দক্ষিণ ভারতে দেবদাসী প্রথা বিলোপের অন্যতম কান্ডারি আইরিশ রমণী অ্যামি কারমাইকেল
কৃষ্ণা রায়
উনিশ-শতকের ঔপনিবেশিক ভারতে যেসব বিদেশিনী সমাজ সেবার কাজে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অ্যামি বিয়াত্রিস কারমাইকেল-এর নাম কজনেই বা জানেন? অথচ অ্যামি ১৮৯৫ সালে ভারতে এসে একাদিক্রমে কাটিয়ে গেছেন পঞ্চান্নটি বছর, কখনো ফিরে যাননি স্বদেশে। আমৃত্যু ভারতের সমাজের এমন এক ব্যাধির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার দায়ে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন, যা সচরাচর শিক্ষিত জনসমাজ জেনেও তার প্রতিকারের জন্য ব্যস্ত হয়নি। সতীদাহ প্রথার মত বহু বছর ধরে ভারতে হিন্দু মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল দেবদাসী প্রথা। দেবতার সেবিকার আড়ালে যৌন কাজে কুমারি বালিকাদের নিষ্ঠুর ভাবে নিয়োগ করা ছিল সামাজিক দস্তুর। সেই করুণ প্রথার বলি হওয়ার হাত থেকে দক্ষিণ ভারতের বহু মেয়েকে বাঁচিয়ে জীবনের সন্ধান দিয়েছিলেন এই আইরিশ নারীটি।
জন্মেছিলেন উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের সমুদ্রের ধারের ছোট্ট গ্রাম মিলিসলেতে ১৮৬৭ সালে, এক স্বচ্ছল ঘরে। বাবা ডেভিড এর নিজস্ব কারখানা ছিল, মা ক্যাথারিন গৃহবধূ। দুজনেই ধার্মিক খ্রীস্টান। পরিবারে ঈশ্বর সেবা, প্রার্থনা আর নিয়মানুবর্তিতার মত বিষয়গুলিকে মান্যতা দেওয়া হত। সাত ভাই বোনেদের মধ্যে অ্যামি ছিল সবার বড়। কালো চুল আর বাদামি চোখের মেয়েটির তিন বছর বয়স থেকেই বড়ই দুঃখ, কেন ভগবান তাকে নীল রঙের চোখ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি। এই নিয়ে রোজ তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাত, হে ভগবান, আমার চোখের রঙ বদলে নীল করে দাও। কিন্তু ভগবান তার কথা শোনেননি। ছোট থেকেই তার মনটা বড়ই নরম। অন্যের দুঃখে সহজেই কাতর হয়ে পড়ত। বারো বছর বয়সে তাকে পাঠানো হল ইংলন্ডের ইয়র্কশায়ারে বোর্ডিং স্কুল হ্যারোগেট লেডিস কলেজে। এই স্কুলেই অবস্থানকালে অ্যামির খ্রিস্টধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মাল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে তিন-চার বছর পরেই স্কুল ছাড়তে হল। যদিও বাড়িতে পড়াশুনোর চর্চা অব্যাহত ছিল, বিশেষত বাইবেল পাঠের। পনেরো বছর বয়সে তার মনের কোথায় যেন একটা বদল এল, যীশুখ্রীষ্টকে অনুসরণ করাই তার জীবনের একমাত্র ব্রত হয়ে দাঁড়াল। অ্যামির বাবা ডেভিড যখন আয়ার্ল্যান্ডের বেলফাস্টে বাস করতে এলেন, তখন তার বয়স ষোলো। সেখানে ডেভিড খ্রীস্ট ধর্ম প্রচারের জন্য গড়ে তুললেন ওয়েলকাম ইভাঞ্জেলিক্যান চার্চ।
আঠারো বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় বাবার মৃত্যু হলে অ্যামির পরিবারটি বেশ বিপদে পড়ল। কিন্তু তার ধর্মভীরু মা ঈশ্বরের প্রতি আস্থা রেখে অবিচল থেকে সব কিছু সামলে নিলেন। অ্যামিও সেই পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে না পড়ে প্রতিবেশী বালক বালিকাদের নিয়ে প্রতি রবিবার একত্রে চার্চ-হলে বাইবেল পাঠ আর প্রার্থনার আসর বসানো শুরু করল। আর সেই সঙ্গে নিজে যুক্ত হল সেই সব গরীব শাল-ওয়ালিদের সংগে। আয়ার্ল্যান্ডের বেলফাস্টে কারখানার যেসব অল্পবয়সী মেয়ে মজদুররা ১৪ ঘন্টা দৈনিক খেটেও টুপি কেনার পয়সা যোগাড় করতে পারতনা, তারা শাল দিয়ে নিজেদের শরীর ঢেকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাত। তারাই হল তার প্রার্থনার সঙ্গী। কিন্তু প্রার্থনায় লাভ কিছু হল না। তবে শীঘ্রই সদস্য সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল, মিশনের প্রচার হল। এই সময়ে তার নজরে এল একটি বিজ্ঞপ্তির, পাঁচশ লোক ধারণ করার জন্য একটি লোহার তৈরি হলঘর নাকি পাঁচশ পাউন্ড খরচ করলেই করা যাবে। জনৈক মিস কিটচেল আর এক কারখানার মালিকের বদান্যতায় টাকা আর জমি যোগাড় হল। ১৮৮৭ সালে তৈরি হল “ওয়েলকাম হল”। বছর দুয়েক বাদে ম্যানচেস্টারের কারখানায় কাজের ডাক পেলেন অ্যামি। এদিকে আর্থিক দায়ভারে জর্জরিত হয়ে অ্যামির পরিবার তখন চলে এল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে। কিছুদিনের মধ্যেই অ্যামি নিউর্যালজিয়া নামের ভয়ানক স্নায়ুর অসুখে পড়ল । সারা গায়ে ব্যথা আর জ্বালার অনুভূতি। কয়েক সপ্তাহ একেবারে শয্যাবন্দী দশা। অবস্থা দেখে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন এক পরিচিত মানুষ রবার্ট উইলসন। বিপত্নীক এই ভদ্রলোকের অ্যামির বয়সি মেয়েটি মারা গেছে। অ্যামিকে তিনি সাদরে নিজের মেয়ের মত পরিবারে স্থান দিলেন। ধার্মিক এই মানুষটি ছিলেন ইংলন্ডের কেসউইক কনভেনশনের এক উদ্যোক্তা। দুটি বছর তার সান্নিধ্যে থেকে অ্যামির মধ্যে ঈশ্বর নির্ভরতা বেশ জাঁকিয়ে বসল। তার তখন তীব্র ইচ্ছে, মিশনারি হয়ে জীবন কাটিয়ে দেবে। সেই ব্যাপারে মায়ের কাছে অনুমতি চাইলেন। মা সানন্দে মত দিলেন। ব্যাস! এবার সব পারিবারিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি নিয়ে নিজের আকাংক্ষিত পথে চলা শুরু হল। ইতিমধ্যে চীনের মিশনারি সংস্থায় যোগাযোগ করেছেন, মিশনারি হবার জন্য লন্ডনে ট্রেনিং অবধি নিলেন। মিশনারি লেখক মেরী জেরালডিন গুইনেসের বহু উৎসাহ থাকা সত্ত্বেও ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য চীন দেশে মিশনারি হবার সুযোগ পেলেন না। সুযোগ এল পরে। কেসুইক মিশনারি হয়ে জাপানে পাড়ি দিলেন সাতাশ বছরের তরুণীটি। সময় ১৮৯৩ সাল। সজল চোখে বিদায় জানালেন পালক পিতা উইলসন। জাপানের জীবন বেশ কঠোর। প্রচন্ড ঠাণ্ডায় অনেক দুঃখ দুর্দশা ভোগ করে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, “অ্যামি! ডোন্ট বী আ বেবি, সিং আ কোরাস অ্যান্ড লুক ফরোয়ার্ড”। যখনই জীবনে দুঃসময় এসেছে, অ্যামি সব হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্য গান গেয়ে, প্রার্থনা করে মনোবল বাড়িয়েছেন। তবে জাপানের আবহাওয়া তার স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকূল হল না। পনেরো মাস সেখানে কাটিয়ে ১৮৯৪ সালে এলেন শ্রীলংকায়, সেখানে থাকতেই পালক পিতার অসুস্থতার খবর পেয়ে লন্ডনে ফিরে গেলেন। তারপর ১৮৯৫ সালের ১১ অক্টোবর সেই যে লন্ডন ছাড়লেন, আর কোনদিন সেখানে ফেরেননি। এলেন ভারতে, ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে, প্রথমে সে-সময়কার মাদ্রাজে। সেখানে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখ গেলেন ব্যাঙ্গালোরে। এখানকার মনোরম পরিমন্ডলে আশ্রয় নিয়ে স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হল। স্থির করলেন, এদেশেই তিনি মিশনারি হতে চান। চার্চ অফ ইংল্যান্ড জেনানা মিশনের নির্দেশে কাজ শুরু করলেন। কিন্তু ব্যাঙ্গালোরের মিশনারিদের সংগে তার মনের মিল হল না। এরা বড্ড সাধারণ, মানুষের সেবার ভাবনা এদের মধ্যে নেই। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কাজ করতে মোটেই চায় না।
অল্প কিছুদিন সেখানে থেকে ১৮৯৬ সালে রেভারেন্ড থমাস ওয়াকারের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতের তিন্নেভেলি জেলায় মিশনারি হয়ে নিজেকে সঁপে দিলেন। ওয়াকার পরিবারটি বেশ ধার্মিক, তারা হিন্দু ধর্মের ব্যাপারে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের বিষয়ে কিছুটা জানতেন। ব্যাঙ্গালোরে থাকতেই অ্যামি শিখেছিলেন তামিল ভাষা। তামিলনাড়ুতে এসে ওয়াকার পরিবারের সদস্য আর বেশ কিছু ভারতীয় ক্রিশ্চান মহিলাদের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ঘুরে নিঃস্বার্থ ভাবে যীশুর বাণী, উপদেশ প্রচার করতেন। আর সেভাবেই শিখেছিলেন ভারতীয় পোশাক পরার কৌশল।
এই সময় তার জীবনে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। তার বাসস্থানের কাছেই ছিল একটি মন্দির। একটি স্থানীয় ছোট মেয়ে সেখানে জল ভরছিল। অ্যামি তার সঙ্গে কথা বলে জানলেন মেয়েটির নাম প্রীণা। তার বিধবা মা টাকার অভাবে তাকে মন্দিরে বিক্রি করে দিয়েছে। সেখানে সে দিন-মজুরি করে। অ্যামি তাকে জানালেন তিনি নিজে কিভাবে ঈশ্বরের প্রেম আর করুণার নির্দেশ পেয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। কয়েক দিন বাদে অ্যামি জানতে পারলেন প্রীণার বিয়ে হয়ে গেছে মন্দিরের কোন এক দেবতার সংগে। এভাবেই অল্প বয়সি মেয়েদের দেবতার সেবা করার নামে তাকে উৎসর্গ করে যৌন ব্যবসায় জুড়ে দেওয়া হয়। প্রীণা মন্দির থেকে পালাল, কিন্তু তাড়াতাড়ি ধরাও পড়ে গেল, ফল হল ভয়ঙ্কর শাস্তি। লোহার রড গরম করে সারা গায়ে ছ্যাঁকা। কিছুদিন পর সে আবার পালাল। তখন তার অ্যামির কথা মনে পড়েছিল, তার কাছেই আশ্রয় চাইল। সমস্যায় পড়লেন অ্যামি। মেয়েটিকে আশ্রয় দিলে তাকে মেয়ে ধরার অপবাদ পেতে হতে পারে, আবার মেয়েটার কষ্টটাও উপেক্ষা করা যায়না। তার মুখে অত্যাচারের গল্প শুনে শিউরে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত অ্যামি তার বিবেক অনুযায়ী কাজ করলেন। এক প্রীণাকে বাঁচাতে গিয়ে জানলেন ভারতে এরকম বহু ছোট ছোট মেয়েকে মন্দিরে অন্যায় ভাবে ব্যবহার করা হয়। এ নাকি এক প্রাচীন প্রথা। অ্যামি আশ্রয় দিলেন ছোট্ট প্রীণাকে। দিনটা ছিল ১৯০১ সালের ৭ মার্চ। কিছুদিন পর অ্যামি এক ধর্মযাজকের মাধ্যমে আরেকটি ছোট মেয়েকে উদ্ধার করলেন। তিন বছর বাদে আরো সতেরটি শিশুকে উদ্ধার করলেন। ক্রমশ অ্যামি অবাক হচ্ছেন। তিনি তো বিয়ে করে মা হতে চাননি। মানুষের সেবা করতে চেয়েছেন। তাহলে ঈশ্বর তাকে এ কেমন পরীক্ষায় বার বার ফেলছেন? আবার নিজেকে প্রবোধ দেন, প্রভুর আদেশ শেষ কথা, ভৃত্য কখনো স্থির করতে পারেনা কোন কাজ তার করা উচিত আর কোনটা নয়। কোনো কাজ যদি আপাত ভাবে ঐশ্বরিক মনে নাও হয়, কিন্তু যদি তার মাধ্যমে অন্যের উপকার হয়, তাহলে আমি ভালবাসার কিছুই এখনো জানি না।
ইতিমধ্যে ১৯০১ সালেই প্রতিষ্ঠা করলেন ডোহনভার ফেলোশিপ (Dohnavur Fellowship)। ডোহনভার জায়গাটা তামিলনাড়ুতে, ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত থেকে মাত্র ত্রিশ মাইল দূরে। গাছপালায় ঘেরা বিশাল এলাকা। এখানে উনিশ শতকে জার্মান মিশনারিরা প্রথম কাজ করতে এসেছিলেন। আর এখানে স্কুল তৈরি করেছিলেন রেভারেন্ড থমাস ওয়াকার। অ্যামি বুঝলেন, এই সব অসহায় অনাথ মেয়েদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে হবে। তাদের শিক্ষা দিয়ে, যত্ন করে নতুন জীবন গড়ে দিতে হবে। প্রবল সাহসে সরাসরি বিপন্ন শিশুদের উদ্ধার করে তাদের আশ্রয় দিতে থাকলেন তার নিজের তৈরি ডোহনাভারের স্থায়ী অভয়াশ্রমে, যেখানে মেয়েরা নিশ্চিন্ত আশ্রয়, খাবার, আর স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবে। অসহায় কন্যা শিশুদের দেবদাসী হওয়া থেকে বাঁচাতে অ্যামি সরাসরি এভাবেই সামাজিক উদ্ধার কাজে নেমে পড়লেন। এর মধ্যে শিখেছেন শাড়ি পরা। শাড়ি পরে অকুতোভয়ে স্থানীয় মেয়েদের ছদ্মবেশে মন্দিরের মহল্লায়, গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, গ্রামের ধুলোয় ভরা পথ রোদ- বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে। কফি মেখে গায়ের রঙ তামাটে করতেন, কপালে পরতেন কুমকুম। যে বাদামি চোখের জন্য ছেলেবেলায় দুঃখ ছিল সেই চোখ তার এই সমাজকল্যাণের কাজে বিশেষ সহায়তা করল। বিদেশিনী থেকে একেবারে খাঁটি দেশীয় রমণী। খবর নিতেন মেয়ে পাচারের কাজ কোথায় কেমন করে হচ্ছে। এইসব খবর মন্দির কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় মিশনারিরা কখনই দিত না। খবর পেলেই মেয়েদেরপক্ষ উদ্ধার করে তার আশ্রমে নিয়ে আসতেন। সে ব্যাপারে মেয়েটির পরিবার অথবা মন্দির কর্তৃ, কারুর কথাই শুনতেন না। হিন্দু পুরোহিতেরা তাকে এর ফলে ভয়ানক অপছন্দ করতে শুরু করলেন। মন্দির থেকে বিড়ম্বিত শিশু উদ্ধারের জন্য প্রায় সময় আদালত অবধি নালিশ পৌঁছে যেত। আপাত ভাবে অ্যামির কাজকর্মকে আইনানুগ বলা চলে না। ১৯০০ সালের প্রথম দশকে পাঁচ বছরের শিশুকন্যা কোহিলাকে উদ্ধার করার সময় কন্যাটির পরিবার তাকে ফেরত চায়। আর ভারতীয় আইন মাফিক অ্যামিকে শিশু-চুরির অপরাধে সাত বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে সমালোচনার আশংকায় তিনি মুক্তি পেয়ে যান। ১৯১৩ সালে একটি শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে শিশুচুরির অভিযোগে একটি হিন্দু মন্দির কর্তৃপক্ষ তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। অনড় অ্যামি হতভাগ্য শিশুটিকে কিছুতেই অত্যাচারের মধ্যে ফিরিয়ে দেননি। সেই সময় তার সংঘে ১৩০টি বালিকা আশ্রয় পেয়েছে। ১৯১৮ সালে বালকদের জন্যও একটি আশ্রম তৈরি হল। এরা ছিল প্রকৃতপক্ষে মন্দিরের দেবদাসীদের অবৈধ সন্তান। সংঘের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দু বছর আগেই গড়ে নিয়েছেন প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মী “সিস্টারস অফ দ্য কমন লাইফ”। ভারতীয় এবং ইউরোপীয় নারীরা তার সদস্য ছিল।
ডোহনভার সংঘ বা ফেলোশিপ ক্রমশ বিস্তৃত হতে লাগল। প্রথম দশায় তৈরি হয়েছিল নার্সারি স্কুল, তারপর কুঠি বাড়ি, সব বয়সীদের জন্য স্কুল, টলমলে শিশু থেকে বালক বালিকাদের জন্য। ১৯১২ সালে ইংলন্ডের রাজা পঞ্চম জর্জের স্ত্রী রানি মেরী এই আইরিশ মিশনারীটির সেবামূলক কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ডোহনাভারে হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সাহায্য করেন। হাসপাতালে শুধু যে শিশু–বালিকাদের দেহের রোগ সারানো হত না, ধর্মকথা, ঐশ্বরিক বার্তা জানিয়ে তাদের মনের গঠনের দিকেও নজর রাখতেন অ্যামি। ধর্মপ্রাণ এই নারীটি মনে করতেন ডোহনভার সংঘের সব কাজের নেপথ্যের চালিকা শক্তি ছিল যীশুর উপদেশবাণী।
অ্যামির ডোহনভার ফেলোশিপ ক্রমে আয়তনে আরো বড় হতে লাগল। চারশ’ একর জমিতে আশ্রয় পেল পাঁচশ জন মানুষ। সংঘের প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হল ভারতীয়রা। সংঘের নিয়ম হল সংঘে জন্ম নেওয়া অথবা বাইরে থেকে সমস্ত উদ্ধার করা শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্তত ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। তাদের শেখানো হত বৃত্তিমূলক শিক্ষা। ১৯২০ সালের মধ্যে স্কুল, হাসপাতাল, আর অজস্র নার্সারি স্কুল গড়ে উঠল। কয়েক শ’ বালিকা এবং পরে মন্দিরে ঈশ্বরের কাজে সমর্পিত বালকেরাও আশ্রয় পেতে লাগল। তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে ভারতীয় নামকরণ অবধি করা হোত। এই সব শিশুরা তাদের জন্মদিন জানতনা। যেদিন শিশুরা উদ্ধার পেয়ে অ্যামির আশ্রমে প্রবেশ করত, সেই দিনটিকেই অ্যামি তাদের “কামিং ডে” বলে ভালবাসায়, স্নেহে, নতুন পোশাক পরিয়ে উদযাপন করতেন।
অ্যামি শুধু যে তাদের আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হতেন তাই নয়, দেবদাসী প্রথা যে একটি গভীর সামাজিক সমস্যা সেটি বোঝানোর দায়ে নিজের লেখক সত্ত্বাকে ব্যবহার করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা সম্বল করে বই লিখেছেন। ১৯০৫ সালে মন্দিরের গোপন যৌন পরিষেবার অন্ধকার দিকটি নিয়ে লেখেন বিশদ ভাবে “Things As They Are: Mission Work in Southern India” শিরোনামের বইটি। নিছক গুজব নয়, সর্বার্থে সত্য ঘটনার সেই সব তথ্য জেনে সারা পৃথিবী চমকে ওঠে। মন্দিরের অন্দরের গোপন আরো কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯০৯ সালে লিখলেন “Lotus Buds” ভারত এবং বহির্ভারতে এই কুৎসিত সামাজিক প্রথাটিকে মানুষের সামনে তুলে ধরলেন।
হতভাগ্য আশ্রিত শিশুদের যদি প্রশ্ন করা হোত, কেন তারা অ্যামির কাছে থাকতে যায়? উত্তরে তারা গভীর বিশ্বাস নিয়ে বলেছে, ভালবাসার জন্য। আম্মা আমাদের ভালবাসে। বস্তুত ডোহনাভার ফেলোশিপ গড়ে তোলার নেপথ্যে অজস্র শিশুদের মন্দির থেকে উদ্ধার, সাম্প্রদায়িক সংঘাত, আর একরাশ বাধার স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন আরেকটি বই ১৯৩২ সালে, নাম “গোল্ড কর্ডঃ দ্য স্টোরি অফ ফেলোশিপ”।
১৯৩১ সালে এক ভয়ানক দুর্ঘটনায় পড়ে প্রবল আঘাতে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন অ্যামি। আর সেই দশা তাকে বাকি দু দশকের জীবনটিকে পঙ্গু করে রাখল। কিন্তু সমাজ সেবার কাজ বন্ধ হল না। গৃহবন্দী থেকেই পরিচালনা করতেন সংঘের কাজ। মন দিলেন লেখালেখির কাজে। লিখলেন প্রায় ষোলটি বই। ব্যস্ত রইলেন আগের লেখা বই-এর পুনর্পরিমার্জনের কাজ নিয়ে। ভারতে কাজ করার সময় মিশনারি হতে ইচ্ছুক এক তরুণী তাকে প্রশ্ন করে ছিলেন চিঠিতে, “মিশনারি জীবনটা আসলে কেমন? উত্তরে অ্যামি লিখেছিলেন, “মিশনারি জীবন আসলে মৃত্যুর জন্য একটি সুযোগ পাওয়া। (“Missionary life is simply a chance to die.”) বস্তুত অ্যামি ভারতে নিজের জীবন বা আত্ম-সম্মানের মায়া না করে তৃণমূল স্তরে কাজ করে গেছেন, অসহায় বালিকাদের জীবন গড়ে দেওয়ার তাগিদে। একই সংগে সমকালের সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বাস্তব কত নির্মম। আর তাঁর সেই প্রচেষ্টার ভিত্তিতেই ভারতের আইন-রক্ষকেরা সজাগ হয়েছেন। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে এই বিষয়ে আইন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে। ভারতীয় সমাজসেবী চিকিৎসক ড মুথুলক্ষ্মী রেড্ডির দেবদাসী প্রথা নিয়ে আন্দোলনে সফল মাত্রা যোগ করেছে অ্যামি কারমাইকেলের সুদীর্ঘ ভারতবাসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তাঁর জীবনীকারদের মতে পঁয়ত্রিশটি বই লিখে ভারতের এই নিষ্ঠুর প্রথার বিষয়ে এমন ভাবে আলোকপাত তাঁর মত আর কেউ করেননি।
আজীবন কুমারী, প্রোটেস্ট্যান্ট ক্রিশ্চান মিশনারী অ্যামি অনাথ-আশ্রম আর ডোহানভার মিশনের মাধ্যমে সুদীর্ঘ পঞ্চান্ন বছর দেবদাসী-প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক কাজ করে গেছেন দক্ষিণ ভারতে। ১৯৪৭ সালে সেকালের মাদ্রাজে দেবদাসী-প্রথা বেআইনি ঘোষিত হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য প্রদেশে এবং সব শেষে জাতীয় স্তরে ২০১৬ সালে। অমানবিক এই প্রথাটি আজো সমাজে গোপনে রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যহীন, চলৎ-শক্তি রহিত মানুষটি দীর্ঘদিন এই ব্যাপারে লড়াই করে তিরাশি বছর বয়সে প্রয়াত হন ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সমাধিতে কোন স্মৃতি-ফলক রাখা হয়নি। আজীবন প্রচার বিমুখ আর পাখি-প্রেমী অ্যামির জন্য একদা তার কাছে আশ্রয় পাওয়া শিশুরা উদ্যোগ নিয়ে তার সমাধির ওপরে পাখিদের স্নানের জন্য একটি জলাধার স্থাপন করে, যেখানে তামিল ভাষায় লিখে রেখেছিল শুধুমাত্র একটি শব্দ, “আম্মা”। অ্যামি এভাবেই বেঁচে আছেন ভারতের ইতিহাসে, আর প্রতি বছর ১৮ জানুয়ারি চার্চ অফ ইংল্যান্ডে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে তাঁর সম্মানে গড়ে উঠেছে কারমাইকেল কলেজ। দুঃখের বিষয় কোন ভারতীয় এই অসামান্য নারীটিকে নিয়ে কোন গ্রন্থ রচনা করেননি। এমন করেই বোধ হয় মানবপ্রেমী অসামান্যাদের জীবন তাঁর কর্মকান্ডের মূল ভূখন্ডের মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।
তথ্য সুত্রঃ
- A Chance to Die: The Life and Legacy of Amy Carmichael by Elisabeth Elliot, F H ravell company, Chicago, USA, 1987, ISBN: 0800715357, 9780800715359
- Amy Carmichael of Dohnavur by Frank Houghton. CLC Publications, UK. 1980, ISBN-10: 0875080847
- With Daring Faith: A Biography of Amy Carmichael, by Rebecca Henry Davis, JourneyForth( Publisher), South Carolina, USA 1987 ISBN 10: 0890844143 ISBN 13: 9780890844144,
