short-story-nishen-pukur

নিশেনপুকুর

অদিতি ভট্টাচার্য

“এই দুটো আবার কী? তোমার জিনিস বলে তো মনে হয় না, কোত্থেকে আনলে?” অর্চনা জিজ্ঞেস করল।

দুটো কাচের গুলি।

“ওহ এই মার্বেলদুটো!” কুহেলী হেসে ফেলল, “কুড়িয়ে পেলাম। তুই নিবি? নে না, তোর ছেলেকে দিস। এ বাড়িতে তো অত ছোটো কেউ নেই। আমার দাদার এরকম অনেক মার্বেল ছিল। ছোটোবেলায় এই নিয়ে দুজনে কম ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি করিনি।”

“কুড়িয়ে পেলে!” অর্চনা দৃশ্যতই অবাক, “তুমি এত পড়ালেখা জানা মানুষ, চাকরিবাকরি করো, রাস্তা থেকে জিনিস কুড়িয়ে ঘরে নিয়ে এলে!”

“রাস্তা থেকে নয় রে বাবা, ওই পুকুরধার থেকে। কাল বিকেলে গেছিলাম, সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল, খুব ভালো লাগছিল। তখনই এ দুটো চোখে পড়ল। কী জানি কী হল, দেখে তুলে আনলাম। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে গেল বলেই বোধহয়!”

“নিশেনপুকুরের ধার থেকে তুলেছ!” অর্চনার মুখ এবারে সাদা, “দাঁড়াও, আমি আসছি।”

কুহেলীকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই অর্চনা উধাও হয়ে গেল।

“কী পুকুর বলল! ওরকম হুড়মুড় করে দৌড়লই বা কোথায়? তবু ভালো খাবারদাবারগুলো সব রান্নাঘর থেকে এনে দিয়েছে, না হলে সেগুলোও তো আমাকেই আনতে হত,” নিজের মনেই বলল কুহেলী।

নতুন চাকরী কুহেলীর, পোস্টিং হয়েছে একেবারে গ্রামে। বাড়িতে বাবা, মা, দাদা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিল, তাপউত্তাপ ছিল না শুধু কুহেলীর।

“তোকে চিনতে আমার আর বাকি নেই! তুই এখন “কোনও দিন গ্রাম দেখিনি, এই সুযোগ’ করে নাচছিস! আমার কী সন্দেহ হয় বল তো? তুই ওখানে গিয়ে আদৌ মন দিয়ে কাজকর্ম করবি, না মাঠেঘাটে, আদাড়েবাদাড়ে ঘুরে বেড়াবি! সাঁতার জানিস না, সে কথাটা অন্তত মাথায় রাখিস। ডোবা, পুকুর – কিছু একটা দেখলেই ‘ও মা কী সুন্দর!’ করে জলে নামতে যাস না,” তপোব্রত বলেছিল।

ওর বলার ধরণে কুহেলী হেসে গড়িয়ে পড়েছিল!

“বাবা! যত চিন্তা যেন তোরই!”

কুহেলী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তপোব্রত বলতে দিলে তো! ওকে থামিয়ে বলল, “তোকে বিশ্বাস নেই। গ্রামটাম তোর ভালো লেগেও যেতে পারে। দেখ হয়তো দু এক পিস ভূত পেত্নীও পেয়ে যেতে পারিস, তোকে দেখে চলে আসতে পারে।”

কুহেলী এবার রেগে উঠে পড়েছিল, “দু দিন পরেই যাওয়া, ভাবলাম আজকের দিনটা তোর সঙ্গে ভালো করে কাটাই, তা নয় তুই খালি বাজে বকে যাচ্ছিস।”

অবশ্য এই রায়দের বাড়িতে ভাড়া ঠিক করে দেওয়া তপোব্রতই করেছিল। সমাজমাধ্যমের এক বন্ধুই যোগাযোগটা করে দিয়েছিল।

“কথা বলে যা বুঝলাম, ওই বাড়িটা, মানে যাকে গ্রামের লোক রায়দের বাড়ি বলে ওটাই কিছুটা ভদ্রস্থ গোছের। তোর অন্তত থাকতে অসুবিধে হবে না, মানুষও খারাপ নয়। বাড়িটা অনেক দিনের, তাও এখন যারা থাকে তারা মোটামুটি মেন্টেন করে রেখেছে,” তপোব্রত বলেছিল।

কথাটা যে ভুল নয় তা এখানে এসে বুঝেছে কুহেলী। বাড়ির বাসিন্দা বলতে গোপাল রায়, তাঁর স্ত্রী রমলা, তাঁদের তিন ছেলেমেয়ে আর গোপাল রায়ের বুড়ি মা সৌদামিনী।

সবে খেতে বসেছে, এমন সময় আবার অর্চনা উদয় হল, অপ্রতিভ মুখে বলল, “তুমি খেতে বসে গেলে! আসলে কথাটা শুনেই বুকের ভেতরটা এমন করে উঠল… তুমি অপিসে বেরোবার আগে একবার ঠাগমার সঙ্গে দেখা করে যেও। ঠাগমা বলেছে।”

“কেন?” কুহেলীর কপালে ভাঁজ, “ঠাকুমা ডেকেছেন কেন?”

“সে তুমি গিয়ে শুনো। আমি কী বলতে কী বলব, তারপরে বকুনি খাব। আমাকে বকতে না পারলে তো কারুর পেটের ভাত হজম হয় না, সে আমার শাশুড়িই বলো কী এ বাড়ির লোকজন,” অর্চনা নিচু স্বরে বলল।

“চুপ কর, বাজে বকিস না। ওরকম পাগলের মতো দৌড়লি কেন মার্বেলদুটো নিয়ে?”

“কী করব, তুমি যে বললে নিশেনপুকুরের ধার থেকে পেয়েছে। শুনেই তো আমার বুকটা কেমন ধকপক ধকপক করে উঠল। এখনও করছে!” মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল অর্চনা।

“নিশেনপুকুর! অদ্ভুত নাম তো! ওই পুকুরটার নাম?”

“শসস… আস্তে বলো,” অর্চনা ঠোঁটের ওপর তর্জনী রাখল।

কুহেলী খুব অবাক হল, এ আবার আস্তে বলার মতো কী কথা? অর্চনা বোধহয় বুঝল সেটা, কুহেলীর কাছে ঘেঁষটে এসে একেবারে ফিসফিস করে বলল, “গোটা গেরামের লোক এটাকে রায়দের ছোটো পুকুর বলে। এ গেরামে এদের অনেক জমিজিরেত আছে। কিছু বিক্কিরি হয়ে গেছে, তবে এখনও অনেক আছে। আরও একটা পুকুর আছে, সেটা বড়ো পুকুর। তুমি দেখোনি সেটা। মাছের চাষ হয় সেখানে।”

“মাছ তো এই পুকুরেও আছে বলে মনে হল,” কুহেলী খেতে খেতেই উত্তর দিল।

“আছে, তবে এ পুকুরে কেউ জাল ফেলে না। এ পুকুরে কিছুই হয় না। এক ঘটি জলও কেউ তোলে না। এ বাড়ির লোকেরা বলে নিশেনপুকুর…”

“ঠাকুমার কাছে নিয়ে চল, তবে আমি পাঁচ মিনিটের বেশি থাকতে পারব না, আমার দেরি হয়ে যাবে,” কুহেলী খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে বলল।

 সৌদামিনী একতলার এক কোণের একটা ঘরে থাকেন। বুড়ো মানুষ, ওপর নীচ করতে পারেন না। এছাড়া একতলায় থাকার মধ্যে আছে ওদের রান্নাঘর, খাওয়ার ঘর, বৈঠকখানা আর কুহেলীর অংশটুকু।

“এই দেখো ঠাগমা, দিদিকে নিয়ে এসেছি,” সৌদামিনীর ঘরে ঢুকে অর্চনা বলল।

ভদ্রমহিলা শুয়ে ছিলেন, এখন কুহেলীকে দেখে আস্তে আস্তে উঠে বসলেন। মার্বেলদুটো পাশেই রেখেছিলেন, হাতে নিয়ে বললেন, “ঠিক করে বলো তো মা, এ দুটো কোথায় পেলে? বাগানের কোথাও না নি… ওই পুকুরের ধারে?”

কুহেলী বুঝল ‘নিশেনপুকুর’ নামটা উনি উচ্চারণ করতে গিয়েও করলেন না।

“একেবারে ওই পুকুরের ধারেই। একটা ছোটো গাঁথনি আছে না, পুকুরের ধারে, দু পাশে খাঁজকাটা খাঁজকাটা? ঠিক ওটার সামনেই পড়েছিল,” বলল কুহেলী।

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন, তারপর আবার জানতে চাইলেন, “আর কিছু দেখতে পেলে?”

প্রশ্ন শুনে কুহেলী খুব অবাক হল, “আর কিছু! কই না তো। আমি পুকুরের কাছে দু তিনবার গেছি, কোনও দিনই কিছু দেখতে পাইনি। গতকালই এ দুটো দেখলাম। এরকম মার্বেলের সঙ্গে আমার ছোটোবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তাই তুলে এনেছিলাম।”

“বুঝেছি,” সৌদামিনী বললেন, “নিশেন রাখার সময় হচ্ছে। আর কারুর নয় নারায়ণ, সে সময় যেন আমারই হয়,” সৌদামিনী দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন, তারপর কুহেলীকে বললেন, “কাজে বেরোবার সময় দেরি করিয়ে দিলাম। বুড়ি হয়েছি, কিছু মনে হলে তক্ষুণি সেটা না জিজ্ঞেস করলে শান্তি পাই না। তাছাড়া মনেও রাখতে পারি না, ভুলে যাই। আচ্ছা মা, তুমি এখন এসো।”

সৌদামিনী কী সব যেন বিড়বিড় করতে করতে আবার শুয়ে পড়লেন।

“এসব কী ব্যাপার? নিশেনটা কী জিনিস?” ঘর থেকে বেরিয়ে ও না জিজ্ঞেস করে পারল না।

অর্চনা আঁতকে উঠল, সতর্ক নজরে চারপাশ দেখল, তারপর কিছুক্ষণ আগের মতো ফিসফিস করেই বলল, “আস্তে বলো দিদি, আস্তে। তোমার গলা নয় তো, যেন ঢাকের বাদ্যি। কেউ শুনতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না।”

কিছু যে একটা গোপন ব্যাপার আছে সে কুহেলী ভালোই বুঝতে পারছিল, কিন্তু এখন এ নিয়ে আর কথা বলার সময় নেই। ঘরে তালা দিয়ে সবে রাস্তায় এসেছে, অর্চনা দৌড়তে দৌড়তে এল, বলল, “সন্ধ্যেবেলায় রান্না করতে আসব, তখন বলব,” বলে আবার তেমনিই দৌড়তে দৌড়তে চলে গেল।

কুহেলী হেসে ফেলল। অল্প দিনেই এ মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে ও। প্রথমদিনেই এসে বলেছিল, “আমার শাশুড়ি এ বাড়িতে কাজ করে, রাতে ঠাগমার কাছে শোয়। অনেক বচ্ছর কাজ করছে। আমি মাঝেমাঝে আসি সাহায্য করার জন্যে। তোমার সব কাজ আমিই করে দেব। একা মানুষ তুমি, কতটুকু আর কাজ?”

“রান্নাও করতে হবে, পারবে তো?” কুহেলী জিজ্ঞেস করেছিল।

“পারব দিদি, তোমার অপিসে যাওয়ার আগে রান্না হয়ে যাবে, আবার সন্ধেবেলা এসে রাতের খাবার করে দেব,” অর্চনা বলেছিল।

সেই শুরু, অল্প বয়সী মেয়েটা দিদি দিদি করে ক’দিনেই কুহেলীর মন কেড়ে নিয়েছিল। দিদি এ গ্রামে নতুন, আগে কখনও গ্রামে থাকেওনি, তাই দিদিকে গ্রামের সব খবরাখবর দেওয়ার ভারও স্বেচ্ছায় নিয়েছিল।

“এ বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই একটা পুকুর আছে। তার নাম কী জানিস? নিশেনপুকুর। এরকম নাম শুনেছিস কখনও?” তপোব্রতকে মেসেজ করল কুহেলী।

“আবিষ্কার নাম্বার ওয়ান। লেগে থাক, আরোও অনেক কিছু আবিষ্কার করে ফেলবি।” প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল।

কুহেলী রেগে উঠতে গিয়ে পারল না। ভাবল, সত্যিই তো, এসব নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কি আছে? গ্রামেগঞ্জে কত পুকুর আছে আর তাদের কত রকম নাম হয়! এ আর এমন কী ব্যাপার! আর ওই মার্বেলদুটো! সত্যি কথা বলতে, সৌদামিনীর মতো একজন গ্রাম্য বৃদ্ধার কথাকে অত গুরুত্ব দেওয়ার সত্যিই কোনও অর্থ আছে কি?

দেখতে দেখতে কাজের চাপে কিছুক্ষণ পরেই মাথায় আর এসব কিছুই রইল না। আজ বাড়ি ফিরতেও অন্য দিনের তুলনায় খানিকটা দেরিই হল। অর্চনা সামনে ঘুরঘুর করছিল, কুহেলীকে দেখে দৌড়ে এল, উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “আজ এত দেরি হল যে? টিফিন খেয়েছিলে তো?”

“হুঁ। ভালো করে এক কাপ কফি কর তো। আর কিছু খেতে দে, খুব খিদে পেয়েছে,” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল কুহেলী।

কুহেলী অফিস থেকে ফেরার আগেই অর্চনা এসে সামনের লাল রঙের ফাটল ধরা রোয়াকে বসে থাকে, এর নড়চড় এ কদিনে একবারও হয়নি।

“তুই একটু পরে এলেও তো পারিস, আমার তো সব সময় ফেরার ঠিক থাকে না,” কুহেলী বলেছে।

“সারা দিন কাজ করে আসো, এসে আবার নিজেই চা-টা করবে, তাই চলে আসি। আমার কোনও অসুবিধে হয় না দিদি,” অর্চনা হাসিমুখে উত্তর দিয়েছে।

ওর সঙ্গলাভের জন্যে, একটু কথা বলার জন্যেই যে মেয়েটার আকুতি তা ভালোই বোঝে কুহেলী। তাই আর কিছু বলেনি।

“নাও, চটপট খেয়ে নাও আগে, কফি আনছি,” চিঁড়ে বাদাম ভাজার বাটিটা খাওয়ার টেবিলে দিয়ে বলল অর্চনা।

“তোর রেখেছিস তো?” কুহেলী জিজ্ঞেস করতে ভোলে না।

অর্চনা সলজ্জ হাসল।

“এখন বলি, শুনবে? এখন এদিকে কেউ নেই। সবাই ওপরে, ঠাগমা বিছানায় বসে বসে জপ করছে,” মেঝেতে বেশ জুত করে বসে খেতে খেতে বলল অর্চনা।

কুহেলী কফিতে চুমুক দিতে দিতে মোবাইল ফোনে মগ্ন, অন্যমনস্কভাবে বলল, “কী বলবি, বল না।”

“ও মা! এর মধ্যেই ভুলে গেলে! নিশেনপুকুরের কথা শুনবে না?”

“তাই তো!” কুহেলী ফোন রাখল, অর্চনার দিকে ফিরে বলল, “সত্যি ভুলেই গেছিলাম! বল শুনি তোর নিশেনপুকুরের কথা।”  

“ও কী অলুক্ষণে কথা গো! ও কী বলছ! আমার নিশেনপুকুর হবে কেন? কক্ষণও যেন না হয়, হে মা কালী, দেখো মা, ও সব যেন কক্ষণও না হয়।”

অর্চনার কাণ্ড দেখে কুহেলী হেসে কুটিপাটি, “কী ব্যাপার বল তো, এত ভয় পেয়ে গেলি কেন?”

“তোমরা এসব বিশ্বাস করো না, তাই না? আমার বর বলছিল, ‘শহরের লোকেরা আমাদের মানুষ বলেই মানে না। আমাদের তাচ্ছিল্যি করে।’ সত্যি কথা, তাই না দিদি?”

“আজেবাজে কথা বলছিস কেন অর্চনা?” কুহেলী বলল, “কখনও দেখেছিস আমাকে তাচ্ছিল্য করতে?”

“তুমি করো না ঠিকই তবে…”

“এসব ছাড়, যা বলবি বলছিলি বল।”

“আজ এ বাড়িতে খুব গোলমাল হয়েছে গো দিদি। তুমি অপিসে চলে যাওয়ার পরে ওই কাচের গুলিদুটো বাড়ির সবাই দেখেছে। মামা, মামী, ছেলেমেয়েরা – সবাই। আমি তো বাড়ি চলে গেছিলাম, আমার শাশুড়িকেই খুব বকেছে, আমি ও দুটো ঠাগমাকে দেখিয়েছি বলে। শাশুড়িও বাড়ি গিয়ে আমাকে দশ কথা শোনাতে ছাড়ল না। তুমি ওরকম কুড়িয়েছ বলেও তোমার নামেও অনেক কিছু বলেছে নাকি।”

“কী বলেছে?” কুহেলীর কপাল কুঁচকোল।

“ ‘পুকুরপাড়ে পড়ে রয়েছে আর অমনি তুলে নিল! একেবারে ঘরে নিয়ে চলে এল! এরা নাকি আবার …’ বলেছে মামা, আমার শাশুড়ি বলল।”

কুহেলীর মনে হল অর্চনা সব কথা বলল না, চেপে গেল।

“তবে ঠাগমা বুড়ি হয়ে গেলে কী হবে, এখনও জোর আছে। ঠাগমার ওপর কেউ কথা বলতে পারে না। ঠাগমাই সবাইকে থামিয়েছে। বলেছে, ‘কুড়িয়েছে তো কী হয়েছে? চুরি ডাকাতি করেছে? আর অর্চনাও বেশ করেছে যে আমাকে দিয়েছে।’ তখন সবাই চুপ করেছে। তবে ঠাগমাকে বলেছে, ‘এসব নিয়ে ফালতু ফালতু মাথা ঘামিও না। এখনকার দিনে এসব কেউ মানে না। শুনলে লোকে হাসবে। খালি নিশেন নিশেন করছ, সব সময় কি এরকম ঘটেছে কিছু? হ্যাঁ, কয়েকবার হয়তো হয়েছে, তবে সে কাকতালীয়।’ তাতে ঠাগমা এমন করে তাকিয়েছে যে মামা, মামী আর কেউ কোনও কথা না বলে চলে গেছে।”

“এমন করে বললি যেন তোর চোখের সামনে সব ঘটেছে!”

“আমার শাশুড়ি এমন করেই বলে গো। সব বলে, একটা কথাও বাদ দেয় না।”

“খুব ভালো। কিন্তু আসল কথা কিছুই বললি না।”

“বলছি গো বলছি,” অর্চনা কুহেলীর দিকে আরও একটু এগিয়ে এল, “অনেক দিন আগেকার কথা, মানে অনেক বচ্ছর আগেকার কথা, এ বাড়ির এক বৌ ওই পুকুরে ডুবে মরেছিল। সে বৌ নাকি সুখী ছিল না। পাওনাগণ্ডার জন্যে শ্বশুরবাড়ির লোকজন অত্যেচের করত। বৌ নাকি মনের দুঃখেই ডুবে মরেছিল। ওই জন্যিই তো ওখানে ওই ইটের গাঁথনি করা আছে।”

পাওনাগণ্ডার জন্যে? মানে সেই হতভাগীও কি পণপ্রথার বলি হয়েছিল?

“বৌএর অনেক জিনিসপত্তর নাকি ওই পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। তারপর থেকে অনেকে মাঝেমধ্যেই বৌকে ওখেনে দেখেছে। বাড়িতে অনেক পুজোআচ্চা করা হয়েছে, তারপর থেকে সে আর আসেনি,” অর্চনা দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল, “তবে জিনিসপত্তর, এটা ওটা নাকি পুকুরের চারপাশে দেখা যেত। ঠাগমা বলে নিশেন। বলে, ‘নিশেন দেখা গেল মানে নতুন নিশেন রাখারও সময় হল।’ এই এখন যেমন দেখা গেল। তুমি কুড়িয়ে নিয়ে এলে।”

“ওই মার্বেলদুটো ওই বৌয়ের জিনিস, এত বছর আছে? কী যে বলিস অর্চনা!”

“তুমি তো কিছুই বুঝলে না দিদি! সবই কি ওই বৌয়ের জিনিস নাকি? সেই কবে, কত বচ্ছর আগে বৌ ডুবে মরেছিল, তারপর থেকে কি এ বাড়িতে আর কেউ কখনও মরেনি? তাই হয় কখনও?”

“তা হবে কেন? কিন্তু তার সঙ্গে ওই মার্বেলের সম্পর্ক কি?”

“তাদের নিশেন থাকবে না? যে মরে তার নিশেন থাকে পুকুরপাড়ে, তাই তো ওই পুকুরের নাম নিশেনপুকুর। ঠাগমারা বাইরে বলতে চায় না, তবে তাই বলে কি আর কেউ জানে না? জানে। আমার শাশুড়িই জানে কত কথা। অনেক বচ্ছর কাজ করছে তো, এ বাড়ির লোকের মতোই হয়ে গেছে, শাশুড়ির সামনে কেউ আর অত রাখঢাক করে না। শাশুড়ি বলল ঠাগমার একটা ছেলে নাকি কচি বয়সে মরেছিল, এ তারই নিশেন। তোমার হাত দিয়ে ফেরত এসেছে। ঠাগমা বলছে আবার কারুর নিশেন রাখার সময় হচ্ছে।”

নিশেন মানে নিশান? যে মারা গেছে তার চিহ্ন? অর্চনা ভর সন্ধ্যেবেলা এ কী গপ্পো ফেঁদে বসল! কথা শুনে মনে হচ্ছে মার্বেলদুটোর গায়েও যেন লেখা আছে ও দুটো কার জিনিস! এই নিশেন ফিরে আসা আর কোনও মৃত্যুর আগাম সংকেত দেওয়ার ঘটনা নাকি আগেও হয়েছে! তবে গোপাল রায় যে তাকে কাকতালীয় বলেছেন এই যা রক্ষে। সবাই এমন কুসংস্কারগ্রস্ত হলে চলে কখনও! অবশ্য অর্চনার ‘ঠাগমা’ যে ওই ধরেই বসে আছেন তা বলাই বাহুল্য। এবং অর্চনাও। এখন মনে হচ্ছে মার্বেলদুটো না নিয়ে এলেই ভালো হত, কিন্তু ও কি আর এত কথা জানত! কুহেলী কী বলবে ভেবে পেল না।

“তুমি বিশ্বাস করোনি, তাই না দিদি?” অর্চনার বুঝতে ভুল হয়নি।

“আমি অন্য কথা ভাবছি। এসব যুক্তিহীন ব্যাপার মাথায় ঢুকিয়ে বসে থাকলে তো মুশকিল। উনি এমনিতেই বয়স্ক মানুষ, শরীরও বেশি ভালো নয়, এ নিয়ে বেশি ভাবনা-চিন্তা করলে তো শরীর আরও খারাপ হবে,” বলল কুহেলী।

অর্চনা আর কিছু বলল না, রান্নাঘরে চলে গেল।

দেখতে দেখতে সপ্তাহ দুই কেটে গেল। আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছে। এত আগে অর্চনা আসতে পারে না। কুহেলী বাড়ি ফিরে এদিক ওদিক করছিল। হঠাৎ মনে হল, নিশেনপুকুরের দিকে গেলে হয় না, সেই ঘটনার পরে আর বাগানে বেরোনই হয়নি। আজ বেশ মেঘলা আছে, পুকুড়পাড়ে গেলে ভালোই লাগবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। পুকুরের কাছাকাছি গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কুহেলী। সৌদামিনী। এর আগেও এক দিন এসেছিলেন, অর্চনা নিয়ে এসেছিল।

“ঠাগমা একেবারে পাগল হয়ে উঠেছিল, তাই নিয়ে গেছিলাম। যাওয়ার জন্যে যত তাড়া, ফেরার জন্যেও তত,” বলেছিল অর্চনা।

কী করছেন ভদ্রমহিলা ওখানে নিচু হয়ে? পড়ে যাবেন না তো? একা বেরিয়ে এলেন কেন? কুহেলী হন্তদন্ত হয়ে ওঁর পাশে গেল। সৌদামিনী ঠিক তখনই সোজা হয়ে দাঁড়ালেন আর দাঁড়াতেই কুহেলীকে ওঁর চোখে পড়ল। হাঁফাচ্ছেন, লাঠিতে ভর দিয়ে অতি কষ্টে যে এসেছেন সে বোঝা যাচ্ছে। তার মধ্যেও হাসলেন। তারপর বাড়ির দিকে রওনা দিলেন।

“আমাকে ধরুন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি,” কুহেলী বলল।

সৌদামিনী মুখে কিছু বললেন না, শুধু মাথা নাড়লেন। তারপর আস্তে আস্তে বাড়িতে ঢুকে গেলেন।

কুহেলীও পায়ে পায়ে পুকুরের দিকে এগোল। আজ চারপাশ যেন বড্ড বেশি নিঝুম। কী একটা পাখি তখন থেকে একটানা বিরক্তিকর সুরে ডেকে যাচ্ছে। কুহেলীর আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করল না, কেন তা ও নিজেই জানে না। চলে আসছিল, তখনই নজরে এল জিনিসটা। এটা এখানে এল কী করে! কিছু ভেবে ওঠার আগেই চারপাশের নিস্তবদ্ধতাকে খানখান করে হাতে ধরা ফোনটা বেজে উঠল। মা। কুহেলী কথা বলতে বলতে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। আধঘন্টা পেরোল কি পেরোল না, অর্চনার ডাকাডাকিতে কুহেলী ফোন ছেড়ে উঠল।

“ও দিদি, এত কাণ্ড হয়ে গেল আর তুমি কী করছ!” অর্চনা ডুকরে উঠল।

“কী কাণ্ড হল?” অর্চনার মুখচোখ দেখে কুহেলীর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

“ঠাগমাকে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে মামা ডাক্তার ডেকে এনেছে। ডাক্তার বলল অনেকক্ষণ আগেই নাকি ঠাগমা মরে গেছে। মরে একেবারে কাঠ হয়ে শুয়ে আছে, কাকপক্ষীতেও টের পায়নি গো!” অর্চনা কাঁদতে কাঁদতে বলল।

“তা কী করে হয়, আমি তো কিছুক্ষণ আগেই…” বলতে গিয়েও কুহেলী থেমে গেল।

অর্চনা কিছু বোঝেনি, এতশত খেয়াল করার অবস্থা ওর নেই। কুহেলী সৌদামিনীর ঘরে যাওয়ার আগে নিশেনপুকুরের দিকে দৌড়ল। নাহ, ঘটিটা আর ওখানে আর নেই।

ও ঘটিটা সৌদামিনীর অত্যন্ত পছন্দের ছিল। ওতে জল খেতেন উনি। মেজে আনতে একটু দেরি হলেও চেঁচামিচি করে বাড়ি মাথায় করতেন, অর্চনাই বলেছে। কিন্তু এখন ঘটির কথা জিজ্ঞেস করার সময় নয়। অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হল না, অর্চনা রান্না করতে এসে বলল, “মানুষ আর মানুষ নেই গো! এতটুকু ভালোমন্দ বিবেচনা নেই! ঠাগমা গেছে এই সবে, এর মধ্যেই ঘটিটা হারিয়ে গেল! ঠাগমার পছন্দের জিনিস! এত লোক আসছে যাচ্ছে, কে নিয়ে গেল কে জানে!”

কুহেলীর কানের কাছে কে যেন বলে উঠল, “বলেছিলাম না, নিশেন রাখার সময় হচ্ছে?”

ওই নিশেন রাখতেই উনি তার মানে পুকুরপাড়ে গেছিলেন? কিন্তু তার অনেক আগেই তো…

শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে কুহেলীর সারা শরীর যেন অবশ করে দিল।

 

 

1 thought on “short-story-nishen-pukur

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *