চুলা সারাই
নাসিমা আনিস
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে পানি পিপাসা পেলে ডাইনিং পর্যন্ত গেলেই পানির জগ আর উপুর করা পানির গ্লাস, রান্নাঘরে কী দরকার তবে! ঐ যে, চুলাটাকে এক নজর দেখব, বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখা ক্ষতটাকে উস্কে দিতে হবে না! জানি আমাকে দেখা মাত্র কঁকিয়ে উঠে বলবে, মাগো আমায় ফেলে দেবে না, আমাকে বাঁচাও! তারপর ঘুম ছুটে গেলে এস্কেদকে গাল দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ব!
রান্নাঘরে গিয়ে চুলাটার দিকে তাকিয়ে থাকি, জায়গায় জায়গায় পুড়ে গিয়ে কালো-ছাই মেশানো বিশ্রী দাগগুলো রাতের আলোয় আরো উজ্জ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে। বললে হয়ত বিশ্বাস করবেন না, ব্যাপারটা অবিশ্বাস্যই, পাঁচ বছরের পুরাতন চুলাটা আমার, আপনার মনে হতো গতকাল কিনে এনেছি। এমন পরিষ্কার আর চকচকে নতুন ছিল পরশুও। সাদা স্টিল রুপার মতো উজ্জ্বল। রান্নার পর চুলা পরিষ্কার করা আমার নৈমিত্তিক কাজ। আমার পঞ্চাশ ছোঁয়া মুখের ত্বকও এত যত্ন পায়নি কোনো কালে, সত্যি! এক ফোঁটা তেল-মসলার কণা পড়ে থাকবে, লুকিয়ে আমার অসতর্ক দৃষ্টির আড়ালে, তা হতেই পারে না। রাশেদা বুয়া তিন কাজ করে, থালাবাটি হাড়িকুড়ি ধোয়া, কাপড় কাচা আর ঘর মোছা। অন্যান্য মোছামুছি আর রান্নাটা আমিই করি, করতে ভালোই লাগে। আসল কথা কারো কাজ আমার পছন্দই হয় না! আমি খেয়াল করে দেখেছি রাশেদা বুয়া আমার চুলার দিকে তাকিয়ে থাকে সময় পেলেই, ঈর্ষা কি হিংসা নাকি ভাবে আমার বাড়াবাড়ি! একদিন বলেই ফেলে, আফার চুলা দেখলে মন কয় যেন রান্ধেন বাড়েন না! আমি বলি, চুলাটা খুব সখ করে স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে কিনেছি, সাধারণ চুলা তিন চার হাজারে পাওয়া যায়, আমি নিজের টাকা যুক্ত করে সাড়ে সাত দিয়ে কিনেছি। আমার প্রিয় জিনিস এটা, বুঝেছ! সে মাথা নাড়ে, খুব বুঝেছে!
মাস কয়েক পর রাশেদা বুয়া আবিস্কার করে হাড়ির নিচে কালি, কড়াইয়ের নিচে কালি, সেই কালি টাইলসের তাক কালো করে দিচ্ছে – খালাম্মা চুলা সারাইরে দিয়া চুলাডা এট্টু দেহায়েনচি! আমি পাত্তা দেই না, সামান্য একটু কালির জন্য রান্নাঘর পর্যন্ত একটা লোক ঢুকাতে রাজি নই আমি। কিন্তু কালি যে মেজে-ধুয়ে উঠায়, তার আব্দার কি ইচ্ছা তো দুর্দমনীয়। দুই দিন পর পর ঐ এক কথা, চুলা সুন্দর হইলে কি, কালি উডে! কথাটা বলার সময় মনে হয় একটু ঠোঁট উল্টায় অবজ্ঞায়! এক সময় মনে হয় আমার প্রিয় জিনিসটাকে এইভাবে কালিমাখা করা আর সহ্য হচ্ছে না। রোজ রান্নার পর চুলাটা মুছি, মুছতে মুছতে কোথায় একটু বিরক্ত জমা পড়ে, বলি, এত সুন্দর রোদের মতো ঝলমল জিনিস, কালি ওঠে! পাঁচ বছরে এর কোথাও কোনো তেলকষ্টা দাগ নাই, শত ব্যবহারে মলিনতার চিহ্ন মাত্র নাই। কিশোরীর বাহুর মতো পেলব, মসৃণ, চকচকে। কেউ বিশ্বাসই করে না এটার বয়স পাঁচ! ত্রিশ বছরের সংসারে এই প্রথম দামি চুলা নিজের তিল তিল করে জমানো পুঁজি যুক্ত করে, বড়ো আনন্দ হয়েছিল। এর আগে চুলা যতই পরিষ্কার করতাম কিছুতেই পরিষ্কার লাগত না, স্টিলটা কেমন খ্যারখ্যারা, জায়গায় জায়গায় চলটা উঠা। চলা উঠা জায়গাটা রাজ্যের অসুন্দর, এক চুলার জন্য রান্নাঘরটা হতদরিদ্র লাগলেও কিছুই করার ছিল না। ভবিতব্য ভেবে মেনে নিয়েছিলাম।
হাড়ির নিচে সামান্য একটু কালি, এর জন্য রাশেদা বুয়া যা শুরু করেছে আমি রীতিমত বিরক্ত। শেষ পর্যন্ত এক কুক্ষণে, অতিক্রান্ত-সকালে চুলা সারাই বলে ডেকে উঠলে রাশেদা বুয়া মরিয়া হয়ে ওঠে, খালাম্মা, চুলা সারাই আইছে!
মনে হলো, ঠিক আছে এত সুন্দর চুলায় খুঁত কেন থাকবে, সারিয়ে ফেলি। বললাম, ডাকো, সারাই! লোকটা ঘরে ঢুকে ডাইনিং পেরিয়ে চুলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, রেগুলেটর নব ঘুরিয়ে চুলা জ্বালায়। – কী সমস্যা?
– কালি ওঠে!
– চুলা তো খুব ভালো, এই চুলা এখন পাইবেনই না!
গর্বের সঙ্গে বলি, বয়স পাঁচ বছর, সাড়ে সাত দিয়ে কিনেছি!
– দশ-বার দিলেও এখন পাইবেন না! কি মজবুত স্টিল!
– আচ্ছা ভালো করে সারাও।
কথা বলতে বলতে সে চুলা কাত করে নানান পাইপ খুলতে শুরু করলে আমি একটা হায় হায় অভিব্যাক্তি নিয়ে তার কাজ দেখতে থাকি। এক সময় বলে, এর আগে আর পরিষ্কার করেন নাই বুঝাই যাইতেছে, এয়ার শাটার ময়লায় বন্ধ হইয়া গেছে, ছিদ্র হইয়া গেছে নানা জায়গায়, পাল্টানো লাগবে।
আমি অবাক হয়ে দেখি সে চুলার কলকব্জা সবই প্রায় খুলে ফেলছে। আমি বলি, এটা আবার কী জিনিস? – চারটা এয়ার শাটার লাগাইতে হইব। আমি বলি মোট কয় টাকা লাগবে? সে বলে পঁচিশ’শ টাকা, বেশি চামু না।
আমার অবস্থা বিস্ময়ে মূর্ছা যাওয়ার, আর্তনাদের মতো বলি, আমার নতুন চুলা, আপনি ভেঙেচুরে এ সব কী করছেন!
– সারাইবেন নাকি বলেন, বললে সারাই, নতুন হইয়া যাইব, এই চুলা আর পাইবেন না!
আমি প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠে বলি, তারচেয়ে তো নতুন কেনাই ভালো, না না সারা লাগবে না, যেমন ছিল তেমন করে দিয়ে যান!
সে বলে চুলার অবস্থা কিন্তু ভালো না, যে কোনো সময় ব্রাস্ট করতে পারে।
যেমন ছিল আগে তেমন করে দিয়ে যান!
সে বলে একটু টিসু দেন ভিতরটা মুছে দেখি, কিছু করতে পারি কিনা! রাশেদা বুয়া এতক্ষণ কাছেই ছিল, পঁচিশশ টাকা শুনে ঘর মুছতে চলে গেছে। আমি বাথরুম থেকে গোলাপি টিসু রোলটা এনে হাতে দিলে সে খোলা যন্ত্রগুলো মুছতে থাকে ঘষে ঘষে। কিছুক্ষণ পর বলে, চুলাটা সারা দরকার ছিল, এতো ময়লা ব্রাস্ট না করে! আমি বলি, যেমন ছিল তেমন করে রেখে যান, একটু কালিতে কী এমন ক্ষতি! আপনার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যান, দরকার হলে ডাকতে পারি যেন।
আমার জিজ্ঞাসায় সে তার নাম বলে এস্কেদ, কুড়িলে আজিজের বাড়িতে সে বউ আর দুই বাচ্চা নিয়ে থাকে, বাড়ি শরিয়তপুর। আমি কি মনে করে বলি, নদী ভাঙনের দেশ! এ কথার উত্তর দিতে সে আগ্রহ দেখায় না। চোখেমুখে সামান্য বিরক্ত যেন!
এস্কেদ চলে গেলে আমি রান্নার বাকিটা শেষ করতে চুলা ধরাই। চুলা জ্বলে অল্প অল্প আর শা শা শব্দ যেন বৈশাখের ঝড় আসছে জানালার ফাঁক দিয়ে। শব্দটা অস্বাভাবিক এবং বিপজ্জনক লাগে, মুহূর্তে স্টিলের গায়ে জায়গায় জায়গায় কালো ছোপ ছোপ পোড়া দাগ ভেসে ওঠে। এস্কেদের ব্রাস্ট শব্দটা মাথায় চেপে বসলে তাড়াতাড়ি চুলা বন্ধ করে এস্কেদকে ফোন দেই।
আপনি আমার ভালো চুলা কী করে দিয়ে গেছেন!
আপনের চুলা যে কোনো সময় ব্রাস্ট করবে, আগেই তো বলছিলাম!
এই তুমি আমার চুলা নষ্ট করছ, আবার কথা বল!
আপনি খারাপ মহিলা, আধ ঘণ্টা ধইরা চুলা খুইলা পরিষ্কার করলাম অথচ সারাইলেন না!
দাঁড়াও তোমারে আমি পুলিশে দিব!
হ, ওত সহজ!
আরো একবার চুলা ধরিয়ে পরীক্ষা করলে যা হলো, চুলার নানা জায়গা দিয়ে আগুন বেরিয়ে ঝকঝকে চুলা পুড়ে লাল হয়ে কালচে দাগ প্রকট হয়ে উঠল। তৃতীয় বার আর চেষ্টা না করে মন খারাপ নিয়ে ভাবলাম, এত আদরের জিনিসটা এস্কেদ নষ্ট করে দিয়ে গেল, লোকটা এত খারাপ!
দুই দিন ধরে ইনডেকশান চুলায় শম্বুক গতিতে রান্না করি আর এস্কেদের গুষ্টি নিপাত করি। নতুন চুলা কেনা ছাড়া কী উপায়! সাধারণ একটা চুলা কিনে ফেলি মনে হলেই বমি আসে সারা শরীর গুলিয়ে। দিন যায় নিজের ভাগ্য আর এস্কেদকে দুষতে দুষতে। ইনডেকশান দিয়ে বেশি রান্না করা যায় না, পাশেই পড়ে থাকা পোড়া দাগে ছোপ ছোপ চুলার দিকে তাকালেই নানা পদের রান্নার বদলে আহত নিজেকে দুষতে থাকি!
২
আর মন মানল না, ঘষে ঘষে চুলার দাগগুলো পরিষ্কার করার চেষ্টা করি, পোড়া দাগ উঠতে চায় না। কোনো রকম পরিষ্কার করে ভাত বসিয়ে দিলাম, যা আছে কপালে! সতর্কতাবশতঃ হাতের কাছে রাখলাম এক হাড়ি পানি। দেখি না কি হয়! দোয়া-দরুদ পড়ে নব ঘুড়াতে জ্বলে উঠল আগুন, বেশ জ্বলছে কোনো সমস্যা নাই। তারপর একটু শব্দ তারপর নানা জায়গা দিয়ে আগুন। আমি স্থির চোখে তাকিয়ে থাকি, আজকে উহার একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক, আজকে পাঁচদিন একই যন্ত্রনায় দিন পার করছি, আর নয়। ব্রাস্ট, বার্স্ট কি বিস্ফোরণ আজ হয়ে যাক! দেখি নানা জায়গা দিয়ে আগুন বের হয়ে এক সময় থেমেও যায়। থেমে যায় শব্দটাও। লক্ষ্য করলে দেখি চুলার আগুনটা অনেকটাই কমে এসেছে। আগুন কেন কমে গেল, এটাই ভাবছি কয়েক মিনিট, ঠিক তখনি ঘটল বিস্ফোরণটা, আগুনে সিলিং পর্যন্ত ঢেকে গেল, ঢেকে গেলাম আমিও। চোখ খুলে দেখলাম আমি আমার শোয়ার ঘরে মেঝেতে পড়ে আছি, ধোয়া আগুন কিছুই নাই!
নাহ, চুলা ধরানো যাবে না!
বাকি রাত নির্ঘুম, সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। দুপুরে দরোজায় কলিং বেলের শব্দে আমার সম্বিত আসে। দরোজায় বাড়িওয়ালি ভাবি আর এক আগন্তুক।
ও আমাদের চুলা সারে, মানে সেরেছে কয়েকবার, পথে দেখা হলো আপনার জন্য নিয়ে এলাম!
বাড়িওয়ালি ভাবিকে চুলার কথা বলেছি বটে পরশু। এখন রান্নাঘর দেখিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি দরজা বরাবর ড্রইং রুমে, আমি আর ভাবি কথা বলি আর আড়চোখে তাকে দেখি। তাকে বলি, সমস্যা ছিল একটা, এখন তো মরণব্যাধি! সে একটু হাসল, এই শ্রেণির লোক সাধারণত হাসতে জানে না। হাসিতে সমস্যা নাই কিন্তু দেখি সে চুলা খুলতে খুলতে আগের দিনের লোকটার মতো সব কলকব্জা খুলে ফেলছে। আমি কোনো আশা রাখি না, আশাহীন স্বপ্নহীন খেইহারা কথাবার্তা বলি ভাবির সাথে। লোকটা বলে, চুলা খুলছিল কেউ! – হ্যাঁ, কয়দিন আগে। সমস্যা বাড়িয়ে দিয়ে গেছে!
আমি ভাবির সাথে কথা বলি না আর, মাথা নেড়ে তার কথায় সায় দিয়ে যাই আর চুলাসারাই লোকটাকে দেখি, দেখি সে কলকব্জা খুলেই চলেছে আর মুখে মিটিমিটি হাসি। হাসি সত্যি না আমার চোখের ভুল তাই ভাবি। আমি আর আমার চুলা বেশ হাসির জিনিস তবে! লোহা-লক্কর খুলতে খুলতে কেউ হাসতে পারে এটা আমার অজানা। হতে পারে সে চুলার আশাহীন ব্যর্থ জীবন নিয়ে কৌতুক বোধ করছে! আমি মনে মনে তার নাম দেই এস্কেদ ২, নতুন নামের আমার কোনো দরকার নাই। সত্যি কথা এই চুলা নিয়ে আমার খুব একটা আশা কি কৌতুহল নাই, কেননা আগুন-টাগুন যা লাগানোর সব তো লাগিয়েই ফেলেছি গত রাতে, জানে বেঁচে আছি এই যথেষ্ট মেনে নিয়েছি!
কী রান্না করেছেন আজকে ভাবি?
রান্না করিনি, ফ্রিজে খাবার আছে।
আপনার কি শরীর খারাপ?
একটু, রাতে ঘুম হয়নি। দুপুরে বাপবেটার দাওয়াত আছে, তাই সকাল থেকে রান্নাঘরে যাইনি।
বেশ কিছুক্ষণ পর এস্কেদ ২ আমাদের সামনে এসে অঞ্জলি মেলে ধরে, অঞ্জলিতে গোলাপের পাপড়ি, মিষ্টি গোলাপি পাপড়ি। আমি ভ্যাবাচেগা খেয়ে বলি, এ সব দিয়ে আমি কী করব! ভাবি নিরিখ করে বলে, এ সব পেলে কই?
এস্কেদ ২ তখনও হাসছে, ফুল পেলে মানুষ যেমন হাসে, সেও তেমন হাসছে। সে বলে, চারটা জিনিস লাগাতে হবে।
আমার মনে পড়ে, এস্কেদও তো চারটা জিনিসই লাগাতে চেয়েছিল, মোট পঁচিশ’শ টাকায়। আমি তখন রাজি হইনি। আজকে আমি রাজি, বলি, লাগান, কত লাগবে? – মোট পনের’শ টাকা দেবেন, ঠিক হয়ে যাবে। আমি বলি, ঠিক করেন তো দেখি! আধ ঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট সে কাজ করে। দেখায় কী যন্ত্র লাগালো। কি একটা সলিউশান দিয়ে চুলার পোড়া দাগগুলো ঘষে ঘষে মুছে আগের সেই চকচকে চুলা বানিয়ে বলে, দেখেন, খুব ভালো স্টিল চুলাটার, এখন এ সব পাবেনই না! আমার এস্কেদের কথা মনে পড়ে, সেও এমন ভাবেই বলেছিল, তারপর কাজটা না পেয়ে আমার উপর রেগে যায়। আমি বলি চুলা জ্বলবে তো! আর বার্স্ট করার ভয় নাই তো!
চুলা ঠিকঠাক সেরে দেয়, জ্বালিয়ে দেখি, কালিও ওঠে না। টাকা পুরোটা দেই না, এক হাজার দিয়ে পাঁচশ টাকা বাকি রাখি, সে তাতেই খুশি, বলে কোনো অসুবিধা নাই, সামনের সপ্তাহে আইসা নিয়া যাব, সমস্যা থাকলে দেইখাও যাব।
গল্পটা এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল, আমার চুলা আমার হলো। কিন্তু এস্কেদ ২ যাবার সময় ফুলের পাপড়িগুলো নিয়ে যায়। এগুলো তার দরকার।
আমি রাতে ম্যাসেন্জারে ফোন দিয়ে গল্পটা করি আমার বড়ো ভাবির সাথে, ভাবি হলেও সে আমার বন্ধুস্থানীয়, নরম মনের মানুষ। ভাই আমার পুলিশে চাকরি করে, খুব রাগি মানুষ, তাঁকে এ গল্প করার প্রশ্নই ওঠে না!
গভীর রাতে ভাইজান ফোন দিয়ে বলে তোর তো বিরাট বিপদ হয়ে যেতে পারত, পাইপে টিসু গুঁজে দিয়ে মৃত্যু ঝুঁকিতে রেখে গেছে সে, শুয়ারের বাচ্চার ফোন নাম্বারটা দে। আমি বলি, বাদ দেন ভাইজান, চুলা ঠিক আছে, এ সব দরকার নাই। ভাইজান বলে, নাম্বারটা দে তো! ধমক খেয়ে দিয়ে দেই।
চুলা আমার আগের মতো ঝকঝকে, রাশেদা বুয়া হাসে আর বলে, খালাম্মা দেহেন ডেচকি কেমন পরিষ্কার, কালি পড়ে না! আপনের চুলা আরো দশ বছর যাইব!
দিন তিনেক পর খবরের কাগজে পড়ি জেল হাজতে পকেটমারের মৃত্যু, দেহে নির্যাতনের চিহ্ন। মাদকসহ আটক, পুলিশ হেফাজতে বডি সেলিমের মৃত্যু। আমার অবচেতন মন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, কু ডাক পাড়ে, মনে হয় কোথাও কিছু ঘটছে! ভাইজানকে খুব ভয় পাই, সারা সন্ধ্যা ফোন করতে গিয়ে ফিরে ফিরে আসি। ভয় কবজা করে ফেললে ভাবিকে ফোন দেই, সে বলে, তোমার ভাই যে মানুষ! ঘটনা শুনে তো পারলে তখনি ধরতে লোক পাঠায়, কী করবে জানি না!
ভয়ে আমার হাতপা জমে যায়! কোনো উপায় না পেয়ে রাতে ছুটে যাই কুড়িলে, এস্কেদের বাসার খোঁজে। আমার কালাচাঁদপুর বাসা থেকে খুবই কাছে। ওর ফোনে ফোন দেই তার আগে, বন্ধ শোনায়। ও বলেছে কুড়িলে আজিজ হাজির বাড়িতে সে থাকে বউ আর দুই বাচ্চা নিয়ে থাকে, বাচ্চাগুলো তার ছেলে না মেয়ে জানি না। এস্কেদ ২ বলেছিল সে এস্কেদকে চেনে, তাকেও একটা ফোন দেয়া যায়। একবারই দেই, এটাও বন্ধ। ফোন বন্ধ রাখার এ আবার কি বুদ্ধি ওদের!
কুড়িলে যখন পৌঁছাই তখন রাত নয়টা দশটা হতে পারে, কত রাত জানি না, মোবাইলে দেখা যায়, দেখতে ইচ্ছাও করে না। রাস্তায় খুব বেশি গাড়ি নাই, যুদ্ধটুদ্ধর জন্য পেট্রোলের ব্যাপক সংকট, অল্প প্রয়োজনে গাড়ি বের করে না, প্রতিবেশিদের দেখে বুঝেছি। অটোওয়ালাকে বলেছি কুড়িল আজিজ হাজির বাড়ি, সে মাথা নেড়ে সায় দেয়। ভাব দেখায় জায়গাটা তার বেশ চেনা। বিশ্বরোড এসে পড়ি তাড়াতাড়িই, চারপাশ সুনসান। সে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে কতক্ষণ চালাতে থাকে, ষাট টাকার ভাড়ায় এতক্ষণ চালানোর কথা না, হতে পারে সে হয়ত ঘরের সামনে নামিয়ে বলবে অনেক ঘুরছি আফা একশ টাকা দেন! গাড়ি সে চালাতেই থাকে, রোড ডিভাইডারে সুন্দর সুন্দর গাছ লাগানো, কারা পানি দেয়! গাছগুলো অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করে স্ট্রিট লাইটে। মনে হয় একটু আগে কেউ এদের স্নান দিয়েছে, ঝাঁকি দিলে পানি ঝরবে। চৈত্রের শেষাশেষি হলেও আবহাওয়া বেশ বসন্ত বসন্ত, বাতাসে ঠা-া আছে। এত কিছু ভালোর পরেও আমার দুশ্চিন্তা অন্তহীন, হাজি আজিজের বাড়িটা খুঁজে বের করতে হবে আমাকে, এস্কেদকে পেতেই হবে। ফোনটা খোলা থাকলে কত সহজ হতো! ফোন বন্ধ থাকলেও তাকে খুঁজে বের করা পুলিশের অসাধ্য তো নয়! তাকে বাঁচাতে হবে আমাকে!
প্রায় বিশ মিনিট অলিগলি করে হাজি আজিজের বাড়ি খুঁজে পায় ড্রাইভার। আমি দেখি একটা বড়ো দোতলা বাড়ি, বাড়ির গাত্র বর্ণিল, শহুরে বাড়ি এমন রঙচঙা হয় না। গা ঘেষে দেয়াল দেয়া টিনের ছাদ লম্বা চৌচালা চারটা। ভিতরে দশে বিশে ঘর, ভাড়ার নিমিত্তে, বোঝাই যায়। এগুলোর কোনোটায় নিশ্চয় এস্কেদ থাকে বউ বাচ্চাদের নিয়ে, নদী ভাঙনে উদ্বাস্তু এস্কেদ!
গেটটা খোলাই, ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে কাউকে খুঁজি। ডানে গেলে টিন সেডগুলো, বাঁয়ে মূল হাজি আজিজের বাড়ি, কমিশনার হাজি আজিজ। টিনশেডগুলোর সামনে কয়টা অড়হরের গাছ সারি বেঁধে, গাছ ভরা লম্বা লম্বা কালো রোমশ চিকন সিমের মতো ফল ঝুলছে। একটা বাতি চৈত্রের হাওয়ায় দোল খায়, আলোটা কেমন রহস্যময়। আমি মানুষ খুঁজি এস্কেদকে ডাকার জন্য, ঠিক তখনই ফোনটা আসে, এস্কেদ ২ এর ফোন। বলি, এস্কেদকে খুঁজতে কুড়িল হাজি আজিজের বাসায় আসছি, কাল এসে আপনার বাকি টাকাটা নিয়ে যাবেন, চুলা ভালোই কাজ করছে। সে বিস্ময় নিয়ে বলে, কই গেছেন?
কুড়িল, এস্কেদকে খুঁজতে।
সে কুড়িল থাকে কে বলছে! সে থাকে সাঁতারকুল মেসে, আমার পাশের ঘরে, বউ বাচ্চা বরিশাল! তারে আবার কী দরকার!
সে এখন কোথায়? তারে বলবেন সিমটা ফেলে দিতে, পুলিশ ধরলে কিন্তু বিপদ আছে!
দুই দিন ধইরা তো মেসে আসে না, ফোনও বন্ধ!
আমার আর্তনাদ এস্কেদ ২ শুনতে পায় কি? সহকর্মীর হারিয়ে যাওয়ার বার্তা!
