বহ্নিশিখা
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
রবিবার। অন্যান্য দিনের চেয়ে চাপ অনেকটা কম। প্রেসিডেন্সি সেন্ট্রাল জেলের হেড মেজর গোল্ডি ডালহৌসি চার্চে প্রেয়ার সেরে নিজের অফিস ঘরে এসে বসলেন। বেল টিপলেন, হাবিলদার ছুটে এসে স্যালুট দিল।
‘ব্রেকফাস্ট রেডি?’
‘ইয়েস সাব। লা তা হুঁ সাব।’
রবিবার গোল্ডির কাছে রসনা বিলাসের দিন। তাঁর সানডে ব্রেকফাস্টের মেনু আলাদা। এই দিন তিনি আয়েস করে সুস্বাদু নেটিভ ব্রেকফাস্ট করেন৷ গরম গরম ডালপুরি, রেড চিলি দেওয়া পটেটো কারি আর রসে চোবানো জিলাবি।
আলুর তরকারিতে চুবিয়ে সবে আধখানা ডালপুরি মুখে পুরেছেন, দরজায় এসে দাঁড়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার অধিকারী।
‘সরি সার, আপনাকে এই সময়ে ডিস্টার্ব করছি। বাট দ্য ম্যাটার ইস সিরিয়াস।’
‘সিরিয়াস?’ ডালপুরি মুখের আগে থেমে গেছে, ‘নো নো, ইটস অলরাইট অঢিকারী। আই আন্ডারস্ট্যান্ড। টেল মি।’
‘সার, আপনি জানেন, বম্ব কেসের স্টেট প্রিজনার রামচন্দ্র মজুমদার এই জেলে রয়েছে। ডেফিনিট ইনফরমেশন আছে, রাম একজন একজন স্বদেশী, টেররিস্ট। ওরা জার্মানি থেকে ফায়ার আর্মস আনাচ্ছে এবং বোমা বানাচ্ছে। একের পর এক অ্যাটাক করছে, খুনের চেষ্টা করছে গভর্নমেন্টের বড় বড় অফিসারদের।’
‘ইয়েস, টেররিস্ট! ডে ওয়ান্ট ফ্রিডম অফ ইন্ডিয়া। অ্যান্ড রাম ইস ইন ড্যাট সোয়াডেশী গ্রুপ। বাট এখনও সেটা প্রুফ হয়নি। কেস চলিটেছে। তাই উহাকে আমাডের এটো খাটির করিটে হইটেছে। বাট হোয়াটস হ্যাপেন্ড? হ্যাস হি ডান এনিথিং সিরিয়াস?’
‘না সার, এখনও তেমন কিছু হয়নি। হেড গেটম্যান আমায় খবর দিল, রামের ওয়াইফ ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এরা স্যার ডেঞ্জারাস লোক। হয়তো স্ত্রীকে দিয়ে কোনও গোপন খবর পাচার করে দেবে৷ আমি সার ডিসিশন নিতে পারছি না, কী করব? ওর ওয়াইফকে রামের সঙ্গে মিট অ্যালাও করব? আবার যদি অ্যালাও না করি, নিউজ পেপারগুলো বিরাট চিৎকার শুরু করবে। হিউম্যান রাইটস নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অবধি খবর পৌঁছে যাওয়াও অসম্ভব নয় সার।’
‘ইয়েস, দ্যাটস পসিবল। ক্যালকাটায় মেনি ব্রিটিশারস আছে, যাহারা সিক্রেটলি নেটিভডের ফ্রিডম মুভমেন্ট সাপোর্ট করে।’ গোল্ডি একটু চিন্তা করে বললেন, ‘হুম, উই শুডন্ট টেক এনি রিস্ক। ডু ওয়ান থিং। টুমি নিজে হাজব্যান্ড ওয়াইফ মিটএর টাইমে নিজে ওই রুমে প্রেজেন্ট থাক। সো দ্যাট, ওই রাস্কেলটা যাহাটে কোনও সিক্রেট ইনফরমেশন ওয়াইফকে না দিটে পারে। রাইট?’
‘ইয়েস সার। থ্যাঙ্কিউ সার।’
মিটিং রুমের একটা চেয়ারে গিয়ে বসলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার অধিকারী। কয়েদিদের সঙ্গে বাড়ির লোকজন দেখা করে এই ঘরে। অদূরের বেঞ্চে ঘোমটা পরা অল্পবয়েসি এক মহিলা বসে আছে। কপালে বড় লাল টিপ। তার সিঁথির লাল সিঁদুর ধেবড়ে এসেছে ভ্রু অবধি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদছে, কান্নার তোড়ে তার শরীর কেঁপে উঠছে।
একটু পরে একজন হাবিলদার এসে পৌঁছে দিল স্টেট প্রিজনার রাম মজুমদারকে। তাকে ঢুকতে দেখেই মহিলার কান্নার বেগ বেড়ে গেল।
রাম একদৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত লক্ষ্য করল স্ত্রীকে। সান্ত্বনার সুরে বলল, ‘ আহা, তুমি কাঁদছ কেন গো! শোন, আমি নির্দোষ, গোরা সায়েবরা আমায় মিছি মিছি আটকে রেখেছে।’
মহিলার কান্না থামল না। অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলারের দিকে তাকিয়ে রাম বলল, ‘স্যার, আপনারা আমায় এত ভয় পান? বউয়ের সঙ্গে নিভৃতে দুটো কথাও বলতে দেবেন না?’
অধিকারী হাসল, ‘কী করা যাবে বলুন রামবাবু! আমি নিমিত্ত মাত্র। সায়েবের অর্ডার। আপনারা সারা দেশ জুড়ে যা শুরু করেছেন, ব্রিটিশরা কি আর বিশ্বাস করতে পারে! যাগ্যে, যা কথা বলার বলে নিন। আপনাদের জন্য দশ মিনিট টাইম বরাদ্দ হয়েছে।’
রাম তাঁকে একঝলক ঘৃণার চোখে দেখল। তারপর সুর পাল্টে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘বলো গো! কী খবর? তোমরা কেমন আছ? বাড়ির সকলে, বাবা মা ভাই বোন কুশল তো?’
‘কী করে কুশল থাকবে বলুন?’ মহিলা ফোঁপাতে ফোপাঁতে বলল, ‘কেউ চোখের পাতা এক করতে পারছি না। খবর এসেছে, আপনি নাকি এখানে এসে স্বদেশী দলে যোগ দিয়েছেন।’
‘বাজে কথা বউ! ইংরেজ সরকারের পুলিশ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দিয়েছে। আমার মতো গ্রাম থেকে আসা গরীব ছেলেরা শ্রমজীবী সমবায় সংঘে লেখাপড়া শিখে চাকরির চেষ্টা করে। পুলিশ আমার বিরুদ্ধে কিছু প্রমাণও করতে পারবে না। বাড়িতে বোলো, কিছুদিনের মধ্যে আমি ছাড়া পেয়ে যাব। বুঝলে?’
অধিকারী খর দৃষ্টি রেখেছেন দুজনের উপর। তিনি দেখলেন, ঘোমটার ফাঁক দিয়ে মুখ তুলে চাইল মহিলা। স্বামীর দিকে চেয়ে আছে গভীর চোখে। তার চোখে জল, মুখে হাসি ফুটে উঠেছে।
কিছুক্ষণ চুপ। তারপর দু আঙুল দিয়ে আঁচলের খুট জড়িয়ে মহিলা বলল, ‘বাবামশাই আপনারে একটা কথা জিগ্যাসা করতি বলেছেন।’
‘কী?’
‘এবার দেশের দিকে বড়ই মশার উপদ্রব, ঘরে ঘরে ম্যালোরি হতেছে। গত বারে বাড়ি যাওয়ার সময় আপনি এখান থেকে দু বোতল মশার তেল নিয়ে গিছিলেন। বাবা অনেক খুঁজিছেন, পান নাই। যদি এট্টু মনে করে বলতি পারেন, বোতল দুটো ঠিক কোথায় রেখে এসিছেন!’ ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল রাম মজুমদার। তারপর তার চক্ষু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়ে গেছে। আমাদের ঘরের দেয়ালের উপরের দিকে ওই যে কুলুঙ্গিটা আছে, ওখানেই বোতল দুটো রেখে এসেছিলাম।’
‘না না, ওখানেও অনেক খুঁজিছি। পাই নাই।’
‘পাবে, অবশ্যই পাবে৷ ভালো করে খুঁজে দেখো। হয়তো হাত লেগে আরও ভিতরের দিকে চলে গেছে।’
‘আজ্ঞে।’ বলে সে গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করল রামকে। তারপর বলল, ‘তাহলে আজ আসি সোয়ামি? আবার আসব। আপনার পিরতীক্ষায় থাকব।’
ঘোমটা মুখ অব্দি টেনে উঠে দাঁড়িয়েছে রামের বউ। আবার ফোঁপাচ্ছে। অধিকারীর কষ্ট হচ্ছে। আহা রে, কচি বউটা! হাঁক দিলেন, ‘শুকদেব। জেনানা কো গেটের বাহারে দিয়ে এসো। হ্যাঁ মা, তোমার সঙ্গে আর কেউ এসেছে?’
‘হ্যাঁ হুজুর। সঙ্গে আমার ভাইপো আছে।’ বউটি অধিকারীকেও ঢিপ করে প্রণাম করল।
‘আহা- হা, এ -এ কী? আচ্ছা, আচ্ছা মা, সাবধানে যেও। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।’ মাথায় হাত রাখলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার।
জেল গেটের সামনের রাস্তায় পায়চারি করছিল এক যুবক। গেটের উপর বড় ঘড়িটা দেখছিল ঘন ঘন, গেটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল। এক ঘন্টা হয়ে গেল! কী হল কি? এত দেরি হচ্ছে কেন পিসিমার? ইংরেজের পুলিশ কি তাকেও গারদে পুরে দিল?
গেটের দরজা খুলে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যুবক। প্রায় ছুটে গিয়ে মহিলার হাত ধরল, ‘ ও:, পিসি! তুমি আমায় যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। ভাবছিলাম, নির্ঘাত –‘
‘আমায় পুলিশে ধরেছে!’ মহিলা খিলখিল করে হেসে উঠল, ‘উল্টে বুড়ো আমার মাথায় হাত দিয়ে কত্ত আশীর্বাদ করল।’
সামনেই একটা এক্কাগাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনে গিয়ে উঠে বসল। অমর বলল, ‘বাবু ঘাট।’ ঘোড়ার গাড়ি চলতে শুরু করল।
ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। ওরা যাবে রিষড়া। একটিতে উঠে বসে ওরা। মহিলা ছইয়ের দিকে এগোতে এগোতে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, ‘জয় দেবাদিদেব, জয় মা গঙ্গা! ক্ষমা করে দিও। অমর, ছোট একটা পাত্রে গঙ্গাজল নাও।’
নৌকা চলতে শুরু করেছে গঙ্গা দিয়ে৷ ভরা জোয়ার, জল আর দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, নৌকা দুলছে। দুজনেই ছইয়ের ভিতর। অমর একটুকরো কাপড় আর একখণ্ড গেরিমাটি বের করেছে ঝোলা থেকে। মহিলার ঘোমটা সরে গেছে৷ সে মাথা নিচু করে অমরকে বলল, ‘নাও, চুলে ভালো করে গেরিমাটি লেপে জল দিয়ে সব পরিস্কার করো।’
নৌকা ওপারের ঘাটে প্রায় পৌঁছে গেছে। চুল, মুখ মুছে ফেলেছে মহিলা। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, ‘অমর, এবার ঠিক আছে?’ তার সিঁথির সিঁদুর, কপালের টিপ অদৃশ্য।
‘হ্যাঁ, ঠিক আগের মতো। ও পিসি, তুমি আজ যা করলে, ভাবা যায় না৷ তোমায় একটা প্রণাম করি?’
‘গুরু কি শিষ্যাকে প্রণাম করে ভাইপো? সে সব পরে হবে। আসল কাজটা আমাদের হয়ে গেছে। মশার তেলের খোঁজ পেয়ে গেছি।’
‘মশার তেল!’ হাঁ হয়ে গেল অমর।
‘আরে হ্যাঁ, মশার তেল!’ হেসে উঠল পিসিমা, ‘বুড়ো ভামটা ঠায় বসে ছিল, আমাদের কথা শোনার জন্যে। কী যে করি! হঠাৎ মাথায় বুদ্ধিটা এসে গেল, রামবাবু আমার ইশারা ঠিক বুঝেও গেল। মশার তেল হচ্ছে মসার (জার্মান মাউসার কোম্পানির তৈরি) পিস্তল, যার খোঁজ পেতেই আমরা এসেছি। রামবাবু বলল, সেটা রেখে গেছে ঘরের কুলুঙ্গির ভিতরের দিকে। এখনই গিয়ে তোমাদের বের করে নিতে হবে।’
অমর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল পিসিমাকে।…
১৯১৫ সাল৷ অশান্ত পৃথিবী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। একদিকে ব্রিটেন, বিপক্ষে জার্মানি। যুগান্তর দলের সশস্ত্র বিপ্লবীরা জার্মানি থেকে গোপনে অস্ত্রশস্ত্র আনিয়ে দেশকে স্বাধীন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ইংরেজ জেনে ফেলেছে এই ষড়যন্ত্র। কিছু দিন আগে বাঘা যতীন বুড়ি বালামের তীরে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রাণ দিয়েছেন। তবু সংকল্পে অটল সশস্ত্র বিপ্লবীরা। যাদুগোপাল মুখার্জির নেতৃত্বে উত্তর পূর্ব ভারতের পথ দিয়ে ফায়ার আর্মস আনাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আহত ব্রিটিশ সিংহ তখন আরও মরিয়া, নখ দাঁত বের করে ভয়ংকর অত্যাচার শুরু করেছে বাংলার যুবকদের উপর। কারোর উপর সামান্য সন্দেহ হলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, একের পর এক ফাঁসি, আন্দামান নির্বাসন আর নইলে কুখ্যাত পুলিশ কর্তা চার্লস টেগার্টের তদারকিতে চলছে স্বীকারোক্তির জন্য বীভৎস নিপীড়ন।
এইরকম অগ্নিগর্ভ সময়ে অমর চ্যাটার্জি যুগান্তর দলে নিয়ে এল সম্পর্কে পিসি সাতাশ বছরের ননীবালাকে। তার স্বামী মারা গেছে ষোলো বছর বয়সে।
ননীবালাকে দলে নিতে বিরাট আপত্তি উঠেছিল। একে যুবতী, তার উপর ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবা। আপত্তি করেছিলেন ননীর বাবা-মাও। কিন্তু তাকে আটকানো যায় কখনও? যার বুকের মধ্যে একবার বেজে ওঠে জন্মভূমির শিকল ছেঁড়ার আহ্বান, সে কী আর ঘরে বসে থাকতে পারে! ননীবালাও বেরিয়ে এল বাড়ি ছেড়ে।
রিষড়ায় থাকছে ননীবালা, তার আশ্রয়ে রয়েছে বিপ্লবীরা। হঠাৎ খবর এল, কলকাতার শ্রমজীবী সমবায়ে তল্লাশি করেছে পুলিশ, ধরে নিয়ে গেছে রামচন্দ্র মজুমদারকে। রামবাবুর কাছে একটা মাউসার পিস্তল ছিল, সেটা সে কোথায় লুকিয়ে রেখে গেছে, বলে যেতে পারেনি।
ননীবালা বলল, ‘ আমি যাব। রামবাবুর স্ত্রী সেজে।’
‘কী বলছ পিসি! বউ সাজতে হলে তোমায় সিঁথিতে সিঁদুর, শাখা পলা পরতে হবে। ‘
‘হ্যাঁ, পরব। এ তো আর সত্যি নয়।’
শিহরিত হল অমর। একটু ইতস্তত করে বলল,’ কিন্তু রামদা তোমাকে দেখে কী করে বুঝবে? সে তো বিয়েই করেনি।’
‘তো কী হল? থ্যাটারে কী হয়? নায়ক নায়িকা অ্যাক্টো করে। আমরা তাই করব। দেখে নিও, রামবাবু আমার চোখে চোখ রাখলেই ঠিক বুঝে ফেলবে। শোন অমর, মসার পিস্তল দুর্লভ জিনিস। তার জন্যে এটুকু ঝুঁকি নিতে হবে।’
তারপরের ঘটনা শুরুতেই বলা হয়েছে। সেই যুগে বেশিরভাগ মেয়েই পর্দানশীন, গৃহবধূ। ওই সময়ে ননীবালা যা ঘটিয়ে ফেললেন, এককথায় তা অকল্পনীয়, অভাবনীয়।
এখানেই ননীবালার কর্মকাণ্ড শেষ নয়, বরং বলা যায় শুরু। ইংরেজ গোয়েন্দারা জেনে ফেলল, ননীবালা রামবাবুর বউ নয়। তাকে খুঁজতে শুরু করল। ননীবালা ডেরা বদলে ফেললেন, নতুন ঠিকানা হল ফরাসি চন্দননগর।
কিন্তু পিছন ছাড়ার পাত্র নয় ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। একের পর এক বাড়ি বদলায়, খবর আসে, এখানেও ওরা আসছে। আরও দু:সাহসের কাজ করে ফেললেন ননীবালা। এক বান্ধবীর দাদা প্রবোধ মিত্র কাজের জন্য যাচ্ছিলেন সুদূর পেশোয়ার। ননীবালা কাকুতি মিনতি করে তাঁর স্ত্রী সেজে উঠে পড়লেন ট্রেনে।
ইংরেজ ভয়ংকর জাত, যার পিছনে পড়ে, তাকে ছাড়ে না। তাদের চর সর্বত্র, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, বার্মা থেকে কাবুল পর্যন্ত। পেশোয়ারে পৌঁছে কলেরায় পড়লেন ননীবালা। তখন কলেরার ওষুধ বের হয়নি। প্রবল জ্বর দাস্তবমিতে ননী প্রায় মুমূর্ষু, বাড়িতে ডাক্তার এল। এই সূত্র ধরেই খবর চলে গেল, শহরে এক বাঙালি যুবতী এসেছে৷
পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলল, সামান্য সুস্থ হতেই ধরে নিয়ে গেল কাশীতে।
তারপর? শুরু হল ননীবালার মুখ থেকে কথা বের করতে অকথ্য অত্যাচার। বলতে ঘেন্না হয়, তার নেতৃত্বে ছিল এক বঙ্গসন্তান — কাশী ডেপুটি সুপার জিতেন ব্যানার্জি।
‘কী রে মাগী, খুব বিপ্লব করবি, অ্যাঁ? গোরা সায়েবরা ভগবান, বুঝলি। বল, বলে ফ্যাল।’
‘কী বলব? আমি কিছু জানি না।’
‘ফের মিথ্যে কথা! বল, তোর গুণধর ভাইপো, হারামির বাচ্চা অমর কোথায় আছে?’
‘খবরদার, ওর সম্বন্ধে খারাপ কথা বলবে না!’
‘বেশ, বেশ। অমর বড় ভালো ছেলে। এবার বল দিকি, সে কোথায়?’
‘বললাম তো, জানি না। তবে জানলেও বলব না!’
‘তবে রে! দেখবি, তোর কী করি! ভালো চাস তো বলে ফ্যাল।’
ননীবালা নিশ্চুপ।
‘দ্যাখ, শেষবার বলছি। বলবি না তো?’
ননীবালা দু’দিকে সজোরে মাথা নাড়লেন।
জিতেন রাগে ফোঁস ফোঁস করতে খবর পাঠাল বিকটদর্শন দুই মহিলাকে, যারা খুনের মামলার সাজা খেটে তখন জমাদারনি। ‘একে নিয়ে যা! এর পেট থেকে কথা বার করতে গুড়ো দাওয়াই দে ভালো করে।’
দুটো মহিলা যমদূত টানতে টানতে নিয়ে গেল ননীবালা দেবীকে, পানিশমেন্ট সেল-এ। সম্পূর্ণ নগ্ন করে তাঁর শরীরের নাক, কান, পায়ু ও গোপন অঙ্গ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল শুকনো লঙ্কার গুড়ো। ননীবালা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন। কিন্তু একটা কথাও বের হল না তাঁর মুখ দিয়ে।
তাঁর উপর এই সাংঘাতিক টর্চার চলতে লাগল দিনের পর দিন। জানলা দরজা বিহীন কুঠুরিতে আধমরা হয়ে পড়ে থাকতেন। তবু ননীবালার মুখ দিয়ে একটা কথাও বের করতে পারল না জিতেন ব্যানার্জি। শেষ পর্যন্ত সে হাল ছেড়ে দিল।
ব্রিটিশ ভয় পেয়ে গেল। যদি এই নিপীড়ন নিয়ে কাগজে খবর বেরোয়! ম্যাজিস্ট্রেটের অর্ডারে ননীবালাকে আনা হল কলিকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দিতে বাধ্য হল স্টেট প্রিজনারের মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রথম শ্রেণীর কয়েদি। প্রসঙ্গত, ননীবালা দেবীই ছিলেন সারা বাংলার একমাত্র লেডি স্টেট প্রিজনার।
এই সেই জেল, যেখানে তিনি দুবছর আগে এসেছিলেন রামবাবুর স্ত্রী সেজে। কলকাতার জেলে এসে খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিলেন ননীবালা। ইংরেজ সরকার আরও বিপদে পড়ল। এই মহিলা যদি মরে যায়? পার্লামেন্টে খবর চলে গেলে চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। জেলার বারবার এসে অনুরোধ করছে, ননীবালাকে। কিন্তু তিনি সংকল্পে অনড়, ছাড়া পেলে তবেই অন্ন গ্রহণ করবেন। প্রেসিডেন্সি জেলের মেজর গোল্ডি তখন প্রমোশন পেয়ে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর স্পেশাল সুপার। সে লোক মারফত ননীবালাকে নিয়ে এল ইলিসিয়াম রো-র অফিসে।
‘দেখো লেডি, মামলা না শেষ হলে তোমায় ছাড়া যাবে না, ততদিন এখানেই থাকতে হবে। তুমি বলো, কী করলে খাবে?’
‘আমি যা চাইব, দেবেন?’
‘হ্যাঁ দেব।’
‘তাহলে আমায় বাগবাজারে সারদা মায়ের কাছে নিয়ে চলুন, সেখানেই বসে খাব।’
চোখ ছোট করে মুচকি হাসল গোল্ডি, ‘তুমি অ্যাপ্লিকেশন করে দাও।’ বলে একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
ননীবালা বাংলায় গোদা হরফে আবেদন লিখে তার হাতে দিলেন। অমনি গোল্ডি সেটা দলা পাকিয়ে বাতিল কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল। ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো লাফিয়ে উঠলেন ননীবালা! ঠাস করে সপাটে চড় কষিয়ে দিলেন গোল্ডির গালে। ফের হাত তোলার আগেই তাঁর হাত চেপে ধরলেন পাশের বাঙালি অফিসাররা, ‘আরে, আরে পিসিমা! করেন কী! করেন কী!’
তখনও রাগে ফুঁসছেন ননীবালা। গর্জন করে উঠেছেন, ‘তাহলে লালমুখোটা আমায় দিয়ে চিঠি লেখালো কেন? আমরা পরাধীন, আমাদের ইজ্জত নেই, তাই তো?’
প্রেসিডেন্সি জেলে ননীবালার উপোস চলছে। উপবাসের কুড়ি দিন পার। ম্যাজিস্ট্রেট নিজে এসে তাঁকে অনুরোধ করলেন, ‘প্লিস লেডি, আপনি কিছু একটু মুখে দিন। মামলা না শেষ হওয়া অবধি আপনাকে ছাড়া যাবে না। লেডি, উই আর হেল্পলেস।’
চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন ননীবালা দেবী। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেক দুকড়িবালা দেবীর মুখ। অসহায় মহিলা তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদি। দু’বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। হাড়ভাঙা পরিশ্রম, প্রতিদিন আধমণ ডাল ভাঙতে হচ্ছে। কারণ, তাঁর বাড়ি থেকেই পুলিশ উদ্ধার করেছে সাতটা জার্মান মাউসার বা মসার পিস্তল।
‘আমার ইচ্ছামতো ব্যবস্থা করা হবে? নাকি ওই শয়তান সায়েবটার মতো –‘
‘না না, আপনার ইচ্ছামতোই হবে৷’
‘তাহলে আমার রান্না করার জন্যে একজন ব্রাহ্মণের মেয়ে চাই, আর দুজন কাজের মেয়ে চাই৷’
‘ব্রাহ্মণের মেয়ে কোথায় পাব লেডি?’ অসহায় কণ্ঠে বললেন ম্যাজিস্ট্রেট, ‘এই জেলে কেউ আছে?’
‘আছে সায়েব। দুকড়িবালা। সশ্রম জেল খাটছে।’
‘ও হো হো, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখনই ব্যবস্থা করছি।’
ঝড়ের বেগে সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। এসে গেল বাসন- কোসন, রান্নার হাড়িকুড়ি। বেঁচে গেলেন দুকড়িবালা, নিযুক্ত হলেন ননীবালার সঙ্গে। উপবাসের ২১ দিনের দিন সকালে দুকড়ির হাতের রান্না খেয়ে উপবাস ভাঙলেন ননীবালা দেবী। ব্রিটিশ সরকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
১৯১৯ সাল। প্রমাণের অভাবে ব্রিটিশ জেল থেকে ছাড়া পেলেন ননীবালা দেবী। তখন তাঁর বয়েস মাত্র একত্রিশ। মহীয়সী তরুণী মেয়েটি এসে দাঁড়ালেন খোলা আকাশের নীচে। কিন্তু তারপর? তারপর কী ঘটল?…
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায় —
‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান… ‘
না, কেউ ননীবালাকে মাথা গোঁজার একটা আশ্রয়ও দেয়নি। আত্মীয় স্বজন মুখ ফিরিয়ে নিল। প্রথমত পুলিশের ভয়, দ্বিতীয়ত তার চরিত্রদোষ, একা যুবতী মেয়ে পুরুষদের সঙ্গে অনেক দিন ও রাত কাটিয়েছে। ননীবালার সশস্ত্র বিপ্লবীদের দল তখন ছত্রভঙ্গ। কারও খোঁজ পেলেন না তিনি। সুতরাং একটা ঘুপচি ঘর ভাড়া নিয়ে আবার নতুন করে শুরু হল অভাগিনীর বেঁচে থাকার লড়াই।
১৯৪৭ সাল। দেশ স্বাধীন হল। তখনও বেঁচে ননীবালা দেবী, দুর্ভাগ্যলাঞ্ছিত জীবন নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে। কী আশ্চর্য! তাঁর কথা একবারের জন্যও কারও মনে পড়ল না! কেউ একবার খোঁজও নিল না, কোথায় গেল বিপ্লবী মেয়েটি!
১৯৬৭ সাল৷ সকলের অলক্ষ্যে, স্বাধীন দেশের নেতাদের নির্লজ্জ অবহেলা বঞ্চনা মাথায় নিয়ে চিরদিনের মতো চোখ বুঁজলেন অগ্নিকন্যা ননীবালা দেবী।
