মাছি (The Fly)
ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ড
অনুবাদ – মহুয়া সমাদ্দার
তোমার এখানে তো আরাম আয়েশ বেশ ভালই আছে, দেখছি! –বৃদ্ধ মিস্টার উডিফিল্ড ক্ষীণ স্বরে কথাটা বলেই একটি শিশু তার প্র্যাম গাড়ি থেকে যেমনভাবে উঁকি দেয়, তিনিও তেমন করেই তাঁর বড় সবুজ চামড়ার আরাম কেদারা থেকে তাঁর বন্ধু “বস”-এর ডেস্কের দিকে উঁকি দিলেন।
তাঁর বলার মতো কথা আর ছিল না। এখন তাঁর ঘরে ফিরে যাবার সময়। কিন্তু তাঁর অবসরের পর থেকে বা বলা ভাল তাঁর স্ট্রোক হবার পর থেকে তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর মেয়েরা তাঁকে শুধুমাত্র মঙ্গলবার ছাড়া আর একটি দিনও বাইরে বের হবার অনুমতি দেয় না। ফলে সপ্তাহের বাকি দিনগুলো তাঁকে ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে কাটিয়ে দিতে হয়। আর এই কারণেই তিনি এখনই ঘরে ফিরতে চাইছেন না।
মার্জিত পোশাক পরিয়ে, চুল আঁচড়ে কেবলমাত্র একটি দিনের জন্যে অর্থাৎ প্রতি মঙ্গলবার, তাঁকে শহরে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। বাইরে বেরিয়ে তিনি কী করেন তা অবশ্য তাঁর স্ত্রী এবং কন্যারা কল্পনাও করতে পারে না। তারা ভাবে মিস্টার উডিফিল্ডকে তাঁর বন্ধুরা নির্ঘাত পছন্দ করেন না! তিনি নিশ্চিত তাঁর বন্ধুদের বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠেন! কিন্তু সেটা যদি সত্যিও হয়, তাতেই বা কী যায় আসে! গাছ যেমন তার শেষ কয়েকটি পাতাকে বুকে আগলে রাখে, ঠিক তেমনই মানুষও তার শেষ বয়সের আনন্দগুলোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
বৃদ্ধ মিস্টার উডিফিল্ড তাই সেখানে বসে তাঁর সিগারেটে টান দিচ্ছিলেন এবং লোভাতুর দৃষ্টিতে তাঁর বন্ধু বসকে দেখছিলেন। বস তাঁর অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বস তাঁর চাইতে বছর পাঁচেকের বড় হলে কী হবে! বসের সুস্থ সবল, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, কর্মক্ষম শরীর দেখে তা বোঝবার জো নেই। বস এখনও নিজের অফিসের দায়িত্ব সফলভাবে পরিচালনা করে চলেছেন।
মুগ্ধ এবং একইসঙ্গে কিছুটা আফসোসের সুরে বৃদ্ধ মিস্টার উডিফিল্ড তাঁর বন্ধুকে আবারও বললেন – সত্যিই! এই জায়গাটা তো বেশ আরামদায়ক!
একটা কাগজ কাঁটার ছুরি দিয়ে ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বস মিস্টার উডিফিল্ডের কথায় সম্মতি প্রকাশ করে বললেন – হ্যাঁ। তা তো বটেই। আমার এই ঘরটি সত্যিই আরামদায়ক ঘরই বটে।
সত্যি কথা বলতে, বস তাঁর অফিস ঘরটি নিয়ে ভীষণ রকমই গর্বিত। কেউ যদি তাঁর এই ঘরটির প্রশংসা করেন, বিশেষত তাঁর বন্ধু বৃদ্ধ মিস্টার উডিফিল্ড যখন প্রশংসা করেন, তখন তাঁর একটু বেশিই ভাল লাগে। গলায় মাফলার জড়ানো বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষটার সামনে তাঁর এই সুন্দর, মার্জিত অফিস ঘরে বসে থাকতে পেরে বস এক গভীর তৃপ্তি অনুভব করেন।
তিনি বললেন – সম্প্রতি ঘরটা আমি নতুন করে সাজিয়েছি। গত বেশ কিছু সপ্তাহ ধরেই তিনি এমন কথা বলে চলেছেন।
নতুন কার্পেট। – বলেই তিনি গাঢ় লাল রঙের বড় বড় বৃত্ত আঁকা নকশা যুক্ত কার্পেটটার দিকে ইশারা করলেন। তারপরেই তিনি মাথা নেড়ে বিরাট বড় বইয়ের আলমারি এবং পাকানো গুড়ের মতো পা-ওয়ালা টেবিলের দিকে নির্দেশ করে বললেন – নতুন আসবাব! তিনি নতুন বৈদ্যুতিক গরম করার ব্যবস্থার দিকেও ইঙ্গিত করলেন। তামার একটি হেলানো পাত্রে পাঁচটি সসেজের মতো লম্বা ও নলাকার, এবং একইসঙ্গে মুক্তোর মতো উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক হিটিং রড তখন মৃদু আলো ছড়াচ্ছিল। সেগুলো দেখিয়ে তিনি নিজের আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করলেন।
তিনি সবই দেখালেন। কিন্তু তিনি বৃদ্ধ উডিফিল্ডের দৃষ্টি টেবিলের ওপর যে ছবিটি রয়েছে, তার দিকে আকর্ষণ করালেন না। ছবিটিতে স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কৃত্রিম পার্কের মধ্যে গম্ভীর মুখের এক তরুণ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তরুণের গায়ে সামরিক পোশাক। আর তার পেছনে রয়েছে ফটোগ্রাফারের বানানো কালো ঝড়ের মেঘের পটভূমি। ছবিটি মোটেই নতুন নয়। ছবিটি ছ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানেই রয়েছে।
কী একটা যেন বলবো তোমাকে! বৃদ্ধ উডিফিল্ড মনে করার চেষ্টা করলেন। পুরনো কথা মনে করার চেষ্টা করতে করতে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
কী যেন! কী যেন! উফ! সকালে বাড়ি থেকে বের হবার সময়েও মনে ছিল কথাটা! তাঁর হাত কাঁপতে শুরু করল। তাঁর দাড়ির ওপরের অংশে লালচে দাগ ফুটে উঠল।
বেচারা বুড়ো মানুষটা! আর বেশিদিন বাঁচবে না! বস মনে মনে ভাবলেন।
তারপর বস সম্ভবত তাঁর বন্ধুর জন্যে একটু সহানুভূতিই অনুভব করলেন। আর তাই তিনি বুড়ো লোকটির দিকে চেয়ে চোখ টিপে দিয়ে মজার ছলে বললেন – বলছি কী শোনো! আমার কাছে একটা জিনিস আছে হে, বুঝলে! আবার ঠান্ডায় বেরোনোর আগে এটা একটু খেলে তোমার খুব উপকার হবে। জিনিসটা দারুণ। এতে বাচ্চাদেরও কোনও ক্ষতি হয় না।
কথাটা বলেই তিনি তাঁর ঘড়ির চেন থেকে একটা চাবি খুলে নিলেন। তারপর তাঁর ডেস্কের নিচের আলমারিটি খুললেন। এবং সেখান থেকে একটা গাঢ় রঙের বোতল বের করলেন। বোতলটা একইসঙ্গে বেঁটে এবং মোটা।
এটাই হলো ওষুধ। – কথাটা বলে বস একটু থামলেন। তারপর তিনি আবারও বললেন – যাঁর কাছ থেকে আমি এটা পেয়েছি, তিনি আমাকে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে বলেছিলেন যে এটি তিনি ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ উইন্ডসর ক্যাসলের মদের ভাণ্ডার থেকে এনেছেন।
বৃদ্ধ উডিফিল্ডের মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। বস যদি টুপির ভেতর দিয়ে একটা খরগোশ বের করতেন, তাহলেও তিনি এতটা অবাক হতেন না।
–এটা হুইস্কি। তাই না, বলো? তিনি দুর্বল এবং ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করলেন।
বস বোতলটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোতলের লেবলটা তাঁকে দেখালেন। তারপর গর্বের সঙ্গে বললেন – এটা সত্যিই হুইস্কি।
মিস্টার উডিফিল্ড বিস্মিত দৃষ্টিতে বসের দিকে চেয়ে থেকে বললেন – তুমি জানো! বাড়িতে ওরা এসব জিনিস আমায় ছুঁতেও দেয় না! তাঁকে বড় অসহায় লাগছিল। মনে হচ্ছিল, তিনি বুঝি এক্ষুনি কেঁদেই ফেলবেন!
আহা! এইসব ব্যাপার আমারা পুরুষরা মেয়েদের চাইতে অনেক বেশি বুঝি! উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বস বলে উঠলেন। তারপর তিনি দ্রুততার সঙ্গে টেবিলের ওপর জলের বোতলের পাশে রাখা দুটি গ্লাস নিলেন এবং উদারভাবে প্রত্যেকটিতে এক আঙুল পরিমাণ হুইস্কি ঢেলে দিলেন।
এক ঢোকে খেয়ে ফেলো এটা। এতে তোমার উপকার বই অপকার হবে না। আর খবরদার! এর সঙ্গে জল মেশাবে না একদম। এমন উৎকৃষ্ট জিনিসে হাত দেওয়া বা তার স্বাদ নষ্ট করা একেবারেই উচিৎ নয়। এতে কিন্তু পবিত্র জিনিসের অবমাননা করা হবে।
আহ! এই বলে তিনি নিজের হুইস্কিটা এক ঢোকে শেষ করে ফেললেন। তারপর রুমাল বের করে তাড়াতাড়ি নিজের গোঁফ মুছে নিলেন এবং উডিফিল্ডের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন, উডিফিল্ড নিজের মুখের ভেতর হুইস্কিটা আস্তে আস্তে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে তার স্বাদ উপভোগ করছেন।
এক সময়ে বৃদ্ধ লোকটি হুইস্কি গিলে ফেললেন। তারপরে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দুর্বল কণ্ঠে বললেন, এর স্বাদ যেন বাদামের মতো!
হুইস্কি তাঁর শরীর ও মনকে উষ্ণ করে তুলল। হুইস্কির প্রভাব ধীরে ধীরে তাঁর দুর্বল মস্তিষ্ককে সচল করে তুলতে লাগল। আর তখনই তাঁর ভুলে যাওয়া কথাটি মনে পড়ে গেল।
এই তো মনে পড়ে গিয়েছে! তিনি বললেন। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অনেক কষ্ট করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
আমার মনে হয়, খবরটা তোমার জানা উচিত। হতভাগ্য রেজির কবর দেখতে গত সপ্তাহে আমার মেয়েরা বেলজিয়ামে গিয়েছিল। সেখানে ঘটনা চক্রে তারা তোমার ছেলের কবরটিও দেখতে পেয়েছে। যত দূর শুনেছি, আমাদের ছেলেদের কবর খুব কাছাকাছি রয়েছে।
বৃদ্ধ উডিফিল্ড একটু থামলেন। কিন্তু বস কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু তাঁর চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল। আর সেটাই জানান দিল যে তিনি কথাগুলো শুনেছেন।
বৃদ্ধ আবারও ক্ষীণ স্বরে বললেন, জায়গাটা যেভাবে রক্ষণাবেক্ষন করে, যত্ন করে রাখা রয়েছে, তা দেখে আমার মেয়েরা খুব খুশি হয়েছে। দুর্দান্ত রকম যত্ন করে রেখেছে ওরা। আমাদের ছেলেদের কবর বাড়িতে থাকলেও ওরা এত যত্ন পেত বলে মনে হয় না আমার! তুমি ওদিকে (ইউরোপে) কখনও যাওনি বোধহয়। ঠিক বলিনি আমি?
না। না। বস ওদিকে কখনও যাননি। নানা কারণে বসের কখনওই ওদিকে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
বৃদ্ধ উডিফিল্ডের গলা কাঁপছে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, যেদিকে তাকাবে সেদিকেই শুধু কবরস্থান দেখতে পাবে। মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধুই কবরস্থান। তবে দেখলে মনে হবে তুমি বুঝি বাগানে আছ। সবটাই বাগানের মতো পরিপাটি। সুন্দর। প্রত্যেকটা কবরের ওপরেই রঙ বেরঙের ফুল ফুটে রয়েছে। আর তার সঙ্গে রয়েছে সুন্দর রাস্তা। রাস্তাগুলো কী দারুণ চওড়া!
মিস্টার উডিফিল্ডের কণ্ঠ শুনে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে চওড়া, সুন্দর, পরিপাটি রাস্তা তিনি কতটা পছন্দ করেন!
আবারও কিছুক্ষণের জন্যে সব চুপচাপ হয়ে গেল । তারপর কোনও একটা কথা মনে পড়তেই বৃদ্ধের মুখ আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
হঠাৎ করেই প্রসঙ্গ পালটে বৃদ্ধ ক্ষীণ গলায় প্রশ্ন করে উঠলেন – হোটেলটা আমার মেয়েদের এক বোতল জ্যামের জন্যে কত টাকা নিয়েছিল, তুমি জানো?
দশ ফ্রা! এ তো পুরো ডাকাতি। তাই নয়, বলো?
গারট্রুড তো বলেইছে যে ওটা একটা ছোট্ট বোতল ছিল। কোনও মতেই ওর দাম আধ ক্রাউনের বেশি হওয়াই সম্ভব নয়। আর তাছাড়া ও তো এক চামচের বেশি জ্যাম খায়ওনি! তারপরেও বদমাসগুলো দশ ফ্রা দাম নিল! গারট্রুড অবশ্য ভালই শিক্ষা দিয়েছে ওদের। পুরো জ্যামের বোতলটাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ও। ওইটুকুনি জ্যামের জন্যে হোটেল যখন পুরো দাম আদায় করেছে, তখন বোতলটাই বা আনবে না কেন!
বেশ করেছে এনে। ওরা আমাদের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করছে।
সেই! ওরা ভাবে, আমরা যেহেতু আমাদের প্রিয়জনদের কবর দেখতে এসেছি, তাই দাম নিয়ে কিছু মনেই করবো না আমরা! যে কোনও দাম চাইলেই রাজী হয়ে যাব! হুহ! এটাই হল আসল ব্যাপার!
এরপর তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই, ঠিক বলেছ। একদম ঠিক বলেছ। বলে বস চেঁচিয়ে উঠলেন।
যদিও ঠিক কোন বিষয়ের জন্যে তিনি কথাটা বলেছেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। এতক্ষণ মনোযোগ সহকারে কথা না শোনার কারণেই এমনটা ঘটেছে, তা বলাই বাহুল্য।
বস তাঁর ডেস্কের পাশ দিয়ে উঠে এলেন। তারপর পা টেনে টেনে ধীরে ধীরে চলতে থাকা বৃদ্ধের পেছন পেছন দরজা পর্যন্ত গেলেন। তাঁকে বিদায় জানালেন।
উডিফিল্ড চলে গেলেন।
এরপর বেশ অনেকক্ষণ ধরে বস দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি চেয়ে ছিলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি ছিল শূন্য। ঠিক তখনই তাঁর ধূসর চুলের অফিস বার্তাবহক (মেসি) তাঁকে একভাবে লক্ষ্য করতে করতে নিজের ছোট্ট ঘর থেকে বারবার উঁকি দিয়ে বেরিয়ে আবার ভেতরে ঢুকছিল। মেসির ভাবটা ঠিক যেন একটা পোষা কুকুরের মতো। একটা পোষা কুকুর, তার মালিক তাকে বাইরে হাঁটতে বা দৌড়াতে নিয়ে যাবে আশা করে যেরকম ব্যবহার করে, মেসির আচরণও ছিল ঠিক সেই রকমের। সেও তখন একটা পোষা কুকুরের মতোই করছিল।
বস হুকুম জারি করলেন। বললেন – শোনো মেসি। সামনের আধা ঘন্টা সময় আমি কারও সঙ্গেই দেখা করবো না। বুঝতে পারলে? এই সময়ে কেউ যেন আমার ঘরে না আসে। কেউ না মানে কেউ না। বুঝেছ?
আচ্ছা স্যার। তাই হবে।
বসের ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। উজ্জ্বল কার্পেটের ওপর দিয়ে ভারী এবং দৃঢ় পদক্ষেপে বস এগিয়ে চললেন। তাঁর ভারী শরীর স্প্রিংওয়ালা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। তারপর তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে হাত দুটো দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন। যেন কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলেন।
তিনি কাঁদতে চেয়েছিলেন। তাঁর সত্যিই খুব কাঁদতে ইচ্ছে হয়েছিল। শুধু তাই-ই নয়। তিনি কাঁদার জন্যে নিজেকে প্রস্তুতও করেছিলেন।
যখন উডিফিল্ড হঠাৎ করে তাঁর ছেলের কবরের কথা বলেছিলেন, সেই কথা শোনার জন্যে সেই সময়ে বস মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে তা নিদারুণ আঘাত হয়ে তাঁর বুকে বিঁধেছিল।
তাঁর মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর মাটি ফাঁক হয়ে গিয়েছে। আর সেই মাটির মধ্যে শুয়ে রয়েছে তাঁর ছেলে। যার দিকে উডিফিল্ডের মেয়েরা নীচু হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। বিষয়টা সত্যিই বড় অদ্ভুত!
ছয় বছরেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। কিন্তু বসের স্মৃতিতে তাঁর ছেলে আজও ঠিক একই রকমের রয়ে গিয়েছে। কোনও ক্ষত চিহ্ন ছাড়াই। পরনে সেই সৈনিকের পোশাক। এখনও ঠিক সেভাবেই চির নিদ্রায় শুয়ে আছে।
–খোকা রে! ভীষণ যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন বস।
কিন্তু তবুও তিনি কাঁদতে পারলেন না।
প্রথম দিকে, ছেলের মৃত্যুর পর প্রথম কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত, শুধু “খোকা ” শব্দটা বললেই তিনি এমনভাবে ভেঙে পড়তেন যে প্রবল কান্না ছাড়া তাঁর যন্ত্রণা কিছুতেই মিটত না।
সেই সময়ে তিনি সকলকে বলতেন যে সময় অন্য সবার শোক ধীরে ধীরে মুছে দিতে পারলেও, সময় তাঁর শোক এতটুকুও কমাতে পারবে না।
অন্য মানুষেরা এক না এক সময়ে তাঁদের শোক ভুলে যায়। তারপর আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। কিন্তু তিনি তা পারবেন না। সেটা কীভাবে সম্ভব, হ্যাঁ? তাঁর ছেলেটিই তো তাঁর একমাত্র সন্তান ছিল!
তিনি তাঁর ছেলের জন্মের পর থেকেই তাঁর এই ব্যবসাটি তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। এতসব করেছিলেন কার জন্যে ? ওরই জন্যে তো! ছেলেটুকু ছাড়া তাঁর জীবনের আর কোনও অর্থই আছে নাকি !
তিনি এত বছর ধরে এত কঠোর পরিশ্রম করতে পেরেছিলেন শুধু একটা মাত্র কারণে। কারণ তাঁর মনে আশা ছিল যে একদিন তাঁর ছেলে তাঁর জায়গা নেবে এবং তাঁর সব কিছুর উত্তরাধিকারী হবে। আর একটু হলেই তো তাঁর সেই স্বপ্ন সত্যি হয়ে যেত!
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এক বছর ধরে তাঁর ছেলে অফিসের কাজের খুঁটিনাটি পর্যন্ত শিখে নিয়েছিল। প্রতিদিন সকালে তারা একসঙ্গে অফিসে যেত এবং একই ট্রেনে বাড়ি ফিরত। তাঁর ছেলেটা যে কী ভীষণ ভাল ছিল! ছেলের বাবা হিসেবে তিনি কত প্রশংসা যে কুড়িয়েছেন! তার ইয়ত্তা নেই।
অমন একটা দুর্দান্ত ছেলে যে দ্রুততার এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসার কাজকর্ম শিখে নেবে , এতে আর আশ্চর্যের কী আছে! আর সেই সঙ্গে অফিসে কী ভীষণ জনপ্রিয় ছিল ও! অফিসের সমস্ত কর্মচারী, তায় বৃদ্ধ মেসি পর্যন্ত তাঁর ছেলেকে ভালবাসত। কিন্তু তারপরেও ওর এতটুকুও অহংকার তো ছিলই না, বরং ও ছিল উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত একটি ছেলে। সবার সঙ্গে কী সুন্দর কথা বলত! তার মুখে ছিল চিরচেনা তারুণ্যের উজ্জ্বলতা। সে প্রায়ই বলত–দারুণ! একেবারে চমৎকার!
কিন্তু সবকিছুই কেমন যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর এমনভাবে শেষ হয়েছিল, যেন সেসব কোনও দিনও ঘটেইনি!
আর তারপর এল সেই অভিশপ্ত দিন! যেদিন মেসি তাঁর হাতে সেই টেলগ্রামটা তুলে দিয়েছিল। সেই টেলিগ্রামই তাঁর গোটা পৃথিবীটাকে ভেঙে চুরে তছনছ করে দিয়েছিল! তাঁর সব আশা আকাঙ্খা সেদিন এক নিমেষেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। টেলিগ্রামটা শুরু হয়েছিল – আপনাকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে!
সেদিন তাঁর জীবন একটা ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছিল। সেদিন তিনি যখন অফিস থেকে বের হয়েছিলেন, তখন তিনি আর আগের মানুষ ছিলেন না। তিনি তখন একটা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়া মানুষ ছাড়া আর কিচ্ছু ছিলেন না।
–ছ বছর! ছ ছটা বছর! উফ! সময় কত দ্রুত চলে যায়! মনে হচ্ছে যেন এই গতকালকেরই ঘটনা!
বস তাঁর মুখ থেকে হাত সরালেন। তিনি এখন কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করছেন। তাঁর মনের মধ্যে যেন কিছু একটা বদল ঘটে গিয়েছে। তাঁর মনে হলো, তাঁর নিজের মধ্যেই যেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। নইলে কেন তিনি আর আগের মতো করে কাঁদতে পারছেন না? কেন তিনি আর আগের মতো কষ্ট পাচ্ছেন না? ভেঙ্গে পড়ছেন না?
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ছেলের ছবির দিকে একবার তাকানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর মনে হল, ছবির দিকে তাকালে তিনি হয়ত আবারও আগের মতো করে কাঁদতে পারবেন। কিন্তু এই ছবিটা তো তাঁর প্রিয় ছবি ছিল না কখনও! এখানে তাঁর ছেলের মুখের অভিব্যক্তি মোটেই স্বাভাবিক নয়! ছবিটা কেমন যেন শীতল! কেমন যেন অন্যরকম। কিছুটা কঠোরও বটে! এই চেহারার সঙ্গে তাঁর ছেলের আসল চেহারার এতটুকুও মিল নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে বস লক্ষ্য করলেন যে একটি মাছি তাঁর চওড়া কালির দোয়াতে পড়ে গিয়েছে। তিনি আরও লক্ষ্য করলেন, মাছিটি দুর্বল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বসের মনে হল মাছিটার ছটফট করতে থাকা পা গুলো যেন চিৎকার করে বলছে – বাঁচাও। বাঁচাও।
কিন্তু কালির দোয়াতের ভেতরের দেওয়াল ভেজা ও পিচ্ছিল থাকায় মাছিটা বেরিয়ে আসতে তো পারলোই না, উলটে আবারও পিছলে নিচে পড়ে গেল এবং সাঁতার কাটতে শুরু করল। বস তৎক্ষণাৎ একটা কলম নিলেন। কলমের সাহায্যে তিনি মাছিটাকে কালি থেকে তুলে আনলেন। তারপরে সেটাকে ব্লটিং পেপারের ওপরে ঝেড়ে ফেললেন। এক মুহূর্তেরও কম সময়ের জন্য মাছিটা তার চারদিকে ছড়িয়ে থাকা কালির দাগের ওপর নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল।
তারপর মাছিটার সামনের পা দুটো নড়ে উঠল। সেগুলো কোনও রকমে একটু ভর পেতে না পেতেই সে নিজের ছোট্ট, কালি-ভেজা শরীরটাকে টেনে ওপরে তুলল। আর তারপরই তার ডানা থেকে কালি পরিষ্কার করার বিরাট কাজটা সে শুরু করে দিল। একটা পা বারবার ডানার ওপর এদিক ওদিক চলতে লাগল। ঠিক যেমন কাস্তে ধার দেওয়ার সময় পাথর কাস্তের ওপর এদিকে ওদিকে ঘষা হয়! মাছিটাও ঠিক তেমনভাবেই নিজেকে পরিষ্কার করতে লাগল।
এরপর সে একটু থামল। তার অবস্থা দেখে যে কারও মনে হবে যেন মাছিটি তার পায়ের আঙুলের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে সে একটি ডানা এবং তারপর অন্যটি মেলে ধরার চেষ্টা করল।
শেষ পর্যন্ত সে সফল হল। তারপর সে বসে পড়ে একটা পুঁচকে বিড়ালের মতো নিজের মুখ পরিষ্কার করতে শুরু করল। দেখে এমন মনে হতেই পারে যে, তার সামনের ছোট্ট ছোট্ট পা দুটো আনন্দের সঙ্গে আস্তে আস্তে একে অপরের সঙ্গে ঘষা খাচ্ছে। স্বভাবতই, তার ভীষণ বিপদ কেটে গিয়েছে। এখন সে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে আবারও নতুন জীবনের জন্যে প্রস্তুত।
ঠিক তখনই বসের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি তাঁর কলমটি আবারও কালিতে ডুবিয়ে দিলেন। তাঁর মোটা কবজি ব্লটিং পেপারের ওপরে রাখলেন। আর তারপরেই তিনি মাছিটার ওপরে একটা বড় কালির ফোঁটা ফেলে দিলেন। মাছিটা ঠিক সেই সময়েই ডানা মেলতে চেষ্টা করছিল।
এবার ওর কী হবে? সত্যিই কি আর কোনও উপায় আছে ওর? ছোট্ট হতভাগ্য মাছিটাকে দারুণ ভীত, অবাক এবং একইসঙ্গে আতঙ্কিত বলে মনে হল। এরপরে কী ঘটবে সেই কথা ভেবেই ও বোধহয় নড়াচড়া করতেও বেশ ভয় পাচ্ছে। কিন্তু ও হার মানল না। ভীষণ কষ্ট সহ্য করে সে নিজেকে ধীরে ধীরে সামনের দিকে টেনে নিয়ে চলল। ওর সামনের পাগুলো নড়ল। শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তারপর আগের চেয়ে আরও ধীরে সে আবার প্রথম থেকে নিজের শরীর পরিষ্কার করার কাজ শুরু করল।
–ছোট্ট প্রাণী। অথচ কী ভীষণ সাহসী! বস ভাবলেন। একইসঙ্গে তিনি মাছিটার সাহস দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি বুঝলেন, এইভাবেই কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়। এটাই হল সঠিক মানসিকতা। হার মেনে নেওয়া, কখনওই উচিৎ নয়। বিষয়টা হল গিয়ে …..
কিন্তু মাছিটা আবারও তার কঠিন-কাজ শেষ করতে না করতেই, বস দ্রুত হাতে কলমে আবার কালি ভরে নিলেন। তারপর মাছিটার সদ্য পরিষ্কার করা শরীরের ওপর আর-একটি বড় কালির ফোঁটা ফেলে দিলেন। ও এবার কী করবে? কী হবে এবার? এক যন্ত্রণাময় মুহূর্ত উত্তেজনার সঙ্গে কাটতে লাগল।
কিন্তু দেখো! কী আশ্চর্য! মাছিটার সামনের পাগুলো আবার নড়তে শুরু করল না ! এটা দেখে বস যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
তিনি মাছিটার ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়লেন। তারপর স্নেহের সুরে বললেন – ওহে, চালাক ছোট্ট দুষ্টু…
মাছিটা যাতে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যেতে পারে, তাই তিনি ওর গায়ে ফুঁ দেওয়ার বুদ্ধিও বের করে ফেললেন। কিন্তু তারপরেও মাছিটা যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। ওর চেষ্টার মধ্যে যথেষ্ট ভয় এবং একইসঙ্গে দুর্বলতা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছিল। তিনি যখন আবার গভীরভাবে কলমটি কালিতে ডুবালেন, তখন মনে মনে স্থির করলেন, আর নয়। এবারই হবে শেষবার।
হলও তাই। শেষ কালির ফোঁটাটা ভেজা ব্লটিং পেপারের ওপর পড়তেই সম্পূর্ণ ভিজে এলোমেলো হয়ে যাওয়া মাছিটা আর একটুও নড়ল না। ও ওখানেই পড়ে রইল। ওর পেছনের পাগুলো শরীরের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। সামনের পাগুলো তো দেখাই যাচ্ছিল না আর।
এই ওঠো। ওঠো! তাড়াতাড়ি করো! বস বললেন। তিনি তাঁর কলম দিয়ে একবার নাড়িয়েও দিলেন মাছিটাকে। কিন্তু লাভ হল না কিছু। নতুন কিছুই ঘটল না আর। অবশ্য নতুন কিছু ঘটার কোনও সম্ভবনাও ছিল না। কারণ, মাছিটা ততক্ষণে মারা গিয়েছে। কাগজ কাটার ছুরির ডগায় মাছিটার মৃতদেহ তুলে তিনি আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা গভীর দুঃখ আর অসহায়তার এক তীব্র অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল। ক্রমে এই অনুভূতি এতটাই প্রকট হয়ে উঠল যে তিনি এবারে সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি এবার তাড়াতাড়ি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ঘণ্টা বাজিয়ে মেসিকে ডাকলেন।
মেসি আসতেই তিনি কঠিন গলায় বললেন আমার জন্য এক্ষুনি কিছু নতুন ব্লটিং পেপার নিয়ে এসো মেসি। তাড়াতাড়ি করো।
মেসি ধীরে ধীরে চলে গেলে বস ভাবতে লাগলেন, একটু আগে তিনি কী নিয়ে চিন্তা করছিলেন? সেটা কী ছিল? সেটা ছিল…
তিনি রুমাল বের করলেন। রুমাল দিয়ে গলার কলারের ভেতরটা মুছে নিলেন। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও তিনি আর কিছুতেই মনে করতে পারলেন না।
