prabandho-sugondher-itibritto

সুগন্ধের ইতিবৃত্ত

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী

প্রাথমিকভাবে বিদেশে এবং এদেশেও সুগন্ধীদ্রব্যের দাম ছিল বেশ চড়া। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষেরা তা সংগ্রহ করতেন না। সুগন্ধ ব্যবহার করতেন রাজা বাদশারা কিংবা বিদেশে বিশেষ উচ্চবিত্ত পরিবারের লোকজন। আমাদের শরীরের সুষুম্নাকান্ডের ভেতর সাতটি চক্র বা প্রাণকেন্দ্র আছে। বিশেষ বিশেষ প্রাকৃতিক সুগন্ধ সেইসব চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। একমাত্র গন্ধই আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে প্রবেশ করতে পারে সরাসরি। মস্তিষ্ক যদি রত্নভাণ্ডার হয়, আমাদের নাক হল তার চাবিকাঠি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেবতার পুজোয় প্রধান উপকরণ হিসেবে অগরু ও চন্দন ব্যবহার করে আসছি। চন্দনের গন্ধ কুণ্ডলিনী চক্রকে উত্তেজিত করতে পারে। এবং এটি মনকে সুষুম্নাগামী করতে পারে। এর ফলে ধ্যানে মন নিবিষ্ট হয়। আবার জুঁইফুলের গন্ধ আমাদের চেতনাকে সজীব করে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে জুঁইফুলের গন্ধ আমাদের মস্তিষ্কের সেরাটোনিন বা ফিলগুড হরমোন ক্ষরণ বাড়ায়। ফলে আমাদের সতেজতার অনুভূতি হয়। এক কাপ কফি খেলে যেমন অনুভূতি হয়, এক্ষেত্রে খানিকটা একই অনুভূতি হয়। আবার কমলালেবুর খোসার গন্ধ বা তা থেকে নিষ্কাশিত তেল আমাদের অনাহত বা হৃৎচক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। এভাবে গুণাগুণ বিচার করে বিজ্ঞানীরা একটি তালিকা তৈরি করেছেন। লেবু এবং ল্যাভেন্ডারের গন্ধ মণিপুর চক্রকে সক্রিয় করে তুলতে পারে।

ফুলের সুগন্ধ বলতে প্রথমেই আমাদের গোলাপের আতরের কথা মনে আসে। আর মুঘল সাম্রাজ্ঞী নুরজাহান তো তাকে আরও বিখ্যাত করে দিয়ে গেছেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর গোলাপ খুব পছন্দ করতেন। বিশেষ সুগন্ধি গোলাপের বাগিচা ছিল রাজপ্রাসাদে। তাছাড়াও তখন নানা বাগিচায় গোলাপের চাষও করা হত সম্রাটের প্রিয় সামগ্রী হিসেবে। যাইহোক ‘তুজুক-ই জাহাঙ্গির-ই’তে পাওয়া যায়, একবার অল্প জলে অনেক গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সম্রাটকে খুশি করতে গোলাপের নির্যাস তৈরি করছিলেন নুরজাহানের মা আসমত বেগম। তিনি তখন দেখেন মুখ বন্ধ পাত্রের গায়ে একরকমের তৈলাক্ত তরল জমা হয়েছে। পাত্রের ঢাকনায় লেগে থাকা সেই তরল কিছুটা তাঁর হাতে লেগে যায়, তিনি দেখেন সেই তৈলাক্ত তরলের এক ফোঁটার সুগন্ধ যেন একশোটা তাজা গোলাপের সমান। এই ঘটনাটি তিনি তাঁর মেয়ে নুরজাহানকে গিয়ে জানান। তখন নুরজাহান উদ্যোগী হয়ে কুড়িহাজার কেজি গোলাপের পাপড়ি বিরাট ধাতুর পাত্রে জল নিয়ে ফুটিয়ে তা থেকে খুবই ছোট এক বোতল মাত্র গোলাপের রুহ্ বা আতর পেয়েছিলেন। সেই আতরের নাম রেখেছিলেন, আতর-ই-জাহাঙ্গির। এটি সম্রাটেরও  পছন্দ হয়েছিল। গোলাপের সেই আতর এরপর মুঘল রাজপরিবারের নারীরা স্নানের সময় ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেভাবেই এটি সর্বত্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

স্বকীয়তা এবং সৃজনশীলতা এই শিল্পের একটি প্রধান দিক। পারফিউমার হলেন একটি সুগন্ধের জনক। তিনি বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে একটি নতুন সুগন্ধকে আবিষ্কার করেন। রাসায়নিক সুগন্ধির চেয়ে সবসময়েই প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পারফিউম অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। প্রাকৃতিকভাবে সুগন্ধ নানা উৎস থেকে পাওয়া যায়। প্রকৃতি কেবল ফুলের বুকেই সুগন্ধ ভরে দেননি, তিনি সেই সুগন্ধের অমৃত ছড়িয়ে রেখেছেন প্রকৃতির নানা উপাদানের ভেতর।

ক) সুগন্ধের উদ্ভিদজাত কয়েকটি উৎস:

১) বাকল বা ছাল – দারুচিনি, ক্যাসিয়া, কাবাবচিনি, তেজপাতা ইত্যাদির ছাল বা বাকলে পাওয়া যায় সুগন্ধ।

২) পাতা – লেমনগ্রাস, জেরানিয়াম, তেজপাতা, পচৌলি, বেসিল, পুদিনা, লেবুপাতা, ইত্যাদি।

৩) ফল – গ্রেপ, ব্লুবেরী, লেমন, অরেঞ্জ, প্যাশন ফ্রুট ইত্যাদি।

৪) ফুল – গোলাপ, জুঁই, চাঁপা, ল্যাভেন্ডার, বেলফুল ইত্যাদি।

৫) বীজ – লতা কস্তূরী, জিরে, মৌরি, ধনে, ক্যারাওয়ে, জায়ফল, ভ্যানিলা, গোলমরিচ।

৬) কাণ্ড – চন্দন, সেডার, অগরু।

৭) লাইকেন – কোলেমা, Chharila ইত্যাদি।

৮) কন্দ – নগরমূথা, জটামাংসী।

৯) মূল – ভিটিভার বা খসখস।

১০) রূপান্তরিত কাণ্ড – হলুদ, আদা।

১১) রজন – পাইন অ্যাম্বার, ধুনো, কর্পূর।

খ) সুগন্ধের প্রাণীজ উৎস:

১) মাস্ক – এটি এশিয়ান মাস্ক ডিয়ারের মাস্ক স্যাক থেকে পাওয়া যায়। এই মাস্ক-স্যাকটি পুরুষ কস্তূরী-মৃগের টেস্টিস এবং মূত্র ছিদ্রের কাছে থাকে। এর মাধ্যমে সে স্ত্রী হরিণকে তার উপস্থিতির বার্তা দেয়। এই মাস্ক সুগন্ধটি লতা কস্তূরী নামক একরকম মালভেসী গোত্রের গুল্ম জাতীয় গাছের বীজেও পাওয়া যায়। এটি পারফিউমের একটি ফিক্সেটিভ হিসেবে এখন বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। এটিকে বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় চাষ করা হচ্ছে।

২) সিভেট – এটি একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। প্রাপ্ত সুগন্ধকে সিভেট মাস্কও বলা হয়। এই প্রাণীর শরীরে সুগন্ধ থলি তৈরি হয়। যা থেকে মাস্ক এই সুগন্ধটি পাওয়া যায়।

৩) অ্যাম্বারজিস – এটি স্পার্ম হোয়েলের বমি। এই ধরনের তিমি মাঝে মাঝে বমির মাধ্যমে এক রকমের তৈলাক্ত পদার্থ বর্জন করে। বাতাসের সংস্পর্শে এলে তা সুগন্ধযুক্ত ও শক্ত হয়ে যায়। একে অ্যাম্বারজিস বলা হয়। সাধারণভাবে পারফিউমারি শিল্পে একে অ্যাম্বার বলা হয়। এটি অত্যন্ত মূল্যবান।

৪) হানি কোম্ব – মৌমাছির চাক জলে ফুটিয়ে এই সুগন্ধটি পাওয়া যায়। ইত্যাদি।

সাধারণভাবে একটি উন্নত মানের সুগন্ধির গঠন কেমন হয়?

১) সুগন্ধির প্রাথমিকভাবে একটি টপনোট থাকবে। যেটি প্রথমেই মুগ্ধ করবে এবং একটা ছাপ ফেলবে উপভোক্তার মনে। এই টপ নোটের স্ফুটনাঙ্ক বা বি পি সব সময় হয় ১৫০ ডিগ্রির কম। যেমন সাইট্রাস, হার্বাল, ল্যাভেন্ডার ইত্যাদি। এই টপ নোট পারফিউমের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ হবে। এর স্থায়ীত্ব হবে ৩ থেকে চার ঘন্টা।

২) এরপর থাকবে পারফিউমের বডি বা মিডল নোট। এই মিডল নোটের স্ফুটনাঙ্ক হবে ১৫০ ডিগ্রি থেকে ২২৫ ডিগ্রির মধ্যে। মিডল নোট হবে সুগন্ধির ৩০% থেকে ৪০% এবং এর স্থায়ীত্ব হয় সাধারণত চার থেকে আট ঘন্টা।

৩) শেষে পাওয়া যাবে বেস নোট। যেটি পারফিউমের স্থায়ীত্ব নির্ধারণ করবে। যেমন মাস্কি, উডি, অ্যামবারি, রেসোনাস, এদের বি পি হয় ২২৫ ডিগ্রির বেশি। উন্নত মানের পারফিউমের বেস নোটের স্থায়ীত্ব প্রায় চব্বিশ ঘন্টা থেকে বাহাত্তর ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে।

সুগন্ধের পরিবার:

প্রাথমিকভাবে সুগন্ধিকে কয়েকটি পরিবারে ভাগ করা যেতে পারে। নারী ও পুরুষদের সুগন্ধিকে মোটামুটিভাবে চারটি ফ্যামেলিতে ভাগ করা যেতে পারে।

নারীদের জন্য চিহ্নিত সুগন্ধের চারটি গ্রুপ বা ফ্যামেলি। যেমন:

১) ফ্লোরাল – ফ্লোরাল গ্রুপের মধ্যে কয়েকটি সাব গ্রুপ আছে। তা হল অ) ফ্লোরাল-ফ্লোরাল, আ) ফ্লোরাল-গ্রিন, ই) ফ্লোরাল-অ্যালডিহাইড এবং ঈ) ফ্লোরাল-হোয়াইট।

২) সিপ্র (Chypre) – নাগরমোথা বা জম্বুদ্বীপের প্রাচীন ভদ্র-মূস্তক, বাংলার ‘ভ্যাদাল-মুথা’ যার বিজ্ঞান সম্মত নাম হল, সাইপার রোটানডাস। সেখান থেকেই এই সুগন্ধটি প্রধানত পাওয়া যায়। এটি এখন জাভা এবং অস্ট্রেলিয়ায় চাষ করা হচ্ছে। অথচ এর উল্লেখ আছে অথর্ববেদ এবং চরক সংহিতায়। তখন এটি মুখের ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহার করা হত। এটি জীবানুনাশক বলে দাঁত ও মাড়ির ক্ষয় দূর করতে পারে। তাছাড়া সুগন্ধিও তৈরি হচ্ছে। এখানে টপ-নোটে থাকে সিপ্র, এবং বার্গামোত। এর প্রাকৃতিক উৎসগুলি হল, সিপ্র ছাড়াও ওকমস, পচৌলি এবং বার্গামোত। বিখ্যাত সিপ্র পারফিউমগুলি হল; AROMATICS ELIXIR – CLINIQUE, RUSH – GUCCI

৩) ওরিয়েন্টাল – রেসিন, উদ্ভিজ্জ আঠা, চন্দন কাঠ, ধুনো এই জাতীয় সুগন্ধগুলিকে বলা হয় ওরিয়েন্টাল। এখানে টপ-নোটে থাকে যে কোনো উদ্ভিজ্জ সুগন্ধ। মিডল-নোটে থাকে চন্দন ও রেসিন জাতীয় সুগন্ধ এবং বেস-নোটে থাকে রজন, ভ্যানিলা, ক্যাম্ফোর, ধুনো, লোবান ইত্যাদি। ওরিয়েন্টালে প্রাকৃতিক যেসব সুগন্ধ থাকে তা হল; চন্দন তেল, ভ্যানিলা অ্যাবসোলিউট, ধুনো, পচৌলি তেল ইত্যাদি।

