অদৃষ্টের গন্তব্য
বৈশাখী ঠাকুর
বাঁশি বাজাতে বাজাতে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। বিপাশা “হোয়ের ইস মাই ট্রেন”-এর অ্যাপটা খুলে বসেছিল। এটাই তাঁর গন্তব্যস্থল। গুসকরা স্টেশন। সে ইন্টারনেট অন করেই রেখেছিল কারণ সে জানত এত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে কেউ তাঁর খোঁজ শুরু করবে না। ভদ্রলোক গুসকরা ইস্কুলের শিক্ষক। ভূগোল পড়ান। বৃদ্ধা মা অসুস্থ। তারই দিনরাত দেখাশোনার জন্য লোক দরকার বলে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। পিছুটানহীন মধ্যবয়সী মহিলার খোঁজ করছিলেন। বিজ্ঞাপনটা ভারী মনে ধরেছিল বিপাশার। এমন একটা বাড়ি পেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে থাকবে কোথায় সেই চিন্তা করতে হবে না। একটা বাড়ির ঘেরা নিরাপত্তা। গৃহিণী না থাকার ফলে দাপট দেখানোর লোক কম। নিরাপদ আশ্রয়। মাথার ওপর ছাদ, খাওয়া-পরা সবই জুটে যাবে। এর বেশি আর কি চাই। তাছাড়া বেশ খানিকটা দূরে। চট করে বাড়ির লোকেদের সাথে দেখা সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই। এই তাঁর ভাল।
স্টেশনে নেমে বিপাশা এদিক ওদিক তাকাল। বৃথা খোঁজার চেষ্টা না করে ফোন করল।
দাদা, আমি বিপাশা বলছি। আমি গুসকরা স্টেশনে নেমে গেছি।
আপনি কি গোলাপি রঙের একটা শাড়ি পরে আছেন আর সাদা ব্লাউজ?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনি দেখতে পাচ্ছেন?
পাচ্ছি। আপনি ডানদিকে ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে কৃষ্ণচুড়া গাছটার নীচে চলে আসুন। ওখানে আমি রিক্সা নিয়ে অপেক্ষা করছি। নির্দেশ মত গিয়ে বিপাশা লক্ষ্য করল একটা রিক্সা সত্যিই অপেক্ষা করছে এবং পাশে এক বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা ধূসর রঙের কটকি ফতুয়ার তলায় কালো প্যান্ট। তাঁকে আসতে দেখে রিকশাওয়ালাটাকে ইশারা করলেন তাঁর হাতের স্কাইব্যাগটা নিয়ে নিতে। তারপর তাঁর দিকে হাত জোর করে বললেন,
আমিই অম্লান চৌধুরী। বিপাশা প্রতিনমস্কার জানাল।
আসতে অসুবিধে হয়নি তো! বসার জায়গা পেয়েছিলেন? হাওড়া থেকে নেহাত কম দূরত্ব নয়!
হ্যাঁ, বালি স্টেশন থেকে বসতে পেয়েছিলাম।
নিন, উঠে পড়ুন। মহাদেব আমাদের বাড়ি চেনে। ও আপনাকে পৌঁছে দেবে। আমি বাজারটা ঘুরে যাচ্ছি। আজকের দিনটা ছুটি নিয়েছি। কাল থেকে আবার ইস্কুল যেতে হবে। তাই আজকেই সব কাজ সেরে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেব আপনাকে। বলে ভদ্রলোক সাইকেলে পা দিয়ে অন্যদিকে বেরিয়ে গেলেন। বিপাশার ভদ্রলোককে ভীষণ ভদ্র বলে মনে হল। সৌজন্যমূলক শুধু দেখাই করতে আসেননি, সঙ্গে একটা রিক্সাও এনেছেন এবং ওই একই রিক্সায় বসে যাওয়ার মত অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেননি। মনে মনে অম্লানবাবুকে ধন্যবাদ জানায় বিপাশা। রিক্সা শহরতলির রাস্তা দিয়ে চলেছে। গাছাপালার প্রাচুর্য এখানে অনেক বেশি তাদের এলাকা থেকে। মাঝে মধ্যে দু একটা পুকুর চোখে পড়ল। সেই পুকুরে দু চারজন চান করছে, হাঁস চড়ছে—এমন দৃশ্য নজর কাড়ল বিপাশার। ঠিক যেন ছোটবেলায় টুপাইয়ের আঁকা কোন সিনারির ছবি! মিনিট দশেক রিক্সায় লাগল অম্লানবাবুর বাড়ি পৌঁছতে। ছিমছাম এক তলা বাড়ি। সামনে এক ফালি ফুলের বাগান। দুটো নারকেল গাছ পাহাড়াদারের মত দুদিকে দাঁড়িয়ে। বাগানে একটা কল আছে। সেটা শুধু বাগানে জল দেবার জন্য নয়। বাসন মাজা কাপড় কাচাও হয় তা ওই স্ক্রচ বাইট আর সাবান দেখে বোঝা গেল। বাড়িটায় অনেকদিন রঙ করা হয়নি তাই দেয়ালে দেয়ালে বেশ কিছু জায়গায় শ্যাওলা ধরে গেছে। রিক্সা থেকে বিপাশা নামতে নামতেই মহাদেব তাঁর মাল নিয়ে বারান্দায় গিয়ে রাখল। ভাড়াটা কি করবে— সে দেবে নাকি—! এই সব চিন্তা করতে করতে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, কত হয়েছে ভাই তোমার?
ও আপনি চিন্তা করবেন না। দাদাবাবু আমাকে আগেই দিয়ে দিয়েছে। আপনি ভেতরে যান। কই রে মালতী—তুই আছিস নাকি! গাছ কোমর করে শাড়ি পরা একটা অল্পবয়সী মেয়ে বেরিয়ে এল। এক গাল হেসে তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকতেই একটা ঘড়ঘড়ে গলা শুনতে পেল বিপাশা, কে এসেছে? কে এসেছে মালতী? ইশারায় মালতী বিপাশাকে ডাকল। বিপাশা কাছে যেতেই একটা ডেটল ফিনাইলের গন্ধ নাকে ঝাপটা মারল তাঁর। খেয়াল করল খাটের তলায় বেড প্যান উঁকি মারছে। হাত দিয়ে ধরে ধরে সারা শরীরের একটা আন্দাজ নিতে চাইলেন বৃদ্ধা। তারপর খুব সরু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম তোমার?
বিপাশা।
নদীর নাম। নদীর নামে মেয়েদের জীবনে বড্ড দুঃখ থাকে। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পরে বিপাশার। পরক্ষণেই তাঁর হুঁশ হল এঁকে সেবা শুশ্রূষা করার জন্যেই তাঁকে এখানে ডাকা হয়েছে। তাঁর অবিলম্বে বাইরের জামাকাপড় খুলে পরিষ্কার জামা কাপড় পরে নেওয়া উচিত। তার সাথে ভাল করে হাত-পা ধুয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিতে হবে। মালতীকে সে কথা বলতেই সেও শশব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাঁকে তাঁর ঘর দেখিয়ে দিল।
ছোট এক ফালি ঘর। জানলা ঘেঁসে একটা খাট রয়েছে। একটা দেয়াল আলনা আছে। আর একটা দেয়াল আলমারি। আর একটা ছোট মোড়া দেখতে পেল এক কোণে। একটু অন্ধকার ঘরটা। বেশি আলো হাওয়া ঢোকে না। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করে বিপাশার মনটা ভাল হয়ে গেল। তাঁর ঘরের লাগোয়া নিজস্ব একটা বাথরুম আছে। বাথরুম খুলতেই আবার ডেটল ফিনাইলের গন্ধ। পরিষ্কার ঠিকই কিন্তু যে বিলাসবহুল স্নানাগারে তাঁর রোজ স্নান করা অভ্যাস সেই তুলনায়—- ন্নাহ! এসব ভাবনা বাতুলতা। সে তো সব জেনে শুনে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। নিজের স্কাইব্যাগ থেকে একটা ছাপা সুতির শাড়ি বের করল, তারপর হাত পা ভাল করে ধুয়ে নিজের গামছা দিয়ে মুছে বেরোতে যাবে কি অম্লানবাবু বিপাশার ঘরে টোকা দিয়ে ভেতর ঢুকলেন।
কয়েকটা কথা বলার প্রয়োজন মনে হল বলে এলাম। নাহলে এটা একান্তই আপনার সাম্রাজ্য। এক হচ্ছে সবসময় আপনার টাকা পয়সা সযত্নে রাখবেন। আপনার যে স্কাইব্যাগটা এনেছেন তাতে রেখে তালা দিয়ে রাখলে সবচেয়ে ভাল হয় এবং চাবি অবশ্যই আপনার কাছে রাখবেন সবসময়। দুই, রাতে আপনি মায়ের ঘরে শুলেই ভাল হয়। এক তো রাতে মায়ের কোন অসুবিধে হলে দেখতে পারবেন। আর এই ঘরটা একটু স্যাঁতস্যাঁতে, ড্যাম্প ধরনের। তাতে অযথা সর্দি কাশির শিকার হতে পারেন! সে ক্ষেত্রে সব দিক দিয়েই মায়ের সাথে শোয়াটা ভাল হবে। নীরবে মাথা নাড়ল বিপাশা। ঘড়িতে চোখ রাখল। সাড়ে এগারোটা বাজে। এবার তাঁকে মোবাইলটা সুইচ অফ করতে হবে। সে মোবাইল সুইচ অফ করে, স্কাই ব্যাগে তালা চাবি নিয়ে মাসিমার ঘরের দিকে গেল।
যেতেই অম্লানবাবু বললেন, এখন মায়ের চানের সময়। দেখতেই পাচ্ছেন মা পুরো শয্যাশায়ী। প্রতিদিন সকালে দু চারটে বালিশ পেছনে দিয়ে এরকম হেলান দিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দিই। আগে সকালে উঠে খবরের কাগজ পড়তেন। রাস্তা দিয়ে যারা যেত তাদের সাথে কথা বলতেন। এমনকি সব্জী বিক্রেতাদের সাথে দরদাম করে সব্জিও কিনতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মায়ের স্মৃতিভ্রম হতে লাগল।
অ্যালঝাইমারস বলছেন?
নাকি ডিমেনশিয়া! এমনিতে কোন কাজকর্ম তো করতে হত না মানে পারতেন না তাই অন্য অসুবিধে কিছু ছিল না। কিন্তু এতটাই উনি নিজের কোন পুরনো সময়ের মধ্যে ঢুকে পড়তেন যে বর্তমান সময় সমন্ধে কিছুই খেয়াল থাকত না। আপনাকে বুঝিয়ে বলি। একদিন হয়তো দেখলাম যে আমার দাদার কথা বলছেন।
আপনার দাদা আছেন?
ছিলেন। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে মারা গেছেন। তা আচমকা সেই সময়ের কথা বলতে শুরু করতেন মা। ফলে মা যে টাইমের লুপে পরে গেলেন তখন তো সচল সুস্থ ছিলেন। তাই মাও খাট নেমে কোন কাজ করতে যাবে ভাবছিলেন নাকি বাথরুমে যাবে ভাবছিলেন জানি না—- দু দুবার কোমর ভেঙে খাট থেকে পরে এখন আর বিছানা ছাড়া অন্য কোন জগত বাস্তবে নেই।
এখনও মাঝে মাঝে কি ওই সময়ে ফিরে যান?
বেশির ভাগ সময়ই উনি অতীতে বাস করেন। সেই জন্যেই তো কাউকে খুঁজছিলাম যিনি দিন রাত মায়ের দেখাশোনা করতে পারবেন। আমার রান্না করার লোক আছে। আরেকজন মানে মালতী ঘর মোছে, বাসন মাজে। প্রয়োজনে কাপড়ও কেচে দেয়। অতএব আপনাকে তেমন ভাবে কিচ্ছু করতে হবে না। কেবল মাকে সঙ্গ দিতে হবে।
শুনে মাথা নাড়ল বিপাশা।
আমি বাজার থেকে বক ফুল নিয়ে এসেছি। ভাতের সাথে ডাল, বকফুল আর মাছ ভাজা দিয়ে মায়ের খাওয়া হয়ে যাবে। শেষ পাতে একটু টক দই। টক দই, ডাল, মাছ রোজই পাতে থাকে। আর রান্নার দিদি মানে সরম দি যা রান্না করেন। সকালে বলে দিই। এইটা প্রতিদিন আমার একটা বিরাট হেডেক। এইবার যখন আপনি এসে গেছেন তখন এই দায়িত্বটা আপনি নিলে ভাল হয়। আর এখন মাকে চান করানোর সময় হয়ে গেছে। সরমাদিরও রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। আপনার কোন কিছু ইচ্ছে হলে আপনি সানন্দে সরমাদিকে বলতে পারেন। সরমাদির সাথে আলাপ হয়েছে আপনার?
বিপাশা না বলাতে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেলেন তাঁকে অম্লানবাবু। সরমাদি বেশ হাসি খুশি মধ্য বয়সী এক মহিলা। তাঁর দিকে হেসে বলল, আপনি মাসিমাকে চান করিয়ে দিন। আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি। শুধু মাছটা ভাজলেই হয়ে যাবে। তারপর আমাদের মাছ অল্প ভেজে সর্ষে পোস্ত দিয়ে ঝাল করে নেব।
নতুন দিদির অনারে আজ একটু চাটনি হবে নাকি সরমাদি।
আপনি যে এই বায়না করবেন তা আমি জানি। বাজার থেকে এক কেজি টম্যাটো আনা দেখেই ধরেছিলাম।
বিপাশাকে ততক্ষণে অম্লানবাবু মায়ের তোয়ালে, গামলা, সাবান তেল সব এনে হাজির করে দিয়েছে। চানের ধরনটা ছিল যে তাঁকে প্রথমে বিছানায় বসিয়েই মাথা ধুয়ে দিতে হবে। তারপর মাথা মুছে গা হাত পা স্পঞ্জ করে কাচা পরিষ্কার জামাকাপড় পরিয়ে দিতে হবে। প্রথম দিন এইসব করতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেল বিপাশা। দরদর করে ঘামতে লাগল। তবে মুখে কিছু প্রকাশ করল না। তারপর খাওয়ানো হয়ে গেলে অম্লানবাবু বললেন মাকে একটু বাংলা গান এফ এম চ্যানেলে শুনতে দিলে মা ওটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরেন। তাঁর আগে অবশ্য একটা ওষুধ দিতে হবে খাওয়াদাওয়ার পরে।
নির্দিষ্ট কাজগুলো সেরে শুইয়ে দিলেন সুনেত্রাদেবীকে বিপাশা। ইতিমধ্যে মাসিমা বলে সম্বোধন করলেও ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন দেখে জেনে গেছেন মাসিমার নাম। তারপর রেডিও চালিয়ে দিতেই সত্যি সত্যি তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম থেকে উঠে চা সবার জন্য বিপাশাই বানিয়ে আনল। নিজে জুত করে ভাল করে দুধ, আদা, এলাচ দিয়ে চাটা করল। চায়ে একটা চুমুক দিয়েই নির্মল আনন্দে ভরে গেল মাসিমার মুখ। বাঁ হাতে প্লেটটা ধরে ডান হাত দিয়ে কাপটা মুখের কাছে ধরে খাইয়ে দিচ্ছিল বিপাশা। আচমকা তাঁর বাঁ হাতটা খপ করে ধরলেন মাসিমা। খুব জোর সামলে নিয়েছে বিপাশা। নাহলেই গরম চা পরে আরেক বিপত্তি হত। তাঁর বাঁ হাতের জরুলের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন মাসিমা। তারপর খুব ধীরে ধীরে বললেন, অমুর উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট এত ভালো হয়েছিল যে আমাদের তখন ভীষণ আনন্দ। অমুকে পাড়ায় নেমন্তন্ন করে সবাই খাওয়াচ্ছে। কেউ মিষ্টি নিয়ে আসছে তো কেউ আবার কোন উপহার। একটা উৎসব উৎসব মেজাজ বাড়িতে। তখনই পাশের বাড়ির নীলাবৌদি এসে বলেছিল, তোমার ছেলে মেধাবী ঠিকই কিন্তু নিজে দেখে বিয়ে দিয়ে ঘরে কিন্তু মনের মত বউ আনতে পারবে না।
আমি আশ্চর্য হয়ে মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল।
অমু তো আমার প্রথম সন্তান। ওঁর মুখ থেকেই আমি প্রথম মা ডাক শুনেছিলাম। তাঁর পছন্দের মেয়েকে দেখার জন্য মনটা উতলা হয় উঠল। নীলা বৌদি বলল, ও তো আমাদের প্রিয়ার বান্ধবী, গো। বুধবার দিন সব একসাথে সিনেমা যাবে। আমাদের বাড়িতেই চারজন এসে মিলিত হবে। প্রিয়া, তোমার হবু বৌমা, ঋতপা আর মৌনী। তা আমি গিয়ে আগে থেকে বসে ছিলাম। একে একে সব এল। আমাকে নীলা বৌদি দেখালেন। বেশ সুশ্রী চেহারা। ঢলঢলে মুখখানা। নিজেদের মধ্যে হাসছে, একে অপরের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। হাসিখুশি উচ্ছ্বল এক ঝাঁক পায়রা। ফিরে এসে অমুর বাবাকে বললাম।
অমুর বাবা বলল, এখন থেকেই যেন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করে দিও না। কবে হবে তাঁর ঠিক নেই! ছেলে চাকরিবাকরি পাক তবে তো! আর আজকালকার ছেলেমেয়ে আদৌ হবে কিনা তারই বা গ্যারান্টি কোথায়? কোন দিন অমু দেখা করতে যেত তা ওঁর সাজপোশাক, হাবভাব দেখেই আমি টের পেতাম। একটু হাতে বেশি টাকা গুঁজে দিলে চোখেমুখে সে কি আনন্দের ছটা! তখন আমাদের পাড়াগাঁয়ে গাছপালা, নদীনালা, পুকুর দীঘি সব ছিল। এমন এক ছায়াঘেরা পাড়া, দীঘি, মেয়েবেলার বন্ধুদের নিয়ে সোনালী দিন বিপাশার মনশ্চক্ষেও ভেসে উঠল।
আপনারা আগে এখানে থাকতেন না বুঝি?
না, আমরা নদীয়া জেলায় থাকতাম। বেশ ভেতরের দিকে। বড় আনন্দে দিন কেটেছে তখন।
অম্লানবাবু চায়ের কাপ শেষ করে মায়ের কাছে এসে বসলেন।
অনেকদিন বাদে নিশ্চিন্তে দুপুরে ঘুমোতে পারলাম আর দারুণ এক কাপ চা পান করলাম। প্রতিদিন যদি এরকম চা পাওয়া যেত।
ইশারাটা বুঝতে পেরে বিপাশা বলল, বেশ তো এসময়ের চা প্রতিদিন আমিই করব।
মা কি সেই সময়ের গল্প শুরু করেছে।
তা বললেও, উনি কিন্তু পাস্ট টেন্সেই বলছেন। অতীতকালের কথা ভেবেই বলছেন।
তাই নাকি! এই বোধটা থাকলে তো ভালই। তাঁর হাতটা ধরে অনেকক্ষণ বসেছিলেন মাসিমা। তারপর এক সময় ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন। রাতে বেশি ঝামেলার কিছু ছিল না। টিভিটা খুলে দিলে সেই দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। দুধ রুটি ওই সিরিয়ালের কূ্টকচালির মধ্যেই অবলীলায় খেয়ে নিলেন। রাত দশটার মধ্যেই সব মিটে গেলে ওই ঘরেই সোফায় শুয়ে পড়ল বিপাশা। সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পরেছে জানে না। ঘুম ভাঙল কার একটা ‘মুনু মুনু” ডাকে। বিপাশা ধড়মড় করে “কে, কে” বলে উঠে বসল। এখানে মুনু বলে ডাকার লোক তো কেউ নেই। গতকালই তাঁর কেমন যেন একটা খটকা লাগছিল। নামগুলোও বড় চেনা! তবে কি! চোখ রগড়ে দেখল মাসিমাও জেগে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনিও বোধহয় ওঁর আচরণে অবাক হয়েছেন। মোবাইলটা হাতড়ে দেখল বিপাশা গতকাল যে সুইচ অফ করেছিল তারপর থেকে আর খোলাই হয়নি। কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে সুইচ অন করে দেখল যে কোন মিসড কল আছে কিনা। না দেখে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ন্নাহ! বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর সঠিক ছিল। সে থাকল কি না থাকল তাতে কারুর কিছু যায় আসে না। অবশ্য সে আগেই থানায় গিয়ে জানিয়ে এসেছিল যে সে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছাড়ছে। কেউ থানায় ডাইরি করতে এলে তারা কোন নিরুদ্দেশের কেস যেন ভেবে না বসে! তাতেই হয়তো আরো মেজাজ চড়ে গেছে। এক লহমায় জীবনটা কিভাবে বদলে গেল বিপাশার।
যখন বিয়ে হয়েছিল বিপাশার অভীক বেশ হাই ওয়েট পাত্র ছিল। মাত্র এক মাসের মধ্যে কথা ঠিক হয়ে বিয়ে হয়ে গেছিল বিপাশার, কারণ বিপাশার বাবা মা এত ভাল পাত্র হাতছাড়া করতে চায়নি। পরিবারের এক মাত্র ছেলে, এত ভাল চাকরি করে বহুজাতিক সংস্থায়। কলকাতার ওপর নিজেদের দোতলা বাড়ি, গাড়ি। এক বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্নে তখন সে বিভোর। তাছাড়া অভীক কেবলমাত্র সুউপায়ী নয়, সুদর্শনও ছিল বটে! না করার কোন কারণ খুঁজে পায়নি বিপাশা। বাবা মাও তাদের একমাত্র মেয়ের এরকম একটা বিয়ে দিয়ে ভীষণ খুশি। প্রথম এক বছর নয়, কয়েক মাস যেতেই বুঝেছিল বিপাশা শুধু টাকাপয়সা, নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের মোহে না পরে মানুষটাকে জানা বোধহয় উচিত ছিল।
অভীকের চরিত্র এমন যে তাঁর নামে নালিশ করে সে ঠিক কূলকিনারা পাবে না। মৃদুভাষী, ভদ্র মানে একটু বেশিই ভদ্র আর বিনয়ী আর কি! কোন তাপ উত্তাপ নেই কিছুতেই। কিছুতেই যেন তাঁর কিছু যায় আসে না। বিয়ের দিন দশেক বাদে বিপাশার হাত কেটে গেছিল বটিতে। সে তেমন বাড়িতে কাজকর্ম করতে অভ্যস্ত ছিল না। আইবুড়ো বেলায় খুব কম মেয়েই কাজে পারদর্শী হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সকলে সংসার করতে করতেই শেখে। নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বিপাশা সাহায্য করতে চেয়েছিল শাশুড়িমাকে। উপোসের দিন একটু ফল কেটে দেবে। তাতেই এই বিপত্তি। শাশুড়িমা এবং শ্বশুরমশাই দুজনেই ব্যাস্ত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু অভীকের কোন হেলদোল দেখা যায়নি। নতুন বউয়ের প্রতিই যদি নজর না থাকে তবে পরে কি হবে! তবু নতুন বিয়ের, নতুন শরীরের একটা উন্মাদনা থাকে। যদিও সে যৎসামান্যই ছিল আভীকের ক্ষেত্রে। পাড়ার ফাংশানে বিজয়া সম্মেলনীতে বিপাশা গান গেয়েছিল প্রথম বছর। তাঁর গলায় সুর ছিল। গানের গলাও ভারী মিষ্টি। সারা পাড়া ধন্য ধন্য করেছিল তাঁর গান শুনে কেবল একজন ছাড়া যার প্রশংসার জন্য সে চাতক পাখির মত কাতর হয়ে ছিল। কোন উচ্চবাচ্য করছিল না দেখে নিজেই রাতে বিছানায় শুয়ে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলেছিল, আমার গান কেমন লাগল কিছু বললে না তো! সবাই কত কিছু বলল, তুমি তো একটা কথাও বললে না!
সবার সব কিছু তো বলাই হয়ে গেছে। আমি আর নতুন করে কি বলব। তাই আর কিছু বললাম না।
তারপর সে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। খানিক বাদেই নাক ডাকার আওয়াজ শোনা গেল। সেদিন রাতে নিঃশব্দে বালিশ ভিজিয়েছিল বিপাশা। এরকম কত ঘটনা যে ধীরে ধিরে জমতে থাকল তার ইয়ত্তা নেই। নির্দিষ্ট কলকাতার একটা হোটেলে খাওয়াদাওয়া করার ভারী শখ ছিল বিপাশার।
নিজের স্বামীকে বলবে না তো আর কাকে বলবে? মুখে কিন্তু অভীক না বলেনি। কেবল একদিন রাতে এসে খাবে না জানাল কারণ সেই নির্দিষ্ট হোটেলে সে খেয়ে এসেছিল। মুখটা নিভে গেছিল বিপাশার। বুকের ভেতর একটা কষ্ট মোচর দিয়ে উঠেছিল। অন্য অনেক হোটেলে অভীকের সাথে তার পরে গেছে বিপাশা কিন্তু সেই নির্দিষ্ট হোটেলে কখনও নিয়ে যায়নি। জীবনে একসাথে চলতে চলতে অনেক সময়ই নিজের অনেক শখ আহ্লাদের কথা বলে ফেলেছে বিপাশা। কিন্তু সে দেখেছে সন্তর্পণে সেই সব কিছুকে খুব কৌশলের সাথে পরিত্যাগ করেছে অভীক। কখনও চেষ্টা করেনি তাঁর সেই শখ পূরণ করার। উল্টে একটা অদ্ভুত আনন্দ লাভ করেছে বিপাশাকে বঞ্চিত করে এবং নিজে সেই শখ পুরণ করে এসেছে তা জানান দিয়ে। এই নালিশ নিয়ে সে কার দরজায় যাবে! কেই বা বিশ্বাস করবে ওই ভদ্রলোকের মুখোশ পরা, পাড়ার দরদী পরোপকারী লোকটার আড়ালে কিরকম ঈর্ষাপরায়ণ, সঙ্কীর্ণ এক মানুষ লুকিয়ে আছে। অতঃপর নিজের ইচ্ছেকে অবদমিত রাখতে শিখেছে বিপাশা। অভীককে না বলে কিভাবে তা চরিতার্থ করা যায় তাই নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছে। অতএব অভীক তাঁর মনের মানুষ বা বন্ধু কোনদিনও হয়ে ওঠেনি। বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করেনি। মধ্যযুগীয় স্বামীই হতে চেয়েছিল সে। ফলে দূর থেকে দুরে সরে গেছে তারা। কিন্তু তাঁর বাইরের চেহারা দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। দাম্পত্যের এই লাশ তুলতে বিপাশা আর সত্যিই পারছিল না। কিন্তু টুপাই! টুপাইও কি বাবার কথা এক লহমায় মেনে নিল! মায়ের কথা একবারও মনে পড়ল না। জানতে ইচ্ছে করল না মা কোথায় গেছে। যবে থেকে দীপ্ত এসেছে তার জীবনে তবে থেকে টুপাই বোধহয় দুনিয়ার সবাইকেই ভুলে গেছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠবে উঠবে ভাবছে তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
হ্যালো মা, শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি বল।
তোমাকে গতকাল অনেকবার চেষ্টা করেছি কেবল সুইচড ওফ বলছিল। তুমি কোথায় আছ?
সে আছি এক জায়গায়। নিরাপদেই আছি। চিন্তা করিস না।
আমিও বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। দীপ্তর সাথে লিভ ইন করব। দুজনের অফিসের কাছেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। তুমি যেখানে আছ মা ভাল থেকো। তোমার ব্যাক্তিগত ব্যাপারে আমি নাক গলাতে চাইছি না। তবে প্লিজ ফোনটা অন করে রেখো। আর তুমি চাইলে কিন্তু আমার কাছে আসতেই পারো।
কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে শেষ পর্যন্ত বিপাশা জিজ্ঞাসা করেই ফেলল,
তোর বাবা কিছু বলছিল?
এ ঘর ও ঘর খুঁজল, তারপর আমাকে খুব ক্যাসুয়ালি জিজ্ঞেস করল, তোর মাকে দেখছি না যে!
তাঁর আমি কি জানি। এই বলে আমি খাবার খেয়ে শুতে চলে গেছি।
একটু খাবারগুলো মাইক্রো ওভেনে গরম করে দিলি না!
তুমি না মা পারও। এই যে আমি চলে এসেছি এবার কে করবে?
কাউকে হয়তো নিয়ে আসবে।
তুমি রত্না আন্টির কথা বলছ? সেও বাবার আসল চরিত্র জানতে পারলে মোটেই থাকবে না তা তুমি জানো।
তাঁর সাথে অন্য আচরণ করতেই পারে।
মনে তো হয় না। যার নয়ে হয় না, তাঁর নব্বই-তেও হবে না। তবে সপ্তাহে একদিন করে আমি যাব। কিছু দেখতে শুনতে পেলে তোমায় জানাব।
ঠিক আছে। ভাল থাকিস, সাবধানে থাকিস।
মেয়ের গলাটা শুনে একটু শান্তি পেল বিপাশা। আলিস্যি ঝেড়ে উঠে চা বানাল। সবাইকে দিল।
গত এক মাসে এখন এটাই দস্তুর হয়ে গেছে। অম্লানবাবুর আতিশয্য এবং আন্তরিকতায় সে মুগ্ধ। মনে হয় পছন্দও করেন তাঁকে যেটা প্রতিদিনের চলার জীবনে খুব প্রয়োজন। বিপাশা বোঝে। ভীষণভাবে মানে।
মাসিমাকে অম্লানবাবু সকালের চাটা খাইয়ে দেন। সেই ফাঁকে স্নান সেরে আসে বিপাশা। তাঁর বরাবরই সকালে স্নান করার অভ্যাস। সেদিন বেরিয়ে সে অনুভব করল আজ একটা সাজো সাজো রব বাড়িতে। সরমাও বেশ আগেই চলে এসেছে। ময়দা মাখছে। এদিকে দুধ ফুটছে — মনে হচ্ছে পায়েস হবে। ব্যাপার কি! রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে ভুরু নাচিয়ে সরমাদির থেকে জানতে চাইল বিপাশা।
আজ বড়দার জন্মদিন। মাসিমার ঠিক মনে থাকে। আজ লুচি, সাদা সাদা আলুর তরকারি আর পায়েস হবে জলখাবারে। দুপুরে বাসন্তী পোলাও মাংস, চাটনি। রাতে আলুর পরোটা আর ধনেপাতার চাটনী। রাতের মেনুটা শুনেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল বিপাশার। এ যে তার ভারী প্রিয় খাবার। তাঁর প্রিয় বলেই তো সেও খুব পছন্দ করত! মনের ভেতর একটা খটকা সেদিন যে হয়নি যে তা নয় কিন্তু সেটা যে এইভাবে বাস্তবায়িত হবে তা সে ভাবেনি। মাথায় গামছা জড়ানো অবস্থাতেই বিপাশা মাসিমার ঘরে ঢুকল। সামনে সে টেবিলে রাখা অম্বরদার একটা ছবি দেখতে পেল। তাতে মালা পরানো। সামনে ধুপ জ্বলছে। কিছু মিষ্টি আর জল রাখা। সেই ছবির দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে আছেন মাসিমা। আর অম্বরদা, ওই ঠোঁটের কোনে মিচকি হাসিটার কি মানে! পালাবে ভেবেছিলে, সেই আমার দরজাতেই বাঁচতে এলে তো!
মুখ ঘুরিয়ে সত্যিই ছুটে পালিয়ে এল বিপাশা। নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল। জীবনের এ কোন বাঁকে এসে দাঁড়াল সে! মন উড়ে চলল স্মৃতির আলপথ বেয়ে অনেক পেছনে। পাড়ার সেরা ছেলে ছিল অম্বর। তার একটা ভাই ছিল জানত কিন্তু তখন অত আমল দেয়নি। লেখাপড়া শুধু নয়, আঁকতও বড় ভাল অম্বর চৌধুরী। রাস্তায় যেতে আসতে বিপাশা খেয়াল করেছে অম্বর তাঁর দিকে তাকায়। সেই চোখের দৃষ্টি যে তাঁকে কি আনন্দ দিত একমাত্র সেই জানে। ওই কাঁচা বয়সে কেউ তাঁর মনের নাগাল পেতে চাইছে – তাও আবার পাড়ার সেরা ছেলে অম্বরদা, এটা ভেবেই বিপাশা তখন বেশ গর্ব অনুভব করত। কিন্তু শুধু চোখের দেখায় কি মন ভরে! ন্নাহ! বেশীদিন আর অপেক্ষা করতে হয়নি তাঁকে। তারপর প্রিয়াকে দিয়ে একটা চিঠি পাঠিয়েছিল। পড়ার জন্যে সে ছটফট করছিল কিন্তু পড়বেটা কোথায়! বাড়ি ফিরে বাথরুমে ঢুকে তাঁর জীবনের প্রথম প্রেমপত্র পড়া! সে যে কি এক অদ্ভুত অনুভূতি। গায়ে যখন জল ঢেলেছিল মনে হচ্ছিল যেন আনন্দের হাজারটা সূচ তাঁর শরীরে বিঁধছে। এক অভূতপূর্ব আনন্দে ভর দিয়ে বেশ চলল একটা বছর। ইতিমধ্যে অম্বরদা শিবপুর বি ই-তে চান্স পেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেছে। বিরহে তখন চিঠিই ভরসা। প্রিয়াদের ঠিকানায় চিঠি আসত। আর বিপাশা রাত জেগে জেগে কুড়ি পাতা বা তিরিশ পাতার চিঠি লিখত সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর দিয়ে। চিঠির দেওয়া নেওয়া করতে করতে আরো একটা বছর ঘুরে গেল। বাবা রিটায়ার করলেন। বিপাশারাও অফিসের কোয়াটার ছেড়ে নিজেদের দেশের বাড়িতে চলে এল। তখনও প্রিয়াই দূত। প্রিয়ার কাছে চিঠি আসত। প্রিয়া তারপর পোস্টে তাকে পাঠাত। একটু দেরী হলেও যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তারপর বেশ কিছুদিন অম্বরদার থেকে কোন চিঠি পায়নি বিপাশা। কি যে চিন্তা হত তখন বিপাশার একমাত্র সেই জানে। অন্য কোন বিদূষী সুন্দরীকে হয়তো মনে ধরেছে! চূড়ান্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত। কিন্তু ইতিমধ্যে আর একটি কান্ড ঘটে গেল। এক ভাল পাত্রর সন্ধান পেল তাঁর বাবা মা। বাবা রিটায়ার করে গেছে বলে চাপাচাপিও করা হল তাঁকে। আর অম্বরদার কোন খোঁজখবর না পেয়ে রাগে, অভিমানে সেও বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ল। সে যদি তাঁকে ভুলে থাকতে পারে তাহলে বিপাশাও পারে। পরে অবশ্য শুনেছিল যে অম্বরদার খুব বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তিন মাস হাসপাতালে ছিল। স্টিলের হার লাগাতে হয়েছে। এখন ক্রাচ নিয়ে হাঁটে। তখন আর ফিরে আসার কোন উপায় নেই বিপাশার। তারপর তো বয়ে গেছে কত জল। অসুখী দাম্পত্যে অম্বরদার কথা ভেবে কত চোখের জলই না ফেলেছে সে! তাকে একবার চোখের দেখা দেখার জন্য মন এক এক সময় কি আকূলই না হয়েছে!
কই জলখাবার রেডি, চলে আসুন দিদি। সরমাদি হাঁক দিল। টেবিলে লুচি সাদা তরকারি আর এক বাটি পায়েস সবার সাথে তাকেও দেওয়া হয়েছে। গলা দিয়ে সে নামাতে পারছিল না। অব্যক্ত এক কষ্ট তাঁর গলায় দলা পাকিয়ে ছিল। কি করে অম্বরদার মৃত্যু হল তা জানার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে বিপাশার। কোন মতে দুটো খেয়ে সে উঠে মাসিমার ঘরে গেল। দেখল মাসিমা ঝিমোচ্ছেন। সবার অলক্ষ্যে ফোটোটায় হাত বোলালো। এটা তো সেই বয়সেরই ছবি। তবে কি অম্বরদার খুব বেশি দিন আর বাঁচেনি।
মুনু। মেয়েটার নাম মুনু ছিল। অমু আমার তাঁকে খুব ভালবাসত। মেয়েটার কথা খুব বলত আমায়। মুনুরা পাড়া ছেড়ে চলে যাবার পর এমন শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াত, আমিই অকে তখন বলেছিলাম প্রিয়ার মারফত চিঠি চাপাটি চালাতে থাক। চাকরি পেলে একেবারে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখবি। ওই তো গাড়ির আওয়াজ হল। ওই অমু এসেছে মুনুকে নিয়ে। যা যা শিগগিরি যা সব।
বুকটা যেন ভেঙে গেল বিপাশার। কখন যে আবার জেগে গেছেন সুনেত্রাদেবী খেয়াল করেনি বিপাশা। ততক্ষনে অম্লানবাবু ঘরে এসে ঢুকেছেন। কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে বিপাশা জিজ্ঞেস করল, ওঁর কি হয়েছিল?
দাদা সুইসাইড করেছিল। মুনু যে মেয়ের কথা মা বলছে তাঁর বিয়ের খবর শোনার চার মাসের মাথায় দাদা কলেজের হোস্টেলের ফ্যান থেকে ঝুলে পরে। এমন একটা কিছুর জন্য বিপাশা সত্যি প্রস্তুত ছিল না। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে উঠে গিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে উদ্যত হল। যেতে যেতে সে শুনতে পাচ্ছিল, ওই তো মুনু! ও অমু ওই তো মুনু। যা ওকে নিয়ে আয়। যা তাড়াতাড়ি গিয়ে নিয়ে আয়। ওঁর হাতের জরুল দেখে আমি ঠিক চিনতে পেরেছি ও আমাদের সেই মুনু।
ঘরের চৌকাঠে পা-টা আটকে গেল বিপাশার। হতবাক হয়ে সে পেছনে তাকাল। অম্লানবাবু খুব নীচু স্বরে তখন বললেন, আমিও তো অমু। ছোট অমু। জীবনে অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে যখন আবার মুনুর আগমন এই বাড়িতেই হয়েছে তাহলে না হয় ছোট অমুর হয়ে মুনু চিরতরে এই বাড়িতেই থেকে যাক।
এই মধ্যবয়সেও বিপাশার বুকে রক্ত চলকে উঠল। মুখে একটা রাঙা আভা ছড়িয়ে গেল। বুকে বেজে উঠল—দিম দিম দ্রিমি।
