short-story-nondinider-sukhe-thaka

নন্দিনীদের সুখে থাকার ক্ষণকাল

পাপড়ি রহমান

খেয়া পারাপার হওয়ার প্রাক্কালে কয়েকজন বখাটে আমাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। ওদের মাঝ থেকে কেউ কেউ ঠোঁট দুইটা সুচালো করে শিষ বাজায়। আমরা ওই শিষের শব্দ শুনে বিব্রত হই। তখন মরানদীর খাড়া বেয়ে নামতে নামতে আমাদের পায়ের কেডস ধুলায় ধুলাকার হয়ে ওঠে। আর সেই ধুলার কারসাজিতে কিনা কে জানে, আচানক আমাদের পা যায় পিছলে। ঢাল থেকে গড়িয়ে পড়তে পড়তেও আমরা নিজেদের কোনোমতে সামলে নেই। আর আড়চোখে বখাটেদের দেখি—

কী রকম গরীবগুবরা ছোটলোকদের মতো চেহারা ওদের! একজন আবার বেশ কায়দা করে তেলমাখা-চুলের-গুচ্ছ কপালের ওপর ফেলে রেখেছে! একজনের নাকের ওপর এবরোথেবরো গোঁফ। আরেকজন পরে আছে সবুজরঙা সিল্কের শার্ট। আরেকজনের পরনে লালশার্ট আর শাদালুঙ্গি। লুঙ্গির সামনের কুচি ডানহাত দিয়ে ধরে উঁচু করে রেখেছে সে। দেখে আমাদের গা গুলিয়ে বমি আসতে চায়। ইয়াল্লা! এদের অঙ্গভঙ্গি এত কুৎসিত কীকরে হয়? কেন হয়? কিন্তু এখন বমি করলে ইশকুলে যাতায়াতের পথ আরও সঙ্গিন হয়ে উঠতে পারে— ভেবে আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি।

আমাদের আম্মার কথা মনে পড়ে। আম্মারা আমাদের পইপই করে বলে দিয়েছে—

‘বখাটেগুলার সাথে কুনু কথা বলবা না একদম। সোজা ইশকুলে যাইবা আর আসবা। কুনুদিকে তাকাতাকি কইরো না। ওরা কিন্তু ভালো ছেলে না।’

আম্মাদের কথা অমান্য করার মতো সাহস আমাদের এখনো হয় নাই। তাই আমরা কুনুদিকে তাকাতাকি না করারই চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা চেষ্টা করলেই যে সফলকাম হতে পারি সেরকম কিছুও নয়। যখন বখাটেদের দল হররোজ খেয়াঘাটে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা ওদের সাথে একদম তাকাতাকি করি না, কথা তো দূর কী বান্ত! কিন্তু আড়েটারে ওদের ঠিকই দেখি। ওদের মানে ওদের কায়কারবার।

আমরা কোনো কিছুই না করলেও ওরা আমাদের পিছু ছাড়ে না। আমাদের ইশকুল টাইম ইয়াদ রেখে ঠিকঠিক খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা ভিতরে ও বাইরে খারাপ বোধ করি। এইসব বখাটেরা কেন আমাদের জ্বালাতন করে? ওদের কি খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজকাম নাই?

শুধু দাঁড়িয়ে থাকে তাও কিন্তু নয়। কখনো গেয়ে উঠে—

সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা / তোমার বেলায় নেব সখি

তোমার কানের সোনা / সখি গো ও…আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি / তোমার কাছে পয়সা নেব না…

ওদের চেহারাছবি গরিবগুবরাদের মতো, পরনের কাপড়জামা অরুচিকর হলেও গান গায় বেশ ভালো। মানে গানের সুরলয়তাল ঠিক রেখে গায়। ওদের গান শুনে আমরা মনে মনে মুগ্ধ হলেও তাকাতাকি করি না। কথা বলার প্রশ্নই আসে না। যদিও এই গানটা আমাদের সকলেরই ভালো লাগে। আম্মাদের সাথে দিলশাদ সিনেমা হলে গিয়ে আমরা এই বইটা দেখে এসেছি। সিনেমার নাম ‘সুজনসখী’। নায়িকা কবরী আর নায়ক ফারুখের জমজমাট প্রেমের ছবি। কিন্তু বখাটেদের গলায় এই গান শুনে আমরা মনে মনে রেগে যাই। যদিও ওদের সুরতাললয় ঠিক আছে। তবুও রাগি, কারণ ফারুখের দারুণ সুঠাম শরীরের সঙ্গে এরা যায় নাকি? অথবা ফারুখের গজদন্তি তুলনাহীন হাসির সঙ্গে এরা কি নিজেদের হাসিমুখ মিলিয়ে দ্যাখে না? যত্তসব ফালতুর দল! আমাদের ইচ্ছা করে ওদের সাথে এ নিয়ে কথা বলি। আর কথা না বললেও বাতাসের সাথে মিছামিছি কথা বলার কায়দায় বলে দেই—

কোথায় আগরতলা আর কোথায় খাটেরতলা? হ্যাহ!

কিন্তু আম্মাদের নিষেধ ডিঙিয়ে আমরা কিছুই করিনা। বা করতে পারি না। আমাদের সাহস হয় না।

সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা / তোমার বেলায় নেব সখি

তোমার কানের সোনা / সখি গো ও…আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি / তোমার কাছে পয়সা নেব না…

ওদের গাওয়া এই গানও আমাদের ওদের দিকে তাকাতে বাধা দেয়। আমরা কী করে এত সস্তা গানেয় গায়কদের সাথে একাট্টা হতে পারি? যেখানে আমাদের ইশকুলে গানের ক্লাসে আমরা গাই—

বনের তাপস কুমারী আমি গো, সখি মোর বনলতা। / নীরবে গোপনে দুইজনে কই আপন মনের কথা। / যবে গিরিপথে ফিরি সিনান করিয়া, / লতা টানে মোর আঁচল ধরিয়া, / হেসে বলি, ওরে ছেড়ে দে, আসিছে তোদের বন-দেবতা…

আমাদের গানের টিচার নমিতাদি বড় যত্ন করে আমাদের এ গান শিখিয়েছে। এই গানের সংগে ওই চটুল গানের মিলঝিল হয় নাকি?

আমাদের ইশকুল ইউনিফর্ম, কোমরের শাদাবেল্ট, পায়ের শাদা মোজা ও কেডস, কাঁধের বাহারি ব্যাগ, ব্যাগের ভিতরের টিফিনবক্সের ডিমপরোটা— এসবই আমাদের নদীর পাড়ে দাঁড়ানো বখাটেদের কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে। এখন ওই গান আর আমাদের শেখা গানের সাথেও দুস্তর ব্যবধান রচিত হয়ে গেলো।

কিন্তু তবুও কোন অদৃশ্য কারণে আমাদের ওদের দেখলে ভালো লাগে। কাজবাজ নাই, ইশকুল কলেজ নাই, পোষাকে রুচি নাই— তবুও ওরা গান গায় আমাদের জন্য! গান গাইলেই কী কিংবা ওরা নাচলেই বা কী? আমাদের মন আম্মারা ‘বখাটে’ শব্দ দিয়ে বেধে দিয়েছে। সব সখীর সাথে বনের তাপসের কোনোদিন মিলঝিল হতে পারে না। তাই আমরা আরও বেশি করে সতর্ক হয়ে উঠি। আমাদের ইশকুল ইউনিফর্ম, কাঁধের ব্যাগ, পায়ের কেডস কিংবা টিফিন বক্স আরও বেশি করে পরিপাটি রাখে আম্মারা। যাতে বখাটেরা আমাদের দিকে ওদের গরিবগুবরা আশা-আকাঙ্খাকে বাড়াতে না পারে। আম্মাদের এতসব কষ্টকর চেষ্টা বিফলে যায় না । আমরা বনের তাপস শেখার পরে নতুন গানে মনোযোগি হই। আমরা গলা খুলে গাই—

বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল / আজো তার ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি তন্দ্রাতে বিলোল। / আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায় ঝুরছে নিশি-দিন / আসেনি দখিন হাওয়া গজল গাওয়া মৌমাছি বিভোল।

ইশকুলের নমিতাদি আমাদের এসব গান বড় যত্ন নিয়ে শেখান, কিন্তু আমাদের মন পড়ে রয় টিভির ‘ছায়াছন্দ’ নামক চলচ্চিত্রের গানের প্রোগ্রামে। ছায়াছন্দ মানে বখাটেদের মুখে মুখে ফেরে যেসব গান, তাদের টিভির পর্দায় দেখে ফেলা। এর চাইতে আনন্দের আর কী আছে? এইসব গানের কাছে বনের তাপস বা বাগিচার বুল্বুলির উড়ে যেতে কতক্ষণ? আমাদের আম্মারাও এই প্রোগ্রাম মনোযোগ নিয়ে দেখে বলে শাসনের শেকল তখন খানিকটা ঢিল দিয়ে রাখে। ছায়াছন্দ নামক সিনেমার গানের প্রোগ্রামেই আমরা দেখি ফেলি অদ্ভুত সুরেলা একটা গান। যে গানে দারুণ সুন্দরী গোলগাল টাইপ এক নায়িকা টাঙ্গা চালায়। আর লাড্ডুমার্কা নায়ক সাইকেলে চড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়—

চুমকি চলেছে একা পথে / সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে? / হার মেনেছে দিনের আলো / রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালো / চুমকি চলেছে একা পথে…

এই গান যে বখাটেদের সাহস বাড়িয়ে দিবে আমরা তা ঘুণাক্ষরেও টের পাই নাই। পরের দিন ইশকুলে যাওয়ার পথে আমরা তিন-চারটা সাইকেলে করে বখাটেদের উড়তে দেখি। আমাদের ঘোড়ার গাড়ি নাই বলে ওরা আস্তেধীরে সাইকেল ঠেলে আমাদের দলের পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করে। আর সমস্বরে গাইতে থাকে—

চুমকি চলেছে একা পথে / সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে? / হার মেনেছে দিনের আলো / রাগলে তোমায় লাগে আরও ভালো / চুমকি চলেছে একা পথে…

আমাদের মনে হয় এখন ঘোর বর্ষাকাল। শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে একশা হয়ে উঠছি আমরা। চৌদিকে কদমফুলের সুঘ্রাণ ম ম করছে। আদতে আমাদের মাথার ওপর চড়ে আছে আগুনে বৈশাখ। খা খা রোদ্দুরে আমাদের রুমালি ছাঁটের ফ্রক ভিজে জবজবে হয়ে উঠেছে। সূর্যের প্রচণ্ড তাপে গলে থিকথিক করছে রাস্তার পিচ। এইরকম বল্গাহীন উত্তাপে কি বখাটেদের কিছুটা সহনীয় লাগছে আমাদের কাছে? আমাদের নিজেদের কোনো টাঙ্গা নাই, কিন্তু বখাটেরা সাইকেল র‍্যালি করে আজ কেমন ক্যারিশমা দেখিয়ে দিলো? এই প্রথম আমাদের উপলব্ধি হয়, বনের তাপস হলেও কারো পারানির কড়ি দেবার সামর্থ্য আমাদের কারোরই নাই। অথচ রুচিহীন গরিবগুবরাগুলারও গানের গলা বেশ সুরেলা হতে পারে। ওরা নতুন সিনেমা বা ছায়াছন্দ বা জনপ্রিয় গানের বেশ খোঁজখবরও রাখে। আমাদের জলার্দ্র-মন টলে উঠলেও পা টলে উঠবার কোনো সম্ভাবনা নাই। আম্মাদের শাসানী ভুলেটুলে বখাটেদের চুমকি হয়ে উঠবার মতন সৎসাহস আমাদের কস্মিনকালেও হবে না। তা ওরা সাইকেল নিয়ে আসলেই কী? কিংবা মরানদীর জলে হেলিকপ্টার নামিয়ে দিলেই বা কী? আমরা আমাদের বকের মতো ধপধপা শাদা ইউনিফর্ম, কোমরের বেল্ট, পায়ের কেডস বা কাঁধে ঝুলানো বাহারি ইশকুল ব্যাগের কাঁটাতার পেরিয়ে আর কোথাও যেতে পারব না, যাওয়া সম্ভব হবে না। আমরা আম্মাদের মুখ মলিন করতে পারব না কিছুতেই! কিংবা ডিঙাতে পারব না আম্মাদের শাসানী।



 

পুকুরের পাড় ঘেষে একটা পাকা অথচ ঢালু লম্বা রাস্তা চলে গেছে ইশকুলের শাদা-বিল্ডিং বরাবর। রাস্তার দুই পাশে সবুজ ঘাসের মখমল তাজা হয়ে আছে। কিন্তু আমাদের এইসব ঘাসে পা ফেলতে ভয় ভয় লাগে। এই ঘাসের গালিচায় জোঁকেরা জেঁকে থাকে যুৎ করে। সুযোগ পেলেই এরা আমাদের সালোয়ারের ভিতর ঢুকে পড়বে। শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয়া পেটমোটা-জোঁক দেখার চাইতে মরে যাওয়া ভালো। ইশকুলের সুউচ্চ-পাঁচিল ঘেষে দুইটা রামগুয়া গাছ আকাশচারী হয়ে আছে। ঝড়বাদলের দিনে রামগুয়া পড়ে বিছিয়ে থাকে গাছেদের তলায়। আমরা তুলে নিয়ে দুই/একটা খেয়ে দেখেছি। সুপারীর চাইতেও এত শক্ত এরা যে, আমাদের দাঁত মট করে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তবুও আমাদের ভালো লাগে রামগুয়া বিছিয়ে থাকা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে। তবে সারাক্ষণ তটস্থ, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হয়। জোঁকদের ঘিনঘিনে চলাচল দেখে ওঠার আগেই আমরা যেন সটকে পড়তে পারি।

লম্বা পাকা রাস্তা ধরে আমরা টিফিন পিরিয়ডে হাঁটাহাঁটি করি। আসমা, বলাকা আর রুপালির সাথে গল্পস্বল্প করি। রুপালির কানের দুইপাশে দুইটা মোটাসোটা কলাবেণী ঝুলতে থাকে। বেণীর ওপর শাদা ফিতা দিয়ে ফুল তোলা। ওর চোখ দুইটা বড় সুন্দর! কাজলকালো ডাগর ডাগর চোখ।

কিন্তু ওর মুখাবয়বে ম্লানিমা দেখে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এত সুন্দর মেয়েটাকে সারাদিনই ম্লান হয়ে থাকলে চলে নাকি? আমরা ওর প্রতি ঝুঁকে পড়লে শুনতে পাই আরেক সিন্ডেরেলার গল্প। যে গল্পে আছে এক সৎমা। বিষাক্ত আপেলের চাইতে বিষাক্ত যার মুখের কথা! রুপালি খুব ধীর গলায় বলে—

‘আজও আসতে লেইট হইলো। কিন্তু কী করা বল?’

আমরা উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করি কোনো গোপনকথা শুনবার জন্য।

কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলিনা। আমরা আমাদের আম্মাদের শেখানো আদবকায়দা অতিক্রম করে কোনো অযাচিত আগ্রহ দেখাতে পারি না।

রুপালি গলা আরও গভীর কোনো খাঁদে নামিয়ে বলে—

‘বুঝিস না, ইশকুলে আসার আগে বেশ কতোটা গুঁড়াগাড়ি মাছ কেটে আসতে হইলো। তাই লেইট।‘

আমাদের দুইপা যেন সালোয়ারের কাপড়ের ভিতর পেঁচিয়ে গ্যাছে, যেন এক্ষুণি আমরা পড়ে যাব মুখ থুবড়ে। কিন্তু আমরা খুব কৌশলে নিজেদের সামলে নিই। রুপালিকে বুঝতেই দিই না আমাদের ভিতরে কী নিদারুণ ভাঙচুর চলছে!

আয়হায়! এই মেয়ে বলে কী? মাছ কেটেকুটে নাকি ইশকুলে এসেছে সে? অথচ আমরা নিজেদের হাতে ম্যানিকিউর করা নখ রাখতে শিখে গ্যাছি। তাতে বাহারের নেইলপলিশ লাগিয়ে দিন ফুরিয়ে ফেলি। আব্বা আমাকে কিছুতেই সংসারের কোনো কুটোটিও নাড়তে দেয় না। আম্মার কাজে  সাহায্য করতে চাইলে আব্বা বলে—

‘হাতে যেন দাগ না পড়ে যায়, সাবধানে খেয়াল কইরো। হাত নষ্ট হইয়া যাইব।’

আমাদের পায়ের কেডস ধুয়ে দেয় আম্মা। ধুয়ে তাতে চুনা লাগিয়েও দেয় আম্মা। বাটার দোকানে জুতা কেনার সময় আব্বা এই চুনা কিনে নিয়ে আসে। গোলগাল শক্তমক্ত শাদা গ্লিসারিন সাবানের মতো দেখতে এই চুনা। সাবানের সাথে স্পঞ্জের টুকরো দেয়া থাকে। স্পঞ্জটা পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে আম্মা ঘষে ঘষে চুনা লাগানোর কাজটি করে। আমরা তখন রেডিওতে দুপুরের অনুরোধের আসরের গান শুনি। বা পাড়া বেড়াতে যাই। অথবা ফুলগাছগুলিকে জলে স্নান করিয়ে দিই।

কাপড়ের শাদা জুতা না ধুলে কীরকম নোংরা দেখায়। ধপধপে শাদা মোজার সাথে কালচে বা অফ হোয়াইট হয়ে যাওয়া কেডস কীভাবে পরা যায়?

আমাদের ক্লাসের সবাচাইতে কোমল মেয়েটা কীনা নিজ হাতে মাছ কাটে? যেখানে আমরা কোনটা যে কী মাছ সেটাই ভালো করে বুঝে উঠতে পারি না।

রুপালির মুখের ম্লানিমা এবার আমাদের বুকের ভিতর দোল খায়। হয়তো এজন্য আমাদের বুকের ভিতরটা কীরকম করে যেন দুলে ওঠে! আমরা চুপচাপ দেখতে থাকি একজন সিন্ডেরেলার কীভাবে সৎমায়ের হিংসুটে দৃষ্টির সামনে মিইয়ে যেতে থাকে। আমরা যখন দুর্বার বেগে বৌমাছি খেলি বা ব্যাডমিন্টন তখন কেন রুপালি অনুপস্থিত থাকে, সেটাও এতদিন বাদে যেন বুঝতে পারি।

তখন পাশের পুকুরের অতল জল থেকে মাছেদের বুরবুরি তোলা দেখি। দুই-একটা রুপোরাঙা মাছ মাথা তুলে জল থেকে লাফ দিয়ে শুন্যে ভাসে। আর আমরা মনে মনে অভিশাপ দেই—

এই পৃথিবীতে মাছের আকাল নেমে আসুক। খাল-বিল-নদী-নালা-সমুদ্দুরের মাছেরা অকালে মরে যাক। কোন মাছ না পাওয়া গেলে রুপালিকে তখন কী কাটতে দিবে ওর মা? মাছ কাটতে না হলে ইশকুলে আসতে আর বিলম্ব ঘটবে না ওর। প্রথম পিরিয়ডের ঘন্টা বাজার আগেই নির্বিঘ্নে পৌছাতে পারবে ও।

রুপালির দুর্দশার কথা ভেবে ভেবে আমরা বিষণ্ণ হয়ে উঠি।

মনের ভুলে সবুজ ঘাসের গালিচা জুতাতে মাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করি আমরা। জেঁকে বসা জোঁকদের রক্তের ঘ্রাণে বেঁকেতেড়ে আসার ঘটনাও  বিস্মৃত হয়ে যাই। আমরা আলগোছে রুপালির হাত ধরি। ওর হাতে কি মাছের আঁশটে গন্ধ লেগে আছে? আমাদের জানা হয় না। কারণ ওর হাত তুলে নাকের কাছে নিয়ে শুঁকে দেখার মতো অভব্যতা আমরা শিখিনি। আম্মারা এইসব শেখায়নি আমাদের। আদতে আম্মারাই তো আমাদের সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও বিকেল হলেই তারা পাড়া বেড়াতে যায়। ঠোঁটে যত্ন করে লিপস্টিক ও চোখে কাজল মাখে। কড়কড়ে মাড় দেয়া শাড়ি পরে আম্মারা পাড়ায় ঢুলকি বাইতে যায়। আম্মাদের মুড শরিফ থাকলে সুরেলা কন্ঠে গানও গেয়ে ওঠে তারা।

সিণ্ডেরেলা রুপালির লাইফে কোনো পরিবর্তন আসে না। কোনো রাজকুমারের পাইকপেয়াদা একপাটি জুতো নিয়ে এসে রুপালির দরোজায় কড়া নাড়ে না। আমরা শুধু দেখি রুপালির কাজলকালো ডাগরডাগর চোখের তলায় ঘন হয়ে জমে ওঠে কালির দাগ। ওর ঢলঢলে লাবণ্যমাখা মুখটা ঝরে পড়া বাসী বকুলের মতো শুস্ক হয়ে ওঠে। আমরা তখন পুকুরের জলে মাছেদের বুরবুরি তোলা দেখি। আমাদের মনে ক্ষোভ জমে ওঠে।

এইটা কিমুন কথা? আমরা হাজারবার চাইলেও কেন মাছেদের মৃত্যু ঘটে না!

মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত রুপালির নিস্কৃতি ঘটবে না। যতদিন মাছ থাকবে, ততদিন রুপালির সৎমা টাইমলি ইশকুলে আসার বিঘ্ন ঘটাবে।

শুধু যে মাছ কেটেকুটেই ও ইশকুলে আসে এমন নয়। ছোটছোট ভাইবোনদের যত্নআত্তি করেটরে মলিন মুখ করে ইশকুলে পড়তে আসে রুপালি।

আমরা দেখি ওর হাতের নখগুলি কাজ করে করে ভাঙাচুরা, আঙুলগুলি কেমন ফ্যাকাশে। অতিরিক্ত ক্ষার দেয়া সাবানে কাজ করলে হাতের আঙুল এমন দেখায়। কিন্তু রুপালিকে এই অবস্থা থেকে আমরা উদ্ধার করতে পারি না। কীভাবে পারব? কেই-বা কার নিয়তির লেখা বদলাতে পারে? রুপালির দুঃখে আমরা নির্বাক হয়ে পুরুরের ঢেউহীন জলের দিকে তাকিয়ে থাকি।

এরই মাঝে আমরা দারুণ স্মার্ট এক নায়কের প্রেমে পড়ি। শার্প চেহারা। দারুণ গান গায়। এই নায়কের বোনও গান গায়। আরেকভাই গান লিখে আর সুর করে। এই নায়ক একদিন টিভিতে ম্যাগিহাতার টিশার্ট পরে আসে। এরকম টিশার্ট আমরা কস্মিনকালেও দেখি নাই। স্টাইলিশ নায়ক হেলেদুলে গান করে—

সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী / হয়ে কারো ঘরনী / জেনে রাখো প্রাসাদেরও বন্দিনী / প্রেম কভূ মরেনি / চলে গেছো কিছুতো বলে যাও নি / পিছুতো ফিরে চাও নি / আমিও পিছু ডাকিনি / বাধা হয়ে বাঁধিনি…

এই গান শুনে আমরা যাকে বলে মিসম্যারাইজড হয়ে যাই। হায়! আল্লা! এইটা কী গাইলো জাফর ইকবাল? নায়িকা ববিতারে নিয়া গাইলো নাকি?

আমাদের ইশকুলে যাওয়ার পথের ধারে দাঁড়ানো বখাটেগুলা কি এই গান শুনেছে?

এই গানটা ওদের শোনা দরকার। প্রেমে যদি তোরা পড়েই থাকিস তাহলে এই গানটা শোন, হাবলারদল।

নইলে ‘সুজনসখী’ সিনেমার ওই গানটা—

বামন হইয়া চাঁদের পানে হাত বাড়াইও না…

আমরা মনে মনে ভাবতে থাকি—

পরের দিন ইশকুলে যাওয়ার পথে বখাটেগুলা সমস্বরে গেয়ে উঠবে—

সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী…

কিন্তু আমরা যা ভাবি তা হয়না। ওরা কিরকম এক অশ্লীল গান গেয়ে ওঠে আমাদের দেখে—

গুন গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায় / সেই গানের টানে ফুলের বনে ফুলের মধু উছলায়।/ভ্রমর যখন ফুলের সাথে করে আলিঙ্গন/চাইয়া থাকি তখন আমার কেমন করে মন। / ফুল যদি হইতাম আমি গাছের ডালায়। / তখন নীল ভ্রমরা হইয়া বন্ধু উইড়া বইতো আমার গায়…

লালমিয়া এই লাইন গাইতে গাইতে দুইহাত জড়ো করে বুকের কাছে নিয়ে আলিঙ্গনের অশ্লীল ভঙ্গি করে। আমরা ধুলা উড়িয়ে দ্রুত পা চালাই। আমাদের বকের মতো শাদা কেডস ধুলায় ধুলাকার হয়ে ওঠে। তা হোক। এদের সামনে থেকে আমাদের এখন পালাতে হবে। ছিঃ কী অসভ্য এরা! এরকম ছেলেরা আমাদের যাতায়াতের পথের পাশেই-বা দাঁড়ায় কীভাবে?



 

সরকারি বয়েজ ইশকুলের হামীম আমার বাসায় আসে দুইদিন বাদেই। ও আর আমি এক ইশকুলে না পড়লেও, একই ক্লাসে পড়ি। ওর সাথে মিশতে আমার ভালো লাগে। ভদ্র, সুইট চেহারা আর খুব পরিপাটি থাকে ও। বিকালের নিভু নিভু আলোতে আমি ফুলগাছে জল ঢালতে থাকি। হামীম এসে কোনো ভাণভণিতা না করেই বলে—

‘ওই নতুন গানটা শুনছস?’

‘কোন গানটা?’

‘ওইযে জাফইর‍্যার গানটা’

আমি রেগে বলি—

‘জাফর ইকবাল বলতে পারিস না? জাফইর‍্যা কীরকম নাম? হ্যাঁ?’

শুনে হামীম খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসে। আমি আরও রেগে যাই। রেগে বলি—

‘লালমিয়ার মতো বখাটেপনা করলে এক্ষুণি চলে যা এখান থেকে।’

আমার কথা শুনে হামীমের হাসি নিভে যায়। ও তখন অন্য একটা চাল চালে। বলে— ‘তুই একটা গান গাইতেছিলি।’

‘কী গান?’

‘কবরীর গানটা।’

‘কোন গান?’

ওর মুখে শয়তানির হাসি উছলে পড়ে। বলে— ‘ওই যে ফুলবাগানের গান।’

শুনে আমার রাগ আরও বাড়ে। আমি ওর বুকে জোরে ধাক্কা মেরে বলি—

‘রঙ্গ করস ক্যান? কী বলতে চাইস, বল।‘

‘সুজনসখীর মারাত্মক গানটা। গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভোমরা যায়।‘

শুনে লজ্জায় আমি এতটুকুন হয়ে যাই। আদতে আমি কি ওই বখাটেদের গাওয়া গানটা গাইতেছিলাম? কী জানি? মনের ভুলে গাইতেও পারি। আমাদের এতোটা বোঝার বয়স না হলেও আমরা বুঝি, এটা একটা বড়দের গান। যদিও শরীর কী বা শরীরের ভাষা কী আমরা সেসবের কিছুই জানি না।

হামীম ফের মিচকে শয়তানের মতো হাসে। গলা নিচু করে বলে—

‘লালমিয়া নাকি তোরে চিঠি দেয়?’

আমি রাগে চিৎকার করে উঠি।

-আর কোনো আলাপ পাস না, না? ফালতু একটা। বদমাশ। আমি অই বখাটের  চিঠি নিতে যাবো?’

‘তাইলে তুই লিখিস নাকি?’

আমি আরও রেগে যাই। রেগেমেগে বলি—

‘তুই আমারে কী ভাবিস অ্যাঁ? আমি ক্যান ওরকম পথের ছেলেকে চিঠি লিখতে যাব? আজব!’

হামীমের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। সহসা গম্ভীর হয়ে বলে—

‘তাইলে আমারে একটা চিঠি লিখিস তুই।’

ওর কথা শুনে আমি তব্দা মেরে যাই। তাজ্জব! কী বলে এই ছেলে? আমি কেন কাউকে বা ওকে চিঠি লিখতে যাব? আমি কি ফালতু নাকি?

আমি এবার হেসে ফেলি—

‘তোরে ক্যান চিঠি লিখতে যাব আমি? তোর সাথে তো প্রায়ই দেখা হয় আমার।’

হামীম আর কিছু না বলে মুখ অন্ধকার করে চলে যায়।

আগের মতোই ‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা’— শুনতে শুনতে আমরা ইশকুলে যাওয়া-আসা করি। বখাটেদের গলায় এই গানটা এতদিনে হুবহু মানিয়ে গ্যাছে। আমরা আড়েটাড়ে ওদের দেখি। দুই একজন সিগারেটের ধোঁয়ার রিং বানিয়ে আমাদের দিকে ছুঁড়ে মারে। লালমিয়াকে দেখি বাঁশের কঞ্চির মতো হেলানো শরীরে শাদা শার্ট গায়ে আমাদের আসাযাওয়ার পথের সামনে লেংচিয়ে লেংচিয়ে হাঁটে। নিত্য দেখা বখাটেদের চাইতে বেশ ভদ্রগোছের একটা ছেলে একদিন সাইকেল চালিয়ে আমার সামনে এসে থামে। আমি থতোমতো খেলেও নিজেকে সামলে নেই। ভয় তাড়াতে সিনা চিত করে দাঁড়িয়ে বলি—

‘এই মধু, কী চাও? কেন আসছ?’

মধু আমার কথা শুনে তোতলাতে থাকে। বলে—

‘তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।’

‘আমার সাথে তোমার আবার কীসের কথা?’

‘না মানে, ইয়ে আর কী? এই ধর কিছু কথা।’

‘কলেজে যাইতেছিলা, যাও। আমার সাথে তোমার কোনো কথা নাই।’

মধু সাইকেল থেকে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নেয়।

আমি তাকিয়ে দেখি ওর ভয়ানক ফর্শা মুখটা লাল টুকটুকে হয়ে উঠেছে।

মধু চলে গেলে আমার ইশকুলমেটরা হাসতে হাসতে রাস্তার ওপর বসে পড়ে। আমি ওদের হাসিতে যোগ না দিয়ে বলি —

‘তাড়াতাড়ি পা চালা। প্রথম ঘন্টা পড়ে গ্যালে কিন্তু আজ আর ইশকুলে ঢুকতে পারবি না।’

টিফিন পিরিয়ডে আমরা হল্লা করে গাইতে থাকি—

সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী

হয়ে কারো ঘরনী…

কিন্তু এই গান গাইলে আমাদের মন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। আমরা রুপালির দিকে তাকাই। আচ্ছা এই মেয়ে কী কোনোদিন সুখে থাকতে পারবে? কারো ঘরনী হতে পারবে ও? দিন কয়েক বাদে চোখমুখ আমসি করে হামীম আসে আমাদের বাসায়। আমি ফুল গাছদের স্নান করাতে করাতে নির্বিকার থাকতে চাই। মনে মনে ভাবি, ফের চিঠি লেখার বায়না নিয়ে আসছে নাকি ও?

সিমেন্টে বাঁধানো একটা বেদীর ওপর বসে হামীম আমাকে ডাক দেয়।

আমি গিয়ে চুপচাপ ওর পাশে বসি। কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব রেখে।

হামীম মুখ আন্ধার করে আছে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে—

‘তুই কি জানস, মধু মারা গ্যাছে?’ শুনে আমি আঁতকে উঠি। ইয়াল্লা ওই ভ্যাকভ্যাকে ফর্সা লালমুখো ছেলেটা মারা গেছে? কীভাবে? কেন সে মরে গ্যাছে? আর মধু আমাকে কী যেন বলতে চেয়েছিল?

কিন্তু আমি তো ওকে কিছু বলতেই দেই নাই। বরং ওকে একেবারে কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি। ছিঃ ছিঃ এটা আমি কী করেছি?

কেন ও কীভাবে মারা গেছে জিজ্ঞাসা করার সাহস আমার হয় না। আমার দুইচোখ অশ্রুতে ভিজে ওঠে। হামীমকে আরও মলিন দেখায়। কীরকম দুঃখী একটা চেহারা। যেন ঝড়ের কবলে পড়া ডানা ভাঙা একটা শালিক ও!  হামীম বিষণ্ণ গলায় বলে—

‘শোন, আমি লাকসামে নানীর বাড়িতে চলে যাচ্ছি। এখন থেকে ওইখানের ইশকুলেই পড়ব।’

শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। এই ছেলে এতসব দুঃসংবাদ বয়ে কেন এসেছে আজ বিকেলে? আমার বুকের ভিতরটা কেমন শূণ্য শূন্য মনে হয়। আমি কি হামীমকে ভালোবাসি? কিন্তু ভালোবাসা কী আমি তাইতো জানি না। হামীম চলে গেলে আমার সাথে ওর আর দেখা হবে না। এইটা কেমন কথা? আতকা এসে আজ বলতেছে, ও লাকসাম চলে যাবে?

হামীম চোখ নত করে রেখেছে। আমার দিকে কিছুতেই তাকাচ্ছে না। আর আমিও আছি, এত বেপরোয়া কেউ হয়? কাউকে পাত্তা না দেয়ার বিদঘুটে স্বভাব আছে আমার। কিন্তু হামীম চলে যাচ্ছে শুনে আমার মন কেন ভেঙেচুরে চৌচির হয়ে যাচ্ছে?

আকাশ থেকে সন্ধ্যার রঙ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। হামীমের মুখ আবছা অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে! ওকে যেন আর দেখা যাচ্ছে না। হামীম এগিয়ে এসে আমার হাত আলগোছে ধরলে বুক ফেটে কান্না আসে আমার। হামীম কীরকম অচেনা গলায় বলে—

সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী…বলেই দ্রুত চলে যায়। আমি থইথই অন্ধকারের ভিতর একাকী দাঁড়িয়ে থাকি। হামীমের সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয় নাই। জাফর ইকবালের গলায় গানটা কিন্তু আজও রয়ে গ্যাছে। গানটা বেজে উঠলে আজও আমি বিষণ্ণ হয়ে যাই। হামীমের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হলে বলতাম—

‘শোন তুই আমাকে বলেছিলি সুখে থাকতে। কিন্তু আমি কোনোদিনই সুখে থাকিনি রে। একদিনের জন্যও নয়। সুখ কাকে বলে আমার কোনোদিনই জানা হয় নাই…’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *