rannaghar-chhutir-aayojon

ছুটির আয়োজন

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

 

শিউলি এখন প্রায় বারোমাস-ই ফোটে— তাই শিউলির ঘ্রাণে শরৎ আসছে বা মা দুর্গা আসছেন আর বলা যাবে না। বরঞ্চ খালে বিলে শাপলা এবং পদ্মফুলের ফুটে ওঠার মধ্যে শরতের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়, এইটা বলা যেতে পারে।

পদ্ম এবং শাপলাকলির ঘুম ভাঙিয়ে আমাদের ঘর এবং মনের দোরগোড়ায় এসে পড়ে শরৎ। শরতের আসা মানেই বাঙালির মনের আশা পূর্ণ হওয়ার পালা। অর্থাৎ পুজো এসে গেল। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। শ্রাবণ ভাদ্রের ভারী মেঘ কখন যেন তুলোর মত হালকা হতে শুরু করে!

প্রকৃতি নীল আকাশের গায়ে সাদা মেঘের আঁচড় কেটে চিঠি লেখে। পুজোর চিঠি। ঘরে ফেরার ডাক থাকে সেই চিঠিতে। জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলোকে কিছুদিনের জন্য সরিয়ে রেখে আনন্দে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায় সেই চিঠি। রোদ্দুরের ভাষা পর্যন্ত অন্যরকম হয়ে ওঠে সেই সময়। রোদ্দুরের সেই ভাষা কেউ কেউ বুঝে নেয়। রোজকার জীবনের টানা-হ্যাঁচড়া, গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ…. এসবের থেকে ক’দিন ছুটি পাওয়া যাবে, এই ভাবনাতে কঠিন মনটা নরম হয়ে আসে। কারোর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতে মন আর সায় দেয় না।

এদিকে, প্রকৃতিও আস্তে আস্তে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। গরমের হলকা কমে আসে। বারোমাস শিউলি ফুটলেও শরতে তার আসল সুবাস জানান দেয় এইবার মা সত্যিই আসছেন।

জলভরা পরিষ্কার নদীর জলে আকাশের ছায়া পড়ে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। বদ্ধ জলাশয়ে সাদা,লাল,বেগুনি রঙের শাপলারা ফুটে ওঠে। যে মহিলারা শহরের বাজারে সবজি বিক্রি করেন,তাদের সবজিতে যুক্ত হয় শাপলা। রাশি রাশি শাপলা তুলে এনে বাজারের মধ্যেই সাত সকালে আঁটি বেঁধে রেডি করে রাখেন ক্রেতাদের জন্য। গ্রামে বাস করা মেয়েরা হাঁটুজলে নেমে শাপলা তোলে। কচুরিপানার শিকড়ে আঁকড়ে থাকা কুচো চিংড়ি সংগ্রহ করে কচুর পাতায় মুড়িয়ে ঘরে ফেরে। কলমি ফুল শোভা পায় সেই সব মেয়েদের খোঁপায়।

 

 

শাপলার লতি দিয়ে ভেলা তৈরি ক’রে বেসন আর চালের গুঁড়িতে চুবিয়ে ভেজে খাওয়া হয়। ডাল আর ওই বড়া দিয়ে সব ভাত খাওয়া হয়ে যায়। গ্রামের বধূ শাপলার ফুলগুলো কাচের গেলাসে সাজিয়ে রাখে।

শাপলার রকমারি রান্না চলে বাড়িতে বাড়িতে।শাপলার লতিগুলো ছোট ছোট টুকরো ক’রে কেটে রাখে। কড়াইতে সর্ষের তেল দিয়ে ফোড়নে শুকনো লঙ্কা আর কালোজিরে দেওয়া হয়। তারপর পেঁয়াজকুচি, অল্প রসুন কুচি দিয়ে ভাজা ভাজা ক’রে চিংড়িমাছ দিয়ে দেয়। কাঁচালঙ্কা বাটা এবং শাপলা দিয়ে নাড়াচাড়া ক’রে একচিমটে হলুদ গুঁড়ো ছড়িয়ে কড়াই ঢেকে দেয়। শাপলা খুব তাড়াতাড়ি নরম হয়ে যায়। ঢাকনা খুলে নুন মিষ্টি আর কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিলেই অতি সাধারন অথচ সুস্বাদু পদ তৈরি হয়ে যায়।

পুজো আসা মানে মুসলিম পাড়াতেও শোরগোল পড়ে যাবে। কোনও কোনও বাড়ির সদস্য মণ্ডপ সজ্জার কাজে বেরিয়ে পড়বেন পুজোর দু তিনমাস আগে থেকেই। প্রধান শিল্পীর নির্দেশে তারক, নিমাইদের সঙ্গে মণ্ডপের সূক্ষ্ম কাজে হাত লাগাবে শহীদুল, মোজাম্মেল, আনিসুর। দর্জি পাড়ায় ওস্তাদের হাতের সুন্দর কাজ নিজের ব্লাউজ ও কামিজের ওপরে করিয়ে নেওয়ার জন্য লাইন পড়বে পুজোর বহুদিন আগে থেকে।

আকবরের মা গাছের নারকেলগুলো যত্ন করে চৌকির তলায় রেখে দেবেন। তিনি জানেন লক্ষ্মীপুজোর সময় ব্যানার্জি বাড়িতে ডাক পড়বে তাঁর। নারকেলগুলো শুধু পৌঁছে দিয়ে এলেই হবে না! তাঁকে কুরে দিয়ে আসতে হবে।

পাড়ায় পাড়ায় সাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে ইমিটেশনের গয়না বিক্রি করে জামাল। পুজোর আগে কলকাতা থেকে নতুন ডিজাইনের চুড়ি ,দুল, হার সংগ্রহ করে বিক্রি করতে শুরু করবে। ধারবাকিতে সে মেয়েদের কাছে গয়না বিক্রি করে। পুজোর সময় পাড়ার মেয়ে বৌরা সব ধার শোধ করে দেয়। পুজোর আগে খুব খাটুনি হয় তার। সাইকেলের ওপরে গয়না রাখার খোলা সুটকেসখানা সাবধানে রেখে সাইকেল চালিয়ে দূর দূরান্তের চেনা অচেনা গ্রামের ভেতরে ঢুকে গয়না বিক্রি করা অতটাও সহজ কাজ নয়।

প্রতিবার পুজোর কদিন সে নিজেকে ছুটি দেয়। স্ত্রী বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটায়। সঞ্চয় ভাঙিয়ে কদিন ভালোমন্দ খায়। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরে। সে মনে করে উৎসবে যোগ দেওয়ার অধিকার সবার আছে।

আল্লাহ্, ভগবান, গড একজনাই। আলাদা আলাদা নাম। আমরা বোকা তাই বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বাধাই।

প্রকৃতি তো এমন করে না! প্রকৃতির চোখে বিভাজন নেই। সবার জন্য সমান বাতাস, রোদ্দুর, চাঁদের আলো।

একফালি চাঁদ যেমন খুশির ঈদের বার্তা বয়ে আনে। তেমনি শরতও নিজেকে একটু একটু ক’রে শারদোৎসবের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

 

 

ট্রেনলাইনের ধার দিয়ে হেঁটে কাজে যাওয়ার সময় জবা আশ্চর্য হয়ে গেল। এ পথ দিয়ে রোজই যায় সে। কিন্তু আজ যেন পথের রূপটাই পাল্টে গেছে।

পরপর দুদিন কাজে যায়নি সে। ছেলেটার জ্বর হয়েছিল। পুজোর আগে কামাই করতে চায় না সে। কিন্তু তার উপায় ছিল না। ছেলেটা কিছুতেই তার কোল ছাড়ছিল না। হেলথ সেন্টারের দিদি এসে দেখে ওষুধ দিল। ওষুধ খেতে জ্বর ছেড়ে গেল। কিন্তু মনা তাকে কিছুতেই ছাড়ল না। “থাকো না মা আজ। ডিম আর আলু দিয়ে চাউমিন করে দাও।”

জবার শাশুড়ি রোজকার ডাল, ভাত, মাছের ঝোল রান্না করলেও চাউমিন, রোল, মোমো পারে না। জবা এইসব শৌখিন রান্নাগুলো খুব ভালো পারে। এই জন্য কাজের বাড়ির বৌদি মাঝেমধ্যেই তাকে দিয়ে এইসব বানিয়ে নেয়। কোনও অতিথি এলে বা ঘরোয়া কোনও অনুষ্ঠানে জবা অনেকরকমের স্ন্যাকস্ বানিয়ে দেয়।

সামান্য উপকরণে দারুণ সব পদ বানিয়ে জবা অবাক এবং মুগ্ধ করে দেয় বৌদিকে। যেমন…. চিঁড়ের পাকোড়া। এককাপ চিঁড়ে ভালো করে ধুয়ে ওর মধ্যে ভাঙা চিনেবাদাম, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচালঙ্কা কুচি, নুন, চিনি এবং ময়দা দিয়ে মেখে সাদা তেলে পেঁয়াজির মত করে ভেজে তুললেই হয়ে যায় চিঁড়ের পাকোড়া।

জবার হাতের গন্ধরাজ ভেটকি অসাধারণ হয়। বৌদি ছুটির দিনে এই পদটা জবাকে বানাতে বলে। দাদা কাঁটাওয়ালা মাছ একদম খেতে পারে না। বৌদি নিজে বাজার থেকে মাছ কিনে আনে। বেশিভাগ মাছ আনে কাঁটাবিহীন অথবা অল্প কাঁটার। ভেটকি, পাবদা, আড়, ট্যাংরা, কাজলি, শিঙি, বড় রুই বা কাতলার পেটি।

গন্ধরাজ ভেটকি জবা শিখেছে টিভিতে রান্নার প্রোগ্রাম দেখে। তার শাশুড়ি বলে টিভির রান্নাগুলো নাকি নকল! খেতে একদম ভালো হয় না। যেন কত খেয়েছেন উনি! মনে মনে হেসে ওঠে জবা। টিভিতে যে মেয়েটা রান্না করছিল, সে যেভাবে বলেছিল…. সেভাবেই গন্ধরাজ ভেটকি বানায় জবা।

ভেটকি মাছের পিসগুলোকে ভালো করে ধুয়ে মুছে নুন এবং লেবুর রস মাখিয়ে রাখতে হবে। এরপর একটা পাত্রে আদারসুন কাঁচালঙ্কা বাটা, গন্ধরাজ লেবুর খোসার কুচি, গন্ধরাজ লেবুর রস, গোলমরিচের গুঁড়ো, নুন, ময়দা দিয়ে ওর মধ্যে একটা ডিম ভেঙে দিতে হবে। উপকরণগুলো ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে মাছগুলোকে মিশ্রণের মধ্যে দিয়ে কিছুক্ষণ ম্যারিনেট করে রাখতে হবে। ননস্টিক প্যানে সাদাতেল এবং মাখন ব্রাশ করে মাছগুলোকে এপিঠ ওপিঠ করে ভেজে নিতে হবে।

জবার বড় ভেটকি কেনার সাধ্য নেই। এই রান্নাটা সে একবার নিজের বাড়িতে তেলাপিয়া মাছ দিয়ে করেছিল। ঢং করে বাড়িতে জানিয়ে ছিল “আজ গন্ধরাজ তেলাপিয়া হবে।”

সবাই খুব খুশি হয়েছিল। জবার স্বামী সঞ্জয় খেয়ে বলেছিল…. “আমার অনেক টাকা থাকলে তোর হাতদুটো সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম। বড় বড় হোটেলের রাঁধুনিরা ফেল করবে তোর কাছে।”

ছেলেটা বলেছিল “আবার একদিন কোরো মা এই রান্নাটা।”

বৌদিরা পুজোর সময় ঘুরতে যায়। সেই কটা দিন জবারও ছুটি। জবা ভেবে রেখেছে। পুজোর কদিন অনেক ভালোমন্দ রান্না করবে সে। ভেটকি মাছ কিনবে। খাসির মাংস কিনবে এক কেজি। আর চিকেন তো থাকবেই! মনার বাবা একটা বড় আবাসনে সিকিউরিটির কাজ করে। ছুটি পাবে না হয়ত! তবে কোনো একদিন সন্ধেবেলা ঠিকই তাদের সঙ্গে বেরোবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে খেলার মাঠের সামনে চলে এসেছে বুঝতে পারেনি জবা। এখানেও বড় প্যান্ডেল হয়। মেলা বসে। দু একদিনের মধ্যেই প্যান্ডেল বাঁধার কাজ শুরু হয়ে যাবে। প্রচুর বাঁশ পড়ে রয়েছে। মাঠের চারদিকে ঝোঁপজঙ্গল। মাঝেমাঝে কাশফুলের ঝাড়। সেই রেললাইনের ধার থেকে শুরু হয়েছে। হালকা বাতাসে কাশফুলের বনে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। দুদণ্ড দাঁড়িয়ে দেখলে মনটা ভালো হয়ে যায়। বৌদির জন্য সে কটা কাশফুল নিয়েছে। বৌদি ঘরে সাজিয়ে রাখবে। ছোটখাট কিছু নিয়ে গেলে বৌদি ভীষণ খুশি হয়।

পুজোর সময় বৌদি এক্সট্রা অনেকগুলো টাকা ধরিয়ে দেয় জবার হাতে। তাছাড়া, জবার জন্য শাড়ি, মনার জন্য দামি জামাপ্যান্ট,মনার বাবার জন্য শার্ট… সব কিনে দেয় বৌদি। এই যে দুদিন এল না তাতে সে-ই মরমে মরে আছে। অথচ বৌদিকে ফোন করে সে যখন মনার কথা জানিয়েছিল, তখন বৌদিই তাকে আসতে মানা করেছিল। তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলে জবা।

সোমলতা গতকালই জানতে পেরেছেন এই পুজোয় বাবাই আসবে না। ছুটি নেই। বৌমাও ছুটি পায়নি। বছরের শুরুতে অবশ্য ওরা এসেছিল বাবাকে দেখতে। সোমলতার স্বামীর যখন দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হল। একমাস ছিল। বৌমার বাপের বাড়ি বরানগরে। বৌমার বাবাও অসুস্থ। রোজ বেহালা থেকে বরানগর যাওয়া আসা সম্ভব নয় বলে বৌমা নাতিকে নিয়ে বরানগরে থাকল প্রায় পঁচিশ দিন। নাতিকে সারাক্ষণ কাছে না পেলেও বহুদিন পরে বাবাইকে কাছে পেয়েছিলেন সোমলতা। বাবাইয়ের বাবার জন্য বাড়িতে ডাক্তার,নার্স, ফিজিওথেরাপিস্টের যাতায়াত লেগে থাকলেও…. অনেকটা সময় ছেলের সঙ্গে কথাবার্তা হতো তাঁর। বেশিরভাগই অতীতের কথা। বাবাইয়ের ছোটবেলা,কিশোরবেলার কথা বলতেন তিনি। যেগুলো মনে পড়ত না বাবাই ধরিয়ে দিত। সোমলতা ভেবে অবাক হতেন…বাবাই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাও কী সুন্দরভাবে মনে রেখেছে! হয়ত বিদেশে থাকে বলে স্মৃতির প্রতি এত টান! পাড়ার একটি মেয়ের প্রতি বাবাইয়ের ভালো লাগা ছিল। উচ্চমাধ্যমিকের পরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে বাবাই খড়গপুর চলে গেল। ছুটিতে বাড়ি আসত। তখনই পাড়ার দোলা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বাবাইয়ের। সম্পর্ক গাঢ় হবার সময়েই বাবাই একটা চাকরি পেয়ে দেশের বাইরে চলে গেল। সোমলতা এবং তাঁর স্বামী পীযূষ এটাই তো চেয়েছিলেন! ছেলে বাইরে থাকবে। উজ্জ্বল কেরিয়ার হবে তার। ছেলের জন্য সোমলতাদেরও মুখ উজ্জ্বল হয়েছিল। সবাই উদাহরণ দিত। উজানের মত ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ছেলের গর্বে গর্বিত সোমলতা এবং পীযূষ কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতে গেলে তাঁদের ঘিরে ভিড় জমা হতো। কীভাবে পড়াশোনা করলে উজানের মত কেরিয়ার হবে জানতে চাইত মায়েরা।

 

 

কিন্তু পীযূষের রিটায়ারমেন্টের পরে ছেলের বিদেশে থাকাতে আর আনন্দ অনুভব হতো না সোমলতার। নিয়মিত শারীরিক চেকআপের পরেও স্বস্তি দিত না একটুও। কাজের লোকের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়েছিল। সোমলতার মনে হতো একটা যদি মেয়ে থাকত, খুব ভালো হতো। অনেকে বলে মেয়েরাই নাকি শেষ বয়সে বাপ মায়ের সেবা করে। সঙ্গ দেয়।

বাবাইয়ের সঙ্গে, বৌমার সঙ্গে রোজ ভিডিওকল হয়, টানা কথা হয়, তবুও মন মানতে চায় না। এক্ষুনি তাঁদের কিছু হলে বাবাই তো সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারবে না। নানান চিন্তায় মাঝরাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায় সোমলতার। জেগে উঠে দ্যাখেন পীযূষও জেগে আছে। কে কাকে কিভাবে সান্ত্বনা দেবেন দুজনেই বুঝতে পারেন না। শুধু বুঝতে পারেন আর্থিক নিরাপত্তাই সব নয়। ভালবাসার স্পর্শ খোঁজে মন। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানকে নির্লজ্জের মত কাছে পেতে ইচ্ছে করে। অথচ সবকিছু পীযূষের ইচ্ছেমতই হয়েছে। বাবাই কিসের পর কী পড়বে…. সব পীযূষ ঠিক করে দিয়েছেন।

বাবাই কোনোদিন বাবার মতের বিরুদ্ধে যায়নি। কোনোদিন বলেনি নিজের কী ইচ্ছে! নিজে কী হতে চায়! পীযূষ বা সোমলতা জিজ্ঞেস করেননি কখনও। পীযুষের ইচ্ছে ছিল ছেলে বাইরে সেটল্ করবে। ছেলেকে দেখার সুবাদে তাঁদেরও মাঝেমধ্যে বিদেশ ভ্রমণ হয়ে যাবে। সেটাই হয়েছে।

তাই বৃদ্ধ বয়সে এসে এই একাকিত্ব, এই হাহাকার তাঁদের মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

সোমলতা ভেবেছেন এবারের পুজোয় পীযূষ এবং বাবাইয়ের পছন্দের রান্নাগুলো তিনি নিজের হাতে বানাবেন। তবে রান্না করে যে মেয়েটি, তার সাহায্য লাগবে। সেসব পদ তিনি তাঁর পছন্দের মানুষদের খাওয়াবেন। পেপার দেয় যে ছেলেটি, তার নাম সোমনাথ। সব বাড়িতে পেপার দেওয়া হয়ে গেলে বেলার দিকে কারখানা যাওয়ার আগে একবার ক’রে বেল বাজিয়ে যায়। “কিছু লাগবে মাসিমা?”

একবার ট্রেনের গণ্ডগোলে রান্নার মেয়েটি দুদিন আসতে পারেনি, তখন সোমনাথকে দিয়ে টাটকা সবজি আনিয়েছিলেন সোমলতা। বাবাই শুনে খুব রাগ করেছিল। ফোনের ওপার থেকে রাগ দেখিয়ে বলেছিল, “আমাকে বললেই তো অর্ডার করে দিতাম!”

সোমলতা বলেছিলেন “আমাদের এখানে যখন দিন, তোদের ওখানে রাত। সারাদিনের কাজের শেষে তখন তোরা ঘুমোচ্ছিস!”

সোমলতা যেটা বলতে পারেননি সেটা হল…… সোমনাথ যখন বাজার দিয়ে যায়…. সেই আন্তরিকতা, সোমলতাদের জন্য তার চিন্তা…. এইটা তিনি অনলাইনে পাবেন না।

সোমলতা ঠিক করেছেন সোমনাথকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন। যে আয়াটি পীযূষের দেখাশোনা করে, তাকে আর তার বাচ্চাদেরও বলবেন। রান্নার মাসি তো থাকবেই। তার ছেলে বৌমাদেরও আসতে বলবেন সোমলতা। পাড়ার দু তিনজনকেও বলতে হবে। বাবাই খুব উৎসাহ দেখিয়েছে। মেনু বলে দিয়েছে। চিকেন পোলাও, পটলের দোরমা, কাবাব, মাছের চপ আর মিষ্টি।

বাবাই বলেছে “আমি যেতে পারলাম না। ওরা তৃপ্তি করে খেলেই আমার খাওয়া হবে। আমার জন্য একটু ফেলে খেও।” ভাগ্যিস ঠিক সময়ে ভিডিওকল অফ করেছিল বাবাই। নইলে সোমলতার ভেজা চোখদুটো দেখে ফেলত। বাবাইকে কোনরকম মানসিক কষ্ট দিতে চান না তিনি। যেখানেই থাকুক তাঁর সন্তান, ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক।

চোখের জল মুছে সোমলতা মনেমনে রান্নাগুলো একবার ঝালিয়ে নিলেন।

চিকেন পোলাও

উপকরণ: একবাটি গোবিন্দভোগ চাল, ছোট সাইজের দেশি মুরগি চারভাগ করা, ছোট আলু, সর্ষের তেল, পেঁয়াজ, আদারসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, খানকতক গোটা কাঁচালঙ্কা, (ছোটএলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, জায়ফল, জয়িত্রী একসঙ্গে তাওয়ায় সেঁকে গুঁড়ো করা) গোলমরিচ গুঁড়ো, টক দই, দুধ, নুন, চিনি, তেজপাতা।

প্রণালী: ছোট আলুগুলো সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে রাখুন। এবারে, একটা বড় পাত্রে বেশ খানিকটা সর্ষের তেল দিন। তেল গরম হলে তেজপাতা এবং ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজগুলো তেলে হালকা ব্রাউন করে ওর মধ্যে আদা রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে একটু কষিয়ে ফেটিয়ে রাখা টক দই নুন, গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে নেড়েচেড়ে মাংস দিয়ে দিন। আবার নাড়ুন। গুঁড়ো করে রাখা গরমমশলার গুঁড়ো দিন এক চা চামচ। ঢেকে দিন। মাংস অর্ধেক সেদ্ধ হয়ে এলে ওর মধ্যে ভিজিয়ে রাখা গোবিন্দভোগ চালগুলো দিয়ে একটু নেড়ে সেদ্ধ আলু মিশিয়ে দেড় বাটি দুধমেশানো জল দিন। ঢেকে দিন। ফুটে উঠলে এবং জল শুকিয়ে এলে একটু মিষ্টি,বাকি গরমমশলা গুঁড়ো, আস্ত কাঁচা লঙ্কা ছড়িয়ে পাত্রের ঢাকনা এঁটে নিভু আঁচে দশ মিনিট দমে বসিয়ে রাখুন।

 

 

পটলের দোরমা

উপকরণ: পেটমোটা পটল, ছোট চিংড়ি, পোস্ত বাটা, কাজুবাদাম বাটা, কিসমিস বাটা (সব এক চা চামচ করে), টকদই, চিনি, নুন স্বাদমতো, কুচো পেঁয়াজ ভাজা, পেঁয়াজ বাটা, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, কাঁচালঙ্কা, সর্ষের তেল, একটা নারকেল কুরিয়ে উষ্ণ গরম জল দিয়ে গুলে দুধ বের করে নেওয়া, গোটা গরমমশলা, গরমমশলার গুঁড়ো, তেজপাতা।

প্রণালী: চিংড়ি নুন হলুদ দিয়ে মেখে হালকা করে ভেজে নিন। ঠাণ্ডা হলে হাত দিয়ে চটকে নিন।

পটলের গা চেঁছে মাথাটা কেটে ভালো করে ধুয়ে স্টিলের চামচের পেছন দিয়ে শাঁস, বীজ বের করে নিন। পটলগুলো কড়া আঁচে খুব অল্প সময় ধরে ভেজে তুলে রাখুন। এদিকে পটলের শাঁস, কাঁচালঙ্কা, আদাবাটা, কোরানো নারকেল সব একসঙ্গে সর্ষের তেলে কষিয়ে নিন। ওর মধ্যে চিংড়ি দিন, নুন, হলুদ, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, পেঁয়াজ ভাজা এবং গরম মশলা গুঁড়ো দিয়ে আরও কষিয়ে বেশ মণ্ড টাইপের হয়ে এলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করতে দিন। ঠাণ্ডা হলে পটলের মধ্যে পুর ভরে নিন।

এবার কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে গোটা গরম মশলা এবং তেজপাতা ফোড়ন দিন। তারপর পেঁয়াজ বাটা, পোস্ত বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মিরী লঙ্কার গুঁড়ো, নুন দিয়ে কষিয়ে অল্প চিনি, কাজুবাদাম বাটা, কিসমিস বাটা দিয়ে আবারও ভালো করে কষিয়ে নিন। ফ্যাটানো দই দিন। নেড়েচেড়ে পুর ভরা পটলগুলো আস্তে আস্তে মশলায় ছাড়ুন। মশলা থেকে তেল বেরোলে নারকেলের দুধ দিয়ে ওপর থেকে গরম মশলা ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে কড়াইতে ঢাকনা এঁটে দিন।

 

শিক গোস্ত

উপকরণ: মাটন কিমা ৮০০ গ্রাম, ভাজা পেঁয়াজ বাটা দুই টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা এক টেবিল চামচ, কাঁচা পেঁপে বাটা দেড় চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, এলাচ এবং লবঙ্গের গুঁড়ো ১ চা চামচ, দারচিনি গুঁড়ো ১ চা চামচ, জায়ফল ও জয়িত্রি গুঁড়ো ১ চিমটে, বেসন ২ টেবিল চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, ধনেপাতা কুচি, স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। তারপর শিকে তেল মাখিয়ে মিশ্রণ থেকে কিছুটা করে নিয়ে গোল করে লাগিয়ে তন্দুর আভেনে দিয়ে লালচে রং ধরা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। মাঝে ওপর থেকে ঘি ছড়িয়ে দেবেন।

 

তোপসে মাছের চপ

উপকরণ: তোপসে মাছ, আদা রসুন কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বাটা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, নুন, কর্ন ফ্লাওয়ার, বেসন, লঙ্কার গুঁড়ো, সাদা তেল, আধ চা চামচ কালোজিরে।

প্রণালী: তোপসে মাছগুলোকে পরিষ্কার করার পরে লেবুর রস মাখিয়ে দুতিন বার ভালো করে ধুয়ে নেবেন। তারপর কড়াইতে অল্প তেল গরম করে নুন হলুদ মাখানো তোপসে মাছগুলোকে ভেজে নেবেন ভাজতে ভাজতে দেখবেন মাছ থেকে কাঁটা, মাথা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ওগুলোকে ফেলে দিয়ে মাছে বাটা মশলা এবং গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে কষিয়ে নেবেন। তারপর মিশ্রণটা ঠাণ্ডা হলে ওর থেকে অল্প অল্প নিয়ে চপের আকার দিন এবং চপগুলোতে কর্ন ফ্লাওয়ারের গুঁড়ো মাখিয়ে রেখে দিন।

একটা বাটিতে বেসনের থকথকে গোলা তৈরি করুন। ওর মধ্যে একটু আদা রসুন কাঁচালঙ্কা বাটা দিন। নুন, হলুদগুঁড়ো দিন। কালোজিরে দিন। এবারে মাছের চপগুলো বেসনের গোলায় চুবিয়ে ডিপ তেলে ফ্রাই করে নিন।

 

রসকদম্ব

উপকরণ: কয়েকটা রসগোল্লা, ফুল ক্রিম মিল্ক ১ লিটার, চিনি, সবুজ এলাচের গুঁড়ো, গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়ো ২ চা চামচ, পোস্ত।

প্রণালী: ভালো দোকান থেকে কয়েকটা রসগোল্লা কিনে আনুন। এক কেজি ফুল ক্রিম মিল্ককে জ্বাল দিয়ে ঘন করুন। সবুজ এলাচের গুঁড়ো দিন। অল্প চিনি দিন। নামানোর আগে সুগন্ধী গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়ো দিন। ক্ষীর তৈরি হয়ে গেলে লুচির সাইজের মত গোল গোল গোল্লা পাকান। তারপর বাটির মত বানিয়ে ওর মধ্যে রসগোল্লা ভরে দিন। এবার শুকনো খোলায় পোস্ত সেঁকে নিয়ে ওর ওপরে ক্ষীরে মোড়ানো রসগোল্লাগুলো গড়িয়ে নিলেই রসকদম্ব তৈরি।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *