prabandho-itihas-bismrito-namegulo

১৮৫৭ – ইতিহাস বিস্মৃত নামগুলো

রম্যাণী গোস্বামী

মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিদ্রোহের প্রসঙ্গ উচ্চারিত হলে প্রথমেই হু হু করে কয়েকটি নাম আমাদের মনের পর্দায় ভেসে আসে। মঙ্গল পান্ডে, নানা সাহেব, তাতিয়া টোপী, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই ইত্যাদি আরও কয়েকজনের। প্রশ্ন হচ্ছে যে ১৮৫৭-র রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের কান্ডারী কারা? ইতিহাস বইতে বারবার উচ্চারিত হয়ে চলা নির্দিষ্ট কিছু বিদ্রোহী নেতা ও নেত্রীরাই? আর আমরা যাঁদের ভুলে গেলাম, যাঁরা সেভাবে ঠাই পেলেন না ইতিহাসের পাতায়? তাঁদের কথা কি একটুখানি আলোচনার অপেক্ষা রাখে না?   

ছোট্ট একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ব্যারাকপুরের ৩৪ নম্বর বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির মঙ্গল পান্ডের নাম ও ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের উত্থাপনে তাঁর বিরাট ভূমিকার কথা আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু আমরা কজন জানি যে সেই একই ছাউনিতে মহাবিদ্রোহের তেত্রিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া ‘ব্যারাকপুর মিউটিনি’র রুদ্ধশ্বাস গাঁথা? ৪৭ নম্বর রেজিমেন্টের কোম্পানির সেপাই বিন্দী তিওয়ারীর শহীদ হওয়ার নির্মম ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা কি আদৌ ওয়াকিবহাল? হয়তো না। কিন্তু ব্যারাকপুরে অবস্থিত বিন্দী বাবার মন্দির ইতিহাসের বিবর্ণ মলাটের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া সেই ধূসর সময়ের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে আজও।

ওদিকে মহাবিদ্রোহের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে লখনউ রেসিডেন্সিতে স্থাপন করা হল এক বীরাঙ্গনা বেগমের মূর্তি। বিদ্রোহী বেগম হজরত মহল। নিজের দেশ অযোধ্যা বা আউধ থেকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হওয়া ভারতের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ এর হারেমের অন্যতম প্রধান বেগম যিনি। তাঁর প্রাণপণ ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের কাহিনীই বা আমরা কতজন জানি? বা মনে রেখেছি আজও?

প্রশ্ন আরও আছে।  

আপামর জনসাধারণের কাছে সিপাহী বিদ্রোহের মূল কারণ জিগ্যেস করলে সাধারণত উত্তর পাওয়া যায় একটাই। সেটা হল ১৮৫৬ সালে ভারতে নতুন আমদানি হওয়া এনফিল্ড রাইফেলে ব্যবহৃত বিতর্কিত গ্রিজড কার্তুজের আখ্যান। অথচ যুক্তি দিয়ে ভাবতে গেলে সত্যিই কি গুজবে রটে যাওয়া কার্তুজের অশুদ্ধতা এবং তা ব্যবহারে সিপাহীদের বাধ্য করাই ছিল এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের একমাত্র প্রধান কারণ? নাকি কোম্পানির সিপাহীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যা গড়ে তুলেছিল বারুদের পাহাড়, সেই পর্বতে ফাটল ধরিয়ে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটায় বহুচর্চিত ওই কার্তুজ ইস্যু?  

এই আন্দোলন কি কেবলমাত্র নেটিভ সেনাদের অন্তরের ক্ষোভ বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ? নাকি সাধারণ মানুষও সামিল হয়েছিলেন এতে? ১৮৫৭ কি শুধুমাত্র সিপাহীদেরই আন্দোলন? নাকি এ এক গণঅভ্যুত্থান? যেখানে কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনার পাশাপাশি দরিদ্র কৃষক, কারিগর, ক্ষমতাচ্যুত জমিদার বা ভূস্বামী, বিভিন্ন উপজাতির অত্যাচারিত সাধারণ মানুষেরাও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন? এ আসলে তিলে তিলে জমাট বাঁধা বহু দিনের জনরোষের প্রত্যক্ষ ফলাফল। যদিও এই ব্যাপারেও মিশ্র মতামত পাওয়া যায় প্রাজ্ঞ ইতিহাসবিদদের কাছ থেকে। কেউ কেউ বলেন যে এ ছিল শুধুই কিছু সংঘবদ্ধ সিপাহীদের বিক্ষোভ। উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে শেষ পর্যন্ত যা দিশা হারায়। কেউ বা অনড় একে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে মেনে নেওয়ায়। তাঁদের মতে ১৮৫৭ সেনাবিদ্রোহ কোনও তুচ্ছ সামরিক অভ্যুত্থান নয়। বরং এমনই এক সশস্ত্র জনরোষ যা পরবর্তীকালে আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। এবং হয়তো এই বক্তব্যটি সম্পূর্ণ ভুলও নয়। স্বয়ং মার্কস এবং এঙ্গেলস তাঁদের ‘The first war of Independence (1853-59)’ বইতে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। 

ফলাফল যাই হোক, বিদ্রোহ সফল হোক কিংবা ব্যর্থ, ইতিহাসে এই আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এবং সেই কারণেই ১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহ ও তার রূপরেখা এখনও একটি চর্চিত বিষয়। এই লেখাটিতে ফিরে দেখা সেই আন্দোলনকে এবং আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ইতিহাস বিস্মৃত কিছু নাম। এই প্রসঙ্গে ১৮২৪ এর ব্যারাকপুর মিউটিনির কথা যেমন আসবে, তেমনই আসবে সেই ঘটনার আঠেরো বছর আগের অর্থাৎ মহাবিদ্রোহের অর্ধশতাব্দী আগে ঘটে যাওয়া ভেলোর বিদ্রোহের প্রসঙ্গও। কিন্তু তার আগে দেখা যাক ইউরোপিয়ান সেপাইদের তুলনায় কতটা নিকৃষ্ট অবস্থায় ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুযোগ্য নেটিভ সেপাইরা। যাঁদের বলে বলীয়ান হয়ে ব্রিটিশ শাসক একের পর এক যুদ্ধ জয় করে নিজেদের সাম্রাজ্যের সীমারেখা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলতে ব্যস্ত তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকাঠামো ঠিক কেমন ছিল।

রেঙ্গুনে প্রথম ও দ্বিতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধে, দুঃসহ খাইবার পাস অতিক্রম করে সুদূর আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে যাঁরা বিনা বাক্যে কোম্পানির জন্য প্রাণ দিচ্ছেন, জানা যাচ্ছে যে তাঁদের মাসিক আয় ছিল খুব সামান্য। পদাতিক বাহিনীর একজন সিপাই মাসে বেতন পেতেন মোটে সাত টাকা আর অশ্বারোহী বাহিনীর একজন সওয়ার পেতেন মাসে সাতাশ টাকা। তার থেকে নিজেদের ইউনিফর্মের খরচ, ঘোড়া প্রতিপালন এবং রেজিমেন্ট বাজার থেকে রোজকার রেশন বাবদ টাকা কেটে নেওয়ার পর মাসের শেষে হাতে যা পড়ে থাকত তা বলার মতো কিছুই নয়। এছাড়াও আর্মিতে তাঁদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করা হত। দারিদ্রের পাশাপাশি অসম্মান ছিল তাঁদের নিত্য সঙ্গী। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে ভারতে নিযুক্ত কোম্পানির সৈন্যদের মধ্যে মাত্র ১৬.২ শতাংশ ছিল ইউরোপীয়। অথচ তাদের পিছনেই কোম্পানি সৈন্যদের দেওয়া সমগ্র বেতনের ৫৭.৮ শতাংশ ব্যয় করত। ভারতীয় সিপাহীর পদোন্নতির সুযোগও ছিল চোখে পড়ার মতো কম। তাঁরা বড়োজোর সুবাদার পদ পর্যন্ত উত্তীর্ণ হতে পারতেন যে পদের স্থান ছিল সর্বনিম্ন ইউরোপীয় অফিসারের অনেক নীচে!

এসব কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই সিপাহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় আর সেই ক্ষোভের পালে দমকা বাতাস লাগে যখন নির্দিষ্ট কোনও কারণে তাঁদের ধর্মীয় চেতনা প্রবলভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এই আঘাতের সূচনা হয় মহাবিদ্রোহের ৫১ বছর আগে। কীভাবে তা দেখা যাক। দক্ষিণ ভারতের ভেলোর শহরে অবস্থিত কোম্পানির উঁচু মাথার অফিসারদের হঠাৎ মনে হল যে সিপাইদের আরও বেশি ‘স্মার্ট লুকিং’ হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের গোঁফ দাড়ি রাখার উপরে, কপালে তিলক কাটার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল। এবং প্রবর্তিত হল নতুন ধরনের ড্রেস কোড। যেখানে চিরাচরিত কাপড়ের পাগড়ির পরিবর্তে কোম্পানির তরফ থেকে বিশেষ ধরণের টুপি মাথায় পরতে বলা হল যার ধারে লেদারের তৈরি একধরণের ফিতে আটকানো ছিল।

কিন্তু এই লেদার বা চামড়ার উৎস কী? সঙ্গতভাবেই ভারতীয় সেপাইদের মনে প্রশ্ন জাগল। গরু বা শুয়োরের চামড়া নয় তো! সকলেই জানে যে গরু হিন্দুদের কাছে পরম পবিত্র জীব। ওদিকে শুয়োর মুসলমানদের কাছে হারাম। চামড়ার বেল্ট আটকানো সেই নতুন টুপি মাথায় চাপানোর আদেশ মেনে নেওয়া নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের সেপাইদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল ত্রাস। ভয় নিজেদের জাত খোয়ানোর। ভয় বিধর্মী হওয়ার। শিরা ধমনীতে মজ্জায় মজ্জায় বয়ে চলা পূর্বপুরুষের সংস্কার। এত সহজে কি তা উপড়ে ফেলা যায়? আর এটাও মনে রাখতে হবে যে সময়ের কথা হচ্ছে তা আজ থেকে দুশো কুড়ি বছর আগেকার।  

১৮০৬ সালের ১০ জুলাই। ভারতীয় সিপাহীরা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে রাত দুটো নাগাদ আক্রমণ করে বসলেন ভেলোর দুর্গে অবস্থানরত ব্রিটিশ অফিসারদের। পরিসংখ্যান বলছে যে এই ঘটনায় ১৪ জন ব্রিটিশ অফিসার ও শতাধিক ইউরোপীয় সেনা নিহত হয়। এক দিনের এই বিদ্রোহ ভারতীয় সিপাহীদের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রক্তাক্ত সংগ্রাম যা ‘ভেলোর মিউটিনি’ নামে পরিচিত। ঘটনার সাত বছর আগে শ্রীরঙ্গপট্টনমের যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে নিহত হন টিপু সুলতান। তাঁর পরিবার তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নজরবন্দী হয়ে বাস করছিলেন ভেলোর দুর্গে। বিদ্রোহীরা ভেলোর দুর্গ দখল করে নিলেন এবং টিপু সুলতানের পুত্রকে নতুন শাসক হিসেবে ঘোষণা করলেন। কোম্পানি অবশ্য পরে কড়া হাতে বিদ্রোহীদের দমন করে। বহু নেটিভ সেনাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। অনেককে তোপের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হয়। যদিও শেষমেশ ড্রেস-কোড তুলে নিতে বাধ্য হয় কোম্পানি। কিন্তু কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত হয়ে গেল।

লেদারের বেল্ট আঁটা টুপি মাথায় পরা হোক কিংবা এর ঠিক পঞ্চাশ বছর পরের বিতর্কিত গ্রিজড কার্তুজের দাঁতে কেটে ব্যবহার। ভারতীয় সেনাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের উপরে বারেবারে আঘাত আসলে কিন্তু ইন্ধন মাত্র। বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ অনেক গভীরে প্রোথিত। সে কথায় পরে আসছি।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটল এর ঠিক আঠেরো বছর পর। ১৮২৪ সন। প্রথম ইঙ্গ-বার্মিজ যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। ব্রহ্মদেশে যুদ্ধের জন্য সেনা পাঠানোর নির্দেশ আসে কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরের সেনা ছাউনিতে। গাড়ির অভাবে বেঙ্গল আর্মির সেনাদের জাহাজপথে কালাপানি পেরিয়ে যুদ্ধের জন্য রেঙ্গুনে যেতে বলা হলে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। কারণ সেই সময় উচ্চ বর্ণের হিন্দু সিপাহীদের বিশ্বাস ছিল যে সমুদ্র অর্থাৎ কালাপানি পেরলে তাঁদের জাত ধর্ম বিনষ্ট হবে। প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবর প্যারেডের সময় ৪৭ নম্বর রেজিমেন্টের বীর সেপাই বিন্দী তিওয়ারীর নেতৃত্বে সিপাহীরা কোম্পানিকে স্পষ্ট জানালেন যে তাঁদের ভাতা ১০০ শতাংশ না বাড়ানো হলে তাঁরা মোটেই বার্মামুলুকে যাবেন না। আর স্থলপথে যেতে হলে বলদ গাড়ির ব্যবস্থাও কোম্পানিকেই নিজেদের খরচে করতে হবে। সিপাহীদের কাছে এত অর্থ কোথায়? তাছাড়া সব গাড়ি তো ইউরোপীয় সেনাদের দখলে। বলদে টানা গাড়ির প্রবল আকাল। পিঠে নিজেদের মালপত্র চাপিয়ে মাইলের পর মাইল আর কত ক্লান্তিকর পথ হাঁটবেন তাঁরা? সাহসী বিন্দী তিওয়ারীর বলিষ্ঠ প্রশ্নে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। একজন সামান্য নেটিভ সিপাইয়ের প্রতিবাদের সাহস হয় কীভাবে? একী আস্পর্ধা!   

১ নভেম্বর ব্যারাকে প্যারেড শুরু হলে সিপাহীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কমান্ডার ইন চিফ এডওয়ার্ড প্যাগেটকে বিদ্রোহী সেনারা পিটিশন জমা দিয়ে নিজেদের ক্ষোভ সম্পর্কে জানান। পরদিন দোসরা নভেম্বর সকালে প্যারেড গ্রাউন্ডে তাঁদের দশ মিনিটের মধ্যে অস্ত্র সংবরণ করে আলোচনায় অংশ নিতে বলা হয়। সেনারা যখন দোনোমোনো করছে ঠিক এই সময় এডওয়ার্ড প্যাগেটের আদেশে বিদ্রোহীদের উপর ইংরেজ গোলন্দাজেরা কামানের গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে। এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য ভারতীয় সেনারা মোটেই প্রস্তুত ছিল না। নিমেষে তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন ও প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটোছুটি আরম্ভ করেন। তখন চারিদিক দিয়ে তাঁদের ঘিরে ফেলা ইউরোপীয় সেনারা অবাধে হত্যালীলা চালায়। অসংখ্য নেটিভ সেনা প্রাণ বাঁচাতে সেনা ব্যারাকের পাশেই হুগলী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং জলের স্রোতে তলিয়ে যান। কেউ কেউ আবার স্থানীয় মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সেনারা বেয়োনেটের খোঁচায় একে একে তাঁদের হত্যা করে। সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের হাত থেকে রক্ষা পায়নি অসহায় গ্রামবাসী, মহিলা ও শিশুরাও। বিন্দী তিওয়ারী ও আরও এগারো জন বিদ্রোহের নেতাকে বিচারে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ৪৭ নম্বর রেজিমেন্টের নাম সেনা তালিকা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়।

এই আন্দোলনের পুরোধা বিন্দী তিওয়ারীকে সবচাইতে নির্দয়ভাবে মারা হয়। আহত রক্তাক্ত অবস্থায় এক সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছের ডালে দিনের পর দিন শিকলে বাঁধা অবস্থায় তৃষ্ণার্ত ক্ষুধিত রেখে তাঁকে তিলে তিলে শেষ করে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহাদুর। এমনকি তাঁর মৃতদেহ সৎকারের উপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ছয় মাস ধরে তাঁর মৃতদেহ রাস্তায় ফেলে রাখা হয় যতক্ষণ না সেই দেহে পচন ধরে। এর কিছুদিন পর সেই অশ্বত্থ গাছের তলায় শহীদ বিন্দী তিওয়ারীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি মন্দির নির্মাণ করেন স্থানীয় মানুষেরা। ব্যারাকপুরে এখনও বিন্দী বাবার সেই মন্দিরটি আছে। এও জানা যায় যে ৩৩ বছর পর ওই একই সেনা ছাউনিতে কর্মরত কোম্পানির সেপাই মঙ্গল পান্ডে নাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসে বসে থাকতেন বিন্দী বাবার মন্দিরে সেই অশ্বত্থ গাছের তলায়। হয়তো বিন্দী তিওয়ারীর বীরত্বের কাহিনী ঝিরঝিরে বাতাসে অনুরণন তুলে স্পর্শ করেছিল তরুণ সেপাই মঙ্গল পাণ্ডের হৃদয়ের গভীরে কোনও তন্ত্রীকে।                   

প্যাগেটের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ভালো চোখে দেখেনি ব্রিটিশ সরকার। শোনা যায় যে তাকে স্বদেশে ফিরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এরপরেও কোম্পানির সঙ্গে সেনাদের সংঘাত মনোমালিন্য চলতেই থাকে। ১৮৩৯ সালে আরম্ভ হয় প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ। এবারেও নেটিভ সেনাদের সঙ্গে কোম্পানির ঝামেলা বাঁধে। কোম্পানি তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি, এরকম দাবীতে বেঙ্গল ও মাদ্রাজ আর্মিতে সেনাদের ভিতরে দানা বাঁধে বিক্ষোভ। ১৮৪৪ সালে ফিরোজপুরের ৩৪ নম্বর রেজিমেন্ট বিশেষ ভাতা বা কমপেনশেসন ছাড়া অত্যন্ত কষ্টকর পথ অতিক্রম করে সিন্ধুপ্রদেশে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে। বেঙ্গল আর্মির ৬৯ নম্বর রেজিমেন্টের সিপাহীরাও তাঁদের ছায়া অনুসরণ করলে কোম্পানি ফের ধ্বংসাত্মক দমননীতি চালায়। এর কিছুদিনের মধ্যে রাওয়ালপিন্ডির ২২ নম্বর রেজিমেন্ট তাঁদের বেতন নিতে অস্বীকার করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে ভারতীয় সেনারা কোম্পানির উপর থেকে আস্থা হারাতে আরম্ভ করেন। কিন্তু শুধু সেনাদের অধিকার খর্বই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বেড়ে চলছিল আরও কতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণে। সেগুলো কী?

ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎ এদেশে খ্রিস্টান মিশনারিদের খুব বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। শুধুমাত্র স্কুল ও হসপিটালের গণ্ডী ছাড়িয়ে তাঁরা হাটবাজার ও ঘিঞ্জি অঞ্চলে এসে সাধারণ মানুষের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের জয়গাঁথা প্রচার করতে থাকেন। হিন্দু ধর্মের কঠোর নিয়ম আচারে বীতশ্রদ্ধ কেউ কেউ প্রকাশ্যে সেই ধর্ম সম্পর্কে আপত্তিজনক ও রূঢ় মন্তব্যও করতেন। ১৮৩৭ এ দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। অনাথ শিশুদের একটা বড় অংশকে খাদ্য পানীয় আশ্রয় দেওয়ার পর তাদের খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। এমন কি জেলের বন্দীদেরও খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ চলতে থাকে। এইসব কারণে জনগণের মনে তৈরি হয় মাত্রাছাড়া বিরক্তি এবং জাত খোয়ানোর আশঙ্কা। খ্রিস্টান মিশনারিদের এই মনোভাবের পিছনে যে কোম্পানির পূর্ণ সমর্থন রয়েছে সেই বিষয়ে কারোরই মনে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এমনিতেই সিপাই ছাড়াও সমস্ত ভারতীয়দের উপরেই ইংরেজদের অকারণ অসম্মান, দুর্ব্যবহার ও রোষ বর্ষিত হত। অভিজাতশ্রেণীর মানুষেরাও এই রোষানলের হাত থেকে রক্ষা পেতেন না। এবার ভারতীয়দের মনে আরও জোরদার ধারণা তৈরি হল যে ইংরেজ শাসকের আসল মতলব হল যাবতীয় হিন্দু ও মুসলমানকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা।

এছাড়াও দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ত ছিল কোম্পানি সরকারের নিষ্ঠুর ও নীতিহীন ভূমিরাজস্ব নীতি। চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি ও মহালওয়ারি, বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রহণ করা এইজাতীয় ভূমিরাজস্ব প্রথাগুলির ফলাফল ছিল একটাই। কৃষকদের উপরে খাজনার বিপুল বোঝা চেপে যাওয়া। খাজনার ভারে জর্জরিত কৃষকেরা চড়া সুদে বেনিয়াদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয় এবং আরও বেশি করে দারিদ্যের অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। তাদের জীবন প্রকৃত অর্থে ছারখার হয়ে যায়। তার সঙ্গে উত্তর ভারতের ভূমিব্যবস্থার ফলে সেখানকার জমিদারেরা তাদের জমির উপর ঐতিহ্যগত অধিকার হারায়। মাঝখান থেকে মহাজন ও বেনিয়ারা অর্থনৈতিকভাবে ফুলেফেঁপে ওঠে। ভুললে চলবে না যে ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। ভারতীয় সেনাদের অধিকাংশই কিন্তু ছিলেন কৃষক পরিবারের। ১৮৫৭ আন্দোলনে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এইসকল গরীব কৃষক, ঋণে জর্জরিত খেতমজুর ও ভূমিহারা জমিদারেরাই দলে দলে সেনাদের সঙ্গে যোগদান করেন বলে জানা যায়।

লর্ড ডালহৌসির একের পর এক নীতিহীনভাবে দেশীয় রাজ্য অধিগ্রহণ করার পন্থা রাজা ও প্রজা উভয়ের মনে একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্রোধের আগুণ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব প্রদেশ দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এরপর উত্তরাধিকারের অভাবের ছুঁতো ধরে একে একে সাতরা, ঝাঁসি ও তাঞ্জোর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়। নাগপুর, কর্ণাটকের ভাগ্যেও একই ঘটনা ঘটে। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রসারের সবচাইতে নির্লজ্জ নমুনা ছিল ১৮৫৬ সালের অযোধ্যা বা আউধ দখল। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ জয়ের পর ১৭৬৪ সালে বাংলার নবাব মিরকাশিম, মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্‌ আলম এবং আউধের তৃতীয় নবাব সুজাউদ্দৌল্লাকে একযোগে বক্সারের যুদ্ধে এবং তার পরের বছর আবার নবাব সুজাউদ্দৌল্লাকে কারার যুদ্ধে হারানোর পর ইংরেজ শক্তি অযোধ্যা বা আউধের স্বাধীন নবাবের ক্ষমতা দখল করার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছিল। এই উদ্দেশ্যে ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট এলাহাবাদে সুজাউদ্দৌল্লার সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং ১৭৭৫ সালে সুজাউদ্দৌল্লার মৃত্যুর আগে থেকেই আউধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বশ্যতা মেনে চলা শুরু করে।

সুজাউদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর চতুর্থ নবাব আসফুদ্দৌল্লার রাজত্বকাল থেকে দশম নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ পর্যন্ত কোম্পানির সমস্ত অন্যায় আবদার মুখ বুজেই মেনে চলতেন অযোধ্যার নবাবেরা। শিল্পসংস্কৃতি সঙ্গীতচর্চা ও হারেমে মজে থাকা ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ রাজ্যশাসনে দক্ষ ছিলেন না হয়ত, কিন্তু তিনি অত্যাচারী শাসক ছিলেন এমন দাবী কেউই করতে পারেনা। সুতরাং এত অনুগত রাজাকে যদি ব্রিটিশ সরকার গদিচ্যুত করে তাঁকে তাঁর দেশ থেকে নির্বাসন দিতে পারে, তবে বাকি রাজা বা নবাবদের নিরাপত্তাই বা কতখানি? ইংরেজদের স্বার্থও কারোর বুঝতে বাকি ছিল না। আউধ ছিল অত্যন্ত উর্বরা কৃষিপ্রধান দেশ। সুতরাং এই রাজ্যটি দখল করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেভিনিউ কালেকশন যে কোন উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছবে সেই হিসেব ডালহৌসি সাহেব বিলক্ষণ জানতেন। ১৮৪৮ সালে তিনি নতুন গভর্নর জেনারেল হয়ে কলকাতাতে আসেন। এসেই এক বছরের মাথায় লখনউ রেসিডেন্ট হিসেবে পাঠান উইলিয়াম স্লিম্যানকে। তিনি আউধ পরিক্রমণের পর ডালহৌসিকে চিঠি পাঠান নবাবের বিলাসিতা ও অকর্মণ্যতার রাশি রাশি বিবরণ দিয়ে। যদিও নবাব যে রাজ্যচ্যুত হবেন এতটা হয়ত স্লিম্যান নিজেও চাননি।    

মোদ্দা কথা পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোম্পানির সমস্ত রকমের বায়নাক্কা মেনে চলার পরও ১৮৫৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আউধের ১৩৪ বছরের নবাবি শাসনের যবনিকা পতন ঘটল। তাঁর প্রিয় লখনউ নগরী ছেড়ে দশম তথা শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ নির্বাসিত হলেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। তার পরের বছরেই তাঁকে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে বন্দী করে ফেলা হয়। দীর্ঘ দুটো বছর স্বজন পরিবার ছাড়া সেখানে বন্দী থাকেন শত শত খিদমৎগার পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা নবাব। ভাগ্যের কীই না চরম পরিহাস! যাই হোক, নবাবকে অন্যায়ভাবে নির্বাসন দেওয়া আর বেআইনিভাবে আউধ দখল করায় অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় জনমানসে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে সাধারণ নগরবাসী। এরপরের ঘটনা সকলের পরিচিত। এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বি মিশে থাকার কাহিনী সেই গনগনে ক্রোধ ও বঞ্চনার অগ্নিতে ঘৃতাহুতি ঢালে।  

১৮৫৭ র ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে ৩৪ নম্বর বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির মঙ্গল পান্ডে প্যারেড গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে গোরা সৈনিকদের বিরুদ্ধে সদর্পে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বাধা দিতে এলে তিনি মেজর হিউসনের দিকে গুলি চালিয়ে দেন। কামানের আড়াল থেকে দ্বিতীয় গুলি ছুঁড়লেন লেফটেন্যান্ট বাওকে তাক করে। যদিও এই আক্রমণে কারোরই মৃত্যু হয়নি কিন্তু একজন নেটিভ সিপাই ইউরোপীয় মেজরকে তাক করে গুলি ছুঁড়ছে সেটা ওই সময় অভাবনীয় স্পর্ধা বলে গণ্য হত। বিচারের নামে প্রহসনের পর তাঁর ফাঁসি হয়। তারিখ ছিল ৮ এপ্রিল। এই ঘটনার ঠিক এক মাস পরে ১০ মে আম্বালা ও মিরাটে, তারপর একে একে ১১ মে দিল্লী, ২৩ মে বেনারস, এলাহাবাদ, কানপুর, ৩০ মে লখনউ, ৩১ মে বেরিলি, ৫ জুন আগ্রা, ১৪ জুন ঝাঁসি প্রভৃতি জায়গায় উল্কার গতিবেগে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের দাবানল। শুধু সেনারাই নয়, তাঁদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছিলেন গ্রাম ও শহরাঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, দরিদ্রতর কৃষক, ভূমিহারা জমিদারেরাও। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সেদিন লড়ছিলেন সব ধর্মের সাধারণ ভারতবাসী। এ ছিল তাঁদের মুক্তির লড়াই। স্বাধীনতার যুদ্ধ। শুধুই ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত প্রাপ্তি যার একমাত্র কারণ ছিল না। এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত কারণ ছিল তাঁদের প্রতি ইংরেজদের দীর্ঘদিনের অপমান, বঞ্চনা, অন্যায় ও অত্যাচার। ছিল ইংরেজ মদতপুষ্ট মহাজন বা ‘বেনিয়া রাজ’ এর চিরকালের মতো উচ্ছেদের সংকল্প।    

তবে এসবের মধ্যেও ১৮৫৭ সালের অযোধ্যা বা আউধ রাজ্যের গণবিদ্রোহ ইতিহাসের পাতায় এক আলাদাই উচ্চতা পেয়েছিল, তা সমস্ত ঐতিহাসিকেরাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন। এই বিদ্রোহে বেগম হজরত মহল তাঁর নাবালক পুত্র বিরজিস কদ্রুকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজেই অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্যান্য জায়গায় ইংরেজরা বিদ্রোহীদের দমন করতে পারলেও আউধে প্রায় পাঁচ ছয় মাস ব্রিটিশদের রেসিডেন্সি ঘিরে রেখেছিলেন বিদ্রোহীরা। চিফ কমিশনার হেনরি লরেন্সকে রেসিডেন্সির ভিতরে বিশ্রাম নেওয়া অবস্থায় কামানের গোলার আঘাতে হত্যা করা হয়। প্রচুর ইউরোপিয়ান সেনাও সম্মুখ যুদ্ধে মারা পড়ে। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈয়ের মতো নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে প্রাণ না দিলেও বেগম হজরত মহল অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। পরে তিনি শত্রুপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে পুত্র সমেত নেপালে পালিয়ে গিয়ে প্রাণরক্ষা করেন।  

১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত অসফল হয় বিপক্ষে থাকা ইংরেজদের উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্র, বৈজ্ঞানিক রণকৌশল এবং নিজেদের একজন সঠিক পরিচালকের অভাবে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিদ্রোহী সেনাদের অপরূপ দক্ষতায় সংগঠিত করার প্রক্রিয়া নানা সাহেব, তাঁতিয়া টোপি, কুনওয়ার সিং কিংবা ঝাঁসির রানি লক্ষ্মী বাঈ কারোরই জানা ছিল না। মনে করা হয় যে সুযোগ্য নেতৃত্ব না পাওয়াই ১৮৫৭ র বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ। সমাজের ধনী ও বুদ্ধিজীবীরা তো চিরকালই স্বার্থপর শ্রেণী। তারা এই সশস্ত্র রক্তাক্ত বিদ্রোহকে যে একেবারেই সুনজরে দেখেনি এতে আর আশ্চর্য কী!

ইংরেজ শাসক কঠোর হাতে বিদ্রোহকে দমন করে। প্রায় এক বছর ধরে চলেছিল দমননীতি। হাজারে হাজারে সেনার পাশাপাশি সাধারণ প্রজাকেও ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কিন্তু এই আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মূল কাঠামোতে চরম আঘাত হানতে পেরেছিল। এটা অনস্বীকার্য। তার পরের বছর ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর ইংরেজরা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে মহারানির প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে নিয়ে আসে। এর ফলে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী ও ভারতীয় প্রজাদের মধ্যবর্তী স্তরের সমস্ত পদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হল। ভারতীয় ও ব্রিটিশ প্রজাদের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোনও ফারাক থাকল না।

কিন্তু পার্থক্য কি ছিল না? মহারানির রাজত্বে বঞ্চনার কাহিনী কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? না। একেবারেই না। পরবর্তীতে এরই ফলশ্রুতিতে ভারতের উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ শাসনকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য সশস্ত্র এবং অহিংস এই দুই ধারাতেই বৈপ্লবিক সংগ্রামের সূচনা হয়। ১৯০৫ এর ‘স্বদেশী আন্দোলন’। ১৯২০ র ‘অসহযোগ আন্দোলন’। ১৯৩০ এর ‘আইন অমান্য আন্দোলন’। ১৯৪২ এর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ ইত্যাদি যার উদাহরণ। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি সেনা আন্দোলনের কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যা সংগঠিত হয় ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঠিক ৮৯ বছর পর। সেভাবে প্রচার বা স্বীকৃতি না পেলেও এই আন্দোলনের জন্যই ব্রিটিশ সরকারকে তাড়াহুড়ো করে ভারত ছাড়তে হয়। এই আন্দোলনটি ছিল ১৯৪৬ সালের রাজকীয় ‘নৌ বিদ্রোহ’।

১৯৪৬ সালের ১৮ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২২ টি যুদ্ধজাহাজ ও কুড়ি হাজার নাবিক, নিম্নপদস্থ কর্মী ও সাধারণ মানুষ ধর্মঘটে অংশ নেন। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে বেতন, খাবার ও আবাসনের মান শ্বেতাঙ্গদের চাইতে কম হওয়ায় এবং বর্ণবৈষম্যের কারণে ভারতীয় নৌ সেনাদের মধ্যে যে অপরিসীম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকেই এই বিদ্রোহের সূচনা। কিন্তু কিছু ইতিহাসবিদের মতে চার বছর আগের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এই নৌ বিদ্রোহে অংশ নেওয়া সেনানীদের মধ্যে।

অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা পায় প্রচুর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর। যার বীজ বপন হয়েছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে। যা কেবলমাত্র সেনা বিদ্রোহ ছিল না। ছিল ধর্ম বর্ণ শ্রেণী নির্বিশেষে এক শক্তিশালী গণ অভ্যুত্থান। এই আন্দোলন তাই স্মরণীয় হয়ে আছে। আগামীতেও থাকবে। এবং আরও নতুন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে এর নবমূল্যায়ন হবে এই আশাই রাখি।      

তথ্যসূত্র –

১। 1857 – Surendranath Sen

২। মেটিয়াবুরুজের নবাব – শ্রীপান্থ  

৩। বারাকপুরের সেকাল একাল – সম্পাদনা – কানাইপদ রায়   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *