মা বিটির বোন
বিমল লামা
“কুথাকে যাতেছিস ভিনসারে?”
“কাঠ কইরবার বটে ন?”
“কাঠ! কাঠতো আছেই।”
কাঠ আছে। মজুদ করা আছে জ্বালানি কাঠ। গোটা মাস চলে যাবে। তবু সকাল সকাল কাঠ সংগ্রহ করতে জঙ্গলে যাচ্ছে নবিতা। তাও একা একা। ভয় ডর নেই মেয়েটার। এই নাজুক বয়সে! সবে তো ষোল হলো এই শরাবণে।
মা বলে, “নাই যাতে হবেক। ভাইকে দেখ।”
কিন্তু মেয়ের জেদ, যাবেই। যাবে তো যাবে কেউ আটকাতে পারবে না।
তখনই সরুবালির সন্দেহ হয়। এতো কিসের কাজ করার নেশা মেয়ের! বনে জঙ্গলে গোটা দিন ঘুরে বেড়ানোর এমন বেয়াড়া টান কেন?
যদিও সে টান অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, বন্ধুরা দল বেঁধে জঙ্গলে কাঠ করতে যাওয়াই রেওয়াজ। সরুবালি চার বাচ্চার মা। জঙ্গলে কাঠ করতে যেতে তারও তো খুব ফুর্তি লাগে। গাঁয়ের মেয়েরা, বউ ঝি’রা মিলে জঙ্গলে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো! কত গল্প হয়, মজা হয়, হাসি তামাশা হয়! আর সঙ্গে দুটো ভাত তিউন নিলে তো কুহু ভাতও হয়ে যায়। রীতিমতো বনভোজন।
তবুও সরুবালির সন্দেহ হয়। কারণ, নবিতার আগ্রহ একটু বেশি লাগে তার। একটু না, বেশি রকমেরই বেশি লাগে তার জেদ। তাই কপালে ভাঁজ পড়ে চিন্তার। ভাবে, খোঁজ নিতে হবে কাদের সঙ্গে যাচ্ছে! জঙ্গলে তো ছেলে ছোকরা জোয়ান মরদেরাও ঘুরে বেড়ায় গরু ছাগল নিয়ে, রাখাল বাগাল হয়ে।
সরুবালি যতক্ষণ পাড়ায় খোঁজ নিচ্ছে মেয়ে ততক্ষণে জঙ্গলে বিলীন। ওদের মাটির গ্রাম চিরে চলে গেছে কালো পিচের চওড়া রাস্তা। রাস্তার একদিকে ওদের গ্রাম অন্যদিকে সরকারের বন। অন্তত তেমনই দাবি সরকারের। যদিও লোকে মন থেকে মানে না সে দাবি। তারা বলে– বন আমাদের। কারণ বনে শুধু গাছ আর জন্তু থাকে তাই না। বনে দেবতাও থাকে। সরকার গাছগুলো নিয়ে নিক। জন্তুও নিয়ে নিক, মাংস না হয় কিনেই খাবে। কিন্তু দেবতা ওরা ছাড়বে না। দেবতা প্রাণের, সরকারের নয়। এখন বন থেকে দেবতাকে আলাদা করার কোনো স্কিম পারলে সরকার চালু করুক এ জঙ্গলে। ওরাও তখন দেখে নেবে কত বড় সে ভোটে জেতা সরকার, আর কত বড় তাদের পূর্বপুরুষের বন পাহাড়ি দেবতা।
এসব কথা মাথায় আছে সরুবালির। গ্রামের মাতব্বররা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঢুকিয়েছে। মাঝে মাঝে সামিল হয় মিটিংয়ে মিছিলে। কিন্তু এখন তার মাথাব্যথার কারণ অন্য, তার মেয়ে নবিতা।
আগনবাড়ি সেন্টার খুলে গেছে। কোলের ছেলেটাকে ওখানেই নামিয়ে দিয়ে আসে সরুবালি। বড়টা পড়ে থ্রি-তে। স্কুল যাবে। ওদের বাবা পরিযায়ী শ্রমিক। কাজ করে নেলোরে। বছরে একবার আসে মকরের সময়।
হাতে হাঁসুয়াটা তুলে নিয়ে পায়ে পায়ে পিচ রাস্তা পার হয় সরুবালি। রাস্তার ওপারেই থমথমে অরণ্য। লাল মাটির পায়ে চলা পথরেখা সধবার সিঁথির মতো চলে গেছে বনানীর অনন্তের দিকে। যেন সে কোনো রহস্য লোকের পথ।
সে পথে পা দিতে যদিও এক মুহূর্ত ভাবে না সরুবালি। যেন নিজের বাপের ঘরে যাচ্ছে এমন ভঙ্গি করে সে বনে ঢোকে। বনে ঢোকে নবিতার খোঁজে। কি জানি কোন দিকে গেল মেয়েটা!
বিরাট বিকট বন। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বহুদূর চলে গেছে। এত বড় এলাকা ঢাকা ঘন অরণ্যের পরতে। সেই পরতের তলায় তলায় কত কি যে লুকানো আছে তার ঠিক নেই। জীবজন্তুর কথা তো ছেড়েই দাও। লুকোনো আছে গোটা গোটা টিলা পাহাড় ডুংরি। আছে তাদের খানাখন্দ খাদ গুহা কন্দর। চিড় ফাটল আছে। খালডোবা পুকুর আছে। মরশুমি ঝর্ণা আছে। এমনকি আস্ত একটা নদী।
আর আছে তাদের প্রাণের দেবতারা– গাছের দেবতা, জলের দেবতা, মাটির দেবতা, পাহাড়ের দেবতা। প্রকৃতির প্রতিটা অঙ্গের দেবতা। আছে তারা তাদের সুরক্ষা বলয় আগলে। বন প্রকৃতিকে তারা বাঁচিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে।
কিন্তু এখন মানুষ বড় লোভী হয়ে পড়েছে। তারা আর দেবতা মানে না। সংস্কার মানে না। তারা জানে শুধু মুনাফা। তার জন্য এমন মরিয়া যে বিপন্ন করে তুলেছে এই বন প্রকৃতিকে। তার আশ্রিতদেরকে। এমনকি বনের দেবতাদেরকেও। কি জানি কি হবে শেষ পর্যন্ত। হয়তো প্রস্তুত হচ্ছে দেবতারাও, অস্তিত্বের এক অন্তিম যুদ্ধের জন্য!
এছাড়াও আরো অনেক কিছু আছে এই বনে। যারা মানে তারা মানে। সেসব গুহা কন্দর আর খালডোবা নদীতে শুধু সাপ খোপ জীবজন্তুই থাকে না, থাকে আরো অনেকে। কিন্তু অনেকেই মানতে চায় না। কারণ তাদের চোখে দেখা যায় না। শুধু বোঝা যায় তাদের অস্তিত্ব। সারা গা দিয়ে অনুভব করা যায় তাদের বিচরণ। তাদের আনাগোনা। বিশেষ করে যখন গোধূলি নামে। অরণ্য জুড়ে মেঘ নেমে আসে মাথার কাছে। হওয়া বয় এলোমেলো। অচেনা শব্দেরা ছেয়ে ফেলে বনের বাতাস।
সরুবালির কপাল দোষে তেমনই হয়ে যায় আজ। দিন শেষ হয়ে সূর্য ঢলে যায় পশ্চিমে। আলো নিভে আসে আকাশে। কালচে ছোপ ধরে যায় বনের শাখায় পাতায়। ঝোপে ঝাড়ে।
সরুবালি তখনো খোঁজ পায়নি তার মেয়ে নবিতার। গোটা দিন সে ঘুরে বেড়িয়েছে বনের ভেতর। চলতে চলতে কতদূর যে চলে গেছে তার ঠিক নেই। আড়ে বহরে সাধ্যমত সে ছেনে ফেলেছে গোটা বন। তবু কোথাও খোঁজ মেলেনি মেয়ের। কাঁচা বয়সের অসহায় মেয়ে। কোথায় যে হারিয়ে গেল অনন্ত বনের ভেতর! একা একা!
হয়তো মেয়ে কাঠ নিয়ে ঘরে ফিরে এসেছে এতক্ষণ। এত বড় বন। ঢোকার মতো বেরোনোরও হাজার রাস্তা তার। কে কোন রাস্তা ধরে কে বলতে পারে। হয়তো মেয়ে অন্য রাস্তায় ঘরে ফিরে গেছে।
তাই সরুবালি ঠিক করে ঘরে ফিরবে। ছোট ছেলে দুটো একা আছে ঘরে। আর দেরি না করে ফিরতি পথ ধরে সরুবালি। গোধূলি পেরিয়ে সাঁঝের দিকে এগোচ্ছে সময়। মাছি আন্ধ্রা সংযোগ এখন। মাছি নিজেই দেখে না চোখে। অন্ধের মত গোত্তা খায় এদিক ওদিক। আর মানুষও দেখতে পায় না মাছি গায়ে বসলে।
সরুবালিও কি মাছি আন্ধ্রার শিকার হলো! না হলে এত বড় পিচ রাস্তাটা সে খুঁজে পাচ্ছে না কেন! কতক্ষণ ধরে হাঁটছে ঘর মুখো, কিন্তু ঘর আর আসছে না। আসছে না পিছের রাস্তাটাও। এতই কি দূর সে চলে গেছিল বনের গভীরে!
এক সময় পুরোই অন্ধকার নেমে যায় জঙ্গলে। সরুবালি আর কিছুই দেখতে পায় না। তবু সে ভয় পায় না। কারণ এ জঙ্গল তার আঙ্গনা উঠানের মতো। এই জঙ্গলের কোলেই তার জন্ম, এখানেই হেসে খেলে বেড়ে ওঠা। জঙ্গল পর নয়। অপর নয়। জঙ্গল বলা যায়, মামার বাড়ির আদর খাওয়ার আনন্দ বন।
কিন্তু জঙ্গল তার একার নয়। সময়ও তার একার নয়। সময় বদলালে জঙ্গল বদলে যায়। মাহল বদলে যায়। বদলে যায় জঙ্গলের মতিগতি। তখন চেনাকেও অচেনা মনে হয়। আলগা লাগে ভরসার বাঁধন। কোনো পরম আত্মীয়ের কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার মতো ঝুঁকি থেকে যায় যেন।
মানে ভয় করে। ভয় করে সুরুবালির জঙ্গলে একা একা। তার উত্তেজনা বাড়ে। বাড়ে উঠবেগ উৎকণ্ঠা। আর বাড়ে ঘর পালানোর গতি।
সরুবালি ভয়ে রীতিমতো দৌড়তে শুরু করে। যেদিকে সরকারের পিচ সড়ক আছে বলে তার বিশ্বাস, সেই দিকে। যেদিকে আবাস যোজনার পাকা ঘর আছে বলে তার বিশ্বাস, সেই দিকে। অন্ধকারে, আন্দাজে, কোনো কিছুর পরোয়া না করে।
কারণ সে পরিষ্কার বুঝতে পারে কেউ তার পিছু নিয়েছে। তার ওপর নজর রাখছে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে। নিঃশব্দে অনুসরণ করছে তাকে।
এই জঙ্গল তার চেনা লাগছে না। নিরাপদ লাগছে না। যেন সে অনধিকার প্রবেশকারী তারই নিজস্ব উঠোন-বাগানে। এমনই সে সময় অসময়ের জটিল রসায়ন।
সরুবালি উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়তে শুরু করে। খানিক দৌড়ে মনে হয় ভুল দিকে যাচ্ছে। তখন আবার সে উল্টো দিকে দৌড় দেয়। সেদিকটাও ভুলদিক মনে হলে আবার অন্যদিকে।
এই করে সরুবালি সারারাত। গোটা রাত সে বনের মধ্যেই দৌড়ে বেড়ায় অন্ধ মাছির মতো। কিন্তু বন থেকে বেরোনোর পথ সে খুঁজে পায় না। বন যেন তাকে কয়েদ করে ফেলে কোনো দিকে বেরোনোর পথ না রেখে।
তারপর সকাল হয়। আলোয় ভরে যায় বন। জেগে ওঠে গ্রাম। গ্রামের মানুষ, আর সরুবালির তিন ছেলে মেয়ে।
বিছানায় মাকে পাশে না পেয়ে কাঁদতে শুরু করে ছোট ছেলেটা। ভাইকে কোলে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায় নবিতা। পাশের বাড়ির ঝুটি মোসি জিজ্ঞেস করে, “তর মা কুথাকে গেল রে, নবিতা?”
সেই প্রশ্ন নবিতারও– মা কোথায় গেল! গোটা গ্রামের সেই প্রশ্ন, কোথায় গেল নবিতার মা? উত্তর নেই কারো কাছে। গ্রামের লোক সারা সকাল জটলা করে। গজল্লা করে। কিন্তু খোঁজ করে না। শুধু বনের দিকে তাকিয়ে অনুমান করে, এই বনেই কোথাও পথ হারিয়েছে নবিতার মা। হয়ত সে অজান্তে ডিঙিয়েছে চান্দো ঘাস, যে ঘাস ডিঙ্গোলে বাড়ির পথ ভুলে যায় মানুষ।
নবিতা আর কি করে, একাই বেরোয় মাকে খুঁজতে। ভাই দুটোকে ঝুটি মোসির কাছে রেখে সে হাঁসুয়া হাতে বনে ঢোকে মায়ের খোঁজে। তাকে খুঁজতে গিয়েই তো নিখোঁজ হয়েছে মা। এখন তারই দায়িত্ব মাকে খুঁজে বের করা।
আড়ে বহরে গোটা বন সে ছেনে ফেলে। টিলা ডুংরির আনাচে-কানাচে, গুহার গহ্বরে কন্দরে। নদীর ধারে, ঝুড়ে ঝাড়ে, সর্বত্র সে খোঁজ করে মায়ের। কিন্তু মায়ের দেখা সে কোথাও পায় না।
নবিতা খেয়াল করেনি কখন গোধূলি নেমে গেছে অরণ্য জুড়ে। মেঘ নেমে এসেছে মাথার কাছে। হাওয়া বইছে এলোমেলো। অচেনা শব্দেরা ছেয়ে ফেলেছে বনের বাতাস। ঘরে ফেরার কথা ভাবার আগেই ঝপ করে নেমে এসেছে অন্ধকার। বিকট বুনো অন্ধকার।
নবিতার কাছেও এই বন আদর খাওয়ার আনন্দবন। কিন্তু এখন তার ভয় করে। মনে হয় বনটা তাকে ভয় দেখাচ্ছে। আরও যারা থাকে বনে, যাদের চোখে দেখা যায় না, তারাই যেন ঘিরে ধরেছে নবিতাকে, চারপাশ থেকে।
আতঙ্কে নবিতা পালাতে চায়। ফিরে যেতে চায় ঘরের নিরাপদ চার দেওয়ালের ভেতর। মাকে ফেলেই যেতে চায় এখনকার মতো। তাই সে দৌড় দেয় উদ্ভ্রান্তের মতো। যেদিকে ঘর আছে বলে তার বিশ্বাস, সেই দিকে। যেদিকে পিচ ঢালা পাকা রাস্তা আছে বলে তার বিশ্বাস, সেই দিকে।
কিন্তু অনেক দৌড়েও নবিতা খুঁজে পায় না ঘরের পথ। তখন আবার সে উল্টোদিকে দৌড় দেয়। সেদিকেও সুবিধা না হওয়ায় আবার অন্যদিকে।
সারারাত নবিতা দৌড়ে বেড়ায় বনের ভেতর। অন্ধকারে, আন্দাজে। অন্ধ মাছির মতো এদিক-ওদিক। তবু বন থেকে বেরোনোর পথ সে খুঁজে পায় না।
সকাল হয়। গোটা বন ভরে যায় নরম সোনালী আলোয়। জেগে ওঠে গ্রাম। জেগে ওঠে ঝুটি মোসি, নবিতার ছোট দুই ভাই। মা আর দিদিকে না পেয়ে কাঁদতে শুরু করে তারা। ঝুঁটি মোসি ভোলায়। আদর দিয়ে বলে, “কাঠ করতে যাঁয়েছে তর মা আর বহিন। এখনই ঘুইরবেক। নাই কাঁদ। নাই কাঁদ বেটা।”
কিন্তু মা বেটি ফেরে না। সারাদিন ফেরে না। আবার রাত নামে। গোটা বন ঢেকে যায় বিকট অন্ধকারে। গ্রামের লোক বনের দিকে তাকিয়ে ভাবে, অসহায় দুটো মেয়ে মানুষ কোথায় হারিয়ে গেল এই বনের ভেতর!
রাতেই মুখিয়া মিটিং ডাকে। খোজি দল গড়ে গ্রামের জোয়ান মরদদের নিয়ে। রাত পোহাতেই তারা দল বেঁধে জঙ্গলে ঢোকে। সরুবালি আর তার মেয়ের খোঁজে।
গোটা বন তারা ছেনে ফেলে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে। কিন্তু সারাদিন খুঁজেও কিছুই পায় না। না কোনো সংকেত, না কোনো নিশানা। ব্যর্থ হয়ে ফিরতি পথ ধরে ছেলেরা। দিন তখন শেষ হয়ে এসেছে। সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে।
ফিরতি পথে একটা অনুচ্চ টিলার পাশ দিয়ে তারা হাঁটছিল। খোজি দলের তরুণ সদস্য ধোকু হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, “কে বটে? কে বটে? হাউ ঠিন?”
ধোকুর দেখানো দিকে তাকায় সবাই। ঝোপ ঝাড় তখনও নড়ছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। ধোকু বলে, “একটা বিটি ছা’র রকম বুঝালো। দৈড়ে ভিত্রালো!”
জায়গাটা ভেতরে চলে যাওয়ার মতই বটে। ঝোপঝাড় পেরিয়ে একটা টিলা পাহাড়, নাম তার হাতি পাহাড়। পাহাড়ের আকারের জন্যই এমন নাম। পাহাড় গোটাটাই পাথরে তৈরি। কিছু গাছপালা গজিয়েছে তার গায়ে। চোখের সামনে কয়েকশ ফুট উঠে গেছে শক্ত পাথরের হাতি পাহাড়। ধোকুর দাবি, ওই পাহাড়ের দিকে সে ছুটে যেতে দেখেছে একটা মেয়েকে। চিনতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু মা বেটির একজন হলেও হতে পারে।
দিনের আলো আর তখন তেমন নেই। তবু ছেলেরা এগিয়ে যায় পাহাড়ের দিকে। চেনা পাহাড়। আগেও গেছে অনেকবার। তাই ভয় তেমন পায় না কেউ।
পাহাড়ের দোরগোড়ায় এসে থমকে দাঁড়ায় দলটা। কেমন যেন লাগে তাদের। ঠিক ভরসা হয় না পাহাড়ের কাছে যেতে। তবুও মুখে কেউ কিছু বলে না। তারপর সাহসে ভর করে এগিয়ে যায় পায়ে পায়ে।
ওরা ওঠেও পড়ে পাহাড়ের আধা-আধি উপরে। প্রায় অন্ধকার করে এসেছে তখন। পথ দেখার জন্য মোবাইলের টর্চ জ্বালতে হয়। সেই আলো রাস্তায় পড়তেই টিমা বলে ওঠে, “হাই দেখ! নবিতার হাঁসুয়া বটে।”
একটা কাস্তে পড়েছিল রাস্তার ওপর। রামা বলে, “কি করে জানলিস নবিতার বটে?”
“এই লাল হাতলটা! উহার হাতলটা হামিঞ লাগায় দিয়েছিলি।”
তবে কি মা বেটি এই পাহাড়েই কোথাও আছে! কোনো কি বিপদ হয়েছে তাদের! হয়তো কোথাও আহত হয়ে পড়ে আছে। অথবা আটকে আছে পাথরের সংকীর্ণ খাঁজে। পাহাড় ফেটে ফেটে এমন খাঁজ তো সর্বত্র।
তেমনি একটা খাঁজের সামনে এসে তারা দাঁড়ায়। পাহাড়টা যেন খাড়াখাড়ি ফেটে গেছে এখানে। ফাটলে তৈরি হয়েছে একটা সংকীর্ণ গলিপথ। কিন্তু তার অপর প্রান্ত অন্ধকার। সরুও হয়ে গেছে ক্রমশ। ভেতর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
“কাপড় রকম বুঝাচ্ছে হে! ভাল্ ন হাউ ঠিন!”
কানে আসে রঘুর উদ্বিগ্ন গলা। সে মোবাইলের টর্চটা ধরে আছে গলির ভেতরের দিকে। খানিকটা ভেতরে একটা লাল শাড়ি গুটিয়ে পড়ে আছে যেন।
উৎকণ্ঠিত আরো কয়েকটা মোবাইল টর্চ ধেয়ে যায় ভুলুণ্ঠিত শাড়িটার দিকে। রঘু নিজেই এগিয়ে যায় সাহস করে। আট দশ পা গলির ভেতরে। তারপর একটা গাছের ডাল দিয়ে শাড়িটা টেনে বার করে আনে।
ডালে আটকে গেছে শাড়িটা। ডালের টানে সেটা লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসে। যেন শাড়িটাকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে টেনে হিঁচড়ে বার করা হচ্ছে ফাটলের ভেতর থেকে। সন্ত্রস্ত জোড়া জোড়া চোখের সামনে শাড়িটা লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসে কোনো জ্যান্ত লতানে জীবের মতো। কয়েকটা কন্ঠ একযোগে বলে ওঠে, “নবিতার মায়ের শাড়ি বটে!”
যদিও পরেশ জোর দিয়ে বলে, “না! উইয়ে রিলিফের শাড়ি পিঁধে ছিল। আমি দেইখেছিলি।”
“তাহলে এটা কার শাড়ি?”
“হয়তো কেউ পূজা দিয়ে গেছে!
ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় কেউ বলে, “পাঁচ বহনির?”
“আর কার!”
পাঁচ বহনি, পাঁচ ভূতনি বোন। সবাই নিশ্চিত তাদের বাস আছে এই বনে। পাঁচ বহনির প্রসঙ্গ এসে পড়ায় কেউ আর থাকতে চায় না এই রাতের জঙ্গলে। এমনিতেই রঘু পাঁচ বহনির শাড়ি ধরে টেনে তাদের ক্ষুন্ন করেছে।
সবাই একমত হয়ে সেদিনকার মত ফিরে আসে গ্রামে। ঠিক করে পরদিন আরো প্রস্তুতি নিয়ে আবার আসবে। সঙ্গে আনবে সাপের ওঝা গোবিন্দকে। আর ভূতের ওঝা শামাকে। বলা তো যায় না কোন দিক থেকে বিপদ আসে!
গল্প শুনে গ্রামের লোকে বেজায় উত্তেজিত। পরদিন অনুসন্ধানী দলে শামিল হতে চায় সকলেই। যেন সে কোনো আমোদের ব্যাপার। মজার অভিযান।
নয় নয় করেও বিরাট একটা দল বনে ঢোকে সকাল সকাল। সোজা গিয়ে হাজির হয় সেই হাতি পাহাড়ের সামনে। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট, ঢুকতে হবে সেই পাথুরে ফাটলের ভেতর। ওর ভেতরেই হয়তো আটকে আছে মা বিটি।
স্বঘোষিত নেতা রঘুই ঠিক করে দেয় সবার আগে ঢুকবে সাপের ওঝা গোবিন্দ, সাপের মন্ত্র নিয়ে। তারপর যাবে শামা ওঝা, ভুতের মন্ত্র নিয়ে। তারপর যাবে সে নিজে, হাতে বর্শা নিয়ে। তারপর বাকিরা তাদের অনুসরণ করবে।
সেই মতো এগোয় দল হাতি পাহাড়ের দিকে। সহজেই পৌঁছেও যায় তার মাঝামাঝি উচ্চতায়। খুঁজেও পায় সেই পাথরের বুক জোড়া সংকীর্ণ ফাটল।
কিন্তু সাপুড়ে গোবিন্দ ফাটলের ভেতর ঢুকতে চায় না সে বেঁকে বসে বলে, “কেমনে ভিত্রাব এসন চিপার মইধ্যে!”
কথাটা রঘুরও যুক্তিগ্রাহ্যই লাগে। দলের অন্যদেরও মনে হয়, গোবিন্দর কথাটা ঠিকই। কিন্তু আবার..!
ভীষণ বিভ্রান্ত হয়ে যায় সবাই। বিশেষ করে যারা কালকের দলে ছিল। কারণ তারা সবাই দেখেছিল রঘু কেমন সহজেই আট দশ পা ঢুকে গেছিল ফাটলের ভেতর। টেনে বার করে এনেছিল পাঁচ বহনির শাড়ি। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে রঘুর মতো মোটা লোকের পক্ষে একপাও ঢোকা সম্ভব না। তবে কি..!
ভাবতেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে সবার। রঘুর গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনরকমে সে বলে, “তরা তো দেইখেছিলিস! নিজের চৈখে দেইখেছিলিস হামি কেতনা ভিতর তক্কো সামাইছিলি।”
সন্ত্রস্ত গলায় ধোকু বলে, “তবে কি ফাটল টো…?”
“বটে বটে, ফাটল টো ছোট হয়ে গেলছে!”
একমত সক্বলে যে পাহাড়ের ফাটল ছোট হয়ে গেছে। এত ছোট যে রঘু তো কি গোবিন্দর মতো সরু লোকও ঢুকতে পারবে না ভেতরে। এক পাও না। শুধু দেখা যাবে চোখ মেলে। কিন্তু একটা মানুষের শরীর কিছুতেই ঢুকবে না। এই কাঠফাটা রোদের মধ্যেও ভেতরটা অন্ধকার হয়ে আছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
সঙ্গে টর্চ এনেছিল টিমা। আলো ফেলে ফাটলের ভেতরে। খানিকটা গিয়ে আলোটাও অসহায় হয়ে পড়ে। যেটুকু আলো পড়ে তাতেই দেখা যায় একটা লাল শাড়ি গুটিয়ে পড়ে আছে ফাটলের বেশ অনেকটা ভেতরে। টিমার আতঙ্কিত কন্ঠ আসে কানে, “পাঁচ বহনির শাড়ি। “
কিন্তু ওই শাড়িটা তো কাল…! সেটাই মেলাতে পারে না কেউ। ওই শাড়িটা কাল টেনে বার করেছিল রঘু, লম্বা করে ফেলে রেখেছিল ফাটলের বাইরে। কিন্তু এখন সেটা আবার…!
“আমি কি ভুল দেখতেছি!”
রামার বিভ্রান্ত কন্ঠ। রঘু বলে, “ভুল দেখতেছি না। ভুল করতেছি। এখানে আর থাকা ঠিক লয়।”
হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে টিমা, “ওটা কি বটে?”
তার টর্চের আলো তখনো ফাটলের ভেতরে। আলো গিয়ে পড়েছে একটা ছোট্ট লাল জিনিসের ওপরে। নবিতার হাঁসুয়া। কিন্তু সেটা ওখানে গেল কি করে! টিমা তো কাল হাতে করে নিয়ে গেছিল হাঁসুয়াটা।
টিমা স্বীকার করে সত্যিটা। অন্ধকারে ওই হাঁসুয়া দিয়ে আগাছা কাটতে কাটতে হাঁটছিল সে। হঠাৎ সেটা অন্ধকারে আটকে যায় কিছুতে। কয়েকবার টানাটানি করে, কিন্তু ছাড়াতে পারে না। দল এগিয়ে যাচ্ছিল। তাই ভয় পেয়ে হাঁসুয়াটা ওখানেই ছেড়ে রেখে গেছিল সে।
কিন্তু সেটা তো এই পাহাড় থেকে অনেকটা দূরে, মাঝপথে। তাহলে এখন কি করে..!
“আমি ভালো নাই বুঝতেছি হে! তুমি বলো শামা কাকা এসবের মানে কি?”
শামা কাকা ভূতের ওঝা। পাঁচ বহনির পুজোও সে করে। সে তার সমস্ত বিদ্যে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে ব্যাপারটা। শেষে বলে, “এটা পাঁচ বহনির কাম লয়। উয়ারা কভু বিটিনদেরকে নাই ধরে। উয়াদের লজর শুধু মরদদের দিকে।”
“তবে?”
“সেটা আমি নাই বুঝা পাছি!”
নিরুপায় হয়ে দল ফিরে যায়। দরবার করে গিয়ে বন দপ্তরে। সবিস্তারে জানায় কিভাবে হাতি পাহাড়ের ভেতরে মা বিটি ঢুকে গেছে। এখন সেই ফাটল এত সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে কেউ ঢুকতে পারছে না। যদিও আগের দিনই রঘু আরামসে ঢুকেছিল আট দশ পা ভেতরে।
বনাধিকারিক হেসে বলেন, “মানে চিচিং ফাঁক?”
“উটা কি বটে?”
সে ব্যাখ্যা বনাধিকারিক দেন না। কিন্তু তিনি তার দল নিয়ে হাতি পাহাড় যেতে রাজি হন। কারণ দুজন মানুষ বনের ভেতর নিখোঁজ হয়েছে। তারপর কেটে গেছে তিন তিনটে দিন। তাই পুলিশেও খবর দিয়ে রাখেন বনাধিকারিক।
তাদের হাতি পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে বেলা পড়ে আসে। সঙ্গে আসে রঘুরাও। ওরাই বনদপ্তরের লোকজনকে নিয়ে যায় ফাটলের কাছে। জোর দিয়ে সমস্বরে বলে, “এই যে এখানেই! এখানেই…!”
“কিন্তু ফাটলটা কই?”
“এই তো ফা..!”
মাঝপথেই থেমে যায় রঘুর কথা। কারণ সে ফাটল আর নেই। বদলে সরু একটা চিড় দেখা যাচ্ছে পাথরের গায়ে। সেটা এত সরু যে মানুষের দেহ তো কি, একটা হাতও ঢুকবে না।
বন কর্মীরা এগিয়ে আসে। চিড় এর ভেতরে টর্চের আলো ফেলে। কিন্তু ভেতরে কিছুই দেখা যায় না। শুধু পাথরের ফাটা গা আর অন্ধকার।
বনাধিকারিক হেসে বলেন, “এর ভেতরেই ঢুকেছিল মা বিটি? ঢুকে দেখাদেখি তুই একবার! হেহেহেহে…!”
রঘুরা নিরুত্তর। সবাই নিরুত্তর।
কিছুক্ষণ পর এক বন কর্মী এগিয়ে এসে বলে, “স্যার, এইটা কিন্তু চওড়াই ছিল। আমি নিজেই দেখেছি।”
বনাধিকারিক বিশ্বাস করেন না। দলবল নিয়ে তিনি ফিরে চলে যান। পরামর্শ দিয়ে যান পুলিশে মিসিং ডায়েরি করতে।
আরো কিছুক্ষণ বিভ্রান্ত সময় কাটিয়ে গ্রামের ছেলেরাও ফিরে আসে গ্রামে। কেউ আর কোনো কথা বলে না। যে যার ঘরে চলে যায় সে রাতের মতো।
পরদিন আরো খোঁজাখুঁজি করেছিল গ্রামের লোকেরা। বেশ কিছুদিন তারা চালিয়ে গেছিল মা বিটির খোঁজ। কিন্তু সরুবালি আর তার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এরপর বহু বছর কেটে গেছে। মা বিটির গল্প এখন কিংবদন্তী। এই বনের ভেতর, হাতি পাহাড়ের ফাটলের ভেতরে কোথাও তারা বিলীন হয়ে গেছে। লোকে বিশ্বাস করে মা বেটি আজও আছে সেই হাতি পাহাড়ের ভেতর। সেই ফাটল এখন প্রায় সুতোর মতো। কিন্তু তার ওপর কান পাতলে আজও শোনা যায় মানুষের কন্ঠ। কারা যেন চাপা স্বরে কথা বলে পাহাড়ের ভেতর। ফিসফিস করে। আবার কখনও চাপা করুণ কান্নার স্বর ভেসে আসে ওই সংকীর্ণ চিড়ের ভেতর থেকে। লোকে বলে — মা বিটি আজও কাঁদে হাতি পাহাড়ের ভেতর। তেমন দিনে কান পাতলে আজও শোনা যায় তাদের কান্না!