ওরিয়েন্টাল ওডার ব্যবহার করে যেসব বিখ্যাত পারফিউমগুলি তা হল; SHALIMAR – GUERLIAN, TRESOR -LANCOME, HYPNOTIC POISON, BLACK ORCHID –TOM FORD, GUCCI GUILTY,

 ৪) অন্যান্য/ Others Group – নারীদের সুগন্ধীর মধ্যে কিছু সুগন্ধকে কোনো গ্রুপে না ফেলে একসঙ্গে অন্যান্য বা আদারস্ হিসেবে একটি গোত্রে ফেলা হয়েছে। এই গ্রুপে আছে সাইট্রাস, ফ্রুটি এবং ওজোনিক সুগন্ধ।

লেবু ও লেবু জাতীয় সুগন্ধকে সাইট্রাস গ্রুপে ফেলা হয়েছে। এই সাইট্রাস গ্রুপের মধ্যে আছে বার্গামত অয়েল, লেমন অয়েল এবং অরেঞ্জ অয়েল। বার্গামত হল লেবু জাতীয় এক রকমের ফল। এটি খাওয়া যায় না, কেবল খোসা থেকে তেল পাওয়া যায়। রাসায়নিকভাবেও এস্টার বিভিন্ন মাত্রায় মিশিয়ে প্রায় এই জাতীয় গন্ধ তৈরি করা হচ্ছে তা হল: সিট্রাল এবং ডাইহাইড্রোমিরসেনল (DHM) সাইট্রাস ওডারকে টপ নোটে রেখে যেসব পৃথিবী বিখ্যাত কিছু পারফিউম তৈরি করা হয়েছে তাদের নামগুলি হল মোটামুটিভাবে: EAU SAVAGE, CK ONE ইত্যাদি।

ফ্রুটি –প্রাকৃতিকভাবে ফ্রুটি স্মেল পাওয়া যায় ব্ল্যাক কারেন্ট এবসোলিউট এবং ওসমানথাস এবসোলিউট থেকে। সি-সিক্সটিন। ফ্রুটি ওডারকে টপ নোটে রেখে কিছু বিখ্যাত পারফিউমের নাম হল: SEXY GRAFFITI, DKNY, ESCAPE-ESCADA, NINA RICCI

ওজোনিক – এই গ্রুপের সমস্ত সুগন্ধই রাসায়নিক বা কৃত্রিম। যেসব রাসায়নিক এই সুগন্ধে ব্যবহার করা হয় তা হল: CALONE, HELIONAL, ADOXAL ইত্যাদি। এক ধরনের রিফ্রেশিং অনুভূতি তৈরি করতে সক্ষম বলে এই সুগন্ধের নাম ওজোনিক। অর্থাৎ ভোরের বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিলে যেমন মনে হয়। এই রাসায়নিকগুলি ব্যবহার করা হয় যেসব বিখ্যাত পারফিউমে তাদের নাম হল: AQUA DI GIO – GIORGIO ARMANI, AQUAWOMAN -ROCHAS, L’EAUD’ISSEY – ISSEY MIYAKE,

অ) সাব-গ্রুপ ফ্লোরাল-ফ্লোরাল – এই সুগন্ধ তৈরি হয় দুই বা ততোধিক ফুলেল সুগন্ধকে টপ নোট হিসেবে রেখে। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে এখানে ফুলের সুবাস পাওয়া যাবে। প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল:

ROSE DE MAI ABSOLUTE – রোজা গ্যালিকা এবং রোজা সেন্টেলা থেকে পাওয়া যায়।

BULGARIAN ROSE OIL -বুলগেরিয়ার এক ধরনের সুগন্ধি গোলাপ রোজা সেন্টেলা থেকে পাওয়া যায়।

GERANIUM OIL – এটি জেরানিয়াম পাতার নির্যাস থেকে পাওয়া যায়। গন্ধ গোলাপের মতো।

কিছু বিখ্যাত ফ্লোরাল-ফ্লোরাল সুগন্ধির নামগুলি হল: PARIS -YSL, ETERNITY – CALVIN KLEIN, TEA ROSE, ROSE – PAUL SMITH

আ) ফ্লোরাল-গ্রিন সাব-গ্রুপ – এই সুগন্ধে কিছুটা সুগন্ধি পাতা এবং গাছপালার গন্ধের সঙ্গে ফুলের গন্ধ মিশে থাকে বলে একে ফ্লোরাল গ্রিন বলা হয়। প্রাকৃতিক ফ্লোরাল গ্রিন হল; জরানিয়াম, ভায়োলেট ফ্লাওয়ার, মাইমোসা অ্যাবসোলিউট ইত্যাদি। এটি হেনা ফুলের নির্যাস থেকে পাওয়া যায়। যেসব বিখ্যাত সুগন্ধিতে ফ্লোরাল-গ্রিন টপ-নোট হিসেবে ব্যবহার করা হয়; CHNEL NO 19, PACCO RABBANE, CLASSICAL, FIDJI ইত্যাদি।

ই) ফ্লোরাল- অ্যালডিহাইড সাব-গ্রুপ:

এটি রাসায়নিক দিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি। প্রাকৃতিক উপাদান থাকে না।

রাসায়নিকগুলি হল যথাক্রমে: ALDEHYDE C11, ALDEHYDE C12 MNA, ALDEHYDE C18

যেসব বিখ্যাত পারফিউম এই সুগন্ধ ব্যহার করে তা হল; CHANEL NO 5. এবং BULGARI BLV

ঈ) সাব-গ্রুপ ফ্লোরাল হোয়াইট:

 সুগন্ধি সাদা ফুল থেকে এই সুগন্ধ তৈরি হয় তাই এই সাব-গ্রুপের নাম ফ্লোরাল-হোয়াইট।

প্রাকৃতিক সুগন্ধগুলি হল; জুঁই, রজনীগন্ধা এবং লাং-লাংয়ের বিশুদ্ধ নির্যাস। ফ্লোরাল-হোয়াইট সুগন্ধ ব্যবহার হয় যেসব বিখ্যাত পারফিউমে:  J’ADORE MARC JACOBS, BEYOND PARADISE -ESTEE LAUDER, POISON – CHRISTIAN DIOR ইত্যাদি।

পুরুষদের জন্য চিহ্নিত গ্রুপ বা ফ্যামিলিগুলি হল:

১) ফোজার, ২) ফোজার- অ্যারোমেটিক, ৩) ওরিয়েন্টাল ৪) উডি, ৫) আদারস্।

১) ফোজার অ্যাকর্ড – এটিতে টপ-নোট হিসেবে থাকে অ্যারোমেটিক এবং হারবেশিয়াস ওডার। যেমন ল্যাভেন্ডার। এর প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল ল্যাভেন্ডার অয়েল, জেরানিয়াম অয়েল এবং থাইম অয়েল। এই গ্রুপের বিখ্যাত সুগন্ধীগুলি হল, DRAKKAR NOIR, COOLWATER -DAVIDOFF, LANVIN

২) ফোজার-অ্যারোম্যাটিক – এই সুগন্ধের প্রাকৃতিক উৎসগুলি হল ল্যাভেন্ডিন অয়েল, রোজমেরী অয়েল এবং ক্ল্যারি-সেজ অয়েল। বিখ্যাত সুগন্ধী কয়েকটি হল, Lacoste – Classic, Good Life for Men, Xs – Pacco Rabbane, Blue de Chanel

৩) ওরিয়েন্টাল – প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল ভ্যানিলা অ্যাবসোলিউট, বেনজোয়িন রেসিনয়েড, পেরু রেসিনয়েড, স্যান্ডেল উড অয়েল ইত্যাদি। রাসায়নিক উপাদানগুলি হল ভ্যানিলিন, ইথাইল ভ্যানিলিন, মালটল ইত্যাদি। বিখ্যাত পারফিউমগুলি হল; LE MALE – JEAN PAUL GAULTIER, GUCCI ENVY FOR MEN, CONTRADICTION -CALVIN KLEIN, BOSS BOTTLED

৪) উডি – এর প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল, স্যান্ডাল উড অয়েল, সেডার উড অয়েল, ভেটিভার অয়েল ইত্যাদি।

বিখ্যাত পারফিউমগুলি হল, DECLARATION –CARTIER, VETYVER-GUELIAN, AZZARO-CLASSICAL, GUCCI RUSH FOR MEN ইত্যাদি।

৫) আদারস্ – পুরুষদের সুগন্ধীর মধ্যে কিছু সুগন্ধকে কোনো গ্রুপে না ফেলে একসঙ্গে অন্যান্য বা আদারস্ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে, স্পাইসি, মসি, অ্যানিম্যালিক মাস্কি, অ্যানিম্যালিক অ্যাম্বারি।

স্পাইসি – এর প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল জিঞ্জার অয়েল, কিউমিন অয়েল, ক্লোভ অয়েল ইত্যাদি। বিখ্যাত পারফিউমগুলি হল, CACHREL POUR L’HOMME, SOUL BY HUGO BOSS, TERRE DE HERMES

মসি – এর প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল ওক্ মস অ্যাবসোলিউট, ট্রি মস অ্যাবসোলিউট, বালসাম ইত্যাদি। বিখ্যাত পারফিউমের নাম হল: FAHRENGEIT – CHRISTIAN DIOR

অ্যানিম্যালিক মাস্কি – এই সুগন্ধের প্রাকৃতিক উপাদানগুলি হল ক্যাসটোরিয়াম অ্যাবসোলিউট, সিভেট অ্যাবসোলিউট, মাস্ক টিঙ্কচার, আগারউড অথবা আউদ। এই সুগন্ধ থেকে প্রস্তুত বিখ্যাত পারফিউমগুলি হল: KOUROUS -YSL এবং OUD COLLECTIONS

অ্যানিম্যালিক অ্যাম্বারি – এর প্রাকৃতিক উপাদান তিমির বর্জ্য থেকে তৈরি হয়। যার কথা আগে বলা হয়েছিল সুগন্ধি উপাদান হিসেবে। যেমন অ্যাম্বারজিস অ্যাবসোলিউট, অ্যাম্বার টিঙ্কচার, ল্যাবডেনাম রেসিনয়েড ইত্যাদি। এই সুগন্ধ উপাদান থেকে প্রস্তুত বিখ্যাত পারফিউম হল, MANIA – GIORGIO ARMANI, BLACK XS -PACCO RABBANE

কয়েকটি পৃথিবী বিখ্যাত পারফিউম প্রসঙ্গে দু চার কথা:

ইউ সোভাজ্ –এখন নারীদের জন্য চিহ্নিত গ্রুপে থাকলেও ১৯৬৬ সালে তৈরির সময় থেকে এটি পুরুষদের একটি জনপ্রিয় সুগন্ধি। ক্রিশ্চিয়ান ডিওর তাঁর বাড়িতে তাঁর এক ধনী ও বিলাসী পার্সি বন্ধু সাভাজকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বাজারজাত করার আগে বন্ধুর সঙ্গে পারফিউমটির কী নাম রাখা যায় সেই আলোচনা করবেন বলেই ডিওর তাঁর শৌখিন এই বন্ধুকে বাড়িতে ডেকেছিলেন। তিনি আসতে বেশ দেরি করে ফেলেছিলেন। সাভাজ এলে ডিওরের চাকর তাঁর নামটি ভুল উচ্চারণ করে তাঁর মনিবকে বলেন, “সোভাজ্ মহাশয় এসেছেন।” পরে এই নামটি দিয়েই সুগন্ধির নামকরণ করা হয়েছিল। এতে টপ নোট হিসেবে আছে লেমন, বার্গামত, বেসিল, রোজমেরি, কারাওয়ে-সিড অয়েল। মিডল নোট হল জেসমিন, কোরিয়ান্ডার, কারনেশন, পাচৌলি, স্যান্ডাল উড, ইত্যাদি। বেস নোটে আছে ওকমস, ভেটিভার, মাস্ক এবং অ্যাম্বার।

সি কে ওয়ান – এটি প্রথম বাজারে আসে ১৯৯৪ সালে। এবং এসেই খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি এখনও খুব জনপ্রিয় একটি পারফিউম। সংস্থার নাম কেলভিন ক্লেইন। এটি একটি ইউনিসেক্স পারফিউম। পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে এটি সমান জনপ্রিয়। এর টপ নোটে আছে লেমন, পাইনঅ্যাপেল, ম্যানডারিন অরেঞ্জ, বার্গামোত এবং এলাচের অয়েল। মিডলনোটে আছে জায়ফল, ভায়োলেট, ওরিস রুট, ইত্যাদি। বেসনোটে আছে চন্দন, অ্যাম্বার, মাস্ক, সেডার এবং ওকমস্।

অ্যাজ্‌জারো ক্রোম – এটি প্রথম বাজারে আসে ১৯৯৬ সালে। পুরুষদের এই পারফিউমটি তৈরি করেন জেরার্ড হ্যারি। এখানে টপ নোটে আছে লেমন, রোজমেরী, বার্গামোত, নেরোলি, এবং পাইনঅ্যাপল্, বেসনোটে আছে মাস্ক, ওকমস্, সেডার, চন্দন, এলাচ, ব্রাজিলিয়ান রোজউড, এবং টঙ্কা-বিন।

সানেল ৫ – বিশ্ব বিখ্যাত এই সুগন্ধী এর মন মাতানো সুবাস এবং সুগন্ধের স্থায়ীত্বের জন্য আজও বিশ্ববন্দিত। বিখ্যাত ফরাসী ফ্যাশন ডিজাইনার কোকো সানেল প্রথম এই পারফিউমটি ১৯২১ সালে বাজারে আনেন। এটি সৃষ্টি করেছিলেন আর্নেস্ট বক্স। আগে অভিজাত পরিবারের নারীরা কেবল গোলাপের মৃদু সুগন্ধ ব্যবহার করতেন। নানা মিশ্রিত সুগন্ধ এবং জুঁইয়ের সুবাসকে খুব শস্তা এবং বেশ্যাদের ব্যবহারের উপযোগী বলে মনে করা হত। এদিকে যখন সানেল ফাইভ বাজারে আসে ইউরোপে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়েছে। এই সময় কোকো সানেল ঠিক করলেন আধুনিক নারীদের জন্য একদম অভিনব একটি সুগন্ধি বাজারে আনবেন।

তিনি ইউরোপে সুলভ এক রকমের হার্বসের শেকড় অরিস রুটের নির্যাস এই জন্য ব্যবহার করেন। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম হল আইরিস জার্ম্যানিকা এবং আইরিস প্যালিডা। এর রাজকীয় সুগন্ধের জন্য এর চলতি নাম হল এলিজাবেথ-রুট। জাপানে এটি পটপউরীতে এখনও ব্যবহার করা হয়। এটি পারফিউমের স্থায়ীত্ব প্রদানকারী একটি সুগন্ধি উপাদান। এছাড়া বন্য গোলাপ ও জুঁইয়েরও অ্যাবসোলিউটও তিনি তৈরি করে এই তিনটি উপাদান একত্র করে তাতে টেন পার্সেন্ট অ্যালডিহাইড মেশাতে বলে যান তাঁর এক ছাত্রকে। ছাত্রটি টেন পার্সেন্টের বদলে ভুল করে অনেক বেশি অনুপাতে অ্যালডিহাইড মিশিয়ে দেয়। অ্যালডিহাইডও পারফিউমের সুগন্ধকে স্থায়ীত্ব দেয়। পরে সেই সুগন্ধটি রাখা হয় পাঁচ নম্বর নমুনার বোতলে। কোকো সানেল প্রথমেই পাঁচ নম্বর বোতলটি খুলে পরীক্ষা করে মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি কনভেন্ট স্কুলে পড়ার সময় থেকেই পাঁচ সংখ্যাটিকে খুবই শুভ বলে মনে করতেন। পরে এই কোকো সানেলের নাম্বার ফাইভ পারফিউমটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। বেশি অ্যালডিহাইডের মাত্রার জন্য এটির সুগন্ধ বহুক্ষণ স্থায়ী হয়। পাঁচ নম্বর থেকে পরে এর নাম হয় সানেল-ফাইভ। এই পারফিউমটি এখনও খুবই জনপ্রিয়। এর বিজ্ঞাপন করেছিলেন মেরিলিন মনরো এবং ব্র্যাড-পিটসহ বহু হলিউডের তারকারা। বলিউডে এটি কঙ্গনা রানাউতের পছন্দের পারফিউম।

আউদ কালেকশন – এটি বিখ্যাত একটি পুরুষদের সুগন্ধি। তবে এখন এর উপাদান আউদ বা অগরু সম্পর্কে দু একটি কথা বলি। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম হল একুইলারিয়া। এটি থেকে সুগন্ধী ধূপ, এসেন্সিয়াল অয়েল ইত্যাদি তৈরি হয়। এই অয়েল শরীরকে ডিটক্সিফাই করে, বর্তমানে এটি আরব আমীরশাহী এবং মিডলইস্টে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। ভারতেও পাহাড়ি জায়গায় এবং উত্তরপ্রদেশের সমতলেও এখন এর চাষ হচ্ছে। এর উল্লেখ প্রাচীন গ্রন্থ এবং ত্রিপিটকেও পাওয়া যায়। গাছটি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর এক রকমের ছত্রাকের আক্রমণের ফলে গাছের যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তাতেই গাছের কাঠ সুগন্ধী হয়ে ওঠে। কাঠ থেকে গাঢ় বাদামি রঙের নির্যাস বা তেল পাতন করে পাওয়া যায়। এর উডি এবং মাস্কি সুগন্ধ বহুক্ষণ স্থায়ী হয় বলেই এটি এতটা মূল্যবান। এটির ধূপ বা ধোঁয়ার ঘ্রাণ মনকে শান্ত ও স্থিত করে।

গুচি রাশ – এটি ১৯৯৯ সালে বাজারে আসে। এটি তৈরি করেন মাইকেল আলমাইরাক। এর টপ নোটে আছে পিচের সুগন্ধ। এছাড়া মিডল নোটে থাকে গন্ধরাজ বা গার্ডেনিয়া, গোলাপ এবং জুঁই। বেসনোটে থাকে পচৌলি আর খসখসের তেল। নারীদের একটি জনপ্রিয় পারফিউম, এবং এটি বলিউডের তারকা ক্যাটরিনা কাইফের প্রিয়।

আরমানি কোড – এটি পুরুষদের পারফিউম। এটি প্রথম আসে ২০০৪ সালে বর্তমানে আবার নতুনভাবে এসেছে ২০২৩ সালে। এর ফ্যামেলি হল উডি এবং সাব ফ্যামেলি হল অ্যাম্বারি। এর সুগন্ধ কিছুটা স্পাইসি। এর টপনোটে আছে লেমন এবং বার্গামোত। এটি আলিয়া ভাটের প্রিয় সুগন্ধি।

নারসিকো রডরিগেজ ফর হার – নামেই মালুম এটি নারীদের জন্য নির্মিত। এটি ২০০৩ এর সেপ্টেম্বরে বাজারে আসে। বাজারে আনেন নার্সিকো রডরিগেজ। এটি আবির্ভাবের পরেই ফরাসী সুগন্ধি ফাউন্ডেশনের প্রথম পুরস্কার পায়। এর টপ নোট হল মাস্ক, অ্যাম্বার এবং অরেঞ্জ-ফ্লাওয়ার। এর সুগন্ধ বেশ গাঢ় এবং স্থায়ী। এটিকে বলা হয় সেক্স- অ্যাপিলিং এবং ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের জন্য আদর্শ একটি সুগন্ধি। এটি দীপিকা পাডুকনের প্রিয় সুগন্ধি।

সুগন্ধ নিয়ে সামান্য পরিসরে লেখা এই প্রবন্ধটি এখানেই শেষ করছি। গাছপালার নেশা আমার আজন্মকালের। আমি উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ছাত্রী। আয়ুর্বেদ হল আমার প্রিয় চর্চার বিষয়। সেই সম্পর্কিত বহু বইপত্র পড়েছি। ছাড়াও এই প্রবন্ধটি লিখেছি কনৌজের (ফ্র্যাগরেন্স এন্ড ফ্লেভার ডেভলপমেন্ট সেন্টার কনৌজ) এফ এফ ডি সি থেকে একটি সুগন্ধি বিষয়ক কোর্স করার পর বিশেষ উদ্বুদ্ধ হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *