short-story-boro-baba

বড়বাবা

কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়

ঢং… ঢং… করে ঘণ্টা বাজল। গুনে গুনে দশবার। এই নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে এটাই যেন একমাত্র প্রাণের শব্দ। আওয়াজটা আসছে বড় গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা থেকে। ঘড়িটা নন্দিতার শ্বশুরমশাইয়ের। যে বাড়িতে এই ঘড়িটা একসময় থাকত, সেখানে মানাত। বড় তিনতলা বাড়ি। এক তলাটা প্রায় পুরোটাই বসার ঘর ছিল। তার এক দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে থাকত মানানসই ঘড়িটা। নন্দিতা বিয়ের পর যেদিন ওই বাড়িতে বউ হয়ে দুধ আলতাও ওপর গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো বড় থালাটার ওপর পা ফেলেছিল, চারদিকে শাঁখ আর উলুধ্বনি বেজে উঠেছিল, ঘড়িটাও ঢং… ঢং… করে বেজে উঠে নববধূকে স্বাগত জানিয়েছিল। নন্দিতা ঘড়িটার একটা নাম দিয়েছিল, বড়বাবা।

দিনেকালে সেই সাবেকি বাড়ি ধুলিস্যাৎ হয়ে শরিকদের মধ্যে ভাগ হয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হল। এ বড় চেনা গল্প। বিশ্বনাথও ভাগের একটা খুপরি ফ্ল্যাট পেয়েছিল। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে কিছুতেই থাকতে রাজি হননি নন্দিতা। ভাগের ফ্ল্যাট বিশ্বনাথকে দিয়ে বিক্রি করিয়ে শহরের একেবারে অন্য প্রান্তে আরেকটা খুপরি ফ্ল্যাটে উঠে এসেছিলেন। এরকম নয় যে সেটা কোনও চেনা পাড়া ছিল। আসলে নন্দিতা বুঝেছিলেন, পূর্ণ স্মৃতির টুকরো হয়ে একটা বাড়িতে থাকতে পারবেন না।

তবে নন্দিতার বিশ্বনাথের কাছে একটাই আবদার বা দাবি ছিল। বড়বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। শরিকদের বিশেষ আপত্তি ছিলনা। শুধু একটা মূল্যায়ন ছিল। বড়বাবার অকশন হাউসে কত দাম হতে পারে। সেটা বিশ্বনাথকে চোকাতে হয়েছিল। তাতে অবশ্য বিশ্বনাথের বিশেষ অসুবিধা ছিলনা। আপত্তি ছিল অতবড় ঢাউস ঘড়িটা নতুন বাড়িতে ঘর জোরা করে কোথায় রাখবেন। সেই জায়গা বার করে দিয়েছিলেন নন্দিতা। বড়বাবা চিরকাল বসার ঘরে থেকে এসেছে। নতুন ফ্ল্যাটেও সেই ড্রয়িং রুমেই সময়ের আবিরাম সাক্ষী হয়ে কাঠের খোলসে বন্দি হয়ে আসন পেতে রয়েছে বড়বাবা। কাচের পেটের ভেতর পিতলের ক্লান্তিহীন পেন্ডুলামটা এপাশ ওপাশ দোলে। বড়বাবার কোনও মত নেই, কোনও পক্ষ নেই, শুধু টিক… টক… টিক… টক…আওয়াজ করে প্রাণের স্পন্দন ধ্বনি শুনিয়ে যাওয়ার এক যান্ত্রিক বিশ্বস্ত দায়িত্ব আছে।

বড়বাবা জড় বস্তু। জড় বস্তুর কোনও চাহিদা থাকেনা। তবে বড়বাবার একটাই চাহিদা আছে। সেটা হচ্ছে, ‘দম’। বড়বাবাকে প্রত্যেক দিন চাবি ঘুরিয়ে দম দিতে হয়। বড়বাবার যেন চব্বিশ ঘণ্টার আয়ু। নন্দিতার শ্বশুরমশাইয়ের নানান ধরনের কাজের লোক ছিল। তারমধ্যে একজন ছিলেন ঘড়িবাবু। রোজ এসে বড়বাবার মুখের ওপর ঢাকনিটা খুলে চাবি ঘুরিয়ে দম দিয়ে যেতেন। শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার পরও ঘড়িবাবু আসতেন দম দিয়ে যেতে। আসলে বড়বাবার ভালবাসার একটা টান রয়েছে। ঘড়িবাবু বুঝতেন। নন্দিতা আজও বোঝেন। শেষের দিকে নন্দিতাই ঘড়িবাবুকে সামান্য মাসোহারা দিতেন। তবে ঘড়িবাবুর বয়স হয়েছিল। বড়বাবাকে নিয়ে নন্দিতা যখন শহরের অন্যপ্রান্তে চলে এলেন, ঘড়িবাবু আর পারলেন না। বিশ্বনাথকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন বড়বাবাকে কীভাবে বুক ভর্তি প্রাণ রোজ দিতে হয়। সেই কাজটা বিশ্বনাথ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত করেছিলেন। এখন বড়বাবার উলটোদিকের দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ছবি হয়ে ঝুলছেন।

বিশ্বনাথ সংসার থেকে বছরখানিক আগে ছুটি নিয়ে নিয়েছেন। তার পর থেকে নন্দিতা একা। ছেলে থাকে বেঙ্গালুরুতে, মায়ের কোনও খোঁজখবর নেওয়ার গরজ নেই। মেয়ে নিউ জার্সিতে। মেয়েই দূর থেকে যতটা পারে মায়ের জন্য চেষ্টা করে। কিছুমাস হল নন্দিতাও শয্যাশায়ী হয়েছেন। বেশ কঠিন অসুখ। মেয়ে তাই ব্যবস্থা করেছে। দিনরাতের জন্য আয়া। তাছাড়া দিনে একজন কেয়ার গিভার।

এই আয়া আর কেয়ার গিভারের তফাৎ কী নন্দিতা বিশেষ বোঝেন না। আয়া আছে তো দুজন। সকালের একজন, জ্যোৎস্না। রাত্রের একজন, আরতি। এর ওপর একজন কেয়ার গিভারের কী দরকার? শুধু শুধু পয়সা নষ্ট। মেয়ে রঞ্জিনী অবশ্য বুঝিয়েছিল কেয়ার গিভার তোমাকে আয়ার চেয়ে অনেক বেশি সাহায্য করবে। তোমাকে সঙ্গ দেবে। সময়ে ওষুধ আর খাবার খাওয়ানো ছাড়া তোমার ইচ্ছেমত গান চালিয়ে দেবে, বই পড়ে শোনাবে। আরও কতকিছুর লম্বা ফিরিস্তি। মেয়ে ফোনে ফোনেই কোন এক সেন্টারের সঙ্গে কথা বলেছিল, ফোনেই কেয়ারগিভারদের ইন্টারভিউ নিয়ে একজনকে পাকা করেছিল।

নন্দিতা ফোনে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন, মেয়ের নিশ্চিন্তি দেখে। কেয়ার গিভার হিসেবে যে মেয়েটা আজ থেকে কাজে আসবে, তার নাম মিতালি। এই গল্পের শুরু হয়েছে ঢং… ঢং… বড়বাবার ঘণ্টা বাজিয়ে। এক বৈশাখের তীব্র গরমের সকাল। মিতালি  প্রথম আসবে।  নন্দিতার আরও কোনও কিছুর দরকার নেই। উনি ঠিক করে রেখেছেন, মিতালির একটাই পরীক্ষা নেবেন। বড়বাবাকে যত্ন করে দম দিতে পারে কিনা দেখার। দশটায় আসার কথা মেয়েটার। সন্ধে ছটা পর্যন্ত থাকার কথা। বড়বাবাকে দম দিতে হবে এগারোটায়। বড়বাবার দম ফুরিয়ে আসছে। জ্যোৎস্না অবশ্য ঠেকায় পড়ে দম দিয়ে দেয়। কিন্তু নন্দিতার একটুও পছন্দ হয়না। কেমন যেন যত্নের অভাব। ঠিক ওর রান্নার মতই।

মিতালি এলো দশটা দশে। প্রথম দিনেই দশ মিনিট লেট। দরজা খুলে মেয়েটাকে নিয়ে এলো জ্যোৎস্না। রোগা পাতলা অল্পবয়সী একটা মেয়ে। থমথমে মুখে নন্দিতা মেয়েটাকে দেখলেন। ঘামে লেপ্টে রয়েছে মুখটা। হাতের মুঠোয় শক্ত করে মোবাইলটা ধরা। এই মেয়েটা সঙ্গ দেবে? সারাদিন পাশে বসে থাকবে?

মিতালিও দেখল নন্দিতাকে। এক প্রৌঢ়া বিছানায় প্রায় মিশে আধ শোওয়া হয়ে রয়েছেন। এঁর মেয়ের সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা হয়েছিল। কথা মানে এক তরফা। মেয়ে থাকে আমেরিকায়। কাকভোরে সময় দিয়েছিল কথা বলার। অনেক কিছু বলেছিল। তবে একটাই কথা মনে আছে মিতালির, “মায়ের কিন্তু গভীর অসুখ। হয়ত বেশিদিন আর মাকে ধরে রাখতে পারব না। আমি এমন একজন মেয়েকে চাইছি, যে মাকে সত্যি করে কোম্পানি দেবে। মায়ের প্রয়োজনগুলো বুঝবে।”

মিতালি কিছু বলেনি। সেন্টারের কেয়াদি কাজটা ধরেছিল। আমেরিকার মেয়েটাকে বলেছিল মিতালির কেয়ার গিভারের ভাল অভিজ্ঞতা আছে। ক্লায়েন্টদের ফিডব্যাক খুব ভাল। কেয়াদি মিথ্যে কথা বলেছিল। মিতালির কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। এই কাজ এই প্রথমবার। কেয়াদি আসলে ওরকমই। হাতে কোনও আর লোক ছিলনা। কেয়াদি টাকার জন্য সব পারে। আয়াদের নার্সের পোশাক পরিয়ে নার্স করে পাঠায়।

মিতালি দাঁড়িয়ে আছে। নন্দিতা জ্যোৎস্নাকে বললেন, “আমাকে উঠিয়ে হুইল চেয়ারে বসাও।”

“আপনি বলুন না মাসিমা কী করতে হবে?” জ্যোৎস্না ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল।

“আহ! যা বলছি কর।”

জ্যোৎস্না নন্দিতাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে হুইল চেয়ারে বসাল। মিতালি ঠিক বুঝে উঠতে পারল না এইসময় কী করা উচিত। জ্যোৎস্না অবশ্য আন্দাজ করতে পেরেছিল নন্দিতা হুইল চেয়ারে করে কোথায় যেতে চান। বসার ঘরে ওই বিদঘুটে ঘড়িটার সামনে। মিতালি পেছন পেছন এলো।

“দম দিয়ে দেব মাসিমা?” জ্যোৎস্না জিজ্ঞেস করল।

“না, আজকে তুমি এই মেয়েটাকে দেখিয়ে দাও কীভাবে দম দিতে হয়।”

কেয়ারগিভার হিসেবে প্রথম কাজ। দম দেওয়ার জন্য ডায়ালের মধ্যে চাবি লাগাতে হয়। জ্যোৎস্নার কাছে বুঝে নিয়ে মিতালি সাবধানে চাবি ঘুরিয়ে দম দিতে থাকল। নন্দিতা কিছুক্ষণ দেখে চোখ বন্ধ করলেন। বড়বাবা একই ভাবে প্রাণের স্পন্দন শুনিয়ে যাচ্ছে। টিক… টক… টিক… টক…। নন্দিতা এই শব্দের ভাষা বুঝতে পারেন। বড়বাবা খুশি হচ্ছেন। মিতালিকে পছন্দ হয়ে গেল নন্দিতার। তবে পছন্দ হওয়া আর বিশ্বস্ত হওয়া, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রথম কয়েক সপ্তাহ নন্দিতা শুধু মেয়েটাকে দেখলেন। মিতালি কীভাবে সঙ্গ দেয়, কেয়ার গিভারের কাজটা আসলে কী।

মিতালির অভিজ্ঞতা নেই। যেভাবে কেয়াদি শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠিয়েছে। মিতালি খবরের কাগজ পড়ে শোনায়। কখনও টিভিতে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেষ্টা করে কোন চ্যানেলে ভাল সিরিয়াল হচ্ছে, সেটা নন্দিতাকে দেখানোর। দুজন মানুষের পছন্দ কখনও এক হয়না। নন্দিতা চুপ করে থাকেন। যে খবর মিতালি পড়ে শোনায়, সেসব শুনতে নন্দিতার ভাল লাগেনা। হয় খুন জখমের খবর না হয় সংসারে কুটকাচালির সিরিয়াল। সবসময় নন্দিতার কানের কাছে বাজে বড়বাবার টিক… টক… টিক… টক…। নন্দিতা জানেন তাঁর জীবনের টিক… টক… শেষ হয়ে আসছে। যে বড়বাবাকে এত যত্ন করেছেন, এত ভালবেসেছেন সেই বড়বাবা আসলে বড্ড নির্দয়। টিক… টক…ছন্দটাকে প্রলম্বিত করেনা। আবার মিতালিও যেন চায় টিক… টক… আরও দ্রুত হয়ে তাড়াতাড়ি ছ’টার ঘণ্টাটা বেজে উঠুক। বড়বাবা যথারীতি কোনও পক্ষেরই মন রাখেনা। 

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেল। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ় এলো। গ্রীষ্মর ভাপ মুছে বৃষ্টি নামল শহরে। এই কয়েকমাসে নন্দিতা বুঝতে পেড়েছেন, মিতালির ওপর ওঁর কোনও নির্ভরতা জন্মায়নি, বরং মনের মধ্যে জমা হয়েছে একরাশ মায়া। সেটার কারণ হয়ত পড়াশোনায় ক্ষান্ত দিয়ে অভাবের তাড়নায় মিতালি এই কাজটা করছে। আসলে নন্দিতার মনটা খুব নরম। অনেকেই বুঝতে পারেনা। তিন মাসে একদিনই মিতালি ছুটি নিয়েছিল, নন্দিতা একটা শূন্যতা টের পেয়েছিলেন। আর সেই দিনটাকেই বেছে নিয়েছিল জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নার প্রথম থেকেই পছন্দ নয় মিতালিকে। মাসিমার মেয়ে বিদেশে থাকে, অঢেল পয়সা আছে বলে মেয়েটাকে রেখেছে। কিন্তু মেয়েটাতো শুধু ফাঁকিবাজির কাজ করে। একবার বাথরুমে পর্যন্ত নিয়ে যেতে হলে সেই জ্যোৎস্নাকে ডাকে।  মিতালি যেদিন আসেনি নন্দিতার কান ভরিয়ে দিতে চেয়েছিল জ্যোৎস্না।

“মাসিমা, ওই মেয়েটার মা নাকি অসুস্থ বলে ছুটি নিয়েছে?”

“হুম।”

“মিথ্যে কথা বলেছে। ওর একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম আছে। রোজ তো বাইকে করে সন্ধেবেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আসে। আজকেও আসার সময় দেখলাম সেজেগুজে বাইকে যেতে। আপনার তো আবার দয়ার শরীর। দিদিকে বলে আজকের মাইনে কাটাবেন।”

বিরক্ত হয়েছিলেন নন্দিতা, “আহ জ্যোৎস্না। তোমাকেও তো আমি কত ছুটি দিয়েছি। মাইনে কেটেছি কি কখনও? কারও ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আমাকে বলতে এসো না।”

একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। জ্যোৎস্না এসে বলল রাস্তায় গোড়ালি ডোবা জল। জল আরও বাড়ছে। নন্দিতা ধরেই নিয়েছিলেন, মিতালি আর আসতে পারবে না। কিন্তু মিতালি এলো। ভিজে গিয়েছে। মিতালি ব্যাকপ্যাকে নিজের সব জিনিস প্রতিদিন নিয়ে আসে। পোশাক, গামছা, টিফিন। ভিজে পোশাক বদলে গামছায় মাথা মুছে মিতালি বারন্দায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল। নন্দিতা খাটে আধশোয়া হয়ে এক মনে মিতালিকে দেখছিলেন। রাস্তায় কি ওর প্রেমিক ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে? বহুদিন আগের একটা দিন মনে পড়ে গেল নন্দিতার। বিশ্বনাথের সঙ্গে বিয়ের পাকা কথা হয়ে গিয়েছে। বিশ্বনাথ মাঝে মাঝে নানান অছিলায় নন্দিতাদের বাড়িতে আসত। একদিন ঠিক এভাবেই নন্দিতা বারন্দায় চুল আঁচড়াচ্ছিল আর হটাৎ-ই চোখে পড়েছিল রাস্তায় বিশ্বনাথ দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখছে।

সেদিন ক্যাসেট প্লেয়ারে একটা গান চালিয়ে ঘর বন্ধ করে নেচেছিল কুড়ি বছরের নন্দিতা। আজ গানটার কথা খুব মনে পড়তে থাকল। আলমারির মধ্যে ক্যাসেট প্লেয়ার, ক্যাসেটগুলো আজও আছে। মিতালি ঘরে আসার পর বালিশের তলা থেকে আলমারির চাবিটা বার করে মিতালির হাতে দিয়ে বললেন ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেট বার করতে। মিতালি খুব অস্বস্তিতে পড়ল। কখনও আলমারি খোলেনি। তবে নন্দিতা জোর করলেন।

আলমারি ভর্তি ঠাসা জিনিস আর অদ্ভুত একটা গন্ধ। নন্দিতা খাটে বসেই বুঝিয়ে দিলেন কোথায় ক্যাসেট প্লেয়ার আর ক্যাসেটগুলো গুছিয়ে রেখেছেন। একটা ক্যাসেট খুঁজছেন যেখানে ‘আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে’ গানটা রয়েছে। মিতালি সেই ক্যাসেটটা খুঁজতে থাকল। জ্যোৎস্না একবার ঘরে ঢুকে বিস্ফারিত চোখে দেখল মিতালি মাসিমার আলমারি খুলে ঘাঁটাঘাঁটি করছে।

অবশেষে ক্যাসেটটা খুঁজে পেল মিতালি। ক্যাসেটের লে-আউট কভারে বারোটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে গানটা আছে। কিন্তু ক্যাসেট প্লেয়ারটা বহুদিনের পুরনো। ক্যাসেটটা আর বাজল না। নন্দিতার পাংশু মুখটা আরও শুকনো হয়ে উঠল। চোখ বন্ধ করে নিলেন। কানের কাছে শুধু বড়বাবার টিক… টক… টিক… টক…শব্দ। সেই শব্দ কিছুতেই নন্দিতাকে কোথাও পৌঁছিয়ে দিচ্ছে না। এমন সময় কোলে বেজে উঠল, ‘আজি   ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না’

নন্দিতা চমকে উঠে চোখ খুললেন। কোলের ওপর মিতালির মোবাইল ফোনটা। স্ক্রিনটা অল্প ভাঙ্গা। সেখান থেকে গানটা বেরচ্ছে। নন্দিতা আবার চোখ বন্ধ করলেন। কী আশ্চর্য! বড়বাবার পর্যন্ত পছন্দ হয়েছে গানটা। তালে তাল মেলাচ্ছে, টিক… টক… টিক… টক…।

গানটা শেষ হল। নন্দিতা চোখ খুললেন। চোখ জলে ভিজে গিয়েছে। মিতালি ইতস্তত গলায় বলল, “ইউ-টিউব”

নন্দিতা প্রথমবারের মত বুঝতে পারলেন, কেয়ার গিভারের মানে কী। মিতালিকে কাছে ডাকলেন, “আয়, কাছে আয়।”

মিতালির চিবুকটা ধরে একটা চুমু খেয়ে বললেন, “যা, ক্যাসেটগুলো আলমারির যেখানে ছিল রেখে দিয়ে আয়। আর ওপরের তাকে সোনালী জরির কাজ করা একটা লাল ভেলভেটের বাক্স আছে, নিয়ে আয়।”

মিতালি ভেলভেটের বাক্সটা নিয়ে এসে নন্দিতার হাতে দিতে নন্দিতা বাক্সটাকে খুলে একবার দেখলেন। একটা রুপোর মাথা বাঁধানো চিরুনি আর রুপোর ফ্রেমের হাত আয়না। বাক্সটা বন্ধ করে মিতালির হাতে দিয়ে বললেন, “এটা রাখ। এটা তোকে দিলাম। এবার থেকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন চুল আঁচড়াবি, এটা দিয়ে আঁচড়াবি।”

কিছুতেই নিতে চায়নি মিতালি। রুপোর জিনিস। কত দাম! তবু নন্দিতা জোর করে দিয়েছিলেন। একটা যেন নতুন সম্পর্কের শুরু হল। তারপর ক্যালেন্ডারের তারিখ যত এগোতে থাকল মিতালিকে দেওয়া জিনিস ততই বাড়তে থাকল। দামি দামি শাড়ি, শখের ঘর সাজানোর জিনিস। নেহাত সোনার গয়নাগুলো ব্যাঙ্কের লকারে ছিল। নাহলে সেগুলোও হয়ত দিয়ে দিতেন। কারণ নন্দিতার একটা তাড়া ছিল। তিনি নিভে যাওয়ার আগে শখের জিনিসগুলো কাউকে দিয়ে দেওয়ার। মেয়েটাতো বড়বাবাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছে ওঁর শেষ নিশ্বাসের সঙ্গে বড়বাবার শব্দ মিশিয়ে রাখার জন্য।  

এই ব্যাপারটা রঞ্জিনীর আর অজানা থাকল না। জ্যোৎস্না পুরনো আয়া। রঞ্জিনী মাঝে মাঝে জ্যোৎস্নার কাছে মায়ের খোঁজ নেয়। জ্যোৎস্না এমনিতেই মিতালিকে দেখতে পারে না। তার ওপর মাসিমা মেয়েটাকে কী কী জিনিস দিয়ে দিচ্ছে সব হিসেব রাখে। জ্যোৎস্নার মনে হয় নিজে খেটে মরছে, আর মরতে যাওয়া বুড়ি একটা ফুটো কড়িও জ্যোৎস্নাকে দেয়না। একদিন রঞ্জিনী ফোন করতেই জ্যোৎস্না যতটা পারে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে রঞ্জিনীর ভেতর ভয় ঢোকানোর চেষ্টা করল, “তুমি কাল সাপকে বাড়িতে এনে তুলেছ দিদি।”  

রঞ্জিনী ফোনটা রাখার পরও জ্যোৎস্নার কথাটা কানের ভেতর থেকে গেলনা। ‘সাপ এনে তুলেছ’ কথাটা মাথার মধ্যে বাজতে থাকল। নিজে ইন্টারভিউ নিয়ে মেয়েটাকে রেখেছে। নিজের কাছেই নিজের একটা দায় আছে। অন্যদিকে মা মেয়েটার ভূয়সী প্রশংসা করে। কার সঙ্গে এটা নিয়ে আলোচনা করা যায়?  ভাইকে বলে লাভ নেই। মায়ের ব্যাপারে ভাইয়ের কোনও সময় নেই। ডক্টর গাঙ্গুলি নন্দিতাকে দেখেন। উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিয়ে এই যুগেও বাড়িতে গিয়ে দেখে আসেন। অসহায় হয়ে ডক্টর গাঙ্গুলিকেই ফোনে বলল রঞ্জিনী।

“দেখুন রঞ্জিনী, আপনার মায়ের হেলথ কন্ডিশনটা আপনি জানেন। ওঁর একাকীত্বটাও  জানেন। মেয়েটাকে আমি আপনাদের বাড়িতেই দেখেছি। মিসেস দেবনাথের সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক কেয়ার কিভার আর পেশেন্টের মত নয়। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। তাছাড়া মিসেস দেবনাথের সোডিয়াম পটাশিয়াম লেভেলটা স্টেবল নয়। খুব যদি আপনাদের কিছু ক্ষতি না হয়ে যাচ্ছে, আমার পরামর্শ, মেয়েটাকে আরও কিছুদিন রেখে দেখুন।” 

ক্যালেন্ডারে মাস বদল হল। বেশ কয়েকটা মাস হয়ে গেল মিতালির নন্দিতার কাছে। মিতালি এখন আর খবরের কাগজ পড়ে শোনায় না, টিভিতে সিরিয়াল চালিয়ে দেয় না। সারাদিন গল্প করে। কত রকমের গল্প। এই গল্পগুলো থেকেই তো খবরের কাগজে খবর হয়। সিনেমা সিরিয়াল হয়। নন্দিতার জীবনের গল্পের লক্ষ্মী ভাঁড়টা আরও অনেক বড়। সেখান থেকে বেছে বেছে গল্প শোনান। স্কুলবেলার কথা। সাবেকি শ্বশুর বাড়িটার কথা। পাহাড়ে, সমুদ্রে বেড়াতে যাওয়ার গল্প। মিতালিকে এখন আর বাড়ি থেকে টিফিন আনতে দেন না। জ্যোৎস্নার করা রান্না দুজনে মিলে একসঙ্গে খান।

আকাশের কালো মেঘ কেটে গেল। ভাদ্র মাসে নন্দিতার শরীর আরেকটু ভাঙল। তারপর শরৎ এলো। পুজোর গন্ধ যেন আকাশে বাতাসে। নন্দিতা গল্প করছিলেন ওঁর ছোটবেলায় পুজোর কেমন কেমন গান বেরত। ‘আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে’, ‘যদি এখনও আমাকে শুধু ভালো লাগে’, ‘আজ শরতের কাশের বনে’। শুধু পুজোর গানই নয়, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজত কত সেবছরের সিনেমার হিট গান, ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’… নন্দিতা মনে করে করে গানগুলো বলেন আর মিতালি নিজের মোবাইলে ইউটিউব থেকে খুঁজে খুঁজে নন্দিতাকে শোনায়।

একদিন মিতালি এসে উত্তেজিত গলায় বলল, “আজকে প্যান্ডেলের কাঠে কাপড় পড়ল।”

নন্দিতা বিড়বিড় করে বললেন, “এটাই আমার শেষ পুজো।”

মিতালি শুনতে না পেয়ে বলল, “কিছু বললেন?”

নন্দিতা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “দেখেছিস মিতালি, একটা কথা একদম ভুলেই গিয়েছি। পুজোর মধ্যে একদিন আমার এক বন্ধুর নাতনি দেখা করতে আসবে। মেয়েটার এই মাসেই জন্মদিন। ভাবছি একটা মোবাইল দেব। তুই তো এসব বুঝিস, আমি তো কিছুই বুঝি না। দেখে দে তো একটা ভাল দেখে।”

মিতালি ওর মোবাইলে অ্যামাজনের অ্যাপে মোবাইলের লিস্ট বার করে নন্দিতার হাতে দিয়ে বলল, “আপনি স্ক্রল করে করে দেখুন। আমি বড়বাবাকে দম দিয়ে আসছি।”

নন্দিতা দেখতে থাকলেন। ঠোঁটের কোণায় মুচকি হাসি। বড়বাবার স্পন্দন শুনতে পেলেন, টিক… টক… টিক… টক…। মনে মনে যেটা ভেবেছেন, বড়বাবা সমর্থন করছে। মিতালি ফিরে আসার পর ছদ্ম রাগ দেখালেন, “এ আমাকে কী ধরিয়ে দিয়ে গেলি! তোকে বললাম না, আমি এসব কিছু বুঝি না। সবচেয়ে ভাল ফোন কোনটা দেখা।”

“সবচেয়ে ভাল ফোন, আইফোন। শুনেছি দারুণ ক্যামেরা। কিন্তু অনেক দাম।”

“দাম নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। দেখা কোনটা।”

মিতালি আইফোন দেখাল। কী কী রঙের পাওয়া যায় দেখাল। পাঁচটা বিভিন্ন রঙ। নন্দিতা বললেন, “আমি তোদের বয়সী মেয়েদের পছন্দ বুঝি না। তোর কোন রঙটা ভাল লাগছে?”

মিতালি নিচু গলায় বলল, “নীল।”

নন্দিতা লক্ষ করলেন, মিতালির চোখে একটা ছোট্ট ঝিলিক, যেটা ও নিজেও বোধহয় বোঝেনি। তারপর মিতালি গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “নীল। মানে, আপনার বন্ধুর নাতনির মনে হয় পছন্দ হবে।”

“বেশ। নীলটা এবার অর্ডার করে দে দেখি।”

মিতালি ফোন ঘেঁটে বলল, “ক্যাশ অন ডেলিভারি নেই। কার্ডে কিনতে হবে।”

“আমার আলমারিটা খোল। ড্রয়ারটা আট নম্বর চাবি দিয়ে খোল। ড্রয়ারে একটা কার্ড আছে। ওটা নিয়ে এসে কিনে দে।”

“আমি আলমারির ড্রয়ার খুলে কার্ড বার করব?” ইতস্তত গলায় জিজ্ঞেস করল মিতালি।

নন্দিতা বিরক্ত হলেন, “যা বলছি, কর। এই বাড়ির ঠিকানাতে আনিয়ে নে। মেয়েটাকে নিজের হাতে দেব।”

অ্যামাজন থেকে দুদিনের মাথায় ডেলিভারি হয়ে গেল আইফোনটা। মিতালিই দরজা খুলে ডেলিভারি নিল। বাক্সটা নন্দিতার হাতে দিতেই নন্দিতা সেটা আবার মিতালির হাতেই বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমার বন্ধুর নাতনিটা হচ্ছিস তুই। আর কতদিন ফাটা স্ক্রিনের মোবাইলে আমাকে গান শোনাবি?”

মিতালি কিছুক্ষণের জন্য পাথর হয়ে গেল। ফোনের দামটা নিজে জানে। এই বাড়িতে যবে থেকে কাজ করছে, যা মাইনে পেয়েছে, তার সব যোগ করলেও এই ফোনের দাম হবে না। প্রথমে আপত্তি জানিয়ে কোনও কাজ না হওয়ায় নন্দিতাকে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল মিতালি। নন্দিতাও কেঁদে ফেললেন। বলতে থাকলেন, “আমি জানি তোর একটা ছেলে বন্ধু আছে। কোনদিন বলিসনি কিন্তু ওর কথা। বললি তো এই মোবাইলের ক্যামেরাটা ভাল। একটা দুজনের, ওই কী যেন বলিস তোরা আজকাল… সেলফি তুলে এনে দেখাস তো!”

 এই ঘটনার সাক্ষী রইল কেবল দু’জন বড়বাবা আর জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্না আর থাকতে পারল না। এবার আলমারির ভেতরে ড্রয়ারে কার্ডে হাত পড়েছে মেয়েটার। রঞ্জিনীকে ফোনে জানিয়ে দিল।

এতদিন সহ্য করে গিয়েছে রঞ্জিনী। এবার মনে হল, সত্যিই কাল সাপ পুষেছে। রাত্রিবেলায় ফোন করল মা’কে, “মা তোমার সঙ্গে আমার সিরিয়াস কিছু কথা আছে।”

“বল।”

“কথাটা তোমার কেয়ার গিভার মিতালিকে নিয়ে। আমি কিন্তু সব খবর পাই মা।”

“অনুমান করছি কার কাছ থেকে তুই খবর পাস। আমি আমার সব জিনিস একটা একটা করে মিতালিকে দিয়ে দিচ্ছি, তাইতো? হ্যাঁ, দিচ্ছি। আমার সব থেকে প্রিয় জিনিসগুলো ওকে দিয়ে দিচ্ছি। কেন জানিস? আমি যখন প্রথম তোদের বড়িতে বউ হয়ে এসেছিলাম, তোর দাদু ঠাকুমা আমাকে গোটা বাড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিনিয়েছিলেন। শুধু ঘরদোর নয়। একেকটা শখের জিনিস। সব শখের জিনিসের একটা করে গল্প ছিল” এইটুকু বলে নন্দিতা হাঁফিয়ে গেলেন।

“তুমি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছ মা।”

“আমার বলা এখনও শেষ হয়নি। তারপর একদিন সেই বাড়ি ভাঙ্গা হল। কত শখের জিনিস জলের দামে কারা যে নিয়ে গেল কেউ জানেনা। কত জিনিস কাবাডিওয়ালারা নিয়ে গেল। আমি শুধু বড়বাবাকে বাঁচাতে পেরেছিলাম। আমি মারা যাওয়ার পর তুই বা তোর ভাই, কেউ বাঁচিয়ে রাখতে পারবি বড়বাবাকে?”

“মা, তুমি বুঝতে পারছ না।”

“না, তোরা কেউ বুঝতে পারছিস না। আমারও অনেক শখের জিনিস আছে। আমার একটা শাড়িও তুই কোনদিন পড়বি? আমার বউভাতের বেনারসিটা কোন রঙের ছিল কোনদিন জিজ্ঞেস করেছিস আমাকে? তার চেয়ে কেউ একজন পরুক, দেখুক, একটা গল্প থাকুক গায়ে জড়ানো। আমার পরে আমার প্রিয় জিনিসগুলো যাতে যত্নে থাকে আমি শুধু তার একটা ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। আমার হাতে যা আছে, সেটা আমি কাউকে দিতে চাইলে, সেটা আমার অধিকার। আমি মরে গেলে এসব জিনিস তো তোরাই বিক্রি করে দিবি, নয়তো ফেলে দিবি। তার চেয়ে বেঁচে থাকতে থাকতে যদি কাউকে দিয়ে যাই, যে সত্যিই ব্যবহার করবে, তাতে ক্ষতি কী?”

রঞ্জিনী বুঝতে পারল মা’কে আজ সহজে বোঝাতে পারবে না। আসল কথাটায় এলো, “বেশ, তোমার শখের জিনিস তোমার যাকে মনে হচ্ছে তাকে দিচ্ছ মা। আমি এতদিন জেনেও আপত্তি করিনি। কিন্তু তুমি নাকি মিতালিকে অনলাইনে ফোন কিনে দিয়েছ? তোমার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে যা দাম দেখলাম, মনে হচ্ছে আইফোন। আর মেয়েটাই নাকি তোমার কার্ড দিয়ে নিজের হাতে ট্রানজাকশন করেছে। ওই কার্ড নম্বর, সিভিভি সব ওই মেয়ে জানে এখন।”

“মেয়েটার ফোনটা ভাঙ্গা। ওই ফোনে রোজ কত গান শোনায় আমাকে।”

“এটা কোনও যুক্তি হল?”  

“যুক্তি দিয়ে তো তোরা সবাই দূরে থেকে গিয়েছিস। তুই আমেরিকা, তোর ভাই বেঙ্গালুরু। যুক্তিতে কি ভালবাসা হয়?” একটু চুপ করে থেকে নন্দিতা বললেন, “গতবার তুই যখন এসেছিলি কার্ডটা আমাকে দিয়ে বলেছিলি, আমার ব্যাঙ্ক আক্যাউন্টে কার্ডটা এমারজেন্সির জন্য নিয়েছিস। আমার কাজের লোকেদের সব টাকাটাই তো তুই দিস। তোর বাবা স্বর্গ থেকে মাসে মাসে যে বিধবা পেনসনটা পাঠায় সবটাই জমে। কদিন পর মরে যাব বলে আমার কি কিছু নতুন শখ হতে পারে না? সেগুলো মিটিয়ে যেতে পারি না?”  

“না মা, এটা শুধু তোমার আর ওর ব্যাপার না। তুমি অসুস্থ, একা থাকো, আর একটা মেয়ে তোমার কার্ড হাতে নিয়ে যা খুশি করতে পারে। তুমি বোঝোই না এসব।”

“আমি বুঝি। তুই যা ভাবছিস, তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝি।” নন্দিতার এই তেজি গলাটা রঞ্জিনী বহুদিন শোনেনি।

রঞ্জিনী কিছুতেই নন্দিতাকে বোঝাতে পারল না। শেষে ধৈর্য হারিয়ে বলল, “তোমার সেফটি সিকিওরিটির কথা ভেবেই আমি শেষ কথা বলছি মা। কেয়াকে বলে দিচ্ছি, কাল থেকে অন্য মেয়ে পাঠাবে।”

কিছুক্ষণ থম মেরে থাকলেন নন্দিতা। বুঝলেন, মেয়ের সঙ্গে আর তর্ক করে লাভ নেই। মেয়ে টাকা পাঠায়, ব্যবস্থা করে, দূর থেকে ভালবাসে। আর সেই দূরত্বই তার সিদ্ধান্তকে অটল করে রেখেছে। সেই একই জেদ, যেটা নিজের রক্তে রয়েছে। নন্দিতা বুঝলেন মেয়ে কাছে থেকে দেখলে যে দ্বিধাটা আসত, দূর থেকে সেটা আসতে পারেনা। নন্দিতা বললেন, “থাক। তোকে বলতে হবে না। আমি নিজেই বলে দেব।”

বসার ঘর থেকে ভেসে আসছিল বড়বাবার চেনা শব্দ, টিক… টক… টিক… টক…, আজ যেন সেটা খুব গম্ভীর।

পরের দিন নিয়ম মত সময়ে মিতালি এলো। হাতে নতুন ফোন। মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল।  গতকাল এখান থেকে বেরিয়ে প্রথমেই সুমিতকে দেখিয়েছিল ফোনটা। সুমিত যেন বিশ্বাসই করতে পারেনি। যে বুড়ি পুরনো সব জিনিস দেয়, সে একটা আস্ত নতুন আইফোন দিয়েছে মিতালিকে। তারপর সুমিতের সঙ্গে দোকানে গিয়ে পুরনো অ্যানড্রয়েড ফোনটার পেট থেকে সিম বার করে নতুন আইফোনের পেটে ঢোকানো। অ্যানড্রয়েডের থেকে আইফোনে সবই যেন উল্টো। কনফিগার করা, শেখা। আর নন্দিতাকে দেখানোর জন্য সুমিতের সঙ্গে একটা সেলফি তোলা। একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করেই নন্দিতাকে প্রথমেই সেই সেলফিটা দেখাতে গিয়ে মিতালি খেয়াল করল, নন্দিতার মুখটা খুব গম্ভীর।

“আপনার শরীর খারাপ নাকি আজকে?” চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল মিতালি।

একটু সময় নিয়ে নন্দিতা বললেন, “আজ থেকে তোর আর দরকার নেই মিতালি। তুই বাড়ি চলে যেতে পারিস।”

মিতালি প্রথমে থতমত খেয়ে গেল। একরাত্রিতে মানুষটার কী হল? ঢোক গিলে শুকনো গলায় বলল, “আমি কি কিছু ভুল করেছি?”

নন্দিতা মাথা নাড়লেন, “না। আমার কাছে তোকে পাঠিয়েছিল আমার মেয়ে। সে ঠিক করেছে, কাল থেকে তুই নয়, অন্য কোনও মেয়ে আসবে।”

চুপ করে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে মিতালি বলল, “কেন?”

“আমার মেয়ে ভাবছে, তুই আমার সাথে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ছিস। ওর ভয়, এটা ঠিক হচ্ছে না।”

মিতালি কিছু বলতে পারল না। চোখ জলে ভরে এলো। নন্দিতা ডাকলেন, “আয়, আমার কাছে আয়।” তারপর মিতালির হাতটা ধরে বললেন, “শোন, তোকে একটা জিনিস দিতে চাই। শেষ দিন বলে না, অনেকদিন ধরেই দেব ভাবছিলাম। আলমারিটা একবার শেষবারের মত খোল। ড্রয়ারে একটা জলরঙের বাক্স আছে। ওটা তুই নিয়ে যা। চল্লিশ বছর আগে সমুদ্র আঁকব বলে কিনেছিলাম। তারপর কতবার সমুদ্র দেখেছি কত জায়গায়। কিন্তু ছবিটা কোনওদিন আঁকা হয়নি। তুই রাখ, তুই আঁকিস।”

মিতালি আর আলমারিটা খুলতে চায়নি। কিন্তু নন্দিতার আবেগের কাছে হার মানল। আজকে তাড়িয়ে দিলেও কত জিনিসই না দিয়েছেন মানুষটা সত্যিকারের ভালবাসা থেকে। আলমারির ড্রয়ারটা খুলে মিতালি অনেকক্ষণ জলরঙের বাক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নাড়ল, “না। এটা আপনার থাকুক।”

“কেন? আমি তো তোকে দিতে চাইছি।”

“আপনি অনেক কিছু দিয়েছেন আমাকে। আমি কোনদিন কিছু দিতে পারিনি আপনাকে। আজ আপনাকেও কিছু দিতে চাই।”

মিতালি ব্যাকপ্যাক থেকে নিজের নোটবই বার করল, একটা পাতা ছিঁড়ল। রান্নাঘর থেকে কাপে খানিকটা জল নিয়ে এসে মাটিতে বসে জলরঙের বাক্সটা খুলে অনেকক্ষণ ধরে তুলি বুলিয়ে চুপ করে একটা ছবি আঁকল। নিস্তব্ধ সেই সময়ে বড়বাবা শুধু সময় বইয়ে নিয়ে গেল, টিক…টক…টিক…টক…।

একটা সময়ে কাগজটা হাতে নিয়ে নন্দিতার হাতে দিল মিতালি। নীল আর ধূসরের মিশেলে অসম্পূর্ণ, আনাড়ি হাতে আঁকা সমুদ্র, দিগন্তে একফালি আলো।

“এই নিন আপনার সমুদ্র। আপনার কাছে যেমন গল্প শুনেছি। আর তো এবাড়িতে আসতে পারব না।”

ছবিটা দুহাতে ধরে নন্দিতা বললেন, “হয়ত আমিও আর থাকব না। এই আমার শেষ সমুদ্র দেখা।”   

মিতালি চোখ মুছে বলল, “আমার শেষ কাজটা করে যাই। বড়বাবাকে দম দিয়ে যাই।”

নন্দিতা কড়া গলায় বলে উঠলেন, “না। তোর সঙ্গে এবাড়ির সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে মিতালি। আর দরকার নেই। তুই যা।”

পুজো পেরল। শরৎ শেষে হেমন্ত এলো। গাছের পাতা ঝরতে থাকল। ক্যালেন্ডারের পাতাও উলটোতে থাকল। হয়ত শীত এলো। নন্দিতার শরীর আরও ভেঙে পড়ছে। বিছানায় যেন মিশে গিয়েছেন। কানে প্রায় শুনতেই পান না। তাই জানেন না বড়বাবা এখন নিথর হয়ে গিয়েছে। বড়বাবা এখন বসার ঘরে শুধু ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পুরনো, ঢাউস আসবাব। ঠিক কবে চিরকালের মতো নিঃশব্দে এপাশ থেকে ওপাশ করার পেন্ডুলামে বড়বাবার দম ফুরিয়ে গিয়েছিল, কেউ লক্ষ্য করেনি।

নন্দিতা এখন আর বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। নতুন যে কেয়ার গিভার মেয়েটা আছে তার নামটা মনে রাখতে পারেন না। জ্যোৎস্নার সঙ্গেই বেশি সময় কাটায় মেয়েটা। মাঝে মাঝে কাছে এলে মিতালির এঁকে যাওয়া ছবিটা চান। ছবির মধ্যে একটা মেয়ে ডুবে রয়েছে। সেটা তিনি নিজে না মিতালি বুঝতে পারেন না। সারা ছবিতে হাত বুলিয়ে তার আঙ্গুলটা খোঁজেন। বুঝতে পারেন জলের মধ্যে ডুবে রয়েছে বড়বাবাও। আঙ্গুলে শব্দের স্পর্শ পান, টিক… টক… টিক… টক…  

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *