জীবনানন্দ : কবিতার ভৌগোলিক পরিসর
ড. শিবশঙ্কর পাল
ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন জীবনানন্দ। কিছু অনুবাদ, প্রবন্ধ রচনা করেছেন ইংরেজিতে। ছিলেন বাংলা ভাষার বাঙালি কবি। কিছুদিন পড়েছিলেন আইন। ছিল নিজস্ব জীবন দর্শন। ইতিহাস নিয়ে হেঁটেছেন বহু পথ। সেখানে বিজ্ঞানও দেখেছি থেকে থেকে। শুনেছি ইলেকট্রন বীজগণিতের কথা—
‘কোন্-এক গভীর নতুন বীজগণিত যেন
পরিহাসের চোখ নিয়ে অপেক্ষা করছে; —
যেন নতুন বীজগণিত নিয়ে এসেছে আকাশ!’ (আজকের এক মুহূর্ত) আর ভূগোল? সেখানে ভৌগোলিক ব্যাপ্তি কতদূর? আমরা অতিসংক্ষেপে তাঁর কবিতায় ভূগোল অন্বেষণটা একটু করে নিতে চাই। আমাদের কাছে যতদূর তথ্য আছে তাতে বাংলার বাইরে তিনি বাল্যকালে একবার গিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদ সংলগ্ন নানা স্থানে, মায়ের সঙ্গে। অধ্যাপনা করেছেন দিল্লিতে কিছুদিন। এর বাইরে অন্য কোথাও গিয়েছিলেন কিনা জানা নেই। সে তথ্যও নেই। তাহলে তাঁর ভূগোলের পরিসরে শুধু পরে থাকে বরিশাল কলকাতা বা এপার-ওপার বাংলা। এটা তাঁর ব্যক্তিগত ভৌগলিক ক্ষেত্র। কিন্তু কাব্যে? কাব্যের ভৌগলিক পরিসর লক্ষ্য করলে দেখা যায় তা প্রধানত নিম্নরূপ—
ইতিহাস বা সাহিত্যখ্যাত স্থান গ্রাম বাংলা, কলকাতা নগর, আন্তর্জাতিক সীমানা, প্রাকৃতিক
ইতিহাসের কালে কবির ভ্রমণকে বনলতা সেন কবিতাটি অমর করে রেখেছে। সেই ইতিহাস নিয়ে সিংহল মালয় সাগর থেকে পৌঁছে গিয়েছেন বিম্বিসার-অশোকের এলাকাতে, সেখান থেকে বিদিশা শ্রাবস্তী। মিশরের মরুভূমি প্রান্তরে উঠছেন জেগে—
‘হে নির্বাক পিরামিড, — অতীতের স্তব্ধ প্রেতপ্রাণ, অবিচল স্মৃতির মন্দির, আকাশের পানে চেয়ে আজো তুমি ব’সে আছো স্থির;’ (পিরামিড) কখনও চলে যাচ্ছেন অ্যাসিরিয়া, টায়ার সমুদ্র, কখনও ব্যাবিলনের সভ্যতায়— ‘আমি ছিনু ‘ক্রুবেদু’র কোন দূর ‘প্রভেনস’ প্রান্তরে!’ (অস্তচাঁদে)। চলে আসছেন সিন্ধু সভ্যতা, ফিনিশিয় এলাকায়। হেঁটেছেন হাজার বছর ধরে, কখনও মাইল মাইল। ভারতের প্রাচীন স্থান দর্শনের ইচ্ছাও তাঁর ছিল—
‘গল্পে আমি পড়িয়াছি কাঞ্চী কাশী বিদিশার কথা
কোনোদিন চোখে দেখি নাই’। (গল্পে আমি পড়িয়াছি) ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’ প্রবন্ধে জীবনানন্দ বলছেন— ‘কবির পক্ষে সমাজকে বোঝা দরকার, কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ সেই সমাজকে বুঝে ইতিহাস ও বর্তমানের সমীকরণ কষতে ইতিহাসনগরীতে ফিরে যাচ্ছেন যেন কবি।
বাংলার সীমা প্রধানত তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র। তা সে হোক ব্যক্তিক বা কাব্যিক জীবন। বরিশাল থেকে স্টিমারে চড়ে আসতেন কলকাতা। তাঁর উপন্যাসের বাসমতি আসলে বাংলার এই বরিশাল। সেখানে থেকেছে বাংলার পাড়াগাঁ, মাঠ, আকাশ। ধাঁনসিড়ি, ধলেশ্বরী, পদ্মা, জলঙ্গী নদী। বাংলার খড়ের ঘর, নবান্ন উৎসব। আসলে জীবনানন্দে বাংলাদেশ অনেকবেশী। তাকালেই বাংলার প্রান্তর সেখানে। বাঙালার ভৌগোলিক সীমায় বিচরণ আছে কাব্যময়। বাল্যকালে নদী বরাবর হাঁটা বা হেঁটে হেঁটে বাংলার ভৌগোলিক রূপকে তিনি দেখেছিলেন—
‘দুজনে মাঠের পথে নেমেছি—হাঁটছি—চেয়ে দেখলাম মুখখানা নিচু;
দেখছে পথের দূর্বা ধুলো ঢিবি পাতা’ (এখন এ পৃথিবীর) এপ্রান্তর বাংলার প্রান্তর। বাংলার ভৌগলিক সীমা থেকেই তাঁর পৃথিবী দর্শন। তবে তাঁর মধ্য পর্যায়ের কাব্যতে বেশী করে এসেছে নগর কলকাতা। কলকাতার রাস্তা, বন্দর, ফুটপাথ, যানজট, কোলাহল। আহিরিটোলা, টেরিটিবাজার। কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি বেশি করে অনুভব করেছিলেন সংকট নগ্নতা—
‘আমিও ফিয়ার লেন ছেড়ে দিয়ে—হঠকারিতায়
মাইল-মাইল পথ হেঁটে—দেয়ালের পাশে
দাঁড়ালাম বেন্টিক্ স্ট্রিটে গিয়ে—টেরিটিবাজারে ;
চিনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে।’ (রাত্রি) কলকাতার রাত্রিকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল সেখানে জন্তুগুলো লজ্জাবশত কাপড় পরে। তাছাড়া কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজে বসবাস করেছেন। তাঁর গল্পেও এসব জায়গার নাম জানা যায়, যেমন সোমনাথ বা শ্রীমতী গল্পে।
জীবনানন্দের কবিতায় আন্তর্জাতিক চিন্তার ছাপ আছে। সেখানে তিনি যাননি। কিন্তু তার কবিতার পরিসর পৌঁছে গেছে চীন, লন্ডন, ক্রেমলিন, এশিয়া, ইউরোপ, রোম। আন্তর্জাতিক চলমানতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, ক্ষমতার অক্ষবদল প্রভৃতি কারণে তাঁর এই আন্তর্জাতিক স্থানাঙ্ক। তার প্রভাব পড়েছিল বাংলার উপরেও। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি দেখেছিলেন বহু জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনা। রাশিয়ায় তখন মার্কসবাদের মাধ্যমে সমাজ প্রতিষ্ঠার চাঞ্চল্য। ইউরোপে চলছিল নাৎজি-নাজি-বলশেভিক আন্দোলন। ওদিকে চিনের বিপ্লব, জাপানের জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, লাতিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকায় চেতনার জাগরণ ঘটতে থাকে। দেশীয় প্রেক্ষাপটে চলছিল ৪২-এর আগস্ট আন্দোলন। ৪৬-এর দাঙ্গা, বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তর। ১৯৪০-এর সময় কালে ভারতের স্বাধীনতাকামী ঘটনাক্রম। এসব তাঁকে আন্দোলিত করেনি সেটা ভাবা অমূলক। সুতরাং তাঁর কবিতার ভৌগোলিক পরিসর দেশ থেকে বিদেশে মহাদেশে পৌঁছে গিয়েছিল। পৌঁছে গিয়েছিল নেশনে নেশনে— মহা-নেশনে। এই সীমাকে বা ক্ষেত্রকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—
GEO-POLITICAL ও GEO-ECONOMIC
উপরের ওসব কারণে পৃথিবীর ভৌগোলিক রাজনীতির সমীকরণ বদলাচ্ছিল। উঠে আসছিল নতুন নতুন দেশ। আবার ওসব কারণে পৃথিবীর অর্থনৈতিক ভারসাম্য উঠেছিল দুলে। সুতরাং ওই দুটি কারণের প্রভাব তাঁর কবিতায় পড়ার কথা। এবং পড়েছে। তারই উচ্চারণ—
‘সকল ভূগোল নিতে হবে নতুন করে গড়ে’। এটা ওই GEO-POLITICAL নতুন সমীকরণের আভাস। ‘অনন্দা’ কবিতায় গোটা পৃথিবীর তৎকালীন মানচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে কবিজনোচিত ভঙ্গিমায় বলছেন—
‘তুমি কি গ্রীস পোল্যান্ড চেক প্যারিস মিউনিক
টোকিও রোম ন্যুইয়র্ক ক্রেমলিন আটলান্টিক
লন্ডন চীন দিল্লি মিশর করাচি প্যালেস্টাইন?
একটি মৃত্যু, এক ভূমিকা, একটি শুধু আইন।’ (অনন্দা) পৃথিবী সেসময় বিভিন্ন গ্রুপে সংগঠিত হচ্ছিল। মিত্রপক্ষ শত্রুপক্ষ। দেশে দেশে সম্বন্ধ নতুন করে উঠছিল গড়ে। আবার দেশে দেশে অর্থনৈতিক কাঠামো হচ্ছিল পুনঃগঠিত। এই পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনানন্দ বলছেন—
‘প্রাচীন চীনের শেষে নবতম শতাব্দীর চীন
সেদিন হারিয়ে গেছে।’ (সময়ের কাছে) এই ভৌগোলিক আর্থ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তকে জীবনানন্দ অপেক্ষা রবীন্দ্রনাথ বেশী আত্মস্থ করেছিলেন। জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ১৯৪৫-৪৬ সালের রাজনীতি ও অর্থনীতির হারজিতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কবি হননি, বরং তিনি ও-গুলি প্রজ্ঞা দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, সেই উপলব্ধিকে ‘সময়ব্রম্ভের শুদ্ধ-স্বরূপ’ মহাকালের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। (উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য) জীবনানন্দও কি অনেকটা তাই করেননি? বিশ্বব্যাপী যে আর্থ-রাজনৈতিক অভ্যাসকে দেখেছিলেন তাকে কি মহাসময়ের হাতে সঁপে দেননি? কিন্তু তাঁর চেতনার বিস্তার এত গভীরতা সম্পন্ন যে তাকে চট করে বোঝা দায়। ভৌগোলিক বহির্বিশ্বে যেসব কাণ্ডকারখানা চলছে সে সম্বন্ধে সচেতনতা তাঁর ‘Atomic Energy and Nations’ প্রবন্ধে কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে P.M.S Blackett-এঁর ‘Military and Political Consequences of Atomic Energy’ বইয়ের আলোচনা প্রসঙ্গে আমেরিকা ও রাশিয়ার কথা, জীবনানন্দের নেশন-সচেতনতার পরিচায়ক। আর ‘রাত্রির কোরাস’ কবিতায় পাচ্ছি—
‘পশ্চিমে প্রেতের মতন ইউরোপ;
পুব দিকে প্রেতায়িত এশিয়ার মাথা;
আফ্রিকার দেবতাত্মা জন্তুর মতন ঘনঘটাচ্ছন্নতা;
ইয়াঙ্কির লপন-দেন ডলারে প্রত্যয়;—’ ১৯২৯-৩০ ব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, এদেশে কালোবাজার, কারও কারও হাতে অনির্বচনীয় হুন্ডি প্রভৃতি নিয়ে জীবনানন্দের স্বল্পাভাস কবিতায় রাখা আছে। এসব নিয়েই তাঁর কবিতার ভূগোল—
‘গভীর গভীরতর রাত্রির বাতাসে
লোকোর্নো হ্বের্সাই মিউনিখ অতলন্তের চার্টারে
ইউ-এন-ওয়ের ভিড়ে আশা দীপ্তি ক্লান্তি বাধা ব্যাসকূট বিষ—
মানুষ সবার জন্যে শুভ্রতার দিকে অগ্রসর হতে চায়—অগ্রসর হয়ে যেতে পারে।’ (পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে)। জীবনানন্দের কবিতার ভূগোলকে অন্যদিকেও দেখা যেতে পারে। যেখানে আছে শুধু প্রকৃতি। যাকে আমরা প্রাকৃতিক ভূগোল বা ENVIRONMENT GEOGRAPHY বলতে পারি। এটি ভূগোলের একটি শাখা। যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অধ্যায়িত হয়। বা একে আমরা যদি সাধারণ চোখে দেখি তাহলে সে ভূগোল প্রকৃতির ভূগোল। জীবনানন্দের প্রাকৃতিক ভূগোলকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। যথা— মাটি-ঘাস-মাঠ, নদী-সমুদ্র-দ্বীপ, নক্ষত্র-সূর্য-আকাশ-নীলিমা। এই ভৌগোলিক সীমাকে যদি পৃথিবীর আকারে বৃত্ত ধরে নিই, তাহলে ওই তিনটি বিষয়ের অবস্থান কিরকম হতে পারে, সেটাও দেখে নেওয়া যেতে পারে।
যেখানে মাটি-ঘাস-মাঠ, নদী-সমুদ্র-দ্বীপ, নক্ষত্র-সূর্য-আকাশ-নীলিমা পরস্পরের সঙ্গে আন্তসম্পর্কে আবদ্ধ। যারা বৃত্তরূপী পৃথিবীর ভিতরের ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করে। ত্রিভুজের তিনটি বাহু ওদের আন্তসম্পর্কে বেঁধে রেখেছে। বিজ্ঞানের চোখে নক্ষত্র-সূর্যরা পৃথিবী ছাড়িয়ে ব্রম্ভান্ডেরও অংশ। কিন্তু কবির চোখে-মনে ওরাও এই পৃথিবীর উপর তলার প্রকৃতি।

যেখানে ‘ক’ হল মাটি-ঘাস-মাঠ। ‘খ’ নদী-সমুদ্র-দ্বীপ। ‘গ’ নক্ষত্র-সূর্য-আকাশ-নীলিমা। জীবনানন্দের কবিতায় প্রাকৃতিক ভূগোল সম্পর্কিত এত এত উদাহরণ দেওয়া আছে যে তার নমুনা তুলে ধরা বৃথা।
