হরিণী (হিরণী কহাণী)
মূল গল্প: চন্দ্রকিরণ সৌনরেক্সা
অনুবাদ: আইভি চট্টোপাধ্যায়
কালো ইটালিয়ান কাপড়ের লাল গুটিওয়ালা চুড়িদার পাজামা আর সবুজ ফুল ফুল ছাপ গোলাপী লম্বা কুর্তা পরেছিল ও। কুসুম কুসুম লাল রঙের ওড়না এলোমেলো হয়ে কাঁধের পেছনে ঝুলছিল,তাতে ঢিলে কুর্তায় ঢাকা ওর চওড়া বুক আর সুপুষ্ট গোলক দুটো ঝলসে উঠছিল। লম্বা মজবুত মাংসল হাতে দপদপিয়ে হলুদ কুটছিল ও। হাতের মোটা মোটা সবুজ চুড়ি আর রূপোর মোটা কঙ্গন ঝনক ঝনক শব্দ করছিল। সেই তালে তালে ও গাইছিল –
‘হুলর হুলর দুধ গেরে মেরী গায়… আজ মেরা মুন্নীলাল জীওয়েগা কি নায়…’
গলার আওয়াজে অদ্ভুত মাদকতা। ভারি আকর্ষক। গ্রাম্য গীতের এই একটা পংক্তি কড়া রোদের দুপুরে কানে মিছরির মতো মিষ্টি হয়ে বিন্দু বিন্দু ঝরে পড়ছিল। কিছুক্ষণ আমি ছাদের কার্ণিশের আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম। না হলুদ কোটা বন্ধ হচ্ছে, না গানের একটা পংক্তি গাওয়া বন্ধ হচ্ছে… ‘হুলর হুলর…’
গরমে আমার পায়ের তলা পুড়ে যাচ্ছে, তো আমি ভাবলাম ঘরে ফিরে যাই। তখনি বৌদি পেছন থেকে জোরে ডেকে উঠল, ‘খুদেইজা! ওরে দ্যাখ, এই হল আমাদের বিবিজি। লুকিয়ে লুকিয়ে তোর গান শুনছিল।’
অমনি ও মুসেলি হলুদের গোটাগুলো ছেড়ে ওপরের দিকে তাকালো, আর হেসে উঠল। তারপর নিজের মাথায় হাত রেখে বলল, ‘সালাম বিবিজি। কত সৌভাগ্য আমার যে আজ তোর দর্শন পেলাম।’
একটু অস্বস্তি হল। বাড়ির পেছনদিকের বাড়িটায় নতুন প্রতিবেশী এসেছে, দিন পনেরো হল। বৌদির কাছে বেশ কয়েকবার খুদেইজার কথা শুনেছি। আর এটাও জেনেছি যে ও আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়,কথা বলতে চায়। তবু আমি নিজে থেকে ওর সঙ্গে আলাপ করতে আসিনি। আমার মনে হয়েছিল, একটা নেহাতই গেঁয়ো মেয়ের সঙ্গে কি নিয়ে কথা বলব!
অস্বস্তি কাটানোর জন্যে তাড়াতাড়ি বললাম, ‘ভাভী, তোমার গানের গলা তো ভারি মিষ্টি… আর একবার তোমার গানটা গাও না!’
‘এহে বিবিজি, আমার গলা! তুমি কেমন বাজনা বাজিয়ে গান গাও, আমার গান তার কাছে কোথায় লাগে?’ ও উত্তর দিল। বলার মধ্যে কোনও নালিশ নেই, তিক্ততা নেই, আন্তরিক ভাবেই বলল।
‘না না, তুমি গাও… পুরো গানটা গাও’, আমি জোর দিয়ে বললাম।
দ্বিতীয়বার অনুরোধ করার আগেই ও গাইতে লাগল, সেই মৃদু মৃদু মিষ্টি গলায়…
‘হুলর হুলর দুধ গেরে মেরি গায়।
আজ মেরে মুন্নীলাল জীওয়েগা কি নায়।
ইস সাসু কী নজর বুরী হ্যায়, মেরি মায়।
আজ মেরে মুন্নীলাল জীওয়েগা কি নায়।’
আমার মনে হল, ও গলা চেপে রেখে গাইছে।
‘ভাভী, পুরো গলা খুলে গান গাও’, আমি অনুরোধ করলাম।
পিষে ফেলা হলুদটা ছাঁকনিতে উল্টে দিয়ে আঙুল তুলে নিচের উঠোনের দিকে ইশারা করল, ‘ফুফ্ফী ঝগড়া করবে।’
বৌদি বলল, ‘তোর ফুফফী মরুক গে যাক। বিবিজি, খুদেইজা খুব ভালো নাচতেও পারে। ও খুদেইজা, একটু নাচ দেখা না!’
ও একটু লজ্জা পেয়ে গেল। ওড়নায় মুখ ঢেকে হাসতে লাগল।
‘তাই নাকি ভাভী? তুমি নাচতেও পারো? তাহলে তো নাচ দেখতেই হচ্ছে। একটু নেচে দেখাও।’ বৌদির সায় পেয়ে আমিও বললাম।
তবে ও যে সত্যিই নাচবে, আমি একটুও আশা করিনি। আমাদের শহরের লেখাপড়া জানা মেয়েদের সামনে বারবার হারমোনিয়াম-তবলা রেখে, বারবার অনুরোধ করার পর মেয়েরা প্রথমে নানা অজুহাত দেখিয়ে গান না গাইবার কথা বলে… তারপর আবার বারবার অনুরোধ…আপনি অমুকের জন্মদিনে কিংবা তমুকের বিয়ের সময় ওই গানটা গেয়েছিলেন ধরনের অনুরোধ…তখন গলা খারাপ থাকার ভান করে। তারপর অনেক সাধ্যসাধনা করার পর এক দু’কলি সুর বাজিয়ে, একটু গান গেয়ে ঢং করে বলবে,’ দেখছেন তো, সত্যিই গাইতে পারি না। আপনি শুধুশুধুই বলছেন বারবার।’
ব্যস, গান গাওয়া হয়ে গেল।
‘নাচ না, খুদেইজা! আচ্ছা, বিবিজির কথা রাখবি না তো?’ বৌদি বলল, ‘বেশ,আমি চলে যাচ্ছি।’
তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল ও, ‘না না,যেও না। তুঝে আল্লাহ পাক কী কসম সরসুতী বিবি। নে, আমি নেচে দেখাচ্ছি… কিন্তু বিবিজির কী আমার নাচ ভালো লাগবে?’
যদিও ওর পায়ে কড়া পড়ে গেছে, পায়ের নুপুর চেপে বসেছে পায়ের পাতায়…তবু ও উঠে দাঁড়াতে খনক খনক করে বেজে উঠল নূপুর। ওড়না মাথায় দিয়ে, খানিকটা ঘোমটা টেনে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, ’নাচি?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ!’
‘কি গাই বলো তো সরসুতী!’
‘যা হয় গা। ওই গানটা… লটক রহতী ববুয়া…’
ও গাইতে লাগল, ‘লটক রহতী ববুয়া তোরে বঁগলে মেঁ,
জো ম্যায় হোতি বাগোঁ কী কোয়েল,
কূক রহতী, ববুয়া তোরে বঁগলে মেঁ।’
কোনও শাস্ত্রীয় নৃত্যকলার মধ্যে পড়ে না ওর নাচ। কত্থক নয়, কথাকলি নয়, মণিপুরী ওডিসি ভারতনাট্যম… কোনোটাই না। হাতের সঞ্চালনে কোনও শিক্ষিত গভীরতা নেই। কিন্তু ওর নাচে সহজ,সরল একটা লয়, গতি… দ্রুত এবং প্রবহমান … জীবনীশক্তিতে ভরপু। আস্থায়ীর সমে এসে নাচের সময় ও দু’ফুট ওপরে লাফিয়ে উঠল, পাখির মতো। আবার মাটিতে পা পড়া মাত্র থিরথির তরঙ্গে বইতে লাগল…একবারের জন্যে থামেনি পায়ের পাতা। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা যুবতী শরীরটা নাচের তালে, লাবণ্যে সোনার মতো উজ্জ্বল আলো আলো…লালিমায় লাল, অপরূপ মোচড়।
গান শেষ হল। নাচ থামিয়ে ও লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে লাগল।
‘সাবাশ ভাভী!’ আমি সোত্সাহে বললাম, ‘সত্যিই খুব ভালো নাচো তুমি।’
‘সত্যি? তোমার ভালো লেগেছে আমার নাচ!’ বিড়ালের চোখের মতো সহজ স্বচ্ছতা ওর দু’চোখে। আয়নার মতো ঝলমলে দু’চোখ উত্সাহে চিকচিক করে উঠল। সরল মুখে বলল,’আরো নেচে দেখাব?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ!’ কার্ণিশের আড়ালে দাঁড়িয়েও পা জ্বলে যাচ্ছে,তবু নিচে যেতে ইচ্ছে করছিল না।
ও ওড়নায় মুখের ঘাম মুছল। তারপর পায়ে ঠুমকা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
ঠিক এই সময় নিচে থেকে কারো তীক্ষ্ণ রাগী গলা ভেসে এল, ‘ওরে ঘোড়া! লাফানো বন্ধ কর। শফিকের আব্বা এসে গেছে।’
খুদেইজার পা থেমে গেছে, যেন দ্রুত গতিতে ঘুরন্ত লাট্টুর ওপরে হাত রেখেছে কেউ। পলকে হাসিমুখের ওপর উদাস ছায়া। বৌদির চোখে চোখ পড়তেই একটু হাসল, ‘দেখলে? চিত্কার শুরু হয়ে গেল তো! পারলে ফুফী আমায় বাক্সে বন্ধ করে রেখে দেবে।’
অস্পষ্ট গানের কলি গুনগুনিয়ে উঠল, ওড়না দিয়ে মুখে হাওয়া করতে লাগল।
নিচে থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিল ওর শাশুড়ি,বলতে বলতে আসছিল, ’খুদেইজা,তুই তো দেখছি সমস্ত লজ্জা-হায়া শরম গুলে খেয়ে ফেলেছিস। আরে, তুই কী নটনীর মেয়ে নাকি? কঞ্জরী বেশ্যা মেয়েদের মতো সর্বক্ষণ গান গাইছিস…বেহায়া কোথাকার….!’
খুদেইজা চমকে উঠল। রাগে ওর গমের রঙের মুখ সিঁদুরের রঙ হয়ে উঠল।
‘ব্যস, ফুফফী, নিজের মুখ বন্ধ রাখ। নটনী তুই, তোর মা। আমাকে কঞ্জরী-বঞ্জরী বলিস যদি, তাহলে তোর একদিন কি আমার একদিন।’
‘হা পরবরদিগার’, শাশুড়ি ওপরে উঠে এসেছিল। আকাশের দিকে দু’হাত তুলে বলল, ‘আল্লাহ তোর ওপর অভিশাপ ফেলুক। তোর ভাই মরুক। তুই তো আমার খানদানের মান-মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দিলি। আমার শফিকের কপালে তুইই ছিলি! হায় আল্লাহ, কেমন মুখ,কেমন মুখের ভাষা! ইচ্ছে করে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে দিই…’
আর ফুফী নাকিসুরে কেঁদে কেঁদে আল্লাহকে ডাকতে লাগল। আমি বৌদির হাত ধরে টেনে নিয়ে নিচে নেমে এলাম। রাগ করে বললাম, ‘এইই তোমার বন্ধু!’
বৌদি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আমার বন্ধুর কী দোষ,বিবিজি? তোমাকে যদি কেউ জেলখানায় বন্ধ করে রেখে তোমার বাপ-ভাইকে গালাগাল দেয়, কতদিন সহ্য করবে? কতদিন শুনবে? ও তো রোহতকের অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। শহরে যেমন হয়, মুখে রাম বলছে আর বগলে ছুরি নিয়ে ঘুরছে, সেই সভ্যতা তো চেনে না ও। ওকে তুমি ‘তু’ বলবে, তো তুমিও ‘তু’ শুনবে! এমনিতে ওর মনটা এত ভালো যে কারো এতটুকু কষ্ট দেখতে পারে না। ও বদমেজাজ দেখানোর কথা ভাবতেই পারে না।’ বৌদি একটু অপ্রসন্ন মুখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
পরের দিন মাথার চুল ধুয়ে শুকোনোর জন্যে পেছনের ছাদের দিকে গেলাম। খুদেইজাকে একবার দেখার লোভও একটা কারণ। ও নিজেদের ঘরের রোয়াকে বসে কিছু একটা সেলাই করছিল, আর গুনগুনিয়ে গান গাইছিল।
আমি আস্তে কাশলাম। সেই আওয়াজ শুনে ও ঘাড় উঁচু করে তাকাল। আমাকে দেখেই মুখ আনন্দে গোলাপ ফুলের মতো সুন্দর হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি কপালে হাত রেখে বলল, ‘সালাম বিবিজি। ভালো আছ তো?’
‘সালাম!’ আমি উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী সেলাই করছ?’
‘কি যে বলি বিবিজি! বেচারী ফুফফীর হাতে চুলকুনি হয়েছে। হা আল্লাহ, এমন সাংঘাতিক ঘা হয়েছে যে বেচারী নিজের হাতে খেতে পর্যন্ত পারছে না। ফুফফীর পাজামা এটা, ছিঁড়ে গেছে.. তাই সেলাই করে দিচ্ছি।’
কালকের ঘটনা মনে পড়ে গেল। আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শাশুড়ির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে? ঝগড়া মিটে গেছে?’
খুদেইজা হাসল, ‘শাশুড়ি-বউয়ের মধ্যে আবার ঝগড়া কিসের, বিবিজি! তবে আমাকে যদি কেউ গালাগালি দেয়, তাহলে আমিও ঝাড়া জবাব দিয়ে দেব।’
‘তবু…ভাভী… এবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তো তোমার একটুও বনে না। তোমার বাবা তোমাকে শহরে বিয়ে দিলেন কেন?’
খুদেইজার গলায় উদাস মনখারাপের সুর, ‘বিবিজি,আমার বাপ তো খুব গরীব। আব্বা, আমার শ্বশুর, আমাকে গাঁয়ে কারো বাড়িতে দেখে পছন্দ করেছিল। কাকার কাছে আমাকে এবাড়ির বউ হিসেবে চেয়ে নিয়েছিল। কাকাও সিধেসাধা লোক,শ্বশুরের কথায় মন গলে গেছিল…কাকাই বা জানাবে কি করে যে শহরের ঘরগুলো জেলখানার মত হয়!’
‘তোমাদের গ্রামে মেয়েদের পরদা করতে হয় না?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘বিবিজি, মেয়েদের কোথায় পরদা করতে হয় বলো তো? যেখানে মানুষের মনে পাপ থাকে। গ্রামে সবাই বউ কিংবা মেয়ে। পরদা করতে গেলে খেতে, কেয়ারি করতে পারবে মেয়েরা? কাজ করবে কী করে?’
‘তাই তুমি এত গান মনে রেখেছ’, আমি মজা করলাম, ‘বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে ঘুরতে নিশ্চয়।’
কথাটা শুনেই যেন সুখের স্মৃতির পুলক জাগল ওর মনে, ‘জানো বিবিজি, শ্রাবণ মাসে আমরা সব মেয়েরা নিমগাছে দোলনা টাঙিয়ে মাঝরাত পর্যন্ত হুল্লোড় করতাম, নাচতাম, গাইতাম। বিয়ে-শাদি হলে সারা রাত ধরে চাঁদের আলোয় নাচগান হত। সব বহু-বিটিরা গান গাইত আর বড়রা বুড়োরা চারপাইতে বসে শুনত।’
‘গ্রামের বউরাও পরদা করত না?’
‘আরে…পরদা আবার কী!’ ও ওড়না টেনে মুখ ঢেকে নিল, ’এইরকম। ব্যস,পরদা নেওয়া হয়ে গেল… কথাবার্তায় কোনও পরদা হয় নাকি? একটু ঘোমটা টেনে নিল, আর গান গাইতে লাগল।’
‘তাই নাকি!’ আমি চুপ করে গেলাম। সত্যি, হেড কনস্টেবলের ছেলের বউ হয়ে বড্ড গেরোয় পড়েছে বেচারা মেয়েটা। ওর জন্যে কষ্ট হচ্ছিল আমার।
‘বিবিজি, একটা গান গাই?’
‘গাও’, আমি খুশি হয়ে বললাম।
সঙ্গে সঙ্গে,সব কিছু ভুলে গিয়ে,গলার স্বর একেবারে পঞ্চমে তুলে গাইতে লাগল মেয়ে…
‘কোঠে উপর কোঠরী, জিসমে তপে তনূর,
গিন-গিন লাউঁ রোটিয়াঁ মেরা খানেওয়ালা দূর রী,
মেরী বালী কা বালা জোবনওয়া বটওয়া গুঁথন দে….!’
‘ওরে ও খুদেইজা!’ নিচে থেকে ওর শাশুড়ি চিত্কার করে ডেকে উঠল, ‘বজ্জাত! আসুক তোর ইয়ার, ওকে দিয়েই তোকে ঠিক করাব… কাল শফিক ট্যুর থেকে ফিরুক,তোকে কি করে মেরামত করি দেখিস।’
আর যায় কোথায়! শাশুড়ি-বউয়ে জোরকদমে ঝগড়া লেগে গেল।
পরের দিন আমি ছাদে যাইনি। কিন্তু তৃতীয় প্রহরে বৌদি যখন এসে বলল খুদেইজা ছাদে বসে কাঁদছে,ওর স্বামী রাতে ওকে কাঠ দিয়ে মেরেছে, তখন আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। ওপরে গিয়ে দেখলাম,খুদেইজা ছাদে খাপরার ছোট ছাদের নিচে খাটিয়ার ওপর পড়ে আছে,খুব কাঁদছে।
‘ভাভী’, আমি নিচু গলায় ডাকলাম।
ও চমকে উঠল,তারপর উঠে বসল। চোখ ভরে জল,তবু হেসে উঠল, ’তুমি অনেকদিন বাঁচবে বিবিজি, আমি তো তোমার কথাই ভাবছিলাম। সালাম।
সালামের উত্তর দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাতে কী হয়েছে?’
‘কী হবে?’ গরম রাগী গলায় বলল,’ তোমার ভাই এসেছিল। ফুফী কি শিখিয়ে দিয়েছিল কে জানে, এসেই লাঠি হাতে তুলে নিল…’ বলতে বলতে ওর গলার আওয়াজ ঠান্ডা হয়ে এল, মুখে একটু হাসিও এল, ‘বিবিজি, কিছু বলল না, চিত্কারও করল না…আল্লাহ কসম…কাঠের তক্তা দিয়ে মারতে লাগল।’ পেছন ফিরে নিজের পিঠ দেখালো, শিরদাঁড়ার পাশে লম্বালম্বি কেটে গেছে।
সহানুভূতির গলায় বললাম, ‘রাম রাম। লোকটা একটা কসাই।’
খুদেইজা হাসতে লাগল, ‘বিবিজি, কি যে বলি তোমায়… দুনিয়া কি বলবে সেই লজ্জায় চুপ করে রইলাম… দুনিয়া বলবে মেয়েটা স্বামীর গায়ে হাত তুলেছে… নইলে আমি তো কাঠসুদ্ধ ওর পা এমন ভেঙে দিতাম, কুঁই কুঁই করত। ওর যত সেপাইগিরি, সব বেরিয়ে যেত।’ আর ওর সুপুষ্ট হাত দিয়ে কাপড় নিংড়ে দেবার অভিনয় করল।
খুদেইজা কথা বলতে শুরু করলে ওকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করত না। এমন নিষ্কপট সরল ভাবে কথা বলত, আমার মন মস্তিষ্কে একটা প্রভাব পড়ত…নেশা হয়ে যেত। নি:শব্দ নিঝুম মাঝরাতে ওর মিষ্টি গলা কানে আসত। আহা, ওকে যদি কিছুদিন অন্তত সঙ্গীত শিক্ষা দেওয়া যেত!
কথা বলতে বলতে হঠাত্ মনে হল, এ মেয়েটা আবার এখনই গান না শুরু করে দেয় … তাহলে আবার মার খাবে। ‘আমি আসছি এখন’ বলে তাড়াতাড়ি নিচে চলে গেলাম।
শুনলাম, ও পেছন থেকে ডেকে বলছে, ‘আল্লাহ কসম বিবিজি, তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু। তোমার বাজনাটা একদিন নিয়ে এসো। আমিও দেখি, কেমন করে বাজাও তুমি।’
ক’দিন আমার বৌদি অসুস্থ হয়েছিল। ছোট ভাইঝি কুসুমও সর্দিজ্বর হয়ে খুব ভুগল। প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেক মহিলাই খবর পেয়ে দেখতে এসেছিল। বাড়ির সব কাজ আমিই করছিলাম। তাই বাইরে বেরোনো দূরের কথা, ছাদে পর্যন্ত যেতে পারিনি। খুদেইজা বেশ কয়েকবার ওর ছোট্ট দেবরকে আমাদের বাড়ি পাঠিয়েছে। আমাকে ডেকে পাঠাচ্ছিল, কিছুক্ষণের জন্যে অন্তত ছাদে আসি যেন। ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারিনি।
সেদিন সবে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলেছি, ছোট ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে বোরখা পরে খুদেইজার শাশুড়ি এসে হাজির। ছেলেটা এসে আগে জিজ্ঞেস করে গেল, বাড়িতে কোনও পুরুষ আছে কিনা। নেই জেনে মহিলা ঘরে ঢুকল।
‘শরীর কেমন আছে, বৌমা?’
‘এখন একটু ভালো আছি’, বৌদি বলল, ‘আসুন আপনি। বিবিজি, এখানে একটা চেয়ার দিও।’
‘সত্যি বলতে কি… বৌমা, তুমি তো খুদেইজার ওপরে জাদু করেছ’, ফুফী চেয়ারে বসে বলল, ‘যখন থেকে তোমার শরীর খারাপের কথা শুনেছে, ডাঙ্গায় ফেলা মাছের মতো ছটফট করছে। ওই ঘাটের মড়া মেয়ে তো বোরখা তুলে নিয়ে চলেই আসছিল। অনেক কষ্টে আটকেছি। তুমি জানো বৌমা, আমাদের মধ্যে হিন্দুদের মতো গায়ে চাদর দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াবার রীতি নেই। যে এমনটা করবে, খুব বদনাম হবে তার। যাকগে, তোমার সঙ্গে তো নিজের লোকের সম্পর্ক… রাতের দিকে একবার ওকে নিয়ে আসব।’
‘ফুফীজি, তোমাদের মধ্যে অনেক আমীর ওমরাহ লোকজনকে দেখেছি আমাদেরই মতো বাইরে যাওয়া আসা করে।’ বৌদি গলা নামিয়ে বলল।
‘তুমি ওদের কথা বলছ! ওরা মুসলমানই নয়, যাদের মেয়েদের পায়ের নখটুকুও কোনও পর-পুরুষ দেখে ফেলে। শহরে ইজ্জতদার মুসলমানরা এমনই হয়। নীচু জাতের আর গেঁয়ো মুসলমানদের কথা বাদ দাও।’
তর্ক করে লাভ নেই। বৌদি অন্য কথাবার্তা বলতে লাগল।
রাত দশটার সময় খুদেইজা এল। সঙ্গে ফুফী, দুই দেবর আর ননদ। ঘরে ঢুকেই বৌদির গলা জড়িয়ে ধরল খুদেইজা… তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরল। কুসুমকে তো আদরে জড়িয়ে রেখেছে, ‘ওরে আমার মুন্নীলাল রে, কোন সতীনের নজর লেগেছে তোর ওপর! আমার বাছা,আমার সোনা,আমাদের কুলদীপ… কি গো সরসুতি, তুমি মেয়েটাকে পর্যন্ত অসুস্থ করে দিয়েছ?’
‘এই খুদেইজা! আস্তে কথা বল।’ ফুফী চাপা গলায় গর্জে উঠল, ‘কুলদীপের বাবা বৈঠকখানায় শুয়ে আছে।’
‘উফ ফুফফী!’ খুদেইজা ঝনঝন করে উঠল, ‘তোর এই আস্তে-আস্তে কথাটা শুনে শুনে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। এবার কী একটা হাঁড়ি নিয়ে মুখ গুঁজে কথা বলব?’
‘তোবা! তোবা!’ ফুফী রাগ চেপে চুপ করে গেল।
কিছুদিন ধরে খুদেইজার লেখাপড়া করার ইচ্ছে চাগাড় দিয়েছে। দেবরকে দিয়ে উর্দু ভাষার কায়দা আনিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছে। যখন ছাদে থাকে, আমাকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে। তবে ও অক্ষর মনে রাখতে পারে না। আলিফ বে মনে রাখতে পারে না, বরং গানের কথা ওর চট করে মুখস্থ হয়ে যায়। ফুফী যদি কখনো কোনও আত্মীয়ের বাড়ি যায়, তাহলে আর দেখতে হবে না। ছাদে নাচ গানের ঝড় তুলে ফেলবে, যতই সন্ধেবেলায় মারধর খাওয়া কপালে থাকুক।
বর্ণমালা কিছুতেই মুখস্থ থাকে না। ছাদে বসে এত দূর থেকে পড়ানো যায় না। তাছাড়া বাড়িতে ওর অনেক কাজ থাকে, কারণ ওর গোল গোল মোটা পুষ্ট হাত দেখে ফুফী আর তার নরম সরম মেয়েরা কোনও কাজে হাত লাগায় না। আর আমার নিজেরও লেখাপড়া আর গৃহস্থালির কাজকর্ম থাকে। আমার কিছু সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত থাকার ব্যাপার আছে।
শহরে একটা মিছিল বেরোবার কথা। আমি মিছিলে যাব বলে বেরোচ্ছিলাম।
‘বিবিজি, কোথায় যাচ্ছ?’ ও ছাদের ওপর থেকে ডাক দিল।
‘মিছিলে।’ আমি বললাম, ‘আজ খুব বড় মিছিল বেরোবে।’
‘হায় বিবিজি! আমি কী করে বেরোই এই জেলখানা থেকে!’ আকুল গলায় বলল খুদেইজা।
‘আচ্ছা, সালাম!’ আমি হাত নেড়ে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু মনটা খুদেইজার আর্তস্বরে আটকে রইল, ‘আমি কী করে এই জেলখানা থেকে বেরোই…!’
দশটা নাগাদ মিছিল আর মিটিং শেষ করে ফিরে দেখি বাড়ির পেছনদিকে গণ্ডগোল হচ্ছে। খুব হট্টগোল। বৌদি দরজা খুলে বলল, ‘বিবিজি, জানি না আজ খুদেইজার কপালে কি আছে। ফুফী নিজের মামার বাড়ি গেছিল। আর খুদেইজা আমাদের ছোটুকে চার টাকা দেবার লোভ দেখিয়ে ওকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল দেখতে চলে গেছিল।’
বৌদি ভয়ে চুপ করে গেল। আমিও ভয় পেয়ে গেলাম। আমরা দুজন ছাদে লুকিয়ে কান পেতে শুনতে লাগলাম।
খুদেইজার শ্বশুর বারবার বলছিল, ‘আজ ও আমার মাথার পাগড়ী পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিয়েছে… এই মহল্লায় এসে এই পড়শীদের সঙ্গে মিশে ও একদম গোল্লায় গেছে। একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। কালই এ বাড়িটা ছেড়ে দেব। এবার দুটো পাঁচিল দেওয়া বাড়ি নিতে হবে।’
দু’দিন পরে পেছনের বাড়িটা খালি হয়ে গেল। খুদেইজা কাঁদতে কাঁদতে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেল। পালকিতে বসেও জোরে জোরে কাঁদছিল মেয়েটা।
আর খুদেইজার খবর পাইনি। চার-পাঁচ বছর কেটে গেছে। এখন আমারও একটা ছোট্ট মেয়ে আছে । আমি মা হয়েছি। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো কমে গেছে। কোনও বন্ধনের নিষেধাজ্ঞা নয়, এমনিই গৃহস্থালির কাজ আর কন্যার দেখাশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি।
একটু সুযোগ পেয়ে দিল্লী বেড়াতে এসেছি। লালকেল্লা দেখা হয়েছে। শাহী হাম্মাম দেখতে গেছি, দেখলাম বোরখা পরে কিছু মেয়েরা ঘুরছে।
‘বিবিজি!’ হঠাত্ একজন বোরখা-পরিহিতা এসে আমার কাঁধে হাত রাখল।
অবাক হয়ে দেখি… খুদেইজা। লম্বা হলুদ রক্তশূন্য গালের হাড় বেরিয়ে গেছে, চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে… খুদেইজা। হ্যাঁ, খুদেইজা।
‘আরে ভাভী, তুমি! বাহ…’ আমি ওর দু’হাত জড়িয়ে ধরলাম।
‘বেশ আছ বিবিজি। আচ্ছা, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে? মুবারক ফিসফিস করে বলল খুদেইজা।
আর শুধুই নিজেকে চেনানোর জন্যে যে বোরখা তুলেছিল, সেটা দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল… যদিও ওখানে কোনও পুরুষ ছিল না।
খুদেইজার ব্যবহারে আমি অবাক হয়ে গেলাম। স্বচ্ছন্দ হরিণী এখন খুঁটিতে বাঁধা ছাগলে পরিণত হয়েছে।
‘ও বাবা! তুমি যে একেবারে বাঁধা গরু হয়ে গেছ ভাভী।’
‘সারাজীবন কি বোকা, বুদ্ধু থেকে যাব?’ মৃদুগলায় জবাব এল, ‘এখন আমার বুদ্ধি হয়েছে। আক্কেল হয়েছে।’
‘আচ্ছা! আক্কেল হয়েছে? খুব বড়দের মতো কথা বলছ। আমার তো ভাই, এখনো আক্কেল হল না। সেই আগের মতই ঘুরে বেড়াচ্ছি… বেলাগাম…নিজের মত….’
বোরখার জালের মধ্যে দিয়ে একবার আমাকে দেখল খুদেইজা। তারপর চোখ নামিয়ে নিল। ওর সঙ্গীরা ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে গেছিল। ওর ছোট্ট দেবর, যে এখন বারো-তেরো বছরের ছেলে হয়েছে, জোরগলায় মালিকের মতো হাঁক পাড়ল, ‘ভাভী!’
আর খুদেইজা যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামীর মতো পেছন ফিরে দেখতে দেখতে সেদিকে চলে গেল।
