short-story-pakhir-bondhura

পাখির বন্ধু

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

মিছিলটা সকালেই বেরিয়েছে। আসলে কমবয়সী ছেলেদের উৎসাহই আলাদা। পারলে ওরা কাল বিকেলেই মিছিল বার করত। বাবা মা ঘরের ভেতরে ছিলেন। তাই জানতে পারেননি। শোনেননি কিছু। অহনা জানলা দিয়ে দেখেছিল। বেশ বড় মিছিল। অনেকের গার্জেনও আছেন। ছেলেগুলো চিৎকার করে বলছিল, “মানছি না, মানব না।” নেহাত সব কিছু ফেলে ওর পক্ষে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। নাহলে ও অবশ্যই যোগ দিত। বিল্টু জানতে চাইছিল বারবার, “কিসের মিছিল? কী বলছে ওরা?”

অহনা এড়িয়ে গিয়েছে। ওইটুকু ছেলেকে কি বলবে ও?

এই মুহূর্তে ওকে কি বলা যেত এটা একটা ভালোবাসার মিছিল? শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের একান্ত শ্রদ্ধা, অনুরাগের মিছিল। বলা যেত না। বা বললেও ওইটুকু ছেলে, ও কিছুই বুঝত না।

সকালের কাগজটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। একবার সেরিব্রাল এ্যাটাকের পর বিল্টুর দাদুর শরীর এখন আর তেমন চলে না, কিন্তু মাথা চলে। পা ঘষে ঘষে লাঠি নিয়ে সকালে বাইরের ঘরে পৌঁছে যান তিনি। ঠিক সকাল আটটায়। কাগজটা তখন ব্যালকনি থেকে তুলে সবে চায়ের টেবিলে আনা হয়। উনি মুখ ধুয়ে চশমা পরে একেবারে প্রস্তুত হয়েই যান। আজও চেয়ারে বসেই হাঁক পাড়লেন।

“বউমা, কাগজটা কোথায়?”

অহনা খুব নিরীহ ভাবে ওঁকে নিরস্ত করার জন্য যুক্তি সাজানোর আগেই বিল্টু কাগজ এনে তুলে দিল দাদুর হাতে। শোবার ঘরে তোশকের তলায় ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রেখেছিল অহনা। বিল্টু টেবিলে বসে হোমওয়ার্ক করতে করতেই নজর করেছিল নির্ঘাৎ। এসে সটান দাদুর হাতে তুলে দিল কাগজটা। কিছু আর করার ছিল না। অহনা চায়ের কাপ আর ডিসে দুটো বিস্কুট সাজিয়ে টেবিলে রেখে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। এরপরের প্রশ্নের ঝড়টা ওকেই সামলাতে হবে তো।

‘বউমা’ হাঁকটার জন্য অপেক্ষা করছিল ও। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘরে ঢুকে দেখল নিবারণ বাবু চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। ও ঢুকতেই ফিরে তাকালেন, “কাগজে এসব কী লিখেছে? বুবুন কোথায়?”

অহনা হাতে কাপড়ের খুঁট নাড়াচাড়া করে।  

“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। বুবুনকে দেখছি না তো। ওকে কি ওরা এ্যারেস্ট করেছে? কখন? আমাকে তুমি বলোনি কেন?”

অহনা থেমেথেমে বলে “আস্তে কথা বলুন। মা শুনতে পাবেন। আপনি শুয়ে পড়েছিলেন।”

নিবারণবাবু মাথা নিচু করে বিড়বিড় করেন, “ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা! এই চ্যাটার্জী পরিবারে এমন ঘটনা…।”

এবার অহনা ফোঁস করে ওঠে। “কী সব আবোলতাবোল বলছেন বাবা? আপনার মনে হয় এরকম একটা নোংরা কাজ বুবুন করতে পারে? সবটাই ষড়যন্ত্র!”

“কিন্তু কাগজে লিখেছে তো। সবাই বিশ্বাস করবে।” নিবারণবাবু ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়েন। অসহায় ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে বলেন, “ওকে পকসো ধারা দিচ্ছে। কী হবে বউমা?”

“আপনার বড় ছেলে ছুটি নিয়ে আসছে। ও ঠিক ব্যবস্থা নেবে। আপনি যান চোখে মুখে জল দিয়ে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। মাকে কিছু বলবেন না।”

অহনা কাগজটা খোলে আবার। বড় বড় করে কাগজের দ্বিতীয় পাতাতেই বেরিয়েছে খবরটা। ‘বৈদ্যবাটীর বিখ্যাত একটি স্কুলের জনৈক মাস্টার মশাই ছুটির পর ক্লাস ফাইভের একটি ছাত্রকে দরজা বন্ধ করে রাখেন এবং শাস্তির নামে যৌন অত্যাচার করেন। অভিভাবকের নালিশের ভিত্তিতে স্থানীয় থানা উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এবং জামিন দিতে অস্বীকার করে।’  

বুবুনের নাম দেওয়া নেই। তবে ছবিটি দেখে ওকে সহজেই চিনতে পারা যায়। পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় মারমুখী জনতার ভিড়, তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত…। অহনা ভয় পা্‌য়, এতকিছুর পরে ঘটনাটার সত্যিমিথ্যে কেউ দেখবে কি? কিন্তু ও নিজে নিশ্চিতভাবেই জানে, বুবুন এ কাজ করতে পারে না।

অহনা ফোন করে ওর বরের ফোনে। ফোনটা বেজে যায়। কেউ ধরে না। মনে হয় গাড়িতে, শুনতে পাচ্ছে না।

 

২

 

কাগজটা দেখেছে সুলেখা। প্রথমে খবরটা ওকে দিয়েছিল সুদীপ্তা, ওর ছোট বোন। ঘুম থেকে ওঠার পর ব্রাশ করাকালীন সুদীপ্তা ওকে বলেছিল, “দিদি একটা খারাপ খবর আছে।”

মা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল, “চুপ। একটা কথাও বলবি না। আগে ওকে চা খেতে দে।” সুদীপ্তা সরে গেছিল চোখের সামনে থেকে। চা-টা সুলেখা ঠিক খায়নি। গিলেছিল। তারপরেই কাগজটা হাতে তুলে হতবম্ব হয়ে যায়। যদিও নীলাদ্রির নামে যে অভিযোগ কাগজে বেরিয়েছে, সেটাকে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। গতকাল রাতে নীলাদ্রিকে ফোন করেছিল ও। কোনও সাড়া পায়নি। এতক্ষণে কারণটা বোঝা যাচ্ছে। আচ্ছা ও এখন কী করবে? কোথায় কার কাছে যাবে? নিজের সমস্যা নিয়েই ও বিব্রত। সামনের সপ্তাহেই ওর মাকালু অভিযান, প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। আগের অভিযানের জন্য বেশ কিছু টাকা বাকি আছে। সরকারী সাহায্য সেভাবে পায়নি। ব্যাংক থেকে লোনটা স্যাংশান না হলে ওর যাওয়া হবে না। এদিকে নীলাদ্রির এই সমস্যা। ঠিক এই মুহূর্তে একজনকেই মনে পড়ল ওর। তিনি হলেন কাকাবাবু। ও সাইকেলটা বার করে বেরোতে যাবে মা এসে সামনে দাঁড়াল।

“কোথায় যাচ্ছিস?”

“কাকাবাবুর কাছে।”

“শোন, ভেবেচিন্তে এগোস। পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। তুই জড়ালে তোকে নিয়ে টানাটানি করবে কিন্তু।”

সুলেখা গম্ভীর হয়ে তাকায় মায়ের দিকে। তারপর সাইকেলটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ও মায়ের কথাটা ভাবছিল। নীলাদ্রির ব্যাপারটায় ও আলগা হয়ে থাকতে পারে না। এর আগের বারে এভারেস্টে অভিযানের সময় নীলাদ্রি ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে যেভাবে ওর জন্য ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ করে টাকা তুলেছিল, সেটা ভোলার নয়। এতটা অকৃতজ্ঞ ও হয় কি করে? তাছাড়া নীলাদ্রি শুধু ওর স্কুলের কলিগ নয়, দীর্ঘদিনের বন্ধুও বটে।

না প্রেম নয়। শুধুই বন্ধুত্ব। তবে তার বন্ধন আরো জোরালো। এই সম্পর্কের সূত্রপাত কলেজেই। নীলাদ্রীকে ও তাই ভালো করেই চেনে। আরো অনেকের মত এটাও জানে, এই ঘটনার কোনও ভিত নেই। শুধু শুধুই ভুল ভিতের ওপর একটা এলোমেলো বাড়ি খাড়া করা হয়েছে।    

পুলিশ নীলাদ্রিকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। কাগজেও খবরটা বেরিয়েছে। গতকাল ও স্কুলে যায়নি, আর ঘটনাটা তখনই ঘটল। ফাইভের সমর দাসকে নীলাদ্রি ঘরে আটক করেছিল। তারপরে ছেড়েও দেয়। ছেলেটা দিব্যি স্বাভাবিক ভাবেই ক্লাস করে বাড়ি যায়। গণ্ডগোলটা তারপরেই ঘটে, দলবল নিয়ে ওর অভিভাবক এসে স্কুলেই নীলাদ্রির ওপর চড়াও হয়। ওকে বাঁচাতেই মাস্টার মশাইরা পুলিশকে খবর দেন এবং তাঁরা এসে নীলাদ্রিকে থানায় নিয়ে যান। তারপরের ঘটনাটাই ও ঠিক বুঝতে পারছে না। কাগজে এসব কুৎসার মানে কি?

কাকাবাবুর বাড়ির গেট খুলে ঢুকছিল ও। বাগানে টগর ফুলের গাছে কুঁড়ি ভর্তি হয়ে আছে। বৃষ্টির জল পেলেই ফুটবে। ছোট আমগাছের মাথা ভর্তি বউল। ছোট ছোট আমও ঝুলছে। এই তো স্বাভাবিক প্রকৃতির ছন্দ। তবে প্রকৃতির ছত্রছায়ায় বড় হওয়া মানুষ এত কুৎসিত আচরণ করে কি করে? কাকাবাবুর দিকে নজর পড়ল ওর। উনি মাথায় সেই টুপিটা পরেছেন। বাগানে কাজ করছিলেন।

ওকে দেখে বাগানের কলে হাত ধুয়ে এগিয়ে এলেন। মুখ তুলে আস্তে বললেন “কালই শুনেছি। আমি আজ সকালেই থানায় গিয়েছিলাম। এখন যিনি আছেন, আমাকে চেনেন না। বললেন, আপাততঃ চোদ্দ দিন ওকে জেল কাষ্টডিতেই রাখা হবে, তারমধ্যেই হয়ত কোর্টে তুলবে। জামিন পাবে না। পকসো আইনে ধরেছে তো। জামিন পাওয়া মুস্কিল।”

“আমি কী করব তাই ভাবছি। সামনের সপ্তাহে আমার মাকালু অভিযান। ঠিক এই সময়েই এই সমস্যাটা…। এটাও তো ছেড়ে দেওয়া যায় না।”  

“তোমার ফোকাসটা নড়িও না। অনেকটা প্রস্তুতি আছে, এখন সবটা এলোমেলো করে দেবার কোনও মানে হয় না। আমরা তো আছিই। লড়ে যাব। তুমি থেকে আর বেশি কী করবে?”

কাকাবাবু একটু অন্যরকমের মানুষ। মিলিটারিতে ছিলেন। পাহাড়ে উনিও উঠেছেন। বারবার ওকে বলেছেন, “পাহাড়ে যারা ওঠে তাদের মানুষের মত দেখতে লাগলেও তারা আর মানুষ থাকে না। তাদের ডানা গজায়। তারা মনেমনে পাখি হয়ে যায়। এ সংসারের মানুষ তাদের বুঝতে পারে না। চিনতে পারে না।”

ফিরতে ফিরতে কাকাবাবুর বলা কথাটা ভাবছিল ও। আজকাল ওকেও তো অনেকে বুঝতে চাইছে না। বিশেষ করে বাড়ির লোকেরা। ওর এই পাহাড়ের নেশা নিতে পারছে না কেউ। মা তো কথায় কথায় বলে, অনেক তো হল। ধবলগিরি তে উঠেছিস, এভারেস্ট হয়েছে, আর কী চাই? দেনার দায়ে ভিটেটুকুও রক্ষা করতে পারব না যেদিন, সেদিন পথে দাঁড়াতে হবে। কাউকে পাশে পাব কি?”

আসলে বাবার কাছে ও বলেছিল, “বাড়ির দলিল বন্ধক রাখলে ব্যাঙ্ক লোন পাওয়া যেতে পারে হয়ত।” কথাটা মার কানে উঠেছে। ওকে খুবই স্বার্থপর ভেবেছে। সেটাও ভুল কিছু নয়।

এক এক সময়ে ওরও নিজেকে বড় স্বার্থপর মনে হয়। এই পাহাড়ে চড়ার নেশার জন্য ও সংসারে থেকেও দিনদিন একটা আলাদা মানুষ হয়ে যাচ্ছে। বাবা রিটায়ার করেছেন। সরকারি অফিসের সাধারণ কেরানী ছিলেন। পয়সাকড়ি যেটুকু যা পেয়েছেন তাতে তো আর হাত দেওয়া যায় না। পৈত্রিক বাড়িটা ছিল। সারাই করতে কিছু টাকা গিয়েছে। ও বিয়ে না করলেও বোনের বিয়ে দিতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা মার চিকিৎসাবাবদও কিছু লাগতেই পারে। ওর পাহাড়ে চড়ার জন্য যে বিশাল অঙ্কের টাকা লাগে তা যোগাবে কে?

এরমধ্যে এই নিদারুণ দুঃসংবাদ। হেডমাস্টারমশাই নীলাদ্রীর কথা শোনেন। ওর অনুপস্থিতিতে সুলেখার পাহাড়ে চড়ার ছুটি পেতেও অসুবিধা হতে পারে। না, সত্যিই ও দিনদিন বড় স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। নাহলে এই বিপদের সময়েও ওর নিজের ছুটির কথা ভাবতে পারল কি করে? সুলেখা ওর সাইকেলটা নিয়ে স্কুলের দিকেই এগোয়। দেখা যাক মাস্টারমশাইরা কি ভাবছেন।

সারা কমনরুমে শীতল নীরবতা! সুলেখার মনে হচ্ছিল কুঁজোর ঠান্ডা জল কেউ কমনরুমে ঢেলে দিয়েছে। সুব্রত বলতে উঠে দাঁড়াল, “একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। আজ নীলাদ্রির ওপর যে আক্রমণ হল, কাল তা যে আমাদের ওপর হবে না, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। কাজেই এই ঘটনায় দল মত নির্বিশেষে সকলকে একসঙ্গে লড়তে হবে।”

তন্ময় এবার দাঁড়ায়। “আমি আন্দোলনে আছি। আমি জানি আসল ঘটনাটা। মাস দেড়েক আগে পেরেন্ট টিচারস্‌ মিটিং এ ওই সমর দাসের বাবা মদ খেয়ে এসেছিল। নীলাদ্রি ওঁকে সব গার্জেনদের সামনে চলে যেতে বলে। সেই অপমানের প্রতিশোধ এতদিনে নিল। আমি দেখছি কী করা যায়।”

স্কুলের ছেলেরা আজ মাস্টার মশায়ের পুলিশের হাতে আটক হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে গেট আটকেছিল। গতকাল মিছিল করেছে। আজ স্কুল বন্ধ। টিচাররা দেড়টার পর স্কুলে জড়ো হয়েছেন। তন্ময় অন্য টিচার্স ইউনিয়নের সদস্য। কিন্তু ও একসঙ্গে লড়বে বলছে। সুলেখা একটু আশ্বস্ত হয়।

 

৩

 

“আচ্ছা উনি আপনাদের স্কুলের না?”

ব্যাঙ্কের কর্মচারিটি চশমার মধ্যে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকায় সুলেখার দিকে। স্কুল থেকে বেরিয়ে লোনের ব্যাপারে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে ব্যাঙ্কে এসেছিল ও। প্রশ্ন শুনে সোজা তাকায় ওনার চোখের দিকে।

“আমি সুলেখা মিত্র। রবীন্দ্র স্মৃতি নিকেতনের টিচার। ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে একবার দেখা করা যাবে কি?”

“ও আচ্ছা। আপনিই সেই, মানে ওই মাস্টার মশাই…, আপনাদের স্কুলেই…।”

সুলেখা আর দাঁড়ায় না, ওই কাউন্টার ছেড়ে ম্যানেজারের ঘরের দিকে হাঁটে।

যেতে যেতে ভাবছিল, নীলাদ্রি এই সেদিন ওকে বলেছিল, “তোর কি মজা! কেমন মাঝেমাঝেই উঁচুতে উঠিস। আমাকে একবার নিয়ে যাবি। এই ‘থোড় বড়ি খাড়া’ জীবন আর ভালো লাগছে না।”

নীলাদ্রি জানে না এই পৃথিবীতে শুধু উঁচু নয়, নিচু ভূখন্ডও অনেক আছে। সীতার পাতাল প্রবেশ কোনো রূপক কাহিনি নয়। তবে দূর্ভাগ্যজনক ঘটনা হল যে ছেলেটা ওর সঙ্গে অনেক উঁচুতে উঠতে চেয়েছিল, তাকেই এই জগৎ কেমন পাতালে ঠেলে দিল।

নীলাদ্রির কথা ভাবতে ভাবতে গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল, জিভ দিয়ে চাটছিল ও। না ওকে শক্ত থাকতেই হবে। ম্যানেজার বাবু আবার পুরনো প্রশ্নমালা ঘাঁটবেন হয়ত। সেক্ষেত্রে ওর উত্তর কী হবে ভেবে নিচ্ছিল ও। নিজের গন্ডি ছেড়ে পাহাড়ে পা রাখতে রাখতেই একটা বড় শিক্ষা হয়ে গিয়েছে ওর। ঝাপট না মারতে পারলে এদের বশে আনা যায় না।

ম্যানেজারের সামনের চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসেছিল সুলেখা। লোনের জন্য দেখা করতেই হল। ও কড়া নজরে দেখছিল ওনাকে। দরকারি কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে উনি না আবার বেদরকারি কথা বলেন।

 

৪

 

ঘটনাটা অদ্ভুতভাবে মোড় নিল। জেল থেকে মুক্তি পাওয়া নীলাদ্রিকে ফুলের মালা পরিয়ে সঙ্গে নিয়ে ছাত্ররা বিজয় মিছিল বার করেছে। নিজেরাই ড্রাম বাজিয়ে শ্লোগান দিচ্ছে। রাস্তায় লোক জমেছে। মিছিল স্বতঃস্ফূর্ত! কোনো কোনো শিক্ষক শিক্ষিকা মিছিলে যোগ দেবেন বলছিলেন। ওরা বাধা দিয়েছে।

“আপনারা গেলে গার্জেনরা ভাববেন আপনারাই ছাত্রদের মিছিল করতে বলেছেন। অথচ সেই কথাটা তো সত্যি নয়। এটা তো ওরাই উদ্যোগ নিয়ে করছে। ওদের ওভাবেই মিছিল করতে দিন।”

রাস্তার একপাশে সাইকেল দাঁড় করিয়ে মিছিলটা দেখেছিল ও। খুব তৃপ্তি হয়েছিল ওর। অপমান যারা করেছে তাদেরই প্রতিনিধিরা সম্মান দিতে পথে নেমেছে। এযে কতবড় পাওয়া!

জঘন্য কেসটার মোড় ঘোরে বড় অদ্ভুতভাবে। নীলাদ্রি জামিন পায়নি। জেলেই ছিল। ইতিমধ্যে সমর দাস এসেছিল স্কুলে। ছোটরা অনেকসময় বড়দের হারিয়ে দেয়। সমর দাসের বাবা ছেলেকে পাখিপড়া করিয়েছিলেন। থানা থেকে শুরু করে সর্বত্র মাটির দিকে তাকিয়ে ছেলেটি একই কথা বলছিল।

“আমাকে স্যার প্রথম পিরিয়ডে নাম ডাকার পর দোতলার খেলার জিনিস রাখার ঘরে বন্দী করেন।”

“তুমি কী করেছিলে?”

“আমি বাপ্পাদিত্যকে ঘুষি মেরেছিলাম।”

“স্যার তোমায় মেরেছিলেন?”

“না দরজায় শিকল তুলে আটকে রেখেছিলেন।”

“তারপর …?”

“ছুটির পর স্যার এসে ঘরে ঢুকে আমাকে প্যান্ট ……”

এই অবধি শোনার পর সুলেখা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সমর দাসের রেকর্ড করা উক্তি শিক্ষকদের শোনাচ্ছিল তন্ময়। ওর গা গোলাচ্ছিল। বেশি কথা শোনার মত শক্তি ছিল না।

কিন্তু তারপরের সেই চমকপ্রদ ঘটনাটা ঘটল ওরই ক্লাসে। সেদিন ওর মন খুব খারাপ ছিল। ভাবতে ভাবতেই ক্লাসে ঢুকছিল। ব্যাঙ্ক লোন ম্যানেজ হয়েছে তুফানদার জন্য। ব্যাংক ম্যানেজার ওঁর ছেলেবেলার বন্ধু। তুফানদা গিয়ে কীভাবে কী বলেছিল কে জানে, টাকাটা মঞ্জুর হয়ে গেল আপাতত। কিন্তু স্কুলে ছুটি পাওয়ার ব্যাপারে ধন্ধটা ছিলই। দিন ঠিক হয়ে গিয়েছে। উইদাউট পে হলেও ও বেরিয়ে যাবে। তবু মনের খচখচানি যায় না। শুধু তো ছুটি নয়, সিনিয়রিটি নষ্ট হবে। মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিয়ে সেদিন অফ্‌ পিরিয়ডে ওকেই  যেতে হয়েছিল ফাইভ বি তে। ওই ক্লাসেই পড়ে সমর দাস।

নীলাদ্রি জেলে যাবার পর ওদের বাড়িতে গিয়েছিল সুলেখা। ওর বাবা, মা, দুজনেই ভেঙে পড়েছেন। শুধু বউদি শক্ত আছেন।বললেন “আমি দশ বছর হল এবাড়িতে এসেছি। একটা মেয়ে একজন পুরুষমানুষকে যেভাবে চেনে, আর কারোর পক্ষে তাকে সেভাবে চেনা সম্ভব নয়। বুবুন কোনোমতেই একাজ করতে পারে না। তুমি দেখো, ও ছাড়া পাবেই।”

সেই থেকেই কথাটা মাথায় ঘুরছে। সামনেই সমর দাসকে বসে থাকতে দেখে চিন্তাটা কিলবিলিয়ে উঠেছিল। সমর দাসের মুখ শুকনো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ও কেঁদেছে।

“তোমার কি কিছু হয়েছে?” খুব মিষ্টি করে বলেছিল ও।

“হ্যাঁ দিদিমণি, সেই ফার্স্ট পিরিয়ড থেকে আমার সঙ্গে ক্লাসের কেউ কথা বলছে না।” ফুঁপিয়ে উঠেছিল ছেলেটা।  

“এসো এদিকে এসো। তারপর ওকে ডায়াসে তুলে একদম কাছে ডেকে নিচু গলায় বলেছিল “সেদিন কী হয়েছিল? সত্যি কথাটা চুপিচুপি আমাকে বলো শুধু, কেউ জানবে না।”

“স্যার আমাকে শুধু আটক করেছিলেন। গায়ে হাতই দেননি। বাবা আমাকে বলল যদি বাবা যা বলছে না বলি আমায় মারবে, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে, স্কুল ছাড়িয়ে দেবে। আমি তাই …। কথাটা কাউকে বলবেন না তো?”

 

৫

 

কিস্তি মাত হল ওই কথাতেই। সমর দাসের সঙ্গে ওর নিজের আলাপচারিতার রেকডিং স্কুলে বাজানোর পরে থানায় জমা দিয়েছিল ও। তারপর কোর্টে বিচারের সময় বাজানো হয় রেকর্ডিংটা। সমর দাসকে কোর্টে ডেকে এনে জেরা করা হয়। বেচারি খুবই ভয় পেয়েছিল। বাবার মারের ভয়। বিচারক ওর বাবাকে ধমকে ছেড়ে দেন। আর বলেন ভবিষ্যতে ছেলের ওপর অন্যায় ভাবে অত্যাচার করলে তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। 

ভাগ্যিস বুদ্ধি করে মোবাইলের রেকর্ডার অন করেছিল ও। বেকসুর খালাস হয় নীলাদ্রি।   

ওর পাহাড়ে চলাকালীন একদিন সুলেখাকে নীলাদ্রি বলেছিল, “তোকে হিংসে হয়, কেমন পাখির মত পাহাড়ের চূড়োয় চূড়োয় উড়ে বেড়াস।”

এবারেও পাহাড়ে রওয়ানা দেওয়ার আগের দিন নীলাদ্রির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ও। ট্রেনে বসে থাকতে থাকতে সেসব কথাই মনে পড়ছিল ওর।   

নীলাদ্রি ম্লান হেসে তাকিয়েছিল ওর দিকে। বলেছিল শুধু একটি বাক্য। “এবার পাহাড়ে যাবার আগে তুই আমাকে মুক্ত করে গেলি?”

ও হেসেছিল, “তোকে কে আটক করবে? আমি আছি তো। তুই আমাকে পাখি বলিস না? তেমন কিছু হলে তোকে আমার সঙ্গেই উড়িয়ে নিয়ে যাবো।”

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *