আমার মা, পাট্টু
সরস্বতী এম. মনিকাম
অনুবাদ –বৈশাখী ঠাকুর
আমার মা, পাট্টু আমাদের জীবন গরিমান্বিত করত মূলত তার অনুপস্থিতির মাধ্যমে, যার জন্য আমি, আমার বাবা এবং আমার দিদা ভীষণভাবে তার কাছে কৃতজ্ঞ ছিলাম। মাসে একবার সে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। আমার দিদার কাছ থেকে টাকাপয়সা হাতানোর জন্য, খাবারদাবার লুট করার আগ্রহে, আমার বাবাকে শাপ-শাপান্ত করার উদ্দেশ্যে আর আমাকে পেলেই হাতসুখের দরকার হয়ে পড়ত। আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম যখন সে বিদায় নিত। একমাত্র আমার দিদা ব্যতিক্রম ছিল। দিদা গোপনে কাঁদত।
যখন পাট্টু থাকত না তখন চারিদিক আলোকময়। মজা করে বন্ধুদের সঙ্গে আমি সাইকেল চালিয়ে সামনের খাবারের দোকানে যেতাম যেখানে মামবাং- এর সেরা কুয়ে তেও বানানো হতো। আহমেদের ঘরের সামনের পাকা জায়গাটায় অনায়াসে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। পার্টি শেষে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরা। সঙ্গে আমাদের ছেলে বন্ধুরাও থাকত– মনোহরণ, রাজু, আব্দুল্লাহ যারা আমাকে পাগলের মতো চাইত। মিস্টার গোচের ঘরের সামনে জড় হয়ে হাসাহাসি -খাওয়াদাওয়া-গল্প-আড্ডায় মুখর হয়ে থাকত আমাদের জীবনটা। সপ্তাহে দুদিন কারনাটিক সংগীত চর্চা করতে যেতাম সুন্দরী কাকিমার বাড়িতে। আন্ট সুন্দরী থাকত আমাদের বাড়ি থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই। পাট্টু তবে বৃথা আমার সেই সংগীত চর্চার ক্লাস বন্ধ করতে চেয়েছিল কারণ তার ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত আমি কোন এক ভিখিরিকেই বিয়ে করব। আন্ট সুন্দরীর বাড়ি ছিল সেই বিরলতম বাড়ি একটি, যেখানে পাট্টু কোনদিন আমন্ত্রিত হয়নি।
যখন পাট্টু থাকে না, আমি ব্রেসিয়ার পরতে পারি, দিদার বানানো টাইট সেমিজের বদলে। ওই সেমিজ পরলে আমার স্তন জোড়া কেমন যেন দেবে গেছে মনে হয় কিন্তু পাট্টুর জবরদস্তির জন্যই ওই সেমিজগুলো পরতে হত।
দিদার ঘরে একটা সাদা কালো ছবি আছে আমার বাবা মায়ের। ১৯৭০-এ তাঁদের বিয়ের পর এই ছবিটা তোলা। ভারতীয় বিবাহের পোশাক পরিহিত এক ভারতীয় মহিলা আর এক চীনা লোক। আমার বাবাকে সস্তা কোন ছায়াছবির প্রমোশনাল ভিডিওর নায়ক মনে হচ্ছিল যেখানে পয়সার কারণে বুঝি সঠিক কোন অভিনেতাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৯৬৫ সালে যখন জাপানী দখলদারি শেষ হল মালয়শিয়ায় তখন আমার বাবাকে তাঁর অতীতের স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াত ছায়াসঙ্গীর মত। ঘুমের মধ্যেও তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ক্ষমা ভিক্ষা করতেন। যখন এটা ঘটত তখন আমি আর দিদা ছুটে যেতাম বাবার ঘরে। দিদা বিভূতি লাগিয়ে দিতেন বাবার কপালে এবং বুকে। দিদা বলতেন বাবার নাকি ওই সব সময়ে যুদ্ধের কথা মনে পড়ে যেত। সেই সময়ে তিনি কাজ করতেন সিয়ামিজদের মরণ রেলের ট্র্যাকে। দিন এবং রাতের ফারাক বোঝা যেত না সেখানে। আটকে পড়েছিলেন এক নরকসম গর্তের ভেতর। সারা দেহ ঘামে ভেজা থাকত, দর দর করে যেন তাঁর আত্মার ভেতর থেকেও ঘাম নির্গত হত। তিনি বারংবার জাপানী সৈন্যদের কাছে মিনতি করতেন ভগবানের নামে তাকে মেরে ফেলার জন্য। চিরদিনের মত শান্তি হয়ে যাবে। যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন তিনি কোন জাপানী লোকের মুখের দিকে চাইতেন না। এমনকি কোন ছবি বা সংবাদপত্রেও না।
যখন যুদ্ধ থেমে গেছিল তখন আমার ভারতীয় দাদু খুঁজে পেয়েছিল তাকে। অর্ধমৃত, কংকালসার চেহারার একটা ছেলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত মুখ। মাথার চুলের রঙ সাদা ধূসর মেশানো যে তাঁর যুদ্ধের আগের জীবনের কথা বলতে নারাজ। আমার দাদু তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল এবং ছোট বাচ্চার মত তাঁর দেখাশোনা করত। তিন মাসের একটা ব্যবধান ছাড়া দুই পুরুষই একে অপরের প্রতি নিবেদিত ছিল যতদিন না আমার দাদু মারা যায় আট বছর পর।
শীর্ণকায় চেহারা হলে কি হবে, ঠোঁটে সবসময় সিগারেট পুরে বাবা তাঁর চীনা পরিচয় সন্তর্পণে বহন করতে পছন্দ করতেন যা একেবারেই ভিন্ন ছিল আমার আর দিদার জীবনযাত্রার থেকে। তিনি সবসময় চীয়ং কী রেস্তোরাঁর চীনা খাবার আনিয়ে খেতেন। জালান ভান্ডারের নম ফুক টেলরের তৈরি লম্বা স্ট্রাইপ দেওয়া পাজামা ছাড়া পরতেন না। রেডিওতে চীনা চ্যানেল শুনতেন, চীনা চা পান করতেন, চীনা সংবাদপত্র পড়তেন এবং আমার বাবা হওয়ার আগে পর্যন্ত যে সময়টা সেটা সমন্ধে একদম কিছু বলতে চাইতেন না।
যেটা আর প্রাসঙ্গিক নয়, সেটা সমন্ধে কেন তুমি কিছু জানতে চাও? জিজ্ঞেস করলে বাবা আমার দিকে না তাকিয়ে এই উত্তরটাই দিতেন। আমি বাবার বড্ড ভক্ত ছিলাম। আমি ভয়ে থাকতাম যে এমন কিছু না বলে ফেলি পাছে বাবা অসন্তুষ্ট হন!
আমার যখন দশ বছর বয়স, একবার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তুমি কি আমাকে ভালবাস পাট্টু?
ভালবাসা আর তোকে ললিতা! বোকা বোকা যত কথাবার্তা! তোর মতই বোকা এবং কুৎসিত একটা প্রশ্ন! আমার যখন চোদ্দ বছর বয়স তখন তুই জন্মেছিলি। অসহ্য একটা ঘটনা আমার জীবনে যার কারণে আমার পেট ফুলে উঠেছিল, বুকে কষ্ট হয়েছিল এবং জীবনভর যার জন্যে আমায় মাশুল গুনতে হচ্ছে।
আহ! পাট্টু কি হচ্ছে! দিদা বলে উঠতেন।
আমার জীবনের মূল্যে ও এসেছিল আম্মা! ও জন্মাবার সাথে সাথে আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, হতচ্ছাড়ি মেয়ে একটা! আর ভুলে যাস না, তুই জন্মাবার আগে দশ ঘন্টার সেই অসহ্য যন্ত্রণা, খুব অল্প সময় তোর লেবার পেন হয়েছিল, ডাক্তারবাবুরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গেছিল। দিদা অবাক হয়ে বলল।
মোটেই না। দশ ঘন্টা। কী ব্যথা ভগবান! আমি তখনই বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছিলাম তোর উপর।
আমি হতবাক হয়ে গেছিলাম কথাগুলো শুনে। একটা মা তো তাঁর বাচ্চাকে স্বাভাবিক ভাবেই ভালবাসবে। তবে কথাটা এক প্রকার আমাকে বেশ শান্তি দিয়েছিল। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম এই ভেবে, আমি যে পাট্টুকে ঘৃণা করি সেটা তবে খুব দোষের নয়!
আমার মা পাট্টু ছিল সেই তিক্ত পিত্তরসের মতন যা প্রতিবার সাক্ষাত হওয়ার পর আমি উগরে দিতাম। সে ছিল আমার মাথার ভেতর এক শোরগোল। যেমনি আমি দেরী করতাম উত্তর দিতে, পুরস্কার স্বরূপ সজোরে থাপ্পড় পড়ত আমার গালে। সে ছিল সেই বিষাক্ত বিষ যা আমার রক্ত, হাড়মাস সব শুষে নিচ্ছিল আর সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। আসলে যদি তুমি আমার চুল, গায়ের রঙ বা চোখ খেয়াল কর তাহলে বুঝবে আমাকে হুবহু পাট্টুর মত দেখতে ছিল। আর এই বিভীষিকা যেন আমি মেনে নিতে পারতাম না। বাবার মত কিচ্ছু আমার মধ্যে ছিল না কারণ সে তো আমার বাবাই ছিল না। সবাই সেই গল্পটা জানত। আমিও দ্রুত জেনে গেছিলাম যদিও বাবা বা দিদা কেউই সে কাহিনী আমাকে বলেনি।
আমি জানি পাট্টু নীরবে বাবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিল যখন পাট্টু অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। দাদু বাবাকে উত্তম মাধ্যম পেটাতে পেটাতে বলেছিল, আমি তোর প্রাণ বাঁচালাম হারামজাদা চীনার বাচ্চা আর তুই এই প্রতিদান দিলি! বাবা পড়ে পড়ে মার খেয়েছিল। উল্টে একবারের জন্যও হাত তোলেনি কিন্তু মৃদু স্বরে বলেছিল, আমি ওঁকে ছুঁইনি পর্যন্ত!
আমি শুনেছি আমার দাদু কিভাবে বাবার পায়ে পড়ে কেঁদেছিল আমি জন্মাবার পর। আমার সবুজ চোখ ছিল এবং চুলের রঙ ছিল গমের মত।
আমি কোনদিন ওকে আম্মা বলে ডাকিনি। সে সবসময়ই আমার কাছে পাট্টু ছিল সেই যখন থেকে সে পালিয়ে গেছিল আঁতুড় ওঠার দু সপ্তাহ পর একটা সেলসম্যানের সাথে। কিন্তু যাওয়ার আগে সে দাদুর ক্যাশ বাক্স ফাঁকা করতে ভোলেনি। তাঁর সঙ্গী হয়েছিল বেশ কিছু সোনার চেন। ছয় মাস বাদে সে ফিরেছিল নিঃস্ব হয়ে। না ছিল টাকা, না ছিল সোনার চেন আর না ছিল সেই সেলসম্যান। পড়শিরা দেখেছিল কিভাবে ক্ষোভে নিমজ্জিত সেই ভঙ্গুর সত্ত্বা সবার অলক্ষ্যে আমাকে চিমটি কেটে কালশিটে ফেলে দিত আমার নরম শিশুদেহে। তারপর থেকে চলতে থাকল এই পর্ব—সুযোগ পেলেই সে পালিয়ে যায় কারুর সাথে। সঙ্গে নিতে ভোলে না যা মুল্যবান জিনিস সে হাতের সামনে পায়। তারপর খালি হাতে আবার কিছুদিন পর প্রত্যাবর্তন। আবার দামী সামগ্রী নিয়ে পলাতক। ফের ফিরে আসা আরো তিরিক্ষি মেজাজ, আরো কম সময়ে মাথা গরম, রাগরোষকে সহযাত্রী করে। অসন্তোষে নিজেই নিজেকে কামড়াত। আরো নানাবিধ পাগলামি ছিল। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে দাদু তাকে একটা বাড়ি করে দিল মামবাং থেকে দশ মাইল দূরত্বে যেখানে সে একা থাকবে এবং যা খুশি তাই করতে পারবে।
আমাদের পরিবার বা এলাকার মধ্যে কোন গোপন ব্যাপার বলে কিছু ছিল না। এই যে আন্ট জুডিথ প্রতিদিন তাঁর বীয়ারের বোতলটা খবরের কাগজে মুড়ে ঘরে যায়, সেটা জানতে কারুর বাকি নেই! সরকারি চাকরি করে কে টেবিলের তলা দিয়ে পয়সা খায়, আব্দুল হাসান এবং চন্দ্রনকে বউ পেটায় (তালিকাটা বেশ দীর্ঘ) আর কার উপপত্নী আছে, কে নিজের বরের মতিগতি ফেরানোর জন্য বাবাজী মাতাজীদের দোরে হানা দেয় এবং সর্বোপরি পাট্টুর সাম্প্রতিকতম প্রেমিক কে, এগুলো কখনই গোপন থাকত না। কিন্তু সেগুলো আমরা সবার সামনে, দিনের আলোয় তুলে ধরতাম না। জনসমক্ষে আমরা সবাই ছিলাম অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং নীতিবান। সবাই একমাত্র পাট্টু ছাড়া।
একটা গল্প আছে এলাকায় যা বলতে গেলে প্রায় কিংবদন্তীর মত হয়ে গেছে। একদিন পাট্টু যখন বাজারে যায় সে অলক্ষ্যে শুনতে পায় এক ভদ্রলোক তাঁর চরিত্র নিয়ে কথা বলছে। মুহূর্তে পাট্টু তাঁর শাড়ি পাশ থেকে খানিক নিয়ে কোমরে গুঁজে লোকটার দিকে এগিয়ে যায়। শার্টের কলার ধরে তাকে পেটাতে শুরু করে।
কীভাবে লোকটা পালাতে চেষ্টা করছিল যদি দেখতি ললিতা! জোশী আন্টি আমাকে আর দিদাকে গল্পটা বলেছিল। ঘূর্ণায়মান রাক্ষসীর মত সে লোকটাকে ঘুষি মারছিল, তাঁর জামা টেনে ছিঁড়ে দিয়েছিল। তারপর যা করল। পা দিয়ে তাঁর ওপর জোরে আঘাত করল এবং জুতসই গালিগালাজ দিয়ে তাঁর পুরুষাঙ্গের বর্ণনা দিল।
আমি কেমন হতবাক হয়ে গেছিলাম। কিন্তু আন্ট জোশী জোশে বলে যাচ্ছিল, মুখটা হয়তো খারাপ মেয়েটার, হয়তো অনেক খারাপ কাজ করে কিন্তু সেইদিন যত বউপেটানো পুরুষ ছিল তাদেরকে সব মেয়েদের হয়ে ও যেন বেশ ভাল ডোজ দিয়েছিল। আমার বুকটা গর্বে ফুলে উঠেছিল। পাট্টু পাট্টুই। নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়েও ও লোককে সাহায্য করে।
তারপর বাড়ি ফিরে এসে আমাকে ঠাস করে থাপ্পড় মারে। কিন্তু বাবা বলেছে, আর …
চুপ ললিতা। অনুনয়ের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল দিদা।
এমন কী ভিখারিগুলোও ওঁকে ভালবাসে। ওঁকে সবাই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় একমাত্র ওখানে… বলে আন্ট জোশী আন্ট সুন্দরীর বাড়ির দিকে তাকাল।
হ্যাঁ, ওঁর হৃদয়টা বড়। মনটা ভাল। সবাইকে ভালবাসে ও। একমাত্র ওঁর পরিবারকেই পাট্টু সহ্য করতে পারে না। দিদা বলল।
না, দিদা, পরিবার নয়, কেবল আমাকে আর বাবাকে ও সহ্য করতে পারে না। দিদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসলে পাট্টু সেই সব জিনিসগুলো চায় যেগুলো ও পায়নি। কিন্তু ললিতা, আমি আর পাট্টুকে তোকে মারতে দেব না। অনেক হয়েছে। আমি সত্যি বলছি।
কেন ও এরকম করে? আমার এই কথাতে দিদা মুখটা ঘুরিয়ে নিল।
গত শুক্রবারের কথাটা মনে কর। আন্ট জোশী বলল।
মনে পড়ে গেল গত শুক্রবারও একটা ঘটনায় কি ভীষণ মেরেছিল আমায়। দিদা কেবল “আইও আইও” করে গেল। তারপর আমার আঘাতের জায়গায় কোন একটা মলম লাগাতে এসেছিল। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আমি সরোষে বলেছিলাম, তুমি ওঁকে আটকাওনি দিদা। আমি চাই ও মরে যাক। বুঝলে একদম মরে যাক আর আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দিক।
বাবার মুখ একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল যখন আমার আঘাতের চিহ্নগুলো দেখেছিলেন। দিদাকে কড়া গলায় বলেছিলেন, যদি আপনি আমার মেয়ের গায়ে হাত দেবার আর কোনদিন অনুমতি দেন তাহলে আমি এবং আমার মেয়ে দুজনেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
আমি বাবার একটা কথাও বিশ্বাস করিনি। বাবা কী জানতেন না কিভাবে দিনের পর দিন পাট্টু আমার ওপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।
এক সপ্তাহ বাদে অবশেষে ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ সিনেমাটা আমাদের শহরে এল। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে উন্মাদনা দেখার মত ছিল। সব গানের কলি মুখস্থ। ইস্কুলের টিফিন ব্রেকে সেই গানগুলো সবাই একসাথে গাইতাম। আমরা শুক্রবার ম্যাটিনি শো দেখতে যাব বলে স্থির করলাম কারণ সেদিন ইস্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়। রুবিয়া টিকিট কেটে রেখেছিল। আমি সাইকেল করে প্রথমে রুবিয়ার বাড়ি গিয়ে তারপর একসাথে মীনার বাড়ি যাবার কথা। হলের সামনে আরো তিনজন অপেক্ষা করবে। সিনেমা দেখার পর প্রথা অনুযায়ী মহা সমারোহে আইসক্রিম খাওয়া হবে। বাবা তখন কুয়ালালামপুরে ছিলেন—তবে এবার চিকিৎসাজনিত কারণে। পাঁচ দিনের জন্য বাবা গিয়েছিলেন কিন্তু আমাকে সিনেমা দেখার এবং খাওয়ার টাকা দিয়ে গেছিলেন। আমার মন যেন ময়ূরের মত নেচে উঠেছিল। এত আনন্দ হচ্ছিল আমার।
আমি শুক্রবার ইস্কুল থেকে দ্রুত ফিরে এলাম জামাকাপড় বদলাব বলে। পাট্টু তখন ঘরে ছিল। পাট্টু ডাইনিং টেবিলে বসে গল্প করছিল আমাদের পড়শিদের সাথে— আন্ট জোশি, আন্ট লীলা এবং আমার দিদা যে কিনা তাঁর মেয়ের সমস্ত প্রিয় পদ রান্না করেছিল। তাঁদের মধ্যাহ্ন ভোজন সারা। পাট্টু দেখলাম ব্লাউজের ভেতর থেকে কিছু টাকা বের করে আন্ট লীলাকে দিল।
লীলা, তুমি কিছু নিজের জন্য কিনে নিও আর ভগবানের দোহাই, টাকাটা তোমার ওই স্বামীর থেকে লুকিয়ে রেখ। আন্ট লীলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পাট্টু হেসে আমাকে দেখতে পেয়েই ওঁর মুখের রঙ বদলে গেল। খেঁকিয়ে উঠল, কি দেখছিস রে পোড়ারমুখী? আমি নিজেকে বলেছিলাম যে আমি পাট্টুকে আর কোনদিনও আমার গায়ে হাত তুলতে দেব না। কিন্তু বুকের ভেতর যেন কে হাতুরি পিটছিল। এত কাঁপছিলাম আমি যে ইস্কুলের ব্যাগটা টাইট করে ধরে রাখলাম।
দি-ই-দা, আমি চান করতে যাচ্ছি।
হ্যাঁ, আমার সোনা। আজ তো তুমি সিনেমা দেখতে যাবে।
কি সিনেমা? পাট্টু জানতে চাইল।
কিছু না পাট্টু। আমি ওটা ভুল করে বলে ফেলেছি।
কি সিনেমা আমাকে বল আম্মা? আন্ট জোশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন, ইংরেজি সিনেমা। সাউন্ড অফ মিউজিক। খুব বিখ্যাত সিনেমা। সব বাড়ি বাড়ি থেকে সিনেমাটা দেখতে যাচ্ছে। বাচ্চা, বুড়ো, বউ, শ্বাশুড়ি সবাই।
ওহো! তাহলে ইংরেজি সিনেমা দেখতে যাওয়া হচ্ছে। ভাল করে জামা কাপড় পরে মেমসাহেব ছেলেদের সাথে বসে ইংরেজি সিনেমা দেখবে! যাও বাছা যাও, গিয়ে চান করে এসো। মুখটা কঠিন করে পাট্টু বলল আর ওঁর চোখের দিকে চেয়ে আমি বুঝতে পারলাম ও প্রথম থেকেই জানত যে আমি সিনেমা দেখতে যাব।
দিদা! আমার গলা বুজে আসছিল।
যাও, ওপরে গিয়ে রেডি হয়ে এসো। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আমি শুনতে পেলাম দিদা বলছে, “দয়া করে পাট্টু আর ঝামেলা করিস না। সারা সপ্তাহ ধরে মেয়েটা কেবল এই সিনেমা দেখতে যাওয়ার গল্পই করছে!”
আমি চান করে বাবার কুয়ালালামপুর থেকে এনে দেওয়া নতুন জামাটা পরলাম। নিচে নামতে নামতে শুনতে পাচ্ছিলাম পাট্টু বলছে, দেখি ওঁর কত সাহস যে ও সিনেমায় যায়!
আমি সিনেমায় যাচ্ছি!
বাব্বা! মুখে মুখে কথা বলতে শিখেছে। মুহূর্তে পাট্টু আমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার স্কারট ধরে টেনে ছিঁড়ে দিল। হাত উদ্যত করল মারার জন্য। আমি শূন্যে ওঠা হাত ধরে ফেললাম। সে অন্য হাতটা দিয়ে আমার চুলের মুঠি ধরল।
আমার একটুও ব্যাথা লাগছিল না। সারা শরীর জুড়ে একটা তীব্র রাগ, জ্বালা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আন্ট জোশি আর আন্ট লীলা পাট্টুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিতে দিতে বলছিল,
মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোর পাট্টু! দিদা মাথা চাপড়াচ্ছিল। আমার চোখের সামনে যেন একটা পাতলা আস্তরণ। ভাল করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না তবে টের পাচ্ছিলাম সব। আমি জানতাম আমাকে এখন কি করতে হবে! বাবার হাঁটার লাঠিটা নিয়ে দু হাত দিয়ে ধরে শূন্যে তুলে পাট্টুর সামনে দাঁড়ালাম। না ললিতা! দিদা আঁতকে উঠল। “ওঁর মত হয়ে যাস না!” লাঠিটা তখনও শূন্যে আমার হাতে ধরা। পাট্টু বলছিল, আমাকে মারতে চায় ও? আমিই ওঁকে মেরে ফেলব। চুপ কর পাট্টু! আন্ট জোশী ধমকালেন।
তুমি পাট্টু নও! বুঝেছ তুমি লালী! দিদা আমাকে বলল। তারপর পাট্টুর দিকে ফিরে বলল, “কী হয়েছে কি তোর? নিজের মেয়েকে মেরে ফেলতে চাস!”
আমি ওঁর মেয়ে নই। আমি হাত থেকে লাঠিটা নামিয়ে মাথা ডলতে ডলতে বললাম। মাথার তীব্র যন্ত্রনাটা এবার অনুভব করতে পারছিলাম।
না, তুমি একটা হারামজাদী বেশ্যা। তুমি আর তোমার বাবা!
পাট্টু, আর নয়…। দিদা বলল।
বাজারি মেয়েছেলে, বেশ্যা, পতিতা…। এইসব কথা পাট্টু বলে গেল। সেইসব কথা যা একবার বললে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। মুখে আনা হয় না ভদ্র সমাজে। কান চাপা দেয় লোকে। বিষ ওগরাচ্ছিল পাট্টু। দিদা ওঁর মুখে হাত চাপা দিল।
এখানে বেশ্যা আমি নই পাট্টু। অত্যন্ত দৃঢ় গলায় কথাগুলো বললাম আমি।
বারো বছর বয়স থেকে পাট্টু তুমি হাতের বাইরে চলে গেছিলে। কান্নাসিক্ত গলায় বলল দিদা। আমার কান্না, বকুনি, হুঁশিয়ারি কোন কিছুরই প্রভাব পড়ত না তোমার ওপর। তোমার বাবাকে ক্রমাগত মিথ্যে বলতাম—বলতাম পাট্টু সেলাই করছে যখন তুমি জুডিথ আর শ্বেতাঙ্গ ছেলেগুলোর সঙ্গে পার্টি করতে। আমি তোমাকে ঘরে তালা দিয়ে রাখতে চাইতাম…
কিন্তু আমি জানলা দিয়ে বেরিয়ে যেতাম আম্মা। জেলখানা মনে হত আমার। এটা কর না। ওখানে যেও না। ছেলেদের সাথে কথা বোলো না। ওরকম পোশাক পর না। প্রতিটা ভারতীয় পরিবারই মেয়েদেরকে এইভাবেই মানুষ করে পাট্টু। আন্ট জোশী বললেন।
আমি একটু মজা করে, আনন্দ করে বাঁচতে চেয়েছিলাম জোশী। এতে অন্যায় কোথায়? উল্টে আমার পারিবারিক মর্যাদার জন্য আমার শ্বাস রোধ করে রাখা হত। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারতাম না। খানিক হাঁপিয়ে পাট্টু যোগ করল, “এখনও পারি না।”
আমি তোমার বাবার থেকে সব কিছু লুকিয়ে রাখতাম।
বাবার কথা আমার সামনে তুলো না। আমার ইস্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তুমি ভাবতে পারো জোশী! বিশ্বাস করতে পারো ইস্কুল থেকে দিদিমণিরা এসে বলে গেছিল—আমি ক্লাসের সেরা ছাত্রী। আমাকে যেন পড়াশোনাটা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়!
তুমি তখন বয়ঃসন্ধির সময় দাঁড়িয়ে! তোমার বাবা পুরনো চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন।
আমি ইস্কুল টিচার হতে পারতাম আম্মা! কিংবা পুলিশ ইন্সপেক্টর! আমি কিছু একটা ঠিক হতাম। দিদা ফের মাথা চাপড়াচ্ছিল। ঘরে সহানুভূতির গুঞ্জন শোনা গেল। খানিক নীরবতার পর পাট্টু বলল, আমি যে জীবনটা চেয়েছিলাম, ও সেই জীবনটা যাপন করছে। এটা আমি হতে দেব না। কিছুতেই না। এই আমি বলে গেলাম। একটা নিঃস্ব, রিক্ত গরিব ভিখিরিকে ও বিয়ে করবে। আমি নিশ্চিত করব যাতে সেটাই হয়। বলে হাসতে লাগল।
আমি জামা বদলাতে ওপরে গেলাম। একটা উজ্জ্বল সবুজ রঙের স্কার্ট বাছলাম। কোমরের কাছে অনেকবার গুটিয়ে গুটিয়ে হাঁটু থেকে কম পক্ষে পাঁচ ইঞ্চি ওপরে করলাম স্কার্টটাকে। সাইকেল চালিয়ে ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’ দেখতে গেলাম বন্ধুদের সঙ্গে। কেমন ঘোরে ছিলাম। সিনেমার একটা দৃশ্যও আমার মনে নেই।
