আলোকদিয়া
সাবিনা ইয়াসমিন রিঙ্কু
আঞ্জুমান এখন ভাবে ভাগ্যিস মীনা কাজটা তাকে জোগাড় করে দিয়েছিল! বাপের জন্মে এমন আরামে কোনদিনও থাকেনি সে। না বাপের ঘরে, না শ্বশুরের ভিটেতে। কল খুললেই জল। মাথার ওপরে সারাদিন পাখা চলছে। দরজাওয়ালা চানঘর। বাপের বাড়িতে বাথরুমের বালাই ছিল না। পুকুরে গা ধুয়ে ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরে ঘরের ভেতর ঢুকে কাপড় পাল্টাতে হতো। শ্বশুরবাড়িতে টিনের ছোটমতো একটা ঘেরা জায়গা ছিল বটে, কিন্তু ছাদ ছিল না। আঞ্জু চান করতে ঢুকলে পাড়ার চিহ্নিত মেয়েবাজ মদ্দামানুষরা পাশের আমগাছে উঠে বসে থাকত।
এখানে সে আঞ্জুমান আরা বেগম নয়, অঞ্জু। মীনাকে আঞ্জু বলেছিল “নিজের সত্যিকারের পরিচয় লুকিয়ে কাজ করা কি ভালো?”
মীনা বলেছিল “অত সাধুগিরি করলে কাজ করে খেতে হবে না। দুনিয়াটা এমনি করেই চলছে চাচী। বাঙালি বাড়ি। অবাঙালিদের মত দিনরাত খাটিয়ে মারবে না। তোমার ভাগের কাজটুকু ঠিকমত করলে আরামে থাকবে। আর নামে কী এসে যায়! নামেই যদি এত সমস্যা তাইলে ভুল নামে কোনও দোষ নাই।”
কাজটা হল, একটা বুড়িকে দেখাশোনা করা। তিনতলা বাড়ি। একতলায় বুড়ি থাকে। দোতলায় থাকে বুড়ির বড় ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নাতনি। তেতলায় পরিবার নিয়ে থাকে ছোট ছেলে। বুড়ি বিছানা থেকে উঠতে পারে না। কোমরে, হাঁটুতে, পায়ে …. সবে ব্যথা। পায়ে রড ভরেও কিছু সুরাহা হয়নি। হাত কাঁপে সবসময়। কথা বলতে গেলে জিভ লেগে যায়। দুদিন অন্তর অন্তর ইউরিন ইনফেকশন।
আঞ্জু ভাবে এত রকমের রোগ নিয়ে বুড়ি বেঁচে আছে কী করে।
প্রথম কদিন বাড়ি থেকে যাতায়াত করল আঞ্জু। ট্রেনলাইনেই তার সুবিধা। কিন্তু রোজ সকাল আটটায় রুগীর বাড়ি পৌঁছতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল।
মীনাকে সমস্যার কথা বলতে মীনা ওই বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। নিচের তলায় বুড়ির ঘরের পাশে একটা রান্নাঘর আছে।
স্টোভ, হাঁড়ি কড়াই সবই আছে। নিজের রান্নাটা নিজে ক’রে নেওয়ার অনুমতি মিলেছিল।
বুড়ির খাবার দোতলা থেকে আসে। সকালে প্লেন দই চিঁড়ে অথবা আটার রুটি তরকারি। ডিমের সাদা ভাগটা দিয়ে তৈরি ঝুরি। দুপুরে ভাত। লাউ, পেঁপে, পটলের সবজি। ওর মধ্যেই দু টুকরো চিকেন দেওয়া থাকে। কোনো কোনো দিন চিকেনের বদলে চারাপোনা বা কই অথবা শিঙি মাছ। বিকেলে রং চা বিস্কুট। রাতে রুটি, সবজি।
আঞ্জু ভাবে এই রান্না দিনের পর দিন খেলে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। রান্নার গড়ন এবং রং দেখে বোঝা যায় সে রান্নাতে যত্ন আছে না বিরক্তি! সে নিজেও কিছুদিন রান্নার কাজ করেছিল। স্বামী স্ত্রী দুজনেই চাকরি করত। ছিমছাম রান্না পছন্দ করত। তারা বদলি হয়ে চলে গেল উত্তরবঙ্গে। আঞ্জুর কাজও গেল। সে ভেবেছিল ছেলেদের বউ এলে একটু বিশ্রাম পাবে। কিন্তু তা আর হলো না। খাটুনি আর খিঁচুনি ছাড়া কিছুই জুটলো না নিজের সংসার থেকে। নিজের সংসার, আপনজনদের থেকে দূরে থাকলে শান্তি জোটে কারুর কারুর কপালে। আঞ্জু এখন তেমন-ই শান্তি পাচ্ছে।
কাছেই বাজার। সেখান থেকেই আঞ্জু সবজি, মাছ, মশলাপাতি কেনে। দু’মাস অন্তর বাড়ি যায়। নাতনিটার জন্য বড্ড মন প’ড়ে। গেলেই “দাদি আমার দাদি” বলে কেমন সুন্দর জড়ায়ে ধরে। ওর জন্য সন্দেশ, ভালো বিস্কুট, ফুলছাপ ফ্রক কিনে নিয়ে যায়। ওখান থেকে চাল নিয়ে আসে। শহরের চাল বড্ড চিকন। পেট ভরে না। যে চাল ও গ্রাম থেকে আনে, সেগুলো একটু গোলপানা আর সাইজে ছোট। ভাতের স্বাদ খুব মিষ্টি।
বুড়িকে খাইয়ে দিয়ে তারপর নিজে খেতে বসে আঞ্জু। বুড়ি নিজের হাতে খেতে চায়, কিন্তু ভাত তুলে মুখে ভরার সময় অনেকটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ব’লে ভাত খাইয়ে দেবার কড়া নির্দেশ আছে। বুড়িকে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে ওষুধগুলো দেবার পর বালিশে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয়। আঞ্জু ভাবে খাওয়ার পর বুড়ি যদি ঘরের মধ্যে এক পা দু পা হাঁটতে পারত, তবে হজমের সমস্যা থাকত না। কিন্তু ছেলের বৌরা জানতে পারলে আঞ্জুকে বকুনি দেবে। এরা আগের মেয়েটাকে কোন দোষে ছাড়িয়েছে জানে না আঞ্জু।
টিভিতে সিরিয়াল লাগিয়ে দিয়ে আঞ্জু মেঝেতে একটা আসন পেতে খেতে বসে। এই সময়টাতে বুড়ি সিরিয়াল দ্যাখে। দুপুরে ঘুমোলে রাত্তিরে বুড়ির ঘুম আসতে চায় না। সেইজন্য গোটা দুপুর টিভি চলে।
সেদিন আঞ্জু রান্না করেছিল আমরুল শাকের ডাল এবং আলুসেদ্ধ। এদের লাগানো ফুলগাছের টবে প্রচুর আমরুল লতিয়েছে। ওখান থেকে তুলে এনে আঞ্জু ডাল রান্না করেছে। খুব উপকারি শাক। ছোট মাছ বা চিংড়ি দিয়েও রান্না করা যায়। চাটনিও করা যায়। গরীব মানুষরা এই সব শাক পাতাতেই সুস্থ থাকে। নইলে এখন ওষুধের যা দাম!
আমরুল শাকের ডাল
উপকরণ: অনেকটা আমরুল শাক। রসুন। কাঁচালঙ্কা। শুকনোলঙ্কা। পাঁচফোড়ন। সর্ষের তেল। পরিমাণ মত লবণ।
প্রণালী: আমরুল শাক বেছে ধুয়ে লতাগুলোকে কুচি কুচি করে কেটে নিয়ে জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। সেদ্ধ করার সময় শাকে কাঁচালঙ্কা এবং নুন দিতে হবে। শাক গ’লে গেলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে হাত দিয়ে ভালো করে চটকে ছেঁকে নিয়ে শাকের ছিবড়েগুলো ফেলে দিতে হবে।
এবার কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে শুকনোলঙ্কা,পাঁচফোড়ন ফোড়ন দিয়ে রসুন কুচি দিতে হবে। ভাজা ভাজা হলে আমরুলের ডাল ঢেলে দিতে হবে। ফুটে উঠলে গ্যাস অফ করে দিতে হবে।
বুড়ি জিজ্ঞেস করে “কী দিয়ে ভাত খাচ্ছিসরে, অঞ্জু? বড্ড বাস বেরিয়েছে…..”
“এই যে মা বাজারে সস্তায় একটা মোচা পেয়েছিলাম। সেটা দিয়ে ধোকা বানায়েছিলাম। ঐ দিয়ে তরকারি রান্না করেছি। আঞ্জু একটাই তরকারি রাঁধে। সেটাই দুবেলা খায়।
ধোকার কারি দেখার জন্য বুড়ি মাথাটা বাড়িয়ে দেয়।
আঞ্জুর মাঝেমাঝে মনে হয় সে যেন এখানে একটা নতুন সংসার পেতেছে! যেসব মশলাগুলো দিব্যি সাদা চিকচিকেতে ভরে রাখা যেত, সেগুলোর জন্য ছোট ছোট কৌটো কিনেছে। আঞ্জু খায় আর ভাবে। তারমধ্যেই টিভির দিকে তাকিয়ে সিরিয়াল দ্যাখে।
বুড়ি কিন্তু নাছোড়বান্দা।
“একটুকুনি ধোকার তরকারি দে। কতদিন খাইনি।”
খুব অপ্রস্তুত হয়ে যায় আঞ্জু। “তোমার তো খাওয়া হয়ে গিয়েছে, মা। এখন খেলে শরীল খারাপ হবে।”
“হোক। তুই দে। আমার ওই বাটিটা ধুয়ে ওতেই দে।”
আঞ্জু বলে “তোমার ছেলের বউ জানতে পারলে রক্ষে থাকবে না। আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়ায় দেবে।”
“ওরা কেউ জানতে পারবে না।”
বুড়ি আজ না খেয়ে মনে হয় ছাড়বে না!
আঞ্জু খাওয়া থামিয়ে খুব সিরিয়াস মুখ করে বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলে “একটা গোপন কথা বলে রাখি। জানি তুমি কাওকে বলবা না। তাই বলছি। আমি কিন্তু মোসলমান। আমার নাম অঞ্জু নয়, আঞ্জু। আঞ্জু আরা বেগম।”
বুড়ি হাসে। এতদিন হল কাজে লেগেছে, বুড়িকে একদিনও হাসতে দ্যাখেনি আঞ্জু।
“তুই মুসলমান তাতে আমার বয়েই গেছে! আমাদের বাড়ি ছিল ওপার বাংলায়, বরিশালে। গ্রামের নামটা কিছুতেই মনে করতে পারি না।
আমার একটা সই ছিল, হাসু। ভালো নামটা মনে নেই। ওর মা কত কী বানাত, খুব খেয়েছি।”
“তোমরা বরিশালে থাকতে? “ধোকার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এইসব কথার ওপরে জোর দিল আঞ্জু।
“হ্যাঁ। খুব ছোটবেলায় এ পারে চলে এসেছিলাম সবাই। গ্রামের নামটা খুব মনে করার চেষ্টা করি। কিন্তু মনে পড়ে না। বাবার মুখটা আবছা মনে আছে। আস্তে আস্তে পুরনো সব কথা ভুলে যাচ্ছি।” বুড়ির মুখে বেদনার ছায়া।
“বাম্ভীশাক কিনে এনে সেদ্ধ করে তোমাকে খাওয়াবো, সব মনে পড়ে যাবে।”
“সে যখন খাওয়াবি, খাবো। এখন দু পিস ধোকা দে, খাই।”
আঞ্জু খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে বুড়ির বাটিটায় ধোকার তরকারি দিয়ে বুড়ির হাতে বাটিটা ধরিয়ে দিল।
হাত দিয়ে ভেঙে একটুকরো ধোকা মুখে ভরে দিল বুড়ি। “খুব স্বাদের রান্না আঞ্জু! এত ভালো রান্না বহুদিন খাইনি। আমি বৌমাকে বলে দেব আমার রান্না তুই করবি।”
“অমনটা কোরো না মা! আমার কাজটাই চলে যাবে। মাঝেসাঝে তোমাকে আমার রান্না খাওয়াবো।”
“বেশ” তাহলে এবার বল এই ধোকা কীভাবে বানালি?
আঞ্জু রেসিপি বলতে শুরু করে।
মোচার ধোকা
উপকরণ: কাঁঠালি কলার মোচা, একটুকরো সেদ্ধ আলু, অল্প ছোলার ডাল বাটা, কাঁচালঙ্কা, শুকনোলঙ্কা, গোটা জিরে, আদাবাটা, ধনে জিরে বাটা, হলুদগুঁড়ো, লঙ্কার গুঁড়ো, অল্প নারকেল কোরা, লবণ, গরমমশলার গুঁড়ো, তেজপাতা, সর্ষের তেল।
প্রণালী: মোচা ছাড়িয়ে কুচি কুচি ক’রে কেটে নুন দিয়ে ভাপিয়ে নিতে হবে। তারপর মিক্সিতে ঘুরিয়ে পেস্ট করে নিতে হবে।
এবার কড়াইতে অল্প তেল গরম করে সেদ্ধ মোচা দিয়ে নাড়তে হবে। ওর মধ্যে ছোলার ডাল বাটা, নারকেল কোরা, আদা বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, অল্প নুন দিয়ে নেড়ে চেড়ে নিয়ে সেদ্ধ আলু চটকে দিতে হবে। শুকনো মাখা মাখা হলে নামিয়ে একটা তেল মাখানো চ্যাপ্টা থালায় ঢেলে নিয়ে সমান করে বসিয়ে দিয়ে ছুরির সাহায্যে চৌকো চৌকো করে কেটে ধোকাগুলোকে ভেজে নিতে হবে।
তারপর কড়াইতে আবার তেল গরম করে জিরে, তেজপাতা, শুকনোলঙ্কা ফোড়ন দিয়ে বাটা মশলা, একটু নুন, মিষ্টি, লঙ্কারগুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো দিয়ে কষিয়ে নিয়ে অল্প জল দিতে হবে। ঝোল ফুটে উঠলে ধোকাগুলো ঝোলে দিয়ে গরম মশলার গুঁড়ো আর আস্ত কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে দিয়ে গ্যাস অফ করে দিতে হবে।
বুড়ি ধোকা খেয়ে মুগ্ধ হয়ে গল্পের ঝুলি খুলে বসে। আঞ্জুর আর বাসন মাজা হয় না।
বরিশালের রান্নায় নাকি নারকেলের খুব ব্যবহার! বুড়ির মা চিংড়ির মধ্যে নারকেলবাটা দিয়ে কলাপাতা মুড়িয়ে চিংড়ির পিঠে তৈরি করত। মায়ের কথা বলতে বলতে বুড়ির ঘোলাটে চোখ ছলছল করে ওঠে।
আঞ্জুরও গল্প করতে খুব ভালো লাগে। গল্পে গল্পে সন্ধে নেমে আসে। দোতলা থেকে ভেসে আসা শাঁখের আওয়াজ মিশে যায় আজানের সুরে। আঞ্জু টুক ক’রে মাথায় ঘোমটা তুলে দেয়। আঞ্জু নিয়মিত নামাজ পড়ে না। নাতনিকে নিয়ে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলে সেদিন রান্নাঘরে ঢুকে মাগরিবের নামাজটা মন দিয়ে পড়ে।
বুড়ি এখন অনেকটা সুস্থ। কদিন থোড় খাইয়ে বুড়ির পেচ্ছাপের নাড়ির সংক্রমণ অনেকটা সারিয়ে দিয়েছে আঞ্জু।
রোজ গল্প করতে করতে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বুড়ির। আগের মত আর সারাদিন শুয়ে থাকে না। সামনের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করে। বুড়ির বৌমারা বুড়ির শারীরিক উন্নতিতে কেন যে খুশি হয় না বুঝতে পারে না আঞ্জু।
আঞ্জু খুব খুশি। কারণ যে জন্য সে অতগুলো টাকা পায়, সেইটা সে ঠিকমত করতে পারছে।
বুড়ি বেগুনের টকঝালমিষ্টি রান্না খেতে চেয়েছে। বুড়ির ছোটবেলার বন্ধু হাসুর মা এই রান্নাটা নাকি খুব ভালো করত। এই পদটা ভাত রুটি ….. সবের সঙ্গেই খেতে ভালো লাগে।
বুড়ির লোভ বাড়ছে। আর কমছে অসুখের বহর।
গালে লালচে রঙের আভা ফুটেছে। আঞ্জু রোজ সুন্দর করে চুল আঁচড়ে দেয়। মাথায় হাত দিলে বুড়ি আরামে শুয়ে পড়ে।
আঞ্জু কাজে ঢুকে বুড়িকে যেমন শুটকো, রগচটা, বিষণ্ন দেখেছিল…..এই কদিনের সেবাযত্ন পেয়ে বুড়ির চেহারার অনেক পরিবর্তন সে দেখতে পাচ্ছে। আঞ্জুর মনে হয় এখন যদি বুড়ি ইচ্ছে করে তবে দোতলাতেও উঠতে পারবে।
বুড়ির বৌমারা আজকাল একতলায় প্রায়ই চৌকি দেয়। বোঝার চেষ্টা করে কী এমন যত্ন করছে অঞ্জু নামের নতুন মেয়েটা যে শাশুড়ি নতুনভাবে জীবনীশক্তি ফিরে পাচ্ছে! তারা তক্কে তক্কে থাকে। অঞ্জু কিছু ঘটালেই খপ করে ধরবে।
আঞ্জু ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। বুড়িকে বলে “এখন কদিন আর অত হাঁটাহাঁটি কোরো নাকো। একটু বিশ্রাম নাও।”
বুড়ি বলে “আমি এখন অনেকটা সুস্থ। তুই আমাকে আগে টকমিষ্টি বেগুন রেঁধে খাওয়া।”
বেগুনের টকঝাল
উপকরণ : ছোট সাইজের বেগুন চারটে, পেঁয়াজকুচি, পাঁচফোড়ন, আদারসুন বাটা, হলুদগুঁড়ো, লঙ্কারগুঁড়ো, নুন, চিনি, পাকা তেঁতুলের পাল্প, তেজপাতা, ছোট এলাচের গুঁড়ো, কয়েকটা আস্ত কাঁচালঙ্কা, দুটো শুকনোলঙ্কা।
প্রণালী: ছোট বেগুনগুলো ধুয়ে বোঁটা রেখে চিরে নিয়ে নুন মাখিয়ে সর্ষের তেলে ভেজে নিতে হবে।
তারপর বেগুনগুলো তুলে রেখে ওই তেলেই পাঁচফোড়ন, শুকনোলঙ্কা, তেজপাতা দিয়ে নেড়েচেড়ে পেঁয়াজকুচি দিতে হবে। পেঁয়াজগুলো বাদামী হলে ওর মধ্যে আদা রসুন বাটা দিয়ে কষিয়ে গুঁড়ো মশলা গুলো দিয়ে নেড়ে একটু জল দিতে হবে। এরপর তেঁতুলের পাল্প দিয়ে আর একটু জল দিতে হবে। নুন, চিনিও দিতে হবে এইসময়। ফুটে উঠলে আস্ত বেগুনগুলো দিয়ে একবার উল্টেপাল্টে কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে ঢাকনা এঁটে গ্যাস অফ করে দিতে হবে।
বুড়ি টক মিষ্টি বেগুন খেয়ে নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে যেন! ঘর থেকে টুক টুক ক’রে হেঁটে উঠোনের দিকে যায়। ঝুমকোজবা গাছের পাশে দাঁড়ায়। ইদানিং আঞ্জু বুড়ির চুলে কলপ লাগিয়ে দিচ্ছে। বুড়ির হাঁটা চলা কথাবার্তা, স্মৃতি ফিরে আসা দেখে ছেলেরা, ছেলের বৌরা যারপরনাই অবাক। কিন্তু খুশি নয়। মানুষটা মারা যেতে পারে, এমন একটা মানসিক সেটিং হয়ে গেলে তাঁর বেঁচে ওঠা মনে হয় অন্যদের আনন্দ দেয় না। তাই বুড়ির আপনজনেরা আনন্দিত হতে পারে না। তবে আঞ্জু খুব খুশি।
সেদিন বুড়িকে খাইয়ে আঞ্জু খেতে বসেছে। ভাত আর মটর ডালের বড়া দিয়ে পাকা শসার ঘন্টো। বুড়িকে একটা বাটিতে করে অল্প তরকারি দিয়েছে। বুড়ি খাটের ওপরে বসে একটু একটু করে খাচ্ছে। এই সময় নিচে কেউ আসে না বলে আঞ্জু দরজায় ছিটকিনি না দিয়ে পাল্লাদুটো ভেজিয়ে রাখে। হঠাৎ বিশাল শব্দে দরজা খুলে বুড়ির বড় ছেলে, বড় বউ ঘরে ঢুকে পড়ল। বড় বউ আঞ্জুর চুলের মুঠি ধরে ভাতের থালার সামনে থেকে আঞ্জুকে তুলে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তারপর চিৎকার করে বলতে শুরু করল…”অসুস্থ মানুষটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে যা ইচ্ছে তাই খাইয়ে মারার ধান্দা করছে এই মেয়েটা।”
আবার নিজের পরিচয় গোপন করে গেছে। ছি! ছি! ছি!
মুসলমানের হাতে খেয়ে আমার শাশুড়ির সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। বেরোও….. এক্ষুনি এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। আগের মেয়েটা না বললেই জানতেই পারতাম না কিছু!”
ঝগড়ার গন্ধ পেয়ে আশপাশের লোকজন হাজির হয়েছে বাড়ির সামনে। বিনা পয়সায় মজা দেখার সুযোগ কে ছাড়ে?
আঞ্জুর হাত এঁটো। মুখে কথা নেই। ভাতের থালায় শুকোচ্ছে ভাত আর শসার তরকারি। খাটে বসে খোলা দরজা দিয়ে বুড়ি বাইরের ঝামেলার দৃশ্য খুব মন দিয়ে দেখছে।
বড় বউ নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভীষণ মেজাজের সঙ্গে বলল… “দিনের হিসেব করে যা টাকা হয় সেটা দিয়ে এক্ষুনি এই আপদটাকে বিদায় করো। তোমাকে বারবার বলেছিলাম মেয়েটাকে আধারকার্ড আনতে বলো। আধারকার্ড দেখলে তক্ষুণি ধরা পড়ে যেত।”
বড় ছেলে ভাতঘুম ছেড়ে এসেছে। বিরক্ত। মুখটা ব্যাজার করে বলল, “সব কিছু আমিই করব! তোমাদের গেলার ব্যবস্থা করব, কাজের মেয়ের আধারকার্ড দেখব…. সব আমিই করব! এই মেয়েটা গেলে এক্ষুনি নতুন কাজের লোক কোথায় পাব? তুমি তো আর মাকে দেখবে না!”
এই সব কথার মাঝখানে বুড়ি কখন খাট থেকে নেমে এসেছে কেউ দ্যাখেনি।
বুড়ির গলার আওয়াজে সবাই চমকে দরজার দিকে তাকালো।
বুড়ির এতদিনের যন্ত্রণাক্লিষ্ট করুণ বিষণ্ন মুখে রোগ মুক্তির আভাস। সেই পুরোনো তেজ আর ব্যক্তিত্ব যেন ফিরে পেয়েছে বুড়ি।
ছেলে, ছেলের বউ এবং প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্য করে জোর গলায় বুড়ি বলে উঠল, “এ বাড়ি এখনও আমার। তাই এই বাড়িতে কে থাকবে আর কে থাকবে না…. সেটা আমিই ঠিক করব। আঞ্জুমান আরা বেগমের ব্যবহার, কাজ, রান্না আমার ভালো লেগেছে তাই ও থাকবে। আমি যতদিন থাকব ও ততদিন থাকবে। আয় আঞ্জু… ভেতরে আয়। জানিস আমার গ্রামের নামটা মনে পড়ে গিয়েছে।”
আঞ্জু খুব খুশি হল। বলল “সত্যি?”
আঞ্জু জানে বুড়ি কী অস্থিরভাবে নিজের গ্রামের কথা মনে করার চেষ্টা করত। মনে পড়ত না বলে খুব কষ্ট পেত।
আঞ্জু ঘরে ঢুকে বুড়িকে খাটে বসিয়ে নিজের এঁটো থালা বাটি তুলতে তুলতে বলল “তোমার গ্রামের নামখানা এইবার বলে ফ্যালো দেখি! আমিও একটু শুনি।”
বুড়ির চোখে খুশির ঝিলিক। আঞ্জুর দিকে তাকিয়ে শিশুর মত করে হেসে বলল…. “আলোকদিয়া “।
