onubad-mod-o-jolporar-itibritto

মদ ও জলপড়ার ইতিবৃত্ত
শেরিডান লে ফানু
ভাষান্তর দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

(আইরিশ লেখক শেরিডান লে ফানুর অলৌকিকের দুনিয়ায় আয়ারল্যান্ডের সমাজ ও বিভিন্ন লৌকিক বিশ্বাসের বিশ্বস্ত ডকুমেন্টেশন ঘটে থাকে। এ গল্পটিতেও দক্ষিণ আয়ারল্যান্ডের সমাজের ছবি ও বিচিত্র লোকবিশ্বাসের কথা উঠে এসেছে অলৌকিকের মোড়কে। 1838 সালে ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকায় এই কাহিনি (The Ghost and the bone setter) প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত এটি তাঁর প্রথম ভৌতিক কাহিনিও বটে। পরবর্তীকালে গল্পটি তাঁর Purcell papers vol-1 বইতে সংকলিত হয়।)

আমার অতি সম্মানিত বন্ধু ফ্রান্সিস পুরসেল সম্প্রতি স্বর্গত হয়েছেন। গত অর্ধ শতাব্দি ধরে তিনি  দক্ষিণ আয়ারল্যান্ডের একটি ছোট্ট গির্জায় তাঁর মহৎ দায়িত্ব সসম্মানে পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নথিপত্রের মধ্যে আমি এই কাহিনিটি পাই। অবশ্য সে নথিপত্রে কেবল এই একটিই কাহিনি নয়, বেশ অনেকগুলিই আছে। আসলে দক্ষিণ আয়ারল্যান্ড হল হাজারো লোকগল্পের খনি। আমার বন্ধুটি গত পঞ্চাশ বছর ধরে সেই খনি থেকে বেশ কিছু মণিরত্ন উত্তোলন করে জমা করেছেন তাঁর নথিপত্রে। এইসব গল্পের অনুসন্ধান করা আর খুঁজে খুঁজে তাদের জোগাড় করে আনাটা আমার বন্ধুটির নিতান্তই একটা শখ বলে আমি জানতাম। কিন্তু অত্যাশ্চর্য আর উদ্ভট সেসব গল্পগাছায় তাঁর আকর্ষণ যে কতটা গভীর সে কথা আগে টের পাইনি। টের পেলাম, যখন তাঁর মৃত্যুর পরে খবর এল যে সেইসব  পাণ্ডুলিপির ভার তিনি তাঁর উইলে আমার হাতে সঁপে দিয়ে গিয়েছেন। অত্যন্ত সুলিখিত ও সুখপাঠ্য তারা।

অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন একজন আইরিশ যাজকের পক্ষে এহেন সব সাহিত্য লেখা কী করে সম্ভব হল এই ভেবে। তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, আইরিশ যাজকদের মধ্যে একটা শ্রেণী ছিলেন, যারা বিদেশে পড়াশোনা করবার কারণে আমাদের আয়ারল্যান্ডের তথাকথিত বিখ্যাত মে’নুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতদের থেকে সাহিত্যকর্মে অনেক বেশি পটু ছিলেন। তবে সে শ্রেণী এখন লুপ্তপ্রায় বললেই ভালো হয়।

এ গল্পে দক্ষিণ আয়ারল্যান্ড জুড়ে প্রচলিত একটা অন্ধবিশ্বাসের সত্যতা দাবি করা হয়েছে। বিশ্বাসটা এই- গোরস্থানে নতুন কাউকে গোর দেয়া হলে বেচারা সদ্যমৃতর ঘাড়ে একটা কাজ চাপে। গোরস্থানে তার পুরোনো যে ভাইবেরাদররা নরকের আগুনে জ্বলছে তাদের ভয়ানক জলতেষ্টা মেটাবার দায়িত্ব নিতে হয় তাকে।

বিশ্বাসটার শেকড় যে কত গভীরে তার একাধিক প্রমাণ পেয়েছে এই লেখক। যেমন ধরুন, টিপেরারি-র এক সম্পন্ন চাষির স্ত্রী মারা যেতে তার কফিনে সে বেচারাকে দুজোড়া দামি ‘ব্রোগ’ মানে মাঠেঘাটে চলবার জুতো ভরে দিতে দেখেছিলাম। তার একজোড়া শুকনো আবহাওয়ায় পরবার জন্য হালকা জুতো। আরেকজোড়া বেশ ভারী। বর্ষায় কাদা ঠেলে চলবার জন্য। তা নইলে বেচারা তার কবরখানার দোস্তদের জন্য জল জোগাড় করতে শীতগ্রীষ্ম রোজ রোজ বের হবে কী করে? এছাড়া ওসব অঞ্চলে মাঝেমধ্যে একই সঙ্গে দুটো শবযাত্রা বের হলে তাদের মধ্যে বেশ একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেতেও দেখেছি। কে আগে গোরস্থানে ঢুকতে পারবে তার জন্য হাডাহাড্ডি লড়াই চলে তখন। কারণটা সহজ- সর্বশেষ গোরস্থানবাসীর কাঁধেই তো জল জোটাবার দায় পড়বে! কাজেই দুই গোরস্থানযাত্রীর মধ্যে আগে যে কবরখানায় ঢুকবে সে সেই কঠিন কাজটা থেকে বেঁচে যাবে। এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ তো আবার কবরখানার পাঁচিল টপকে ভেতরে কফিন ছুড়ে ফেলে দিয়েও তাদের মড়ার আগে গোরস্থানে ঢোকা নিশ্চিত করে থাকে।

দক্ষিণ আয়ারল্যান্ড জুড়ে খুঁজলে এমন হাজারো উদাহরণ মিলবে। তবে সেসব নিয়ে সময় নষ্ট না করে আমি পাঠককে সরাসরি আসল কাহিনিতে নিয়ে যাব।

ড্রামকুলা-র স্বর্গত রেভারেন্ড ফ্রান্সিস পুরসেলের পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃত

এ কাহিনি আমি তার কথকের থেকে যেমনটা শুনেছি, যথাসম্ভব সেইভাবে বলবার চেষ্টা করব। ভদ্রলোক কথাবার্তাটা ভালোই বলতেন। দৃষ্টিভঙ্গী উদার ছিল। তাঁর চার্চের আওতায় থাকা গ্রামগুলোর ছেলেপুলেদের সাহিত্য, বিজ্ঞান এসব পড়াতেন। নাম টেরি নিল-

শুনতে হয়তো খানিক অদ্ভূতুড়ে ঠেকবে, কিন্তু এই গল্পটা একেবারে খাঁটি সত্যি। এই যে আপনি আমার সামনে বসে আছেন এটা যেমন একেবারে জলজ্যান্ত সত্যি, এই গল্পটাও তাই। আর, এ গল্প আমি যতটা রসিয়ে গুছিয়ে বলতে পারব, তেমন করে বলা আশপাশের এ চত্বরের দ্বিতীয় কারো সাধ্য হবে না এ আমি হলফ করে বলতে পারি। কারণ ঘটনাটা ঘটেছিল আমার বাবার সঙ্গে, আর বাবার মুখ থেকে আমি বহুবার এ গল্প শুনেছি। বাবা ছিল সাংঘাতিক সত্যবাদি। একজন নাইটের জবান মিছে হতে পারে, কিন্তু জানবেন, আমার বাবার গল্পে কখনো কোনো খাদ থাকবে না। গ্রামের কোনো গরিবগুর্বোর কোর্টকাছারিতে বাবা গিয়ে আদালতে দাঁড়ালে, সে যা জবানবন্দি দিত, সবাই তা মেনে নিত।

আদ্যন্ত সৎ মানুষ। একটু নেশাটেশা করত অবশ্য। কিন্তু খেতের কাজে কিংবা পুকুরটুকুর খোঁড়ার কাজে তার জুড়ি ছিল না। ওর পাশাপাশি ছুতোরের কাজেও আবার বেজায় চৌকশ ছিল। হেন কাঠের কাজ নেই যা বাবা জানত না। সাত আটখানা গ্রামের টেবিল কিংবা টুলে পায়া সারাই করবার দরকার হলে বাবারই ডাক পড়ত সবার আগে।

টেবিল-চেয়ারের পায়া সারাতে সারাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই বাবা মানুষের হাত-পা সারাবার কাজটাও শুরু করে দেয়। ভাঙা হাড় সেট করে সিধে করার কাজ আরকি। তাতেও চারদিকে তার প্রচুর নামডাক হয়ে গেল। সাতটা গ্রামের ঠ্যাংভাঙারা এসে ভিড় করতে লাগল বাবার কাছে।

সেই করতে করতে শ্রীযুক্ত টেরি নিল, অর্থাৎ আমার বাবার মন হালকা ও পকেট ভারী হয়ে উঠতে শুরু করল। স্যার ফেলিমের জমিদারিতে গিয়ে খানিক জমি ভাড়া নিয়ে বাড়ি বানাল সে। জায়গাটা ফেলিমের পুরোনো কেল্লাটার ঠিক নীচে। পরিবেশ ভারী মনোরম। সকাল বিকেল সেখানে চারদিক থেকে হাত পা ভাঙা লোকজন খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাড় জোড়া দিতে আসত বাবার কাছে।

তবে অত সুখের মধ্যে কাঁটা ছিল কেবল একখানাই। অবশ্য সেটা বাবার একার কাঁটা নয়। স্যার ফেলিমের জমির সব ভাড়াটেরই সে জ্বালা সইতে হত মাঝেমধ্যে। ব্যাপারটা এই-

স্যার ফেলিম মাঝেমধ্যে কোনো কাজকর্মে বাইরে গেলে ভাড়াটেদের কাউকে না কাউকে তাঁর দুর্গটাকে পাহারা দিতে হত। দরকার কিছু ছিল না অবশ্য। কেল্লায় এমনিতেই এক চাকর থাকে রাতে। কিন্তু কর্তা বাইরে কোথাও গেলে প্রজারা এসে দুর্গ পাহারা দেবে এ হল গিয়ে সাতপুরুষের প্রথা। সে তো বজায় রাখতেই হবে!

কাজটা অবশ্য মোটেই সুখের ছিল না। কারণ, ভাড়াটেরা প্রত্যেকেই জানত, দুর্গটায় কিছু গড়বড় আছে। গড়বড় মানে, ইয়ে… ঐ ভূত আরকি। লোকজন বলাবলি করত, ফেলিমের বুড়ো ঠাকুর্দা- অমন ভদ্রলোক আর দুটি হয়নি- ঈশ্বর তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন… বোতলের কর্ক জোর করে টেনে খুলতে গিয়ে কলজের শিরা ফেটে দেহরক্ষা করেন। এমনটা অবশ্য যে কারোই হতে পারে। কিন্তু দেহরক্ষান্তে তিনি স্বর্গে যাবার বদলে দুর্গেই ঘোরাফেরা করতে থাকেন।

কেল্লার বসবার ঘরের দেয়ালে বুড়োর একটা ছবি ফ্রেমে লটকানো থাকত। বুড়ো মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা সেই ফ্রেম ছেড়ে নেমে এসে দুর্গ জুড়ে হেঁটে বেড়াত। শিশিবোতল ঘেঁটে যেখানে যেটুকু মদ পেত সব গিলত। ওদিকে আবার পরিবারের কেউ সামনাসামনি এলেই বুড়ো তড়িঘড়ি ফ্রেমে উঠে ফের ছবি। এমন ভোলাভালা মুখের ভাব, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। এত বদমাশ।

তা একবার স্যার ফেলিম পরিবার নিয়ে দুয়েক হপ্তার জন্য ডাবলিনে থাকতে গেল। তখন ভাড়াটেদের পালা করে কেল্লা পাহারা দেবার কথা।

তা, তিন নম্বর রাতে আমার বাবার পালা এল। বাবা বলে, “হা ঈশ্বর! সারাটা রাত আমায় ওই ভাঙা কেল্লায় জেগে বসে থাকতে হবে, আর হতচ্ছাড়া ভবঘুরে ভূত আমার চোখের সামনে কেল্লা জুড়ে নৃত্য করে আর যতোসব কুকর্ম করে বেড়াবে?”

তবে না গিয়ে তার আর কোনো পথ ছিল না। বাবা অতএব একবোতল ‘পটিন’ মদ আর ভূতের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য এক বোতল মন্ত্রপূত জল নিয়ে কেল্লায় গিয়ে উঠল।

যখন সে কেল্লায় গিয়ে পৌঁছুল তখন আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে। চারপাশে অন্ধকার, দমচাপা একটা  পরিবেশ। একে বৃষ্টিতে ভেজা, তার ওপর কেল্লায় ঢুকেই আধবোতল মন্ত্রপূত জল মাথায় ঢেলে বাবা তখন ভিজে চুপ্পুর। কাজেই ঠান্ডা আর হিহি কাঁপুনি এড়াতে খানিক পটিন পেটে চালান করতেই হল।

দরজা খুলে দিয়েছিল ফেলিম পরিবারের পুরোনো চাকর লরেন্স কোনর। লোকটার সঙ্গে বাবার ভালোই বন্ধুত্ব ছিল। কাজেই রাতটা সে বাবার সঙ্গে কাটাতে রাজি হয়ে গেল। এতে বাবা খানিক নিশ্চিন্ত হল।

সব ঠিকঠাক হয়ে যেতে ল্যারি বলে, “বসার ঘরে একটু আগুন জ্বালিয়ে ওখানেই রাতটা কাটিয়ে দেব, বুঝলে?”

বাবা খানিক আগেই দেখে এসেছে, বুড়োর ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা বসবার ঘরে টাঙানো। সে খানিক ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “বসবার ঘরের বদলে ওপাশের বড়ো হলঘরটায় রাত কাটালে হয় না?”

“উঁহু। হল ঘরে আগুন জ্বালানো যাবে না,” লরেন্স জবাব দিল, “ওর ফায়ারপ্লেসের চিমনির ভেতরে একটা বুড়ো কাক বাসা করেছে।”

“তাহলে বরং রান্নাঘরে গিয়ে বসা যাক চলো,” বলতে বলতে মাথা নাড়ল বাবা, “মানে, বুঝতেই তো পারো, আমাদের মতো চাষাভুষো মানুষের পক্ষে একেবারে মালিকের বসবার ঘরে গিয়ে ওঠাটা ভালো দেখায় না।”

“না হে টেরি। ওটি হচ্ছে না।” লরেন্স মাথা নাড়ল, “দিনকাল বদলে গেছে। এখন আর মালিক চাকরে অতো ভেদভাব চলে না…”

“দুত্তোর তোর দিনকাল পালটানোর নিকুচি করেছে,” বাবা মনে মনে ভাবল। তবে মুখে সেসব কিছু বলল না। বললে যদি লরেন্স টের পায় সে ভয় পেয়েছে! উলটে বেশ উৎসাহ উৎসাহ ভাব দেখিয়ে বলে, “বেশ বেশ। আমিও তো তাই বলি!”

এই বলে বসার ঘরে ফায়ার প্লেসে আগুন চালু করে তারা রান্নাঘরে চলে গেল। সেখানে খাওয়াদাওয়া সেরে দুজন মিলে যখন বসবার ঘরে ফেরত এলো ততক্ষণে ফায়ার প্লেসে আগুন বেশ গনগনে হয়ে উঠেছে।

তারপর তো ভরা পেটে আগুনের ধারে বসে দুজন মিলে মহা আরামে গল্পগাছা শুরু হল। পাইপের পর পাইপ তামাক ধ্বংস হতে লাগল। সামনে টেবিলের ওপরে রাখা বোতলে পটিন-এর পরিমাণ আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। মন্ত্রপূত জলের বোতলটায় আর হাত পড়ল না অবশ্য।

রাত খানিক বাড়তেই লরেন্সের মাথা ঢুলতে শুরু করল। সেটা স্বাভাবিক অবশ্য। বেচারার বয়েসের গাছপাথর নেই। দিনের বেশির ভাগ সময় তার এমনিতেই ঘুমোনোর অভ্যেস।

বাবা তখন একটা লম্বা গল্প বলছিল। মাঝপথে কথা থামিয়ে তার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, “ওকি ও, ঘুমুলে নাকি?”

“ধুস!” ল্যারি মাথা ঝাঁকাল, “ঘুমোলাম কোথা আবার? তামাকের ধোঁয়া লেগে জ্বালা করছে বলে চোখদুখানা একটু বুজে রয়েছি!” এই বলে গলাটা খানিক কড়া করে বলে, “আমি কি করছি সেই নিয়ে অত খিটখিট না করে, যা বলছিলে সেটা বলে যাও, আমি দিব্যি শুনছি।” এই বলে সে ফের চোখ বুজে ঢুলতে শুরু করে দিল।

বাবা তখন কী আর করে! একে আর ডেকেডুকে কোনো লাভ নেই বুঝতে পেরে সে গল্পটাই তেড়েফুঁড়ে বলে যেতে লাগল। জিম সুলিভান আর তার বুড়ো ছাগলের গল্প। খাসা গল্প। শুনলে মরা মানুষ অবধি জ্যান্ত হয়ে উঠে বসে, তো সাধারণ ঘুম তো তুশ্চু। তার ওপর বাবা তখন গল্পটা যেভাবে বলছিল, তেমনভাবে ও-গল্প কেউ কখনো বলেনি। লরেন্সের কানের কাছে মুখ নিয়ে, গলার শিরা ফুলিয়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে একেকটা শব্দ উচ্চারণ করে, আর তাকিয়ে দেখে লরেন্স জেগেছে কিনা। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হল না। গল্প শেষ হবার অনেক আগেই দেখা গেল ল্যারি ও’কোনরের নাক ব্যাগপাইপের মতো বাজতে লেগেছে।

“মর তুই আপদ কোথাকার,” বাবা গাল দিয়ে উঠল, “এ কী বিপদে পড়লাম রে বাবা! বুড়ো শয়তানটা এতো বন্ধু বন্ধু ভাব দেখাল, আর শেষে ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে এ ঘরে যে ওই তিনিও  আছেন… এবারে কী হবে? জয় বাবা যিশু। এ বিপদে তোমার কুরুশকাঠ বাগিয়ে আমায় রক্ষা কোরো বাবা…”

এই বলে ফের একবার লরেন্সকে জাগাবার তালে ছিল বাবা, কিন্তু ডাকতে গিয়ে তার ভয় হল, ঘুম ভাঙালে লরেন্স যদি তিতিবিরক্ত হয়ে তাকে একলা ফেলে নিজের ঘরে শুতে চলে যায়! তার চেয়ে বরং এখানেই ঘুমোক। হাজার হোক আরেকটা মানুষ তো কাছে রইল!

এইসব ভাবে আর লরেন্সের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, “ইশ! কী বেভ্যুল ঘুমুচ্ছে দেখো! আমিও যদি অমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রাতটা পার করে দিতে পারতাম!”

কিন্তু ঘুম তখন তার চোখে পা দিতে আদৌ রাজি নয়। অতএব বাবা উঠে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে শুরু করে দিল। দুপদুপিয়ে হাঁটে আর যিশুবাবার কাছে প্রার্থনা করে, “হেই ভগবান, এযাত্রা তড়িয়ে দাও বাপু…”

হাঁটতে হাঁটতে গায়ে ঘাম বেরিয়ে গেল, কিন্তু তবু ঘুম আর আসে না। নার্ভ ঠান্ডা করতে পাঁইটখানেক পটিন পেটে চালান করল, তাতেও হতচ্ছাড়া চোখে সামান্য ঢুলুনিটুকুও এল না। 

শেষমেষ একরকম জোর করেই ল্যারির পাশে একটা আরামকেদারা টেনে নিয়ে তাতে লম্বা হল বাবা। তারপর জোর করে চোখদুটো বন্ধ করে পড়ে রইল।

কিন্তু ঘুম কি আর আসে! খানিক বাদে বাদেই চোখদুটো তার খুলে যায়, আর দেখে ফ্রেমের ভেতর থেকে বুড়োমালিকের ছবিটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দেখতে দেখতেই তার খেয়াল হল, ল্যারির ঘুমোনোর পর থেকেই ব্যাপারটা ঘটছে। গল্প বলতে বলতে, হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই নিজের অজান্তে তার চোখদুটো ওই ছবিটার দিকে ঘুরে যাচ্ছে বারবার। এখন আরামকেদারায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে রাখার সময়েও সেই একই ব্যাপার। আর… যতবার সে ঘরের যে জায়গা থেকেই তাকিয়েছে বুড়ো মালিকের ছবি থেকে চোখদুটো সেদিকেই তাকে ঘুরে দেখেছে!

কথাটা মাথায় আসতেই বাবা বুঝে গেল আজ আর নিস্তার নেই। শুয়ে শুয়েই মাথা নাড়ে আর আক্ষেপ করে, “কোন কুক্ষণে যে এই অভিশপ্ত জায়গায় এসে আস্তানা গেড়েছিলাম!” তারপর জোরে জোরে, যেন নিজেকে সাহস দেবার জন্যই, বলে, “মরতেই যখন হবে, তখন আর ভয় পেয়ে মরা কেন? বীরের মতোই মরি…”

এই বলে বাবা যথাসম্ভব শান্ত হয়ে শুয়ে রইল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, হয়তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসব স্বপ্নে দেখছে। কিন্তু তার পরেই বাইরে ঝড়ের গোঁ গোঁ আওয়াজ, চিমনির ভেতর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়ার শিস, হাওয়ার ঝোঁকে বাইরে গাছপালার দুলুনির শব্দ- এই সবকিছু এসে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, স্বপ্নটপ্ন কিছু না। বাবা দিব্যি জেগেই রয়েছে।

সে যে কী প্রলয় ঝড় কী বলব! তার ধাক্কায় কেল্লার পাথরের তৈরি মোটা মোটা দেয়ালগুলো অবধি কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল বুঝি এই সেসব খুলে পড়ে যায়!

আর তারপর, একেবারে হঠাৎ করেই ঝড়টা একদম থেমে গেল। বাইরেটা এতো চুপচাপ আর শান্ত হয়ে গেল, যেন জুলাই মাসের কোনো বিকেল।

মিনিট তিনেক সেই শান্ত অবস্থাটা চলবার পর বাবা চিমনির পাশ থেকে একটা হালকা শব্দ পেয়ে চোখদুটো মিটমিট করে একটু খুলল। দেখে, বুড়ো তার ছবিতে নড়তে চড়তে শুরু করেছে। প্রথমেই গায়ের কোটটা টেনে হিঁচড়ে খুলে ফেলল। তারপর, লম্বা পা ফেলে ফ্রেম থেকে বেরিয়ে ছোট্ট একটা লাফে মেঝের ওপর নেমে এল।

বজ্জাত বুড়ো মাটিতে নেমে প্রথমেই একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখল বাবারা ঘুমিয়ে আছে কি না! দেখে বাবা মড়ার মতো পড়ে রইল। খানিক বাদে যখন সে নিশ্চিন্ত হল বাবা আর লরেন্স দুজনেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে, তখন এগিয়ে এসে পটিনের বোতল নিয়ে তার থেকে ঢকঢক করে খানিক মদ গলায় ঢেলে নিল। পরিমাণে… তা প্রায় পাঁইটখানেক তো হবেই। বেশিও হতে পারে। তারপর বোতলটা ফের সাবধানে মন্ত্রপূত জলের বোতলের পাশে যথাস্থানে বসিয়ে রেখে সে ঘর জুড়ে পায়চারি করতে শুরু করল। একবার এদিক যায়, একবার ওদিক যায়, যেন এখনও দিব্যি জ্যান্তই আছে, মরে ভূত হয়ে যায়নি আদৌ!

কিন্তু পায়চারি করতে করতে যখনই সে বাবার এলাকা দিয়ে যায়, বাবা টের পায় তার গায়ে গন্ধক পোড়ার নাক জ্বালানো গন্ধ! সে গন্ধ পেয়ে তো বাবার ধাত ছেড়ে যাবার দশা। কারণ ও জিনিস একমাত্র নরকের আগুনেই পোড়ানো হয়! ফাদার মারফি প্রতি রোববার সে আগুনের কথা ভবাবাদের ব্যাখ্যান করে শোনান।

তা এই চলতে চলতে একবার একটা অঘটন ঘটেই গেল। হাঁটতে হাঁটতে বুড়ো সেবার বাবার একেবারে পাশটায় এসে গিয়েছিল। তাতে পোড়া গন্ধকের ধক এমন কড়াভাবে বাবার নাকে এসে ঢুকল যে বাবা ভয়ানক জোরে কাশতে কাশতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল একেবারে।

দেখে বুড়ো কেল্লাদার তার একেবারে সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। দুজনের মধ্যে বড়োজোর দুই পা-এর তফাৎ। বাবার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর বলে, “চামড়ার খোলের ভেতর তুই ওটা কে রে? টেরি নিল নাকি? তা সব কিছু চলছে কেমন রে?”

“আজ্ঞে আপনার কৃপায় ভা… ভালোই আছি জনাব,” বাবা ভালোভাবেই জবাব দিল, (মানে ভয়ে পৌনেমৃত কোনো মানুষ যতটা ভালোভাবে জবাব দিতে পারে ততটাই আরকি।) “কী সৌভাগ্য আমার যে আজ রাত্রে আমি আপনার দেখা পেয়েছি!”

“হুম। তা টেরান্স, তুই তো লোক খুবই ভালো রে! (কথাটা সত্যি) খাটতে পারিস, মাথা ঠান্ডা, বেজায় ভদ্র, গোটা গ্রামের মানুষের কাছে তুই তো সাক্ষাত উদাহরণস্বরূপ!”

“সবই হুজুরের কৃপা,” বাবা একটু সাহস পেয়ে বিগলিত হয়ে বলল, “যদ্দিন জ্যান্ত ছিলেন, এমনই মিঠে বুলি ছিল আপনার। এখন মরার পরেও… আহা ঈশ্বর আপনার আত্মাকে চিরবিশ্রাম দিন…”

“চিরবিশ্রাম…” ভূত গর্জন করে উঠল (রাগে তখন সে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে) “কী বললি তুই হতচ্ছাড়া? আমার চিরবিশ্রাম? বজ্জাত, রাস্কেল কোথাকার! তোর ভদ্রতা কোথা গেল রে? অ্যাঁ? বলি মরেছি যে সে কি আমার নিজের দোষ? তাই বলে তোর মতো চাষাভুষোও উঠতে বসতে আমার মড়া বলে গাল দেবে? এত বড়ো আস্পর্ধা তোর হল কেমন করে?” এইসব বলে আর পাগল ঘোড়ার মতো মাটিতে পা ঠোকে বুড়োকর্তা। এমন জোরে জোরে পা ঠোকে যে মনে হয় মেঝের কাঠের পাটাগুলো এই বোধ হয় ভেঙেচুরে গেল।

বুড়োর মূর্তি দেখে তো বাবার ধাত ছেড়ে যাবার দশা। তাড়াতাড়ি হাত জোর করে বলে, “আমি গরিব মুখ্যুসুখ্যু মানুষ! কী বলতে কী বলেছি, তার ঠিকঠিকানা নেই।”

“গরিব তো বটেই। মুখ্যুও একশোবার।” বুড়ো ভূত জবাব দিল, “তোর ভ্যাজোর ভ্যাজোর শোনবার জন্য কিংবা তোর মতো পোকামাকড়ের সঙ্গে বাক্যালাপ করবার জন্য আমি আজ রাতে এখানে উঠে… থুরি… নেমে… আসিনি। (এই মুখ ফশকে ‘উঠে’ বলে তারপর সেটাকে ‘নেমে’ বলে দাবি করবার ব্যাপারটা বাবা ঠিকই খেয়াল করল) “এবারে মন দিয়ে শোন টেরান্স নিল। তোর দাদু প্যাট্রিক নিল আমার প্রজা ছিল তা কি তুই জানিস?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ জনাব।”

“বেশ ভদ্রসভ্য মানুষ ছিল সে। আর, আমার ধারণা বেঁচে থাকতে আমিও একজন ভদ্রসভ্য মানুষ ছিলাম।”

“সে তো বটেই, সে তো বটেই,” বাবা জবাব দিল (যদিও কথাটা একেবারে ডাহা মিথ্যে। কিন্তু ভূতের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যি কথা বলবার সাহস মোটেই করা উচিৎ নয়।)

“বেশ। তাহলে বলি শোন। চিরটাকাল ভদ্রসভ্য হয়ে কাটিয়ে গেলাম। অন্তত জমিদার কেল্লাদারদের পক্ষে যতটা ভদ্রসভ্য হওয়া সম্ভব ততটুকু তো হয়েছি! মাঝে মাঝে প্রচুর ধর্মকর্ম করেছি। কখনো কখনো গরিবকে খানিক দানধ্যানও করেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরলোকে গিয়ে যেখানে এখন আছি সেখানে আমি খুব একটা ভালো নেই। মানে এতসব ভালো কাজকর্ম করবার ফলে যতটা ভালো থাকা উচিত ছিল ততটা নেই। একটা কষ্ট…”

“আহা হা হা। কী দুঃখের কথা!” বাবা বলে উঠল, “আমি কি তবে পাদরিবাবা মারফির সঙ্গে আপনার আত্মার শান্তির জন্য একবার কথা বলব?”

“চোপ রও হতভাগা বজ্জাত কাঁহিকা।” বুড়ো ভূত গর্জে উঠল, “আমি আমার আত্মার কষ্টফষ্ট নিয়ে ভাবছি সে কথা তোকে কে বলল অ্যাঁ? একটা ভদ্রলোকের সঙ্গে আত্মাটাত্মার ব্যাপারে কথা বলতে আসিস, এতবড়ো সাহস তোর হল কোত্থেকে ব্যাটা চাষার পো?”

বলতে বলতে সে তার থাইতে একখানা বজ্রচাপড় মেরে আরো উঁচুতে গলা চড়িয়ে বলে, “আত্মার ব্যাপারে কোনো কিছু দরকার হলে আমি সে কাজের যোগ্য লোকের কাছেই যাব। তোর মতো একটা গাঁওয়ারের কাছে আসতে যাব কোন দুঃখে?”

বলতে বলতে বুড়ো এসে বাবার মুখোমুখি বসল, “এবারে মন দিয়ে শোন। আমার কষ্টটা আত্মাফাত্মার নয়। আমার ডান পা’টাকে নিয়ে। বুঝলি?”

“আজ্ঞে না।”

“বলছি। গ্যালভানোচের যুদ্ধে ব্ল্যাক বার্নিকে যেদিন মারলাম, সেদিন লড়াইতে আমার পা’টা ভেঙেছিল।”

পরে বাবা খোঁজ করে দেখেছিল, সে যুদ্ধে বুড়োর পা ভেঙেছিল আসলে ঘোড়ায় চেপে একটা বেড়া ডিঙিয়ে লাফিয়ে পালাতে গিয়ে। ঘোড়া পা হড়কে বুড়োর ওপরেই আছাড় খায়।

“খুন করবার পাপ লেগে পায়ে কষ্ট হচ্ছে বুঝি?”

“আমি পাপী? জিভ ছিঁড়ে নেব তোমার হারামজাদা,” বুড়ো খেঁকিয়ে উঠল, “এবারে বলি শোন ভাঙা পায়ে কষ্ট কেন হয়। যেখানে আমি থাকি সেখানে আমার সারাটা দিন লম্বা লম্বা পথ সফর করতে হয়। ভাঙা পা নিয়ে ওতে বড়ো কষ্ট হয়। সে বাদেও, বেঁচে থাকতে অত হাঁটার অভ্যেসও তো ছিল না কস্মিনকালে। তাছাড়া প্রত্যেকদিন অতো হাঁটাহাঁটি আমার পক্ষে ভালোও নয়। মাঝে মাঝে এইখানে এসে একটু বিশ্রাম পাই বটে, কিন্তু সে আর কতটুকু!”

“অত হাঁটাহাঁটি করেন কেন তবে? একজায়গায় বসে থাকলেই তো…”

“সেটাই তো মুশকিল রে! সে জায়গায় লোকজন ঠান্ডা জল খেতে ভারী পছন্দ করে। কী করবে, ওর চেয়ে বেশি ভালো কোনো পানীয় সেখানে থাকলে তো! জঘন্য জায়গা একটা। যেমন ভ্যাপসা তেমন গরম।

“তা, সেখানে আমার কাজ হল ওই জল টেনে এনে সবাইকে খাওয়ানো। কিন্তু আমার নিজের ভাগে সে জলের খুব কমই পড়ে। যেটুকু পাই তাতে ঠোঁটও ভেজে না ভালো করে। সে যে কী ঝামেলার কাজ কি বলব তোকে! লোকগুলো একেকটা মরুভূমির মতো। জল আনতে না আনতে শুষে নিয়ে বলে আবার যা, আরো জল নিয়ে আয়!

“বুঝতেই পারছিস সারা রাত জলের হাঁড়ি টেনে টেনে ভাঙা পায়ে কেমন যন্ত্রণাটা হয়। তাই পায়ের ভাঙা হাড়টা আমার ঠিকঠাক সারাই করে দিতে পারে এমন কারো তালাশে ছিলাম আমি। এই হল গিয়ে তোর সঙ্গে আমার কথা বলবার মোদ্দা ব্যাপার।৷ তুই তো শুনেছি হাড়টাড় জোড়া দেয়ার ওস্তাদ হয়েছিস। তা দ্যাখ দেখি আমার ভাঙা পা,টা যদি…”

ভূতের ওপর বদ্যিগিরি করবার কোনো সদিচ্ছাই বাবার ছিল না। কিন্তু সে কথা তো আর একজন জলজ্যান্ত ভূতকে মুখের ওপর বলা যায় না। তায় আবার সে ভূত যদি ঠাকুর্দার মুনিব হয়! বাবা তাই হাতটাত কচলে মিনমিন করে বলে, “হুজুর মা-বাপ, আপনাদের মতো উঁচুদরের মানুষের ওপর সে চিকিচ্ছে কেমন করে করি বলুন? ওতে যে বেজায় ব্যথা লাগে। ওসব আমাদের গরিবগুর্বোর দেহে সয় হুজুর। আপনাদের কোমল শরীর…”

“ওসব বাজে বকবক থামা। এই যে পা’টা বাড়িয়ে ধরছি।” বলতে বলতেই সে তার ভাঙা পা খানা বাবার নাকের সামনে তুলে ধরেছে, “বাঁচতে চাস তো লাগা হ্যাঁচকা টান। বাঁকা পা সিধে করে দে একেবারে। আর যদি তা না করিস, তাহলে… ভূতের গায়ে কেমন জোর হয় সেটা আজ তোকে দেখিয়ে দেব আমি। শরীরের একখানা হাড়ও আস্ত রাখব না তোর এই বলে দিলাম। সব পাউডার বানিয়ে ছেড়ে দেব, বুঝলি? পাউডার!”

অতএব কী আর করা? আমার বাবা ভূতের সেই ভাঙা ঠ্যাং দুহাতে চেপে ধরল। তারপর দিল টান। টানতে টানতে বাবার কপালে ওই ঠান্ডাতেও ঘাম বেরিয়ে গেল। তাও পা আর সিধে হয় না।

“জোরসে টান না শয়তান কোথাকার!” বুড়ো হাঁক দিল।

“আজ্ঞে এই যে হুজুর টানি।”

“আরো জোরসে টান শয়তান…”

এবারে বাবা খোদ শয়তানের মতোই টান লাগাল।

“উফ! একটু খাই,” বলে ভূত বেশ ব্যথাভরা মুখে টেবিলে রাখা বোতলদুটোর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, “সাহসটা ফিরিয়ে আনা দরকার রে! পা’টায় বড্ডো… ইয়ে…একঢোক পটিন খেলে বোধায়…”

এইপর্যন্ত সব ঠিকই চলছিল। কিন্তু ব্যথায় আনচান বুড়োর হাতটা গিয়ে পড়েছিল ভুল বোতলের গলায় এই যা। ওদিকে মুখে তখন তার তুবড়ি ছুটছে। বলে, “আহা একখানা বিরাট চুমুক… তারপর… টান তুই ভাঙা ঠ্যাং ধরে কত জোরে টানতে পারিস…” বলতে বলতেই মন্ত্রপূত জলের বোতলটা তুলে নিয়ে বুড়ো নিজের গলায়…

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার গলা থেকে এমন একটা ধারালো চিৎকার বেরিয়ে এলো যে মনে হল সেটা ছুরির মতো ঘরটাকে বুঝি চিরে দুখানা করে দেবে। আর সেইসঙ্গে পা’খানায় এমন এক ঝাঁকুনি দিল যে সেটা তার শরীর থেকে খুলে বাবার হাতে চলে এল। তারপর বুড়ো পড়ল মুখ থুবড়ে্‌ আর তার পা বুকে ধরে বাবা ছিটকে গিয়ে পড়ল ঘরের অন্য কোণে।

পরদিন সকালে মুখে রোদ পড়তে বাবার জ্ঞান ফিরল যখন, দেখে বড়ো বড়ো পুরোনো চেয়ারগুলোর একখানার একটা পায়া খুলে এসে তার বুকে জড়িয়ে রয়েছে। তার একটা মাথা খাড়া ছাদের দিকে উঁচু করা।

ল্যারি তখনও গভীর ঘুমে। তার নাক ডমরুর মতো বেজে যাচ্ছে। বাবা তক্ষুনি সেখান থেকে উঠে ফাদার মারফির কাছে গিয়ে হাজির।

সেদিন থেকে বাবার ভূতে ভগবানে ভয়ভক্তি সাংঘাতিক বেড়ে উঠল। মরার দিন অবধি একদিনের জন্যও রোববার গির্জায় যাওয়া বাদ দেয়নি। প্রার্থনা, পাপস্বীকার এই সবকিছুই ভারী নিয়ম মেনে করত। আর ভূতটার কথা যদি বলো, তাকে আর ওর পর থেকে কেল্লায় দেখা যায়নি। হয় ঠ্যাং হারাবার শোকে সে বিবাগী হয়েছিল, কিংবা ওই মন্ত্র দেয়া জল খেয়ে… কী হয়েছিল তার… কে জানে!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *