short-story-neel-krishnachura

নীল কৃষ্ণচূড়া

শাশ্বতী নন্দী

যে ঝাঁকড়া মাথাওলা গাছটায় বর্ষা নামার আগে বেগুনী রঙের ফুলে ভরে যায়, তার নীচেই রোজ এসে দাঁড়ায় ওরা দুজন। অঙ্কন আর অঙ্কিতা। দুজনের নামে বড্ড মিল। কিন্তু স্বভাবে একেবারে নর্থ পোল সাউথ পোল। অঙ্কন ভদ্র, নরম সরম, লাজুক গোছের ছেলে। অঙ্কিতা তেমনি ডানপিটে, অহংকারী, রাস্তায় হাঁটে যেন ধুলো উড়িয়ে।

দুজনেই ওরা একই অফিস, ডিপার্টমেন্ট আলাদা। বিকেলগুলো যখন নীল নীল রঙে নীলাম্বরী হয়ে ওঠে, কমলা সূর্য আকাশে টলটল করে, ছোট্ট দুটি যাদু মাখা শব্দ অঙ্কনের মোবাইলে ঢুকে পড়ে, “আসবি নিচে?”

ব্যস, আর নিজের কিউবিকেলে আটকে থাকতে পারে না। উঠে পড়ে চেয়ার ছেড়ে। তারপর ছুটে যায় ওই নীল কৃষ্ণচূড়ার নিচে।

হ্যাঁ ওই নীল বেগুনিরঙা ফুলের গাছটাকে অঙ্কন নাম দিয়েছে নীল কৃষ্ণচূড়া। অঙ্কিতারও নাকি দারুণ পছন্দ এই নামটা। ভাগ্যিস …

ও মেয়ের তো অঙ্কনের কোনো কিছুই পছন্দ হয় না। তবু কি এক বন্ধনে আটকে থাকে ওরা দুজন।

কিন্তু আজ সেই ভালোবাসা, গন্ধ মাখা মেসেজ, “নিচে আসবি?” এলো না তো। বিকেল পাঁচটা পেরিয়ে সাড়ে পাঁচটা, না, এল না। অঙ্কন জানে, আসবেও না। আজ অঙ্কিতা দেখা করতে যাবে ওর ফিয়াসের সঙ্গে। আমেরিকায় বড় চাকুরে। কী যেন নাম!

অথচ অঙ্কনকে নীল আকাশ ডাকছে, লনের সবুজ গাছপালা হাতছানি দিচ্ছে, পাখিগুলোও গান থামিয়ে চুপ করে বসে আছে তাদের অপেক্ষায়।

অপেক্ষা তো অঙ্কনের বুকেও। ওই যে রোজ অঙ্কিতা ডাকত এ সময়, তারপর ওর কিউবিক্যাল থেকে নেমে আসত হাত নাড়াতে নাড়াতে। কাছে এসে দাঁত ঝিকিয়ে হাসত, ওর লেয়ার্স কাটিং চুল দুলে উঠত!

আচ্ছা, অঙ্কন যদি নিজেই এবার টেক্সট করে, মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে কি! কী লিখবে? আজ আমার মন খারাপের বিকেল। দূর, বোকা বোকা। রেগে যাবে ভীষণ। এমনিতেই যা রাগী মেয়ে! তেমনি খামখেয়ালী, কখন কীসে যে মুড অফ। অঙ্কন, তাই একটু গুটিয়েই থাকে ওর সামনে।  

এই যেমন সেদিন এলোমেলো হাওয়ায় অঙ্কিতার চুল উড়ছিল, উড়ে ডান চোখটা ঢেকে দিচ্ছিল বার বার। কী মিষ্টি একটা দৃশ্য!

অঙ্কনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, ‘থাক না, এরকমই থাক, চুলে ক্লিপ আটকাস না।”

ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে সে কী বাঁকা হাসি। অঙ্কিতা হাসছে তো হাসছেই। বলে, ‘তুই এমন ন্যাকাপুষুর মতো কথা বলিস কেন রে? বিশ্রী লাগে শুনতে। একটু পুরুষ হ । জানিস আমার উজান …”

ব্যস, অঙ্কন ফিউজড।

 

২

 

অফিসটাকে প্রথম প্রথম থ্রি স্টার হোটেল মনে হত অঙ্কনের। এত সুসজ্জিত, আর বিকেল বেলায় যেন আরও রূপসী। কিন্তু আজ যেন সবই রঙহীন, ফিকে। সঙ্গে যে অঙ্কিতা নেই। অঙ্কনের জীবনে ওই তো ছিল রামধনুর সাত রং।

হঠাৎ ডিং করে একটা হোয়াটস অ্যাপ টিউন। চমকে ঝুঁকে তাকায় ও স্ক্রিনে। বুকের ভেতরটা কে যেন খিমচে ধরল। অঙ্কিতা কি? 

যাহ্‌ শালা! অন-সাইট থেকে ম্যানেজার, বিজনদা। ওখানে তো সবে এখন ভোর ফুটেছে। ব্যাটার কি চোখে ঘুম টুম নেই? অনেকদিন ধরেই একটা ইসু নিয়ে ঘ্যানঘ্যানাচ্ছে। আজ আবার বিস্তারিত লিখেছে ইয়া লম্বা একটা মেসেজে। ধুস, থাক। রাগ করে পুরোটা পড়লও না সে।

ভেতরটা অস্থির অস্থির, বিকেলটাও কেমন নাছোড়বান্দার মতো ডেকেই চলেছে। একটু দৌড় পায়েই সে এগোল দরজার দিকে। দিপ্তানদা ওদিক থেকে হেসে ইশারায় বলে, ‘কাটছিস? বেশিক্ষণের জন্য যাস না ভাই। বিজনদার ফোন আসছে ঘন ঘন। ওদিকে ইউ এস এর ক্লায়েন্ট জেমসও তো তোর প্রেমে হাবুডুবু। হাজার বার কল’।

অঙ্কন হেসে কপাল দেখায়, ‘ভাগ্য খারাপ বস। নইলে জেমস আমার প্রেমে। আরও তো কত ক্লায়েন্ট ছিল, ইভ, ক্লারা, কেউ এই অভাগার দিকে ফিরেও চাইল না’।

ক্যাফেটেরিয়ায় না গিয়ে কার্ড সোয়াইপ করে সে বেরিয়ে আসে অফিস কম্পাউন্ডের বাইরে।

সামনে একটা ঝুপড়ি দোকান। সবাই ডাকে, ‘কাকার ঠেক’। এখানে কত যে খাবারের সম্ভার। চায়ের টেস্টটা একেবারে সুপার্ব, অথচ ঝুপড়ি দোকান। খদ্দের অনেক।

অঙ্কিতা আজ সঙ্গে থাকলে ঢুকত না। ওর সব কিছুই ব্র্যান্ডেড হওয়া চাই।

-অনেকদিন পর এলে। প্যাটিস বিস্কুট দিই দুটো, নাকি প্রজাপতি? – কাকা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ভাঁড়ে চা এগিয়ে বিস্কুটের বোয়ম খুলছে।

-আজকাল ইভনিং শিফট চলছে গো কাকা। যখন বেরোচ্ছি, তোমার দোকান ঘুমিয়ে কাদা। প্রজাপতি দাও, একটাই। মুচমুচে তো?

কিন্তু চায়ে চুমুক দিয়ে তেমন জমল না। বেশি কড়া লিকার নাকি দুধ কম? অর্ধেক শেষ হওয়ার পর দূরে ভাড়টাকে ছুঁড়ে দেয় সে। কিছুই ভাল লাগছে না। মনের মধ্যে বাউল বাউল বাতাস, শুধু অঙ্কিতা আর উজান।

এমন হওয়ার তো কথা নয়। উজান যে একদিন ফিরবে, জানাই ছিল। তবু পিনকোড হারানো চিঠির মতো আজ এলোমেলো, দিকশূন্য লাগছে কেন? সেই সকাল থেকে কাজে মন বসাতে পারেনি ও এক ফোঁটা।

তবে আজ অফিসের হাওয়াও গরম। এমপ্লয়ীদের মধ্যে বিরাট ক্ষোভ চলছে। রাতে নাকি কোম্পানি আর ক্যাব দেবে না। তাহলে বাড়ি ফিরবে কেমন করে, বিশেষ করে মহিলা স্টাফরা।

এই সব সমস্যা অবশ্য অঙ্কনের নেই। কোনদিনই সে অফিসের গাড়ি টারি নেয় না। শাটল ট্যাক্সি বা অটো অটো করে বিন্দাস বাড়ি ফেরে, একটু দেরি হয় পৌঁছোতে, তা হোক।

রাতের কলকাতা, আহ্‌ সত্যিই অপরূপা! যে দিন দশটা সাড়ে দশটায় ফেরাটা ম্যানেজ করা যায়, কোনও পার্কের সামনে দিয়ে যেতে যেতে দেখে, মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরছে ফুচকাওলা, ঝালমুড়িওলা, ঘুঘনিওলার দল। আইসক্রিমওলার গাড়ির ঘরঘর শব্দটা কানে লাগে, যেন ও কিছুতেই যেতে চাইছে না সবুজ মাঠ ছেড়ে। কিন্তু পাড়ার ফুলওলা রবিদার বড্ড তাড়া। এগারোটা বাজলেই মাথায় ঝুড়ি আর হাতে থলে নিয়ে হনহন হাঁটে, শিয়ালদা থেকে বারোটা দশের রানাঘাট লোকাল। তাই দু দন্ড কোথাও থামা নেই। ওর হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে জুঁই আর বেলিফুলের গন্ধটাও ছড়াতে ছড়াতে যায়। বহুদিন ভেবেছে রবিদার কাছ থেকে পড়ে থাকা সব মালা একদিন কিনে নেবে। ভিড় ট্রেনে নইলে মালাগুলো দোলে পিষে নষ্ট হয়ে যাবে। ফুলের সুগন্ধটাও রানাঘাটের লোকালে মিশে হারিয়ে যাবে। কিন্তু কী করবে অত মালা ঘরে এনে? ভেবেই ও ইচ্ছেটাকে দমিয়ে ফেলে।

হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। ঠিক শুনলো কি? তারই ফোন তো? বুকের মধ্যে আবার লাফালাফি ছোটাছুটি। এবার কি সত্যি সত্যিই অঙ্কিতা? উজানের সঙ্গে যাওয়া ক্যানসেল করল?

না, এবারেও জিরো রানে আউট। ওপাশে দিপ্তানদা, গলাটা স্বাভাবিক, তবু হাল্কা উত্তাপ আসছে, ‘কী হল, ফোঁকা শেষ হয় নি এখনও? এই তোর দোষ, মাঝে মাঝে কেমন বাচ্চা ছেলের মতো বিহেভ করিস। বললাম তাড়াতাড়ি ফের, আজ খুব চাপের দিন’।

মাথার মধ্যে কী যে হল ওর, ফট করে বলে বসল, ‘দেরি হবে বস। প্রথম হাফটা তো সামলে দিয়েছি, নেক্সটা তুমি দেখো’।

-এই, শুধু শুধু বাওয়ালি বাঁধাবি নাকি? আজ কী হল তোর? সকাল থেকেই ফার্নেস।

-কেন, সব কাজই তো নামালাম ঠাণ্ডা মাথায়। আর কথা বাড়িয়ো না বস। সত্যিই আজ আমি আউট অফ টিউন, একটু দেরি হবে সিটে যেতে।”

বলতে বলতে অঙ্কন ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকল। ইচ্ছে করেই, সময়টাকে একটু দীর্ঘ করতে। আজ মাথার মধ্যে এমন সব ইচ্ছে আসছে কেন? সে তো বরাবরের সুভদ্র এক মানুষ।

ক্যাফিটেরিয়ায় খাবারের দাম এত চড়া। তবু সময় কাটাতেই … এখন আর কিউবিক্যালে ফিরে কমপিউটার স্ক্রিনে চোখ রাখতে ইচ্ছে করছে না।

যে টেবিলটায় গতকাল বসেছিল অঙ্কিতা, আজ ওখানেই বসল ও একা। একটা কোল্ড কফি আর স্যান্ডউইচ অর্ডার করল। দুটোই অঙ্কিতার পছন্দের।

ওহ্, সে কি অঙ্কিতাকে ছাড়া পৃথিবীর আর কিছুই ভাবতে পারছে না। মেয়েটা নিশ্চয়ই এখন কোনো রেস্টুরেন্টে বা মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমায়। ভেতরে ঘন অন্ধকার ঘরে, দুজন দুজনের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।

এত দাম দিয়ে কেনা কোল্ড কফি, সেটাও কেমন বিস্বাদ লাগছে! স্যান্ডউইচটাও এক কামড় খেয়ে সরিয়ে রাখল।

গতকাল অদ্ভুত একটা জিনিস নজরে পড়েছিল। অঙ্কিতার বাঁ নাকে এক কুচি হিরের ফুল, ঝলমল করছে। ওর মুখের গড়নটাই পাল্টে গিয়েছিল, এত অন্যরকম লাগছিল! চুলের স্টাইলটাও বেশ, একটা হলুদ প্রজাপতি ক্লিপ আটকে ছিল ওর ঈষৎ বাদামী হেনা করা চুলে। হঠাতই যেন ও বড্ড বেশি মেয়ে মেয়ে উঠেছিল, সেই রুখা সুখা ভাবটা উধাও। এগুলো কি উজানের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি? অঙ্কন তো প্রথমে চিনতেই পারিনি।

হেসে বলেছিল, “তোকে আজ দারুণ দেখাচ্ছে। তবে শাড়ি পরলে আরো সুন্দর দেখাতো।”

-পরব কাল। তখন দেখিস। কাল অফিসে এসেই একটা হাফসিল মারবো। বেরোবার সময় কল করব, গেটে আসিস, দেখা হবে।

শুনেই অভিমানটা চলকে বেরিয়ে পড়তে চাইল। বলতে যাচ্ছিল, ‘আমার দেখার দরকার কী? ওটা উজানের জন্য, ও-ই দেখুক’। 

শেষ মুহূর্তে সামলে নিয়েছিল। কী দরকার, যদি ফাটাফাটি হয়ে যায়। অঙ্কিতা কখন কীসে রিঅ্যাক্ট করে!

প্রসঙ্গ ঘোরাতেই অঙ্কন জিজ্ঞাসা করে, ‘উজান কি পার্মানেন্টলি চলে আসছে স্টেটস থেকে? নাকি কদিনের জন্য … তোদের বিয়েটা কবে?’

অঙ্কিতা অন্যমনস্ক, কী যেন চিন্তা করছিল, সে ভাবেই উত্তর দিল, ‘হুম, জানি না। আজকাল এত কম কথা বলে। বুঝতে পারি না ওর ভাব গতিক। তবে ছেলেটা কেমন র‍্যাপিডলি পাল্টে যাচ্ছে জানিস, বিদেশের হাওয়া গায়ে লাগল বুঝি। অঙ্কিতা নখ খুঁটতে খুঁটতে ফিকে হাসে। – ভীষণ কেরিয়ারিস্ট, টু মাচ প্রফেশনাল’।

অঙ্কন পুরো কফিটা এক চুমুকে ঢক করে শেষ করে বলেছিল, ‘তুই তো এরকম একজন ব্যস্ত আর সফল পুরুষকেই জীবনে চাস”।

-হুম, তা চাই। তবে …

কথা শেষ করার আগেই অঙ্কিতার মোবাইল বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকিয়ে ও ত্রস্ত, ‘উজান। হোয়াট আ প্লেসেন্ট সারপ্রাইজ! তুমি অনেকদিন বাঁচবে। এই মাত্র তোমার কথা ভাবছিলাম। কী করছ?’

অঙ্কন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। উজানের সঙ্গে কথা চলছে, তার কি সামনে থাকা উচিত? একটা দূরের চেয়ারে বসতে যেতেই, হাত দিয়ে আটকাল অঙ্কিতা। চোখে ইশারা, “এখানেই বস।”

অগত্যা। তবে অবাক হয়ে দেখে চলে, এই অঙ্কিতা তার চিরচেনা অঙ্কিতা নয়। উজানের সঙ্গে যখন কথা বলছে, ও সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ। শান্ত, নরম, হাসিটাও ঝর্ণার মত। নাকের হীরের ফুল দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারপাশে।

 

৩

 

অঙ্কিতার কাছ থেকে একটা ফোন অন্তত আশা করেছিল অঙ্কন। এল না। প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করলে কি সব ভুলে থাকতে হয়! নীল বিকেলের বন্ধুদের মনে থাকতে নেই?

 আচ্ছা অঙ্কিতা কি খুব স্বার্থপর? না, না। ও খুব ভালো। স্বচ্ছ মনের মেয়ে। যা বিশ্বাস করে, মুখের উপর বলে দেয়। হয়তো একটু উচ্চাকাঙ্খী, স্পষ্ট বাদি, সব কিছুতেই লাউড, কিন্তু সংকীর্ণ মনের নয়। স্বার্থপর তো নয়ই।

আজ অফিস থেকে ও বেরিয়ে এসেছে তাড়াতাড়ি। দিপ্তানদার সঙ্গে এক চোট হয়ে গেছে। কোনদিন যা করে না, আজ ও তাই করল। বেশ কড়া কড়া কতগুলো শব্দ ব্যবহার করেছে, পরে অবশ্য খারাপ লেগেছে।

অদ্ভুত ব্যাপার, দিপ্তানদা প্রথমটায় রেগে উঠলেও পরে ভিজে নরম। তার পিঠে হাত রেখে বলে, ‘যা ভাই, আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি কাট। তোর মুড একেবারে অফ। একটা সত্যি কথা বলবি? প্রেমে ট্রেমে পড়েছিস কি?’

সে চমকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়, ‘কেন, এর মধ্যে আবার প্রেম কোথায় দেখলে। চিরকালই তো বলতে আমার মধ্যে এক্স ফ্যাক্টর নেই, জীবনেও কোনও প্রেমিকা জুটবে না’।

দিপ্তানদা একই ভাবে হেসে বলল, ‘বলেছিলাম, কিন্তু কদিন ধরে লক্ষ করছি তোর কথার ধার বেড়েছে, চোখের মধ্যেও কেমন ছটফটানি। উঁহু, এগুলো প্রেম না করলে আসে না। এনিওয়ে, বেস্ট অফ লাক ব্রো, দিল কা মামলা থাকলে কাজে মোটিভেশন আসে’।

বাড়ির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখল রবিদা তখনো ফুলের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। একটাও খরিদ্দার নেই, তবু কার জন্য অপেক্ষায়?

ও কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল, দশটা পঞ্চাশ। একবার কি জিজ্ঞাসা করবে, “আজ তোমার রানাঘাট লোকাল নেই?”

না থাক। কিছু কিছু সময় মানুষের অপেক্ষার মধ্যে কোন প্রশ্ন রাখতে নেই। সে অপেক্ষা বড় মধুর, সারা জীবন বয়ে বেড়ানো যায়।

বাড়ির গলিতে না ঢুকে অঙ্কন এখন এলোমেলো ভাবে হেঁটে চলেছে। একটি মেয়েও খুব জোরে পা চালিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছে মোবাইলে, “ফিরছি মা। দেরি হল, ওই যে নাইট শিফটের নার্সদিদি আসতে দেরি করল, তাই। তুমি বাবাকে খেতে দাও। একটু গরম ভাত রেখো, ভাল ঘি এনেছি, একসঙ্গে দুজনে খাব।”

হঠাৎ অঙ্কনের পকেটেও মোবাইল বেজে উঠল। গা ছাড়া ভাবেই সে স্ক্রিনে তাকায়। এখন আবার কে? বাড়ি থেকে কেউ বোধহয়। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়ে চমকে ওঠে। অঙ্কিতা! এতক্ষণে মনে পড়ল!

একগাদা অভিমান দলা দলা হয়ে জমতে থাকে গলার কাছে। ইচ্ছে হল কেটে দেয় লাইনটা। তারপর কী ভেবে বোতাম টিপেই ফেলে, ‘হ্যাঁ বল। এখন ফিরলি বুঝি উজানের সঙ্গে কাটিয়ে?”

ওপাশে ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর, ‘সে খবরে তোর কী?’

-না, এমনিই। অঙ্কন ঢোক গেলে।

ম্যাডামের টেম্পার মগডালে চড়ে আছে, বোঝা যাচ্ছে। বেশি কথায় কাজ নেই। ও চুপ করে যায়। এত রাত্তিরে লড়াই যুদ্ধ ভাল লাগে না।

-কী রে, একেবারে সাইলেন্ট যে! শোন, তোর ওই পেটে খিদে মুখে লাজ মোডটা থেকে এবার বেরিয়ে আয়। অঙ্কিতা বলে ওঠে ওপার থেকে।

-মানে? যা তা বলছিস কিন্তু! মাথাটা গেল নাকি!

প্রথমে যা-ও একটু ধরে খেলছিল অঙ্কিতা, এবার একেবারে ছক্কা হাঁকাল। চেঁচিয়ে বলে, ‘আমার মাথা কমপ্লিটলি ওক্কে। চাইলে তোরটা চেক করিয়ে নে’।

-করাব, তোকে সঙ্গে নিয়ে।

-ক্কী! কী বললি?

-কই, কিছু না তো। অঙ্কনের পিলে চমকে উঠেছে।

-আমি স্পষ্ট শুনেছি তুই আমাকে কিছু একটা বললি।

-আরে না রে বাবা। পাশ দিয়ে একটা পাগল মতন ছেলে হৈ চৈ করতে করতে যাচ্ছিল, সেসবই শুনেছিস বোধহয়। তারপর বল, হঠাৎ এত রাতে কেন মনে পড়ল?

-কেন, আমি কি রাতে ফোন করি না কখনও?

-না, না, করিস, করিস। ওই আর কী, কথার কথা। 

অঙ্কনের রীতিমত ঘাম ঝরছে শরীরে। উফ, কী মেয়ে একখানা! ঘড়িতে এগারোটা। রাস্তা প্রায় শুনশান, এবার বাড়ি ফিরতে হবে। বাড়ি মানে তার ওই এক ফালি ভাড়া ঘরে। মা, বাবা, ভাই, পুরো পরিবারটাই আছে কলকাতার বাইরে। 

-ঘুম আসছে না জানিস। -অঙ্কিতা আবার বলে।

-অ্যাঁ, কী! অঙ্কন চমকে ওঠে। ঘুম আসছে না কেন? চুপ করে শুয়ে থাক ঘর অন্ধকার করে।

-না, না, অন্ধকারে আরও ভয়। ছোটবেলায় বাবা আমাকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াত। এখন তো দিল্লীতে পোস্টেড, বাবাকে কাছে পাই না। মা-ও স্কুলের খাতা নিয়ে ব্যস্ত। আজ ভারি রেস্টলেস লাগছে। বাবা, কোন গানটা গাইত বল তো?

অঙ্কন ফট করে বলে বসে, “নিশ্চয়ই ওই যে, আয় খুকু আয়, শ্রাবন্তী মজুমদার। ওটা বাবাদের একচেটিয়া গান”।

-কারেক্ট! তুই কিন্তু বেশ সেনসিটিভ, যতটা আতা মনে হয়, ততটা নয়।

আবার খোঁচা! যাক গে, ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। আজ ওর রাগের পারদ উর্ধ্বমুখী। কিন্তু বুকে অদ্ভুত এক দুরু দুরু ভাব। হঠাৎ গানের কথা উঠল কেন? তাকে আবার গান টান ধরতে বলবে না তো। সর্বনাশ!

প্রসঙ্গ ঘোরাতেই অঙ্কন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘উজান ফাইনালি কি ঠিক করল? আবার স্টেটসে, না কি ইন্ডিয়ায় সেটল করবে? ডেট কবে ফিক্স করলি?’

-কীসের ডেট?

-তোদের বিয়ের। এক নিঃশ্বাসে বলে ও।

খানিকক্ষণ নীরব। তারপর থেমে থেমে অঙ্কিতা বলে, ‘ওসব বিষয়ে কোনও কথাই হয়নি। সারাদিন উজান শুধু শুনিয়ে গেল ওর প্রজেক্টের গল্প। ভীষণ টেনসড, আমেরিকায় নাকি আর কাজ করার পরিবেশ নেই’।

-ভালোই তো, চলে আসুক কলকাতায়। অত ট্যালেন্টেড ছেলে, ভাল চাকরি মিলে যাবে।

অঙ্কিতা হাসছে, তবে আগের মতো হাসিতে উচ্ছলতা নেই। বলে, ‘উজান কি তোর মতো নীল বিকেল দেখতে ভালবাসে? নাকি নীল কৃষ্ণচূড়ার নীচে দাঁড়িয়ে কফি খেতে জানে? ও সব সময় চোখ ওপরে তুলে হাঁটে। তোর মতো শালপাতায় ঘুঘনি, ফুটপাতের লিট্টি খাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না’।

তা ঠিক, সবুজ ঘাসের মাঠ দেখলেই এখনও তার উপুড় হয়ে শুয়ে বরফ জল চুষতে ইচ্ছে করে। ট্রামের পাদানিতে দাঁড়িয়ে কলকাতা ঘুরতে ইচ্ছে হয় খুব।

-স্কাই ইজ হিজ লিমিট। আবার কথা শুরু করে অঙ্কিতা। উজান শুধু ছুটে চলেছে প্রজেক্টের পেছনে, একটা প্রজেক্ট শেষ হবার আগেই দুশ্চিন্তা পরের প্রজেক্টের জন্য। সেটা শুরু হবার আগেই আবার জাল পাতে তারও পরেরটা ধরবে বলে’। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা গেল ওর গলায়। -উজান আর সেই মানুষ নেই রে, আমূল পাল্টে গেছে, মেন্টালিও ও সিক মনে হয়’।

অঙ্কন অসহায়, এরপর কি কোনও সান্ত্বনার বাক্য শোনানো উচিত? নাকি শুধুই চুপ করে … তবু সে মিনমিন করে, ‘আসলে আকাশ ছুঁতে গিয়ে ও এখন বড্ড একা’।

-ঠিক, তবে এই একাকীত্বের বোধটাও হারিয়ে ফেলেছে। মাটির কাছাকাছি ফিরতেও চায় না উজান। জানিস, একটু দম নেয় ও, উজানের সঙ্গে দেখা না হলেই বোধহয় ভাল হত, এত কষ্ট হচ্ছে এখন। শোন, কাল কিন্তু আমরা আবার নীল কৃষ্ণচূড়ার নীচে দাঁড়িয়ে চা খাব। আজ বড্ড মিস করছিলাম বিকেলটা।

-সে কী! উজানকে কাছে পেয়েও এসব তোর মনে পড়ল?

-হ্যাঁ রে। উজান এত দূরে ভেসে গেছে, চাইলেও হয়তো আর ফিরতে পারবে না উজান বেয়ে। -অঙ্কিতার গলাটা করুণ। ঠিক আছে রে, গুড নাইট। কাল দেখা হবে আবার। আর হ্যাঁ শোন, না থাক। কালই বলব।

-কেন? এখনই বল। এরকম অর্ধেক কথা ভাল লাগে না।

চুপ করে রইল ও খানিকক্ষণ। তারপর থেমে থেমে বলে, ‘তুই খুব ভাল। এমনই থাকিস সব সময়’।

-যাহ্‌, আমাকে বলছিস! তুই আজ সত্যিই ভুলভাল। আমি কত সাদামাঠা জানিস না বুঝি? আকাশ ছুঁতে চাই না কখনও।

-দরকার কী। তোর ভেতরেই তো মস্ত এক আকাশ, এক খন্ডও কালো মেঘ নেই সেখানে। নইলে এত উদার, এত বিশাল হয় নাকি কারো মন?

ফোন ছেড়ে দেয় অঙ্কিতা। বাড়ির পথে হাঁটে অঙ্কন, রবিদা এখনও মালা নিয়ে বসে। দিনের শেষ ঘন্টাটা যে এমন সুন্দর কাটবে, ভাবেই নি আগে। ভেতরে আনন্দের ফুলঝুরি। এই আনন্দের একটা উদযাপন দরকার। রবিদার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় ও, তারপর সব মালাগুলো কিনে বাড়ি ফেরে। জুঁই, বেলি আর রজনীগন্ধার সুবাস সাক্ষী হয়ে থাক এই রাতটার।         

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *