নেকলেস

নেকলেস
লেখক – গ্যঁ দে মোঁপাসা
অনুবাদ – যূথিকা আচার্য্য
কথায় আছে না শাপভ্রষ্ট অপ্সরা। রূপসী মিসেস মাতিল্ডা লোঁজেলের জীবনটাও ছিল ঠিক তেমনি। গরীবের ঘরে জন্ম, তারপর গরীব কেরানীর সঙ্গে বিয়ে। জীবনের আর রইলো কী!
মাতিল্ডার মনে এতটুকুও শান্তি ছিল না, কিন্তু সমস্যা হল অভিযোগটা করবে কার বিরুদ্ধে? বেচারী আয়না দেখে আপশোষ করতো। অমন সাদা গোলাপের মতো গায়ের রং, স্ট্রবেরীর মতো টুকটুকে রাঙা ঠোঁট, সোনালী রেশমের মতো চুল… এসব কী কোনো কেরানীর বাড়িতে শোভা পায় না পাওয়া উচিত! কিন্তু গরীব মানুষের বাড়িতে জন্ম হলে যা হয়। না আছে ভালো গয়না, না ভালো পোশাক, না কোনো পরিচিতি। ধনী পুরুষের চোখে পড়ার জন্য যে জিনিসগুলোর দরকার, তার কোনটাই মাতিল্ডার বাপ কখনো তাকে দিয়ে উঠতে পারেননি। খানিকটা বাধ্য হয়েই সে মিস্টার লোঁজেলকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল। বলতে নেই, কিন্তু স্বামীকে সে বরাবরই একটু করুণার চোখে দেখতো। মিস্টার লোঁজেল অল্পেই খুশি। জীবনে একটু বড় কিছু করার অ্যাম্বিশন নেই। বড় কোনো চাহিদা নেই। কেমন যেন মিনমিনে একটা মানুষ!

দেখো বাপু, সে মুখে যে যাই বলুক, কিন্তু পুরুষ আর নারী এক নয়। পুরুষের মূল্য নির্ধারণ হয় তার কাজে, আর্থিক সংগতিতে। তেমনি মেয়েদের মূল্য তাদের সৌন্দর্য্যে আর নরম ব্যবহারে। দরিদ্র পুরুষ আর কর্কশ নারী পছন্দ করে না কেউই। মাতিল্ডার সমস্যা ছিল সেখানেই। আয়নায় নিজের রূপ দেখে তার মনে হত ওটাই শুধু সত্যি। তার চারদিকে ঘিরে থাকা রঙচটা দেওয়াল, কাঠের চোকলা ওঠা চেয়ার, জানালায় ঝুলতে থাকা ছেঁড়া পর্দাগুলো সব মিথ্যে! এমনকি তার বাড়িতে কাজ করতে আসা বদখৎ বুড়িটাকে অবধি অসহ্য মনে হত তার। মনে হত সবকিছু একটা জঘন্য, কুৎসিত দুঃস্বপ্ন। আপনি হয়তো বলবেন যে এমনটাতো হয়েই থাকে। সত্যি কথা বলতে কী গরীবের ঘরে এমন হওয়াই তো স্বাভাবিক। তাহলে আমিও বলব যে গরীবের ঘরে এমন রূপ দেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল! সাধ দিয়ে সাধ্য দিতে ভুলে গেলেন ভগবান। এত ভারী অন্যায়!

মাতিল্ডা লোঁজেল নিজের চারপাশে কল্পনার একটা পৃথিবী তৈরী করে নিয়েছিল। ভ্যাপসা রান্নাঘরে বসে, স্টোভের আগুনে বিনা মাখন, মরিচশূন্য সস্তার স্যূপ বানাতে বানাতে সে আপনমনে বিড়বিড় করতো, “এই তো ল্যাম্ব লেগটা হয়েই এল বলে, এরপর স্যালমনটা হাল্কা ফ্রাই করে নেব। যাই বলো তোমরা, একটু বেশী মাখন না দিলে খাবারে যেন স্বাদই পাওয়া যায় না।”
ডাইনিং রুমে টেবল ক্লথের ছেঁড়া অংশটা ন্যাপকিন দিয়ে ঢেকে অদৃশ্য অতিথির প্রতি মিষ্টি হেসে মাতিল্ডা বলতো, “কী সৌভাগ্য! লর্ড এডওয়ার্ড, এত দেরী হল যে। কী নেবেন বলুন, শ্যাম্পেন না বোরদ্যোঁ রেড? ক্যাভিয়ারে আপত্তি নেই তো!”
এরপর সে দরজায় ঝোলানো কাল্পনিক সিল্কের পর্দার দিকে দেখাতো,
“লেডি বেলিস্তার, আপনার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব! হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, কার্টেইনগুলো নতুন। আগেরগুলো ইন্ডিয়ান মসলিন ছিল। এবারে ওরিয়েন্টাল সিল্ক।”
মাতিল্ডার মাথায় যে এসব কে ঢুকিয়েছিল সে ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে লোকমুখে শোনা যায় যে এই ব্যাপারে তার প্রিয় বান্ধবী ম্যাডাম জীন ফরেস্তিয়ারের প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে। ম্যাডাম ফরেস্তিয়ার মাতিল্ডার স্কুলের বন্ধু। পড়াশোনা শেষ করার পর তার বিয়ে হয়েছিল এক অভিজাত পরিবারে। ওদিকে মাতিল্ডার মন্দ কপাল। তার কপালে জুটলো নিম্ন-মধ্যবিত্ত কেরানী বর। আজকাল মাতিল্ডা তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখাও করতে যায় না। নেমন্তন্ন খেতে গেলে নেমন্তন্ন করতেও হয়। কিন্তু এমন ধনী বান্ধবীকে নিজের ভাঙাচোরা বাড়িতে সে ডাকবে কী মুখে!

শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা মিস্টার লোঁজেল ঘরে ঢুকেই বললেন,
“বলতো মাতিল্ডা, তোমার জন্য কী এনেছি?”
মাতিল্ডা চোখ তুলে দেখলো তার স্বামীর হাতে পেটমোটা একটা খাম। খামের মুখ খুলতেই তার ভেতর থেকে বেরোলো অফিসের চেয়ারম্যান সাহেবের নিজের হাতে সই করা জমকালো একখানা কার্ড। তাতে সোনালী অক্ষরে লেখা,
“জর্জ অ্যান্ড কোম্পানীর বার্ষিক সান্ধ্য অনুষ্ঠানে মিস্টার এবং মিসেস লোঁজেলকে জানাই সাদর আমন্ত্রণ।”
মিস্টার লোঁজেল ভেবেছিলেন নেমন্তন্ন পেয়ে মাতিল্ডা কী খুশিই না হবে। এমনিতে বেচারীর শখ-আহ্লাদ কিছুই মেটেনা। কিন্তু মাতিল্ডার মুখ অন্ধকার হয়েই রইলো। সে কার্ডখানা দু-তিনবার খুঁটিয়ে পড়লো, তারপর সেটা টেবিলের ওপর রেখে বললো,
“নিমন্ত্রণ পেয়েছ ভালো কথা। আমাকে বলে কী হবে? তুমি যেও।”
মিস্টার লোঁজেল আমতা আমতা করে বললেন,
“ওভাবে বলছ কেন ডার্লিং, দেখতেই তো পাচ্ছো যে সস্ত্রীক যেতে বলেছে। এসব বড়কর্তাদের ব্যাপার। নর্ম্যালি কেরানী লেভেলের কেউ কখনো নিমন্ত্রণ পায় না। নেহাৎ চেয়ারম্যান আমার কাজে খুশি তাই আমাকে স্পেশ্যালি বলেছেন। এখন বল দেখি আমি একা যাই কী করে! তাছাড়া তুমি তো এসব জাঁকজমক ভালোবাসো। তাই ভাবলাম তোমার ভালো লাগবে…।”
“চুপ কর তো। তুমি কখনও কিছু মাথা খাটিয়ে ভাবো! পার্টিতে নিয়ে যাবে বলে নাচছ, কখনও ভেবেছ আমি কী পরে যাব? একটা ভাল গাউন, একখানা গয়না কোনোদিন কিনে দিয়েছ আমাকে? পার্টিতে অত বড় বড় লোকজন আসবে। তুমি কী চাও যে আমি ভিখিরীর মতো ছেঁড়া গাউন পড়ে লোক হাসাই।”
“কেন তোমার সানডে গাউনটা তো আছেই। ওটা পরলেই তো হয়! মন্দ কী?”
মাতিল্ডা হাল ছেড়ে দেওয়া চোখে তাকিয়ে রইল। ইশ্, কেমন মানুষ রে বাবা! নিজেই বলছে পার্টিতে হোমড়াচোমরা সবাই আসবে। অথচ বৌ-কে বলছে সাতবছরের পুরনো, সুতো ওঠা গাউন পরে যেতে! মুখ ফুটে না বললে তো বুঝবেও না। বিরক্ত হয়ে সে বললো, “পুরোনো গাউন পরে অতবড় পার্টিতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।”
“তাহলে ইনভিটিটেশনটা নিয়ে কী করব?”
“জানি না, তোমার বন্ধুবান্ধব কাউকে দিয়ে দাওগে যাও। যার বৌ-এর কাছে ভালো গাউন, ভালো গয়না আছে তারই যাওয়া উচিৎ এসব জায়গায়।“
মিস্টার লোঁজেল কিছুক্ষণ ভেবে একটু সাবধানী গলায় বললেন, “মাতিল্ডা, রাগ করো না সোনা। আচ্ছা এদিকে তাকাও। একটা মোটামুটি দেখতে গাউনের দাম কেমন হবে বলতে পার? মানে বলছিলাম যে খুব বেশী না হলে…” মাতিল্ডা চোখদুটো সরু করে দেখলো একবার। মিস্টার লোঁজেলের কথাগুলো শুনে রাগ করে বসে থাকার উপায় ছিল না। সে মনে মনে হিসেব করে বললো, “আমারও ঠিক জানা নেই। তবে মনে হয় চারশো ফ্রান্কের মধ্যেই হয়ে যাবে।”
“চারশো ফ্রান্ক!” বিড়বিড় করে বললেন মিস্টার লোঁজেল।
অসম্ভব না হলেও একলহমায় চারশো ফ্রান্ক বের করে দেবেন, তেমন ক্ষমতা তার ছিল না। তারপরেই মনে হল ব্যাঙ্কে একজায়গায় কিছু টাকা আলাদা করে সরিয়ে রাখা আছে। পরিমাণে ওই চারশো বা সাড়ে চারশোই হবে। গরমকালে শিকারের সরঞ্জাম কিনবেন বলে টাকাটা জমাচ্ছিলেন। প্রতিবার বন্ধুরা যায়। ভালো একটা বন্দুকের অভাবে তার আর যাওয়া হয় না। এবার ভেবেছিলেন টাকাটা জমলে বন্দুক আর টোটা কিনে তিনিও যাবেন। কিন্তু নাহ্, তা আর হবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, “চিন্তা করো না মাতিল্ডা। চারশো ডলারের ব্যবস্থা আমি করবো। তুমি তোমার পছন্দ মতো একটা গাউন কিনে নিও।”
গাউন তো কেনা হল। এদিকে অনুষ্ঠানের দিন যত এগিয়ে আসে, মাতিল্ডার মুখে তত মেঘ ঘনায়। সারাদিন বিরক্ত হয়ে চুপ করে বসে থাকবে, অথচ মুখ ফুটে কিছু বলবে না। মিস্টার লোঁজেল শেষটায় থাকতে না পেরে বললেন, “কী হয়েছে বল তো তোমার? গাউন পছন্দ হয়নি নাকি?”
“না তা নয়।” মাতিল্ডার জবাব এল।
“তাহলে, দিনরাত এমন মুখ শুকিয়ে ঘুরছো কেন?”
“পার্টিতে কত ধনী লোকেদের বাড়ির মেয়েরা আসবে বল তো। আমি সেখানে যাব, খালি গলায়, খালি হাতে…আঙুলে পড়ার একটা আংটিও জোটে না আমার কপালে!”
মাতিল্ডার কাঁদো কাঁদো মু্খ দেখে প্রমাদ গণলেন মিস্টার লোঁজেল। আগেরবার না হয় বাবুগিরি দেখিয়ে বলেছিলেন যে টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু এবার? গয়না কেনা কী মুখের কথা। পার্টির কথা ভেবে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু পুরুষমানুষের নাকি চোখের জল ফেলতে নেই, সে কথা ভেবে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। মেয়েদের এত ঝামেলা…! একবার ঢোঁক গিলে তিনি মাতিল্ডাকে বললেন,
“আজকাল সব মহিলাদের দেখি চুলে ফুল লাগাতে। তুমিও না হয় দুটো গোলাপ কুঁড়ি লাগিয়ে নিও। আমি এনে দেব।”
মাতিল্ডা ফুঁসে উঠলো, “হ্যাঁ তোমার বড়কর্তাদের বাড়ির মেয়েদের সামনে আমি শুধু খোঁপায় দুটো ফুল লাগিয়ে ঘুরি। ভিখিরী পেয়েছ তো আমায়। সাজগোজের কিছু বোঝ না যখন, কথা বলতে যাও কেন তুমি শুনি?”
হঠাৎ মিস্টার লোঁজেলের মুখ হাসিতে ভরে গেল। তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“ইশ্ মাতিল্ডা, আমরা কী বোকা!”
“কেন এতে আবার বোকামির কী দেখলে তুমি?”
“তোমার বান্ধবী, ম্যাডাম ফরেস্তিয়ারকে বললেই তো হয়। তোমরা তো স্কুলের বন্ধু। এক-আধখানা গয়না চাইলে উনি কী তোমায় না বলবেন?”
মাতিল্ডার মুখেও হাসি ফুটলো।
“ঠিকই বলেছো তুমি, এই বুদ্ধিটা আমার মাথায় কেন এল না! সত্যিই গো আমি কী বোকা। আমার মনে হয় না জীন আপত্তি করবে। এক রাত্রির তো ব্যাপার। পরদিনই গিয়ে ফিরিয়ে দেব।”
পার্টির দিন সকালবেলা মাতিল্ডা তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করল। ম্যাডাম ফরেস্তিয়ার সবকিছু শোনামাত্রই বললেন, “হ্যাঁ, এতে অত চিন্তার কী আছে! একরাত্রির জন্য বৈ তো নয়। আমার গয়নার বাক্সখানা এনে দিচ্ছি। তোর যেটা পছন্দ নিয়ে নে।”
এরপর ম্যাডাম ফরেস্তিয়ার তার আয়না বসানো মস্ত বড় আলমারি খুলে, মেহগনি কাঠের তৈরী গয়নার বাক্সখানা এনে মাতিল্ডার হাতে দিলেন।
“তোর যা যা ভালো লাগে নিয়ে নে।”
মাতিল্ডা বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল বাক্সটার দিকে। প্রথমে খানদুয়েক ব্রেসলেট নিয়ে সে পরে দেখল। এরপর একটা মুক্তোর মালা। নাহ্ কোনটাই তেমন পছন্দ হল না তার। একটা ইটালিয়ান ব্রোচ নিয়ে জামায় লাগিয়ে দেখল সে। ভালো, কিন্তু তেমন কিছু আহামরি নয় কোনোটাই। এমন হলে চলবে না। তার সাজপোশাক সবকিছু একদম পারফেক্ট হতে হবে। সে একটু অস্থির হয়ে বলল,
“জীন, এগুলো ছাড়া আর অন্য কিছু নেই?”
“থাকবে না কেন, বাক্সের নীচে দেখ। আরো অনেক ডিজাইন পাবি। যেটা পছন্দ, নিয়ে নে।”
মাতিল্ডা বাক্সের নীচের ডালাটা সরাতেই একটা একটা ঘন নীল রঙের স্যাটিনের বাক্স বেরিয়ে এল। হীরের নেকলেস! বৃষ্টির ফোঁটার মতো স্বচ্ছ। স্বপ্নের মতো সুন্দর। ঠিক যেমনটি সে চেয়েছিল। নেকলেসটা স্যাটিনের বাক্স থেকে বের করে সাবধানে গলায় পরলো সে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। অ্যাত্তো সুন্দর সে! তার রাজহংসীর মতো গলায় হীরের নেকলেসটা ঝলমল করছে। কে যে কার অলঙ্কার তা বলা মুশকিল!
একটু ভয়ে ভয়ে বললো মাতিল্ডা,
“এই নেকলেসটা নিতে পারি? আর কিচ্ছু দরকার নেই। শুধু এটা হলেই হবে।”
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। ভারী সুন্দর মানিয়েছে তোকে।”
ম্যাডাম ফরেস্তিয়ারকে জড়িয়ে, দু’গালে দুটো চুমু খেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গেল সে। আজ রাত্রে পার্টিতে দেখবে সবাই সৌন্দর্য্য কাকে বলে!

মাতিল্ডা যেমন ভেবেছিল ঠিক তেমনটাই হল। বরং এতটা বাড়াবাড়ি হয়তো সে নিজেও আশা করেনি। সে রাত্রে পুরুষদের তো কথাই নেই, মেয়েরাও তার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছিল। মিস্টার লোঁজেলের বড়কর্তারা তার সঙ্গে মাত্র একটিবার কথা বলার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। মেয়েরা তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য যারপরনাই চেষ্টা করছিল। মাতিল্ডার কী পছন্দ, কী অপছন্দ সে ব্যাপারে সবাই জানতে চায়। সবকিছুতেই তার মতামত জানতে চায় সবাই। এমনকি চেয়ারম্যান সাহেব নিজে তার জন্য গ্লাসে শ্যাম্পেন এনে বললেন,
“মিস্টার লোঁজেল, তোমার সৌভাগ্যের ওপর কিন্তু হিংসা হচ্ছে সবার। নারী নয়, স্বয়ং দেবী ভেনাস এসেছেন তোমার ঘরে।”

একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল মাতিল্ডা। হ্যাঁ, সব মিলে যাচ্ছে। ঠিক এইরকমটাই তো চেয়েছিল সে। আতসবাজির মতো ঝলমলে একটা জীবন। যেখানে ইচ্ছে করলেই গরীব কেরানীর গৃহিণী থেকে একমুহূর্তে ভেনাস হওয়া যায়। ঠিক এইরকমই তো। তার রূপের আগুনে ঝলসে যাক সবকিছু। নেশার মতো, ধোঁয়ার মতো আচ্ছন্ন হয়ে উঠছিল সে। আজ রাত্রে ঘড়ির কাঁটা এইখানেই থেমে যাক। এই হাসি, এই আনন্দ অনন্তকাল ধরে চলতে থাকুক। মাতিল্ডার রূপ, তার চারিদিকে রূপমুগ্ধ মানুষের ভিড়, তাদের চোখের মুগ্ধতা শুধু এটুকুই সত্য হয়ে থাকুক। তার রঙচটা শোবার ঘর, ছেঁড়া টেবিল ক্লথ, ঘুপচি-কালিমাখা রান্নাঘর, ও সবকিছু মিথ্যে! ভয়ানক একটা দুঃস্বপ্ন। সত্যি শুধু আজকের এই সন্ধ্যেটুকু। নাচে-গানে-হাসিতে আকন্ঠ ডুবেছিল সে। ভোর চারটে নাগাদ ঘোর কাটলো তার। পার্টি অনেকক্ষণ হল শেষ হয়ে গেছে। পুরুষেরা বসার ঘরে যে যেখানে জায়গা পেয়েছে, শুয়ে পড়েছে। মেয়েদের অনেকেই ঢুলু ঢুলু চোখে সোফায় বসে আছে, গল্প করছে। গুডবাই বলে বেরিয়ে গেল বেশ কয়েকজন।
মিস্টার লোঁজেল এসে বললেন,
“মাতিল্ডা, গায়ে এবার চাদরটা জড়িয়ে নাও, নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে। তুমি দাঁড়াও, আমি বরং একটা গাড়ি ডেকে আনি।”
চাদরখানা মিস্টার লোঁজেলের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়ল সে। হে ঈশ্বর, এই লোকটার কোনো কান্ডজ্ঞান নেই! আশেপাশে সবাই দামী ফার, পশমের চাদর পরে বেরোবার জন্য তৈরী হচ্ছে, সেখানে তার স্বামী রঙচটা, পুরোনো চাদর নিয়ে বলছে পরে নাও। কতজন দেখলো কে জানে?
রাস্তায় বেরিয়েও হল সমস্যা। এত রাত অথবা এত ভোরে রাস্তায় একটাও গাড়ি নেই। বহু চেষ্টার পরও যখন কিছুই জুটলো না, তখন মিস্টার লোঁজেল ক্লান্ত স্বরে বললেন,
“তুমি এখানেই দাঁড়াও। আমি একটু এগিয়ে দেখি। রাস্তার মোড়ে গেলে ছ্যাকরা গড়ি পাওয়া যাবে ঠিক। আমি নিয়ে আসছি।”
মাতিল্ডা দুষ্টু পোনী ঘোড়ার মতো ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানে। গাড়ি কেনার মুরোদ না থাকলে এমনি দুর্দশাই হয়।
মারটিয়ার স্ট্রীটে তাদের বাসার সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই মাতিল্ডার শরীর সীসার মতো ভারী হয়ে গেল। পা দুখানা যেন আর চলতে চায় না। কোথায় সেই আলো ঝলমল, দামী কার্পেটে মোড়া বলরুম আর কোথায় এই অন্ধকার, ভাঙাচোরা বাসাবাড়ি! আবার সেই বিরক্তিকর একঘেয়ে জীবন! শোবার ঘরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে, এমন আশ্চর্য একটা রাতের প্রতিবিম্ব যদি শেষবারের মতো দেখে নেওয়া যায়। নিজের রূপে যদি আরও কিছুক্ষণ ডুবে থাকা যায়… সিল্কের গাউনের ওপর আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালো মাতিল্ডা। চাদরখানা সরিয়ে নিজের দিকে তাকাতেই হঠাৎ আঁতকে উঠলো সে। একী! নেকলেসটা কোথায় গেল? একটু আগেই তো তার গলাতে ছিল!
মিস্টার লোঁজেল জামাকাপড় খুলে ততক্ষণে ঘুমোনোর জন্য রেডি হচ্ছিলেন। স্ত্রীর অবস্থা দেখে তিনি হকচকিয়ে গেলেন,
“কী হল মাতিল্ডা, অমন করছ কেন? কী হয়েছে?”
মাতিল্ডা কোনোরকমে বলল,
“নেকলেসটা নেই!”
“অসম্ভব! নেই মানে! তোমার গলাতেই তো ছিল! কোথায় গেল?”
স্বামী-স্ত্রী দুজনে সব জায়গায় খুঁজলো আবার। তার চাদরে, গাউনের ভাঁজে, মিস্টার লোঁজেলের পকেটে, শোবার ঘরের মেঝেতে, সিঁড়ির ধাপে… নাহ্ নেই। কোথ্থাও নেই ম্যাডাম ফরেস্তিয়ারের নেকলেস।
মিস্টার লোঁজেল বললেন,
“মাতিল্ডা, ঠিকমতো ভেবে দেখো, বলরুমে খুলে পড়েনি তো তোমার নেকলেস?
“না, বলরুম থেকে বেরোনোর সময় গলাতেই ছিল, আমার পরিস্কার মনে আছে…”
মিস্টার লোঁজেল বিড়বিড়িয়ে বললেন,
“রাস্তায় হাঁটার সময়ও পড়েনি, পড়লে টের পাওয়া যেত। তাহলে…”
নারী-পুরুষ একত্রে বললো,
“গাড়িতে!”
“ওই গাড়িতেই পড়েছে নিশ্চয়। ওই গাড়ির নম্বরটা কী দেখেছিলে তুমি?”
মাতিল্ডা ঘাড় নাড়লো।
“বারে, গাড়ি ডাকতে তো তুমি গিয়েছিলে। আমি কী করে নম্বর দেখবো!”
“আহ্, ঝগড়া করো না এখন। শোনো আমি রাস্তায় গিয়ে খোঁজ করছি। দেখি গাড়িটার খোঁজ পাওয়া যায় কিনা? তুমি দরজা আটকে রেখো।”

জামা-জুতো গায়ে চাপিয়ে মিস্টার লোঁজেল বেরিয়ে গেলেন রাস্তায়। মাতিল্ডা পাথর হয়ে বসে রইল ঠান্ডা মেঝের ওপর। হীটার জ্বালানো, রান্নার ব্যবস্থা কিছুই হয়ে উঠলো না সেদিন। অন্ধকারে চুপ করে বসে সে শুধু অপেক্ষা করছিল তার স্বামীর ফিরে আসার। পুরো দিন কেটে গেল। মাতিল্ডার পরনে আগের রাত্রির গাউন। খোঁপা ভেঙে এলোমেলো চুল ছড়িয়ে পড়েছে তার পিঠে। রাত্রিবেলার রূপটান ঘামে গলে তাকে দেখাচ্ছিল ঠিক প্রেতাত্মার মত। তার বাড়িতে কাজ করতে আসে যে বুড়ি সে এসে বারকয়েক ডেকে ফিরে গেল। দরজার ওপর কান রেখে মাতিল্ডা চুপচাপ বসেছিল। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ সিঁড়ির ওপর মিস্টার লোঁজেলের ভারী বুটজুতোর আওয়াজ পেয়ে সে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল।
নাহ্, ওই গাড়িটার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নেকলেসটা কোথায় আছে, তাও জানা যায়নি। মিস্টার লোঁজেলের মুখ-চোখ বসে গেছে। থানায় গিয়ে রিপোর্ট করে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু পুলিশ বলেছে যে সময় লাগবে। তাড়াহুড়ো করা সম্ভব নয়। মাতিল্ডা ভেঙে পড়লো এবারে। এতক্ষণ একটু হলেও আশ্বাস ছিল যে তার স্বামী যেভাবে হোক হারখানা খুঁজে আনবেন। কিন্তু মিস্টার লোঁজেলের অবস্থা দেখে সেই ভরসাটুকুও রইলো না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো,
“ওগো কী হবে? জীনকে কী বলব এবার?”
মাথার দুপাশের রগ দুহাতে টিপে বসেছিলেন মিস্টার লোঁজেল। সেই অবস্থাতেই বললেন,
“ওকে চিঠি লিখে জানাও যে হারের লকটা তুমি ভেঙে ফেলেছ। কয়েকদিন সময় চেয়ে বল যে, তুমি লকটা মেরামত করে ওর কাছে হারটা পাঠিয়ে দেবে।”
স্বামীর কথামতোই কাজ করলো মাতিল্ডা। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি লিখতে বসলো সে।

সপ্তাহখানেক পরে তারা হাল ছেড়ে দিল। পুলিশের থেকেও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মিস্টার লোঁজেল বললেন,
“মাতিল্ডা যে ভাবেই হোক, ঠিক ওইরকম আরেকখানা নেকলেস কিনে তোমার বান্ধবীকে ফিরিয়ে দিতে হবে। নইলে আমরা চুরির দায়ে পড়ব।”
নেকলেসের বাক্স থেকে জুয়েলারের নাম জানা গেল। পরদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে গেলেন সেই জুয়েলারের দোকানে। জুয়েলার বাক্সখানা চিনল সে, কিন্তু হারের বর্ণনা শুনে সে মাথা নাড়ল।
“নাহ্, এমন প্যাটার্নের নেকলেস আমাদের কাছে কোনোদিনই ছিল না। বিশ্বাস না হলে ক্যাটালগ দেখে নিন।”
কথাগুলো মিথ্যে ছিল না। ক্যাটালগে সত্যিই অমন ডিজাইনের হার পাওয়া গেল না। দু’জনে খুঁজতে শুরু করলেন পুরো প্যারিস জুড়ে। অন্তত পঞ্চাশখানা দোকানে দেখার পর, শেষ পর্যন্ত ভার্সাই প্যালাসের পাশে একটা বড় শোরুমে পাওয়া গেল অবিকল একই ডিজাইন। হীরের নেকলেস। ঠিক যেমনটি ম্যাডাম ফরেস্তিয়ারের ছিল। মিস্টার লোঁজেল সাহস করে দাম শুনতে চাইলেন, দোকানী জানালো, চল্লিশ হাজার ফ্রান্ক। বহু কাকুতিমিনতি করে দামটা শেষ পর্যন্ত ছত্রিশ হাজারে নামানো গেল। পকেটে যা কিছু ছিল সব দিয়ে নেকলেসটাকে বুক করে এলেন তারা। তিন দিনের মধ্যে টাকা নিয়ে এলে নেকলেস তাদের।
মিস্টার লোঁজেলের পৈতৃক সম্পত্তি যা কিছু ছিল সেসব বিক্রী করে হাতে এল আঠারো হাজার ফ্রান্ক। বাকী টাকার জোগাড় হল ধার করে। অফিস থেকে হাজার, এর থেকে পাঁচশো, ওর থেকে তিনশো। ঘরের সব আসবাবপত্র গেল বন্ধক হিসেবে পাওনাদারের কাছে। দুই সপ্তাহ পর শুকনো মুখে মাতিল্ডা তার বন্ধুর বাড়িতে গেল হীরের হারখানা ফিরিয়ে দিতে।
ম্যাডাম জীন ফরেস্তিয়ার নেকলেসটাকে হাতে নিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন,
“একদিনের জন্য নিয়েছিলি, আর পনেরো দিন পরে ফিরিয়ে দিচ্ছিস!”
মাতিল্ডা শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল নেকলেসের বাক্সখানার দিকে। তাদের সারাজীবনের হাসি, আনন্দ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু ওই হীরের মধ্যে জমাট বেঁধে রইল। অত দুঃখেও একটুখানি হাসি পেল তার। মন্দ নয়, জাঁকজমকটুকু বাদ দিলে তাদের আগামী দিনগুলো অবিকল হীরের মতোই হবে। শুস্ক, কঠিন, মৃত্যুর মতো শীতল!
সমস্যা মাত্রাছাড়া হয়ে গেলে, মানুষ বোধহয় ভয় পেতেও ভুলে যায়। লোঁজেল দম্পতির অবস্থাও হল ঠিক তাই। ওই একরাত্রির রোশনাই-এর মূল্য চোকাতে যে পুরো জীবনটাই জ্বালানী হয়ে জ্বলবে, সেটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না তাদের। গরীব তারা আগেও ছিলেন, কিন্তু সম্মানের কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এখন অবস্থা যা হল তা কহতব্য নয়। বাপ-ঠাকুরদার রেখে যাওয়া যৎসামান্য সম্পত্তির গরিমাটুকু তপ্ত কড়ার ওপর পড়া জলের ফোঁটার মতো বাস্প হয়ে উবে গেল। বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বলতে কেউ রইলো না। চেনাজানা সবাই এখন পাওনাদার।

বাড়িতে যে মহিলা কাজ করতেন তাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হল। ভদ্রস্থ ভাড়া বাড়িতে থাকার মতো সামর্থ্য আর তাদের ছিল না। মিস্টার লোঁজেল নামমাত্র ভাড়ায় পরিচিত একজনের বাড়ির গ্যারাজটি ভাড়া নিলেন। আশ্চর্য্যের ব্যাপার, মারটিয়ের স্ট্রীটের তিন কামরার বাড়িটাকে মাতিল্ডা এতদিন ঘৃণা করতো, কিন্তু গ্যারেজের এই একচিলতে ঘরে সে দিব্যি মানিয়ে নিল। তার ভাল গাউন দুখানা বিক্রী করে সংসার খরচের সুরাহা হল। গাউন দুটোর সঙ্গে তাঁর অহংকারও পত্রপাঠ বিদায় নিল। কেরানী বৃত্তির পাশাপাশি মিস্টার লোঁজেল প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় খাতা লেখার একটা এক্সট্রা কাজ জোটালেন। মাতিল্ডাও পিছিয়ে রইলো না। অন্যান্য বাড়ির পরিচারিকাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সে বাজার করতে শিখলো, দুটো পেনি বাঁচানোর জন্য কর্কশ গলায় দরাদরি করতে শিখলো। কোঁচকানো রোঁয়া ওঠা ফ্রকের ওপর এপ্রন পরে সে দ্রুত হাতে বাসন মাজতে অবধি শিখে গেল। জামাকাপড় ধুয়ে, ঘর মুছে আর বাসন মেজে তার হাতের অবস্থা হল খেটে খাওয়া চাষীবউদের মতো।

দশবছর পর এই যন্ত্রণা শেষ হল। ঠিক দশবছর পর তাদের ঋণের দায় মিটল। দেনার শেষ পেনিটুকু মিটিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে ঋণমুক্ত হল তারা। মিসেস মাতিল্ডা লোঁজেলকে এখন আর চেনা যায় না। তার শক্ত, শিরা ওঠা হাত, না আঁচড়ানো রুক্ষ চুল, বলিরেখায় ঢাকা মুখ দেখলে মাথায় যে শব্দটা আসে তা আর যাই হোক ‘ভেনাস’ নয়। পিয়ানো বাজানো, বোরদ্যোঁ ওয়াইনের আলোচনা অলস দিবাস্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেছে। তার বদলে মাতিল্ডা এখন মেঝে ঘষা, কয়লা ভাঙা, বালতি বালতি জল তোলার কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছে।

রোববার সন্ধ্যেবেলায় মাতিল্ডা পার্কে গিয়ে বসেছিল। সারা সপ্তাহ হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই একটা দিনই সে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায়। হঠাৎ বাচ্চা সমেত আরেক মহিলাকে দেখে সে চমকে উঠলো। জীন না, হ্যাঁ জীনই তো! সঙ্গে ওর ছোটো মেয়েটা। কী সুন্দর দেখাচ্ছে ওদের। জীনের বয়স যেন এতটুকুও বাড়েনি। ঝলমল করছে ওর চুল। গাউনটাও কী সুন্দর। বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে রইল ওদের দিকে মাতিল্ডা। ওই ভয়ঙ্কর রাতটা যদি মিথ্যে হত। জীনের হারখানা মাতিল্ডা যদি না চেয়ে নিত, তাহলে কে জানে হয়তো মাতিল্ডাও আজ ওর মতোই…। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। একবার ভাবল জীনের চোখে পড়ার আগেই সে পার্ক থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর আবার তার মনে হল, কেন? পালাবে কেন? সে কোনো অপরাধ তো করেনি। ভাগ্যদোষে বিপদে পড়েছিল কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সেই বিপদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। দশটা বছর সময় কী কম! দশ বছর ধরে নিজের পাপের, না না পাপ নয়, ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছে সে। বরং আজ তো তার গর্বের দিন। তার ঋণমুক্তি ঘটেছে আজ। নাহ্, সে পালাবে না, বরং জীনকে সবকিছু খুলে বলবে সে। লুকোনোর তো কিছু নেই।

কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে মাতিল্ডা বললো,
“জীন কেমন আছিস? কতদিন পর দেখলাম তোকে?”
ম্যাডাম জীন ফরেস্তিয়ার অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। ছেঁড়া ফ্রক পরা, আধবুড়ি এই অপরিচিত মহিলা তাকে ‘জীন’ বলে সম্বোধন করায় তিনি যারপরনাই অবাক হলেন। তিনি একটু ভেবে বললেন,
“ক্ষমা করবেন, আপনি কী আমায় চেনেন?”
মাতিল্ডা ম্লান হাসলো,
“জীন, আমি মাতিল্ডা। মিসেস মাতিল্ডা লোঁজেল, তোর স্কুলের বন্ধু।”
ম্যাডাম ফরেস্তিয়ার প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ওহ মাই গড! মাতিল্ডা! একী অবস্থা হয়েছে তোর! আমি চিনতেই পারিনি!”
“এত আঁতকে উঠিস না জীন। আমার এই অবস্থার পেছনে সামান্য হলেও তোরও দায় আছে।”
“আমি! আমি আবার কী করেছি?”
“সেই হীরের নেকলেসটা তোর মনে আছে, যেটা তুই আমাকে পরতে দিয়েছিলিস?”
“হ্যাঁ, কিন্তু ওটা…”
“সেই নেকলেসটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
“হারিয়ে ফেলেছিলিস মানে? সেই নেকলেস তো তুই কবেই আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিস। তার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?”
মাতিল্ডা হাসলো,
“আমি যেটা এনে দিয়েছিলাম সেটা ওটার মতোই দেখতে বলে তুই বুঝতে পারিসনি। আমাদের অবস্থা তো তুই জানতিস। গত দশবছর ধরে সেই নেকলেসটারই দাম শোধ করেছি। আজকে সুদেআসলে সেসব ঋণ শোধ হল।”
ম্যাডাম ফরেস্তিয়ার পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন,
“মাতিল্ডা, একবার বলতে তো পারতিস আমায়। তোকে যে নেকলেসটা দিয়েছিলাম, ওটা নকল! মাত্র পাঁচশো ফ্রান্ক দাম ছিল ওটার। ওটা হীরে নয়, কাঁচ…!”

এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

2 thoughts on “নেকলেস

  1. যূথিকা, বিশ্বের অন্যতম সেরা ছোটগল্পকার গী দ্য মঁপাসা-র “নেকলেস”-এর সুন্দর অনুবাদ করেছ তুমি ! নিশ্চয়ই ভাবানুবাদ, তাই তো? এ গল্প আমার পড়া ছিল। আবারও পড়লাম একইরকম আগ্রহ নিয়ে। চিরন্তন আবেদন রয়েছে এ গল্পের প্রতিটি ছত্রে!
    টাইপিং -এ নিশ্চয়ই গোলমাল হয়েছে… অবশ্য তেমন কিছু নয়… সামান্য কয়েকটি শব্দের ক্ষেত্রে। তাছাড়া, তুমি একজায়গায় ফ্রান্সের মুদ্রা “ফ্রাঁ”-র বদলে লিখে ফেলেছ “ডলার”! নাথিং সিরিয়াস।
    তোমাকে এমন সুন্দর সাবলীল অনুবাদের জন্যে জানাচ্ছি অনেক অনেক ধন্যবাদ আর থাকছে আন্তরিক শুভেচ্ছা অন্তহীন।

  2. অসাধারণ মোচড়। লোভ আকাঙ্খার শাশ্বত টানাপোড়েন এই গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেও উত্তরণ ঘটেছে আত্মসম্মান বোধের কঠিন বাস্তবের ছোঁয়ায়। সাবলীল অনুবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *