আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার
সুবোধ ঘোষের ছোটগল্পের অন্তরমহল
মানস মণ্ডল
এলাম, লিখলাম, জয় করলাম। বাংলা সাহিত্যে এমনটা খুব কম লেখকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমীদের মধ্যে সুবোধ ঘোষ একজন। বাংলা সাহিত্যে সুবোধ ঘোষের আলোড়ন জাগানো আবির্ভাব, এই প্রবাদপ্রতিম বাক্যটিই হয়ে ওঠে আক্ষরিক অর্থে সত্যি, আদ্যন্ত যথার্থ। গল্প লেখার কথা কখনও ভাবেননি সুবোধ ঘোষ। একটি ঘরোয়া আসরে, যার নাম ছিল অনামী সঙ্ঘ অথবা চক্র, বাংলা সাহিত্যের গল্প সম্পর্কে আলোচনা চলাকালীন সুবোধ ঘোষ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং লিখে ফেলেন বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেই অবিস্মরণীয় গল্প “অযান্ত্রিক”। তারপরেই “ফসিল”। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান সুবোধ ঘোষ। বাংলা সাহিত্যের পাঠকরা তাঁকে বরণ করে নিলেন। সমালোচকরা করলেন বন্দনা। অনুজ লেখকরা তাঁকে বসালেন প্রেরণার আসনে। সেই সময় রমাপদ চৌধুরী জানালেন, “লিখতে শুরু করেছি যখন, তখন আমাদের সামনে দুটি পথ- তারাশঙ্কর আর সুবোধ ঘোষ। বিখ্যাত ছোটগল্পকার বিমল করের স্বীকারোক্তি, “সুবোধ ঘোষের লেখা ছিল আমার প্রেরণা।” মহাশ্বেতা দেবীর সাক্ষ্য, “ছোটগল্পের ক্ষেত্রে তিনি একটা নতুন দিগন্ত খুলে দেন।”
বাংলা ছোটগল্পের জগতে বিস্ময়ের অন্য নাম সুবোধ ঘোষ। বৈচিত্র্যেরও। রবীন্দ্রনাথের পর ত্রিশোত্তর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার। সে সময় বাংলা ছোটগল্পে যে নতুন ধারা শুরু হয়েছিল, সুবোধ ঘোষ ছিলেন তার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর এবং দেশভাগের মতো ঐতিহাসিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি ব্যক্তি মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক জীবনের বৈচিত্রকে তাঁর গল্পে যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শুধুমাত্র “অযান্ত্রিক” আর ফসিল নয়। কম বেশি ১১২টি গল্পের অন্তরমহলে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি গল্প অলাদা, স্বতন্ত্র ভঙ্গি, এবং ভাষা নিয়ে অনন্য বৈচিত্রে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করছে। তাঁর ছোট গল্পের বিশেষত্ব, জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা, গভীর আর্থ-সামাজিক চেতনা, এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ। প্রতিটি গল্পের আলাদা করে আলোচোনা এই পরিসরে সম্ভব নয়, তাই কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্টকে সামনে রেখে আলোচনা।
১. বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব এবং বৈচিত্র্য
ক. বিচিত্র জীবন ও জীবিকাঃ
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অনেক গল্পেই বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে। যেমন, সার্কাসের ক্লাউন, বাসের কন্ডাক্টর, ট্রাক ড্রাইভার। এমনকি সমাজের নানা স্তরের মানুষ উঠে এসেছে তাঁর গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে।
দারিদ্রের কারণে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পরেই তাঁকে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়। যেমন, বিহারের আদিবাসী অঞ্চলের বাসের কন্ডাক্টর, সার্কাসের ক্লাউনের কাজও তাঁকে করতে হয়েছে। তিনি কাজ করেছেন, মুম্বাই পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি হিসেবে, কলেরা মহামারীর সময়ে বস্তিতে টিকা দেওয়ার কাজও করেছেন। করেছেন মালগুদামের স্টোর কিপারের কাজ। ছাত্র জীবনে হাজারীবাগের বিশিষ্ট দার্শনিক মহেশ ঘোষের লাইব্রেরিতে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেছিলেন। জীবিকার প্রয়োজনে পড়াশোনা বন্ধ হলেও, তাঁর প্রত্নতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব, এমনকি সামরিক বিদ্যাতেও যথেষ্ট দক্ষতা ছিল।
কালপুরুষ ছদ্মনামেও তিনি বেশকিছু গল্প লিখেছিলেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস “তিলাঞ্জলি”(১৯৪৪)-তে সমকালীন রাজনৈতিক মতাদর্শকে তুলে ধরেছিলেন। গ্রন্থটিতে ব্রিটিশরাজ এবং কমিউনিস্টপার্টির কাজকর্মের প্রতিবাদ ছিল। এই কারণে বইটির প্রকাশক ভারতরক্ষা আইনে জেল হওয়ার হুঁশিয়ারি পেয়েছিলেন। সুবোধ ঘোষ নিজেও শত্রু পক্ষের গুপ্তচর হিসেবে মিথ্যা অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্টের দাঙ্গায় দেশের বিভিন্ন জায়গা বিধস্ত হওয়ার পর তিনি উত্তর নোয়াখালি থেকে মহাত্মা গান্ধীর সহচর হিসেবে দাঙ্গা-পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।
খ. যন্ত্রে জীবন আরোপঃ
অযান্ত্রিক গল্পটি তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। গল্পের নায়ক বিমল, তার পুরনো ভাঙাচোরা ট্যাক্সিকে কেবল একটা যন্ত্র হিসেবে দেখেনি। তাকে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ হিসেবেই দেখে এসেছে। জড় পদার্থের উপর জীবন আরোপ করে লেখা গল্প বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম। একমাত্র সুবোধ ঘোষের সোনার কলম থেকেই এমন অভাবনীয় রচনা সম্ভব। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দুটি চরিত্র একজন মানুষ এবং একটি যন্ত্র। গল্পের নায়ক বিমল এক ভবঘুরে ট্যাক্সি চালক। সে সমাজ বিচ্ছিন্ন, আবেগপ্রবণ এবং কিছুটা খামখেয়ালি। বিমলের কাছে গাড়ি চালানো শুধুমাত্র জীবিকা নয়। তার জীবনের একমাত্র আঁকড়ে ধরার অবলম্বন। সাধারণ মানুষের ভিড়ে সে নিজেকে কখনই মেলাতে পারেনি। তাই সে তার সমস্ত আবেগ, ভালোবাসা, ও একাকীত্বের ভার সে তার গাড়ির ওপর চাপিয়েছে। অন্যদিকে বিমলের পুরনো জগদ্দল জীর্ণ ট্যাক্সি, গল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এটি প্রায়ই বিগড়ে যায়। বিমলের কাছে এটি কেবল যন্ত্র নয়। এটি তার বন্ধু, সন্তান, প্রেমিকা। সুবোধ ঘোষ এই গল্পে যন্ত্রের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। বিমল জগদ্দলের সঙ্গে মানুষের মত কথা বলে, আদর করে, বকা দেয়। সে বিশ্বাস করে, জগদ্দলেরও মানুষের মত মেজাজ আছে, তারও রাগ-অভিমান হয়। সে তার গাড়ির নাম পরিবর্তন করে “মানসী” রাখেনি, কারণ সে জানে এটি তার জীবনের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সঙ্গি-জগদ্দল। বিমলের ব্যক্তিগত জীবনে কোনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই। জগদ্দল তার একাকী জীবনের শূন্যতা পূরণ করে এসেছে। এই যন্ত্রটি তার জীবনের সমস্ত আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্র। যখন অন্যেরা তার গাড়িকে খারাপ বলে, আঘাত করে তখন সে ক্ষেপে ওঠে, এবং প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়। বস্তুত এই সম্পর্কটি যুক্তি বা অর্থের হিসেব মানে না। অর্থনৈতিকভাবে গাড়িটি অলাভজনক হলেও, বিমল এটিকে ছাড়তে পারে না। এটি কোনও যান্ত্রিক বন্ধন নয়, বরং মানবিক ভালোবাসার এক অযান্ত্রিক টান। গল্পের শেষে, বিমলের চরম অর্থনৈতিক চাপ, এবং অনিবার্য যান্ত্রিক দুর্বলতার কারণে তার প্রিয় জগদ্দলকে পুরনো লোহা-লক্করের দোকানে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এটি তার কাছে নিজের সন্তানকে বেচে দেওয়ার মতই কষ্টের। বিমল গাড়িতে ব্যবহৃত সবকিছু বিক্রি করে দেয়, কেবল হর্নটি স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়। এই হর্নটি জগদ্দলের কন্ঠস্বর, তার একমাত্র উপস্থিতি। গল্পের শেষ দৃশ্যে বিমল যখন তার পুরনো হর্নটি বাজাতে বাজাতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে তখন সে দেখে, একটি ছোট ছেলে তার বেচে দেওয়া গাড়ির কাঠামোর কাছে খেলছে এবং সেই ভাঙা চাকা ধরে জোরে ঘোরাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে বিমল এক গভীর সত্য উপলব্ধি করে; তার ভালোবাসা জগদ্দলের মধ্যে চিরকাল আবধ্য ছিল না। বস্তুটি ধ্বংস হলেও তার ভালোবাসা হারিয়ে যায়নি। বরং নতুন করে সেই শিশুর মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই উপলব্ধি তাকে এক ধরনের মুক্তি ও শান্তি এনে দেয়, যা তার ব্যক্তিগত কষ্টের অনেক ঊর্ধ্বে। অযান্ত্রিক তাই যন্ত্রসভ্যতার নিষ্ঠুরতার মধ্যেও মানবিক আবেগ এবং সম্পর্কের চিরন্তন চাহিদা নিয়ে লেখা এক ক্লাসিক গল্প।
গ. মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব এবং ভণ্ডামিঃ
বিখ্যাত ফসিল গল্পে, মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে কষ্টিপাথরে ঘসে আসল সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মধ্যবিত্তের দ্বিধাবিভক্ত মানসিকতা এবং আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার এক ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছেন। সময়ের করাল গ্রাসে মানুষের ভালোবাসা, স্বপ্ন ও আকাঙ্খার “ফসিল” হয়ে যাওয়ার করুণ চিত্র এঁকেছেন। একটি সম্পর্কের জীর্ণতা এবং মানসিক দূরত্বকে তিনি অত্যন্ত প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছেন। লক্ষ বছর পরে মানুষ যখন ফসিল হবে, তখন সমাজের বিপ্লবী মানুষের গণ-আন্দোলন চাপা পরে থাকবে ফসিল হয়ে। ভাবতে অবাক লাগে, এই সুগভীর চেতনা, সেই সময়ে তাঁর কলমে। গল্পটি ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্সযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত। সামন্ততন্ত্র, ধনতন্ত্র, এবং শ্রমিক শ্রেণি, মূলত এই তিনটি প্রধান শ্রেণির মানুষের মধ্যে সংঘাত এবং শোষণের ছবি এই গল্পের বিষয়। নেটিভ স্টেট অঞ্জনগড়ের মহারাজা অরতিদমন সামন্ত্রতন্ত্রের প্রতীক। তিনি স্বেচ্ছাচারী, কঠোর এবং প্রাচীন ঐতিহ্যের মোড়কে ঢাকা। অভ্র ও গ্রানাইটের খনি ব্যবসায়ী মিঃ গিবসন ও তার সঙ্গী ম্যামকেনা ধনতন্ত্রের প্রতিনিধি, এরা আধুনিক এবং অর্থের জোরে সব কিছু কিনতে প্রস্তুত। মহারাজের কুর্মি প্রজা এবং গিবসনের কুর্মি কুলি শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি, যাদের নেতৃত্ব দিয়েছে অভিজ্ঞ ও প্রতিবাদী চরিত্র দুলাল মাহাতো।
গল্পের শুরুতেই অঞ্জনগড় নামক এক নেটিভ স্টেটের পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যার মহারাজা অরিত্রদমন, ‘ত্রিভুবনপতি, নরপাল, ধর্মপাল। তার শাষন মূলত লাঠিতন্ত্রের নির্ভরশীল। এই রাজ্যের কুর্মি ও ভীল প্রজারা শোষণে জর্জরিত। এই দুর্বল সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে ধনতান্ত্রিক শক্তি, ব্রিটিশ খনি মালিক মিঃ গিবসন। প্রথমে দুর্বল তৃতীয় পক্ষকে কেন্দ্র করে সামন্ততন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। মহারাজ চাইছেন, তার অনুমতি ছাড়া যেন শ্রমিক নিয়োগ না করা হয়। আর গিবসন চায় তার ব্যবসার উপর মহারাজের কোনো নিযন্ত্রন না রাখতে। গল্পের কেন্দ্রীয় প্রতিবাদী চরিত্র হল, দুলাল মাহাতো, যে দীর্ঘকাল মরিসিসের চিনিকলে কাজ করেছে। প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। সে ফিরে আসে অঞ্জনগড়ের অসহায়,শোষিত শ্রমজীবি ভাইদের নতুনভাবে বাঁচাতে। দুলাল কুর্মিদের বোঝায়, “ভাইসব, এই বুড়োর মাথায় যতগুলো সাদা চুল দেখছ, ততবার বিশ্বাস করে সে ঠকেছে। এবার আর কাউকে বিশ্বাস নয়, সব নগদ নগদ। একহাতে নেবে আর অন্য হাতে সেলাম করবে।” তার সুযোগ্য নেতৃত্বে মহারাজার প্রজা এবং গিবসনের কুলিরা একজোট হয়ে নিজেদের ন্যায্য মজুরি, ছুটি, ভাতা ও ওষুধের দাবি আদায়ের জন্য সংঘবদ্ধ হয়। শ্রমিক শ্রেণির এই সচেতনা ও ঐক্য যখন দুই শোষক গোষ্ঠীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের পুরনো দ্বন্দ্ব ভুলে যায়। পরস্পর বিরোধী সামন্ততন্ত্র এবং ধনতন্ত্র নিজেদের ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য হাত মেলায়। এই দুই শোষক গোষ্ঠীর সম্মিলিত চক্রান্তের শিকার হয় দুলাল মাহাতো। তাকে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণিসহ অভ্র ও গ্রানাইটের ধসে পড়া ক্ষুধার্ত খনি গহ্বরে চাপা দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ ঘটনায় চাপা পড়ে প্রায় ৯০ জন পুরুষ ও মহিলা।
গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অঞ্জনগড়ের ল-এজেন্ট মুখার্জী, যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা মধ্যবিত্ত সমাদের প্রতিনিধি। তাকেও বাধ্য হয়ে এই দুই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলাতে হয়। সে ভাবে লক্ষ বছর পরে পৃথিবীর কোনো এক জাদুঘরে জ্ঞানবৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিকের দল যখন কুলি ও দুলালের লাশ দেখবে, তখন তারা কেবল ফসিল দেখবে। সেই ফসিলের গায়ে আজকের লাল রক্তের দাগ থাকবে না। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই গল্পটি শেষ হয়। গল্পটিতে সুবোধ ঘোষ তাঁর শাণিত দৃষ্টিভঙ্গি ও বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গির পরিচয় রেখেছেন। বাংলা ছোট গল্পে সামাজিক এবং রাজনৈতিক চেতনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
২. মানব-মানবীর জটিল সম্পর্ক
ক. এই পর্বের গল্পগুলিতে প্রেম এবং দাম্পত্যের চিরাচরিত ধারণাকে তিনি নির্মমভাবে ভেঙেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় প্রেম ও দাম্পত্যের জটিল ও রহস্যময় দিকগুলি অসম্ভব মুন্সিয়ানায় নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। “জতুগৃহ” তেমনই একটি গল্প বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া এক দম্পতির পাঁচ বছর পর একটি রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে আকস্মিক সাক্ষাৎ এই গল্পের পটভূমি। এখানে দেখানো হয়েছে একসময় যে প্রেম জীবনের পাথেয় ছিল, তা সময়ের সঙ্গে কীভাবে মরে যায়। শতদল এবং মাধুরীর নির্মোহ আলাপচারিতায় দাম্পত্য সম্পর্কের কঠিন বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে। বারবধূ, ঠগিনী এই ধরনের গল্পে সমাজের তথাকথিত পতিতা বা প্রেম ব্যবসায়ীনিদের জীবন, তাদের কাছে প্রেমের প্রভাব এবং জীবনের জটিলতা তুলে ধরেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলির মধ্যে “চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ” একটি। গল্পটি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত। ব্যঞ্জনাময় এই গল্পে ঐতিহাসিক পানিপথের তিনটি যুদ্ধের পটভূমিতে ভারতীয় সমাজেআভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং আদিবাসী সম্জের উপর বাইরের শক্তির আগ্রাসনকে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রে মুণ্ডা সমাজ এবং তাদের জীবনের সংকট। খ্রিস্টান ধর্মযাজক ফাদার লিন্ডনের প্রভাবে মুন্ডা সমাজের মিনুষজন কীভাবে ধর্মান্তরিত হচ্ছে এবং তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কীভাবে বিপন্ন হচ্ছে, এটাই গল্পের মূল বিষয়। পানিপথের তিনটা যুদ্ধে ভারতীয় শক্তি বিদেশি শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছে। এই পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, ভারতীয় রাজশক্তিগুলিয অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং যুদ্ধ চলাকালীন অন্যান্য ভারতীয় শক্তির নিরপেক্ষতা বা নিষ্ক্রিয়তা। আর চতুর্থ পানিপথের যুদ্ধ হল, ব্রিটিশ শাষকের মদতে খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের এক অসম এবং অঘোষিত যুদ্ধ। আদিবাসীরা আপোসহীন সংগ্রাম করেও এই যুদ্ধে পরাজিত হয়। পানিপথের পূর্ববর্তী যুদ্ধগুলির মতই এই যুদ্ধেও তথাকথিত মূলস্রোতের ভারতীয়রা অর্থাৎ বাঙালী ও বিহারী ছাত্ররা আদিবাসী সমাজের পক্ষে কোনো সাহায্য করেনি, বরং নিস্ক্রিয়, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওদের পক্ষে ছিল। গল্পের শিরোনামেই লেখক আদিবাসী সমাজের এই সংগ্রামকে জাতীয় ইতিহাসের এক বৃহৎ প্রেক্ষাপটে তুলে এনেছেন।
সুবোধ ঘোষ একসময় তাঁর সাড়া জাগানো গল্পগ্রন্থ “ভারত প্রেমকথা” লিখবেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল “কুসুমেষু” গল্পে। গল্পের প্রতিটি বাক্যই যেন এক একটি স্বতন্ত্র কবিতা। অপরূপ, মন্ত্রের মত। “কুসুমেষু” বাংলা ছোটগল্পের জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং ভিন্ন স্বাদের সংযোজন, যা প্রেম, সম্পর্ক এবং সময়ের সাথে সাথে আবেগের পরিবর্তনকে গভীর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। গল্পটির শিরোনামে যেমন স্নিগ্ধতার ইঙ্গিত আছে, তেমনই ভিতরে ভিতরে এক বিষণ্ণ স্রোতের ধারা প্রবাহিত। সুবোধ ঘোষের বিশেষত্বই হল, মানব মনের জটিল গতিবিধিকে সরল অথচ তীক্ষ্ন ভাষায় প্রকাশ করা। এই গল্পে প্রেম ও বিচ্ছেদের পর মানুষের মনের গভীরে যে ভয়ানক শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা সূক্ষভাবে চিত্রিত হয়েছে। কুসুমেষু শব্দের অর্থ ফুলের মত বা ফুলের প্রতি। নামটি সতেজ, পবিত্র ও কোমল প্রেমের প্রতীক কিন্তু গল্পে সেই প্রেমের বর্তমান অবস্থা বা সমাপ্তি দেখিয়ে লেখক এক বিদ্রুপাত্বক বা করুণ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতপক্ষে কুসুমেষু হল অতীত প্রেমের এক বিষণ্ণ পোষ্টমর্টেম।
“ভারত প্রেমকথা”- এক আশ্চর্য নির্মাণ। ভারত প্রেমকথার অন্তরমহলে প্রবেশ করার আগে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রমথনাথ বিশী তাঁর “বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক রস” নামক রচনায়, যে লেখাটি ভারত প্রেমকথার ভূমিকাও বটে, সেখানে তিনি বলছেন, “ভারত প্রেমকথার গল্পগুলিতে স্বাধীনতা ও সংস্কারের অতি অপূর্ব মিলন হইয়াছে, আর সেই জন্যই এই প্রেমকথাগুলি অতি উচ্চাঙ্গের শিল্পসৃষ্টি হইয়া উঠিয়াছে।” আরও বলেছেন, “ভারত প্রেমকথা গল্পগুলিতে ভাষার মৃদঙ্গ বাজিতেছে। এমন বণার্ঢ্য, রূপাঢ্য ধ্বনিসুন্দর ভাষা বাংলা ভাষারই এক নতুন পরিচয় এবং বিপুল উৎকর্ষের সম্ভাবনাময় দিকটি দেখাইয়া দিতেছে।” আর লেখক নিজে বলেছেন, আদিযুগ আর নবতম যুগ, রূপের দিক দিয়ে এই দুইয়ের মধ্যে ভিন্নতা আছে, কিন্তু এই ভিন্নতা নিশ্চয়ই বিচ্ছেদ নয়। নবতমের মধ্যে হোক আর পুরাতনের মধ্যে হোক, শিল্পীর মন সেই এক চিরন্তনেরই রূপের অন্বেষণ করে থাকে। শিল্পীর সাধনা হল নতুন করে পাওয়ার সাধনা। শুধু পথ চাওয়িতেই আর চলাতেই শিল্পীর আনন্দ হয়। নতুন করে পাওয়ির আনন্দও শিল্পীর আনন্দ। আদি যুগের রূপকে এই জগতে আর একবার পাওয়া যাবে না ঠিকই, কিন্তু আদিযুগের রূপকে নতুন করে কাছে পাওয়ার আকাঙ্খা শিল্পি ছাড়তে পারেন না। কারণ, সেই পুরাতনের রূপের সঙ্গেএকটি অখণ্ড আত্মীয়তার ডোরে বাঁধা রয়েছে নবতম যুগের মানুষেরও জীবনের রূপ। জীবনের রূপ সম্বন্ধে এই অখণ্ডতার বোধ হল কবি শিল্পী ও সাধকের মহানুভূতি এবং এই মহানুভূতিই মানুষজাতির শিল্পে ও সাহিত্রের ক্ষেত্রে যেখানে সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ও সুন্দরাত্মপ্রকাশ লাভ করেছে সেখানেই আমরা পেয়েওছি ক্লাসিক গৌরবে মণ্ডিত সাহিত্র ও শিল্প। ক্লাসিকের ভাব ও রূপ খণ্ডকালের মধ্যে সীমিত নয়।
“ভারত প্রেমকথা” প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। গ্রন্থটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বহুল বিক্রিত। মোট কুড়িটি গল্প নিয়ে গ্রন্থিত ভারত প্রেমকথার গল্পগুলি মহাভারতের পাতা থেকে তুলে আনা কিছু অপ্রচলিত, পার্শ্বচরিত্রের প্রেমের গল্প। লেখক প্রাচীন এই প্রণয়কাহিনিগুলিকে কেবল হুবহু তুলে ধরেননি, বরং তাঁর নিজস্ব মণীষা, শিল্পনির্মিত এবং আধুনিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে সেগুলির পুননির্মাাণ করেছিলেন। যেন নতুন করে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লেখক এই কাহিনিগুলির মধ্য থেকে নর-নারীর প্রেমের রহস্য, বৈচিত্র্য, মহত্ব এবং চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রেম যে এক গভীর ও সুসহ রহস্য এই ভাবনাই প্রতিটি গল্পের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুবোধ ঘোষ এই গল্পগুলির মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যকে কেবল তথ্য হিসেবে পরিবেসন না করে, মানবজীবনের চিরন্তন আবেগ ও অনভূতির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। যার জন্য আজও ভারত প্রেমকথা বাংলাসাহিত্যের একটি ক্লাসিক ও জনপ্রিয় সংকলন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংকলনে মহাভারতের স্বল্প আলোচিত প্রেম উপাখ্যানগুলির এক মৌলিক, শিল্পসম্মত ও আধুনিক পুননির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মানুষের প্রেমের চিরন্তন রহস্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রচিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রেম কীভাবে যুগে যুগে মানুষের জীবনকে চালিত করেছে- তা সে রাজা, মহারাজাই হোক কিম্বা মুনি-ঋষি। গ্রন্থটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রেমে ছবি দেখা যায়।
১. যে প্রেমে মহৎ ত্যাগের অঙ্গীকার থাকে
২. যে প্রেমে আকস্মিক মুগ্ধতা ও তীব্র আকর্ষণ থাকে
৩. যে প্রেমের পথে কঠিন বাধা ও শর্ত আরোপিত হয়
৪. আধ্যাত্বিক ও জাগতিক প্রেমের সমন্বয়, যেখানে ভোগ ও ত্যাগের দ্বন্দ্ব দেখা যায়। (যেমন অগস্ত ও লোপামুদ্রার উপাখ্যান)
এই গ্রন্থের গল্পগুলির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল, প্রচীন কাহিনির কাঠামো বজায় রেখেও, সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিক ও মনস্তাত্বিক গভীরতা প্রদান করেছেন। যার জন্য বলা যেতে পারে এই গ্রন্থটি কেবল একটি সাধারণ সংকলন নয়, বরং প্রাচীন প্রেমগাথাগুলিয উপর লেখা একটি মৌলিক সাহিত্যকর্ম।
তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে নির্মাণের গুণমানের উপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। তার উপস্থাপনের মৌলিকত্ব, পরীক্ষামূলক বিষয়বস্তু, ভাষার ব্যবহার, চিন্তার গভীরতার জন্য সুবোধ ঘোষ ছিলেন লেখকের লেখক। তাঁর গল্পের গভীরতা, প্রকরণের অভিনবত্ব, জীবন বোধের ব্যপকতা এবং নিজস্ব সাহিত্য শৈলী যা পরবর্তীকালের বহু লেখককে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিল।
