বিস্মর
তিলোত্তমা মজুমদার
ইদানীং এমন মুশকিলে পড়ি, কী আর বলব! কাকে বলি, আর কে শোনে। অরুণ আগে রাগ করত। এখন রাগ দেখিয়ে দেহবল অপচয় করে না। তার শরীর বিষয়ক সচেতনতা আগাগোড়াই। বিরাশি হল। আমার ছিয়াত্তর। তবে তাকেই আমার চেয়ে শক্ত দেখায়। দাঁতে ঘষে ঘষে আমার জিহ্বার সিকিভাগ ক্ষয় হয়ে গেছে। সারাক্ষণ নাল ঝরে। গোপনে।
পঞ্চাশ বছর আগে যখন বিয়ে হয় আমি ছাব্বিশ, সে বত্রিশ। আমার টেলিফোনে কাজ, তার ব্যাঙ্কে। প্রেমের বিয়ে তো নয় যে আগে থাকতে চেনাজানা। আরও শত লক্ষ দাম্পত্যের মতোই আমরা মানিয়ে নিয়েছিলাম। দু’খানা সুস্বাস্থ্য বাচ্চাও হয়েছে আমাদের। ছেলে, না মেয়ে, না ছেলেমেয়ে, মনে নেই আর। কী দরকার হাজার কথা মনে রাখার? তাদের জগতে এনেছিলাম, এখন যে যার নিজের দায়িত্বে আছে, এই তো বেশ।
আমার বিয়ের চারবছর আগে পর্ণাসী পাত্রস্থ হয়েছিল। কী যেন নাম বরের? মনে নেই। ইঞ্জিনিয়ার টিয়ার ছিল বোধ হয়। পর্ণাসী যখন দূরদর্শনে যোগ দেয়, সে বসন্তপঞ্চমীর শতরূপা সরস্বতী। তাকে ভালবাসি। সে আমার জিভের নীচে স্থাপিত খড়িপেন্সিল।
এদিকে আমার জিভ দাঁতে ঘষে হ্রাস পাচ্ছে। মাথার ভিতর বিল্বপত্র, চন্দন, ধুনো সব ঘিলুর মধ্যে সমাধিস্থ। ডিমেনশিয়া, নাকি অ্যালজাইমার, কেউ জিজ্ঞেস করলে একেক সময় একেকটা বলে দিই। যখন যেটা ইচ্ছে হয়। ভুলে যাওয়া রোগ যার, তাকেই রোগের নাম জিজ্ঞেস করার চেয়ে বেওকুফি আর কী! অরুণ অনেক সময় বলে, সব তোমার ভড়ং। শয়তান মেয়েছেলে।
কথাটা ঠিকও হতে পারে। হওয়াই সম্ভব। পুরনো কথা দিব্য মনে আছে। কত পুরনো? সেই হিসেব জানি না। তবে হ্যাঁ, কাল কী দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম আজ ভুলে যাই। মনে থেকে লাভ কী? সারা জীবন ধরে কবে কে কী খেয়েছে, মনে করতে পারে নাকি? তাহলে গতকালের খানাদানাই বা ভুলব না কেন? মনের ভিতরটা একেবারে ফাঁকা করে দিতে পারলে যে কী আরাম হতে পারে! তা, আমি যদি পাসপোর্ট, ভোটার, আধার, প্যান কোথায় রেখেছি ভুলে যাই, সে তো ক্ষমার অযোগ্য। অরুণ খুঁজে খুঁজে হয়রান। ওগুলো না পেলে আমিও নেই, তুমিও নেই। বছর বছর বেঁচে থাকার প্রমাণ দাখিল করা শাস্তি ছাড়া কি? না হয় মরার আগেই মরজাগতিক বিন্দু হলাম। অরুণ মানছে না। এত বিষয় আশয় গয়না টাকা উত্তরাধিকারীর জন্য আগলে রাখছে। সব খুঁজে পাওয়া গেল চালের ড্রামে, হলদে ন্যাকড়ায় জড়ানো। সত্যি আমি রাখিনি। রান্নাঘরে কোনও কালেই যাই না। চাল- ডাল কোথায় থাকে কিছুই জানি না। অরুণ এক মুহূর্তের জন্য ভুটানের ড্রাগন হয়ে গেল। লকলকে জিভ, বড় বড় শ্বদন্ত, চোখ দিয়ে অনর্গল আগুন। নিজের আগুনে ও নিজেই ছাই হল, আর আমি ভস্ম। এই তো জীবন। ন্যাকড়া জড়ানো পাসপোর্ট সমেত ছাইভস্ম।
পর্ণাসী জানে। ছাই, ভস্ম, অঙ্গার, দহনসহন নাভিকুণ্ড।
অরুণ আমাকে চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়ে দেয়। বাঁধা লোক আছে। কেউ রাঁধে, কেউ কাঁধে দায়িত্ব তুলে এখানে সেখানে যায়। আমি একেবারে ভিজে বেড়াল হয়ে গুটি গুটি গেছি। ডাক্তার যা যা জিজ্ঞেস করলেন, আমি পটাপট গুছিয়ে জবাব দিলাম। অতীত বর্তমান একচুল এদিক সেদিক হল না। তিনি ভুরু কুঁচকে কম্পিউটার দেখতে দেখতে বললেন, আপনার কি মনে হয়, ভুলে যাচ্ছেন? আমি বলি, আপনার কি মনে হয়, আমি ভুলে যাচ্ছি?
আমার মনে হচ্ছে না। তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করছি।
মাঝে মাঝে মনে হয় ভুলে যাচ্ছি হয়তো।
যেমন?
জিভ দিয়ে কী কী করে, এই হিসেব গুলিয়ে যায়।
চিকিৎসক ভিটামিন -বি গুচ্ছ খাবার পরামর্শ দিলেন। আমি যে সেগুলো কোথায় রাখলাম, মনেই পড়ছে না। তবে নোট করছি। কী মনে পড়ে, কী পড়ে না। চিকিৎসককে সাহায্য করাই আমার উদ্দেশ্য। মুশকিল হল, উদ্দেশ্যহীন থাকতে থাকতে, আকস্মিক উদ্দেশ্য হাতে পেয়ে আমি যেন আস্ত রুটি পাওয়া ইঁদুর। কীভাবে খাব, কোন দিক থেকে শুরু করব, চেটে দেখব না কামড়ে, এই নিয়ে বিহ্বল। মাঝখান থেকে পর্ণাসী এসে ঘ্যান ঘ্যান করছে তো করছেই। কুটুর কুটুর কুটুর কুটুর। মরে ঘুণপোকা হয়ে জন্মেছে। তার কথা আমি প্রকাশ্যে আনছি না। চিকিৎসক জানলে আমাকে হয়তো ভিটামিন ডি খেতে বলবেন। তাতে কি আমি স্মরণ করতে পারব, পর্ণাসী আমার পুরো চেনা ছিল কিনা, কিংবা আমাদের অন্তরঙ্গতা অতল কিনা? পারি বা না পারি, ঘুণপোকার রহস্য উদ্ঘাটিত। গতজন্মে সে ছিল প্রখ্যাত সাহিত্যিকের মেয়ে। মহাশয় আজও বেঁচে আছেন কিনা মনে পড়ে না। বইপত্র আর কিনিও না, পড়িও না। গ্রন্থাগারের অস্পৃশ্য অন্ধকারে হয়তো তিনি হরি ওঁ হরি ওঁ জপছেন।
আমার সংগ্রহের পুরনো বইগুলো কেজি দরে বেচে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। যদিও বই বেচে দু’পাঁচ টাকা আদায় করার পক্ষপাতী আমি ছিলাম না। তবে বই গুছিয়ে রাখার স্বভাবও নেই। বরাবরই আমি অগোছালো। ঠাকুমা বলত, এমন ছন্নছাড়া মেয়েকে লোকে অলক্ষ্মী বলে। আমি কলা দেখিয়ে, মুখ ভেংচে বলতাম, বয়েই গেল।
বুঝবে শ্বশুরবাড়ি গেলে। পড়ার টেবিলে তো সাপে ডিম পাড়বে এবার। স্কুল থেকে এলে, জামা- জুতো ছুড়ে দিলে এদিকে- ওদিকে। গবগবিয়ে গিলেই আবার পড়ার নামে ধিঙ্গিপনা করতে যাওয়া।
‘ধিঙ্গিপনা’ শুনে আমি হেসে গড়িয়ে পড়ি। খানিক সাঁওতালি নৃত্য করি ঠাকুমাকে ঘিরে। ধিঙ্গি শব্দটার সঙ্গে মিলিয়ে দিই তাদের মাদলের বোল। ধিধিং ধিধিং গিং গিং। ঠাকুমা তখন খর চোখে তাকাত। আশপাশ দিয়ে যাওয়া – আসা করত মা। মুখখানা গম্ভীর। ঠাকুমা আমায় গালমন্দ করে, নিন্দেও, মায়ের রাগ হয়। ভীষণ ভালবাসে আমাকে। বাজপাখি যেমন ভালবাসে নিজের ছানাদের, সেইরকম তীব্র, রণরঙ্গিণী ভালবাসা। পড়াশোনায় ভাল ছিলাম, মা সেদিকেই আমার মন বইয়ে দিয়েছিল। পরের বাড়ি যেতে হবে বলে ঘরের কাজে চৌখস হও, ঠাকুমার এই চাওয়ার কবল থেকে মা আগলে রাখত আমাকে। মন্ত্রের মতো বুঝিয়েছিল, সমাজে পুরুষের সঙ্গে মেয়েদের তফাৎ একটাই। তারা রোজগেরে, আমরা অধীন, আমরা দাসী। আমি পর্ণাসীকে বলি, ধিঙ্গি। ও বলে শিঙ্গি। আমি বলি, দাসী। ও ধ্বনিত করে হাসি। আমি বলি, কাশী। ও বলে, রাশি। আমি বলি, ফাঁসি। ও বলে, বিয়ের বাঁশি।
এখন কত মেয়ে বিয়েই করতে চায় না। যৌথজীবনের জটিলতার চেয়ে তারা স্বাধীন একাকী জীবন আনন্দময় বলে মনে করছে। কিন্তু সত্তর বছর আগে, আমার অকালবিধবা, স্বল্পশিক্ষিত মা, ঠিক এইরকম করেই ভাবত। এই কঠোর সত্য বুঝতেও মায়ের দেরি হয়নি, পৌত্র না দিয়ে যে নাতনিকে জন্ম দেওয়া হয়েছে, তাতে ঠাকুমা বেজায় রুষ্ট। প্রচণ্ড রাগ হলে আমাকে বলত, বাপখাকি। আমার ছেলেটাকে না খেয়ে নিজে মরতে পারলি না? তোর ভাতার মরবে রে। তুই ভাতারখাকি হবি।
বালাই ষাট! অরুণ অশীতিপর হয়েছেন। ঠাকুমা শাপ দিয়ে, অকারণ দোষের বোঝা চাপিয়ে নিজের কষ্ট লাঘব করত, আর আমি হেসে হেসে অকারণ খুশিতে ঠাকুমাকে ঘিরে নাচতাম। পাখার ডাঁটি দিয়ে ঘামাচিও মারত, আমাকেও। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাতার মানে কী, মা?
মা বলল, মূলত এর অর্থ, যে অন্ন দেয়, অন্নদ। সেই অর্থে পিতা বা পিতৃস্থানীয় কেউ হতে পারেন। তাঁরা অন্নদাতা, প্রতিপালক। কিন্তু মুখে মুখে শব্দটার সংকীর্ণ অর্থ তৈরি হয়েছে। এখন এটার মানে, স্বামী। মানে বর আর কী।
বরকে কেউ খেয়ে ফেলছে ভেবে আমার বেজায় হাসি পেত। বর কি ঝালমুড়ি নাকি? এমনকী আমিই বা কী করে আমার বাবাকে খেয়েছি মাথায় ঢোকে না। তাঁর পাহাড়ভ্রমণের নেশা ছিল, উঁচু উঁচু পাহাড়ে চড়ে ফিরে আসতেন শ্রান্ত হয়ে, কিন্তু মুখে অপূর্ব হাসি। এ হল পর্বতচূড়া জয় করে ফেরা। এরকমই একবার তিনি গেলেন, আর ফেরেননি। সেই ভৃগুপাহাড়ের কোন খাঁজে আজও হয়তো তাঁর বরফচাপা দেহ পড়ে আছে। ওই মৃতদেহের সম্ভাবনা ছাড়া পাহাড়ের সঙ্গে আমার ক্ষীণতম যোগ নেই। পর্ণাসীকে জিজ্ঞেস করলাম, পাহাড় কেমন করে জয় করা যায়? সে বলে, দুর্গম শিখরে ওঠাই হল পাহাড় জয় করা।
যুদ্ধটা কি একপক্ষীয় হয়ে গেল না?
কী করে?
পাহাড় কাউকে লড়তে বলছে না। সে বেচারা একলা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। যত নিরীহ মনে হয়, তত নয়। অস্ত্র শস্ত্র প্রচুর। কেউ চুপ করে থাকলেই যে ভিতরে ভিতরে লড়ছে না, বা যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম তার তৈরি নেই, এটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আগ বাড়িয়ে তো সে মানুষের ঘাড়ে উঠতে যাচ্ছে না। তোমার ঘাড়ে পিঁপড়ে উঠলে তো দিব্যি ঝেড়ে ফেলো। টিপেও মারতে পারো।
পাহাড় আমার দারুণ লাগে। বাবাও পাহাড় ভালবাসে। তবে বাবা শৃঙ্গজয়ে যেতে চায় না। বলে অত সময় কোথায়। আসলে ভয় পায়। জগতে যত বাবা, সব্বাই ভিতু।
পর্ণাসীর পিতা বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আমার বাবাকে ভাল করে মনেই পড়ে না। তবু আমি ঠাকুমার চোখে হয়ে গেলাম বাপখাকি। অথচ কোনও দিন মুখ ফসকেও মাকে ভাতারখাকি বলেনি।
তাহলে তোমার সমুদ্র ভাল লাগে? পর্ণাসী জানতে চেয়েছিল।
বোধ হয় না। এখনও চোখে দেখিনি। এসব ভাল লাগতেই হবে, তারই বা অর্থ কী।
তোমার ঠাকুমার নাম কী? তর্কে পরাভূত পর্ণাসী বলে।
মনে নেই। সম্ভবত ঠাকুমাগণের নাম থাকে না। কী করবে নাম দিয়ে? শোক, সন্তাপ, নিন্দে, অভিশাপ নিয়ে যাদের কারবার!
এক মিনিট, এক মিনিট। আমিও কি ঠাকুমা দিদিমা হয়ে যাইনি? কিন্তু আমার শোক কই? নিন্দে কই? অভিসম্পাত? পর্ণাসী, তুমি কি ঘুণপোকা জন্মে কোনও ঠাকুমা? ক্রমাগত কুটুর কুটুর। তোমার নাতনি বড় হলে বিষয়টা রণক্ষেত্র হয়ে উঠবে। মুখ ভ্যাংচানো ছেড়ে সে হবে প্রতিবাদমুখর।
মা বলে, ওসবে কান দিয়ো না। আমি গর্জে উঠি, তোমাকে বলে না কিছু, তাই তোমার গায়ে লাগে না। মা বলে, তুমি ভালই জানো, তুমি আঘাত পেলে আমিও পাই। উনি পুত্রশোকে উন্মাদ।
তাহলে আমিও পিতৃশোকে উন্মাদ।
না। তিনি তোমাকে মনে রাখেননি, তুমিও তাঁকে ভুলে গিয়েছ। আমি জানতে চাই, আর তুমি? মা বলে, আমি ভিতরে ক্ষয়ে গিয়েছি। কিন্তু তুমি আমার শক্তি। তাই আমি তাঁকে ক্ষমাও করেছি। ক্ষমার চেয়ে শক্ত আর কিছুই নেই, মহত্তর কিছুও না।
আমি বাবার মতো পাহাড়পাগল হয়ে যাব মায়ের ভয় ছিল। তার বদলে আমি গৃহগোধিকা। একেবারে ঘরকুনো। মায়ের কথামত আমি ক্ষমা সাধন করতে করতে বুঝলাম ক্ষমা আসলে একরকম বিস্মরণ। ঠাকুমা কেমন দেখতে ছিল, আমি ভুলে গেছি। অরুণ কি কোনও দিন আমাকে গভীর চুম্বন করেছে? মনে নেই। একপক্ষে ভাল যে অরুণের কখনও ভ্রমণের সাধ জাগেনি। এই বিষয়ে সে তার স্মৃতিতে রক্ষিত সেই কবিতার লাইন বলে এলোমেলোভাবে। ঘরের কাছেই প্রকৃতির কত রূপ, তার জন্য খচ্চা করে দূরে যাবার কী দরকার? তার চেয়ে টাকা রেখে দেওয়া ভাল। অরুণ দাম্পত্যের রম্যতায় যৌথস্নানেও আগ্রহী ছিল না। থাকলে আরও ভাল কিছু হোত কি? পর্ণাসীর বর সর্বাঙ্গলেহী ছিল। আকণ্ঠ ও দীর্ঘ চুম্বনে, বিবিধ ভঙ্গির যৌনক্রিয়ায় মত্ত হয়ে উঠত। খ্যাতিমান গায়ক আচমকা পর্ণাসীর স্তনপীড়ন করায় সে সরাসরি দূরদর্শনের প্রধানের কাছে অভিযোগ করেছিল। প্রধান বলেন, এ নিয়ে হৈ চৈ না করাই ভাল।
পর্ণাসী আগুন, পর্ণাসী স্টিল প্ল্যান্টের চুল্লি। সে তার বরকে জানাল, থানায় অভিযোগ করবে। বর বিচক্ষণ হল, আহত প্রেমিক নয়, বলল, তোমার বাবার কথা ভেবে দেখো। তাঁকে বলো। জানাজানি হলে তাঁর মানসম্মান থাকবে না। আমি পর্ণাসীর আর্তনাদ শুনেছিলাম। অপমানিত হলাম আমি, অসম্মান হল আমার, আমি প্রতিবাদ করলে বাবার মান থাকবে না, কীরকম? এতকাল তাহলে কীসের সাহিত্যসাধনা? কীসের সমাজচিত্র লেখা? কীসের নীতিবাদ?
সাহিত্যিক শুরুতেই মেয়েকে শাসন করেছিলেন। তুমি নিশ্চয় তাঁকে প্রলুব্ধ করেছ। তোমার পোশাক পরিধান নিশ্চয় এমন ছিল যে তিনি আহ্বান ভেবেছেন। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে এমন কী করে হয়? আমি কি জীবনে কম ইন্টারভিউ দিয়েছি? তুমি থানায় যাবে না।
যাব। আমি কোনও অন্যায় করিনি। ভুল করিনি। বর বলল, লোক জানাজানি হলে আমার জঘন্য অবস্থা হবে। সাহিত্যিক বললেন, বিখ্যাত লোকের মেয়ে তুমি, জীবনের দুর্ঘটনা অপ্রকাশ রাখাই সকলের মঙ্গল।
আমি বললাম, পর্ণাসী, তুমি একলা নও, আমি তোমার সঙ্গে আছি। দু’জনে পুলিশে গেলাম। ডিউটি অফিসার ঠোঁট কামড়ে, কলম ঠুকে বললেন, আর একটা দিন ভাবুন। সেই একদিনেই খুব ছোট করে সংবাদ প্রকাশিত হল। অভিঘাত হল বিরাট। ঠাকুমা গত। মা মৃতপ্রায়। বর পাথর। আমার স্পর্ধায় দিশেহারা, তাকে জিজ্ঞেস না করে এত দূর? সে মানুষখেকো হাঙরের ঢঙে আমার আপাদমস্তক চর্বণ করতে লাগল।
মাকে বললাম, আমি অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর, পর্ণাসীও। তাহলে? মা?
মা বলল, এ তো এক- পা ফেলা মা। পথ যে অনেক… আপনার জনকে ক্ষমা করে দিতে হয়।
পর্ণাসী পুড়ছিল। আমি শ্মশানে যেতে পারিনি। বর বলেছিল, ওসব নোংরামির মধ্যে ফের যদি যাও, আমি…
কী? আমি কী? ঠিক মনে নেই। বাচ্চাদের নিয়ে আলাদা হয়ে যাব? গলায় দড়ি দেবো? ছাত থেকে লাফিয়ে পড়ব? তোমাকে খুন করে জেলে যাব? সবই তো এক। মোট কথা, পর্ণাসীর শেষ মুহূর্তে আমি ছিলাম না। বলেছিলাম, আমি আছি, কিন্তু ছিলাম না।
জিভ দিয়ে যেন ঠিক কী কী করে? কোথায় যেন থাকে?
বাক্দেবী, শতরূপা সরস্বতী, নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না মা।
