short-story-atolanter-aaloandhari

অতলান্তের আলো-আঁধারি

অনীশ মুখোপাধ্যায়

তুই কত রোগা হয়ে গেছিস রে! খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস নাকি! সাম্যকে জিজ্ঞেস করে তার বন্ধু অতলান্ত। ওরা এখন বসে আছে নিউ-টাউনের এক অভিজাত কফি-শপে। সাম্য হেসে বলে, আর বলিস না! উপমা পেছনে লেগে থেকে থেকে ছ’মাসে দশ কেজি কমিয়েই ছাড়ল!

দশ কেজি! গুরু, ফাটাফাটি! তা এক পিস বিড়ি খাবি তো? অতলান্ত কিং-সাইজ সিগারেটের প্যাকেট বের করে জানতে চাইল।

সাম্য সামান্য দ্বিধান্বিত দৃষ্টি হেনে চারপাশে তাকিয়ে বলে, এখানে তো হবে না! বাইরে বেরিয়ে…। আমি অবশ্য প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।

উপমার আর্তিতে?

উঁহু! কোভিডের ইম্প্যাক্ট।

বেশ করেছিস। আমিই শালা পারলাম না।

সাম্য জিজ্ঞেস করে, তুই এবারে কতদিন আছিস?

অতলান্ত একটুখানি থেমে, কিছু একটা ভেবে বলল, সেটা ওপেন রেখেছি। আই মিন, একটা টিকিট কাটা আছে। তবে সেটা রি-শিডিউল করতে হতে পারে, ভেবেই কেটেছিলাম।

সেটা কেন?  

ফ্যামিলি ইস্যু আছে অনেককটা। যতখানি সম্ভব সেগুলো মিটিয়ে ফিরতে পারলে ভাল  হয়। পার্টিকুলারলি, শাশুড়ি মাকে নিয়ে একটু টেনশন আছে। আমাদের বারুইপুরের বাড়িটা নিয়ে কিছু প্ল্যান হয়েছিল। ডোন্ট নো, হাউ ফার উই ক্যান প্রসিড নাউ।   

কফির কাপে দু’জনেই চুমুক দিয়ে আধ মিনিট কাটাবার পরে অতলান্ত বলল, তোর কী প্ল্যান? কতদিন আছিস?

আমার তো ভাই সবই একেবারে টাইট। যাওয়া-আসা বাদে আঠারো দিন। তার মধ্যে সাতদিন চলে গেল!

দুঃখ পাচ্ছিস? চল বাইরে গিয়ে বিড়ি ফুঁকে আসি।

সাম্য উঠতে উঠতে বলল, চল!

বাইরে মানে কফি-শপ থেকে একটু এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। সেখানে এসে ওরা দাঁড়াল।  

সিগারেট ধরাবার পরে সাম্যর মাথাটা সামান্য টাল খাচ্ছে। কতদিন পরে…

উপমা জানলে দুঃখ পাবে। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালীন এক বিকেলে তাকে কথা দিয়েছে সাম্য—সিগারেট খাবে না। মদটা একদম মেপে খাবে। মেয়ে বড় হচ্ছে। তার ওপরে সাম্যর আছে লং-কোভিড ইম্প্যাক্ট! বুকে ঝামেলা আছে। সিওপিডি হলে আর দেখতে হবে না। সাম্য তারপর থেকে ভীষণ নিয়ম মেনে চলে। সপ্তাহান্তে দু’পেগ স্কচ খায়। কিন্তু সেটা একদিন। আর পনেরো দিনে একবার। এর বেশি হলে উপমা খেপে যায়। অতলান্তর চেহারায় বেশ যেন অনিয়ম আর অত্যাচারের ছাপ পেল সাম্য।  

অতলান্ত বলল, দুঃখ পাস না সাম্য। আমাদের মতো এনআরবি’দের আর খুব বেশিদিন কলকাতায় আসার দরকার পড়বে না। বাবা-মা আর শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি যে বেসিক দায়িত্ব-কর্তব্যের জায়গাটা ছিল, সেটাই কমে আসছে। ক্লোজ ফ্রেণ্ডস অ্যাণ্ড রিলেটিভস—প্রায় সবাই চলে যাচ্ছেন। জমাট আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়ার যে গেট-টুগেদার নিয়ে ফ্লাইটে ওঠার ছ’মাস আগে থেকে প্ল্যান করতাম, সবই কমে আসছে।

হেসে ফেলল দু’জনেই।

আর এই নতুন যা-সব নিয়ম আসছে, দু’দিন বাদে ইউএস থেকে ইণ্ডিয়ায় আসাই না বন্ধ হয়ে যায়।তুই-আমি তা-ও এসেছি। ভাস্বর, দেবজ্যোতিরা তো লাস্ট দু’বছর আসতেই পারেনি। এর থেকে ইউরোপে চাকরি করলে ভাল থাকা যেত। আমি তো কোম্পানি চেঞ্জ করে আটলান্টায় গিয়ে ছ’মাস স্ট্রেইট ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম।   

অতলান্ত বকবক করেই চলেছে। বরাবরই সে বেশি কথা বলত। কলেজের দিনগুলোর কথা মনে আছে সাম্যর। উল্টোদিকে সাম্য বরাবরই ধীর-স্থির মিতবাক চরিত্রের মানুষ। উপমাকে প্রোপোজ করার আগে তাই নিয়ে এক বছর ধরে ভেবেছিল। শেষে বন্ধুরাই ওর হয়ে প্রাথমিক উদ্যোগটা নেয়।   

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে দু’জনে কফি-শপে ফিরে এসে বসার পরে অতলান্ত বলে, এভাবে আড্ডাটা ঠিক জমল না,বুঝলি!তোর তো হাতে সময় কম!তার মধ্যে একদিন যদি বের করতে পারিস, তাহলে চল না,কোথাও একটু… চোখটা টিপে ইশারা করে অতলান্ত।

সাম্য হেসে বলে, গ্লাস নিয়ে…?

হ্যাঁ, গুরু! তুই, আমি আর কুহু মানে আমাদের কুশল! মনে আছে তো? কুশল হোড়?

সাম্য বলল, অফ-কোর্স মনে আছে। কুহো থেকে সত্যিই কুহু বানিয়ে ছেড়েছিলি! কিন্তু এ-যাত্রায় সময় হবে কিনা নিশ্চিত নই।রোজই কোথাও না কোথাও…তুই বুঝিসই!  

অতলান্তর মুখটা কেমন মিইয়ে গেল। পরক্ষণেই সেটা আড়াল করে সে বলল, প্রব্লেম। দেখা তো একবার হল! কপালে থাকলে আবার হবে! বাই-দ্য-ওয়ে, তোর সঙ্গে অভিলাশদার তো যোগাযোগ আছে!

অভিলাশ রায়!

হ্যাঁ।

আছে। আমার অফিস থেকে অবশ্য ঘন্টা দেড়েক দূরে ওঁর অফিস। একই কোম্পানি হলেও ব্রাঞ্চ আলাদা। কিন্তু কেন রে? কথা বলবি?

আমাকে নম্বরটা একবার মেসেজ করিস।ওখানেই আছেন তো?

রাইট। অভিলাশদা এবারে আসেননি। তোকে পাঠিয়ে দেব।  চল, তাহলে! ওঠা যাক!

ইয়েস বস!

 

২

 

উপমা সব শুনে বলেছিল, যাই বলো বাপু,তোমার এই বন্ধুটিকে আমার বরাবরই বন্ধু কম আর মতলববাজ বেশি বলে মনে হয়েছে। তোমার মতো সোজা-সরল বোকা-সোকা লোক পুরনো কথা মাথায় রাখে না। আমি অবশ্য কিছুই ভুলিনি।  

উপমা আজ চেতলায় তার মাসির বাড়িতে গেছে। মেয়েকে নিয়ে ওখানেই থাকবে। সাম্য যেতে পারেনি। আগামীকাল দুপুরে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে ওদের নিয়ে ফিরবে। কলকাতায় এখন ঘোর বর্ষা। মেয়ের স্কুলে লম্বা ছুটি বলে ওরা এই সময়ে এসেছে। ডিসেম্বর হলে সেটা সম্ভব হবে না। সাম্যদের এই ফ্ল্যাটে এখন মা আর ভাই থাকে। জায়গাটা সিঁথির মোড়ের কাছে। আজও প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আর বৃষ্টি বেশি হলে বিটি রোডের চেহারাটা দেখে ছোটবেলার মতো এখনও কান্না পায়।   

ব্যালকনিতে এসে বাইরের আলো-আঁধারির দিকে তাকিয়ে সাম্য ভাবতে চেষ্টা করে, উপমা কি ঠিক ভেবেছে? অতলান্তর সঙ্গে আজ বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে তাকে মতলববাজ ভাবার মতো কোনও কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। অতলান্ত যদিও ফেলে আসা জীবনে তার প্রতি বেশ খানিক ঈর্ষাণ্বিতই ছিল।  এমনকি কলেজেও…। ভাস্বরের কথা মিথ্যে না হলে প্রথম-প্রথম উপমা-সাম্যর জুটিকে সে যেন বাঁকা চোখেই দেখেছে। এ-ও নাকি সত্যি যে উপমার দিকে তার নজর পড়েছিল। যদিও সাড়া মেলেনি। পরে সে চণ্ডিগড়ে এক বছর থাকাকালীন বর্ণিতার প্রেমে পড়ে। বর্ণিতা তখনই গুরগাঁওতে চাকরি করত। বাকিটা অনেক পরে জেনেছে সাম্য। সে যখন আমেরিকায় যাওয়ার ফ্লাইটে ওঠে, অতলান্ত সেই সময়ে নয়ডায় চাকরি করত। তার নাকি দু’টো শেষ অবধি নাকচ হয়ে যাওয়ার ফলে তখনই দেশ ছাড়া সম্ভব হয়নি। আমেরিকায় পা ফেলতে আরও দেড় বছর লেগে যায়। হালকা না ভারী—কোন স্তরের খারাপ লাগার দরুণ সে অ্যালকোহলে ডুবে গিয়েছিল, সাম্য জানে না। দীর্ঘকাল দু’জনের যোগাযোগও ছিল না। কিন্তু তারও আগে…   

সেক্টর ফাইভের নামী কোম্পানি গ্রিনটেক সলিউশনে দু’জনেই ইন্টারভিউ দিয়েছিল। সাম্যকে নেওয়া হয়। অতলান্তের চাকরি জোটেনি সেখানে। চাপা বৈরিতার সেটাই কি শুরু? বেদব্যাস ব্যানার্জী নামে গ্রিনটেকের একজন ম্যানেজার নাকি সাম্যকে ব্যাক করেছিলেন। এ-ও অতলান্তের অনুমান না পাকা খবর সেটা বলা কঠিন। তার কারণ বেদব্যাস তার দেড় বছর আগে কানাডা চলে যান। আর ফেরেননি। তবে সাম্যকে আগে থেকেই তিনি চিনতেন। কিন্তু বাকিটা…? বিদীপ্তা বাগচি নামে ওদের এক বন্ধু নাকি খবরটি অতলান্তকে দেয়।  

ঘুমোতে যাবি না, দাদাভাই?

চমকে উঠল সাম্য। কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ওর ভাই সৌম্য। সাম্যর থেকে দু’বছরের ছোট। দত্তপুকুরে একটা স্কুলে পড়ায়। নিরীহ ভালমানুষ বলতে যা বোঝায়, সৌম্য তেমনই।

উমম…?হ্যাঁ, এই যাব! তুই-ও তো জেগে দেখছি রে! 

হ্যাঁ। শুতে যাচ্ছিলাম। তোর ঘরে আলো দেখে…

সাম্য জানালার সামনে থেকে সরে আসতে আসতে বলল, মা ঘুমিয়েছে?

অনেকক্ষণ। তোকে একটা কথা বলার ছিল। এখন বলব?

বল না!

দাদাভাই, মা তোদের কথা ভেবে প্রচুর কান্নাকাটি করে। এত চিন্তা কেন করে জানি না। আমি আর শুক্লা যতটা সম্ভব মাকে যত্নে রেখেছি। তুই টাকা পাঠাস। সেটা সমস্যা নয়। মা খালি বলে, যখন চলে যাব তখন যদি সামুটাকে একবার দেখতে না পাই…

সৌম্য থেমে গেল। সাম্য স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। যে প্রশ্নটা সে করতে পারছে না তার উত্তর দু’জনেই জানে। সাম্য ভাইয়ের দিকে এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, তুই ভাবিস না। আমি সবসময় সঙ্গে আছি। এখানে থাকলেও আছি। না থেকেও আছি।

জানি দাদাভাই। কিন্তু…

তোরা যা চাস, সে জীবন আর বোধহয়…

কথা শেষ না করে ক্লিষ্ট হেসে ভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, তোকে আজ একটা কথা বলি। তোকেই বলছি।আর কাউকে নয়।

সৌম্য দাদার দিকে তাকায়।

সাম্য বলে, মাকে নিয়ে আমার ভাবনা কিছু কম নয় রে। একটা এমারজেন্সি ফাণ্ড রাখাই থাকে। আমি যে কোনও সময় চলে আসতে পারব। তবে, রিমঝিমের কেরিয়ারটাও তো ভাবতে হয়। এখন যেভাবে ও সেট করে গেছে আবার এখানে এনে ভর্তি করা…তুই তো সবই বুঝিস।

বুঝি দাদাভাই। মা কেবল একেকদিন বুঝতে চায় না। তোকে যদিও এ-সব বলা বারণ।

সাম্যর বুকটা যেন কেমন করে ওঠে। সে যখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে সবে ভর্তি হয়েছে তখন হঠাৎ বাবা মারা গিয়েছিলেন। সৌম্য তখনও মাধ্যমিক পাশ করেনি। মা সে-সময় শক্ত হাতে সবকিছু না সামলাতে পারলে আজ দুই ভাই কী করত? নিজের অজ্ঞাতেই দীর্ঘশ্বাস পড়ল সাম্যর। খানিক বাদে সে সৌম্যকে বলে, মাকে আমি বুঝিয়ে যাব। চিন্তা করিস না। চল এখন। শুতে যাই।  

 

৩

 

অতলান্তর ইচ্ছে বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়া হোক। বারুইপুরের মতো জায়গায় দাম তো নেহাৎ কম পাবে না! টাকার দরকার যখন হয়েইছে! বোন দূর্গাপুরে থাকে। কালে-ভদ্রে কলকাতায় আসে। এলেও বারুইপুর অবধি এসে মায়ের সঙ্গে প্রতিবার দেখা করার সময় থাকে না। তার শ্বশুরের ফ্ল্যাট বেলগাছিয়া মেট্রোর কাছে। ফলে বারুইপুরের বাড়িটায় কার্যত অতলান্তর মা এবং দু’জন কাজের লোক ছাড়া কেউ থাকে  না। কলকাতায় এলে অতলান্ত অবশ্য বারুইপুরেই ওঠে। তার স্ত্রী বর্ণিতা এতদূরে আসতে রাজি নয়। নিজের খরচেই সল্টলেকের একেবারে শেষ প্রান্তে একতলা বাড়ি কিনেছে। সেখানে বাবা-মা এবং ভাইয়ের পরিবার থাকছে। কল্যাণীর থেকে এটা অনেক সুবিধাজনক অবস্থান বলে তার মনে হয়। বর্ণিতা আটলান্টাতেই চাকরি করে। তবে বেশিরভাগটাই এখনকার ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম ছকে চালিয়ে দেয়। দু’দিন অফিস, বাকিটা বাড়িতে বসে কাজ। অতলান্তও অনেকদিন অবধি সেভাবেই চালিয়েছে। শেষ দেড় বছর তাকে অফিসে যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে। গাড়িতে দেড় ঘন্টার পথ। প্রচুর অনিচ্ছা সহকারে সকাল সাড়ে সাতটায় সে বেরিয়ে যায়।    

বাড়ি বিক্রির কথা শুনে অতলান্তর মা প্রথমে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তারপরে বলেছিলেন, এখন আর অন্য কোথাও গিয়ে মন বসবে না। তবু, তুই যদি একান্তই বাবার বানানো বাড়ি বিক্রি করতে চাস, তাহলে বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট বানানোর জন্য চেনাশোনা প্রোমোটার খোঁজ।আমরা দু’টো ফ্ল্যাট যদি পাই, সেটা তো আর মন্দ নয়!জীবনের বাকিটা আমার এখানেই তাহলে চলে যাবে।   

এই গল্পটা আজকাল সর্বত্র ঘোরে। এ-সব দেখে আর শুনে অতলান্তর ক্লান্ত লাগে। এবারে কলকাতায় এসে শুধু ক্লান্ত নয়, আরও বেশি করে কেমন যেন একটা দমচাপা অবস্থা অনুভব করছে সে। সর্বদা যেন অস্থির ভাব। একটা টেনশন।চেনা জায়গায় এসে সে যেন দিন গুনছে যে কবে ফিরে যাবে। আর তার আগে মহেশ রাইয়ের সঙ্গে ফাইনাল এগ্রিমেন্টটা কবে সে সেরে উঠতে পারবে। মহেশ রাই হলেন এই অঞ্চলের নামী প্রোমোটার। কুহু মানে কুশল হোড় তাকে মহেশের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। মহেশ এসে সব দেখে-শুনে গেছেন। কয়েক দফায় কথাও হয়েছে।তিনি মোটের ওপর খুশি। তার কারণ এমন জায়গায় একটি পাঁচতলা স্ট্যাণ্ড অ্যালোন ফ্ল্যাট বানাতে পারবেন।    

অতলান্ত মাকে এটা জানাবার পরে উনি জানতে চাইলেন, কতদিন লাগবে রে? আমাকে তো সেই সময়ে অন্য একটা কোথাও থাকতে হবে!ভাবছি, ছকুর ওখানে চলে যাব। ছকু মানে বিপ্রদীপ বসু হল অতলান্তর একমাত্র মামাতো ভাই। টালিগঞ্জের কাছে থাকে। অতলান্তর যদিও সেটা ইচ্ছে নয়। তার ধারণা ছকুর স্ত্রী মাকে সেভাবে দেখে-শুনে রাখতে পারবে না। মা অবশ্য এটা মানতে রাজি নয়। বর্ণিতা তাকে বলেছে, তোমার এই নিয়ে ভাবার দরকার নেই। মা যদি ছকুদার ওখানে গিয়ে থাকতে পারবেন বলে মনে করেন সো বি ইট! তুমি দ্যাখো, যাতে তাড়াতাড়ি কাজটা শুরু করা যায়। আর কিছু পেমেন্টের কথাও মিস্টার রাইকে বলে রাখো।লাগবে যখন, আগে জানানোই ভাল।

 

৪

 

কলকাতায় আসতে না আসতেই ফেরার দিনটা যেন দৌড়ে চলে আসে। সাম্য ভাবতে থাকে,সামনের বছর যদি আসতে পারে তাহলে কি আরেকটা সপ্তাহ ছুটি ম্যানেজ করা যাবে? আজ বিকেলে কুহু আর অতলান্তর সঙ্গে বসার কথা আছে। অতলান্ত ওকে ছাড়ল না। উপমা আজ বনহুগলীতে ফিরবে না। রাতটা মায়ের বাড়িতে তার থাকার কথা।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। সাম্য এসেছে লেকের ধারে এক নতুন রেস্তোরাঁয়। কুহু বেঢপ একটা চেহারা বানিয়েছে। অতলান্ত ওকে দেখিয়ে কুহুকে বলল, আমি কিন্তু বাজি জিতেছি। এবারে সব খরচ তোর।

কীসের বাজি? সাম্য অবাক হল।

কুহু বলেছিল তুই আসবি না। আর আমি বলেছিলাম যে তোকে ঠিক ধরে আনব। এই নিয়ে বাজি। তুই না এলে ফুল এক্সপেন্স আমার। আদারওয়াইজ কুহু খাওয়াবে।

অতলান্ত সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত হল। সাম্য মনে মনে একটু যেন বিরক্ত হচ্ছে। তার আসা নিয়ে বাজি! অতলান্ত কি পরের পয়সায় ফূর্তি করতে চাইছে? কিন্তু কেন? বিরক্তি গিলে সাম্য ওদের সঙ্গে গল্পে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কথায়-কথায় অতলান্ত তাদের বাড়ির ব্যাপারটা জানিয়ে বলল, এটা মিটে গেলেই আমি পালাব। এতদিন দেশে থাকা মানে সবদিকেই চাপ।

তুই কি ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করছিস? সাম্য জানতে চায়।

অতলান্ত গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ইয়েস এবং নো। মানে পুরোটাই অন-অফ মোডে রান করছে। কিন্তু এটা আর দশদিনের বেশি চালানো যাবে না। বর্ণিতাও ফেরার জন্য তাড়া লাগাচ্ছে। এই উইকেণ্ডে প্রোমোটারের সঙ্গে বসে সই-সাবুদ মিটে যাওয়ার কথা আছে। আমি তার আগেই টিকিট কেটে নেব।

তোর সঙ্গে অভিলাশদার কথা হয়েছে তো? সাম্য জানতে চাইল।

অতলান্ত কিছু একটা ভাবছিল। সাম্যর প্রশ্নে কেমন একটা চমকে যাওয়ার মতো মুখ করে বলল, উমম…? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ! তোকে ডিটেইলে বলা হয়নি। আমার এক পরিচিত আসলে ক্যালিফোর্নিয়ায় কিছু অপরচুনিটি খুঁজছে। বেচারার সাডেন লে-অফ হওয়ার চাপ আছে বোধহয়। তাই আগে-ভাগে দু’চারটে জায়গায় সিভি ড্রপ করবে। রেকো পেলে সে-সব কাজে লাগাবে। ওর লাইনের খবর আমি খুব বেশি রাখি না। ওকে জিজ্ঞেস করায় অভিলাশদার কথা বলল। হি মাইট বি অফ সাম হেল্প। তাই কথা বলেছি।

কী বললেন উনি?

আমি জাস্ট একটা ইন্ট্রো করলাম। প্রব্লেমটা জানালাম। উনি বললেন, ছেলেটিকে ফিরে গিয়ে নেক্সট মান্থে যেন অনলাইনে কন্টাক্ট করতে বলি। অভিলাশদা চেষ্টা করবেন।  

কুহু এতক্ষণ সব শুনে-টুনে বলল, আচ্ছা একটা কথা বল। তোরা কলকাতায় থাকতে না চাস, থাকিস না। কিন্তু দেশের অন্য কোথাও কি তোদের কাজ-টাজ করা একেবারেই সম্ভব নয়?

সাম্য চুপ করে আছে। দু’দিন আগেই বাড়িতে এই নিয়ে কথা হয়েছিল। অতলান্তও নীরবে দু’চুমুক গলায় চালান করে সিগারেটে টান দিল। তারপরে কুহুর পিঠে হাত রেখে বলল, প্রিয়ব্রত আর সোহম এক বছর হায়দ্রাবাদে কাজ করেছিল। সেটা জানিস তো?

জানি। ফিরে গেল সেদিন!

রাইট। কেন গেল জানিস?

ওভাবে জানতে চাওয়া যায়? তোরাই বল! 

ওয়ার্ক কালচার, কুহু। তুই একবার ইউএস ওয়ার্ক কালচারে অ্যাডজাস্ট করে ফেলার পরে ইন্ডিয়াতে এসে আর…ইটস অলমোস্ট ইম্পসিবল। দু’জনেরই ফ্যামিলি নিড ছিল। তাই জোর করে প্রজেক্ট ম্যানেজ করে…! তাছাড়া টাকার কথাও ভাব একবার!

সাম্য এতক্ষণ চুপ করে থাকার পরে বলল, আরও অনেক অসুবিধা আছে। যাইহোক, কুহুকে আমি চার বছর আগে মাইগ্রেট করার জন্য ভাবতে বলেছিলাম।

অতলান্ত বলল, আমিও! কিন্তু তুই আমাদের এখানে ফেরার কথা বলছিস কেন রে?

কুহু সিগারেট ধরিয়ে বলল, দেখা-সাক্ষাৎ বেশি হতো। এই যে বসেছি, এমন আরও…

অতলান্ত হাসল।

তারপরে বলল, এবারে ফিরে যাই! তারপরে দেখছি, যদি এখানে কিছু জোটাতে পারি।  

 

৫

 

আগামীকাল এরকম সময়ে আমরা এয়ারপোর্টে ঢুকে গেছি। মনে হচ্ছে এই সেদিন এলাম, দ্যাখো! এরই মধ্যে…

উপমা বড় ট্রলি-ব্যাগটা খুলে কয়েকটা জিনিস ঢোকাতে ঢোকাতে বলছিল। এই মুহূর্তে সাম্য জানালার ধারে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন একটা বিষণ্ণতা তাকে ঘিরে ধরছে। কেন যে এমন হয়!

উপমা একবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, পরেরবার আরেকটু বেশিদিনের জন্য আসব। এবারটা যেন হুশ করে…। মা বলছিলেন, সামনের বার নাকি পুজো অক্টোবরের মাঝামাঝি। যদি একেবারে সেই সময়ে আসা যায়…

সাম্য মুখ ফিরিয়ে বলল, সত্যি! জানিয়ে খুব ভাল করলে। গ্রেট আইডিয়া!

ফোনটা বেজে উঠেছে সাম্যর। কুহু ফোন করছে। এত সকালে! সাম্য ফোনটা ধরে বলল, তুই তো সাড়ে আটটার আগে উঠিস না! আজ যে এত ভোর-ভোর…?

কুহু কেমন কাঁপা গলায় বলল, অতলান্তকে ভোরবেলায় হসপিটালে ভর্তি করতে হয়েছে। হার্ট অ্যাটাক মনে হচ্ছে। ফর্টিসের আগে নতুন যে মাল্টিস্পেশালিটি…

সাম্য আঁতকে উঠল, সে কি! তুই কোথায়?

আমি এই পৌঁছলাম। বর্ণিতা আমায় সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ফোন করেছিল। তুই কি আসতে পারবি একবার?

সাম্য একটু ভেবে বলল, অবশ্যই। কিন্তু এখন ও কোথায় আছে? আইসিইউ?

না। সিসিইউ বলে একটা ওয়ার্ডে। বারোটা নাগাদ পারলে আয়। আমি আছি।

ফোনটা রেখে ধপ করে খাটে বসে পড়ল সাম্য। উপমা জানতে চাইল, কার কী হয়েছে?

সাম্য বিড়বিড় করে ওকে ব্যাপারটা জানাল। উপমা শুনে বলল, সর্বনাশ! এমনিতেই লাইফে প্রব্লেমের অন্ত নেই ওর। তার ওপরে… আমি স্নানে গেলাম। তুমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করো। সাড়ে দশটায় বেরোব।

ঘন্টা তিনেক পরের কথা। কুহু আর সাম্য হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। যেটুকু জানা গেছে তা হল, গতকাল অতলান্তদের বাড়ির কাজ ভালভাবেই মিটে গিয়েছিল। প্রোমোটার ভদ্রলোক অতলান্তের কথায় বেশ কিছু টাকা অগ্রিম দিয়েও গেছেন। সন্ধের পরে সামান্য পান-ভোজনের ব্যবস্থা ওদের দো’তলার ঘরেই হয়েছিল। ভদ্রলোক বেরিয়ে যান সাড়ে দশটায়। তারপরে ল্যাপটপ খুলে কাজ নিয়ে বসেছিল অতলান্ত। বাড়ির সবাই তখন শুয়ে পড়েছে। এরপরে কতক্ষণ কাজ করেছে আর কখন শুতে গেছে সে, কেউই জানে না। ভোরের দিকে বুকে ব্যথা, প্রবল ঘাম এবং মাথা ঘোরা শুরু হয় অতলান্তর। ওর ডাক শুনে বর্ণিতা ছুটে আসে। অত ভোরে ডাক্তার পাওয়া বারুইপুরে অসম্ভব। ফলে অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ শুরু হয়। অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল অতলান্ত। হাসপাতালে তাকে আনতে আনতে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজেছে। কুহুকে ফোন না করলে আরও দেরি হয়ে যেত। আপাতত সে কিছুটা নিরাপদ। ডাক্তার যদিও আটচল্লিশ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখবেন।    

অতলান্ত অতি কষ্টে ওদের দেখে একবার হাত তুলেছিল।

কুহু বলল, এত অনিয়ম করে ছেলেটা! এখানে এসে আরও বেয়াক্কেলে হয়ে যায়।  আর এবারে ওর যে কী হয়েছে…! থেকে থেকে খালি বলে, আমার শালা ফিউচারটা পুরো ডার্ক হয়ে গেল, বুঝলি কুহু! তোকে কিছু বলেছে নাকি?

সাম্য অন্যমনস্কের মতো ঘাড় নাড়ল। তারপরে বলল, তুই আছিস। এটা ওদের বড় ভরসা। আমাকে তো কাল ফ্লাই করতেই হবে। কিন্তু আমি তোদের সঙ্গে রোজ যোগাযোগ রেখে চলব। টাকাপয়সা যদি লাগে আমাকে কিন্তু বলিস।

কুহু উদ্বিগ্ন মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল।

ফ্লাইটে বসার বেশ কিছুক্ষণ পরে উপমা জিজ্ঞেস করে, তোমরা যে সেদিন মিট করলে, ড্রিঙ্ক নিয়েছিলে নিশ্চয়ই!

সাম্য স্মিত হেসে বলে, নিয়েছিলাম। রেড ওয়াইন।

উপমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!

সাম্য ঘন হয়ে বসার চেষ্টা করে নিচু গলায় বলল, তোমায় কথা দিয়েছি। ভাবলে কী করে যে সেটা এত দ্রুত ভুলে যাব?

উপমা স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখে-মুখে চাপা স্বস্তি আর খুশির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে।  একটু বাদে সে জানতে চাইল, কিন্তু তোমার বন্ধু এটা কী ঝামেলা পাকিয়েছে? ওর কি কোনও আক্কেল নেই?

আছে। বড্ড বেশি করে আছে উপমা।

আর ইউ সিওর?

ইয়েস! আর তাই টেনশনে ভেতরে-ভেতরে ভেঙে-চুরে যাচ্ছিল।

কীসের টেনশন?

লে-অফ!

হোয়াট? ওকে কি স্যাক করেছে নাকি?

না। কিন্তু নোটিস ধরিয়েছে। এক মাস। কলকাতায় ল্যাণ্ড করে ও মেইলটা পায়!   

উপমা অবাক হয়ে বলল, তোমাকে অতলান্ত এটা কবে জানাল?

চেপে গেছে।

দেন?

অভিলাশদার কাছ থেকে আমি জানতে পেরেছি।

অভিলাশদা! উনি এর মধ্যে কীভাবে…

অতলান্ত অন্য একজনের কাজের দরকার এই মর্মে ওঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার কাছে নম্বর চেয়েছিল। কিন্তু ওঁকে পুরো ব্যাপারটা বলতেই হয়েছে। বাকিটা অভিলাশদা আমাকে বলেছেন। যদিও আমি যে জানি এটা অতলান্তর জানার কথা নয়। অন্তত সেভাবেই অভিলাশদাকে ও নাকি বলেছিল।

এবারে? কিছু করার উপায় আছে?

আছে। তবে খুব সহজ তো নয় ব্যাপারটা। এই বাজারে…তুমি তো সবই জানো। কাউকে কিছু পাইয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কিছুদিন সময় তো লাগবেই। অভিলাশদা চেষ্টা করবেন। তবে আমাকেই আসলে পেছন থেকে দেখতে হবে। পাগলটা আগেই যদি বলত!

বলতে পারেনি! পারার কথাও নয়, তাই না?

সাম্য ঘাড় ঘুরিয়ে উপমার দিকে একবার তাকাল। তারপরে মনের অতলান্তে গড়াতে গড়াতে চোখ দু’টো বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কিন্তু আমাকে পারতেই হবে উপমা। সামহাউ একটা কাজ…। আফটার-অল, ছেলেবেলার বন্ধু। কী হবে, যদি…?

উপমা সাম্যর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, আমি জানি, তুমি ঠিক ওর জন্য কিছু একটা করে উঠতে পারবে।  

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *