বাজি
(লেখক – অ্যান্টন চেকভ)
অনুবাদ – মহুয়া সমাদ্দার
(লেখক পরিচিতি – অ্যান্টন চেখভ ১৮৬০ সালে রাশিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি পেশায় চিকিৎসক হলেও অজস্র নাটক এবং ছোট গল্প লিখে গিয়েছেন সমান দক্ষতায়। তিনি থিয়েটার জগতে বিপ্লব এনেছিলেন তাঁর লেখা বিখ্যাত চারটি নাটক যেমন – The Seagull, Uncle Vanya, Three Sisters এবং The Cherry Orchard-এর দ্বারা। আধুনিক নাটকের জনক হিসেবে ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গের সঙ্গে অ্যান্টন চেকভের নামও একই সারিতে রাখা হয়। এমন একজন দক্ষ লেখক ১৯০৪ সালে, মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে অকালে অমৃত লোকে যাত্রা করেন।)
অন্ধকার শরৎ রাতে বৃদ্ধ ব্যাংকার যখন তাঁর পড়ার ঘরে পায়চারী করছিলেন, ঠিক সেই সময়ে তাঁর মনে পড়ল পনেরো বছর আগের এমনই এক শরৎ রাতের কথা। সেই রাতে তিনি একটি পার্টি দিয়েছিলেন। যে কোনও পার্টিতেই বুদ্ধিমান মানুষের ভিড় বেশি হলে সেখানকার কথাবার্তা স্বভাবতই অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সেই পার্টিটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মৃত্যুদন্ড নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছিল। বেশিরভাগ অতিথিরাই বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিক হওয়ায় স্বভাবতই, তাঁদের প্রত্যেককেই মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে মত দিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে তাঁরা মৃত্যুদন্ডকে পুরনো, অনৈতিক এবং খ্রিস্টান রাষ্ট্রের জন্য অনুপযুক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিছু জন এটাও বলেছিলেন যে মৃত্যুদন্ডের পরিবর্তে আজীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
সেই কথা শুনে ব্যাংকার প্রতিবাদ করে বলেছিলেন – আমি তোমাদের সঙ্গে একমত নই। যদিও মৃত্যুদণ্ড বা আজীবন কারাদন্ডের কোনওটাই আমি ভোগ করিনি, তবুও দুটোর মধ্যে বিচার করলে মৃত্যুদন্ডই বেশি মানবিক বলে মনে হয়। কারণ, মৃত্যুদন্ডে মানুষ একবারে মরে। কিন্তু কারাদণ্ড একজন মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কে বেশি মানবিক? যে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু নিয়ে আসে সে? নাকি যে বছরের পর বছর জীবনকে টেনে বেড়ায়, সে?
একজন অতিথি প্রতিবাদ করে উঠলেন। – দুজনের মধ্যে কেউই নৈতিক নয়। কারণ, দুজনেরই আসল লক্ষ্য মৃত্যু। রাষ্ট্র রাষ্ট্রই। রাষ্ট্র কখনওই ঈশ্বর নয়। সে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে না। তারপরও সে জীবন কেড়ে নেয় কীভাবে?
অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত পঁচিশ বছরের তরুণ আইনজীবীটির কাছে তাঁর মত জানতে চাওয়া হলে, তিনি বলেন – মৃত্যুদণ্ড এবং আজীবন কারাদণ্ডের মধ্যে দুটোই একই রকমের খারাপ হলেও যদি আমায় দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমি আজীবন কারাদণ্ডকেই বেছে নেব। কারণ, যে কোনও ভাবে বেঁচে থাকতে পারাটাই হল আসল কথা।
তর্ক ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠতে লাগল। ব্যাংকারের বয়স সেই সময়ে অনেকটাই কম থাকায় স্বভাবতই তিনি ছিলেন আবেগপ্রবণ। উত্তেজিত হয়ে তিনি টেবিলে ঘুষি মেরে চিৎকার করে বললেন – এসব সত্যি নয়। আমি বাজি ধরছি, কেউ যদি এক টানা একটা ঘরে পাঁচ বছর বন্দি থাকতে পারেন, তাহলে আমি তাঁকে কুড়ি লাখ টাকা দিয়ে দেব।
– আপনি কি সত্যি সত্যিই বলছেন?
– একজন যুবক বললেন, তাহলে আমি রাজি। তবে শুধু পাঁচ বছর নয়। আমি পনেরো বছর এক টানা একা একা থাকতে চাই।
– পনেরো বছর? বেশ। আমি কুড়ি লাখ টাকা বাজি রাখলাম, ব্যাঙ্কার চেঁচিয়ে উঠে বললেন।
– আপনি লাখ লাখ টাকা বাজি রাখলেন। আর আমি বাজি রাখলাম আমার স্বাধীনতা। সেই যুবকটি বলল।
ঠিক এভাবেই সেদিন বোকার মতো অর্থহীন বাজিটা ধরা হয়েছিল। ব্যাঙ্কারের মনে পড়ল এই বাজিটা ধরে তিনি বেশ মজাই পেয়েছিলেন। রাতে খাওয়ার সময়ে তিনি এই বাজির কথা তুলে সেই যুবকের সঙ্গে একটু মস্করাও করলেন এবং বললেন – “তুমি এখনও ভেবে দেখো। এখনও হাতে সময় আছে কিন্তু। আমার কাছে কুড়ি লাখ টাকা কিছুই না। কিন্তু এর বিনিময়ে তুমি তোমার জীবনের তিন চারটে মূল্যবান বছর হারিয়ে ফেলবে। আমি তিন চার বছরই ধরলাম। কারণ, এর বেশি তুমি কিছুতেই বেঁচে থাকতে পারবে না। ভুলে যেও না কিন্তু, ইচ্ছাকৃত বন্দি যাপন থাকাটা কিন্তু বাধ্যতামূলকের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন কাজ। বাইরে বেরবার স্বাধীনতা তোমার রয়েছে – এই চিন্তাটাই তোমার বন্দি জীবনকে আরও বিষাক্ত করে তুলবে। আমি তাঁর জন্যে দুঃখিত।”
এখন ব্যাঙ্কারটি পায়চারী করতে করতে স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছেন। তিনি নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করলেন, ওই বাজির উদ্দেশ্য কী ছিল? একটা মানুষের জীবনের পনেরোটা বছর নষ্ট করে এবং তার বিনিময়ে কুড়ি লাখ টাকা দিয়ে আমারই বা কোন লাভ হল? এটা কি সত্যিই প্রমাণ করল যে সারাজীবন কারাদণ্ডের চাইতে মৃত্যুদণ্ডই বেশি ভাল? না। একেবারেই তা নয়। এগুলো অর্থহীন বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমার দিক থেকে ঘটনাটা দেখলে অবশ্য বড়লোকের খামখেয়াল ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না। অন্যদিকে যদি যুবকটির দিক থেকে চিন্তা করি, তাহলে সেটা ছিল স্রেফ অর্থের প্রতি তাঁর মোহ।
সেদিন সন্ধ্যায় কী কী ঘটেছিল মনে পড়ে গেল তাঁর। ঠিক করা হল যে সেই যুবক কড়া পাহাড়ার মধ্যে ব্যাঙ্কারের বাগানের একটা ঘরে থাকবেন। পনেরো বছরে তিনি ঘরের চৌকাঠ পার হতে পারবেন না। শুধু তাই নয়। স্থির হল, তিনি এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে না মানুষের মুখ দেখতে পাবেন, না তিনি মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাবেন। চিঠি বা খবরের কাগজও তিনি নিতে পারবেন না। তবে তিনি গান শুনতে বা চিঠি লিখতে পারবেন। মদ বা সিগারেটও খেতে পারবেন তিনি। চুক্তি মোতাবেক, বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে যুবকের কাছে থাকবে একটি মাত্র ছোট জানালা। তাঁর যা কিছু দরকার সে বই, বাদ্যযন্ত্র, মদ বা অন্য যা কিছুই হোক না কেন, কী প্রয়োজন এবং এবং কতটা পরিমানে প্রয়োজন, তা তাঁকে ক্রমানুসারে লিখে জানাতে হবে। তবে তাঁর প্রয়োজনীয় সব কিছু ওই জানলা দিয়েই পাওয়া যাবে। চুক্তিতে এমন সব খুঁটিনাটিও উল্লেখ ছিল, যাতে যুবকের একাকীত্ব পরিপূর্ণ হতে পারে। তাঁর বন্দি জীবন শুরু হয়েছিল ১৪ই নভেম্বর ১৮৭০ থেকে ১৪ই নভেম্বর ১৮৮৫ পর্যন্ত। যুবক যদি তাঁর বন্দি জীবন শেষ করার মাত্র দু মিনিট আগেও কোনও সামান্যতম শর্ত ভঙ্গ করেন, তাহলে ব্যাঙ্কার কুড়ি লাখ টাকার মধ্যে একটি টাকা দিতেও বাধ্য থাকবেন না।
বন্দির সংক্ষিপ্ত লেখা থেকে জানা যায়, প্রথম বছরটা সেই বন্দি চূড়ান্ত হতাশা এবং একাকীত্বের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। তাঁর ঘর থেকে সারা দিন রাত পিয়ানোর আওয়াজ পাওয়া যেত। এর মধ্যে তিনি মদ বা তামাক কিচ্ছুটি খাননি। তাঁর লেখা অনুযায়ী, মদ মানুষের হৃদয়ে আকাঙ্খার জন্ম দেয়। আর এই আকাঙ্খাই হল একজন বন্দির সবচাইতে বড় শত্রু। তাছাড়া একা একা বসে দামী মদ খাওয়ার চাইতে খারাপ কিছু আর হয় না। আর তামাক ঘরের বাতাসকে বিষাক্ত করে দেয়। প্রথম বছরে তিনি হালকা বই যেমন – রোম্যান্টিক, রহস্য ইত্যাদি পড়েছেন।
দ্বিতীয় বছরে তাঁর পিয়ানো নীরব হয়ে গেল। তিনি তখন শুধুমাত্র ক্লাসিকের বই চাইতেন। পঞ্চম বছরে তাঁর ঘর থেকে আবারও গান বাজনার আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। তিনি সেই সময়ে শুধু মদ চাইতেন। যারা তাঁকে সেই সময়ে জানলা দিয়ে দেখেছিলেন, তাঁদের মতে, বন্দিটি সেই সময়ে খাবার খাওয়া, মদ্যপান করা, শুয়ে থাকা, হাই তোলা এবং নিজের ওপরে নিজে রাগ দেখানো ছাড়া আর কিছুই করেননি। সেই সময়ে তিনি বইও পড়েননি। অনেক রাতে তিনি লিখতে বসতেন। তারপর, সারা রাত ধরে লিখতেন এবং সকাল হলেই সেই লেখা ছিঁড়ে ফেলে দিতেন। আর তারই সঙ্গে, মাঝে মাঝেই তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যেত।
ষষ্ঠতম বছরের মাঝের দিকে বন্দিটি হঠাৎ প্রচুর আগ্রহ নিয়ে নানা ধরণের ভাষা, দর্শন এবং ইতিহাস পড়তে শুরু করেন। এমন উৎসাহ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন যে ব্যাংকারের পক্ষে তাঁর চাহিদামতো বই জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ল। চার বছরে প্রায় ছয়শো বই তাঁর জন্য সংগ্রহ করা হয়।
এই সময়েই ব্যাংকার তাঁর কাছ থেকে একটি চিঠি পান—
“প্রিয় জেলার মহাশয়,
আমি ছয়টি ভাষায় এই চিঠি লিখছি। যারা এই ভাষাগুলো জানে, চিঠিটা তাদেরকে পড়তে দেবেন। যদি তারা একটিও ভুল না পায়, তবে বাগানে একটি গুলি ছোঁড়ার অনুরোধ রইল। সেই শব্দ আমাকে জানাবে যে আমার পরিশ্রম সফল হয়েছে। সব যুগের ও দেশের প্রতিভারা ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু তাঁদের বুকের মধ্যে একই আগুন জ্বলে। এই জ্ঞান অর্জন করে আমার আত্মা কত আনন্দ অনুভব করছে, তা যদি আপনি বুঝতেন!
ব্যাংকার কিন্তু বন্দির ইচ্ছে পূর্ণ করেছিলেন। তিনি বাগানে গুলি ছোঁড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
দশম বছরের পর বন্দি ব্যক্তি প্রায় নড়াচড়া না করে বসে কেবল বাইবেলের গসপেল পড়তেন। যে মানুষ চার বছরে ছশো বই পড়েছে, সে কীভাবে একটি সহজ বই নিয়ে প্রায় এক বছর কাটাতে পারে – এটা ভেবেই ব্যাংকার অবাক হতেন। বন্দি এরপর ধর্মতত্ত্ব এবং ধর্মের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
শেষ দুই বছরে তিনি এলোপাথাড়ি প্রচুর বই পড়েন। কখনো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, কখনো আবার বায়রন বা শেক্সপিয়র। কখনো একসঙ্গে রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, উপন্যাস, দর্শন—সবই চাইতেন। তাঁর পড়াশোনা দেখে মনে হতো যেন জাহাজডুবির পর একজন মানুষ ভাঙা কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।
বৃদ্ধ ব্যাংকার এসব কথা মনে করে ভাবলেন—
“আগামীকাল বারোটায় সে মুক্তি পাবে। চুক্তি অনুযায়ী, আমাকে কুড়ি লক্ষ টাকা দিতে হবে। যদি আমি টাকাটা দিই, তাহলে আমি শেষ হয়ে যাবো। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাব।”
পনেরো বছর আগে তাঁর টাকার কোনও হিসাব ছিল না। আর এখন তিনি নিজেই জানেন না যে তাঁর দেনা বেশি, নাকি সম্পদ। শেয়ারবাজারে দুঃসাহসী জুয়া, বেপরোয়া বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছে। “অভিশপ্ত বাজি!”– তিনি বিড়বিড় করে বললেন।
“লোকটা যদি মারা যেত! এখন সে চল্লিশ বছরের। সে আমার সব টাকা নিয়ে চলে যাবে। বিয়ে করবে। জীবন উপভোগ করবে। আর আমি ভিখারির মতো ওর দিকে তাকিয়ে থাকব। না। অনেক হয়েছে। এই দেউলিয়া আর লজ্জার হাত থেকে বাঁচার উপায় এখন একটাই রয়েছে। আর সেটা হল লোকটার মৃত্যু!”
রাত তিনটে বাজল। চারদিকে নিস্তব্ধতা। সবাই ঘুমোচ্ছে। হিম শীতল গাছের মর্মর ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ব্যাংকার নিঃশব্দে পনেরো বছর ধরে খোলা না হওয়া অগ্নি-প্রতিরোধী সিন্দুক থেকে চাবি বের করলেন। তারপর কোট পরে বাইরে বেরোলেন।
বাগানে অন্ধকার এবং ঠান্ডা। তাঁর মধ্যে আবার বৃষ্টি পড়ছে। ঝোড়ো হাওয়া বইছে। ব্যাংকার তাঁর চোখে চাপা দিলেন। কিন্তু পৃথিবী, মূর্তি, ঘর, গাছ – কিছুই দেখতে পেলেন না তিনি। কষ্ট করে কুঠির দিকে এগিয়ে দারোয়ানকে ডাকলেন। কিন্তু কোনো সাড়া পেলেন না। তিনি বুঝলেন ব্যাটা এই খারাপ আবহাওয়া থেকে বাঁচতে নির্ঘাত রান্নাঘরে বা গ্রিনহাউসে ঘুমিয়ে পড়েছে।
“আমি যদি কিছু করি, সন্দেহ প্রথমে দারোয়ানের ওপরেই পড়বে, তিনি ভাবলেন।
অন্ধকার হাতড়ে তিনি দরজার কাছে পৌঁছে অবশেষে ভেতরে ঢুকলেন। দেশলাই জ্বালিয়ে দেখলেন, কোথাও কেউ নেই। এখানে একটা বিছানা-হীন খাট এবং ঘরের কোণে একটা স্টোভ আছে। ব্যাংকার আরও দেখলেন, বন্দির ঘরের দরজা ঠিকঠাক করেই বন্ধ করা রয়েছে।
দেশলাই কাঠিটি নিভে যেতেই বৃদ্ধ মানুষটা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেন। তিনি দেখতে পেলেন, একটা মোমবাতি বন্দির ঘরে আবছা ভাবে আলো দিচ্ছে। বন্দিটি টেবিলে বসে আছেন। পিঠ, মাথার চুল এবং তাঁর হাতটুকু ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বেশ কিছু খোলা বই তাঁর টেবিলের ওপরে, দুটো আরাম কেদারার ওপরে এবং কার্পেটের ওপরে পড়ে রয়েছে।
পাঁচ মিনিট কেটে গেল। কিন্তু বন্দি একটিবারের জন্যেও নড়লেন না। পনেরো বছরের বন্দি জীবন তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে এতটুকুও না নড়ে বসে থাকা যায়। এরপরে ব্যাংকার বন্দির জানলায় আস্তে আস্তে টোকা দিলেন। কিন্তু বন্দি প্রত্যুত্তরেও এতটুকু নড়লেন না।
এবারে ব্যাংকার দরজার সিল ভেঙে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি আশা করেছিলেন পায়ের শব্দ বা আতঙ্কের চিৎকার যা হোক কিছু তিনি শুনতে পাবেন। কিন্তু তিন মিনিট কেটে যাওয়ার পরেও ঘর একইরকম শান্ত রইল। ব্যাংকার ভেতরে যাবার জন্যে মনস্থির করলেন।
ভেতরে ঢুকে তিনি দেখলেন টেবিলে একটি লোক নিশ্চল হয়ে বসে আছেন। লোকটি যেন একটা কঙ্কাল। বন্দির চামড়া হাড়ে লেগে আছে। তাঁর চুল লম্বা, এলোমেলো দাড়ি, চোখ বসে গিয়েছে। মুখের রঙ হলুদ। তাতে মাটির আভা। বন্দির দুই গালে গর্ত। হাতদুটো রোগা আর সরু। এই হাত দুটোর ওপরে হেলান দিয়েই যেন তাঁর এলমেলো মাথাটা ঠেকনা দিয়ে রয়েছে। তাঁর রূপ দেখে বোঝার উপায় নেই যে তাঁর বয়স মাত্র চল্লিশ।
তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। টেবিলের ওপরে বন্দির ঝুঁকে থাকা মাথার পাশে একটি কাগজ পড়ে ছিল। তাতে মুক্তোর মতো ঝকঝকে হাতের লেখায় কিছু লেখাও ছিল।
–বেচারা! – ব্যাংকার বিড়বিড় করলেন। –বেচারা নির্ঘাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কুড়ি লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখছে! আমি এই আধ-মরা লোকটাকে তুলে ওর বিছানায় ছুঁড়ে মারবো। তারপর একটা বালিশ মুখে চাপা দিয়ে … এক্সপার্টরা এসে হিংসাত্মক মৃত্যুর কোনও চিহ্নও দেখতে পাবে না। কিন্তু তাঁর আগে চিঠিটা পড়া দরকার।
ব্যাংকার টেবিল থেকে কাগজটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন —
“আগামীকাল ঠিক বারোটার সময়ে আমি আবারও স্বাধীনতা ফিরে পাব এবং আমি আবারও অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারব। কিন্তু তার আগে সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে আমি তোমায় বলতে চাই— স্বাধীনতা, জীবন, স্বাস্থ্য—যাকে তোমাদের বইয়ে “ভাল জিনিস” বলে উল্লেখ করা রয়েছে, তাদের কোনও মূল্য আমার কাছে নেই।
পনেরো বছর আমি বইয়ের মধ্যে দিয়ে জীবনকে জেনেছি। আমি মদ পান করেছি, গান গেয়েছি, জঙ্গলে পশু শিকার করেছি, প্রেম করেছি, এলবুর্জ, মন্ট ব্লানের মতো পাহাড়ে উঠেছি, সেখান থেকে সূর্যোদয় দেখেছি, সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মাথার ওপরে বিদ্যুৎ ঝলকাতে দেখেছি। আমি প্রকৃতিকে দেখেছি। সবুজ পাহাড়, জমি, নদী, হ্রদ, শহর – সব দেখেছি। আমি এই সবই দেখেছি বইয়ের মাধ্যমে।
আমি বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করেছি। যুগে যুগে মানুষের বিশ্রামহীন চেষ্টায় যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, তা আমার মস্তিস্কের ক্ষুদ্র পরিধিতে সংকুচিত হয়ে আছে। আমি জানি, আমি সকলের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী।
তোমাদের বই, জ্ঞান, পৃথিবীর আশীর্বাদ – এই সব কিছুকে আমি এখন ঘৃণা করি। সবই মরীচিকার মতো মূল্যহীন, মায়াবী এবং প্রতারণাপূর্ণ। তুমি নিজেকে জ্ঞানী ভাবতেই পারো। নিজের জন্যে গর্ব বোধও করতে পারো। কিন্তু এই সবই ক্ষণস্থায়ী। শুধুই মায়া। মৃত্যু তোমার সবকিছুকে মুছে দেবে। সে তোমায় বলে দেবে, তুমি মাটির নিচে ধার করা ইঁদুর ছাড়া আর কিছু নও। তোমার সমৃদ্ধি, তোমার ইতিহাস বা তোমার অমর প্রতিভারা পৃথিবীর সঙ্গে জ্বলে উঠবে বা জমে যাবে।
তোমরা ভুল পথে আছো। তোমরা মিথ্যাকে সত্য বলে মনে করছো। কদর্যতাকে সৌন্দর্য বলে ধরে নিয়েছ। তুমি যেমন আশ্চর্য হবে যদি তুমি দেখো আপেল বা কমলা লেবু গাছে ফলের বদলে ব্যাং বা টিকটিকি জন্মেছে অথবা গোলাপের গায়ে ঘর্মাক্ত ঘোড়ার শরীরের গন্ধ, ঠিক তেমনই আমি আশ্চর্য হয়েছি এটা দেখে যে তুমি আমায় পৃথিবী দেওয়ার বদলে স্বর্গ দিয়ে দিয়েছ।
আমি প্রমাণ করতে চাই যে, তোমরা যেসব জিনিসকে সুখ বলো, আমি তাদেরকে তুচ্ছ বলে মনে করি। আর তাই আমি কুড়ি লাখ টাকা ত্যাগ করছি। এই টাকাটাকেই আমি একদিন স্বর্গীয় সুখ বলে মনে করতাম। কিন্তু আজ তাকেই তুচ্ছ বলে মনে করি। নিজেকে যাতে সেই কুড়ি লাখ টাকা থেকে বঞ্চিত করতে পারি, তাই আমি নির্ধারিত সময়ের পাঁচ ঘণ্টা আগে এই স্থান ত্যাগ করব। এর ফলে আমি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ফেলব।
চিঠিটা পড়ে ব্যাংকার কাগজটা টেবিলের ওপরে রেখে দিলেন। তারপর, সেই আশ্চর্য মানুষটির মাথায় চুমু খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিজেকে নিজের ভীষণ রকম ঘেন্না লাগছে। স্টক এক্সচেঞ্জে অনেক ক্ষতির পরেও এত ঘেন্না নিজেকে কখনও করেননি তিনি। নিজের ঘরের খাটে শুয়েও এই কষ্টে বহুক্ষণ ঘুমোতে পারলেন না তিনি।
পরদিন সকালে পাহাড়াদারেরা ফ্যাকাশে মুখে খবর নিয়ে এল, লোকটি জানালা দিয়ে বেরিয়ে পালিয়ে গেছে। ব্যাংকার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির পরিচারকদের সঙ্গে বাগানের কুঠিতে গিয়ে বন্দির পালানো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে এলেন।
যাতে কেউ জানতে না পারে বা যাতে এই নিয়ে কোনও সমালোচনার সৃষ্টি না হয়, ব্যাংকার কাগজটি নিয়ে সিন্দুকে লুকিয়ে রাখলেন।
