prabandho-vobishoter-kobita

ভবিষ্যতের কবিতা, কবিতার ভবিষ্যৎ
পবিত্র সরকার


ভূমিকা

এই নামে গত ২৮ জুন, ২০২১ তারিখে (মার্কিনদেশে রবিবার) একটি ওয়েবিনারে যোগ দিতে হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই ওয়েবিনার। তাতে বাংলাভাষার অনেক কবি ছিলেন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের, আর ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাব্যভাবুক হায়দার আলী ভাই ছিলেন। আমি কবিতার যে খুব একজন একাগ্র পাঠক তা নই অনেকদিন। নিজে কবিতা লিখি মাঝে-মধ্যে, তবে লোকলজ্জায় সেটা বেশি প্রকাশ্যে আনি না। মানে মুখে চাউর করি না, তবে এখানে ওখানে, মানে লিট্ল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়, তাতেই তুমুল খুশি থাকি। আর এখন কবিতা সম্বন্ধে পড়াশোনাও খুব একটা করি না, যদিও কবিতা বা গানের ভাষা নিয়ে কিছু পড়াশোনা আর লেখা আছে। ফলে বক্তা হিসেবে আমি কেন আমন্ত্রণ পেলাম তা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। সম্ভবত উদ্যোক্তারা আমাকে যোগ্যতার চেযে বেশি স্নেহ করেন বলেই এই অঘটন ঘটেছে।
যাই হোক, বামনেরও যেমন চাঁদকে ছোঁওয়ার ইচ্ছে থাকে, তেমনই আমারও এই বিষয়টা নিযে দু-একটা কথা জমে ওঠেছিল, বিষয়টার দ্বারা প্ররোচিত হয়েই। ‘অপারবাংলা’র জন্য সেই কথাগুলো লেখার ইচ্ছে হল। পড়বার মতো হল কি না তা পাঠকেরা বিচার করবেন, অপাঠ্য হলেও জানাবেন।


নামের দ্বিতীয় অংশটা নিয়ে বেশি প্রশ্ন নেই।
কবিতার ভবিষ্যৎ কথাটার নানা রকম ইঙ্গিত হতে পারে। একটা ইঙ্গিত স্থায়িত্বের। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কবিতা থাকবে তো? মানুষ আদৌ কবিতা পড়বে তো? এ প্রশ্নের সোজা উত্তর হল, হ্যাঁ, কবিতা থাকবে, মানুষ কবিতা পড়বে, যেমন কয়েক হাজার বছর ধরে শুনে এবং পরে পড়ে, এসেছে। এ নিয়ে আমাদের মনে কোনও সংশয় নেই। মূল প্রশ্নটা কী ধরনের কবিতা পড়বে মানুষ তাই নিয়ে। ভবিষ্যতের এই কবিতা কী ধরনের হবে।
একটা জিনিস যেন আমরা খেয়ালে রাখি। কবিতা যদি যথার্থভাবে কবিতা হয় তা হলে তা কোন কালের সেটা বড় হয়ে ওঠে না। অতীতের কবিতাও আমাদের সমাদৃত ব্যবহারে দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে। পাঠ্যবইয়ে তো থাকেই। পাঠ্যবইয়ের কথাটা আমি ধরছি না। তাতে অতীতের অনেক রচনার একটা সংগত স্থান আছে। সাহিত্যের যে বিবর্তন ঘটেছে সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের তার সঙ্গে পরিচয় গভীর ও ঘনিষ্ঠ করানোর দায় থাকে বিদ্যায়তনের, তাই উপভোগের জন্য না হলেও মনোযোগ আর অনুধ্যানের জন্য অতীতের অনেক কিছু পাঠ্য করা হয়।
কিন্তু অতীতের অনেক রচনা, ধরা যাক কবিতাই, কি আমাদের বর্তমান উপভোগের জন্য যোগ্য হয়ে থাকে না? নিশ্চয়ই থাকে। শুধু শহরের ‘শিক্ষিত’ পাঠকের কাছে নয়, গ্রামের অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন পাঠকপাঠিকার কাছেও? রামায়ণ মহাভারত আলিফ লায়লা থেকে শুরু করে বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস প্রমুখ বৈষ্ণব কবিরা, রামপ্রসাদ, মধুসূদন,রবীন্দ্রনাথ, কায়কোবাদ, নজরুল, জয় গোস্বামী এবং যাবতীয় কবি তো এক হিসেবে অতীতেরই কবি। আমাদের জন্মের আগে কত লোক লিখে জন্মের আগেই প্রয়াত হয়েছেন। তাঁদের কবিতা কি আমরা পড়ি না? কতজন কবি আর শারীরিকভাবে আমাদের সমসাময়িক? সেই অতীতের কবিতাগুলিও কি এক অর্থে আমাদের বর্তমানের কবিতা নয়? বহু অতীতের কবিতা মুছে যায়, অবলুপ্ত হয়, আবার বেশ কিছু অতীতের কবিতা বর্তমানের কবিতা হয়ে থাকে, সার্থক কবিতা হওয়ার জন্য। হয়তো তার অনেকগুলি ভবিষ্যতেও আমাদের সঙ্গে থাকবে। বর্তমানের সব কবিতাই কি আমাদের কাছে পৌঁছায়? একেবারেই না। আমাদের কাছে পৌঁছায় না, ভবিষ্যতের কাছেও পৌঁছায় না। আমাদের ধারণা, অতীতের যে কবিতাগুলি বর্তমানে পৌঁছেছে তার অধিকাংশই ভবিষ্যতেও পৌঁছোবে। সেগুলিকে কি অতীতের কবিতা বলব, না বর্তমানের, নাকি ভবিষ্যতের?
তার মানে ভবিষ্যতের কবিতার একটা অবিমিশ্র, অভিনব, সুসংহত চেহারা দাঁড়াবে না। ‘কালোত্তীর্ণ’ কথাটা মামুলি, কিন্তু এটা তো ঠিক যে কিছু কবিতার গায়ে চোখ বুজে ওই ত্রিকালের ছাপ দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতেও তার অধিকাংশই টিকে থাকবে, হয়তো একটি পার্শ্বিক ধারা হিসেব। ‘পার্শ্বিক’ কথাটাও ঠিক বললাম না সম্ভবত। হয়তো কারও কারও কাছে রবীন্দ্রনাথই কবিতার শেষ কথা হয়ে থাকবেন, বলবেন বর্তমান ভবিষ্যৎ চুলোয় যাক, কবিতা বলতে আমি বুঝি রবীন্দ্রনাথ। অন্য কারও কাছে অন্য কেউ বা অন্য কয়েকজন। ফলে ভবিষ্যৎ কথাটার মধ্যে যে অতীত বা বর্তমানকে পরিষ্কার পিছনে ফেলে যাওয়ার অর্থ আছে, তা বোধ হয় খাটবে না। বোধ হয় এলিয়ট সাহেবও এইরকম কথা বলেছেন।


কবিতা কথাটার মানে কী ?
এই প্রশ্নটা শুনে পাঠকের হাসি পাবার কথা। পণ্ডিতেরা প্রায়ই বলেন, কবিতার সংজ্ঞা হয় না, তার চরিত্র বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা পণ্ডিত নই বলেই কবিতার কয়েকটি লক্ষণ নীচে তালিকাবদ্ধ করবার চেষ্টা করি—
১ কবিতা মানুষের ভাষার সৃষ্টি, তার অন্যান্য সাহিত্যেরই মতো। তাই কবিতা মানুষের সাহিত্যের একটি অংশ, যে সাহিত্য মৌখিক (অলিখিত) এবং/অথবা লিখিতও (মুদ্রিতও) হতে পারে। ২ কবিতা, অন্য সৃষ্টিশীল সাহিত্যের মতোই, কোনও সংবাদ বা জ্ঞানের আদান-প্রদানের লক্ষ্যে রচিত নয়, মূলত আনন্দদানের উদ্দেশ্যে রচিত। তবে তার রচিত দেহে সংবাদ বা জ্ঞান বা উপদেশের উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু তার আবেদন শ্রোতার/পাঠকের ভালো লাগার কাছে। ৩ শ্রোতা/পাঠকের মনে এই ভালো-লাগার অনুভব উৎপাদনের জন্য কবিতার ভাষা সাধারণ দৈনন্দিন ভাষা থেকে একটু আলাদা হয়। তাতে সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে হয়।
এই কথাটা একটু বুঝিয়ে বলি, প্রাক্তন চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাহার ভাষাবিজ্ঞানীদের তত্ত্ব থেকে নির্দেশ মেনে। তাঁরা বলেছেন, ভাষার কাজ ছ-রকমের। এক হল সংবাদের আদান-প্রদান, (‘আজ খুব বৃষ্টি হয়েছে কলকাতায়’, ‘তোমার খাওয়া হয়েছে তো?’, ‘না, এই খাব’ ইত্যাদি), যার নাম আমাদের ভাষায় জ্ঞাপন, ইংরেজিতে communicative function। দুই হল, হুকুম, নির্দেশ, কোনো কাজের জন্যে উৎসাহদান, খ্যাপানো ইত্যাদ, যার ইংরেজি নাম conative function, আমাদের দেওয়া বাংলা নাম ‘প্ররোচন’। তিন হল, আবেগ-প্রকাশ, তাতে রাগ, দুঃখ, ঘৃণা, আর্তি সব কিছু প্রকাশেরই সুযোগ আছে, ইংরেজি নাম emotive function, আমাদের বাংলায় ‘আবেগন’। চতুর্থ হল, সামাজিক সৌজন্যপ্রকাশ, যেমন পথে চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হলে আমরা ‘সেলাম আলায়কুম, নমস্কার, কেমন আছেন?’ ‘ভালো আছি’ ইত্যাদি। এটাকে, phatic function ভাষার একটু তুচ্ছ কাজ মনে হতে পারে, কিন্তু সামাজিক সংহতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলি ‘সৌজন্য সম্ভাষণ’। পঞ্চম হল, ভাষা দিয়ে ভাষার বিচার, যা ব্যাকরণবিদ আর ভাষাতাত্ত্বিকেরা করে থাকেন, তার ইংরেজি নাম metalinguistic function, আমাদের বাংলায় আধিভাষিক কর্ম। এটাও সাধারণ ভাষাব্যবহারকারীর কাছে খুব প্রকাশ্য নয়, বিশেষজ্ঞদের কাজ। কিন্তু ষষ্ঠ বা শেষ কাজ ভাষার হল aesthetic function বাংলায বলতে পারি ‘নন্দন’। কবিতা এই কাজটাই করে।
মনে রাখতে হবে, অন্য কাজগুলিও কবিতার অন্তর্গত হতেই পারে। তাতে সংবাদ থাকতে পারে, প্ররোচন, আবেগন তো থাকবেই, এমনকি কোনও-কোনও কবিতায় সৌজন্য সম্ভাষণ বা ভাষাবিচারও থাকতে পারে, যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘হিং টিং ছট্’-এ আছে। কিন্তু তার মূল লক্ষ্যটি হবে সৌন্দর্য সৃষ্টি, তা শ্রোতা/পাঠকের চিত্তকে একভাবে বা একভাবে আ-নন্দিত করবে। ৪ এই সৌন্দর্যসৃষ্টির জন্য কবিতার কতকগুলি উপায় আছে। সেগুলির সাহাযেই কবিতা কেজো গদ্য থেকে আলাদা হয়ে যায়। সেগুলি কী কী? সবই যে কবিতার কবিতা হওয়ার জন্য অপরিহার্য, তা নয়। যেমন ছন্দ। কবিতা যতদিন মুখের ছিল ততদিন ছন্দ আর তার সঙ্গী মিল তাতে এক ধরনের সৌন্দর্য জুড়ে দিত। মনে রাখতেও সাহায্য করত। কবিতা লিখিত/মুদ্রিত হওয়ার পরেও যে বহু সংস্কৃতিতে, বাংলাতেও তার ব্যবহার হয়ে চলল, তার কারণ তা এক ধরনের শ্রুতি এবং বোধের সৌন্দর্যও সৃষ্টি করে। কিন্তু ছন্দমিল ছাড়াও তো কবিতা হতে পারে। পৃথিবীর বহু সংস্কৃতিতেই ছন্দ দীর্ঘদিন নেই।
কিন্তু যা ছাড়া কবিতা হতে পারে না, তা হল শব্দসজ্জার ভিতর ও বাহিরের সৌন্দর্য। বাইরের সৌন্দর্য হল ধ্বনিরবিন্যাসের নানা সৌন্দর্য, যাকে ভারতীয় কাব্যতত্ত্বের পরিভাষায় শব্দালংকার বলা হয়ে থাকে। এ সৌন্দর্য কানকে খুশি যত করে, মনকে তত খুশি করে কি না সন্দেহ। মনকে খুশি করে শব্দের নিগূঢ় সজ্জার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত সৌন্দর্যময বা উন্নত ভাব, বা চমৎকার ছবি। এই ছবির একটি উপাদান তথাকথিত অর্থালংকার, আর একটি উপাদান এখন যাকে বলা হয় চিত্রকল্প বা image, ড. অমলেন্দু বসু যার নাম দিয়েছিলেন বাক্প্রতিমা। অর্থালংকার সাধারণভাবে প্রথাগত উপায়, বহু কবির দ্বারা অল্পবিস্তর রূপান্তরে ব্যবহৃত, যদিও তাতেও কবি অভিনবত্ব আনতে পারেন, যেমন জীবনানন্দের উপমা ‘উটের গ্রীবার মতো অন্ধকার’ বা সুকান্তর উৎপ্রেক্ষা ‘পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ কিন্তু চিত্রকল্প মূলত ব্যক্তিগত উদ্ভাবন।
ফলে ভবিষ্যতের কবিতা সম্বন্ধে ভাবতে হলে উপরের প্রত্যকটি ক্ষেত্রের দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। তার ভাষা, তার এতদিন ব্যবহৃত নানা প্রযুক্তি, তার সৌন্দর্যায়নের নানা উপকরণ—শব্দসজ্জা, অলংকার, চিত্রকল্প ইত্যাদি। প্রথম প্রশ্ন—হয়তো একটু লঘু প্রশ্ন—এগুলো থাকবে না বর্জিত হবে। এই প্রশ্নটা এই জন্য করা যে, এর উত্তরের মধ্যেই নিহিত আছে কবিতার কোনগুলি অপরিহার্য উপাদান, কোনগুলো নয়। ভাষা অপরিহার্য, কাজেই ভাষা বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কবিতা হবে এমন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আরগুলি?


ভবিষ্যৎ কথাটার মানে কী ?
এখন যখনই আমরা একটা কথা ব্যবহার করি তখনই, দার্শনিক জাক দেরিদা যেমন আমাদের দেখিয়েছেন, ওই কথাটার প্যাঁচে পড়ে যাই আমরা। কারণ একটা কথার অর্থ তো এক নয়, সোজাসাপটা নয়। তার নানা ভাঁজবিভঙ্গ আছে। ভবিষ্যৎ মানে কী? আমি যে পরের শব্দটা টাইপ করব সেটাও তো ভবিষ্যতের গর্ভে আছে, টাইপ করার সময়ে হয়তো বর্তমান হল, টাইপ হয়ে গেল তো অতীত হয়ে গেল। অর্থাৎ সময়ের স্রোতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ গায়ে-গায়ে লেগে থাকতে পারে, কে কখন কোন্‌টা হয়ে যাচ্ছে তার পরিচিতি মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। তবে না, আমি এত বোকা নই যে, এই ধরনের ওয়েবিনারের আয়োজন যাঁরা করন তাঁরা এই পারদের মতো বদলে যাওয়ার হিসেবটাকে ধরে ভবিষ্যতের ধারণা তৈরি করেন। তাঁরা ভাবেন বর্তমানকে অনেক পেছনে ফেলে যাওয়া সুদূর এক ভবিষ্যতের কথা, যা নিঃসন্দেহেই বর্তমান থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তার জন্যে আমাদের বেশ কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। তখন অনেক কিছুই বদলে যাবে, তাই, আশা বা আশঙ্কা করা যায়, কবিতাও বদলে যাবে।
এই অনুমান কতটা সত্য? এখানে আমরা আর-একটা প্যাঁচের মধ্যে গিয়ে পড়ি। এ সংসারে কোন্ জিনিসগুলো খুব তাড়াতাড়ি বদলায়, কোন্ জিনিসগুলো অত তাড়াতাড়ি বদলায় না, তার একট পরিষ্কার হিসেব কি এখন আমাদের কাছে আছে? কোন্‌ দলে আমরা ফেলব কবিতাকে? প্রাণীর, সেই সঙ্গে মানুষের শরীর বদলায় খুব ধীরে ধীরে, হাজার হাজার বছর ধরে। কবিতা প্রাণী নয়, মানুষ নামে এক প্রাণীর তৈরি শিল্প। এ কথাটা বলা বাহুল্য হল, কারণ মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রাণীর শিল্প নেই। ভাষা দিয়ে তৈরি শিল্প। মানুষের সমাজ ও শ্রেণিসম্পরক হল মার্কসের ভাষায় ভিত্তি, অধোনির্মাণ, আর ভাষা তার ওপর সুপারস্ট্রাকচার বা অধিনির্মাণ। কবিতা আবার, আমাদের মতে দ্বিতীয় স্তরের অধিনির্মাণ।


আমাদের বর্তমানের মধ্যেই অনেক সময় অতীত লুকিয়ে থাকে, ভবিষ্যৎ তো পরের কথা
আমাদের অনেক কবি তাঁদের কবিতা বর্তমান থেকে এগিয়ে আছে বলে দাবি করে অনেক সময় একট লেবেল দেন তাঁদের কবিতাক—আমার কবিতা ‘দাদাবাসী’, ‘ভবিষ্যবাদী’, বা ‘সুররিয়াল’ ইত্যাদি। মুশকিল হল, এগুলি হল পশ্চিমদেশে অতীত হয়ে যাওয়া মতবাদ—১৯২০ থেকে ১৯৪০-এর মধ্যে সেখানে উঠেছে আর অস্তে গেছে। কবিতার স্তবকের নানা নকশার ছবি করে ‘কংক্রিট’ কবিতাও অতীতের বিষয়, তা এখনও আমাদের কবিতা ‘নতুন’ বলে দেখাতে চান বাংলা কবিতায়। এমনকি উত্তর-আধুনিক নিয়েও একই সমস্যা। পাশ্চাত্যে যে মতবাদ ১৯৭০-এর বছরগুলির শেষ দিকে তৈরি হয়েছিল তা আমাদের দক্ষিণ এশিয়াতে এই শতাব্দীর গোড়ায় কিছু কবির কবিতায় ঢুকে পড়ল, এবং ওদের অতীত আমাদের কাছে বর্তমান হয়ে দাঁড়াল। ফলে এই প্রশ্ন উঠে গেল, আমরা কি আসলে অতীতমুখী? ভবিষ্যৎ ব্যাপারটা সম্বন্ধে ভাবতে কি আমরা অভ্যস্ত নই?
দু-নম্বর কথা, কবিতা স্বয়ংসৃষ্ট কোনও জীব নয় যে নিজে নিজে বদলাবে। তা বহু মানুষের সৃষ্টি, এবং বহু মানুষের সৃষ্টির মধ্যে সময়েরও একটা ছাপ থাকে, যে জন্যে একটা সময়ের কবিতার একটা সাধারণ লক্ষণ ফুটে ওঠে, আমরা বলি ক্লাসিক যুগ বা নিও-ক্লাসিক যুগ বা রোমান্টিক যুগ বা আধুনিক যুগ। শিল্পের যুগ হল সময় ও শিল্পের স্রষ্টাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার দ্বারা চিহ্নিত। কিন্তু এও তো ঠিক যে, কবিরা প্রত্যেকে আলাদা মানুষ, এবং তাঁদের মধ্যে যাঁরা প্রখরভাবে আত্মসচেতন (অন্যদের থেকে নিজেদের সৃষ্টিকে পৃথক রাখার জন্য যত্ন নেন) তাঁরা সবাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে একযোগে বদলাতে শুরু করবেন। ফলে ভবিষ্যতের কবিতা বদলে যাবে। কবিরা কখনও কি ভাবেন যে, আমি এই বর্তমানে আছি, কাল আমি ভবিষ্যতে পৌঁছে যাব, তাই আমার কবিতাকে সেইভাবে বদলাতে হবে? সে প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর আমাদের কাছে আছে কি?
আমরা জানি, ভাষা খুব ধীরে ধীরে বদলায়। কবিতা ভাষার সৃষ্টি। কাজেই কবিতার ভাষা খুব দ্রুত খুব বিপুল পরিমাণে বদলে যাবে এমন আশা বা আশঙ্কা আমরা করছি না। অর্থাৎ কবিতার অভিধানের শব্দাবলি প্রায় একই থাকবে। হ্যাঁ, বাঙালি যত অন্য ভাষায় দ্বিভাষী হবে, সে সব ভাষার শব্দ বাংলায় আসবে—ইংরেজি, হিন্দি, আরবি, ফারসি—সব। কিন্তু মূল ভাষাভিত্তি বাংলাই থাকবে।
তবে কি ছন্দ বর্জিত হবে? পৃথিবীর অনেক দেশের কবিতায় ছন্দ মিল এ সব নেই, তারই দেখাদেখি আমরা কবিতা লিখতে শুরু করব? তাও আমার মনে হয় না। আমি বরং ভাবি, ছন্দমিলের যে একটা সৌন্দর্যের আবেদন আছে তা বাঙালি কবি বা পাঠক ছাড়তে চাইবে না। আর কবিও ভাববেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো নিয়েই দেখি না কবিতাটা ভালো লাগার মতো হয় কি না। নতুন কবিরা অনেকে গদ্যকবিতা দিয়ে শুরু করেন তা দেখি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কথা ছেড়েই দিলাম, শামসুর রাহমান, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি ছন্দের যে ঐতিহ্য তৈরি করে গেছেন, তা কি আত্মবিশ্বাসী বাঙালি কবি ছেড়ে যাবেন? আমার তো মনে হয় না।
অবশ্যই নতুন নতুন অলংকার এবং চিত্রকল্প তৈরি হবে।

এই পৃষ্ঠাটি লাইক এবং শেয়ার করতে নিচে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *