short-story-otithi-debo-bhobo

অতিথি দেব ভব

ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়

গাড়ি থেকে নেমে পাড়াটা দেখেই মুগ্ধ অনসূয়া। চওড়া রাস্তার দুদিকে একতলা বাংলো প্যাটার্নের বাড়িগুলো একে অপরের থেকে একেবারেই আলাদা। কোনোটার ধাঁচা তো কোনোটার রঙ আবার কোনোটার আয়তন। তার সঙ্গে ঘাস আর গাছ গাছালির সবুজের ছোঁওয়ায় মন আর চোখ দুই ভরে যায়। নিখুঁত, নিটোল। পিকচার পোস্টকার্ড বলতে যা বোঝায় তাই। কিন্তু এরকম জনহীন কেন? প্রাণহীন কেন? পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে কেউ থাকে না। কিন্তু না, থাকে। প্রত্যেকটা বাড়িতেই মানুষের বসবাস। তবে কলকাতার মত হইচই, চিৎকার বা পাড়ার আড্ডা নেই। 

এই হল সিডনির সেভেন হিলস এর বৈশিষ্ট। শুধু সেভেন হিলস নয়, শহরতলির প্রায় সব জায়গাই এরকম। এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় কোথাও ট্র্যাফিক জ্যাম বা মানুষের ভিড় চোখে পড়ে না।  

এত খালি খালি কেন ভাবছ বলো তো? গাড়ি লক করে কৌস্তভ নামতে অনসূয়ার অভিব্যক্তি দেখে বলেই ফেলে। 

হ্যাঁ। আমাদের ওখানে তো ভাবাই যায় না। প্রথম প্রথম এখানে এসে আমাদেরও এটাই মনে হত। চিমটি কেটে দেখতাম বেঁচে আছি তো! হেসে ফেলে অনসূয়া, আর এখন কলকাতা গেলে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। 

একদম তাই।

ডিকি থেকে স্যুটকেসটা বার করতেই অনসূয়ার ছেলে বাবি এগিয়ে আসে, আরে তুমি নিচ্ছ কেন? আমায় দাও না ছোটমামা।

অতিথি দেব ভব! 

ওরে বাবা! স্যাংস্ক্রিট! তুমি জানো?

অফ কোর্স! 

ও তোর মত বাংলা মায়ের অ্যাংলো সন্তান নয় রে, বাবি। নিজের কালচারের কিছুই জানিস না, মানিস ও না। 

মায়ের বিরোধিতা করে বাবি, কে বলেছে জানি না? যদিদং মম মম… 

এখানেই থেমে যা…আর এগোস না। কৌস্তভ ভাগ্নের পিঠে চাপড় মারে, মম মম! এ কি মম চিত্তে নাকি? 

সারাদিন শুধু খেলা আর রক ব্যান্ডের গান নিয়ে পড়ে থাকলে মমতেই আটকে থাকবি। অনসূয়া আগেও বহুবার ছেলেকে এ কথা বলেছে। 

ইউ লাভ রক? থামের গায়ের সুইচ টিপে লোহার রেকট্যাঙ্গুলার গেটটা খোলে কৌস্তভ, শোনাবো তোকে। 

বাবি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। অনসূয়াও। এসব উন্নত টেকনোলজি দেখতে একেবারেই অভ্যস্ত নয়। কলকাতার বালিগঞ্জ গার্ডেনসে মানুষ। বিয়ের পর ঢাকুরিয়ায় চলে আসে। লাইনের ওপারে শ্বশুরের তৈরি ভিটেটা মন্দ না। শুধু লেভেল ক্রসিং এ আটকে গেলেই একরাশ বিরক্তি উপচে পড়ে। 

পড়বে নাই বা কেন? সারাদিন স্কুলে ছাত্র ঠেঙিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই মনে হয় কতক্ষণে স্নান সেরে বিছানায় টানটান হয়ে শোবে। যদিও সে ক্ষণিকের আনন্দ। বাবি পাড়ার মাঠে খেলে বাড়ি ফিরতেই তাকে খেতে দেওয়া, পড়তে বসল কি না নজর রাখা আর তারপর নীলাঞ্জন অফিস থেকে ফিরলে তাকে জলখাবার দেওয়া। এই নিয়মেই চলছিল জীবন।

হঠাৎ গত ডিসেম্বরে খুড়তুতো ভাই টাবুন ওরফে কৌস্তভ কলকাতা এসে অনসূয়াদের সঙ্গে একদিন নিয়মমাফিক দেখা করে। আর কথায় কথায় বলে, কবে আবার ওখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাব। তার আগে একবার সিডনিটা ঘুরে যাও।  

সংসার ফেলে আমি কি করে যাব বল? 

ফেলে যেতে কে বলেছে? সবাই মিলে ঘুরে যাও।

আমার অফিসে এতদিন ছুটি নিলে ফিরে এসে বাটি হাতে বসতে হবে ভাই। নীলাঞ্জন ঠাট্টা করে, তার চেয়ে তুমি তোমার দিদিভাইকে আর ভাগ্নেকে নিয়ে যাও।  

নিয়ে যাও শুনেই বাবি লাফাতে শুরু করে। বন্ধুদের জানিয়ে দেয় সে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে। পাশের বাড়ির রিকুর মা অনসূয়াকে একদিন রাস্তায় পেয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেলে, কিগো কবে চললে? কোথায়?  

অস্ট্রেলিয়া আবার কোথায়? 

শুনেই অনসূয়া বুঝে যায় এ ছেলের কীর্তি। তুই রিকুকে বলেছিস আমরা অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি? 

পড়ার টেবিলে বসে ঝিমোচ্ছিল বাবি, ধড়মড় করে ওঠে।

গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছিস কেন? বলেছিস?

হ্যাঁ মানে…

গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। আগে থেকেই রাষ্ট্র করে বেড়াতে লাগলি?

নীলাঞ্জনের কানে যেতে সেও একটু অসন্তুষ্ট হয় ঠিকই। তবে তারপরেই বলে, ঘুরেই এসো না।

আমরা তোমায় একা ফেলে কোনোদিন কোথাও গেছি?

একা ফেলে যাওয়ার কি আছে? আমি কি বাচ্চা! আর দেখো অনু, সত্যি অত দিনের ছুটি পাব না।  

কতদিন লাগবে? 

লাগবে ধরো…দিন দশেক। যাওয়া আসাতেই তো বিরাট সময়। ভাই ডাকছে, এই মওকা ছেড়ো না। 

সারাদিন স্কুল আর বাড়ির কাজের মধ্যে কথাটা মাথায় ঘুরতে থাকে অনসূয়ার। একবার কি সিডনি ঘুরে আসবে? ভাবতে ভাবতে একদিন ফাইনাল করেই ফেলে। কৌস্তভকে জানাতে সে আনন্দে আটখানা।  

ভিজা অ্যাপ্লাই করে দাও দিদিভাই। আমি আমার অ্যাড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি।

করে দেয়। কয়েক মাসের মধ্যে পেয়ে যায়। যাত্রা শুরু হয় অনসূয়া আর বাবির। কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে সিডনি। এই প্রথম বিদেশ যাত্রা বাবির। অনসূয়া এর আগে একবার ব্যাংকক গেছে, সে অবশ্য ছেলে হওয়ার আগে।

দিল্লিতে ঘন্টা আড়াইয়ের ওয়েটিং ছিল। একই এয়ারলাইন্স বলে লাগেজ অটোমেটিকালি ট্রান্সফার হয়ে যাবে। তারপর লম্বা ফ্লাইট। হাঁপিয়ে উঠেছিল অনসূয়া। বাবিও। এক জায়গায় বসে থাকার ছেলে ও নয়। কত আর সিনেমা দেখবে, গান শুনবে। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। আর তারপর সিডনি পৌঁছে, ইমিগ্রেশান পেরিয়ে বাইরে আসতেই শরীর মন সব চনমন করে ওঠে। 

 

জায়গাটা কি সুন্দর! স্নান সেরে কফি নিয়ে বসেছে বাবি আর অনসূয়া। এমনিতে ভালই। কোনো ঝুটঝামেলা নেই। আমাদের নেবার ও খুব মিশুকে। রিমা চিকেন স্যান্ডউইচের প্লেটটা এগিয়ে দেয়, নাও। একটা তুলে নেয় বাবি, ছোটমামা আমরা কোথায় কোথায় যাব?

প্রথমে যাব ব্লু মাউণ্টেইন।

ব্লু! নীল রঙের পাহাড় হয়?

বলব না, গিয়ে দেখবি। কৌস্তভ কফি মাগে চুমুক দেয়, কাল সকাল সকাল বেরিয়ে যাব দিদিভাই। আর্লি পৌঁছলে তবেই মজা। তারপর ফেরার পথে… 

কালকে কি একবার বন্ডাই বিচে যাবে? রিমা জানতে চায়।

ওটা ভাবছিলাম সোমবার করব। কাল সান্ডে, ভিড় হবে।

কিন্তু সোমবার তোমার ছুটি থাকবে? 

ও না থাকলে কি হয়েছে, আমি নিয়ে যাব বাবি। 

রিমা নিজেও একটা স্যান্ডউইচ নেয়, ওখান থেকে সিটি ঘুরিয়ে আনব।

উফ! এক্সাইটিং! 

ও কেন এত এক্সাইটেড বলতো? কতক্ষণে ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করে বন্ধুদের দেখাবে।

অনসূয়ার কথায় সকলে হেসে ওঠে।

শুধু ছবি পোস্ট নয় মা, আমি ভ্লগ বানাবো। নাম দেব – অসাম অসি।

পরের দিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েই ভিডিও শুট শুরু করে দেয় বাবি। গাড়ি ছাড়ার আগে নিজের ইন্ট্রোডাকশান দিয়ে সামনের সিটে বসে। রাস্তা তো নয় যেন এয়ারপোর্টের রানওয়ে। একেবারে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে!  

নটা নাগাদ ওরা পৌঁছল। রিমা আসেনি, নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে বলে থেকে গেছে। কৌস্তভ প্রায় ট্যুর গাইডের মত ওদের বোঝাতে বোঝাতে এগোয়। 

ব্লু মাউন্টেইন কিন্তু ব্লু নয়। 

তাহলে? মুখের সামনে থেকে মোবাইল সরিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকায় বাবি।

হিয়ার ইজ দ্য ক্যাচ। সকালবেলা পাহাড়ের গায়ে যত গাছ আছে তারা এমন একটা গ্যাস এমিট করে যে দ্য মাউন্টেইন টারনস ব্লু। 

ইজ ইট! 

দেখ নিজের চোখে।

বাবি দৌড়ে যায় রেলিং ঘেরা ভিউ পয়েন্টের দিকে। ট্যুরিস্ট আছে তবে বেশিরভাগ সাদা চামড়ার। তারা মুগ্ধ হয়ে দেখছে, ছবি তুলছে, নিজেদের মধ্যে বকবক করছে।

সিরিয়াসলি ছোটমামা! ব্লুইশ একটা টিঞ্জ আছে। 

বিভোর বাবি ছবি আর ভিডিও তুলতে থাকে। অনসূয়াও দু চোখ ভরে দেখছে। প্রকৃতির এরকম খেলা আগে কখনো দেখেছে বা শুনেছে বলে জানা নেই।

উলটোদিকের পাহাড়ের পিকসগুলো দেখছ? কৌস্তভ হাত দেখায়, ওটাকে বলে থ্রি সিস্টারস।

কেন?  

উইন্ড ইরশানের ফলে পাহাড়ের মাথাটা ক্ষয়ে তিনটে চূড়া বেরিয়ে এসেছে। তাই থ্রি সিস্টার্স।

ওয়াও! 

বাবি কয়েকজন পর্যটকের পাশ কাটিয়ে একেবারে রেলিং এর ধারে চলে আসে। নরম সূর্যের আলো ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের চারদিকে আর তার সঙ্গে ধোঁওয়া ধোঁওয়া পরিবেশ। একটু একটু করে কাটছে।

আরেকটু পরে এলে নীল আভাটা আর দেখতে পেতিস না। যত সকাল হয় এটা ক্রমশ কমে যায়। তাই বলেছিলাম একটু আর্লি এলে মজা পাবি। 

প্রাণ ভরে ব্লু মাউন্টেইন দেখে পাশেরই একটা ক্যাফেতে জুস আর বার্গার খেয়ে ওরা বাড়ি ফিরল। ততক্ষণে লাঞ্চের ব্যবস্থা করে ফেলছে রিমা। ভাত, ডাল, ঝুরি আলুভাজা, সরষে মাছ আর চিকেন। সঙ্গে টোম্যাটোর চাটনী। 

এতকিছু একা হাতে করলে! ডাইনিং টেবিলে খাবারের সম্ভার দেখে অনসূয়ার চোখ কপালে।

কতদিন পর রাঁধলাম জানো না দিদিভাই। নিজেদের জন্য কে এসব করে বলো? 

বুঝতে পারছ তো! তোমার ভাইকে না খাইয়ে রেখেছে…  

ও বাবা! কে বলছে? রিমাও ওদের সঙ্গে খেতে বসে, ফিট থাকার জন্য তিনি কিছুই মুখে তোলেন না। কত যে বায়নাক্কা ভাবতে পারবে না। 

অনসূয়া এক হাতা ডাল পাতে নেয়, তুমি কি ভাবছ ওর কথা আমি বিশ্বাস করছি? 

যাক। তুমি আমার ফরে, দ্যাটস গুড। রিমার চোখ যায় বাবির দিকে, কিরে তুই চুপ কেন? ঘুম ঘুম পাচ্ছে?

হ্যাঁ। একটু। 

জেটল্যাগ। 

কৌস্তভ আরও খানিকটা আলুভাজা পাতে নেয়, এক কাজ কর খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নে। ইভনিং এ তোদের হারবার ব্রিজের দিকটায় নিয়ে যাব।

সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ ওরা এল হারবার ব্রিজ। গাড়িটা একটু দূরে পার্ক করে হেঁটে আসতে আসতে পাশ দিয়ে কয়েকটা ট্রাম পেরিয়ে যায়।  

কি বিরাট ছোটমামা!

হুম…ফোর কোচ ট্রাম।

চড়তে হবে।

আজ? পরশু দিনের বেলা আসব সেদিন চড়াব। 

মামার কথা বাবি মেনে নেয়, ইয়া! দিনেরবেলা বেস্ট। ইন ফ্যাক্ট আমি ভাবছিলাম একা একা আসব। 

একা আসবি? কেন?

টু এক্সপ্লোর দিস প্লেস। আর সেকেন্ড থিং আমি ইন্ডিপেন্ডেন্টলি ঘুরতে চাই। মা সঙ্গে থাকলেই বলবে এখানে যাস না, ওটা করিস না।

ছেলে লায়েক হয়ে গেছে দিদিভাই। 

ক্লাস নাইন ছোটমামা। নট আ কিড এনি মোর! 

কৌস্তভ বাবির কাঁধে হাত রাখে, ইউ আর স্টিল আ কিড টু আস। 

তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে ফেরি ঘাটের ডানদিকের রাস্তা ধরে অপেরা হাউসের সামনে আসে। জনা দশেক লোক এই মুহূর্তে সেখানে। লোকাল আর ট্যুরিস্ট মিলিয়ে। সিঁড়িতে বসে গল্প করছে আর আলোর মালায় সজ্জিত হারবার ব্রিজের শোভা দেখছে। 

বাবি ওদের ছাড়িয়ে তরতর করে ওপরে উঠে, অপেরা হাউসকে পেছনে রেখে কখনো গ্রুফি তো কখনো সেলফি নেয়।  

এটার বিউটি সকালে একদম অন্যরকম বুঝলি বাবি।  

নিচ থেকে চেঁচিয়ে বলে কৌস্তভ। বাবি হাত নাড়ে, আমি কিন্তু আসছি আবার এখানে…একা।   

 

সোমবার মানেই ব্যস্ততার আরেক নাম। কৌস্তভের অফিস এবং কিসব জরুরি মিটিং আছে বলে সকাল নটার মধ্যে বেরিয়ে গেল। কথা ছিল রিমা ওদের বন্ডাই বিচ নিয়ে যাবে। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে বাবি জেদ ধরে সে আজকেই হারবার ব্রিজ আবার যাবে। দিনের আলোয় অপেরা হাউস না দেখলে চলছে না। 

কাল যাস। আজকে বিচে চল না! 

রিমা বা অনসূয়ার কোনো কথাতেই কাজ হয়না। তবে বিদেশ বলে কথা। তার ওপর ছেলে নিজেকে যতই স্মার্ট ভাবুক তাকে একা ছাড়া যায়? অনসূয়া সঙ্গে আসে। রিমা অবশ্য ভাল করে সব বুঝিয়ে দেয়। যেহেতু সেভেন হিলস সিডনি শহরের অনেকটাই বাইরে তাই ওখান থেকে ট্রেনে করে আসাটা সহজ, ওরা তাই করে। 

ওয়াইন ইয়ার্ড স্টেশনে নেমে মা আর ছেলে গুলিয়ে ফেলে কোনদিকে যেতে বলেছিল রিমা। মোবাইল সঙ্গে আছে তবে রোমিং করেনি বলে একমাত্র ওয়াই ফাই ছাড়া কানেকশান পাওয়া মুশকিল। অগত্যা একজনকে জিজ্ঞেস করে কোনদিকে গেলে হারবার ব্রিজ পাওয়া যাবে। লোকটা দেখিয়ে দিতে ওরা সেই মত হাঁটতে থাকে।   

সকাল আর রাতের মধ্যে সত্যি কত ফারাক! এক তো এই জায়গাটা বিজনেস সেন্টার। আর দ্বিতীয় লোকাল আর ট্যুরিস্টদের ভিড়ে সরগরম। তার মধ্যে রাস্তায় গাড়ির মেলা,ঘনঘন ট্রাম চলছে। অনসূয়ার হাতে মোবাইল ধরিয়ে বাবি যথেচ্ছ নিজের ছবি আর ভিডিও বানিয়ে ফেলে। নানা পোজে,নানা রকম অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলতে তুলতে অনসূয়া ক্লান্ত।

ওরে আমার দুটো ছবি তোল! আমিও তো বেড়াতে এসেছি… 

ও হ্যাঁ দাও!

ব্যাকগ্রাউন্ডে ট্রাম, কখনো হিউজ অফিস বিল্ডিং এমনকি অ্যাপেল এর অফিস রেখে বাবি ছবি তুলে দেয়।

দেখো। কি ফাটাফাটি ছবি তুলেছি।

অনসূয়া আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখে হতাশ, এ কি রে! আমায় তো গুটিপোকার মত এতটুকু লাগছে বাবি!

আরে ব্যাকগ্রাউন্ড টা দেখো… 

রাখ তো ব্যাকগ্রাউন্ড। আমায় যাতে বোঝা যায় সেরকম কয়েকটা তুলে দে।

তাই দেয় বাবি। আর এবারে অনসূয়ার পছন্দ হয়।

লেটস ওয়াক টুওয়ারডস অপেরা হাউস মা…এসো।

রাস্তা ক্রস করতে করতে অনসূয়া বলে, অপেরা হাউস লাস্টে যাব। চল অন্যদিকটা দেখি।

হারবার ব্রিজের গা ঘেঁষে ফার্স্ট ফ্লিট পার্কে ওরা এল। ভিড় আছে। পার্কের এক পাশে এক বিদেশিনী নিজের মনে ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে আর পথচারীরা কেউ দাঁড়িয়ে শুনছে। কেউ কিছু দান পেটিতে দিয়ে যাচ্ছে।

এখান থেকে জেটি দেখা যাচ্ছে আর ডানদিকে ব্রিজটাও। ভাল হাওয়া দিচ্ছে। সমুদ্রের হাওয়া। উড়ে যাচ্ছে বাবির চুল আর তার সঙ্গে মনটাও। এতদিন বিভিন্ন ট্র্যাভেলগে দেখে এসেছে, এবার স্বচক্ষে দেখছে। কখনো ভাবেনি এভাবে তার ইচ্ছেপূরণ হবে। অবশ্য সিডনি আসার ইচ্ছে জন্মায়নি কখনো বা স্বপ্ন ও দেখেনি, হঠাৎ সবকিছু হয়ে গেল। এক পা ফিরে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে।

কি হল?

থ্যাঙ্ক ইউ। 

কিসের জন্য?

এই…আমায় নিয়ে এলে বলে।  

অনসূয়া গাল টিপে দেয়, আমার সোনা ছেলে।

মা প্লিজ! সবার সামনে গাল টিপো না। লোকে দেখছে।

দেখুক। আমার ছেলের গাল আমি টিপব তাতে কার কি?

পেছন থেকে ‘ফট’ করে একটা শব্দ শোনা যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে লোকের চিৎকার। কি হয়েছে কিছু বোঝার আগেই ভায়োলিন বাজিয়ে মেয়েটি তার সরঞ্জাম গুটিয়ে দৌড়তে শুরু করে।

কি হল বলতো? 

অনসূয়া পার্কের দিকে ঘুরতে দেখে দূর থেকে এক বন্দুকধারী ধেয়ে আসছে। আর চিৎকার করে কিসব বলছে। মুহূর্তে ছেলের হাতটা ধরে অনসূয়া ছুটতে শুরু করে হারবারের ধার ধরে, কোনোদিকে না তাকিয়ে। বাবিও হতবাক। এরকম মনোরম একটা সকাল নিমেষে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে এক সেকেন্ড আগেও কল্পনা করেনি। 

পুট ইওর গান ডাউন… অর উই উইল শুট!

পুলিশের গলাই হবে। ভেসে আসে ওদের পেছনদিক থেকে। 

নো! লিসেন টু মাই ডিমান্ডস ফার্স্ট। অর আই উইল শুট এনাদার সিভিলিয়ান।

তার মানে এর মধ্যে লোকটা কাউকে মেরে ফেলেছে! ভাবতেই অনসূয়ার শরীরটা কাঁপতে শুরু করে। ব্যাগে ফোন অথচ ভাইকে জানানোর উপায় নেই।  

মা, কারোর থেকে হটস্পট নিয়ে ছোটমামাকে কল করব?

এখনকার দিনের ছেলে, এসব বুদ্ধি চট করে খেলে যায়। অনসূয়া হ্যাঁ না বলার আগেই বাবি হাত ছাড়িয়ে বাঁদিকে চলে যায়। ছোটখাটো যে কটা স্ন্যাকবার ছিল সেগুলো ঝপাঝপ বন্ধ করে স্টাফেরা পালিয়ে যাচ্ছে। 

এক্সকিউজ মি! ক্যান আই গেট ইওর মোবাইল হটস্পট। নিড টু কল সাম ওয়ান। 

কালো ফুল হাতা শার্ট, ধুসর রঙের প্যান্ট পরা ছেলেটা বাবির দিকে ফেরে। ফর্সা রং, চোখের তারাদুটো সবজে।  

ক্যান ইউ প্লিজ! বাবি মিনতি করে।

শিওর!

ছেলেটা মোবাইলটা পকেট থেকে বার করতে বাবি অনসূয়াকে ডাকে, মা এসো। ছোটমামার সঙ্গে কথা বলো।

ইন্ডিয়ান? হটস্পট অন করতে করতে ছেলেটা জিজ্ঞেস করে। 

ইয়েস। 

তব তো হিন্দি আতি হোগি?

হাঁ আতি হ্যায়।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে ছেলেটার। ততক্ষণে অনসূয়া এসে পড়েছে, দে কথা বলি।

যা! সরি, কল করা যাবে না। মনে হচ্ছে জ্যামার লাগিয়ে দিয়েছে। 

ছেলেটা মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে মাথা নাড়ে, নট ওয়ার্কিং। 

মাই গড! তাহলে ছোটমামার সঙ্গে যোগাযোগ করব কি করে?  

আপনারা কোথায় যাবেন? 

অনসূয়া নিজেকেই বলে, কি যে ঝামেলায় পড়লাম এখানে এসে। কি করব এবার? 

কোথায় যাবেন বলুন? আবার জিজ্ঞেস করে ছেলেটা।

সেভেন হিলস।

ও! অনেকটা দূর। এক কাজ করুন, আমার দোকানে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করুন। ততক্ষণে নিশ্চয় পুলিশ লোকটাকে ধরে ফেলবে। তারপর আপনারা… 

ট্রেন বাস সব চলবে তো? 

চলবে। 

কিন্তু…

কিছু বলতে যাচ্ছিল অনসূয়া, আবার দূর থেকে কয়েকটা গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। 

মনে হচ্ছে পুলিশ টেক ওভার করে নিয়েছে। 

তাই! যাক বাঁচা গেছে।

সানি! রান ম্যান…দ্যাট গাই ইজ কামিং দিস সাইড। 

কয়েক হাত দূর থেকে একজন চিৎকার করে ছেলেটাকে বলে উল্টোদিকে দৌড় মারে। 

গুড গড! আই থট ইটস দ্য পোলিস! 

বাবি আর অনসূয়ার হাত ধরে টেনে দোকানের ভেতর ঢুকিয়ে ঝপাং করে শাটার ডাউন করে দেয় সানি। 

 

রিমা অনলাইন কাজ করছিল। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে লিভিং এরিয়াতে এসে টিভিটা চালায়। সকাল থেকে এই প্রথম একটু বসতে পারল বা বলা যায় নিজের মত সময় বার করতে পারল। মি টাইম। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে এক জায়গায় থামে। সাউন্ড বাড়িয়ে মাগে সিপ করতে গিয়ে চোখ আটকে যায়। হারবার ব্রিজের কাছে আততায়ী হামলা। ফুটেজ দেখা যায় এক বন্দুকধারী পার্কের ভেতর দিয়ে ছুটছে আর এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ছে। 

হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায় রিমার। ওখানেই তো অনসূয়ারা বেড়াতে গেছে। মোবাইলে পাওয়া যাবে না জানে। সঙ্গে সঙ্গে কৌস্তভকে ফোন করে। 

দেখলে? 

আমি তোমাকেই কল করতে যাচ্ছিলাম। 

কী হবে?

আমার মিটিং শেষের দিকে। বেরোচ্ছি।

কিন্তু ওরা সেফ আছে কি না… 

লেটস নট স্পেকিউলেট…আমি পরে কথা বলছি।  

 

দুটো এনার্জি ড্রিংকের ক্যান দুজনের সামনে রাখে সানি। গুলির শব্দ, মাইকে পুলিশের হুমকি এখন আর শোনা যাচ্ছে না। তার মানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তাও সাবধানের মার নেই, এখনই বাইরে বেরোনো উচিত হবে না বলে অনসূয়া আর বাবিকে বেরোতে দেয়নি।   

এটা খেয়ে নিন। এনার্জি পাবেন।  

অনসূয়ার বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। হাতটাও অল্প কাঁপছে। এসব ঘটনা টিভিতে দেখেছে, কাগজে পড়েছে। কিন্তু চাক্ষুষ এই প্রথম। যদি সেই সময় ওরা পার্কের ওদিকটায় যেত? যদি গুলিটা কোনোভাবে বাবির গায়ে লাগত? ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। 

আপনি আর টেনশান করবেন না ম্যাম। 

আচ্ছা, ওই লোকটা ওভাবে গুলি করছিল কেন? 

টেররিস্টদের নানারকম অ্যাজেন্ডা থাকে। ওরও আছে কিছু। 

কোথাকার লোক?

শুনছিলাম পাকিস্তানি। 

সারা পৃথিবীটা নরক বানিয়ে রেখেছে পাকিস্তান! বেশ রেগে যায় অনসূয়া, অন্য দেশগুলো চাঁদে পৌঁছে গেল আর ওরা শুধু সন্ত্রাসবাদী তৈরি করতে ব্যস্ত।  

হ্যাঁ ম্যাম। আ ডিসগাস্টিং কান্ট্রি! কয়েক শো বছর পিছিয়ে আছে। 

বাবি কয়েক সিপে ড্রিংকটা শেষ করে ক্যানটা রাখে, মোবাইল কাজ করছে?

লেট মি চেক।

সানি স্ক্রিন অন করে, না। নো টাওয়ার। দাঁড়ান আমি একবার বাইরেটা দেখি।

শাটারটা অর্ধেক তুলে উঁকি মারতে মার্ককে দেখা যায়। সে হাত নেড়ে বলে, পোলিস অ্যারেস্টেড হিম। 

ওহ গ্রেট!  

হাত দিয়ে ঠেলে শাটারটা মাথার ওপর তুলে হাসিমুখে সানি ভেতরে আসে, চিন্তা নেই। লোকটা ধরা পড়েছে। আসুন এবার।

অনসূয়া আধ খাওয়া এনার্জি ড্রিংকের ক্যানটা কাউনটারে রেখে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে আসে, আমরা ট্রেন ধরব। চলছে তো?

হে মার্ক! রেল সার্ভিসের…

মার্ক নিজের দোকানে তালা মারতে মারতে চেঁচায়, ইটস অন।

ওহ বাবা বাঁচলাম! বুক থেকে পাথর নামে অনসূয়ার। 

চলুন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি।

সানি দুজনকে নিয়ে এগোতে থাকে। একটু আগে দেখা লোকে ভরা হারবারে এখন ভিজিটার নেই। চারদিকে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। পুলিশ ছেয়ে আছে। ওদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। অনসূয়া আর বাবি পাসপোর্ট দেখিয়ে ছাড় পায়। কত প্ল্যান ছিল আজকে। সব ধূলিসাৎ। না হল অপেরা হাউসে সময় কাটানো, ক্যাফেতে খাওয়া আর না হল ট্রামে চড়া। তবে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারল এর থেকে বড় কথা আর কি হতে পারে? 

ষ্টেশনের কাছাকাছি এসে অনসূয়ার হঠাৎ মনে পড়ে, একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে। ড্রিংকের টাকাটা দেওয়া হল না।  

সানি হাসে, প্লিজ ম্যাম। ভেবে নিন না ওটা গিফট ছিল।

না না সানি, এ কি করে হয়? তুমি বলো কত দাম। অনসূয়া ব্যাগের চেন খুলে পার্সটা বার করে।

অতিথি দেব ভব…তার সেবা করে আবার তার কাছ থেকে দাম নেব? আপনি হলে নিতেন? 

অনসূয়া অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে, আজকালকার ছেলে হয়ে তুমি এসব মানো জেনে খুব ভাল লাগল। কিন্তু আমার…আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে…  

সানি মাথা নাড়ে, প্লিজ ম্যাম এটা আমার রিকোয়েস্ট।

ওকে। অ্যাজ ইউ উইশ। 

থ্যাঙ্কস ফর এভরিথিং সানি। বাবি হাত বাড়ালে সানি ওর হাতটা ধরে ঝাঁকায়। 

অনসূয়া পার্সটা ব্যাগে রেখে ঘড়ি দেখে, দশ মিনিটে ট্রেন। সানি পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে বাবিকে দেয়, পৌঁছে আমায় একটা কল করো।  

শিওর। 

বাবি কার্ডটা উলটে পাল্টে দেখে। দোকানের নাম আর ফোন নম্বর লেখা। 

এই সফরটা অনেক কারণে মনে থাকবে। সবথেকে বেশি মনে পড়বে তোমার কথা। তুমি না থাকলে আজ যে কি হত! 

অনসূয়ার চোখের কোণ চিকচিক করছে, তোমার পুরো নামটাই তো জানা হল না বাবা! তুমি কি অরিজিনালি এখানকার?

সানি হাসিমুখে উত্তর দেয়, আমার নাম এহসান মালিক। বাড়ি মুলতান, পাকিস্তান।  

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *