short-story-amiyer-trishna

অমিয়ের তৃষ্ণা

জয়ন্ত দে

আমার সঙ্গে খুব খারাপ জীবন কাটালে, না?

অমিয় শুয়েছিলেন তৃষ্ণার উলটো দিকে। তৃষ্ণা চুপ করে শুয়ে আছে। মাথার নীচের বালিশটা এক পাশে সরে গেছে। ইচ্ছে করলে সে নিজেই মাথাটা সরিয়ে বালিশে অথবা বালিশটা মাথার নীচে ঠিকমত রাখতে পারে। কিন্তু সে এভাবেই শুয়ে আছে। যেন তার শোয়ার ভেতর, মাথাকে অবজ্ঞা করে বালিশের সরে যাওয়ার ভেতর একটা বিষণ্ণতার বোধ আছে। তৃষ্ণা এমন ছিল না। এখন এমন হয়ে গেছে। দিনে দিনে এমন হয়নি, মাসে মাসে বা বছরে বছরেও এমন হয়নি, রোগে ভুগে, শোকে তাপেও এমন হয়নি। হয়েছে অবজ্ঞায়, অবহেলায়, দাম্পত্যের বঞ্চনায়। আর সেটা অমিয় জানে।

জানে মানে এতদিন পরে জেনেছে। আগে জানত না। জানত না মানে জানার চেষ্টা করত না, জানার কোনও প্রেক্ষিতও তৈরি হতো না। সে রকম কোনও প্রেক্ষিত তৈরি হলে অমিয় চুরমার করে বেরিয়ে যেতেন।

তৃষ্ণার এই বালিশ বেঁকে যাওয়া মুখটা কেমন যেন বিসদৃশ লাগছে। দেওয়ালের ফোটোফ্রেম বেঁকে ঝুলে থাকলে এমন লাগে। ঠিক করে দিতে হয়। যতটা পারা যায়। বেঁকে যাওয়ার আগে যতটা পারা যায় ততটা সোজা করে রাখা যায়। অনেক সময় হয় না। ফ্রেমে বাঁধা দড়ি কিংবা ঝোলানোর মাপে গোলমাল থাকে যখন শত চেষ্টা করলেও ঠিক হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে হবে, ঠিক করা যাবে। অমিয় না পারলেও তৃষ্ণা ঠিক করে নেবে।

অমিয় ভাবছিল তৃষ্ণার মাথাটা কি ঠিক করে বালিশের ওপর রাখবে। নাকি বালিশটা ঠেলে ওর মাথার নীচে ঢুকিয়ে দেবে। সে হাত বাড়িয়ে দিল যেন, তার বাড়ানো হাত তৃষ্ণার মাথা আর বালিশ ছুঁয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকল। আগে কোনওদিন সে এমন দেখেনি। দেখতেও চায়নি।

তাদের বিবাহিত জীবন প্রায় তিপান্ন বছর। প্রায় কেন, তিপান্নই। তিপান্না বছর সাত মাস সতেরো দিন। আগে আগে তার বছরের হিসেবই ভুল হতো, মাস দিন তো দূরের কথা। তখন তৃষ্ণা কোন বছর বিয়ে হয়েছিল মনে করিয়ে দিত। অমিয় বলত, শীতকাল।

এখন কোনওকিছুই মনে করাতে হয় না, সব মনে আছে। গত চার বছর। সব কিছু মনে আছে। আর নতুন কথা নয়, সব পুরনো কথা।

তার তখন আঠাশ। একটু বেশি বয়েসেই বিয়ে করেছিল। সে সময় আঠাশ বেশ বেশি বয়েস। তৃষ্ণার তখন কুড়ি। এখন তিয়াত্তর। তার একাশি। ইশ কতগুলো বছর অমিয় আইনের প্যাঁচে প্যাঁচে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ছিল।

নামী ল’ইয়ার অমিয় সেন। খুব নামী। কতটা নামী তা ক্রিমিনালরা জানে, পুলিশ জানে। ক্রিমিনালরা এসে তাঁর পায়ে পড়ে। সব অপরাধ তিনি ধুয়ে মুছে সাফ করে দেন। অপরাধীদের মুক্ত করেন, আর বিড়বিড় করেন, ‘এই মান্ধাতার আইন দিয়ে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যায় না, যাবে না।’ কখনও বলেন, ‘আমি কী করব। টপ টু বটম কোরাপটেড। পুলিশ আগেভাগে টাকা খেয়ে যা চার্জশিট বানিয়ে রেখেছে, আমি না হলে অন্য যে কোনও ভাল ল’ইয়ার এই কাজটা করে দিত।’ কখনও বলেন, ‘আমার প্রফেশন। আমি ক্লায়েন্টের হয়ে কাজ করি।’

জাস্টিফাই! আর কিছু না। ফার্স্ট জেনারেশন ল’ইয়ার বলে কাঁটা খচখচ করে। তিনপুরুষ পেরিয়ে এলে, এসব ব্রণর মতো কাঁটা ফোটা বিবেক ঘষে রগড়ে গর্বিত হয়ে ফুটে উঠত।

অপরাধীরা তাঁর জন্য ইলিশ মাছ পাঠায়। তিনি রান্নাঘরে পাঠিয়ে দেন। মিষ্টি পাঠালে বিলিয়ে দেন। মদ পাঠালে সেলারে রাখেন। বন্ধু বান্ধব এলে, অকাতরে খুলে দেন।

তিনি পুলিশকে শুভেচ্ছা পাঠান। তাদের যখন যা দরকার হয়। ঠিক টাকা পয়সা নয়। সোর্স দেন। তারা ঝামেলায় পড়লে আড়াল করেন। সাপোর্ট দেন। অনেক সময় পোস্টিং-এর সাপোর্ট। তাদের ছেলেমেয়েদের ভর্তির সুযোগসুবিধা। হাসপাতালের বিল কমিয়ে দেওয়া।

প্রথম জীবনে যত রোজগার করেছেন, বাড়ি সারাতে ঢেলে দিয়েছেন। তারপর তৃষ্ণার জন্য গয়না কিনেছেন।

অথচ একদিন সেই গয়না প্রসঙ্গে তৃষ্ণা বললেন, ‘তুমি আমার জন্য গয়না কিনেছ? আমার জন্য তুমি সোনা কিনেছ? আসলে সোনার থান ইট না বানিয়ে আমার গয়নার নাম দিয়ে আমার গায়ে চাপিয়েছ।’

অমিয় সেন হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘উকিলের বউ!’

তৃষ্ণাও বিষণ্ণ হাসি হেসেছিলেন। বুঝেছিলেন, তাঁর স্বামী তাঁর কথার মর্ম বুঝতে পারেননি। শুধু যুক্তি বুঝেছেন।

এর আগে তৃষ্ণার শাশুড়িও হয়তো এমন কথা বলেছিলেন। যেটা অমিয় বুঝতে পারেননি। তৃষ্ণা বুঝেছিলেন। বার বার বলার চেষ্টা করেছিলেন। শোনেননি অমিয় সেন।

সুনন্দা তখন বেশ অসুস্থ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে বাড়িতে শ্বেত পাথর বসানোর কাজ হচ্ছে, মার্বেল গ্রানাইটে সারা বাড়ি মুড়ে ফেলা হচ্ছে। সারাদিন লোকজন, মিস্ত্রি মজুর আসা যাওয়া, কাজকর্ম, হইচই চলছে তো চলছে। মার্বেল কাটার তীব্র আওয়াজ যেন বধির করে দিচ্ছিল। সুনন্দা একদিন তৃষ্ণাকে ক্লান্ত গলায় বলেছিলেন— ‘এত মার্বেল বসিয়ে কী হবে? বাবু কি এই বাড়িকে রাজপ্রাসাদ বানাতে চাইছে?’

‘আপনার ছেলে তো তাই চায়, মা।’

‘অন্য কোথাও বড় জমি কিনে সেখানে করতে পারত। এই তিন কাঠা জায়গায় বাড়ি বাগান ওর বাবা বড় কষ্টে বানিয়েছিল। এর বুকে এত পাথর চাপাচ্ছে কেন!’

সুনন্দা যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন শ্বাস নিতে পারছিলেন না। যেন বুকের ওপর পাথর চেপেছে। সেটা তৃষ্ণা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুভব শত চেষ্টা করেও প্রকাশ করতে পারলেন না, হয়তো। সেই অনুভবের কোনও রেশই অমিয় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলেন না।

রাতে খাবার সময় আইনের বইয়ে মুখ গোঁজা অমিয়কে বলেছিলেন তৃষ্ণা। ‘শোনো, এই বাড়ির পাথরের কাজ কবে শেষ হবে?’

‘কেন?’

‘তুমি তো বাড়ি থাকো না, তুমি জানতে পারো না। মার্বেল কাটার কী ভয়ঙ্কর আওয়াজ।’

‘কানে তুলো গুঁজে রাখো।’

‘আমার অসুবিধে হচ্ছে। কিন্তু মায়ের কষ্ট হচ্ছে।’

‘মার্বেলের কাজ কতদিন হচ্ছে, বড়জোর মাস দুয়েক। আওয়াজ তো হবেই। মা এই দোতলা বাড়ি রোজ ঝাঁট দিত, মুছত। যখন আমরা ন মাস করে করে মায়ের পেটে ছিলাম, তখনও এই কাজটা করেছে। পরের দিকেও আঃ উঃ করত, আর ঝাঁট দিত। সেই কষ্ট মা সহ্য করে এসেছে। তিন তিনটে সন্তান। মোট সাতাশ মাস। কোনওদিন বাবাকে একটা কথাও বলেনি। এখন মাত্র মাস দুয়েকের কষ্ট সহ্য করতে পারছে না, তোমাকে নালিশ করছে।’

‘নালিশ করছে না, কষ্ট পাচ্ছে। চারদিকে এত মার্বেল বসানোর কী দরকার?’

‘দরকার আছে।’

দরকার আছে শুনে চলে যাচ্ছিলেন তৃষ্ণা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তোমার যুক্তিতে ফাঁক আছে— তোমার বাবা রিটেয়ারমেন্টের টাকায় পুরনো বাড়ি থেকে এই নতুন বাড়ি করেছিলেন। সাতাশ মাসের তত্ত্বটা ভুল।’

অমিয় সেন হেসেছিলেন, ‘উকিলের বউ।’

উকিলের বউ বলে প্রসঙ্গটা তিনি হালকা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জমি তো আর টেনে বড় করতে পারব না। বাড়িটাকে সুন্দর করি।’

তাঁর গলায় চাপা অহংকার। তিনি ক্রিমিনাল ল’ইয়ার অমিয় সেন। পুরনো দিন হলে এভাবে বলা হতো, অমিয় সেন যার নামে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়।

অমিয় সেন তখন দাঁত চেপে, ফার্স্ট জেনারেশন ল’ইয়ার— কিছু হয় না, আমি দেখিয়ে দেব। প্রথম গাড়ি, তারপর বাড়ি। তারপর সোনা। তারপর বাগানবাড়ি। রোববার সকালে বাড়িতে চেম্বার। অন্যদিনগুলো কোর্ট ফেরত হয়ে বাড়ি ঘুরে স্টেশন রোডের চেম্বার। চারদিকে জুনিয়ারের মেলা। অল্প বয়েসি ছেলে মেয়ে। তারা সব অমিয় সেনের কথায় পুতুলের মতো নড়ছে চড়ছে। অপনেন্টের ফাঁক ফোকর খুঁজছে। কম্পিউটারে সব মগ্ন।

তৃষ্ণার বাড়ি আর বাড়ি। সোনার খাঁচা! শ্বেত পাথরের সমাধি! অমিয় এই বাড়ির বড়ছেলে। তার পর এক বোন, এক ভাই। তারা কেউ এই বাড়ির ভাগ পায়নি। ভাই চেয়েছিল, অমিয় দেয়নি। টাকা দিয়ে মিটিয়ে নিয়েছে। এ বাড়ি তার একার। বাড়ির সঙ্গে তার মানসম্মান জড়িয়ে।

তৃষ্ণার কোনও কোনও সময় মনে হয়, অমিয় তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হতে চেয়েছিল। পরের দুজন যেন অপ্রাসঙ্গিক, অহেতুক।

কী আশ্চর্য! একদিন পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘একটার বেশি কী আর দরকার ছিল?’

ওদের একমাত্র মেয়ে। সেই মেয়ে কয়েক যুগ আগে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, সে বাবার লাইনে আসবে না। সে মাসকম করে তখন মুম্বইয়ে পড়ে আছে। স্ট্রাগলার। স্ট্রাগল করছিল। ব্রেকের অপেক্ষায়। ব্রেক পেয়ে সে-ও তার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। এখন তো খুবই ব্যস্ত। রোজ না পারলেও ফোন করে বাবার খবর নেয়।

সেই বাড়ি পর্বে একদিন সুনন্দা বলেছিলেন, ‘এত কী ঘষছে?’

শাশুড়িকে তৃষ্ণা বলেছিল, ‘মার্বেল বসালেই হয় না মা, ঘষতে হয়, ঘষে ঘষে চকচকে করতে হয়।’

‘এত ঘষছে! বাবু কি বাড়িঘর সব মুক্তো বানাবে!’

অমিয় সেনকে তৃষ্ণা বলেছিলেন, ‘এত ঘষার কী কী আছে, কী বিশ্রী আওয়াজ। সারাদিন ঘরঘর ঘরঘর। বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করে।’

অমিয় সেন একটা জরুরি ব্রিফ থেকে মাথা না তুলে বলেছিলেন, ‘আর আয়না লাগবে না। মার্বেলেই মুখ দেখে নেবে।’

ক’দিন পরে তৃষ্ণা মুখ দেখেছিলেন, তাঁর কপালের রগের পাশে গুচ্ছ পাকা চুল। কবে এত চুল পাকল, টের পেলেন না! কত দিন চলে গেল, কত মাস, কত বছর, টের পেলেন না।

অমিয় সেন ভেবেছিলেন, পঞ্চাশ বছরের বিবাহ বার্ষিকী করবেন। সবাইকে ডাকবেন। সবাই।

শুনেও কোনও উত্তর দেননি তৃষ্ণা। তাঁকে নিরুত্তর দেখে অমিয় সেন বলেছিলেন, ‘উকিলের বউ কথা বলছে কেন? খুশি!’

তৃষ্ণার কাছে পঞ্চাশ বছরই তো অহেতুক লাগে। আগে আগে বছরে দু বার বেড়াতে যাওয়া নিয়ে খুব আনন্দ লাগত। কিন্তু শেষ কটা বছর ধরে বেড়ানোর দল বদলে গেছে, এখন এত জজ ব্যারিস্টার সঙ্গে চলে, প্রাণ পায় না তৃষ্ণা। জুনিয়ারদের পিকনিকটা বরং অনেক ভালো। বেশ ভালো। এই একটা দিন যেন কাজহীন থাকেন অমিয় সেন।

অমিয় সেন কাজ করেন। কাজে ডুবে থাকেন। তিনি এক জেনারেশনে যেন তিন জেনারেশনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফার্স্ট জেনারেশন ল— বলে যারা কপাল কুঁচকে ছিল, তাদের তিনি দেখিয়ে দিতে চান।

পেরেছেন। নিশ্চয়ই পেরেছেন। তিনি শুধু কোর্টে নয় চারদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। খবরের কাগজে তিনি আছেন। টিভির বক্তা হয়ে তিনি আছেন। তাঁর চেম্বারে মক্কেলের ভিড়। জুনিয়াররা আছেন। তাঁদের এগিয়ে দেন। তিনি স্যার। তিনি যেন পিতা। শুধু নিজের মেয়েটাকে শত চেষ্টা করে বুঝিয়েও এই লাইনে আনতে পারলেন না। সে স্ট্রাগলার।

অমিয় সেন জানে স্ট্রাগল কী ভীষণ বস্তু। তাঁর সিনিয়ার বসুদেব ঘোষের বিখ্যাত ডায়লগ ছিল— মাগুর মাছের ঝোল-ভাত খেয়ে, বউকে জড়িয়ে শুয়ে থাকার ইচ্ছে হলে ওকালতি প্র্যাকটিশ করতে এসো না বাবা। এ কঠিন পথ। তারপর তুমি ফার্স্ট জেনারেশন!

সেই কঠিন পথকে অমিয় সেন রাজপথ বানিয়ে ফেলেছেন। এটা ঘটনা। তিনি আশপাশের সব ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আশপাশে সব স্কুলের কর্ম সমিতিতে ছিলেন। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলে ঢোকেননি। ইচ্ছে করলে অনেক দলই তাঁকে টিকিট দিত। তিনি হাসেন, কিং হওয়ার থেকে কিংমেকার হওয়ার ভালো।

তিনি কি কিংমেকার? একদম নয়। কিন্তু যারা কিং মেকিং করে, আসলে ভোট মেকিং করে, সেইসব সমাজবিরোধীরা জানে, তাদের জন্য অমিয় সেন আছেন। প্রোটেকশন!

তিনি বটবৃক্ষ! তিনি ঢাল! তিনি বর্ষাতি! তিনি কন্ডোম!

কিন্তু তৃষ্ণার কাছে? তিনি—?

তৃষ্ণার জীবনে একটা সময় পর্যন্ত শাশুড়ি সুনন্দা ছিলেন। তারপর কালের নিয়মে তিনি চলে গেলেন। একটা সময় পর্যন্ত তাঁর কাছে, তৃষ্ণার কাছে তৃষ্ণার জলের মতো কন্যা ছিল। সময়ের নিয়মে সে-ও দূরে। অমিয় কি কোনওদিন ছিলেন। ছিলেন, ছিলেন। তবে তা লাইট হাউসের মতো।

আর এখন পরিত্যক্ত। চার বছর আগে ভোর রাতে তাঁর স্ট্রোক হয়েছিল। একদিক পড়ে গেছে। সব হুঁশ আছে। কিন্তু বিছানায়। তৃষ্ণা এই বিশাল বাড়িটায় কাজের লোক নার্স আয়া ডাক্তার প্যাথলজিস্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তিনি আরও শক্ত হয়েছেন। শুয়ে শুয়ে অমিয় সেন সব দেখেন। কোনও কথা নেই মুখে। স্তব্ধ। শুধু চোখ ঘোরে। বাঁ পা অল্প বিস্তর কাঁপে। প্রায় প্রতি রবিবার সন্ধেবেলা জুনিয়ারদের কেউ না কেউ আসে। পালা করে, ফোন করে তৃষ্ণা তাদের আনায়। তারা কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যায়। তারা আসা মানেই, আজ রবিবার, অমিয় সেন বোঝেন। উলটো দিকে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে যায়। তৃষ্ণা দুপুরে নিজের খাওয়া শেষ করে এই ঘরে এসে শুয়ে থাকেন, মুখোমুখি। কী অদ্ভুত স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

অমিয় সেন তাঁকে প্রশ্ন করেন—

আমার সঙ্গে খুব খারাপ জীবন কাটালে, না?

তৃষ্ণা অমিয় সেনের কথা শুনতে পান, কিন্তু উত্তর দেন না। তিনি স্থির। অনেক অনেক লড়াই করে যেভাবেই হোক তিনি অমিয় সেনকে বহু বহু বছর বাঁচিয়ে রাখতে চান। তৃষ্ণা এখন এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন, যেন ওঁর দু’চোখে কালো কাপড় বাঁধা, হাতে দাঁড়িপাল্লা।     

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *