই তিনি আটকে পড়লেন! হাতের মোবাইল দেখে একটু অস্থির লাগে তাঁর। সন্ধ্যা নামছে। ওরা ভাববে না তো যে তিনি কথা রাখলেন না! শেষমুহূর্তে তিনি সরে দাঁড়ালেন এমন যদি ভাবা হয় তবে সেটা বড় অসম্মানের হবে তার পক্ষে।
“সমর, লোকদুটো এদিকেই আসছে দেখেছো?”
সমর স্থির নির্বিকার হয়ে বসে থাকে। উদাস গলায় বলে, “তাই তো দেখছি।”
লোকগুলো যখন একহাতের মধ্যে এসে পড়েছে, অপর্ণা বলেন, “সমর, তুমি আর দাঁড়িয়ে থেকো না। স্পিডে বেরিয়ে যাও।”
সমর নড়ে না। “কী হল? সমর? স্টার্ট দাও।”
“তা হয় না মাসিমা। ওরা কিছু বলতে চায় …”
“ওরা বলতে চায় আর আমি সেসব শুনবো বসে বসে? আমার নিজের কাজ নেই? স্টার্ট দাও …” অপর্ণা কিছুটা ধমকে ওঠেন।
এবার সমর ড্রাইভিং সিট ছেড়ে নিচে নেমে লোকদুটোর দিকে এগিয়ে যায়। কিছু কথা বলছে ওরা মাত্র দুহাত দূরে দাঁড়িয়ে। অপর্ণা অবাক। সমর তার কথা না শুনে এইসব অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলছে? এ কী? কী চাইছে এরা! অপর্ণা শাড়ির আঁচল ভাল করে গলায় পেঁচিয়ে নেন। এতক্ষণে তাঁর মনে সন্দেহ জাগছে সমরের ওপরে। কিন্তু সেই সন্দেহ দানা বাঁধতেও পারছে না। বহুদিন হল ছেলেটি রয়েছে তাঁর কাছে। কখনও বেচাল দেখেননি।
সমর ঐ দুজন লোকের সঙ্গে গাড়ির কাছে এগিয়ে আসে। দরজা খুলে একজন মাথা ভেতরে এগিয়ে দেয়। সমর পাশেই দাঁড়ানো।
“কী চাইছো তোমরা? টাকা? আমার কাছে কোন টাকা নেই। যেতে দাও আমাকে।” অপর্ণা শক্ত গলায় বলেন। কিন্তু তার সমস্ত সাহস একধাক্কায় ধ্বসে যায় যখন সমরের দিকে তাকিয়ে দেখেন। তার হাতে একটা ত্রিফলা ছুরি চকচক করছে। সেটা নাড়তে নাড়তে সে ঠান্ডা উদাস গলায় বলছে,
“মাসিমা, আপনার বয়স হয়েছে, কেন শুধু শুধু নিজেকে ঝামেলায় জড়াবেন? আপনার নুন খেলাম এতদিন। গায়ে হাত দেব না। গয়নাটা নিজেই খুলে দিন।”
“সমর? তুমি? তার মানে …”
“হ্যাঁ মাসিমা। আমি সমর, আমিই আপনার মীরণ। যে আপনাকে ফোন করে সব আদেশ নির্দেশগুলো দিয়েছে এতদিন।”
“তাহলে তোমাদের উদ্দেশ্যটাও এমনি মিথ্যে? সব মিথ্যে বলে গেছ এতদিন আমাকে? যত মেইল আমি পেয়েছি দলের, যত মানুষ তাদের সমস্ত দামি জিনিস উজার করে দিয়েছে বলে জানিয়েছো সব মিথ্যে?”
“না, পুরোটা মিথ্যে হলে আমাদের চলবে কি করে? ওই যে গয়নাগুলো মহিলারা দিয়েছেন সেগুলো সব সত্যি। ইস্টার্ন জোনে আপনার এই নেকলেসটাই বাকি আছে শুধু। এগুলো যে আমাদের দেওয়া হল এটা তো সত্যি। কিন্তু…বাকিটা এক অসম্ভব গল্প। তা কোনদিনও সত্যি হবে না।”
“তোমরা ভারতবর্ষের কোহিনূর হিরে ইংল্যান্ড থেকে এই গয়নাগুলোর বিনিময়ে ফেরত আনবে না? এতদিন যা যা বলা হয়েছে সব মিথ্যে কথা?”
সমর হাসে, “দূর দূর …ইংল্যান্ড গভর্নমেন্টের দায় পড়েছে লুটের মাল ফেরত দিতে । আপনি এত বুদ্ধি রাখেন আর এটুকু বুঝতে পারলেন না? হাজার গয়নার বিনিময়েও কোনদিনই ওই কোহিনূর হিরে ভারতে ফিরবে না। আর কোনও এক্সচেঞ্জ যদি করতেই হয় সেটা এক সরকারি ব্যপার। বাইরের আমজনতার কারূর কথা এখানে চলবে কেন!”
সমর এত কথা বলছে দেখে দুজন লোকই বিরক্ত হয়ে উঠেছে। তাদের হাতেও খুব বেশি সময় নেই। এই বয়স্ক মানুষের সঙ্গে এত কথা বলার কী আছে? একধাক্কায় গা থেকে নেকলেসটা সার্চ করে নিয়ে চলে গেলেই তো হয়। তারপর যতক্ষণে উনি লোক ডাকবেন বা থানায় যাবেন, তারা ততক্ষণে কলকাতার কাছে পৌঁছে যাবে। ব্যস, সেখান থেকে মাঝরাত্রের ফ্লাইটে আরো অনেক দূর পগাড়পার।
সেইমতোই এগিয়ে আসছিল একটি লোক। সে ওপাশের দরজাটা খুলে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অপর্ণার গলার কাছে। আর ঠিক তখনিই শান্ত শিষ্ট সমর কোন যাদুমন্ত্রে লাফিয়ে গিয়ে পড়ল লোকটির ওপর। তাকে ক্যারাটের প্যাচে একদম মাটিতে ফেলে দিয়ে হিস হিস করে বলে উঠল,
“তোমায় বললাম না ওনাকে স্পর্শ না করতে!”
“আরে দূর, তোমার খবরদারি কে শুনছে এখন, আগে মালটা হাতাই …” লোকটি আবারও আস্ফালন করে মাটি থেকে উঠতে যায়। এবার সমর হাতের ত্রিফলাটা সোজা চালিয়ে দেয় লোকটার বাম কাঁধের ওপর দিয়ে। রক্ত দেখে আঁতকে ওঠেন অপর্ণা। এবার অন্য লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়েছে সমরের ওপরে ।
অপর্ণা চিৎকার করে ওঠেন, “কেন মারামারি করছো তোমরা! আমাকে মেরে ফেলো, আমার প্রাণ যাক তবু তোমরা নিজেরা মারামারি কোরো না।”
অপর্ণার চিৎকারে কান দেয় না কেউ। সমর আর দুনম্বর লোকটা মারামারি করতে করতে খালের জলে গিয়ে পড়ল ঝপাং করে। পুরোপুরি অন্ধকার নেমে এসেছে। অপর্ণা গলা থেকে নেকলেসটা খুলে একটা গাছের গুঁড়ির দিকে ঘাসের ওপর ছুঁড়ে মারেন। তারপর নিজে গাড়ি থেকে নেমে লুকিয়ে পড়েন অন্ধকারে বুনো ঝোপঝাড়ের আড়ালে।
যে লোকটার ছুরি লেগেছিল সে বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। আর একজন সমরের সঙ্গে পচা ডোবায় পরেও মারামারি করেই চলেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে জল থেকে ওঠা ছপাত ছপাত শব্দে। অপর্ণা ভেবে পান না কী করা উচিত তার। রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফেরা অসম্ভব। মোবাইলটাও এই চক্করে কোথায় পড়েছে কে জানে। কী অসম্ভব এক স্বপ্ন দেখিয়ে দিনের পর দিন তাকে এই দুষ্কৃতির দল এভাবে ঠকিয়ে গিয়েছে! ভাবলেই মনে হচ্ছে নিজেকে শেষ করে দেওয়া উচিত। সব দিক দিয়ে ঠকে গেলেন তিনি। তিনি একা তো নন, কত অসংখ্য মানুষ এদের হাতে বোকা বনেছে, সর্বস্ব হারিয়েছে। তারা সবাই শুধু নিজের দেশকে ভালবেসে, দেশের হৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করতে এদের ছলনায় বিশ্বাস করে ঠকেছে। অপর্ণার মনে হয় তার জীবনে আর কোন উদ্দেশ্য নেই, বেঁচে থেকেও কোন লাভ নেই।
যখন এরকম একটা স্থবির অবস্থায় বুনো ঝোপের আড়ালে বসে হাহুতাস করছিলেন অপর্ণা, কানে আসে উজ্জ্বলার গলা, সে কোথা থেকে চেঁচিয়ে ডাকছে, “ঠামি…ঠামিইই…”
একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে অপর্ণার গাড়ির পাশে। কয়েকজন লোক সেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা লোকটাকে টর্চ জ্বেলে দেখছে । উজ্জ্বলাও রয়েছে এই পুলিশদের দলে। মোহিনীকেও দেখা যাচ্ছে। সে ফাঁকা গাড়িটার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে। অপর্ণা পাশের ঝোপ থেকে এসব দেখে আর বসে থাকতে পারেন না। বেরিয়ে আসেন কাঁটায় ছড়ে যাওয়া শরীর। আসার আগে গাছের গুড়ি থেকে নেকলেসটা কুড়িয়ে আনতে ভোলেননি।
“এই তো … এই তো ঠামি …মোহিনীদি, এই যে ঠামি … “উজ্জ্বলা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।
পুলিশের দলের কিছু কিছু জন ততক্ষণে অজ্ঞান লোকটাকে তাদের জীপে তুলেছে। আর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুনম্বর লোকটাকেও তুলে অ্যারেষ্ট করেছে। সমর ও উঠে এসেছে জল থেকে।
অপর্ণাকে নিয়ে উজ্জ্বলা আর মোহিনী গাড়িতে বসেছে। সমরও ড্রাইভিং সিটে উঠতে যায়। অপর্ণা চেঁচিয়ে ওঠেন, “অফিসার, একেও অ্যারেষ্ট করুন। বিশ্বাসঘাতক বেইমান …”
পুলিশ অফিসার এগিয়ে আসেন, “না মাসিমা, সমর ওরফে চন্দ্র আমাদেরই লোক। ওর জন্যই আজকে আপনার কোন ক্ষতি হয়নি। গত চারমাস ধরে চন্দ্র আপনাকে গার্ড দিয়ে গেছে। আমাদের খবর দিয়ে গেছে।’
“মানে?”
“মানে হল আপনি যাদের খপ্পরে পড়েছিলেন, তারা একটা সাঙ্ঘাতিক গ্রূপ । ইংল্যান্ড থেকে কোহিনূর হিরে ফেরত আনবে এই অ্যাজেন্ডা নিয়ে তারা প্রথমে সারা দেশের আপনার মত দেশপ্রেমিকদের লোকেট করেছে । সকলের কাছ থেকে ঐতিহাসিক মূল্যবান গয়না সংগ্রহ করেছে । ঐগুলোর বিনিময়ে তারা কোহিনূর ফেরত পাবে এমন একটা ট্রীটি ওরা ফলস ডকুমেন্টেশান করে আপনাদের দেখিয়েছে। যার কারণে আজ আপনিও আপনার বহুমূল্য ভিক্টোরিয়ার নেকলেস ওদেরহাতে তুলে দিতে যাচ্ছিলেন।”
“হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো এখানে নয় …সিস্টারস হাট ধাবা থেকে অন্য গাড়িতে ওঠার কথা ছিল আমার।”
“ওগুলো কথার কথা মাসিমা। এই সমর ভেতরের ব্যাপারটা জানতে পেরেছে ওদের দলের একজন সেজে। দিনের পর দিন ওকে দুদিকে রোল প্লে করে যেতে হয়েছে। আচ্ছা, এবার স্টার্ট করা যাক। কাল আমরা সব কথা খোলসা করে বলব ডিটেলে।”
সমর তাও স্টার্ট দেয় না। অপর্ণা পেছন থেকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, “গাড়ি চালাও সমর। আমায় ভুল বুঝো না। মাসিমাকে পার তো ক্ষমা কোরও।”
“ছি ছি কী বলছেন মাসিমা, আমি আপনার ছেলের মত।”
“তুমি তার চেয়েও বেশি।” মনেমনে উচ্চারণ করেন অপর্ণা। তার মনে পরে যায় তাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে মোহিনী আর উজ্জ্বলা ছুটে গেছে থানায়। কিন্তু তার উপযুক্ত ছেলেরা কেউ মাকে খুঁজতে যায়নি।
৬
রাত তখন প্রায় দশটা। থানায় যেতে হয়েছিল অপর্ণাদেবীকে। উজ্জ্বলা আর মোহিনী তার সঙ্গেই ছিল। পুলিশ অফিসার বলেছিল যে বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে পরে এসে উনি যা লেখালিখি করার করতে পারেন। কিন্তু অপর্ণাদেবী কাজ ফেলে রাখার মানুষ নন। তিনি সোজা থানাতেই চলে গিয়েছেন আগে। তাদের গ্রাম কৃষ্ণনগর থানার মধ্যেই পরে।
তিনি মুখে মুখে বলেছেন, থানার লোক লিখে গিয়েছে।
“এই গ্রুপটার সঙ্গে আপনার আলাপ হল কবে? কিভাবে?” আই সি বললেন।
অপর্ণা চোখ বুজে চিন্তা করেন। তারপর থেমে থেমে বলেন, “একদিন একটা মেইল এল আমার কাছে। লাইন বাই লাইন মনে নেই, তবে মূল কথাটা ছিল, আপনি কী নিজের পরিবার এবং পরিবেশের বাইরে গিয়ে আপনার দেশের জন্য কিছু করার কথা ভেবেছেন কখনও? দেশের জন্য কিছু করতে চান? কেমন লাগবে যদি দেশের হারানো সম্পত্তি ফিরিয়ে আনার যে বিপুল কর্মযজ্ঞ করে চলেছে একদল নিরলস দেশপ্রেমিক কর্মী তাদের মধ্যে আপনারও কিছু অবদান থাকে? আপনি কী এবিষয়ে উৎসাহী? তাহলে আমরা নির্দিষ্ট সময়ে যোগাযোগ করব। এইরকম কিছু কথা ছিল সেখানে।
এমনভাবে লেখা ছিল যা আমার মনকে নাড়া দেয়। আমার স্বামী ছিলেন একজন একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। তাঁর অনেক অবদান রয়েছে আজকের এই শহরগঠনের পেছনে। তিনি সবসময় চাইতেন দেশের উন্নতি হোক, গ্রামের মানুষ আরও ভাল থাক। আমার মনে হল যে কিভাবে কী করতে চাইছে এরা একটু জানাই যাক। আমি রিপ্লাই মেল দিয়ে জানালাম যে আমি উৎসাহী। তখনও জানি না আমাকে কী করতে হবে। ভেবেছিলাম হয়তো বাচ্চাদের পড়ানো বা ঐ জাতীয় কিছু কাজ দেবে আমাকে। আমার তাতে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।”
“তারপর?”
“ওরা প্রথমদিকে মেল করেই কথা বলত। তাই ওদিকে কে বা কারা আছেন জানতে পারিনি। আশ্চর্য হল, আমার তখন ব্যাপারটার মধ্যে যে গোপনীয়তা, সেটাই বোধহয় ভাল লেগে গিয়েছিল। মিথ্যে বলব না, বেশ একটা উত্তেজনা, আমি একটা ভাল কাজ করছি যা দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজন, এরকম একটা গর্ব আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত ভেতরে ভেতরে। আমি ছেলেদের বা কাউকেই এটা জানাই নি।”
“মিটিং হত?”
“হ্যাঁ, মোবাইলে জুম মিটিং হল একটা। ওদের মুখ দেখা যায়নি। পর্দার পেছনে সব মাথা। ওরা বললেন আমাকেও কেউ দেখতে পাচ্ছে না। আমি তো এতটা সড়োগড়ো নই। তাই বিশ্বাস করলাম। ওই মিটিং-এ ওরা প্রথমে পাঁচলাখ টাকা চাইল। বলল এটা বর্ডারের গ্রামগুলোয় গরীব বাচ্চাদের জন্য নেওয়া হচ্ছে।”
“কিভাবে দিলেন ওই টাকাটা?”
“ওটা আমি সমরকে দিয়ে প্যাকেট করে ওদের বলে দেওয়া জায়গায় পাঠিয়েছিলাম।”
আই সি মাথা নাড়েন, “হুমম, ওইদিনই প্রথম সমর আমাদের ট্র্যাপে পড়ে। ইন ফ্যাক্ট টাকা হ্যান্ড ওভারের পরে আমরা ওকে ট্র্যাপ করি। আপনি জানেন না আপনার পরিবারের ওপর স্পেশ্যাল নজর রয়েছে আমাদের ডিপার্টমেন্টের। শুধু আপনিই নন, এরকম যত ধনী এবং বয়স্ক মানুষ আছেন, তারা সবাই এদের শিকার হয়েছে বা হতে পারে।”
অপর্ণাদেবী সমরের উল্লেখে অবাক চোখে তাকান, “সমরকে আপনারা কিভাবে ব্যবহার করলেন সেটাই বুঝতে পারছি না।”
“আমরা প্রথমে ওর পেট থেকে কথা বের করেছি, অর্থাৎ আপনার যে প্যাকেট ও দিয়ে এল এক অচেনা ব্যক্তিকে সেই খবরটা। তারপর ওকে আমাদের গ্রুপে ইনফর্মার হিসেবে ইনক্লুড করেছি, ওকে স্পেশ্যাল ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে হ্যাকিং এর জন্য। তারপর ওর কাছ থেকে আপনার কাছে আসা সমস্ত মেল আমরা টাইম টু টাইম পেয়ে গেছি।
আজ আপনি গয়না দিতে যাবেন, এবং দুজন লোক মাঝপথেই আপনাকে অ্যাটাক করে সেই গয়নাটা নিয়ে চম্পট দেবে এটাও জানা গেছে সমরের মাধ্যমে।”
“সেটা কিভাবে?”
“কারণ সমর আপনার হয়ে ওদের অনেকগুলো মেল করেছে। আবার নিজেও ওদের গ্রুপে ঢুকতে নানা কারসাজি করেছে। তারই ফলে সমর জানতে পেরেছিল ওদের আসল প্ল্যান হল চুরি, আর কিছুই না। এইভাবে রাস্তার মাঝখানে গাড়িটা থামিয়ে আপনার কাছ থেকে গয়নাটা নিয়ে নেওয়া হবে, এটা যখন ওরা বলল, সমরকে তখন হাসিমুখে হ্যাঁ বলতে হয়েছে।”
অপর্ণাদেবী আর কত অবাক হবেন! তার হাঁ বন্ধ হতে চায় না সহজে। কিন্তু তার প্রশ্ন শেষ হওয়ার নয়। যখন সবই জানা গেল তবে আর কেন ভার বয়ে বেড়াবেন তিনি? কোমড়ের কাছ থেকে কাপড়ের কষিটা আলগা করে মেশিনটা টেবিলে রেখে বলেন, “এই পিস্তলটা ওরা দিয়েছিল। কে দিয়ে গেল বলতে পারব না। আমাকে জানানো হয়েছিল পুকুরে ঘাটের সিঁড়ির কাছে একটা ছোট প্যাকেট পড়ে থাকবে, সেটা কালেক্ট করে নিতে হবে। আমি তাই করেছি। খুলে দেখি পিস্তল। পরে মেইল করে জানায় এটা আত্মরক্ষার জন্য। কিন্তু এখন এটারও আর দরকার নেই।”
“হা হা …ওটা একটা টয় পিস্তল। ওটা আপনার কাছে নিজেদের ওয়েট বাড়াতে দিয়েছে।”
“ওরে বাবা আ আ ঠামি, হলেই বা টয় পিস্তল, এটা তুমি ক্যারী করছিলে? আমি তো ভাবতেই পারছি না” উজ্জ্বলা বলে ওঠে।
“চলুন মাসিমা, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দি। অনেক রাত হল।”
অপর্ণা উঠে দাঁড়ান, স্খলিত গলায় বলেন, “আমি কখনও ভাবিনি মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে এমন খেলা করতে পারে মানুষ। আমি কিন্তু খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম ওদের কথাগুলো জান! ভেবেছিলাম আমাদের দেশের মহামূল্যবান সম্পত্তিটা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে যদি আমার নিজের একটা ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়, তবে সেটা আর কতটুকু! তাছাড়া এই ভিক্টোরিয়ার নেকলেস নিয়ে এত ঝগড়া ঝামেলা অশান্তি যখন, দূর হোকগে ছাই সবকিছুর মূল এই নেকলেস।”
অনেক কথা বলতে বলতে কখন ব্যক্তিগত কথায় চলে এসেছেন খেয়াল করেননি অপর্ণাদেবী। এখন একদম চুপ করে যান। কেউ তাকে কোন প্রশ্ন করে বিব্রত করে না।
গাড়ি এসে নামিয়ে দেয় তার বাড়ির বিশাল দরজার সামনে। আই সি নিজে এসেছেন। তার একটা ফোন আসে। কিছু কথা বলে নিয়ে তিনি উত্তেজিত ভাবে এগিয়ে আসেন অপর্ণার সামনে। খুব সাবধানে ধরে ধরে তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বলেন, “মাসিমা, এইমাত্র একটা সুখবর পেলাম। এই গ্যাংয়ের আরো তিনজন কিছু আগে ধরা পড়েছে দিল্লিতে।
তারা দুব্যাগ ভর্তি গয়না টাকা নিয়ে পালাচ্ছিল।
“কতো মানুষের সর্বনাশ করেছে এরা, ধোকা দিয়েছে দিনের পর দিন। অপর্ণা বড় সোফাটায় গা এলিয়ে দিয়ে বলেন।
উজ্জ্বলা বলে ওঠে, “মোহিনী দিদি সবাইকে ডাক। ঠামি ফিরে এসেছে।
কিছু পরে নেমে আসে অরুণ কিরণ নন্দা মালা ঝিলিক আর বরুণ। অপর্ণা বাড়িতে নেই এত রাত অবধি, তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না, কাউকে কিছু না বলে উজ্জ্বলা আর মোহিনী থানায় চলে গিয়েছে, সবকিছুর জন্যই দুই ছেলে দুই বৌমা দৃশ্যতঃই বিরক্ত। কী হতে চলেছে, তার জন্য কী করা প্রয়োজন এসব নিয়ে তারা সবাই বিভ্রান্ত। শুধু ঝিলিক অবিশ্রান্ত মেসেজ করে চলেছে তার ফিঁয়াসেকে। নেকলেসটা চুরি যাওয়ার দুঃখ তারই সবচেয়ে বেশি। ঘরে ঢুকে পুলিশ দেখে অরুণ খিঁচিয়ে ওঠে,
“কী ব্যাপার! এত রাত্রে আপনারা!”
আই সি হাসেন, “কিরকম ছেলে আপনি! মা সুস্থ ভাবে ফিরলেন কিনা সে প্রশ্নটা আগে না করে আমাদের চার্জ করছেন!
“ঠিক আছে ঠিক আছে, আমাকে সারমন দেওয়ার দরকার নেই। উনি ঠিকই আছেন দেখাই তো যাচ্ছে”
কিরণ সামনে এগিয়ে আসে, “কী হয়েছিলটা কী? কোথা থেকে পেলেন মাকে? মা তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে? উজ্জ্বলা তুমি বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে গেলে কেন? কী ভেবেছো? অনেক বড় হয়ে গিয়েছো?”
অপর্ণা হাত তুলে থামান কিরণকে, “অনেক হয়েছে। আর একটা কথা নয়। আমি একটা মাত্র কথা বলব, তারপর ওপরে যাব।”
“ঠামি …তুমি উঠো না, একটু রেষ্ট নাও, এখানে বসেই কিছু খেয়ে নাও আগে। আমি জানি দুপুরেও তুমি কিছু খাও নি …” উজ্জ্বলা বলে ওঠে ।
মালার চোখে পড়েছে দুই ফেরতা দিয়ে শাশুড়ির গলার কাছটা আঁচলে ঢাকা। সে বলে ওঠে, “মা আপনি এভাবে আঁচল পেঁচিয়ে রেখেছেন কেন গলায়?”
“শোন, তোমরা সবাই আমাকে নেকলেসের জন্য অনেক কিছু বলেছো। আমি তোমাদের কাছে একটা অসত্যভাষণ করেছিলাম। ভিক্টোরিয়ার নেকলেস আমার কাছেই আছে। তোমাদের সবারই চোখ ওটার ওপর। আমি ওটা উজ্জ্বলাকে দিচ্ছি। ওই একমাত্র এটা পাওয়ার যোগ্য।” আঁচল সরিয়ে গলা থেকে নেকলেসটা খুলে উজ্জ্বলাকে পরিয়ে দেন অপর্ণা। প্রায় পনেরো ভরি সোনার ওপরে অজস্র ছোট ছোট হিরে মুক্তো চুণি আর পান্নার কারুকাজ করা নেকলেসটা ঝলমল করে ওঠে।
ঝিলিকের মুখটা কালো হয়ে যায়। সে বলে ওঠে, “এটা কী হল ঠামি? আমি বড় ওর থেকে…”
ঝিলিকের মাথায় হাত বুলিয়ে অপর্ণা বলেন, “তোমার জন্য আমি অন্য গয়না রেখেছি। বয়স দিয়ে সব বিচার হয় না। এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত জিনিস, আমার যাকে মন চেয়েছে দিয়েছি। এই নিয়ে কারো কিছু বলার অধিকার নেই।”
মালা আর অরূন মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশ চলে গেছে। অপর্ণাকে বলে গেছে, আর কোন মেল পেলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তাদের জানানো হয়। সবাই যার যার ঘরে ঢুকে গেছে অপ্রসন্ন মনে। কী ঘটেছিল, অপর্ণা কোন বিপদের হাত থেকে ফিরেছেন সেসব শোনার মত মন বা ইচ্ছে নেই কারো। ছেলেরা তো কিছুই জিজ্ঞেসও করল না। বৌমারাও যেন কিছুই হয়নি এভাবেই চলে গেল।
মোহিনীর হাত ধরে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিজের ঘরে এসে ঢোকেন অপর্ণা। দেওয়ালে টাঙ্গানো মণিশংকরের বিশাল ছবিটা হাসছে। যেন বলতে চাইছে অপর্ণাকে এই ঘরেই মানায়, আর কোথাও নয়। দরজা বন্ধ করে দিতেই যাচ্ছিলেন অপর্ণা। সত্যি তার বিশ্রাম প্রয়োজন। অনেক ঝড় গেল শরীর মনের ওপর দিয়ে। ছেলেরা বৌমারা নাতি নাতনি সবাই তাকে ভুল বুঝল। আর কিছু অসৎ লোকের কাছে তিনি এভাবে ঠকে যাচ্ছিলেন সেটাই যেন মনটাকে আরো ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে।
“ঠামি, একবার ঢুকবো ভেতরে?” দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে উজ্জ্বলা।
“সবাই শুয়ে পড়ল, তুই এখনও ঘরে যাসনি? আয় আয় …”
উজ্জ্বলা গলা থেকে ঠামির পরিয়ে দেওয়া নেকলেসটা খোলে।
“তুমি দিয়েছো, আমি নিয়েছি। এবার এটা তোমার কাছেই রেখে দাও ঠামি। এ জিনিস তোমার কাছেই মানায়। আমি তো এখনও ছোট।”
অপর্ণা হাসেন। তিনি বুঝতে পারেন, বাড়ির সবাইকে অসন্তুষ্ট করে উজ্জ্বলা এটা নিতে চাইছে না।”
হাত বাড়িয়ে নেকলেসটা নেন তিনি।
“বেশ। যতদিন তুমি ছোট, এটা আমার কাছে গচ্ছিত থাকল। মেজরিটি পেয়ে তুমি আসবে আমার কাছে। নিয়ে নেবে নিজের জিনিস। আর যদি আমি ততদিন…”
“না ঠামি, ওকথা বোলনা …” মুখে হাত চাপা দিয়ে অপর্ণার কথা অসমাপ্ত করে দেয় ছোট্ট উজ্জ্বলা। তারপর বড়দের মত মুখ করে বলে, “তার চেয়ে তুমি এটা ভারত সরকারের কোন একটা মিউজিয়ামে দিয়ে দাও। সবাই দেখবে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নেকলেস। আমাদের ফ্যামিলির নাম আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়বে। দাদুর নাম, দাদুর বাবার নাম …। তুমি দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলে, এটাও তো দেশের কাজই হল।”
অপর্ণা জড়িয়ে ধরেন উজ্জ্বলাকে। এই ছোট্ট মেয়েটা তাকে যা শান্তি দিল তা তার পেটের ছেলেরাও দেয়নি।
“কিন্তু তার জন্যও তো অনেক লেখালিখি করতে হবে রে …, আবার কে কোথা থেকে ঠকিয়ে নেবে আমায় …”
“না ঠামি, আর দুটো বছর পর আমার আঠারো হয়েই যাবে। যা করার সব আমি করব। তুমি কোন চিন্তা কর না। শুধু এই দুটো বছর তোমাকে একদম সুস্থ থাকতে হবে।”
অপর্ণা আর কথা বলতে পারেন না। সহজে কাঁদেন না তিনি। কিন্তু এই মেয়েটা তাঁর চোখে জল এনেই দিল।
চোখে জল, মুখে হাসি, হাতে নেকলেস, অপর্ণার সেই মুহূর্তের একটা ছবি তোলা হয়ে থাকল বিশাল ঘরটার বাতাসে, মণিশংকরের ছবির সঙ্গে মিশে গিয়ে সেই ছবি জমা থাকল আগামী প্রজন্মের জন্য।
