onubad-polander-kobitaguchha

পোল্যান্ডের কবিতাগুচ্ছ
অনুবাদ: তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
জবিগনিউ হার্বার্ট, বিয়ালোঝেউইস্কি ও হারাসিমোউইৎস – এই তিনজন তরুণ কবির সঙ্গে ‘নিউ ওয়েভ’ আন্দোলনের শরিক হয়েছিলেন গ্রোচোস্কি। তাতে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে ‘ফাস্ট ভ্যানগার্ড’-এর বৃদ্ধ কবিরা তরুণ কবিদের ওপর আক্রমণ শুরু করলেন তাদের লাম্পট্যের জন্য, তাদের কবিতায় ভয়ানক সব বিষয়বস্তুর অবতারণার কারণে। তাদের মধ্যে গ্রোচোস্কি ছিলেন প্রধান লক্ষ্যস্থল। এই আক্রমণের পশ্চাতে আসল উদ্দেশ্য ছিল এই তরুণদের দর্শন বিষয়ে অতি উৎসাহ সম্পর্কে এক বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করা যা তাদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতেন। যাঁদের উপর আক্রমণ করা হয়েছিল, তাঁরা ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন কিনা বলা মুশকিল। তবে তিরিশ বছর বয়সেই তাঁদের এমন খ্যাতি হয়েছিল যে, নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন।
রানির স্তন কাঠ দিয়ে বানানো
স্ট্যানিস্ল গ্রোচোস্কি

রানির হাতদুটো চটচট করে চর্বিতে
রানির দু’কানে গুঁজে রাখা আছে তুলো
জিপসাম দাঁত আছে রানির মুখের ভিতর
আর রানির স্তন যেন কাঠ দিয়ে বানানো

আর এনেছি এক জিব যা মদের ছোঁয়ায় তপ্ত
ঝিকমিকে লালা চটচট করে মুখের ভিতর
আর রানির স্তন যেন কাঠ দিয়ে বানানো

রানির বাড়িতে শুকিয়ে যাচ্ছে একটা হলুদ মোমবাতি
রানির বিছানায় ঠাণ্ডা হয়ে যায় জলের বোতল
ত্রিপল বিছিয়ে ঢেকে রাখা আছে রানির আয়নাগুলো
রানির গেলাসে মরচেয় পোড়ে একটা পিচকারি

এবং এনেছি বলবান এক কচি পেট
সঙ্গে কিছু দাঁত যা যন্ত্রের মত টানটান
আর রানির স্তন কাঠ দিয়ে বানানো

রানির চুল থেকে ঝরে ঝরে পড়ে পাতা
এক মাকড়সার জাল রানির চোখ থেকে খসে পড়ে
তাঁর হৃদপিণ্ড শব্দ তুলছে মৃদু ফোঁসফোঁস
হলুদ হয়ে গেঁথে রানির নিশ্বাসে জানালার শার্সিতে

এবং এনেছি ঝুড়িতে করে এক ঘুঘু
আর সোনালি বেলুন একঝাঁক
রানির চুল থেকে ঝরে ঝরে পড়ে পাতা


যখন কিছুই থাকেনা
স্ট্যানিস্ল গ্রোচোস্কি


একদিন আমি তোমাকে জাঁকজমকের ভিতর বসাবো
যেখানে থাকবে জলের মতো ভারী জামাকাপড়
থাকবে আপলের গন্ধওলা মোজা
বিশাল ধার আছে এমন টুপি
আর থাকবে ধাতু

তোমাকে চাই নগ্ন গাঢ় ল্যান্ডস্কেপের ভিতর
যাতে নিবিড় হয়ে আছে ব্রোঞ্জের দীপাধার ও ফুলদানি
যার থেকে একটা ভ্যানিলা লতা ধোঁয়া ছাড়ুক
মহান ডেনীয়দের শ্বাসটান নাসারন্ধ্রের ভিতর

রেমব্র্যান্ডট অনুভব করেছিলেন এমন প্রয়োজন সাস্কিয়া আঁকবার সময়
যে বারবার হারিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর মধ্যে
আর যদি তিনি চাইতেন আঙুরের ওজনের সঙ্গে সে থাকুক তাঁর সঙ্গে
দামী বাতিদানের আলোতে তাকে টেনে নামিয়ে আনার জন্য

লেখক পরিচিতি: জবিগনিউ হার্বার্ট
জবিগনিউ হার্বার্টের প্রথম কাব্য গ্রন্থ যখন প্রকাশিত হয়, তাঁর বয়স তিরিশের উপর। উনিশশো ছাপ্পান্ন সালের আগে কবিতা প্রকাশের অর্থ ছিল নিজের রুচির উপর আনুগত্য না রাখা, কিন্তু হার্বার্ট তা মানতে রাজি ছিলেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে হয় ও সেসময় তাঁর নিজস্ব ব্যাক্তিত্ব, অটুট স্বাস্থ্য ও রূঢ়তা তাঁকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে, এমনকি তারও পরে রাজনৈতিক গোঁড়ামির দিনগুলোতেও তিনি আস্থা রাখতেন নিজের রুচির উপর।

তাঁর কবিতার ফর্ম দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় প্রাক-যুদ্ধ দিনের ‘সেকেন্ড ভ্যানগার্ড’ আন্দোলন থেকে শুরু করে রোজউইৎস হয়ে তরুণতম কবিদের যে ধারা, হার্বার্ট তারই এক যোজক ছিলেন। যদিও তাঁর উচ্চারণ ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আইনে ডিপ্লোমা ছিল হার্বার্টের, পড়েছিলেন দর্শন ও শিল্পের ইতিহাস, এই সবকিছু তাঁর কবিতায় কোনো না কোনোভাবে অনুপ্রবেশ করেছে।

দু’বছর ফ্রান্স ও ইটালিতে থাকার পর তিনি একগুচ্ছ প্রবন্ধ লিখেছিলেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর, যেগুলি তাঁর কবিতা ও নাটিকাগুলির সঙ্গে ইন্দ্রিয়গতভাবে যুক্ত। এখন তিনি বসবাস করেন ওয়ারশ-এ, ও প্রায়শ ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন পশ্চিম ইউরোপে।


জিহ্বা
জবিগনিউ হার্বার্ট

অসাবধানে আমি তার দাঁতের সীমানা পার হয়ে গেলাম এবং গিলে ফেললাম তার চঞ্চল জিব।
ওটা আমার ভিতরেই আছে এখন, একটা জাপানি মাছের মতো। ওটা ধাক্কা দিচ্ছে আমার হৃদপিণ্ড।
আর আমার বুকের ঝিল্লি যেন অ্যাকোরিয়ামের একটা দেওয়াল। ওটা তলা থেকে ঘুলিয়ে তুলছে পলি।
সে অর্থাৎ যাকে তার স্বর থেকে বঞ্চিত করেছি, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আর অপেক্ষা করছে কথার জন্য।
তবু আমি জানি না তার সঙ্গে কথা বলতে হলে কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে – যে ভাষা আমি চুরি করে এনেছি সহৃদয়তার আতিশয্যের জন্য, যেটা আমার মুখের ভিতর গলে-গলে যাচ্ছে।

ক্ষণিক বিরতি
জবিগনিউ হার্বার্ট

আমরা থেমে দাঁড়ালাম একটা শহরে
গৃহকর্তা টেবিলটাকে বাগানে সরিয়ে দেবার জন্য হুকুম দিলেন
প্রথম তারা ফুটে উঠল আবার নিভে গেল
আমরা রুটি ছিঁড়লাম ঝিঁঝির শব্দ শোনা যাচ্ছিল
সন্ধ্যের আগাছার ভিতর একটা চিৎকার – বাচ্চার কান্নামাত্র – নয়তো
মানুষের কণ্ঠস্বর নয়, বহু পতঙ্গের গুঞ্জন একটা তীব্র গন্ধ মাটির যারা দেওয়ালের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছিল তারা ফাঁসিকাঠকে দেখল পাহাড়গুলোকে এখন বেগুনি পাহাড়ের মত দেখাচ্ছে
দেওয়ালের গায়ে আইভিলতার মতো আঁকাবাঁকা ফাঁসির দড়ি
আমরা প্রচুর খাচ্ছিলাম
যা হওয়া উচিত যখন আমাদের কাউকেও দাম দিতে হবে না

একটি নগ্ন শহর
জবিগনিউ হার্বার্ট

সমভূমির ওপর লোহার পাতের মতো চিতিয়ে রয়েছে শহরটা
শহরের গির্জার ভাঙাচোরা হাতের ছুঁচলো নখর বাড়িয়ে
পাকস্থলীর রক্তের মতো ফুটপাত আর ছালচামড়া ছাড়িয়ে নেয় ঘরবাড়ি

সূর্যের হলুদ ঢেউয়ের নীচে
চাঁদের খড়িগোলা ঢেউয়ের নীচে শহর
হে শহর কোন সে শহর তার নামই বা কী
কোন নক্ষত্রের নীচে কোন রাস্তাতেই বা তার অবস্থান

মানুষজন সম্পর্কে তারা কাজ করে
রক্তরাঙা কংক্রিটের দেওয়ালমোড়া একটা বিশাল অট্টালিকার কসাইখানায়
আর জন্তুর অন্তিম প্রার্থনা কোনও কবি কি সেখানে আছে (কবিরা নিস্তব্ধ)
শহরের বাইরে আছে সৈন্যদল ব্যারাকের হৈহল্লা
রবিবারে সেতুর ওপাশে কাঁটাঝোপের আড়ালে ঠাণ্ডা বালির উপর
বিবর্ণ ঘাসের উপর মেয়েরা গ্রহণ করে সৈন্যদের
কিছু কিছু জায়গা আছে যা শুধু স্বপ্নের সিনেমার দেওয়ালে
ঝলসে ওঠে বারের দেওয়ালের দাগ
আর কুকুরও রয়েছে সেখানে ক্ষুধার্ত কুকুর যা ঘেউঘেউ করে
আর এভাবেই শহরের সীমানা নির্দেশ করে আমেন

আর তুমি কিনা এখনও জানতে চাইছ কী নাম সেই শহরের
যা চাইছে ফুঁসে ওঠা রাগ কোথায় সেই শহর
কোন বাতাসের তারের উপর বা হাওয়ার কোন স্তরের নীচে
আর যে মানুষেরা বাস করে তাদের চামড়া আমাদেরই মতো
বা আমাদের মুখের মতোই মুখ এমন মানুষ

এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *