মাতৃদেবী নিরুদ্দেশ
দীপান্বিতা রায়
দুটো খবরের মাঝে একটা আধঘণ্টার ফাঁক পাওয়া গেছে। সাধারণভাবে এটা থাকে না। মিতালি একটা বাংলা নিউজ চ্যানেলে প্রডিউসারের কাজ করে। দায়িত্বের চাকরি। সকালের এই সময়টায় টানা খবর চলতে থাকে। ফলে নিজের ওয়ার্কিং ডেস্ক থেকে ওঠার কোনও সুযোগই পায় না। ওখানে বসেই টুকটাক খাওয়া, জরুরি ফোন সবই সেরে নিতে হয়। আজ একটা স্পনসর্ড প্রোগ্রাম আছে। তাই সামান্য একটু হাঁফ ছাড়ার ছুটি। কাজের জায়গা থেকে উঠে এক কাপ কফি আর ফোনটা নিয়ে বসল মিতালি। প্রথম ফোনটা বাবাকে করতে হবে। বাবা নব্বই, মা পঁচাশি। থাকেন দুর্গাপুরের কাছে মিতালিদের পৈতৃক বাড়িতে, গোটা দুয়েক কাজের লোকের জিম্মায়। মিতালি এবং তার দুই বোনের বহু অনুরোধ সত্ত্বেও কলকাতায় এসে থাকতে রাজি হননি। কারণ সেখানে তাঁদের রোদ-হাওয়ায় ভাসাভাসি পুরোনো দিনের বাড়ি। মস্ত মস্ত ঘর। এপাশ-ওপাশ বারান্দা। সামনে ফুলের বাগান, পিছনে ফলের আর সবজির। গরমের দিনে শুধু ঝিঙেই নাকি এমন হয় যে পোস্ত দিয়ে রাঁধতে গেলে খাজনার থেকে বাজনা বেশি হবে বলে স্যুপ বানিয়ে খেতে হয়। ঝিঙের স্যুপ ব্যাপারটা কল্পনা করেও হয়তো দেশ-বিদেশের তাবড় তাবড় শেফ আঁতকে উঠবেন, কিন্তু মিতালির মা-বাবা দুজনেই সমবেতভাবে একবাক্যে বলেছিলেন যে সেই হালকা সবুজ রঙের ঝোল, তাতে কালো জিরের আঁকিবুঁকি আর ডুবসাঁতার দেওয়া ঝিঙের টুকরোর স্যুপ নাকি স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। ছুটি পাওয়া যায়নি। তাই মিতালি সেসময় যেতে পারেনি দুর্গাপুরে এবং মনে মনে অতীব আশ্বস্ত হয়েছিল।
যাই হোক্, এইসব আরামদায়ক ব্যাপার ছেড়ে তাঁরা কোনওমতেই কলকাতার ঘুপচি ফ্ল্যাটবাড়িতে এসে থাকতে রাজি নন। অনেকবার বলে শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে মিতালিরাও ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে। তবে দুশ্চিন্তা তো একটা থাকেই। খোঁজখবর নেওয়া সারাক্ষণই চলতে থাকে। ইদানীং স্মার্ট ফোনের দৌলতে তাঁরা দুজনে আস্ত এবং সচল আছেন কিনা সেটা দেখেও নেওয়া যায়, শুধু কানে শোনায় নির্ভর করতে হয় না। মিতালিও রোজই ফোন করে বিস্তারিত জেনে নেয়। সাধারণত একবার সকালে, গাড়িতে অফিসে আসার সময়। সেটা মোটামুটি হাই-হ্যালোর পর্যায়ে অর্থাৎ একবার কানে শুনে নেওয়া সব ঠিকঠাক চলছে কিনা। কারণ হাতে সময় কম। আর একবার সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে। তখন একটা আধঘণ্টার গল্পের শেসন চলে, যার মুখ্য অংশই হচ্ছে মা এবং বাবার পরস্পরের প্রতি নালিশ। যতটা সম্ভব সালিশির চেষ্টা করে মিতালি ফোন রেখে দেওয়ার পর তাঁরাও খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়েন, পরদিন নতুন করে ঝগড়ার শক্তি সঞ্চয় করতে।
রুটিনটা মোটামুটি এরকমই। কিন্তু আজ সকালে গাড়িতে হাই-হ্যালো পর্ব সারা যায়নি। কারণ অফিসের জরুরি ফোন ছিল। অফিসে এসেই ফোনটা করবে ভেবেছিল মিতালি। কিন্তু মাঝখানে একটা গ্যাপ আছে দেখে ঠিক করে নেয় ওইসময়ই কথা বলবে। সেইমতো ফোন নিয়ে ডায়াল করে। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। আর বেশি দেরি করলে বাবার খাওয়ার সময় হয়ে যাবে। তিনি আবার ঘড়ি ধরে সবকিছু করাই পছন্দ করেন।
রিং হতে বাবাই ধরলেন। গলাটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। একটু যেন গুমগুমে। তবে পাত্তা দিল না মিতালি। ওরকম প্রায়শই হয়ে থাকে। দু-চারটে মামুলি কথার পর জিজ্ঞাসা করল,
মা কই, মাকে দাওতো একটু…..
তোর মা বাড়িতে নেই।
বাবার উত্তর শুনে বেশ একটু অবাক হয় মিতালি। যদিও শীতকাল আসন্ন বলে রোদের তেমন তেজ নেই। কিন্তু স্নান-খাওয়ার সময়। মা এখন গেল কোথায়? কোনও পুজো-আচ্চা আছে নাকি, মন্দিরে গেছে? প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে জিভের ডগায়।
মা কোথায় গেছে?
তোর মা মর্নিং ওয়াকে গেছে এখনও ফেরেনি।
চমকে ঘড়ির দিকে তাকায় মিতালি। সাড়ে বারোটা। মর্নিং ওয়াক। তার মানে সাড়ে সাতটা বড়জোর আটটায় বেরিয়েছে। এতক্ষণ ধরে কোথায় ওয়াক করছে!
একলা গেছে নাকি?
না তো কে সঙ্গে যাবে শুনি?
কেন সাধনা কাজে আসেনি? ওকে তো সঙ্গে যেতে বলতে পারতে।
মেয়ের কথা শুনে নীহারবাবু রেগে প্রায় জলে পড়েন না আগুনে পড়েন ভঙ্গিতে বললেন,
সাধনার তোর মাকে আগলানো ছাড়া আর অনেক কাজ আছে। সেগুলো কে করবে তাহলে, আমি!
মিতালি এবার বেশ ভালোরকম উদ্বিগ্ন হয়। উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ সুলতাদেবীর এরকম একলা বেরিয়ে পড়াটা ঠিক নয়। বিশেষ করে বাড়িটা দোতলা। পুরোনো বাড়ির খাড়া, সরু সিঁড়ি। সেসব ভেঙে নীচে নেমে আসার পর যে সিমেন্ট বাঁধানো জায়গাটা পড়ে, সেখানে বর্ষাকালে ভালোরকম শ্যাওলা জমে। এখন অবশ্য সেই ভয়টা নেই। কিন্তু বাগানের ভিতর দিয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে তবে রাস্তায় ওঠা। সেই রাস্তায় উঠে তিনি কোনদিকে গেছেন তার কোনও সন্ধান কারও কাছে নেই। এদিকে সিঁড়ি ওঠা-নামায় নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও একলা বেরোনর ক্ষেত্রে ডাক্তারের কিছু সাবধানবাণী আছে। সাধারণত সব বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রেই থাকে। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে সেটা মেনে চলা জরুরি মিতালি জানে। কারণ মাত্র মাস চারেক আগেই সুলতাদেবী সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কোমরের নীচের হাড়ে অসহ্য ব্যথা। সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যথা বাড়ছে। হাঁটা-চলা করতে ভয়ানক কষ্ট। চিঁ চিঁ করতে করতে তিনি ঘোষণা করে দিলেন, শেষের সেদিন সমাগত প্রায়। বাবাও ভয় পেয়ে মেয়েদের ফোনাফুনি শুরু করলেন। এমনিতে কলকাতায় এসে মেয়েদের হেফাজতে থাকায় তাঁর ঘোরতর আপত্তি। কিন্তু বিপদে পড়লে তো মেয়েরাই ভরসা। তবে ওইসব আশা-ভরসার মতো নরম শব্দে তাঁর বিশ্বাস নেই। নার্ভাস হয়ে গিয়ে তাঁর তেজ আরও বেড়ে গেল। মেয়েরা যাতে তক্ষুণি হুজুরে হাজির হয় সেজন্য সিংহবিক্রমে গর্জনও শুরু করলেন। পরিস্থিতি গুরুতর বুঝে মিতালির পরের বোন পিয়ালি অফিসে ছুটি ম্যানেজ করে গেল দুর্গাপুরে। আজকাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া আর ভগবানের দর্শন পাওয়া মোটামুটি একই ব্যাপার। তবুও তারমধ্যেই নানারকম চেষ্টা-চরিত্র করে, চেনা-পরিচিতকে ধরে এক অস্থি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সময় ঠিক করা হল। ব্যাথায় কাতর মাকে নিয়ে পিয়ালি গেল ডাক্তারের কাছে। পরীক্ষা করে এবং কোমরের এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন যে হাড়ের ক্ষয় হয়েছে। কিন্তু সেটা এই বয়সের একজন মানুষের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তারজন্য হঠাৎ ওরকম মারাত্মক ব্যাথা শুরু হওয়ার কথা নয়। এর পিছনে নিশ্চিত অন্য কোনও কারণ আছে। ডাক্তারবাবু গম্ভীরভাবে রোগিণীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ভারী জিনিস কিছু তুলেছিলেন, বালতি কিংবা অন্য কিছু?
না কখনোই তুলি না। ভারী বালতি তোলার ক্ষমতাই আমার নেই।
সুলতাদেবীর সাফ উত্তর। নেহাতই রোগা-সোগা ছোটো-খাটো মানুষটির দিকে তাকিয়ে কথাটা অবিশ্বাস করতে পারলেন না ডাক্তার। তাই ফের জিজ্ঞাসা করলেন, মাটিতে বসে পুজো করেন? নীচু হয়ে রান্না করেন?
পুজো আজকাল আর করি না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঠাকুর পেন্নাম করে নিই। আর রান্নার পাট অনেকদিন চুকেছে। রান্নাঘরেও রোজ যাই না।
রোগের প্রকৃতি নির্ধারণ হলেও কারণ জানা গেল না। ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিলেন ব্যাথা কমবে। তবে সময় লাগবে। ওষুধ খেতে হবে। কোমরে বেল্ট পরতে হবে। আর কোনওভাবেই নীচু হয়ে কিছু করা চলবে না। বসা-দাঁড়ানো সব একেবারে খাড়া হয়ে। কোমরটি বাঁকিয়েছো কী মরেছো।
রাতে সারাদিনের রিপোর্ট দিদিকে পেশ করে পিয়ালি বলল, কারণটা কিন্তু বোঝা গেল না, রে। মা বলছে ভারী জিনিস কিছু তোলে না, নীচু হয়ে কিছু করে না। ঠিকই বলছে। করার তো দরকার নেই। এদিকে ডাক্তারের বক্তব্য এসব কিছু না করলে এরকম ব্যথা হওয়ার কথাই নয়। অদ্ভুত ব্যাপার কিন্তু। কারণটা বোঝা গেলে সাবধান হওয়া সহজ হয়।
বিছানায় শুয়েও সেদিন বোনের কথাগুলোই মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছিল মিতালির। হঠাৎ মাথার মধ্যে চিড়িক করে উঠল একটা ছবি। মাস দেড়েক আগের কথা। জুন মাসের গোড়ার দিকে একবার দুর্গাপুর যেতে হয়েছিল তাকে। তখনও বর্ষা নামেনি। ভ্যাপসা-গুমোট গরম। বাগানের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় মিতালি দেখেছিল, বেশ কতগুলো গাছের গোড়ায় প্লাস্টিক বিছানো আছে। হাওয়ায় যাতে উড়ে না যায়, সেজন্য চারকোণে মাটির ঢেলা চাপা দেওয়া।
বাগানে ওরকম প্লাস্টিক পেতে রেখেছ কেন?
মিতালির প্রশ্ন শুনে মা খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেছিলেন, আরে তুই আসবি বলে দুদিন ধরে জাম-জামরুল সব পাড়া হচ্ছে তো। মাটিতে পড়লে নোংরা হয়ে যাবে, তাই প্লাস্টিক পেতে রেখেছি। খুব ভালো জামরুল হয়েছে এবার। আজকেই তোর বাবা আঁকশি দিয়ে পাড়ল। সব কুড়িয়ে এনে ধুয়ে রেখেছি।
সেদিন আরও জানা গেছিল এবছর নাকি আমের সাংঘাতিক ফলন হয়েছে। রোজ রাশি রাশি আম হয় পড়ছে নাহয় পাড়া হচ্ছে। পাড়া-পড়শি সবার বাড়িতেই গাছভর্তি আম। তাই বিলোনোর জন্য লোক খুঁজতে হচ্ছে। ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, প্লাম্বার থেকে ব্লিঙ্ককিটের ডেলিভারি বয় পর্যন্ত যে কেউ বাড়িতে পা দিলেই পাকা আমের প্যাকেট হাতে পেয়ে যাচ্ছে। একেবারে হাতে গরম আম। এরপরেও আছে অনেক। সেসব আম বাড়িতে এনে আচার, মোরব্বা, আমসত্ত্ব এইসব নানা মুখরোচক জিনিসপত্র তৈরি হচ্ছে। শিশিতে ভরে মেয়েদের জন্য রাখা আছে। যে যখন আসবে দেওয়া হবে। নতুন কেনা ফ্রিজটির অর্ধেকই এখন গাছের আমের মোরব্বা আর আমসত্ত্বে ভর্তি।
সকালে ফোন করে বোনকে বলল মিতালি, ডাক্তার ঠিকই বলেছেন। ব্যাথা হওয়ার কারণ জানা গেছে। এই বয়সে, রোজ সকাল-বিকেল নীচু হয়ে গাছতলা থেকে আম-জাম-জামরুল কুড়োলে আর চৌকি ভরে আমসত্ত্ব দিলে কোমর কি ছেড়ে কথা বলবে? মাকে বলে দিস, যতই ফল নষ্ট হোক, দোতলা থেকে যেন নীচে না নামে।
সেই ব্যাথা চলেছিল বেশ কিছুদিন। তিন বোন পালা করে গিয়ে মায়ের দেখভাল করেছিল। ফল কুড়োনোর জন্যই ওরকম অসম্ভব ব্যাথা হয়েছে সেটা অবশ্য স্বামী-স্ত্রীর কেউই ঠিক মেনে নিতে পারেননি। ফল-ফুলুরি তো সারাজীবনই কুড়িয়েছেন। তার জন্য কোমরে ব্যাথা হবে কেন! সুলতাদেবী ধরেই নিয়েছিলেন তাঁর কোনও সাংঘাতিক অসুখ করেছে, হাতে সময় নেহাতই গোণাগুণতি। কিন্তু দেখা গেল আজকালকার চাকরে মেয়েদের ধমক-চমককে স্বয়ং বিধাতাপুরুষও কিঞ্চিৎ ডরান। তাই সেরকম কিছু ঘটল না। ধীরে ধীরে ব্যাথা কমল। সুলতাদেবী সুস্থ হয়ে উঠলেন। মেয়েরা নিজেদের কাজের জগতে ফিরে গেল। ডাক্তার দোতলা থেকে নামার অনুমতি দিলেন। তবে সাবধানে এবং সম্ভব হলে সঙ্গে কাউকে নিয়ে।
কিন্তু সেই নির্দেশ যে মানা হচ্ছে না তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ তো হাতের মুঠোয়। মিতালি এবার তাই খানিকটা রেগেই বাবাকে বলে, একলা মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে গেল! তুমি যেতে দিলে কেন?
পঁচাশি বছরের একজন মানুষ। তার নিজের বোধ-বুদ্ধি নেই! আমি বারণ করলেই শুনবে?
কখন বেরিয়েছে সেটা জানো নাকি তাও দ্যাখোনি?
জানব না কেন। স্নান করল। জলখাবার খেল। তারপর বলল দুদিন হাঁটতে যাওয়া হয়নি, একটু হেঁটে আসি। তারপর গটগট করে চলে গেল।
আর তুমি বসে বসে দেখলে…..রাগে প্রায় বাকস্ফুর্তি হয় না মিতালির।
দেখব না তো কি বেঁধে রাখব!
নীহারবাবুও মেয়ের এহেন অন্যায় আক্রমণে রীতিমত ক্ষিপ্ত।
তখন বাজছিল কটা?
ওই দশটা হবে….
তার মানেও প্রায় আড়াই ঘণ্টা। মায়ের পক্ষে কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের বেশি হাঁটা এককথায় অসম্ভব। সেখানে আড়াই ঘণ্টা কেটে গেছে।
খোঁজ নিয়েছ কিছু, কোথায় গেছে মানে কোথায় যেতে পারে?
আমি কোথা থেকে খোঁজ নেব। আমি তো ঘরে বসে আছি। বাড়িতে আর কেউ নেই। সাধনা-সবিতা কাজ সেরে চলে গেছে।
তা ওরা চলে যাওয়ার আগে তো একবার বলতে পারতে খোঁজ নিতে!
কোথায় খোঁজ নেবে? রাস্তায় রাস্তায় তোর মাকে ঘুরে খুঁজে বেড়াবে?
ফোন করেছিলে?
কাকে ফোন করব? পাড়ার কারও ল্যান্ডলাইন নম্বর আমি জানি না।
কী মুশকিল, মাকে ফোন করোনি! মায়ের তো একটা মোবাইল আছে।
কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দ। তারপর ফের বেঘো গলায় গর্জন শোনা যায়, তোর মা মোবাইল নিয়ে যায়নি। মোবাইলটা ঘরেই রয়েছে।
এবার মিতালির সম্পূর্ণ ধৈর্য্যচ্যুতি হয়, মোবাইলটাও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলোনি!
আমি কেন বলব! আমাকে কেন বলতে হবে! নিজের কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই! এদিকে তো জ্ঞানের ডিপো। সবকিছুতে মত দিচ্ছে। এখন শুধু শুধু আমাকে দোষ দিলে তো চলবে না,
সময় শেষ হয়ে আসছে। এদিকে মায়ের নিরুদ্দেশ সমস্যার সমাধান না করে কাজে বসাও অসম্ভব।
শোনো আমি এখন ফোন রাখছি। আধঘণ্টার মধ্যে মা না ফিরলে আমাকে জানাবে। আমি পুলিশে খবর দেব। বাবাকে প্রায় হুমকি দিয়ে ফোনটা রেখে ঘড়ির দিকে তাকালো মিতালি। এখনও হাতে মিনিট দশেক রয়েছে। বেশ কয়েকটা বিজ্ঞাপনের বিরতি চলবে। মনের মধ্যে এই অশান্তি নিয়ে কাজ করতে বসলে ভুল-ভাল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই তার আগেই একটা কিছু করতে হবে। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা করে ভাবার চেষ্টা করে মিতালি। মা কোথায় যেতে পারে? দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকলেও সম্ভাবনা কম। কারণ আধা-গ্রাম জায়গা। সবাই-সবাইকে চেনে। বাড়ি জানে। মায়ের সেরকম কিছু হলে এতক্ষণে বাড়িতে খবর চলে আসত। নির্ঘাৎ নিজেই কোথাও গেছে। কিন্তু সেটা কোথায় ? মাথার অলিগলি হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাৎ মিতালির মনে পড়ে দুদিন আগেই মা বলছিল, যে গাছে নাকি অনেক আতা হয়েছে। পেকেওছে বেশ কয়েকটা। এবার পাড়তে হবে, নাহলে মাটিতে পড়ে নষ্ট হবে।
নিজেরা পাড়তে যেও না যেন, কথাটা শুনেই সতর্ক হয়েছিল মিতালি, আবার যদি ব্যথা বাড়ে আর ছুটি পাব না বলে রাখছি এখনই।
মাও তাড়াতাড়ি ভালোমানুষের মতো বলেছিল, না না আমি যাব না। আসলে ইতু খুব আতা খেতে ভালোবাসে তো….তাই ভাবছিলাম।
ইতু মায়ের সম্পর্কিত জা। মিতালিদের কাকিমা। কাছাকাছি থাকেন। মানুষ ভালো। মায়ের সঙ্গে অবরে-সবরে আড্ডাও হয়।ফোনটা আবার ডায়াল করে মিতালি। ধরেই বাবার গম্ভীর গলা, এখনও ফেরেনি….আধঘণ্টাও হয়নি।
ঠিক আছে। একটা কথা বলো তো, এরমধ্যে তোমরা আতা পাড়িয়েছো?
আতা!
প্রশ্নের আকস্মিকতায় বাবা একটু ঘাবড়ে যান, হ্যাঁ, তা পাড়িয়েছি। কেন?
নিজেরা পাড়তে গেছিলে?
মিতালির গলায় চোর ধরার উল্লাস। বাবার বাচনভঙ্গিতে বিরক্তি, না, সে তো তোদের জ্বালায় উপায় নেই। রবি এসে পেড়ে দিয়ে গেছে। দুটো আতা নিয়েছে, কুড়িটা টাকাও দিতে হয়েছে….
মা কি বেরনোর সময় হাতে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছে?
মেয়ের এহেন গোয়েন্দাসুলভ প্রশ্নে নীহারবাবু আরও ঘাবড়ে যান। অত দেখিনি। হাতে একটা প্যাকেট ছিল বোধহয়….
লাইনটা কেটে দিয়ে ইতুকাকিমাকে ফোনে ধরে মিতালি, কাকি, মা এসেছিল নাকি তোমাদের বাড়িতে?
হ্যাঁ, এসেছিল তো। তোদের গাছের আতা দিয়ে গেল। কেমন সুন্দর বড় বড় পাকা আতা হয়েছে রে। তোর মা তো জানে আমি খুব আতা ভালোবাসি। তাই নিয়ে এসেছিল। গল্প করল। চা খেল। আমি মূলোশাক ভাজছিলাম। বললাম বোসো, একটু খেয়ে যাও। তাও খেলো। তোর বাবার জন্য দিয়ে দিয়েছি টিফিন বক্সে। এই তো উঠল ফুলদি। কেন রে?
না, ওই মানে বাবাকে বলে আসেনি তো। তাই বাবা চিন্তা করছিল। ও কিছু না । ঠিক আছে। তোমরা সবাই ভালো তো…..
কথা শেষ করে নিউজ ডেস্কে গিয়ে বসার মিনিট দশেকের মধ্যেই ফোনটা আসে। গুমগুমে গলায় নীহারবাবু জানিয়ে দেন, মিতালির মা সশরীরে, সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছেন। সঙ্গে কৌটোতে মূলোশাক ভাজা। মেয়েরা যেন এবার থেকে সব বিষয়ে বাবাকে দোষারোপ না করে মাকেও খানিকটা সতর্ক করে। নব্বই বছর বয়সে এত দায়িত্ব তিনি নিতে পারবেন না। ধৈর্য ধরে পুরোটা শোনে মিতালি। এখন আর পাল্টা কিছু বলার সময় নেই। এবেলার মতো এপিসোড এখানেই খতম। বকুনিটা সন্ধের জন্য তুলে রাখতে হবে। বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের মধ্যে মোবাইল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনো যে যোগ করতে হবে সেটা মাথায় রাখতে রাখতে কাজে মন দেয়।
